বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বিস্মরণ

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X “এখন থেকে বালিশের নিচে মোবাইল ফোন রেখে ঘুমাবো না। বেশীরভাগ মোবাইল ফোন ৯০০ মেগাহার্টজ এর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে সিগনাল প্রেরণ করার মাধ্যমে ক্ষতিকারক বিকিরণ উৎপন্ন করে। এই বিকিরণ মাথা ব্যথার কারন হতে পারে। এমনকি মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করতে পারে।” কাগজে লেখা বাক্যগুলি আমার বিছানার সম্মুখভাগের দেয়ালটিতে শোভা পাচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে কাগজটি দেয়ালের নজরকাড়া রঙের সৌন্দর্য কিছুটা বিনষ্ট করলেও আমার কাছে তা মহামূল্যবান। যে কাগজটি প্রতিদিন আমার এত বড় একটি উপকার করে যাচ্ছে তাকে সৌন্দর্য বিনষ্টের অভিযোগটি দেই কি করে বলুন? আমি একটু ভুলোমনা টাইপের মানুষ। আমার মধ্যে জরুরী বিষয়গুলো ভুলে যাওয়ার বাতিক আছে। তাই নিজের দায়িত্বের বিষয়গুলো সবসময় লিখে রাখার চেষ্টা করি। মনভোলা হলেও আমি যথেষ্ট পরিমানে আত্নসচেতন। নিজের ভাল তো পাগলেও বোঝে। আমি একজন সুস্থ মানুষ হয়ে নিজের ভাল না বোঝার তো কোন কারন নেই। বেশ কিছু দিন যাবত্অানিদ্রায় ভুগছি। কাজের চাপে গভীর রাতে ঘুমোতে যেতে হয়। বিরক্তিকর ব্যপার হলো, তখনও ঘুম আসে না। তাই ডাক্তারের পরামর্শক্রমে প্রতি রাতে নার্ভ রিলাক্সের ওষুধ খেয়ে ঘুমাই। অপ্রত্যাশিত কলে যাতে মাথা ব্যথার উদ্রেক না হয় তাই কাগজটি দেয়ালে লাগিয়ে রেখেছি। প্রতি রাতে শোয়ার সময় অন্তত একবার এটি চোখে পড়বে আর ফোনটি সঠিক জায়গায় রাখতে ভুল হবে না। তবে আজ একটু ব্যতিক্রম হয়েই গেল। কারণ আজ একটি বিশেষ দিন, মোবাইলটি হাতের কাছে রাখাটা খুব জরুরী! আজ আমার প্রিয়তমা সহধর্মিণী ঊষার জন্মদিন। কিন্তু কাল সন্ধ্যাবেলাতেই ঊষা ওদের বাড়িতে চলে গেছে। প্রতি বছর নিজের পরিবারের সবার সাথে জন্মদিন পালন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সে। বিয়ের পর কেবল দুটো জন্মদিনে আমি ওর পাশে থাকার সুযোগ পেয়েছি। দুবারই আমিও ওর সাথে ওদের বাড়িতে গিয়ে জন্মদিন পালন করেছিলাম। তবে এবারের জন্মদিনে একটি বিশেষ কারনে তাকে সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সারাদিনই একটি বিশেষ কাজে আমাকে খুব বেশি ব্যস্ত থাকতে হবে। এদিকে ঊষা সন্তানসম্ভবা। কখন কি হয়ে যায় তার তো কোন নিশ্চয়তা নেই, তাই ওকে গতকাল সন্ধ্যায়ই ওদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। মাঝে মাঝে জীবনের তাগিদে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে প্রিয়জনের পাশে থাকা সম্ভব হয় না। ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয় হতাশার সাজ কুটিরে। তারই ফলশ্রুতিতে আজ ঊষাকে সময় না দিতে পারার ব্যর্থ নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রাতে। ঊষাই আমাকে কল করে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলো। আমি আবার ঘুমকে আমার স্ত্রীর মত দেখি, তাই ঘুমের সাথে সন্ধি হলে সম্পূর্ণরূপে অচেতন হয়ে যাই! কিন্তু ফোনের ভাইব্রেশনে বালিশে যে কম্পন সৃষ্টি হয় তা আমার অচেতন মনকে চেতনায় ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট। আজকে আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে যেতে হবে। তাই ঊষার কথামত ইচ্ছে করেই বালিশের নিচে ফোনটি রেখেছিলাম যাতে সে আমাকে সময় মত কল করে জাগিয়ে দিতে পারে। ঊষার কল পেয়ে ঘুম ভাঙলো ঠিকই কিন্তু ফোনের ভাইব্রেটে মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল। আমার মাথা ব্যথা শুরু হলে সেটি সহজে থামতে চায় না। দেয়ালে লাগিয়ে রাখা সাবধানবাণী না শোনার ফল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি! কিন্তু আজ যত মাথা ব্যথাই করুক, আলসেমি করে শুয়ে থাকলে চলবে না। তাই কনকনে শীতের এই মিষ্টি সকালে কম্বলের লোভনীয় উষ্ণতা ছেড়ে উঠে পড়তে হলো আমায়। সকালের টিপ টিপে রোদ আসছে পূর্ব দিকের জানালা দিয়ে। বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙছি, হঠাৎ আবিষ্কার করলাম সাজিদ বিছানায় নেই! সাজিদ আমার বন্ধু। আমরা দুজনই গার্মেন্টস ব্যবসার সাথে জড়িত। আমার গার্মেন্টসটি গাজীপুর আর ওরটা কিশোরগন্ঞ্জ। আমাদের পরিচয় হয়েছিল বছর দুয়েক আগে চৈত্রের এক তপ্ত ক্ষণে। আমি একটি বিদেশী বায়ারের সাথে ডিল করতে গিয়েছিলাম, সেখানে সাজিদও গিয়েছিল একই উদ্দেশ্য নিয়ে। আমরা বয়সে প্রায় সমান হলেও ডিলের ব্যপারে সাজিদের অভিজ্ঞতা আমার থেকে বেশি। কারন ও আমার অনেক আগে থেকে এই বিজনেসে আছে। আর সেই কারনেই ঐ ডিলটি সাজিদ সফলভাবেই করে ফেলে। আর আমার অনভিজ্ঞতা আমাকে ব্যর্থতার ঝুলি হাতে ফিরে আসতে বাধ্য করে। বিশাল অংকের টাকার অর্ডার ছিল! সেদিন সাজিদের সৌভাগ্য দেখে খুব হিংসা হচ্ছিল আমার। স্বাক্ষরহীন যে ফাইলটি সাজিদ এনেছিল, চোখের সামনে দিয়ে সেই ফাইলটি ডিলের স্বাক্ষরে পরিপূর্ণ করে নিয়ে গিয়েছিল। ওর সাথে সেদিন সৌজন্যমূলক হালকা কথাবার্তা হয়েছিল। তারপর থেকে সে বিজনেসের কাজে এদিকে আসলেই আমার সাথে দেখা করতো। এক সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে গিয়ে আমাদের মধ্যে চমৎকার বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। গতকাল বিকেলে সাজিদ এসেছে আমার বাসায়। আজকে একটি বিদেশী বায়ারের সাথে ডিল হবে। আমিও যাব ডিল করতে। সকাল সকাল বায়ারের সাথে দেখা করতে হবে তাই সাজিদ একদিন আগেই কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে এসেছে। ঊষা কাল সন্ধ্যায় চলে যাওয়ায় আমরা দুজন