বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সিদ্ধান্তটা ছিল আমি বাবা অথবা মাকে খুন করব। অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্তটা নেই। আমায় অনেকে নিষ্ঠুর,পাগল বলবে জানি,কিন্তু এছাড়া আমার কাছে আর কোন উপায়ও ছিল না। বলতে গেলে একদম ফেড আপ হয়ে গিয়েছিলাম। বাবা মায়ের প্রতিদিনের ঝগড়া অসয্য পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। প্রতিদিন ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া।
একদিন খাবার সময় বাবা হঠাৎ থু থু করতে করতে উঠে গেল। আর বলল," কি এসব রান্না করছ? লবণ দিয়ে ভরায় রাখছ।"
হ্যা লবণটা একটু বেশিই পরেছিল। তাই বলে এভাবে react করার কি আছে? বাবা কিছু খেল না। মাও রাগ করে রাতে খাবারে আরও বেশি লবণ দিল। বাবা প্রায় ১ সপ্তাহ হোটেলে গিয়ে খেল। এভাবে প্রতিদিন ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া চলেই। আমি না হয় বড় কিন্তু আমার ছোট ভাই টার উপর তো এসবের খারাপ প্রভাব পরবে। শুধু সন্তান জন্ম দিলেই হয়? তাদের ঠিকমত টেককেয়ার ও তো করতে হয়। আমার মনে আছে একরাতে আমার ভাই আমায় কাঁদতে কাঁদতে ডাকল। আমি ঘুম ঘুম চোখে তাকালাম। সে কাঁদতে কাঁদতে বাইরে ইশারা করছে। একটু পর বুঝলাম বাইরে বাবা মা ঝগড়া করছে।বাবা বলছে," বিয়ের আগে যে ছেলের সাথে ঘুরতে,ওই যে তোমার স্কুলের বিএফ, তাকেই তো বিয়ে করবে আমায় ডিভোর্স দিয়ে তাই না? দেখি তো,এফবি তে লাইক, কমেন্ট করে। প্রাক্তন প্রেমিক ফিরে এসেছে তাই না?"
"তুমি কি ধোয়া তুলসি পাতা? রাতে কোন কোন মেয়ের সাথে থাকতে সব আমার জানা।" এই মাঝরাতেও তারা থামল না? তখন আমার ভাইটার বয়স মাত্র ৭। ছেলেটা কতটাই না ভয় পেয়েছিল। আর এসব বাজে কথা সে শুনলে, বুঝলে কি ভাববে? ছি ছি।
একদিন তো তারা সীমা পার করে দিল। ঝগড়া থেকে হাতাহাতির পর্যায়ে চলে গেল। গ্রামের বাড়ির এক জমি। মা চায় বিক্রি করতে। বাবা তা করবে না। ব্যাস লেগে গেল।
"তোমার বাবা কিছু দিয়েছে আমায়? আমার জমির উপর নজর কেন? যাও বাপের জমি বিক্রি কর।"
" ফকিরের মত আচরণ কেন তোমার? যৌতুক চাইতে লজ্জা করে না?" একপর্যায়ে মা প্লেট ছুড়ে।মারতে লাগল।বাবাও হাতে যা পায় ছুড়ে মারে। কি যে বাজে অবস্থা।
মাও কম যেত না। তার মেজাজ অকারণেই হাই থাকত। আর মেজাজ হাই থাকলে অকারনে জাত নিয়ে কথা শুনানো। আমাদের কোন ভুল হলেই পাগলের জাত দেখে বিয়ে করেছি। ছেলে মেয়ে তো পাগল হবেই। রাতে বাবার আসতে দেরী হলেই, "দ্যাখ কোন মেয়ের সাথে ঘুরতে গেছে, মদ খেয়ে রাস্তায় পরে আছে হয়ত।" তবে হ্যা বাবার একটা খারাপ খুব খারাপ অভ্যাস বাবা ড্রিংক করে। আর রাতে মাতাল হয়ে এসে যাচ্ছে তাই ভাষায় মায়ের সাথে ঝগড়া। পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই ভাবি একজনকে মরতেই হবে নাহলে শান্তি আসবে না। কোচিং থেকে আসার পথে ভেবে নেই। আজ যে ঝগড়া শুরু করবে সেই খুন হবে। বাইরে থেকেই শোরগোল শুনা যাচ্ছিল। আবার শুরু করেছে। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছিল। দৌড়ে গিয়ে দরজায় লাথি দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখি বাবা মা কেক নিয়ে বসে আছে। থতমত খেয়ে যাই। মুখের শক্ত ভাব নরম হয়ে আসে। আজ বাবা মায়ের বিবাহবার্ষিকী। কি পাগলের মতই না সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তারা তো একে অপরকে অনেক ভালবাসে। লজ্জায় মাথা হেট হয়ে গেল। একটু ভয়ও ছিল। কারণ বাবা আমার দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছিল। সে আমার মনের কথা বুঝে ফেলে নি তো?
