বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

চাঁদের আলোয় একজন নিরাশ যুবক

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X মেয়েটি পিছন থেকে আস্তে আস্তে হেঁটে কাছে এসে ডাক দিল, ভাইজান! যুবকটি ফিরে না তাকিয়েই মাথা ঝাঁকাল অল্প, মুখে কিছু বলল না। মেয়েটি বসে পড়ল পাশে। কিছু সময় কেটে গেল চুপচাপ। উপরে মেঘমুক্ত আকাশ, হাল্কা বাতাস দিচ্ছে। চকচকে চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে বাগান। মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে সেই কখন! ভোর হবে কিছু পরেই। সাধারণত এই সময় এরকম বাইরে থাকলে আম্মি মানবতী কবর থেকে উঠে এসে বকে ফিরাতে নিয়ে আসেন, কিন্তু আজ এখনো তার সাড়া নেই। ভালই, ভাবে মেয়েটি। তারপর আচমকা সে জিজ্ঞাস করে, আচ্ছা ভাইজান, আব্বাকে আপনি সত্যই ভাই বলে ডাকতেন? বিষণ্ণ যুবকটি ফিক করে হেসে ফেলে বলে, হ্যাঁ তো! চোখ কপালে তুলে মেয়েটি বলে, ছি ছি। কেন? আব্বাকে কেউ কোনদিন ভাইসাব বলে বুঝি? যুবকটি খানিক গম্ভীর হয়ে পিছন ফিরে দেখে নিল আম্মি আসছে কিনা। তারপর বলল, ভাইসাব বলিনি তো। শাহ ভাই ডাকতাম। কেন? সে কুত্তার বাচ্চা আমার কোন বাবাগিরিটা করেছে কবে? জন্ম দিলেই বাবা হয় বুঝি? মাতালটা সারাদিন আরকেই তো ডুবে থাকত। আরক আপনি খান নাই কোনদিন বুঝি? হেসে যুবকটি বলল, ওরে। শাহ ভাইয়ের আরক আর আফিম খাওয়ার সাথে আমার তুলনা! তুই নিজেই তো দেখেছিস। মেহেরুন্নিসা বান্দিটা শাহ ভাইকে মদে চুর রেখে দেশ চালাত দেখিসনি? মেহেরুন্নিসার কথায় মেয়েটির মুখ একটু শক্ত হয়ে আসল। বলল, ঐ মহিলার কথা ছেড়ে দিন। ছোটলোকের ঘরের ছোটলোক। কিন্তু তবুও ভাইজান, আব্বা বলে কথা। আব্বার উপরে কে জানিস? আব্বার উপরে দাদা। আমাদের দাদার পছন্দ ছিলাম এই আমি। কথা ছিল দেশ আমিই চালাব। আমার বয়েস যখন মোটে সাত বছর তখন আস্ত মনসব দিয়েছিলেন আমাকে দাদাভাই। আস্ত মনসব। সাত বছর বয়েসে মনসবদার ছিলাম রে আমি। উড়িষ্যা তখন মাত্র দাদার হাতে এসেছে, সেই উড়িষ্যার ধনদৌলত আমাকেই দিয়ে দেন তিনি। মামাকে করে দেন আমার আতালিক। চুপ করে শোনে মেয়েটি। আতালিক মানে অভিভাবক। হায় তাকে কেউ কোনদিন একটা শক্ত আতালিক বরাদ্দ করলনা, দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ভাবে সে। আতালিকের সমর্থন থাকলে মেহেরুন্নিসাকে দুটো টাইট দেয়া যেত বটে। যুবকটি বলে চলে, মামা মান সিংহ তখন উড়িষ্যা আর বাংলা দুই রাজ্যই চালাতেন। কাছেই এখান থেকে বেশী দূর না বাংলা উড়িষ্যা। আচ্ছা। হ্যাঁ। দাদা একবার কি বলেছিলেন জানিস? বলেছিলেন, আমি আমার নাতিদের আমার ছেলেদের থেকেও বেশী ভালোবাসি। তাই বলে ছেলে বেঁচে থাকতে নাতি দেশ চালাতে পারে বুঝি? আলবৎ পারে, গলা চড়িয়ে বলল যুবকটি, মাতাল অথর্ব বিবেচনাহীন ছেলের বদলে নাতি নিশ্চয়ই দেশ চালাতে পারে। এইরকম ছেলে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মধ্যে কী তফাৎ? একটু কুঁকড়ে গেল মেয়েটি। তারপর ভয়ে ভয়ে বলল, যাক আব্বাজান মারা গিয়েছেন, শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন লাহোরে। আর বদনাম নাইবা করলেন। বদনাম? হিসহিস করে বল যুবকটি, এইগুলা সত্য কথা। শাহ ভাই একটা জোচ্চর ছিল জানিস? সামান্য হাতির খেলাতেও সে জোচ্চুরি করত। হাতির খেলা? হ্যাঁ হাতির খেলা। আমার হাতিশালের সবচাইতে পাকা হাতি ছিল অপূর্ব। যেমন শক্তি তেমনই বুদ্ধি। দরবারি হাতির খেলায় শাহ ভাইয়ের লোক যখন দেখে তাদের হাতির সাথে আমার হাতি জিতে যাবে, তখন পিছন থেকে পাথর ছুঁড়ে আমার মাহুত আসমতের মাথা ফাটিয়ে দেয় আর অপূর্বকে জখম করে। ছিহ ছিহ। লজ্জা লাগে আমার এইসব ভাবতে। বদনাম! একশবার বদনাম করব চোরের বাচ্চা চোর। জোচ্চর মাতাল আফিংখোরটা বউয়ের লেহেঙ্গায় মাথা গুঁজে দেশ চালাত ভাবতেও গা ঘিনঘিন করছে আমার। মাথা নিচু করে চুপ করে রইল মেয়েটি। তার পর আস্তে করে বলল, আব্বা সত্যিই আপনাকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন ভাইজান? জলভরা চোখে যুবকটি মেয়েটির হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, লাহোরে আমাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে আমার বন্ধু হুসেন বেগ আর আব্দুর রহিমকে পশুর ছালে ভরে গাধায় চড়িয়ে সারা শহর ঘুরিয়েছিল জানিস? লাহোরের গনগণে গরমে সেই চামড়া শুকিয়ে গায়ে এঁটে মরে যায় হুসেন বেগ। আব্দুর রহিম বেঁচে যায় কোনরকম। এরা আমার দুই হাত ছিল বোন দুই হাত। সারা দুনিয়া যখন আমাকে ছেড়ে পালাচ্ছিল তখন আমার সামনে ঢাল নিয়ে দাঁড়িয়ে যেত এই হুসেন বেগ আর আব্দুর রহিম। তাদেরকে আমার চোখের সামনে অপমান করে মারা হয়। আর তারপর… গলার কাছে একটা কষ্টের দলা আঁকড়ে আছে টের পায় মেয়েটি। সে ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, ভাইজান! ঢোঁক গিলে আরেকদিকে তাকায় যুবক। কান্নার মত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। বলে, তারপর হাতির পিঠে শিকলবদ্ধ আমাকে চড়িয়ে লাহোরের বুলন্দ রাস্তায় বের হয় শুয়োরের বাচ্চা জমানা বেগ। দুই পাশে সারি সারি কাঠের খাম্বা। তাতে কাউকে ফাঁস দেওয়া হচ্ছে, কারুকে ফাঁস গলায় পরিয়ে হি হি করে হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে সিপাই। কাউকে শুইয়ে দুই পা উঁচু করে ধরে পাছায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে বর্শা। কারা এরা জানিস? কারা? কাদেরকে এরকম যন্ত্রণা দিয়ে মারছে শাহ ভাই? এরা আমাকে সাহায্য করেছিল লাহোরে। বলেছিল, অথর্ব কুলাঙ্গার চাইনা তোমাকে চাই আমাদের শাসক হিসাবে। এরা আমাকে সিপাই দিয়েছিল ঘোড়া দিয়েছিল অর্থ দিয়েছিল ভাত দিয়েছিল। আর সেদিন আমি হেরে যাওয়ায় এদের পুত্র পরিবারের সামনে শূলে চড়ায় শাহ ভাই। হায় বোন, কী কানফাটা চিৎকার আমি দেখেছি। কী কানফাটা চিৎকার! সিপাইদের উপর হুকুম ছিল আমি আসার আগে যেন পুরো মারা না হয়, তাই তারা অপেক্ষা করে ছিল কখন আমার হাতি তাদের খাম্বার পাশ দিয়ে যায়। একজন একজন একজন করে তারা শূলে চড়িয়ে রাখে, ওহ কী অসহ্য যন্ত্রণা তাদের চোখে মুখে। মনে আছে এক আমীর তৈয়বউল্লাহ আমাকে নব্বইটা ঘোড়া দিয়েছিল, সেই তৈয়বউল্লাহ’র ভুঁড়ি বেরিয়ে ঝুলছিল। কী চিৎকার! কী চিৎকার! কী ভয়ানক এক দিন! সেই দিনই কি আব্বা আপনাকে অন্ধ করে দেয়? শ্বাস ফেলে মাথা নাড়ায় যুবক। না। মেয়েটি বুঝতে পারে ভাই এ ব্যাপারে কথা বলতে চায়না। চুপ করে থাকে সে। পিতার হুকুমে পুত্রের চক্ষু উৎপাটনের এই পৈশাচিক গল্পে মুখ না নড়া স্বাভাবিক। দিনের বেলা যখন লোক জড়ো হয় এই খসরুবাগ বাগানে তখন তারা অন্ধ হবার গল্প ফলাও করে বলতে থাকে। কবরের নিচে শুয়ে এক ধরণের অসুস্থ কৌতুহল নিয়ে শোনে মেয়েটি। কেউ কেউ বলে পিতা জাহাঙ্গীরের হুকুমে ছেলের চোখ গরম শলাকা বিঁধিয়ে তুলে নেয়া হয়। কেউ বলে চোখের পাতা সেলাই করে দেবার কথা। অন্য অনেকে বলে চোখে বিষাক্ত তরল ঘষে আঁধি করে দেবার গল্প। হঠাৎ একটু আঁধার হয়ে আসে বাগান। যুবকটি মাথা তুলে দেখে একখণ্ড মেঘ এসে চাঁদের আলো ঢেকে দিয়েছে। কী একটা বলতে গিয়ে দুই ভাই বোন টের পায়, পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে মা। আস্তে করে দুই ভাইবোন উঠে দাঁড়াল। অপরাধীর স্বরে মেয়েটি বলল, আম্মিজান! রাজকুমারী মান বাঈ হেসে বললেন, অনেক তো গল্প হল দুজনে। ভোর হয়ে আসবে একটু পরেই সে খেয়াল আছে? চল চল শুতে চল। কেউ চলে আসবে এখনই। বাধ্য ছেলেমেয়ের মত ভাইবোন নিথার বেগম এবং খসরু মীর্জা মায়ের পিছন পিছন খসরুবাগে যার যার কবরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ চাঁদের আলোয় একজন নিরাশ যুবক

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now