বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
“কি মামা? ঘুমাও নাকি এখনো ?”-ভকভক করে
বেনসনের ধোঁয়া ছেড়ে প্রশ্ন করল নাভিদ ।
“নাহ ! কই আর ঘুমাই ! বিছানায় হাডুডু খেলি ।”—ছুটির
দিনে ‘ভোর’ দশটায় ঘুম ভাঙানোর কারণে বিরক্ত
হয়ে উত্তর দিলাম ।
“আরে মামা! রাগ হও ক্যান ? আজকে তো গুরুর
জন্মদিন ?”—স্বভাবসুলভ ‘কিছুই হয় নাই’ ভঙ্গিতে
বলল নাভিদ । আমি খানিকটা ইতস্তত বোধ করলাম ।
নাভিদের স্বভাব , লালন থেকে লিঙ্কিন পার্ক প্রায়
সবাই তার কাছে গুরু । আজকে আবার তাদের
মধ্যে কোন গুরুর জন্মদিন , কে জানে ? ভয়ে
ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-“কোন গুরু?” নাভিদ আবার
সর্বদাই তার ‘গুরু’-দের ব্যাপারে দুই ফারেনহাইট
বেশি সিরিয়াস । গম্ভীর স্বরে বলল –“শে
গেভারা , সবাই যার ভুল উচ্চারণ করে চে গুয়েভারা
বলে ।” । এতোটুকু বলে সে আবার খানিকটা
সময় নিল ভকভক করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার
জন্য ।
আমি প্রমাদ গুনলাম । মাসখানেক আগে আমাদের
হাতে চে গুয়েভারার একটা জীবনী আসে । ওটা
পড়েই সবার মাথায় সুমহান বিপ্লবের পোকা
ঢোকে । কিছুদিন আগে দলবেঁধে চে-র
ছবিওয়ালা টি-শার্ট আর গেঞ্জি কিনে নিয়ে আসা হয়
, যার বেশিরভাগগুলোতেই “মানুষের মুক্তির
চিরন্তন চেতনা” এরনেস্তো চে গুয়েভারা
ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট নিয়ে সৌম্যদৃষ্টিতে
তাকিয়ে আছেন । এসব আবোতাবোল ভাবছিলাম
এমন সময় রুমে এসে ঢুকল রিফাত । রিফাতের
গায়েও নাভিদের মতোই চে-গুয়েভারার ছবিওয়ালা
ট-সার্ট । রিফাত , নাভিদ আর আমি – আমরা তিনজন
রুমমেট । নাভিদ ছেলেটা যেকোন কিছুতেই
ব্যপক আশাবাদী । যেসব পরীক্ষায় আমরা
নেহায়েৎ পাশ করলেই বাঁচি , সেসব পরীক্ষায়
সে এ প্লাস পাবে বলে আশার বসতি গড়ে । আর
এটা বলাই বাহুল্য সেই বসতি ভাঙতে সময় লাগে না ।
কিন্তু তবুও নাভিদ ভাঙে তো মচকায় না ।
অপরদিকে রিফাতের দাবী , জগতে কেবল দুইটা
জিনিসই ক্রমবর্ধমান । এর মধ্যে একটা হল এনট্রপি ,
আরেকটা হল হতাশা । আর এই দুই বিপরীত
প্রবৃত্তির মানুষের সাথে বসবাস করতে গিয়ে
কেমন যেন একটা ‘অনিকেত প্রান্তর’-এ ঝুলতে
থাকি আমি । না পারি প্রবল আশায় বুক বাঁধতে , আবার
না পারি তীব্র হতাশায় শ্লাঘা ত্যাগ করতে ।
যাই হোক রিফাত রুমে ঢুকেই হতাশার ঝাঁপি খুলে
বসল – “এই যে আজকে যারা চে গুয়েভারার
জন্মদিন নিয়ে এতো মাতামাতি করছে , বিপ্লব আর
পরিবর্তনের তুবড়ি ছুটিয়ে মুখ দিয়ে ফেনা তুলে
ফেলছে , তাদের মধ্যে কতোজন আসল
ইতিহাস জানে ? আমার তো মনে হয় ঠিকভাবে
