বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বিয়ের আসর থেকে
এইমাত্র পালিয়েছি
আমি। আমি নিজেই
পালিয়েছি এমনটাও
নয়। কে যেন আমার হাত
ধরে আছে। কী আশ্চর্য!
আমি তাকে দেখছি না।
এমনকি আমি নিজেকেও
দেখছি না। সে আমার
হাত ধরে টানছে। আমিও
যত তত তার সাথে
দৌড়ছি। এই মুহূর্তে
আমরা দুজনই ছায়া। সে
তো অদৃশ্যই, আমিও অদৃশ্য
হয়ে আছি। আমি ভয়
কাটিয়ে আগন্তককে
অনেক কিছু জিজ্ঞেস
করলাম।
ল্যামপোস্টেরদিক
ে দৌড়ছিলাম। আগে
আমার ছায়া একটু একটু
দেখেছিলাম। এখন
সম্পূর্ণ দেখছি। সেই
সাথে তারও। সে নিশ্চয়
ছেলে। ছায়ার যে লম্বা
চুল নেই আমার মতো।
বিয়ের আসর থেকে কেন
সে পালিয়ে এনেছে
তাও জানি না। আমার
কি কোনো বিপদ ছিল?
নাকি সে-ই আমার জন্য
বিপদ বয়ে এনেছে?
পেছনের দিকে আরেকটি
ছায়া দেখলাম। তা যত
তত আমাদের দিকে
তেড়ে আসছে। ভীষণ ভয়
করছে। আমার শরীরের
ঘাম শোষে গিয়ে গা
শিরশির করছে, রক্ত
শীতল হয়ে আসছে।
এভাবে থাকলে পেছনের
ছায়াটা আমাদের ধরেই
ফেলবে। বুদ্ধি করলাম,
আলোতে না দৌড়ে
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে
থাকলে কিছুটা লাভ
হবে। সে আমার ছায়াটা
আর দেখবে না। সেই
সুবাদে আমি আগন্তকের
বিরুদ্ধে গিয়ে একটি
গাছের নিচে অবস্থান
করলাম যেখানে ঘুটঘুটে
আঁধার। গাছটির
আশেপাশে চাঁদনী আলো
ছিটিয়ে আছে। সেও
এসেছে, আগন্তক। আমার
হাত এখনো ধরে আছে।
স্বর নিচু করে গম্ভীর
গলায় বলল, 'আপনি
এখানে এসে ঠিক
করেছেন। সুযোগ বোঝে
আপনাকে দিয়ে আসব।
ততক্ষণ পর্যন্ত হাত
ছাড়তে পারবেন না।
চুপচাপ বসে থাকেন।'
আমি যা হচ্ছে সবের
জন্যই অপ্রস্তুত। কোন
বাধায় যেন আমি কিছু
জিজ্ঞেস করতে গিয়েও
পারলাম না। অপর
ছায়াটিও ইতোমধ্যে
এসে পড়েছে। না, এসব
অলৌকিক কিছু স্বচক্ষে
আর দেখতে পারছি না।
মাথাটা যেন ঘুরে
উঠছে। অচেতন হয়ে পড়ে
গেলাম।
.
'মা, উঠিস না। শুয়ে
থাক।'
'মা, আমি এখানে কী
করে এলাম?'
'আমরা তোকে এই ঘরে
পেয়েছি সকালে। কথা
বলিস না। তুই এখন
অনেক ক্লান্ত। একটু
রেস্ট কর মা।'
মায়ের কথায় সায়ও
দেয়া হলো না।
অবসাদের বশে চোখদুটো
বেঁধে এলো।
চোখ খুলতেই দৃষ্টি
রাখলাম দেয়াল ঘড়ির
দিকে। কাটাগুলো অনড়।
নষ্ট হওয়ারই কথা।
রাকিবের মারা
যাওয়ার পর থেকে এ
দুটো বছর ঘরটি
তালাবদ্ধ ছিল। জিনিস
সবে ধুলোবালি জমে
আছে। মাকরশাও বাসা
বেঁধেছে অগণিত। আজ
দুটো বছর পর কেন
এখানে আসা হলো? কে
আনল? আজ থেকে ঠিক দুই
বছর আগে রাকিব
এখানে মারা
গিয়েছিল। তখন থেকেই
এটি মানুষের বাসা
থেকে মাকড়শার বাসায়
রূপান্তরিত হয়েছে।
টাইম কত এখন? সবাই
নিশ্চয় বাইরে আমার
ঘুম ভাঙার অপেক্ষা
করছে। তারা নিশ্চয় কী
হয়েছে জিজ্ঞাসা
করবে। আমি কি কালকের
কথাগুলো বলব?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে
কিছুক্ষণ নীরব
থাকলাম। রুমটিকেই
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি।
মনে হচ্ছে, এই
দেয়ালগুলোর
নিস্তব্ধতায়ও
রাকিবের নিশ্বাসের
শব্দ হচ্ছে। আচ্ছা,
সেদিন এখানে কী
হয়েছিল? রাকিবকে কে
মেরেছে? ওর শরীরের
মাংসগুলো কোন হিংস্র
প্রাণী খেয়েছিল? এই
ঘরটির আশেপাশে
চারিদিকে খোলামেলা।
হিংস্র পশুর উপদ্রব
কোত্থেকে হবে? হলেও
সে সেসময় আব্বুকে
জানাতে পারত। রাকিব
মোটেও ভীতু ছিল না।
আমি বয়সে ওর বছর
দুয়েক বড়। বলতে গেলে
রাকিবই সবসময় আমাকে
সবকিছুতে সাহস
জুগিয়েছে। আজ সে
কোথায়?