আমাদের বেড রুমে পাশাপাশি শুয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমানোর আগে আমি সাজিদকে বলে রেখেছিলাম আমার আগে ওর ঘুম ভাঙলে যেন আমাকে ডেকে দেয়। কিন্তু এখন তো দেখছি নিজের স্বার্থ সবাই আগে দেখে। ও আগেই ঘুম থেকে উঠেছে অথচ আমাকে ডাকেনি। ঊষা ফোন না করলে হয়তো আজকে আমার সেখানে যাওয়াই হতো না। আমি সব সময়ই স্বীকার করি, একজন পুরুষের জীবনে তার স্ত্রীর অবদান সত্যিই ব্যাখ্যা করার মত না। কোন পুরুষ যদি তার স্ত্রীর অবদানগুলো বলে বা লিখে ব্যাখ্যা করতে চায় তাহলে তার প্রতিটি শব্দই যে ব্যার্থতার রশিতে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়বে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ঊষার মায়াভরা মুখটি ভাবনার আয়নায় দেখতে দেখতে বেড রুমের সাথে লাগোয়া বাথরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। ঘুম থেকে উঠে সাজিদের তো বাথরুমেই আগে যাওয়ার কথা। ওর উপর খুব রাগ হচ্ছে আমার। শালা আগে থেকে উঠে পড়েছে অথচ আমাকে ডাকেনি! এখনই দুচার কথা শুনিয়ে দিতে না পারলে মনে শান্তি পাচ্ছি না। বাথরুমের দরজার কাছে যেতেই অবাক হলাম! দরজাটি ভেতর থেকে আটকানো হয়নি। শুধু চেপে আছে। আমি সাজিদকে মোটা গলায় ধমক দিলাম। কিন্তু কোন প্রতিউত্তর পেলাম না। মেজাজটা বেশ খরখরে হয়ে গেল।দাঁড়া,বের হয়ে আয়।তারপর তোর সাথে এক পাল্লা গান গাইবো। বিড়বিড় করে বললাম আমি। আমি পনের মিনিট যাবত অপেক্ষা করছি অথচ ওর বের হওয়ার নামগন্ধ পর্যন্ত নেই। ঘুম থেকে উঠেছি তখন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ত্রিশ মিনিট হয়ে গেল বাথরুম থেকে পানি পড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। বেটা সাজিদ একাই যদি এত সময় নেয় তাহলে তো আমাদের যেতে যেতে অনেক দেরী হয়ে যাবে। নাহ্! আর সহ্য করা যায় না। একটি অনুচিত কাজ করেই ফেললাম।সমস্যা কি! আমরা আমরাই তো! মনে মনে ভাবলাম আমি। কিন্তু ভেতরে চোখ পড়তেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। ঝরনা থেকে অবিরাম পানি ঝরছে। ভেজা লুঙ্গিটা বাথরুমের মেঝেতে পড়ে আছে। সাজিদ কোথায় গেল তাহলে! এমনিতেই মাথা ব্যাথা করছে আমার। তার মধ্যে সাজিদের অনুপস্থিতি মাথায় আরো চাপ বাড়িয়ে দিলো। ফোনটা হাতে নিয়ে সাজিদের নম্বরে কল দিলাম। আশ্চর্য! ফোনটাও অফ করে রেখেছে! কোথায় গেল তাহলে! ধুর! আমার কি। যে আমাকে কিছু বলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি তাকে নিয়ে আর অনিশ্চিত ভাবনা ভেবে কি হবে! হয়তো আমাকে না বলেই ডিল করতে চলে গেছে। বলা তো যায় না, এবার তো আমিই ডিলটা পেয়ে যেতে পারি। সেই সন্দেহেই হয়তো চলে গেছে। তবে কাজটা একদমই ঠিক করেনি সে। এত কিছু চিন্তা করার সময় হাতে নেই। চট করে বাথরুমে চলে গেলাম গোসল করতে। দশ মিনিট পর গোসল-শেভ সেরে ডাইনিং এ এসে বসলাম। এখানেও ঊষার অনুপস্থিতি ভোগাচ্ছে আমাকে। অন্যদিন এমন সময় ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো থাকে। আমি গোসল করে এসে ডাইনিং এ বসি আর ঊষা আমাকে খাবার বেড়ে দেয়। তারপর দুজন একসাথে সকালের নাস্তা করে ফেলি। যদিও কাল রাতের খাবার রয়ে গেছে ফ্রিজে, তবুও শীতের সকালে ঐ ঠান্ডা খাবার খেয়ে শরীরের হাড়গুলোকে নাচানাচি করার সুযোগ দেয়ার কোন ইচ্ছেই আমার নেই! না খেয়েই চলে যাব আজকে। ইস্! বউটা এখন থাকলে কত ভাল হতো! ডাইনিং থেকে উঠে কমপ্লিট ড্রেস আর টাই পড়ে তৈরী হয়ে নিলাম। কিন্তু সাজিদের এভাবে চলে যাওয়াটা আমি সহজভাবে নিতে পারছি না। ডিল পাওয়ার আশায় কি এতই লোভী হবে যে আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন মনে না করেই চলে যাবে! ভাবতে ভাবতে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ঘড়িটা আনতে গেলাম আমি। কিন্তু এখানে এসে আমি সত্যিই চমকে গেলাম! আমার ঘড়ির পাশে সাজিদের ঘড়িটিও সময়ের অবস্থান ঠিক ভাবেই জানান দিয়ে যাচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের মুখটাকে কেমন যেন লাল দেখাচ্ছে। এখন চিন্তায় পড়ে গেলাম আমি। সম্ভাব্য কোন ভাবনাই আমার মাথায় স্থান করে নিতে পারছে না। ঘড়িটি হাতে পড়তে পড়তে হঠাত্ মনে হলো, ঊষার জন্মদিনে তো গিফট দেয়া হয়নি এখনও! এমন আত্মভোলা আর দায়িত্বহীন হয়ে গেছি আজকাল যা বলার মত না। বউটা অনেক অভিমান করে আছে হয়তো! সাথে সাথেই ঊষাকে কল করলাম। ‘আমি অনেক দুঃখিত লক্ষীটি। তুমি কিছু মনে করোনা প্লীজ!’ফোন রিসিভ করতেই আকুতি মাখানো কন্ঠে বললাম আমি। ঊষা বিস্ময়ের কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,‘কেন! কি করেছ আবার?’ ‘তোমার জন্মদিনের গিফট দিতে ভুলে গিয়েছি সেটা এখন মনে হলো। তুমিও কেমন বলতো, নিজের বরের উপর অভিমান করে তুমিও অভিযোগটি করোনি।’ আহ্লাদিভাব নিয়ে বললাম আমি। ‘তোমার আবার অমন হচ্ছে,তাই না?’একটু কড়া ভাবে বলল ঊষা। ‘অমন মানে? আমার ভুল হয়েছে সেটি তো স্বীকার করছি। রাগ করো না প্লীজ! আমি কাজটি সেরে এসেই গিফট নিয়ে তোমাদের বাড়িতে চলে যাব।’ ‘আমি তোমাকে কতবার বলেছি তুমি ডাক্তার দেখাও। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে আমাদের যে সন্তানটি আসছে তার কাছেও তো তোমাকে লজ্জা পেতে হবে। কিন্তু তুমি তো আমার কথা শোনোই না।’এবার কিছুটা রাগ প্রকাশ পেল ওর কন্ঠে। সন্তানের কথা শুনলেই আমার ভেতরটা আনন্দে লাফাতে শুরু করে। আর কিছুদিন পরই আমি বাবা হবো। আমাদের পুচকাটি আমাকে ‘বাবা,বাব’ বলে ডেকে পুরো ঘর মাতিয়ে রাখবে। ভাবতেই মনটা রোমাঞ্চিত হয়ে যায়! ‘কেন,তোমার কি মনে হচ্ছে আমি আবার ঐ সমস্যার ভুক্তভোগী হয়েছি?’ হাসতে হাসতে বললাম আমি। ‘আরে বলদ!এতে মনে হওয়ার কি আছে?