বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ভয়ঙ্কর সেই রাতে
কাহিনী : বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
*************************************************
সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা কালো মেঘে ঢাকা ছিল। ঝিরঝিরে বাতাসের সঙ্গে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছিল। কৃষ্ণনগর থেকে বেথুয়াডহরী যাব বলে আগেই ঠিক ছিল। বিকেলের বাসে ওই দিনই রওনা হলাম বেথুয়াডহরীর দিকে। জানলার ধারেই জায়গা পেয়েছিলাম বলে, মেঘলা দিনের উড়ন্ত মেঘ দেখতে দেখতে বেশ আরামের সঙ্গেই চলেছি। ছিটেফোঁটা বৃষ্টি তখনো চলছে। বিষন্ন বিকেল বিদায় নিয়ে সন্ধে নেমে এল। আবছা অন্ধকারের মধ্যে যাত্রীবোঝাই বাস উড়ন্ত গতিতে চলেছে সোজা রাস্তা ধরে। আচমকা কোথা থেকে আছড়ে পড়ল ঝড় আর সেইসঙ্গে সিংহনাদের মতো গুরুগম্ভীর মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের ঝলকানি এবং মুষলধারে বৃষ্টি। হুড়মুড় করে সবাই বাসের জানলাগুলো বন্ধ করে দিল। আমিও আমার সিটের পাশের জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে, ঝড়বৃষ্টি আর মেঘের ডাক শুনতে শুনতে ভাবতে লাগলাম, বাস থেকে নামবার সময়েও যদি এইভাবে ঝড়বৃষ্টি চলে তাহলে অজানা, অচেনা জায়গায় গিয়ে মুশকিলে পড়ে যাব।
বাসের চলার গতি ঝড়ের দাপটে কমাতে বাধ্য হয়েছে ড্রাইভার। বাসে বসে বুঝতে পারছি, যে কোনো সময়েই বাস আটকে যেতে পারে রাস্তায়, কারণ এই ঝড়ে দু-চারটে গাছ উপড়ে গিয়ে রাস্তাও আটকে দিতে পারে। কিন্তু চওড়া রাস্তা বলেই, দু-একটা গাছ রাস্তায় পড়ে থাকা স্বত্তেও পাশ কাটিয়ে বাস বেশ মন্থর গতিতে চলতে লাগল। যাত্রীদের মধ্যে কেউ ঘুমোচ্ছে, গান গাইছে আর আমার পাশের সিটে মায়ের বুক জড়িয়ে একটা হ্যাংলা মতো ছেলে সমানে কেঁদে চলেছে।
"....বেথুয়াডহরীর মোড়ে কে নামবেন?" সিট থেকেই হাঁক দিল কন্ডাক্টর।
আমি ব্রিফকেসটা হাতে নিয়ে গেটের কাছে দাঁড়ালাম এবং একটু পরেই একমাত্র আমি একাই বাস থেকে নামলাম। বাস চলে যাবার পর অন্ধকারের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যে, জনমানবহীন জায়গায় একটা সজনে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একমাত্র জীবন্ত প্রাণী হলাম আমি। জায়গাটায় যেন শ্মশানের নীরবতা। সজনে গাছের ফাঁক দিয়ে অঝোরে বৃষ্টির জল আমাকে সম্পূর্ণভাবে ভিজিয়ে দিল আর আমি ভিজে জামাকাপড় পরে কাঁপতে শুরু করলাম। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলে তো চলবে না। বাজারের মধ্য দিয়ে গিয়ে রিকশাস্ট্যান্ড পেরিয়ে আমাকে মাস্টারমশাই শচীন দত্তের বাড়ি পৌঁছতে হবে। চিঠি দিয়ে আমার আসবার কথা আগে জানিয়েও ছিলাম। বাসটা যেদিকে এগিয়ে গেল, সেই দিকেই আমি এগিয়ে চললাম।
বিদ্যুতের চমক ছিটকে পড়েই পরপর দুটো বাজ পড়ল কাছাকাছি। কাঁপুনিটা আরও বেড়ে গেল, কিন্তু সাহস সঞ্চয় করে ব্রিফকেসটা মাথায় চাপিয়ে এক হাঁটু জলের মধ্যে কোনোরকমে এগিয়ে চললাম। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে আমারই চলার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো আওয়াজই শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা প্যাঁচার কর্কশ শব্দ সমস্ত পরিবেশটাকে কেমন যেন থমথমে করে দিল। আমার মনে হতে লাগলো আমার সঙ্গে আরও কেউ যেন হেঁটে চলেছে আমারই পাশাপাশি।
আমি এগিয়ে চললাম।