জিজ্ঞাসা করলে অনেকে উনার দেশটাও বলতে
পারবে না । ” এসব শুনে নাভিদ তার আশার ডালি উজাড়
করে দিয়ে বলল –“তোরে কইসে ? হয়তো
কয়েকজন জানবে না । তাদের জানা না জানাতে কিছু
আসে যায় না। কিন্তু অধিকাংশই জানবে ।” । এই
নিয়ে দুজনের বাকবিতন্ডা যখন ঊর্ধ্বগামী ঠিক
তখনই নাভিদের তরফ থেকে একটা বাজির প্রস্তাব
আসে । প্রস্তাব হল তারা ঠিক এই মুহূর্তে
ক্যান্টিনে যাবে এবং কমপক্ষে ত্রিশ থেকে
পঁয়ত্রিশজনকে চে সম্পর্কে কিছু বেসিক প্রশ্ন
জিজ্ঞাসা করবে । তারা উত্তর দিতে পারলে নাভিদ
জিতবে , আর না পারলে রিফাত হারবে । কিন্তু বাজি
ধরা হবে কিসের উপর ? ক্ষণকয়েক বাদে
সিদ্ধান্ত হল বাজি ধরা হবে এক প্যাকেট
বেনসনের উপর । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের
মোটামুটি বেশ উচুদরেরই বাজি ।
যাই হোক তাদের সাথে আমিও গিয়ে বসলাম
ক্যান্টিনে । কে জিতে বাজিটা দেখা দরকার ! এখন
প্রশ্ন হল ঠিক কাদেরকে প্রশ্নগুলো করা হবে
। এ ব্যপারে দুজনে বেশ কিছুক্ষণ উঁচু স্বরের
বাক্যালাপ শেষে সিদ্ধান্ত নিল অর্ধেক মানুষ বাছাই
করবে নাভিদ , আর বাকি অর্ধেক রিফাত । প্রথমেই
ক্যাম্পাসে পরিবর্তনের ছোঁয়া এনে দিতে সদা
তৎপর এক তরুণকে ডাকা হল । এই তরুণকে আমি
ব্যক্তিগতভাবে চিনি । সে অনলাইনের জগতের
একজন ছোটখাটো সেলিব্রেটি । সমাজের
যাবতীয় অসমীচীনতা নিয়ে লেখা তার বিশাল
বিশাল স্ট্যাটাসগুলোতে প্রায়শই লাইকের বন্যা
বসে । তরুণকে প্রশ্ন করা হয় , চে গুয়েভারার
জন্ম কোন দেশে ? আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম
এই প্রতিবাদী তরুণ অবশ্যই পারবে । কিন্তু
আমাকে আর নাভিদকে অবাক করিয়ে দিয়ে সে
উত্তর দিল আফ্রিকা । আমরা তিনজনই খানিকটা
নড়েচড়ে বসলাম । এরপর অফলাইনের জগতে
বিভিন্ন মিছিলের স্লোগানে দেশ পরিবর্তনে দৃঢ়
অঙ্গীকারবদ্ধ আরেক বিপ্লবী তরুণের কাছ
থেকে জানা গেলো চে গুয়েভারা দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের একজন তেজী যোদ্ধা ! এভাবে
প্রায় ত্রিশজনকে প্রশ্ন করা শেষ । ফেসবুকে
চে-এর ছবি কভার ফোটো দেয়া ছেলে
থেকে শুরু করে তাঁর ছবিওয়ালা গেঞ্জি পড়ে তাঁর
স্টাইলে সিগারেট ফুঁকতে থাক ছেলেটা ,
বিশ্বের প্রায় সব বিশয় নিয়ে গুরুগম্ভীর কথা বলা
ছেলেটা থেকে শুরু করে নারী অধিকারে
সোচ্চার হয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দেয়া মেয়েটা
--- সকলের বিমূর্ত উত্তরে আমাদের
রীতিমতো ‘তবদা’ লেগে যাওয়ার দশা । নাভিদ
বাজিতে হেরে হতাশ , রিফাতকে জিতেও তেমন
খুশি হতে দেখা গেলো না ।