এখন যেখানে আছি,
সেটি আমাদের আসল
বাড়ি না। এটি
রাকিবের বাড়ি। আব্বু ও
ছেলে বলে ওকে খুব
দেখতে পারতেন।
আমাদের ঘরটা একটু
ছোট হওয়ায় আব্বুর
জায়গাও কম থাকায় ওর
ভবিষ্যতের জন্য আলাদা
করে এই ঘরটি
বেঁধেছিলেন এই
জায়গাটি কিনে নিয়ে।
ওর বয়স তখন উনিশের
বেশি ছিল না। এখানে
থাকার সে জেদ
ধরেছিল। সে যা চায়,
তাই আজীবন হয়ে
এসেছে। অতঃপর সে
এখানে এসে মাঝে
মাঝে দুয়েক রাত
কাটাত। ভয়ও করত না
ওর। আমাকে ও অনেক
ভালোবাসতো। আব্বুর
অবহেলার সামনে
দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে
আমাকে খুশি রাখত। তাই
ওখানে কারো যাওয়া
নিষিদ্ধ হওয়ার
সত্ত্বেও আমাকে
অধিকার দিয়েছিল।
আমি তখন বংশের মধ্যে
মেয়েদের পড়ার যতটুকু
সীমা আছে ততটুকু পড়া
চুকিয়েছিলাম। এমন
সময় আব্বু তাঁর এক বন্ধুর
ছেলেকে আনলেন। বন্ধুর
সাথে যোগাযোগ ছিল
না। তবে হুট করেই এই
ছেলের সাথে দেখা
হয়ে যায়। আব্বু কিছু না
ভেবে আমাদের বিয়ে
ঠিক করে দেন।
ছেলেটির নাম নাহিদ।
দেখতেও মোটামুটি ঠিক
আছে। শুনেছিলাম
এতদিন বাবার সাথে
বিদেশে থাকত।
বিয়ের দিন কাছিয়ে
আসতে লাগল। হবু
শ্বশুরের ঘরের কেউই
আসছিল না। বর ছাড়া
তার পরিবার নেই।
এভাবে বিয়ে? সে ছেলে
নিজেকে মডার্ন দাবি
করে। সে সুবাদেই একা
বিয়ে করতে সঙ্কোচ
করছে না। বিয়ের
কয়েকটা দিন আগে
ছেলেটি এল ঘরে। আব্বুর
সাথে কথাবার্তা বলতে
লাগল। আমাদের ঘরের
চাকর ছেলেটা চা
দিয়ে গেল। তাকে ধরতে
গেলে চাকরের মত
মানায় না। অনেক ফর্সা
এক ছেলে। ভেতরের
রক্তের লালবর্ণ উপর
থেকেই ফুটে উঠে। এই
টিপ দিলে যেন রক্ত
বেরিয়ে আসবে। এই
ছেলের রক্ত বেশি।
ফর্সার সাথে লাল
মিশিয়ে এক অপূর্ব বর্ণ
তার। নাহিদ তো
জিজ্ঞেস করেই বসল, সে
আমাদের আপন কেউ
নাকি। আমি হাসতে
হাসতে আমার এক
বান্ধবীর বাসার দিকে
রওনা দিলাম। অন্তরঙ্গ
সে, বিয়ের দাওয়াত না
দিলে হয়? মাঝপথে
রাকিবের কল এল।
'আপু, তুই কি বের হয়ে
গেছিস?'
