বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বিপরীত বাস্তবতা

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ================== বিপরীত বাস্তবতা ================== এই ট্রিলিয়ন বছর বয়সী পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া অদ্ভুত, কাকতালীয় আর আশ্চর্যজনক ঘটনার সংখ্যা নেহাত কম না! এই তো আজ থেকে আঠারো-উনিশ বছর আগের কথা; ঠিক একই দিনে, ঘড়ির কাটায় একই সময়ে, বাংলাদেশের আলাদা আলাদা জায়গায় জন্ম নিলো দুইটা পিচ্চি মেয়ে। একজনের জন্ম হলো এপোলো হসপিটালের চার নাম্বার ভিআইপি কেবিনে, আর আরেকজনের জন্ম পুরান ঢাকার চুনওঠা দেয়ালের ছোট্ট একটা দু'রুমের বাড়িতে! বিশিষ্ট শিল্পপতি নিজামুল হক সাহেব তার একমাত্র মেয়ে রাইসার জন্মের খুশিতে জিএম থেকে দারোয়ান পর্যন্ত, অফিসের সবাইকে এক প্যাকেট করে মিষ্টি গিফট করলেন। নিজামুল হক সাহেবের অফিসের জুনিয়র ক্লার্ক কামরুল মিষ্টির প্যাকেটটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার স্ত্রী’র হাতে দিয়ে বললো, 'বাসায় নতুন অতিথি আসছে আর একটু মিষ্টি-টিষ্টির আয়োজন না করলে হয়? এখনই আশেপাশের বাসায় মিষ্টি বিতরণ করে আসো, আমি ততক্ষণ আমার শান্তা মামনীরে ধরতেছি।' রাইসা আর শান্তা, দুই মেয়েই তার নিজ নিজ মা বাবার কাছে রুপকথার রাজকন্যা! মেয়ের দ্বিতীয় জন্মদিনে নিজামুল হক সাহেব মেয়েকে বসুন্ধরা থেকে চার হাজার টাকা দিয়ে একটা বার্বি ডল কিনে দিলেন। আর কামরুল ঐদিন ফুটপাথ থেকে চল্লিশ টাকা দামের কাপড়ের লাল একটা পুতুল কিনে মেয়ের হাতে দিয়ে বললো, 'হ্যাপি বার্থডে মামনী।' রাইসা আর শান্তা দুজনেই সেদিন ভীষণ খুশি হয়েছিলো। বাচ্চারা তো বড়দের মতো প্রাইস ট্যাগ বোঝে না। তারা সমান খুশি হয়! তারপর এতোদিনে যমুনা ফিউচার পার্কের কৃত্রিম ঝর্ণাটায় গড়িয়েছে অনেক অনেক জল! পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েকটা বছর। রাইসা আর শান্তা দুজনেই এখন যথেষ্ট বড়। কতোটা বড়? যতটা বড় হলে মেয়েরা মা'কে বলে, 'উফস মম! তুমি আমার সব কিছুতে ইন্টারফেয়ার করবা না তো! আমি এখন নিজের ডিসিশান নিজেই নিতে পারি।' রাইসার আম্মু মুচকি হেসে বললেন, 'আচ্ছা ঠিক আছে। এবারে লক্ষী মেয়ের মতন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও তো। ড্রাইভার আংকেল নিচে ওয়েট করছে, তোমার ক্লাসের দেরি হয়ে যাবে।' রাইসা একটা নামিদামি প্রাইভেট ভার্সিটিতে ইন্জিনিয়ারিং ফার্স্ট সেমিস্টারে পড়ে। তার এই উনিশ বছরের মোটামুটি দীর্ঘ জীবনটা বলতে গেলে অসংখ্য সমস্যায় পরিপূর্ণ। ছোটখাট ভাবার কিছু নেই, প্রতিটা সমস্যাই বিশাল আর ভয়াবহ! এই যেমন আম্মু ওর ডেইলি এক স্লাইসের বেশি পিজ্জা খাওয়া এলাউ করেন না। এটা নাকি ব্যাড ফর হেলথ! তারপর গত পরশুদিন এত্তো সাধের মেমোরী কার্ডটা ফরম্যাট হয়ে গেল। কতোগুলো পছন্দের সং আর সেলফি ছিলো সেটাতে। ইচ্ছে হচ্ছিলো চিৎকার দিয়ে কাঁদতে! আরো আছে, আব্বু ওকে লাস্ট উইন্টারে ফ্রেন্ডদের সাথে সাজেক ট্যুরে যেতে দেয়নি। সবাই কত্তো মজা করেছে, আর রাইসা? বোর হয়েছে বাসায় বসে বসে। আরেকটা প্রবলেম ওর ছোট ভাই রাতুল। সেদিনও পিচ্চিটা ওর ভীষণ দামি মেকাপ বক্সের মধ্যে পানি ঢেলে দিয়েছে। ইসস! তিনশো ডলার একদম জলে। তারপর আজকে রাতে রাইসা যখন পুরো দুই ঘন্টা ধরে ওর বয়ফ্রেন্ড আবীরের নাম্বার ওয়েটিং পেল তখন ওর ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেল! আবীরকে কয়েকশো বার ট্রাই করার পর শেষমেশ রাইসা কল দিলো তার বেস্ট ফ্রেন্ড শান্তাকে। তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো। রাইসা কোন ভূমিকা ছাড়াই প্রশ্ন করলো, 'কি রে তোর জ্বর কমেছে?' ‘এইতো আগের মতোই; একবার বাড়ে একবার কমে’ শান্তা বললো। ‘তোর কি খবর?’ 