এমন সময় নাভিদ একটা ছেলেকে ডাকলো ।
ছেলেটার চুল তেল দিয়ে পরিপাটি করে
আঁচড়ানো , বড় কার্বন ফ্রেমের চশমা ।
মোটের উপর , দেখলেই বুঝা যায় এই ছেলে
বিপ্লবের ধারেকাছেও নাই । ছেলেটার
সম্পর্কে অল্প বিস্তর যতদূর জানি , তাতে বিপ্লব
শব্দটার ধারকাছ দিয়ে তাঁর থাকার কথা নয় । সিস্টেম
পরিবর্তন নয় বরং সিস্টেমে খাপ খাওয়ানোই
এদের লক্ষ্য হয়ে থাকে । নাভিদ তাকে জিজ্ঞাসা
করল চে গুয়েভারার নাম শুনেছে কিনা ।
ছেলেটা নির্লিপ্ততা জড়ানো কন্ঠে বলল –“হুম
চিনি তো । প্রায়ি দেখা হয় ।”
আমরা তো পুরো থ হয়ে গেলাম । বলে কি
পাগলে ? আমরা জানতে চায়লাম তার মাথা থিক আছে
কিনা !
ছেলেটা একটু হেসে বলল – “ক্যান্টিনের
টেবিল বয় মামুনকে চেনো ? ছেলেটা সকাল
থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে কাজ করে আর
রাতে নৈশ স্কুলে পড়ে । গত বার্ষিক পরীক্ষায়
পঞ্চম হয়েছে সে । আমাদের ডিপার্টমেন্টের
দপ্তরী রফিক মিয়াঁকে কে চেনো ? সকাল
থেক বিকাল পর্যন্ত দপ্তরীর কাজ করে রাতে
গিয়ে আবার চায়ের টং চালায় একটা । তার এক
ছেলে এবার এস,এস,সি, পরীক্ষায় গোল্ডেন
এ প্লাস পেয়েছে । হাসান আলীকে
চেনো ? রিকশা চালায় । ঘরে চারটা
ছেলেমেয়ে আছে । তবুও রাস্তা থেকে
কুরিয়ে পাওয়া এক মেয়েকে মানুষ করছে ,
পড়ালেখা শেখাচ্ছে । আমার কাছে এদের সহ
এরকম আরো অনেকের জীবনটাই একটা বিপ্লব
মনে হয় । প্রতিটা পদক্ষেপই এক একটা প্রতিবাদী
মিছিলের তীব্র শ্লোগান । তাই চে-এর সাথে
আমার হরহামেশাই দেখা হয় হয় , পরিচয় হয় , কথা
হয় । হয়তো তোমাদেরো হয় , কিন্তু তোমরা
পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে যাও । তোমরা যে ধরেই
নিয়েছো ওখানে তাঁকে তোমরা খুজবে না । ”
– এই কথাগুলো বলেই সূর্যটাকে ছাতা বানিয়ে
রোদের পথে বেরিয়ে গেলো ছেলেটা ।
নাভিদ উঠে গেলো কয়েক সেকেণ্ড পর ,
আর তারপর রিফাতও । মিনিট পাঁচেক পর দুজনেই
আবার ফিরে এলো । দুজনের হাতেই ১৭০ টাকা
দামের দুটো বেনসনের প্যাকেট । একই
বাজিতে দুজনের একসাথে হেরে যাওয়ার ঘটনা
বোধহয় এই প্রথম ।
“ছেলেটা কে রে ?” চেয়ার টেনে বসতে
বসতে প্রশ্নটা করল নাভিদ ।
“চে ! চে গুয়েভারা ! বাবা কৃষক , মা অসুস্থ ।
গ্রামের বাড়িতে থাকে স্কুল পড়ুয়া ছোট ভাইটার
সাথে । ও টিউশন করে নিজেকে চালায় ,
সেইসাথে পরিবারটাকেও । ” – রোদকে মাড়িয়ে
দিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছেলেটার পথের দিকে
তাকিয়ে বললাম আমি ।
-- দুর্জয় বৈদ্য
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now