'হ্যাঁ, কেন?'
'ইসস, একটু পরেই ঘরে
যাচ্ছিলাম। তোর
অর্ডার করা বইটা
নিয়েছি। ঘরে গিয়ে
সবাইকে দেখা দিয়ে
সোজা আমার নিজ
বাসায় যাব। তোর আসতে
হয়ত দেরি হবে। বইটা
তোকে হাতে হাতে
দিতে চাই। নইলে
চাচাতো বোন মিমু
পাগলিটা চুরি করে
বসবে।'
'রাকিব, তুই এক কাজ
করতে পারবি। আমি একটু
পরেই রহিমার বাসায়
গিয়ে পৌঁছবো। তুই যে
জায়গায় আছিস, দূরত্ব
সেখান থেকে বেশি না।
এসে দিয়ে যা।'
রাকিবের কাছ থেকে
বইটি নিয়ে রহিমার
বাসায় ঢুকলাম।
রাকিবও নিজ পথ ধরল।
আবার আমাকে পেছন
থেকে ডেকে বলল, আপু?
'কী?'
'কিছু না। নিজের খেয়াল
রাখিস।'
এটুকু বলে সে চলে গেল।
আমি প্রায় ঘণ্টাখানেক
সময় কাটালাম। একবার
আসলে রহিমা সহজেই
আমাকে ছাড়ে না।
কমপক্ষে পাঁচ ঘণ্টা
আমাকে রেখে দেয়ার
ক্ষমতা রাখে। এখনো
যাওয়ার প্রহর অনেক
দূর। ঘণ্টাখানেক পর
রাকিবের কল এল। সে
কিছুটা হাপিয়ে
বলেছিল, 'আপু, তুই এই
বিয়েটা করিস না। কা-
কারণ..'
'হ্যালো, হ্যালো।
হ্যালো। রাকিব? তুই
আছিস? রাকিব কই তুই?
কি হয়েছে? রাকিব?'
কানে অনেকক্ষণ
মোবাইল লাগিয়ে
রাখলাম। আর কোনো
সাড়াশব্দ পেলাম না।
ফোন রেখে টাইম
দেখলাম। আমি আসার
তিনটে ঘণ্টা পার
হয়েছে। এক ঘণ্টার
ভেতর সে বাড়ি পৌঁছে
জিনিস সব ঠিকঠাক
করে রওনা দিয়েছে।
বাড়ি থেকে ওর বাসা
দুই ঘণ্টায় যাওয়া
যাবে। হোক না হোক, সে
নিজ বাসা থেকেই কল
করেছে। তড়িঘড়ি করে
তার বাসার উদ্দেশ্যে
রওনা দিলাম। আব্বুকেও
কল দিলাম। কয়েকবার
রিং পড়া শেষে
বিরক্তির সাথে কল
উঠালেন। উনাকে
বিপদের কথা বলতেই
আম্মুকে নিয়ে বেরিয়ে
পড়লেন। দুই ঘণ্টা পড়
এই ঘরে এসে দেখি
মেঝেতে রক্ত ছড়িয়ে
আছে। কোথাও দু এক
ফোটা, কোথায় অনেক
বেশি। একটু দূরে
রাকিবের নিথর দেহ
পড়ে আছে। কিছুদূরে তার
মোবাইলটা পড়ে আছে।
আমি যেখানে
দাঁড়িয়েছিলাম
সেখানেই হাঁটুগেড়ে
বসে পড়লাম। ওর মৃত্যুর
পর আমি বিয়ে করলাম
না। এই ঘরটা অন্য কেউ
বেঁধে দিয়েছে। নাহিদ
তো উঠেপড়ে বিয়ে না
করার কারণ জানতে
চাইত। আমি শোকের
মধ্যে কিছুই বলতাম না।
নিশ্চয় রাকিব অমঙ্গল
কিছু দেখেছিল আমার
বিয়ের সাথে জড়িত।
সকলের অবস্থা
নাজেহাল ছিল। একই
দিনে দুজনে মৃত্যু!
আমাদের চাকর
ছেলেটিও সেদিন
মৃত্যুবরণ করেছে। সবার
ধারণা, তার গলার
পাশে যেদুটো ক্ষত আছে
সেগুলো সাপের দংশনে
হয়েছে। নাহিদ তখন
থেকেই ছোট বাচ্চা
যেমন ইনোসেন্ট মুখ
নিয়ে চকলেট খুঁজে, সেও
ঠিক তেমন করে
জিজ্ঞেস করে, 'আমি কি
কিছু করেছি? আমরা কি
কখনো এক হব না?'