বিদ্যুতের ঝিলিক চমকে উঠল আবার। সেই ক্ষণস্থায়ী আলোর মধ্যে আমি দেখলাম অস্পষ্ট একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন আমারই প্রতীক্ষায়। সমস্ত দেহটা ভয়ে কেঁপে উঠল আমার এবং আমি সেই মূহুর্তে অনুভব করলাম যে, আমার জীবনটা যেন শেষ হয়ে আসছে। আমি আমার প্রিয়জনদের আর হয়তো দেখতে পাব না। কাঁপুনিটা সেই মূহুর্তে অসম্ভবভাবে বেড়ে গেল আর আমার বেশ মনে আছে আমি তখন ছোট ছেলের মতো 'মা' বলে ডেকে উঠে ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে এক হাঁটু জলের মধ্যে পড়ে গেলাম। সেই স্বরটা আজ আর আমার মনে নেই কিন্তু ওই অবস্থার মধ্যে শুনতে পেলাম কে যেন বলে উঠল, "ভয় নেই, আমি আপনার পাশেই আছি"।
তাড়াতাড়ি মনে সাহস এনে উঠে পড়ে বললাম, "কে কথা বললেন, আমার কাছে আসুন, আমি যে অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না"।
কোথাও এতটুকুও শব্দ নেই, আমি সেই নির্জন প্রান্তরে একা এবং অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে শুধু আমার হৃদপিন্ডের ধুকপুক আওয়াজ শুনতে পেলাম। ফস করে একটা আওয়াজ হয়ে, রংমশালের মতো আলো ছড়িয়ে একটু দূরেই বিদ্যুতের তার ছিটকে পড়ল রাস্তায়। আবার আমি দেখলাম সেই অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন আমারই অপেক্ষায়।
রাত কত জানি না। মাথার ওপর দিয়ে আবার একটা প্যাঁচা ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। সেই মূহুর্তে আবার শুনতে পেলাম, "ভয় নেই, সামনে এগিয়ে চলুন। এখানে বেশীক্ষণ দাঁড়াবেন না"।
দৈববাণীর মতো কথাগুলো কানে পৌঁছতেই, আমি যেন ফিরে পেলাম অসীম সাহস আর শক্তি। সেই মূহুর্তে সমস্ত ভয়, জড়তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলাম ক্ষিপ্র গতিতে। প্রতিটি মূহুর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম যে, আমার সামনে, পেছনে বা পাশে থেকে কে যেন অনুসরণ করে চলেছে। আমি চলেছি নির্ভয়ে, কিন্তু আবার আমায় থামতে হলো সেই দৈববাণীর আদেশে -
".....দাঁড়ান, আর এক পা'ও এগোবেন না। সামনেই আছে একটা খাল, অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। বাঁদিকে ঘুরলে একটা সাঁকো পাবেন, সেই সাঁকোর ওপর দিয়ে ওপারে চলে যান। আমিও যাচ্ছি"।
দম দেওয়া পুতুলের মতো আমি বাঁদিকে ঘুরেই হাতড়াতে হাতড়াতে একটা বাঁশের ওপর হাত পড়তেই বুঝলাম - এটাই সাঁকো এবং কোনোরকমে সন্তর্পণে নড়বড়ে সেই বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলে গেলাম ওপারে। একটা চাপা গর্জন কোথা থেকে ভেসে এল এবং গর্জনটা একটু পরেই কান্নায় পরিণত হলো। আমি এবার ভয় পেয়ে সেইখানেই দাঁড়িয়ে কাঁপতে শুরু করলাম। কিসের গর্জন ছিল ওটা? এই রাতে কে-ই বা কাঁদছে ওই অন্ধকার খালের ধারে?
এবার ধমকের সুরে আদেশ হলো, "এখুনি সামনের দিকে চলে যান, নইলে আমার সাধ্য নেই যে, আপনাকে বাঁচাবো। "
নিমেষে ছুটে চললাম সামনের দিকে এবং কিছুদূর গিয়ে আর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে, ক্লান্ত দেহ নিয়ে সেইখানেই বসে পড়লাম। বৃষ্টি আর ঝড়ের দাপট আর নেই। সর্বাঙ্গে কাঁপুনিটা আরও বেড়েছে। সমস্ত শরীরটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। বসে পড়েছি বলেই হয়তো উঠতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু যেতে তো আমাকে হবেই। সমস্ত ক্লান্তি আর যন্ত্রণা ভুলে আমি উঠে দাঁড়ালাম আবার। জানি না আরও কত পথ আমায় হাঁটতে হবে। কিভাবেই বা যাবো। বিদ্যুতের সেই ঝলকানি আলোও নেই যে, খুঁজে পাবো সেই ছায়ামূর্তি বন্ধুকে।
আমার খুব কাছ থেকেই স্পষ্ট শুনলাম, "ভয় নেই, আমি কাছেই আছি। এই মাঠ পার করে দিয়েই আমি ফিরব। আমারও ফেরার সময় হয়ে এসেছে। সামনের দিকে আরও কিছুটা গেলেই শহরের রাস্তা। এই পথ দিয়ে কেউ যাওয়াআসা করে না আর একবার যদি কেউ ভুল করেও এ পথে এসে পড়ে, তার আর ফেরা হয় না। শুধু একটা অনুরোধ রইল, কাকু'কে বলবেন, শানু সেদিন কোনো দোষ করেনি,শানু ভালো আছে"।
