বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমার তখন সবে বিয়ে হয়েছে। গরমকাল। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি গিয়েছে। খাওয়াদাওয়ার পর পাইপ খেতে খেতে উপন্যাস পড়ছি। স্ত্রী শুতে চলে গেছে। চাকরবাকররাও বিদেয় নিয়েছে। এমন সময়ে ঘণ্টাধ্বনি শুনলাম দরজার।
ঘড়িতে তখন বারোটা বাজতে বারো মিনিট বাকি। এত রাতে রুগি ছাড়া আর কেউ আসে না। মনটা খিচড়ে গেল। সারাদিন ধকলের পর রাতটুকুও কি জিরোতে পারব না?
কিন্তু কর্তব্য আরামের চাইতে বড়ো। তাই উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখলাম দোনগোড়ায় দাঁড়িয়ে শার্লক হোমস।
আমাকে দেখেই বলল সোল্লাসে, ঠিক জানতাম রাত হলেও তোমাকে পাওয়া যাবে।
কী সৌভাগ্য! ভেতরে এসো!
আইবুড়ো সময়ের অভ্যেস দেখছি এখনও ছাড়তে পারনি, আর্কেডিয়া মিক্সচার না হলে পাইপ খাওয়া হয় না। কোটের ছাইগুলোই অকাট্য প্রমাণ। আর মিলিটারি ধড়াচূড়াও এখনও ছাড়তে পারনি, তাই আস্তিনে রুমাল গুজে রাখ এখনও। ভায়া, রাতটা থাকা যাবে এখানে?
স্বচ্ছন্দে।
টুপির আলনায় টুপি ঝুলছে না যখন পুরুষ-অতিথি বাড়িতে নেই।
হোমস, তুমি থাকলে আমি বর্তে যাব।
যাক, ঠাই তাহলে পাওয়া গেল। বাড়িতে মিস্ত্রি এসেছিল মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ, গ্যাস বিগড়েছিল।
কার্পেটে বুটের ছাপ রেখে গেছে। এবার একটু পাইপ খাওয়া যাক।
মুখোমুখি বসে নীরবে ধূমপান করতে লাগল বন্ধুবর। আমিও কথা বললাম না। জরুরি দরকার না-থাকলে এত রাতে বাড়িতে হানা দেওয়ার পাত্র সে নয়। সুতরাং ধৈর্য ধরতে হবে, একটু পরেই সব বলবে।
আমার দিকে চেয়ে হঠাৎ বললে, পসার খুব জমেছে দেখছি।
কী করে বুঝলে?
তোমার জুতো দেখে। দিব্যি ঝকঝক করছে। তার মানে খুব ঘোড়ার গাড়িতে চাপছ। আমি তো জানি, কাছাকাছি যেতে হলে হাঁটা পছন্দ কর তুমি— গাড়িতে চাপো না।
‘চমৎকার!’ প্রশংসামুখর হলাম আমি।
কিন্তু খুবই সামান্য ব্যাপার। নজরটা ঠিকমতো দিতে পারলে শ্রোতাকে এইভাবে বক্তার পক্ষে চমকে দেওয়াটা আশ্চর্য কিছু নয়। আসল জিনিসটা চোখ এড়িয়ে গেলে এইরকমই হয়। ভায়া, একই কথা প্রযোজ্য তোমার ওই গল্পগুলোর ক্ষেত্রেও। নিজের কায়দায় লিখতে গিয়ে সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য থেকে বঞ্চিত কর পাঠককে। এই মুহুর্তে আমার হাতে এমনি একটা কেস এসেছে। বড়ো অদ্ভুত কেস– মাথা গুলিয়ে দিচ্ছে। এখনও খেই পাচ্ছি না— কিন্তু পাবই, ওয়াটসন, অন্ধকারে আলো আমি দেখতে পাবই। বলতে বলতে দু-চোখ প্রদীপ্ত হয়ে উঠল বন্ধুবরের, পাতলা গালে দেখা দিল রক্তিম আভা। মুহুর্তের জন্যে যেন একটা আবরণ উঠে গেল ওর সুতীব্র, সুতীক্ষ্ণ প্রকৃতির ওপর থেকে। কিন্তু তা পলকের জন্যেই। পরের মুহুর্তেই ফের দেখলাম রেড ইন্ডিয়ানদের মতো ভাবলেশহীন নির্বিকার মুখচ্ছবি— মুখের এই বিচিত্র বিকারবিহীন ভাবের জন্যেই অনেকে ওকে একটা নিছক যন্ত্র ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না।
ওয়াটসন, সমস্যাটা রীতিমতো ইন্টারেস্টিং— অত্যন্ত অসাধারণ বৈশিষ্ট্য-সমৃদ্ধ। ভেবেচিত্তে একটা সমাধান আঁচ করেছি। তোমাকে এর মধ্যে পেতে চাই।
সানন্দে যাব, হোমস।
কালকে অলডারশট যেতে হবে।
যাব।
ওয়াটারলু থেকে দশটা দশের গাড়ি?
ভালোই তো।
ঘুম পেয়েছে কি?
পেয়েছিল— এখন উড়ে গেছে।
বার্কলের খুন সম্পর্কে কিছু শুনেছ?
না।
আর সিপাই বিদ্রোহে এদের কৃতিত্ব ভোলবার নয়। জেমস বার্কলে গত সোমবার পর্যন্ত কম্যান্ডার ছিলেন এই রেজিমেন্টের। ঢুকেছিলেন গাদা বন্দুক বইতে— ধাপে ধাপে ওপরে উঠেছেন— সিপাই বিদ্রোহের পর অফিসার হয়ে যান— পরে রেজিমেন্টের সর্বময় কর্তা।
সার্জেন্ট থাকার সময়ে রেজিমেন্টের এক কৃষ্ণকায় সাজেন্টের মেয়ে ন্যান্সি টিভয়কে উনি বিয়ে করেন। এসব বিয়ে সমাজ চট করে মেনে নেয় না তাদেরও নেয়নি। পরে ঠিক হয়ে যায়। মেয়েটা সুন্দরী— তিরিশ বছর বিবাহিত জীবনের পরেও।
বিয়ে করে সুখী হয়েছিলেন কর্নেল বার্কলে। প্রাণ দিয়ে ভালাবাসতেন স্ত্রীকে। স্ত্রী-ও ভালোবাসতেন তাকে— কিন্তু সে-ভালোবাসায় স্বামীর ভালোবাসার মতো আদিখ্যেতা ছিল না। কাজেই এ-রকম অপূর্ব জুটির এ-ধরনের পরিণতি কল্পনা করা যায় না।
কর্নেল বার্কলে এমনিতে ফুর্তিবাজ, কিন্তু মাঝে মাঝে হঠাৎ মুখ কালো করে বসে থাকতেন। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে হইচই করতে করতে আচমকা গুম হয়ে যেতেন। দিনকয়েক কাটত এইভাবে। মনে হত যেন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছেন। ভীষণ ক্লান্তিবোধ করেছেন। ওঁর অফিসার-বন্ধুদের কাছেই শুনেছি এই ব্যাপার।
অলডারশটের ক্যাম্পে বিবাহিত অফিসাররা বাইরে রাত কাটান। আট মাইল দূরে ল্যাচেন বলে একটা বাড়িতে দুজন ঝি আর একজন কোচোয়ান নিয়ে সস্ত্রীক থাকতেন কর্নেল। বাড়িটা খালি জমি ঘেরা, পশ্চিমদিকে তিরিশ গজ দূরে বড়োরাস্তা।
গত সোমবার রাত আটটায় গির্জেতে একটা মিটিংয়ে গিয়েছিলেন মিসেস বার্কলে। তাড়াতাড়ি ডিনার খেয়ে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। মিস মরিসন নামে একটি তরুণীর সঙ্গে মিটিংয়ে যান এবং সওয়া ন-টায় তাকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে স্বগৃহে ফিরে আসেন।
রাস্তার দিকে কাচের দরজাওলা এটা ঘর আছে ল্যাচেনে। সকালের দিকে ঘরে বসা হয়, সন্ধের পর খালি থাকে। কাচের দরজায় পর্দা নেই। দরজার সামনে তিরিশ গজ লম্বা সবুজ ঘাস-ছাওয়া লন, তারপর রেলিং-দেওয়া পাঁচিলের পর রাস্তা। মিসেস বার্কলে এই ঘরে এসে এক কাপ চা আনতে বললেন ঝি-কে, অথচ ও সময়ে কখনো তিনি চা খান না। স্ত্রী ফিরেছে শুনে খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে হল ঘর পেরিয়ে এই ঘরে ঢোকেন কর্নেল বার্কলে, দেখেছে কোচোয়ান। তারপর আর তাকে জীবিত দেখা যায়নি।