আমি চুপ থাকতাম।
নাহিদকে অনেক ভালো
মনে হয়। না চাইতেই
ওর সাথে আর বিয়ে
করিনি। কিছুদিন আগে
আব্বুর ধৈর্যের বাঁধ
ভেঙে গেল। উনি আমাকে
বিয়ের জন্য প্রেসার
দিতে লাগলেন।
নিরুপায় হয়ে সম্মত
হলাম। কাল পুরো বাড়ি
সাজানো হয়েছিল।
আমাকে বউয়ের মতো
করে সাজানো হয়েছে।
বর আসার একটু আগে
আমার রুমে এসে কেউ
যেন আমার হাত ধরল।
সাথে সাথেই আমিও
গায়েব হয়ে গেলাম। ঐ
অদৃশ্য জিনিসটি আমার
হাত ধরে একপ্রকার
টেনে ঘর থেকে
বাহিরে নিয়ে গেল।
ঠিক সে সময় বরযাত্রী
প্রবেশ করল। আমি
চিল্লানোরও সময়
পেলাম না। সে আমাকে
অনেক দূরে নিয়ে
এসেছে। এত দূরে
একাধারে দৌড়ে আসা
সম্ভব নয়। হয়ত সে-ই
আমাকে সকালে এখানে
দিয়ে গেছে। কিন্তু কে
সে? আমাকে কি
কোনোকিছু থেকে
বাঁচিয়েছে? আর এ ঘরের
চাবি পেল কই সে? এ
চাবি কার কাছে ছিল
তা তো কারোরই জানা
নেই।
'আরে, কখন উঠেছিস?
আমাকে ডাকিসনি
কেন?', আম্মু বললেন।
'একটু আগে উঠেছি।'
'তোর কাছে কিছু
লাগবে?'
'না, মা। আমাকে এখানে
কে এনেছে? আর আপনারা
কী করে জানেন আমি
এখানে আছি?'
'জানতাম না।
জানিয়েছে। সকাল
ছ'টার দিকে তোর
মোবাইল থেকে আমাদের
কাছে অনেক কল এল।
রিসিভ করার পর
ঘনঘলায় আমাদের এ
ঘরে আসতে বলল। তোর
গায়েব হওয়ার কারণটা
মাথায় ঘুরছিল। কী না
কী হয়েছে ভেবে তোর
আব্বুকে নিয়ে এখানে
এসেছি। আমরা আসতেই
দরজাটা আপনা থেকেই
খুলে গেল। তারপর তোকে
এখানে শোয়া অবস্থায়
পেলাম। তুই বল, কাল কী
হয়েছিল তোর সাথে?
এখানে কেমনে এলি?
'মা, আমি নিজেই কিছু
বুঝছি না কে আমায়
এখানে এনেছে। মনে
হচ্ছে, সে আমায় চেনে।
কিছু একটা ইঙ্গিত
করতে চায়। মা, আর
কাউকে কি আমাকে
এখানে পাওয়ার কথা
বলেছ?'
'না। কথা হচ্ছে
আশ্চর্যজনকভাবে
আমাদের দুজনেরই
মোবাইল হারিয়ে
গেছে। কাউকেই কিছু
বলতে পারলাম না। তার
ওপর দরজাটিও খুলছে
না। বেঁধে গেছে।
কেমনে এসব কি হচ্ছে
কিছুই বুঝছি। দুপুর হয়ে
আসছে। এই পুরোনো
বাড়িতে পানি, খাবার
কোত্থেকে জোগাড় করব?'
আমি একটু গিয়ে
চারিদিকে দেখলাম।
সবকিছু আগের মতোই
আছে। কিছুই পরির্বতিত
হয়নি। শুধু ঘরের
মাঝখানের পিলারের
সাথে কিছু মোটা
সাইজের রশি পেলাম।
আমার একদম
ভালোভাবেই মনে আছে,
লাস্টবার এখানে কোনো
রশি ছিল না। পেটে
ঘুরঘুর শব্দ হচ্ছে।
অসম্ভব খিদে পেয়েছে।
বেলা অনেক হয়েছে
হয়ত। এমন সময় হঠাৎ
আতঙ্কজড়িত কন্ঠে মা
আমার নাম ধরে
ডাকলেন, 'রুবা, এদিকে
আয়। একটা জিনিস দেখে
যা।'
আওয়াজ রান্নাঘর
থেকেই আসছে। আমি
তাড়াতাড়ি দৌড়
লাগালাম।
(চলবে..!)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now