তুমি তো কাল সন্ধ্যা বেলায় এত্তগুলো গিফট কিনে দিয়ে আমাকে বাড়িতে রেখে এসেছ।’ বিরক্তি মাখা স্বরে কথাগুলো বলেই ফোনটা কেটে দিল ঊষা। কিছু বলার সুযোগ পেলাম না! আসলে কিছুদিন যাবত মাঝে মাঝেই এমন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি আমি। এই ব্যাপারটি সব সময় ঘটে না,কিন্তু যখন ঘটে তারপর নিজেকে খুব বোকা মনে হয়। ঐদিন মা বলছিল সরিষা দিয়ে ইলিশ রান্না করবে। আমি বাজার থেকে দুটো ইলিশ আর সরিষা কিনে বাসায় গেলাম। মা তখন চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে বললো, ‘গতকালই তো এগুলো আনলি। আজকে কি এগুলো তোর মাংসের সাথে মিশিয়ে কাবাব বানাবি?’ মা'র কথা শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়েছিলাম। পরে ডাইনিং টেবিলের উপরে রাখা সরিষা ইলিশের ঝোল দেখে বুঝতে পেরেছিলাম সত্যিই এর আগে সরিষা আর ইলিশ কিনে এনেছিলাম। অথচ সেটি আমার মনে নেই! কিন্তু বিষয়টাকে আমি গুরুত্ব দেইনি। চলতি পথে আমরা প্রতিনিয়ত কত কিছু ভুলে যাই তার ইয়ত্তা নেই। ছোটবেলায় মা আমাকে কোন কাজ করতে দিলে প্রায়ই ভুলে যেতাম সেগুলো। আর ভুলে যাওয়ার কারনে মা'র হাতে কত পিটুনি যে খেয়েছি তা আর মনে করতে চাই না। একদিন আমার ছোট বোন বাজার থেকে শ্যাম্পু কিনে আনতে বলেছিল। আমি যাতে ভুলে না যাই তাই আমার শার্টের পকেটে একটি ইটের টুকরো ঢুকিয়ে দিয়েছিল, যাতে ইটের টুকরোটি চোখে পড়লেই ওর শ্যাম্পু আনার কথা মনে পড়ে! কী বুদ্ধিমতি মেয়ে রে বাপ! জোর করে মনটাকে অতীতের ভাবনা থেকে ফিরিয়ে আনলাম। কাজটা আগে শেষ করে নেই তারপর ভাবছি ডাক্তার দেখাবো। নয়তো এমনও হতে পারে, কর্মচারীদের বেতন দুই বার দিয়ে ফেলতে পারি। সবাই তো আর ঊষার মত বোকা না,যে একবার বেতন দিয়ে পরের বার যদি আবার বেতনের জন্য ডাকি তখন সত্ভাবে সব বলে দিবে। নিজেদের লাভের কথা ভেবেই সবাই চুপচাপ মাসে দুই বার বেতন ভোগ করে যাবে। ভেবেছিলাম ঊষাকে সাজিদের কান্ড জ্ঞানহীনতার ব্যাপারটি জানাবো, কিন্তু তার আগেই তো রাগ দেখিয়ে ফোনটা রেখে দিল। এদিকে বায়ারে সাথে দেখা করার সময় হয়ে আসছে। আর দেরী করা যাবে না। ঘড়িটি হাতে দিয়ে, চট করে জুতোটা পড়ে ফাইল হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রুম থেকে। গাড়ির কাছে যেতেই এতক্ষণ ধরে মনের মাঝে উঁকি দেয়া ভাবনাগুলো দূর হয়ে গেল। সাজিদের গাড়িটি নেই। তার মানে আমাকে না জানিয়েই ডিল করতে চলে গেছে। অনেক বড় রকমের ডিল এটি। সফল হলে একবারেই প্রচুর টাকা আসবে হাতে। আসলে নিজের বেলায় সবাই ষোলআনা চিন্তা করে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে গাড়িতে উঠে নিয়মিত অভ্যাস অনুযায়ী পিছন ফিরে তাকিয়ে হাত নাড়লাম। কিন্তু এখন বোকামির পরিচয় দিলাম। দরজার দিকে চোখ পড়তেই সেখানে ঊষার অনুপস্থিতি বোকা বানালো আমাকে। মুচকি হেসে,নিজের মাথায় হালকা একটি চাপড় দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের এলাকার এই অংশটিতে সুপারি বাগানের প্রাচুর্যতা রয়েছে। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এমন যে,দূরের ছোট ছোট বনের দিকে তাকালে সেটি দূর না হয়েও দূরত্বের মরীচিকা সৃষ্টি করে, সে মায়াদিগন্ত মানুষের মনকে এক গভীর মুক্তির আনন্দে ভরে দেয়। এ সৌন্দর্য আমার নিছক কল্পনা নয়, বহুবার দেখা গিয়েছে সন্ধ্যার সময় পশ্চিম আকাশে তাকাতে তাকাতে প্রকৃতি প্রেমী যুবক হঠাত্ বাড়ির মায়া ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে রওনা দিয়েছে। তারপর সে আর ফিরল না! তাকে মরা পাওয়া গেল উত্তর দিকের ঐ ঝিলের পাড়ে। গাড়িতে বসেই এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব সহজেই চোখে পড়ে। আমি সব সময় গাড়িতে বসে বিধাতার এই নিঃস্বার্থ দানগুলোকে উপভোগ করি। আরো ভাল লাগে সাথে ঊষা থাকলে। মাঝে মাঝে অবুঝের মত বায়না ধরে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে স্পর্শ করে দেখতে। কিন্তু জায়গাগুলো নিরাপদ নয় এমন অনেক মতবাদ প্রচলিত আছে। তাই ওর বায়না সব সময় বায়না করেই রেখে দেই। জেনে শুনে বিপদে কে পড়তে চায়! গাড়ি নিয়ে উওর দিকের ঐ ঝিলের কাছে পৌছেই দেখলাম কিছু মানুষ জটলা করে রাস্তার একটা অংশ দখল করে আছে। রাস্তার ঠিক পাশেই ঝিলটি। সচরাচর এখানে তেমন ভিড় থাকে না। আর রাতের বেলায় তো জনশুন্য বললে কোন ভুল হবে না। আমি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। খেয়াল করলাম সবার নজর একদিকে। কিছু একটা দেখছে সবাই। আমি ঝিলের পাড়ে এগিয়ে গেলাম। ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দেখলাম, একটি প্রাইভেট কার আগুনে পুড়ে আছে। গাড়িটির সামনের অংশ পুড়েছে শুধু। মানে অর্ধেক পুড়েছে আর বাকী অর্ধেক ভাল আছে। নানাবিধ প্রশ্ন আসল মাথায়।ঘটনা কি? জিজ্ঞেস করতেই এক লোক বলে উঠল,‘গতকাল গভীর রাতে কারা যেন গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। জনশূন্য স্থানে গাড়িটি যখন প্রায় অর্ধেক পুড়ে গিয়েছিল তখন এক প্রহরী এসে অনেক চেষ্টা করে গাড়ির ভেতরের লোকটিকে বাইরে বের করে আনে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, গাড়ির ভেতরের লোকটি নাকি গাড়ি থেকে বের হয়েই দৌড়ে চলে যায়। তারপর তার আর কোন হদিস পাওয়া যায় নি।’ এইতো এখন দেশের অবস্থা! আমাদের দেশটি বিদেশীদের কাছে মোটামুটি যেটুকু সুনাম অর্জন করে থাকুক না কেন,দেশের অভ্যন্তরের শত্রুদের কবল থেকে দেশকে বাঁচানো যাচ্ছে না। রাজনৈতিকদের ছত্রছায়ায় সারাদেশে আজ চলছে সন্ত্রাসের মহোত্সব। লুটপাট, ছিনতাই, চাঁদাবাজি চারদিকে। গোটা দেশ মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি। তার উপর বিরোধীদলের হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধের অত্যাচার। যে আজ সরকারে, সেই তখন বলে হরতাল, জ্বালাও- পোড়াও ইত্যাদিতে দেশের মস্ত ক্ষতি, এসব দরিদ্র জনগনের উপর অমানবিক নির্যাতনের শামিল। কিন্তু যেই সরকারচ্যুত হয়, অমনি এসব হয়ে যায় প্রতিরোধের ভাষা। ধুর বেটা!এসব ভাবছিস কেন? তোকে কি কেউ ডায়াসে উঠে বোলচাল মারতে ডেকেছে? নিজের নিঃশব্দ ঝাড়িতে মন থেকে চিন্তাগুলো ঝেরে ফেললাম। তারপর গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ফাইলটা স্টিয়ারিং এর সামনে গ্লাসের কাছেই রেখেছিলাম। কি মনে করে যেন ফাইলটা হাতে নিয়ে ভেতরের কাগজপত্র দেখতে লাগলাম। এবার সত্যিই আমার অবাকের চরম পর্যায়ে আরোহণের পালা। ওহ্ মাই গড! আমি সাজিদের ফাইল নিয়ে এসেছি! বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠল আমার। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। কাঁপা কাঁপা হাতে স্টেয়ারিংটা ধরলাম। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর গাড়িটি ঘুরিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাসায় গিয়ে চলটে ওঠা কালো দরজাটা ঠেলে দৌঁড়ে বেড রুমে চলে গেলাম। ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা ফাইলটি খুলতেই দেখি,আমার ফাইল! দুজনের ফাইলের একই কালার ছিল। তাই হয়তো ভুলক্রমে সাজিদের ফাইলটি নিয়েছিলাম আমি। আমার ফাইলটি খুলতেই যেন অন্য জগতে চলে গেলাম আমি! ছোট একটি কাগজ ফাইলের ভেতরে এক কোণায় রাখা।‘সাজিদকে চা খাওয়ানোর কথা বলে উওর দিকের ঝিলের কাছে নিয়ে যাবো। তারপর গাড়িতে আটকে রেখে পুড়িয়ে মারবো।’ লেখাটি দেখেই চোখগুলো ছানাবড়া হয়ে গেল আমার! দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি টুকু হারিয়ে ফেললাম আমি! ধুপ করে মেঝেতে বসে পড়লাম। কি আশ্চর্য! রাতে কখন কি করেছি কিছুই মনে পড়ছে না আমার। কাগজের লেখাটিও তো আমার হাতের। বিস্ময়ের এক তপ্ত স্রোত যেন বয়ে গেল আমার শিরদাড়া দিয়ে! কান দিয়ে যেন উষ্ণ ধোঁয়া বের হয়ে যাচ্ছে। তার মানে ডিলটি পাওয়ার লোভেই এমন পৈশাচিক কাজ করেছি আমি? ভাবতেও অবাক লাগছে, এতটা লোভী ও নিষ্ঠুর কিভাবে হয়েছিলাম আমি! অসাড় মনে রুম থেকে বাইরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যা হবার হয়েছে, বসে থাকলে হবে না। ডিলটি পেতে হবে আমাকে। অনেক টাকার ব্যাপার। হঠাত্ পেছন থেকে কারো শক্ত বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হলাম আমি।কিছু বুঝে উঠার আগেই গলায় ধারালো কিছুর স্পর্শ অনুভব করলাম! আমার অনাগত সন্তানটিকে হয়তো দেখা হলো না আর!"


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বিস্মরণ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now