'আর বলিস না, আবীরের ফোন দুই ঘন্টা ধরে ওয়েইটিং পাচ্ছি! আমার কিচ্ছু ভাল্লাগতেছে না। ইচ্ছে হচ্ছে মরে যাই!' 'হা হা হা, এতো অল্পতেই এত্তো আপসেট হলে চলে? দেখ কোন ইম্পর্টেন্ট কলে বিজি আছে হয়তো!' 'আচ্ছা দেখি, আজকে ওর সাথে ফাইনাল বোঝাপড়া করবো। আর তুই টাইম নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি কোন মেডিসিন স্পেশালিষ্টের সাথে কনসাল্ট কর! রাখতেছি, টা টা।' রাইসার এই এক বাজে স্বভাব! নিজে ঝড়ের মতো কথা শেষ করেই হুটহাট ফোন রেখে দেয়! ফোন রাখতেই শান্তার আম্মু এক গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে এসে পাশে রাখলেন। বললেন, 'লক্ষী মেয়ের মতো এবার পুরোটা খেয়ে নাও তো মা! আল্লাহর রহমতে জ্বর কমে যাবে।' ফিজিক্স কেমিস্ট্রির সব থিওরী ভুল প্রমাণ করে দিয়ে রাইসা আর শান্তার মধ্যের ফ্রেন্ডশিপ পৃথিবীর আরেকটা আশ্চর্যজনক ঘটনার প্রমাণ। সব দিক দিয়েই এই দুই মেয়ে একদম আলাদা। একজন রাহুল দ্রাবিড় হলে আরেকজন শহীদ আফ্রিদি! দুজনের প্রথম দেখা হয় তাদের বাবার অফিসের কালচারাল পার্টিতে। চেয়ারম্যান থেকে পিওন; অফিসের সবার ফ্যামিলিই ছিলো সেখানে নিমন্ত্রিত। আজীবন কেটি পেরি, লিংকিন পার্কের হার্ডরকের ফ্যান রাইসা সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলো শান্তার রবীন্দ্রসঙ্গীতে। সেই আদিকাল থেকেই মানুষের ধর্ম চুম্বকের বিপরীত, তারা নিজেদের থেকে আলাদা টাইপ কাউকে আকর্ষণ করে! রাইসা যতোটা অশান্ত, শান্তা ঠিক ততোটাই শান্ত মেয়ে। কতোটা? যতোটা শান্ত হলে মা যা বলে মেয়ে ঠিক তাই-ই শোনে। শান্তার আম্মু ওর কপালে হাত রেখে বললেন, 'ইস! জ্বরটা বেশ বেড়েছে। আজ আর ক্লাসে গিয়ে কাজ নেই। বাড়িতে বসে রেস্ট নাও। তোমার আব্বু বাসায় এসে রাতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।' শান্তা বাংলার মতো একটা সহজ সরল ভালোমানুষ সাবজেক্টে অনার্স করে। হাসি খুশি আর আনন্দে পরিপূর্ণ তার এই উনিশ বছরের ছোট্ট লাইফটা। আব্বু আম্মু আর ছোট্ট বোনটাকে নিয়ে সন্ধ্যায় একসাথে বসে লুডু খেলা আর বেশি করে ঝাল দিয়ে মাখানো ঝালমুড়ি খাওয়া; সুখী থাকার জন্য লাইফে আর বেশি কিছু লাগে? ওর জীবনটা যেন রুপকথার সেই গল্প শেষ হওয়ার মতন! 'অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো!' ওদের মতো সুখী কে আছে এই পৃথিবীতে? তবে পৃথিবীর সেই একই স্বভাব! সে সবসময় আশ্চর্যজনক ঘটনার জন্ম দিতে পছন্দ করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ এনায়েতুর রহমান সব রিপোর্টসে চোখ বুলিয়ে শান্তার বাবা কামরুল হাসানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, আমি ধারণা করছি আপনার মেয়ে লাস্ট স্টেজ লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত। সহজ ভাষায় যাকে বলে ব্লাড ক্যান্সার! সারভাইভ করার চান্স মাত্র বিশ পার্সেন্ট। এই মুহুর্তে টাকা লাগবে, অনেক অনেক টাকা। কিন্তু একটা অফিসের ছোটখাট ক্লার্ক হুট করে এতোগুলো টাকা কই পাবে? শান্তার বাবার মাথায় পুরো আকাশটা বায়ুমন্ডল, ওজনস্তর সবকিছু সহ ভেঙে পড়লো। হ্যাঁ, দরকার হলে কামরুল হাসান নিজের কিডনী বিক্রি করবেন! তবে একটা কিডনীর আর কতই বা দাম! এই জিনিস