দশ মিনিট পরে চা নিয়ে এসে ঝি দেখল দরজা ভেতর থেকে চাবিবন্ধ এবং অত্যন্ত চড়া গলায় গিন্নি ঝগড়া করছেন কর্তার সঙ্গে। কর্নেল বার্কলে এত আস্তে নরম গলায় জবাব দিচ্ছেন যে কথা শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু গিন্নিমার কথাগুলো শুনে তাজ্জব হয়ে গিয়ে সবাইকে ডেকে আনে সে। মিসেস বার্কলের প্রত্যেকটা কথায় আতীব্র ঘৃণা ঠিকরে পড়ছিল। স্বামীকে তিনি বার বার ‘কাপুরুষ’ বলে গাল পাড়ছিলেন। ‘তোমার সঙ্গে থাকতেও আমার গা রি-রি করছে! ফিরিয়ে দাও আমার জীবন! আর কি তা পাব? এখানে আর এক মুহুর্ত নয়! কাপুরুষ কোথাকার! কাপুরুষ! কাপুরুষ! আচমকা পুরুষকষ্ঠে শোনা গেল একটা আর্ত চিৎকার! দড়াম করে আছড়ে পড়ার আওয়াজ এবং নারীকণ্ঠে মুহুর্মুহু বুকফাটা হাহাকার। দরজা খুলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে কোচোয়ান লনের দিক থেকে একটা খোলা জানলা গলে ঢুকে পড়ে ভেতরে। দেখে, সোফায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে মিসেস বার্কলে। আর, চেয়ারের হাতলে দু-পা রেখে ফায়ার প্লেসের ঝাঝরির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে কর্নেল বার্কলে। প্রাণহীন। ঘরে রক্তগঙ্গা বইছে।
ভেতর থেকে দরজা খুলতে গিয়ে মুশকিলে পড়ল কোচোয়ান— দরজার চাবি কোথাও পাওয়া গেল না। কাজেই জানলা গলে বাইরে এসে ডেকে আনল পুলিশ আর ডাক্তার। অজ্ঞান অবস্থায় মিসেস বার্কলেকে ঘরের বাইরে আনা হল। এ অবস্থায় সন্দেহটা তার ওপরেই পড়ে এবং তার ব্যতিক্রম হল না। দেখা গেল, মাথার পেছনে ইঞ্চি দুয়েক লম্বা একটা মারাত্মক চোট পেয়ে মারা গেছেন কর্নেল, একটা ভোঁতা ভারী অস্ত্র দিয়ে আঘাত হানা হয়েছে খুলিতে। অস্ত্রটাও পাওয়া গেল দেহের পাশে। অদ্ভুত হাতিয়ার। একটা নিরেট গদা, হাতলটা হাড় দিয়ে বাঁধানো। কাঠের ওপর অদ্ভুত সব খোদাইয়ের কাজ। দেশবিদেশে লড়াই করে নানারকম বিচিত্র বস্তু সংগ্ৰহ করে এনেছিলেন কর্নেল, এই গদাটিও হয়তো তারই সংগ্রহ, অথচ চাকরবাকরেরা এ-জিনিস এর আগে কখনো বাড়িতে দেখেনি। চাবিটা শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না। অলডারশট থেকে তালা-মিস্ত্রি আনিয়ে দরজা খুলতে হল।