রাতে টিভি দেখছিলাম। সবাই ঘুম। একটু পর দেখলাম বাবা বের হল। ফ্রিজ থেকে বিয়ারের বোতল বের করে বসল আমার পাশে। বুঝলাম কিছু বলবে। দোঅা করতে লাগলাম যেন বাবা আমার ওই পাগলের মত সিদ্ধান্তের কথা জেনে না যায়।
বোতলের মুখ খুলতে খুলতে বাবা বলল,
" টিভির সাউন্ড কমা।"
কমালাম। বাবা আমার পাশে আসল। এই বুঝি মার খাব। কিন্তু না। বাবা আমার কাধে হাত রাখলেন।
"জানিস তোর মাকে প্রথম কবে দেখি? আমি তখন ক্লাস ৮ এ। পাশের বাসায় ভাড়া থাকত। আমার থেকে এক বছরের জুনিয়র। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পরে যাই। কিন্তু প্রেম নিবেদন করতে করতেই ২ বছর চলে যায়।" বলেই বাবা হাসতে লাগলেন জোরে জোরে।
"তোমাদের লাভ ম্যারেজ?"
" তা না তো কি? ৫ বছরের প্রেম তারপর পালিয়ে বিয়ে। তোর নানারবাড়ির কেউ রাজি ছিল না। এমন অবস্থা যে আমায় পেলেই খুন করবে। ভার্সিটির লাস্ট ইয়ারে ছিলাম যখন বিয়ে করি। চাকরি নেই কিছু নেই।কি যে অবস্থা। বন্ধুদের বাসায় ঘুরে ঘুরে দিন পার করি বউ নিয়ে। তোর রেজা আংকেলের মেসে ছিলাম ৫ দিন।ছেলেদের মেস। সে কি যে কেলেংকেরি অবস্থা।" বলেই আর ও এক গাল হাসল বাবা। আমি অবাক হয়ে শুনছি।
"তারপর তুই হলি। নাতির মুখ দেখে তোর নানা মেনে নিল।"
" তাহলে তোমরা এত ঝগড়া কর কেন?"
আমি মনে হয় জোক করলাম। বাবা আরও এক গাল হেসে নিল। তারপর আমার কানের কাছে মুখ আনল। মদের কটু গন্ধ পেলাম। বাবা বলল,
"ভালবাসা।"
"ভালবাসা?"
"হুম। আমরা মনে করি ভালবাসা আর ঝগড়া বিপরীত শব্দ। কিন্তু আসলে এদুটো সমার্থক শব্দ।ভালোবাসা আএ ঝগড়া ভাই ভাই। না নানা ভাই ভাই না।ভাই বোন।আমরা তাদের সাথেই ঝগড়া করি যাকে আমরা ভালবাসি। যার থেকে কিছু আশা রাখি।তাই দেখবি একজন অচেনা মানুষের সাথে আমরা কিন্তু ঝগড়া করি না। বুঝলি? তুই কি বুঝবি। বিয়ে কর। সব বুঝবি।"
বিয়ের কথায় একটু লজ্জা লাগল। তাও বললাম,
"তাই বলে এত ঝগড়া?"
কি যেন ভেবে বাবা বলল,
"খুব বেশি করি তাই না? আসলে হয়েছে কি তোর বাপ মা দুটোই একটু পাগল। আর ৩০ টা বছর একসাথে কাটিয়েছি। তাই একরকমের একঘেয়েমি চলে আসে। আমার কথা শুনলে অনেকে বলবে আসল ভালোবাসায় একঘেয়েমি আসে না। আমি বলব সে কখনো আসল ভালোবাসা বুঝেই নি। ভালোবাসাতেও একঘেয়েমি আসে। আর সেই একঘেয়েমিতাও সুখের। যখন এমন একঘেয়েমি লাগে,আমার ভালই লাগে। এটা ভেবে ভাল লাগে যে তোর মার এতটা বছর কাটিয়েছি যে এখন একঘেয়েমি লাগে। খেয়াল করে দেখবি যাদের সাথে আমরা অনেক বছর থাকি তাদের প্রতিই একঘেয়েমি অনুভব করি। এটাও প্রমাণ করে আমাদের ভালোবাসা। বুঝলি? তুই কি বুঝবি? বিয়ে কর। সব বুঝবি।"
বাবার নেশা উঠেছে। আর খেতে দেয়া যাবে না। তবুও মানা করলাম না। বাবার কথা শুনতে ভাল লাগছে,মাতাল মানুষের কথাতেও নেশা থাকে। তাদের কথা শুনলে নেশা লেগে যায়।আরও শুনতে ইচ্ছা করে।
"বাবা একটা কথা বলব। রাগ করো না।ইয়ে মানে মায়ের কি আরও বিএফ ছিল? আর তোমার জিএফ ছিল?"
আরও একগাল হেসে বাবা বললেন,
"আরে ধুর ধুর। তোর মায়ের সাথে কে প্রেম করবে? হিটলার লেডি। ওসব তো তোর মাকে জ্বালাতে বলি। তোর মাও আমাকে জালাতে ওসব বলে। বুঝলি? তুই কি বুঝবি। বিয়ে কর। সব বুঝবি।"
একটু হেসে বললাম," তুমি তো প্রেম করেছ মায়ের সাথে।"
"হাহাহাহাহা। রাইট রাইট। ক্লেভার বয়।ক্লেভার বয়।"
কিছুসময় দুজনই চুপ ছিলাম। নিরবতা ভেংগে বাবা বলল,
" আর তাছাড়া ঝগড়া হলে আমি তোর মাকে সরি বলি। মাঝে মাঝে তোর মাও আমায় সরি বলে।"
" কই আমি তো কোনদিন দেখলাম না সরি বলতে।"
"ধুর ব্যাটা। তোদের সামনে সরি বলব নাকি? রাতে, ঘুমানোরর আগে সরি বলে মন হাল্কা করে ঘুমাই। বুঝলি? তুই কি বুঝবি। বিয়ে কর সব বুঝবি।"
বারাবার বিয়ের কথা কেন বলছে বাবা? বিয়ের বয়স হয়ে গেছে নাকি আমার?লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলি।
"খাবি? নে খা।"
বাবা আমায় বিয়ার অফার করছে!! কি করব? বাবার সামনে ড্রিংক করা ঠিক হবে? বাবার আদেশ না মানাও তো ঠিক হবে না। হাত বাড়ালাম গ্লাসটা নিতে।বাবা ওমনি ধমক দিয়ে বললেন," এটা কি করছিস? আমি খেতে বলব আর খাবি? নিজের বিবেক নেই? নিজের ভাল মন্দ বুঝতে শিখ। মায়ের মত হয়েছিস দেখছি। যা ঘুমা।" বলেই বাবা চলে গেল। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাবার মধ্যে যে এত অসাধারণ মানুষ ছিল সেটা সেদিনই জেনেছিলাম।
আজ আমার স্ত্রী,নিলার সাথে ঝগড়া করে ড্রয়িং রুমে বসে বাবার কথাগুলাই ভাবছিলাম। বিয়ে হয়েছে। তাই আজ বাবার ওইদিনের কথাগুলা বুঝতে পারছি। একটু পর নিলা এসে আমার হাত ধরে বলল,"আমি রাগ করেছি বলে বাইরে বসে থাকতে হবে? আস ভিতরে আস। আই এম সরি।" বলেই আমার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেল। আর কানে একটি কথাই বাজতে লাগল,"বুঝলি? তুই কি বুঝবি।বিয়ে কর সব বুঝবি।"
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now