বিক্রি করে আজকাল সর্বোচ্চ আইফোন সেভেন কেনা যায়, মেয়েকে বাঁচানো যায় না। শেষমেশ অনেক কষ্টে কিছু টাকাপয়সা ধারকর্জ করে উনি মেয়েকে উত্তরায় একটা কমদামী ক্লিনিকে ভর্তি করালেন। ক্লিনিকে ভর্তি করানো আসলে শুধু শুধু। সান্তনা স্বরূপ! এখনো কেমো শুরু করার টাকাটাও যোগাড় হয়নি যে! শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশেই ক্লিনিক। সারাদিন জানলা দিয়ে প্লেনের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে শান্তার একদিন হঠাৎ করে মনে পড়লো, ইস! ওর ক্যান্সারের খবরটা তো রাইসাকেই জানানো হয়নি! শান্তা কল দিলো। একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ করে রাইসা তার স্বভাবসুলভ হড়বড় করে কথা শুরু করলো, 'ওহ শান্তা তুই এদ্দিন পর কল দিলি? আর এদিকে তো আমি পুরা শেষ! আয়াম টোট্যালি গন।' ‘কেন কি হইছে তোর? আবীর কিছু উল্টাপাল্টা করেছে আবার?’ শান্তা জানতে চাইলো। 'আরে ধুরর! আর বলিস না, ওর চেয়েও বেশি বড় ঘটনা। রাইসা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, এত্তো যত্ন নিই তারপরও আমার মুখে ব্রন উঠেছে। দেখে তো আমার পুরো চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। তার উপরে আমাদের কাজের বুয়া বললো এই একটা ব্রনই নাকি আস্তে আস্তে সারা মুখে ছড়িয়ে যাবে। তুই ভাবতে পারছিস? উফস আল্লাহ, আমার যে কি হবে! এই শান্তা ফোনটা রাখ তো। আবীর কল দিচ্ছে, টা টা।’ ইস পাগলী মেয়েটা! ফোন রেখে শান্তার মনে হলো রাইসাকে কাছে পেলে মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদর করে দিতো। ক্যান্সার যেন খুব অল্প সময়েই শান্তার বয়স অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্তার অবস্থা দিনে দিনে বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে। শুকিয়ে একদম পাটকাঠি। সাথে ভীষণ দুর্বল শরীর, বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারে না। শুধু আকাশে একটা প্লেন দেখা গেলেই চোখ খুলে জানলা দিয়ে সেদিকে তাকায়। কেমো দেয়ার টাকা যোগাড় করা যায়নি। শান্তার বাবা এখন শেষমেশ তাবিজ-কবজ পানিপড়া টাইপ চিকিৎসার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা আরকি! এইসব জিনিসে সর্বোচ্চ কোমরের ব্যথা সারে, ক্যান্সার না। বিকালে শান্তার অবস্থা হঠাৎ করে ভীষণ খারাপ হয়ে পড়লো। বিনা চিকিৎসায় আর কদ্দিন? বিশাল একটা প্লেন জান্তব শব্দ করে উড়ে যাচ্ছিলো ওর জানালায়, দৃষ্টিসীমার আকাশ দিয়ে। প্লেনের রূপোলী ডানায় প্রতিফলিত হয়ে বিকেলের রোদ ঝিক করে শান্তার চোখে এসে পড়লো। একরাশ ক্লান্তি নিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বুজলো শান্তা! ঢাকা টু সিঙ্গাপুরের এই রূপালী ডানার প্লেনটার বিজনেস ক্লাসে বসে হেডফোনে জাস্টিন বিবারের গান শুনতে শুনতে কফি খাচ্ছিলো রাইসা। তার গন্তব্য সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটাল। সেখানে নাকি ব্রনের বেশ ভালো চিকিৎসা আছে। একদম গোড়া থেকে নির্মুল করে দেয়। লেজার ট্রিটমেন্ট বলে যেটাকে। রাইসা কফি শেষ করে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজলো। ট্রিলিয়ন বছরের বৃদ্ধ পৃথিবী মুচকি হাসলো সেটা দেখে। তার এই জীবনে বাস্তবতার চেয়ে বেশি অদ্ভুত, কাকতালীয় আর আশ্চর্যজনক কিছুই দেখেনি সে। কিচ্ছু না!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বিপরীত বাস্তবতা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now