ছায়ামূর্তি কথা শেষ করল।
......কিভাবে সেদিন শহরের রাস্তায় পৌঁছেছিলাম আজ আর মনে নেই। মাস্টারমশাই অর্থাৎ শচীন দত্ত মহাশয়ের মুখে শুনেছিলাম, একজন দোকানদার আমার জ্ঞান ফিরিয়ে এনে আমার মুখে মাস্টারমশাইয়ের নাম শুনে পৌঁছে দিয়েছিল তাঁর বাড়িতে।
মাস্টারমশাই আমার মুখে সবকিছু শুনে বলেছিলেন, সেই বাসের কন্ডাক্টর ভুল করে যে জায়গাটায় নামিয়ে দিয়েছিল সেটা বাজার থেকে অনেক দূরে এবং ওদিকে কোনো লোকবসতি নেই। আসলে ওই জায়গাটার চারপাশে ভাগাড় এবং স্থানীয় শ্মশান। পরাণ মন্ডলের খাল এখানকার সবাই চেনে এবং নামটা শুনে সকলেই আঁতকে ওঠে। জীবিত অবস্থায় কেউ ওই খাল পেরিয়ে আসতে পারেনি। আপনার ভাগ্য ভালো আপনি বেঁচে গেলেন"।
আমি বললাম, "সেই অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি তাই হয়তো আমাকে খালে নামতে নিষেধ করে একটা বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে যেতে বলেছিল"।
মাস্টারমশাই বললেন, "সেই ছায়ামূর্তিকে আপনি দেখেছিলেন?"
আমি বললাম, "হ্যাঁ। মাঠ পেরিয়ে শহরের রাস্তায় পৌঁছাবার আগে সে বলেছিল, 'শানু সেদিন কোনো দোষ করেনি, শানু ভালো আছে' এই কথাটা যেন আপনাকে গিয়ে জানিয়ে দিই"।
এ'কথায় মাস্টারমশাই চিৎকার করে ককিয়ে কেঁদে উঠে বললেন, "শানু আপনাকে এই কথা বলেছে? " বলেই আরও জোরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আমি শানুকে সেদিন মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। যাবার সময় ও বলেছিল, 'কাকু, আমি কোনো দোষ করিনি, ওরা মিথ্যা করে লাগিয়েছে "।
আমি অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে মাস্টারমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন বোবা হয়ে গেলাম।
মাস্টারমশাই বললেন, "শানু আমার দাদার ছেলে। ও যখন খুব ছোট ছিল তখন আমার দাদা মারা যায়। সেই থেকে শানুকে আমি নিজের ছেলের মতোই মানুষ করেছি। সঙ্গদোষে ও মাঝখানে খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। একদিন ওরই অন্তরঙ্গ দুজন বন্ধু এসে আমার কাছে ওর নামে বেশকিছু অভিযোগ করে। আমি আর কোনোকিছু বিবেচনা না করে প্রকাশ্য রাস্তায় শানুকে দু-চার ঘা চড় থাপ্পড় মেরে বলেছিলাম, 'আর বাড়ি ঢুকবি না'। শানু আমার কথা শুনেছিল, শানু আর বাড়ি ফেরেনি। দু-দিন কোনো খোঁজ না পেয়ে পাগলের মতো চারদিকে খোঁজাখুঁজি করতে করতে ওকে যখন পেলাম, তখন ওর শরীরের অনেকটা অংশই শকুনে খেয়ে গেছে। একটা গাছের ডালের ফাঁকে ওর দেহটা এমনভাবে আটকে ছিল যে, মনে হয়েছিল কেউ যেন ওকে জোর করে ওখানে আটকে রেখেছে। গলায় পাঁচ আঙুলের বীভৎস দাগ। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছিল শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু কিন্তু আশ্চর্য এটাই, খুনীর হাতের কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্টই পাওয়া যায়নি। বিশ্বাস হয় না তবুও ঘটনা শোনা যায়। শ্মশানের কাছে ওই খালটাকে এখানকার লোক খুব ভয় পায়। শুধু শানু'ই নয়, অনেকেরই রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে ওখানে। "
মাস্টারমশাই তাঁর কাহিনী শেষ করলেন।
ইলেকট্রিক আলোর মধ্যে নিরাপদ জায়গায় বসেও আমার শরীরটা আরেকবার কেঁপে উঠল। মনে পড়ল, বাঁশের সাঁকো দিয়ে খাল পার হবার সময় খানিক দূর থেকে ভেসে আসা সেই অমানুষিক গর্জন আর কান্না'টা। শানুর অশরীরী আত্মা যদি আমাকে না বাঁচাত তাহলে এতক্ষণে আমার যে কি হতো, এই ভেবেও আমি বারবার শিউরে উঠতে লাগলাম।
( সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now