গত মঙ্গলবার পর্যন্ত এই হল ঘটনাপ্রবাহ। কর্নেলের বন্ধু মেজর মফি আমাকে ধরে-বেঁধে নিয়ে গেলেন অলডারশটে পুলিশকে সাহায্য করার জন্যে। যে ঝি-টা কর্তাগিন্নির ঝগড়া বাইরে থেকে শুনেছিল, তাকে জেরা করতে গিয়ে একটা আশ্চর্য খবর শুনলাম। গিন্নিমা নাকি রাগের মাথায় কর্তাকে ‘ডেভিড’ বলেছিলেন বার কয়েক, অথচ কর্তার নাম জেমস। ব্যাপারটা প্রণিধানযোগ্য। রহস্য সমাধানের প্রথম ধাপ এইটাই হওয়া উচিত।
আরও একটা ব্যাপারে তাক লেগে গেছে চাকরবাকর এবং পুলিশ মহলের। কর্নেলের মুখের পরতে পরতে প্রকট হয়েছে বিষম আতঙ্ক। মৃত্যুর পূর্বমুহুর্তে যেন ভূত দেখে চমকে উঠে সিঁটিয়ে গিয়েছেন। পুলিশের বিশ্বাস, প্রাণাধিকা স্ত্রী গদা দিয়ে তাকে মারছে, ভয়ানক এই দৃশ্য দেখেই নাকি তিনি আঁতকে উঠেছিলেন। ভদ্রমহিলা নিজে এখন ব্রেন ফিভারে আক্রান্ত, কোনো কথা তাঁর মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে না।
মিসেস বার্কলের সঙ্গে মিস মরিসন ফিরেছিলেন গির্জের মিটিং থেকে, হঠাৎ মিসেস বার্কলে কেন এত খাপ্পা হয়ে গেলেন, এ-প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি মিস মরিসন।
চাবি যখন কোথাও পাওয়া গেল না, ধরে নিলাম বাইরের কেউ ঘরে ঢুকে চাবি নিয়ে ভাগলবা হয়েছে। তাই জানলার বাইরে লন আর রাস্তা পরীক্ষা করতে গিয়ে সবসুদ্ধ পাঁচটা পায়ের ছাপ আমি পেলাম। আততায়ী রাস্তা থেকে পাঁচিল টপকে লনে ঢুকেছে, বেগে লন পেরিয়ে এসেছে, যে কারণে পায়ের পাতা পায়ের গোড়ালির চাইতে মাটিতে বেশি চেপে বসেছে, তারপর জানলা টপকে ঘরে ঢুকেছে। পাঁচটা ছাপের একটা পেলাম রাস্তায়, দুটাে লনে, দুটো জানলার গোবরাটে। কিন্তু আততায়ীর সঙ্গে তার একজন যে-এসেছে, আমাকে বেশি তাজ্জব করেছে সে।
খুনের স্যাঙাত?
পকেট থেকে একটা পাতলা ফিনফিনে কাগজ বার করে হাঁটুর ওপর সন্তপর্ণে মেলে ধরল হোমস।
বলল, বলো তো ছাপগুলো কীসের?
কাগজভর্তি অনেকগুলো কিন্তুতকিমাকার পদচিহ্ন দেখলাম। বড়ো বড়ো নখ আছে পায়ে এবং নখ-টখ মিলিয়ে পুরো পায়ের ছাপ আইসক্রিম চামচের চেয়ে বড়ো নয়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now