বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"শুভ নামটা খুব কমন, তাই না?"
পুলিশের দারোগা চোখে চোখ রেখে
জানতে চাইলেন। আমি তখন তার
শার্টের কলারের দিকে তাকিয়ে
আছি। কলার দেখে আন্দাজ করা
যাচ্ছে, এ সপ্তাহে শার্টটা আয়রন করা
হয়নি। তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন, "শুভ
নামটা খুব কমন, তাই না?" আমি ঘাড়
নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম নামটা কমন।
দারোগার হাত দ্রুত চলে গেল কাগজের
ওপর দিয়ে। যেন কোন ব্যস্ত প্রেমিক
তার প্রেমিকার উদ্দেশ্যে চিঠি
লিখছে। হাতে সময় খুব কম। প্রেমিকার
বাবা অনেক রাগী। দ্রুত পৌঁছাতে
হবে ঠিকানায়। নইলে ওলট পালট হয়ে
যাবে সাজানো ভালবাসার
অ্যাসাইনমেন্টের পৃষ্টাগুলো।
হাতের কাজ শেষ হলে দারোগা
হাবিলদারকে বললেন, "এই
ছোকরাটাকে নিয়ে গারদে ভরে
রাখো।"
আমি হাবিলদারের দিকে তাকালাম।
শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার
দিকে। প্রভুহীন রাস্তার কুকুরগুলো
অচেনা কোন কুকুরকে দেখলে ঠিক
যেরকম করে তাকিয়ে থাকে সেরকম।
মাথার ওপর পুরনো ফ্যান ঘট ঘট শব্দ করে
ঘুরছে। মনে হচ্ছে কাছে কোথাও
পলিথিন উড়িয়ে হেলিকপ্টার নামছে।
জরাজীর্ণ ফাইলগুলো থেকে
মায়াধরা এক রকম গন্ধের তীব্রতা এই
অদ্ভুত পরিবেশে মাদকের মতো কাজ
করে। এই মাদকতা এখন আমার চারদিকে।
আমি উন্মত্তের মতো হাবিলদারের
সঙ্গে হাঁটছি।
কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে
কখনো প্রবেশ করা হয়নি। আজই প্রথম।
মরচে পড়া শিক, পুরাতন দেয়ালে
সুড়কির দাগ, আঁশটে গন্ধ, ভ্যাপসা গরম সবই
যেন আমায় উপহাস করছে। অতিথির
আগমনে পিশাচের কুটির যেমন
নিস্তব্ধতা ধরে রেখে খিলখিল করে
হাসে, অনেকটা সেই কল্পনার হাসির
ন্যায়। জানালাবিহীন ঘরের এক
কোণায় পিতলের কলসি রাখা।
ঢাকনার ওপরে উল্টো হয়ে আছে
কাঁসার গ্লাস। পাশে বিছানা দিয়ে
বালিশ মোড়ানো।
শরীরটা বড্ড ক্লান্ত। এক গ্লাস পানি
গিলতে গিয়ে বমি চলে আসলো৷ শত
বছরের পুরাতন গ্লাসে কোন এক বৃদ্ধের
নিঃশ্বাসের গন্ধ নাকে ভাসছিলো
নাকি? ভাবলাম। এরপর ক্লান্ত দেহটা
এলিয়ে দিলাম ময়লার আবরণে শক্ত হয়ে
যাওয়া বিছানাটিতে। আজ কি কোন
ভয়ংকর স্বপ্ন দেখবো? সম্ভবত না।
কোন স্বপ্নই দেখিনি। মা বলতেন, দুপুরে
ঘুমালে স্বপ্ন দেখা যায়। তার কথা
বহুদিন পর আজ মিথ্যে প্রমাণিত হলো।
মায়ের কথাগুলো সবই বিজ্ঞানের
থিওরির মতো হয়ে যাচ্ছে। কালের
পরিক্রমায় হঠাৎ করে বদলে যায়। সেই
খালি জায়গা দখল করে নেয় নতুন
কোনো সম্ভাবনাময় থিওরি। মা
বলতেন, "মিথ্যা কখনো তোর ওপর দখল
নিতে পারবে না।"
কিন্তু শুধু মিথ্যা নয়। পুরো একটা খুনের
অভিযোগ আমার মাথার ওপর চেপে
বসেছে। বেদখল হয়ে যাওয়া জমির
মালিকের মতো শূন্য আমার চোখের
দৃষ্টি। আমি আকাশে বড় বড় হাতি উড়ে
যেতে দেখি। সেই হাতিদের কোন
পাখা থাকে না৷
কোর্টে আমার মামলাটা আয়োজন
করেই ঝুলছে। ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া
শুকনো ডালের মতো অপাংক্তেয় হয়ে।
কখনো উন্নতি, কখনো অবনতি। আমার
মাঝবয়সী উকিল যখন রাষ্ট্রপক্ষের
প্রবীণ উকিলকে কথার বাঁকে ফেলে
দেয় তখন আমার প্রিয়জনেরা মুচকি
মুচকি হাসে। আমার উকিলের মুখেও
বিজয়ী ভাব ফুটে উঠে। শুধু আমিই
হাসতে পারি না। কারণ, ভবিষ্যতটা
তো আমি চোখের সামনে দেখতেই
পাচ্ছি। সেখানে কোন আনন্দের
সংবাদ নেই।
আমার ফাঁসি রাত বারোটায়। জেলার
সাহেব সন্ধ্যেবেলা দেখা করে
গেলেন। আমি ঘুমাচ্ছিলাম। কাঁসার
গ্লাস দিয়ে পিতলের কলসিতে টুং
টাং শব্দ করে তিনি আমার ঘুম
ভাঙালেন। দুপুরের ঘুম সন্ধ্যাবেলা
ভাঙলে অন্যরকম একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
চারপাশের সাদাকালো জীবনকে তখন
রঙিন মনে হয়। অবসাদগ্রস্তের ন্যায়
ঘাপটি মেরে বসে থাকা অথবা ঘুমঘুমে
উদাস দৃষ্টি। জেলার সাহেব আমার
ডান কাঁধে হাত রাখলেন। আমি আমার
সামান্য শ্রবণশক্তি দিয়ে
ভালোভাবেই তার দীর্ঘশ্বাস অনুভব
করতে পারলাম। তিনি উঠে
দাঁড়ালেন। আমার কোনো শেষ চাওয়া
আছে কি না জানতে চাইলেন। আমি
বললাম, "আপনি কি আমাকে জামালপুর
নিয়ে যেতে পারবেন?"
জেলার সাহেব মাথা নাড়ালেন।
তিনি পারবেন না। "আমার আর কোন
চাওয়া নেই", মুচকি হেসে বিদায়
দিলাম তাকে। আচ্ছা, মা-বাবার কবর
জামালপুর না হয়ে জেলখানার পাশের
জমিতে হলে কি আমি এখন সেখানে
যেতে পারতাম?
সবার মন খারাপ। আমার রুমের সামনের
দু'জন গার্ড, তওবা পড়াতে আসা হুজুর,
জেলার সাহেব, মাঠের মাঝখানে
মাঠি ফুঁড়ে উঠে আসা কাঠগোলাপের
গাছ, অবিরাম চলতে থাকা রঙীন
পাঙ্খা, ৩২ নাম্বার রুমের দেয়াল,
বাইরের মরচে ধরা টিনের নম্বরপ্লেট।
সবার। শুধু আমার মনে দারুণ প্রশান্তি।
মুক্তির স্বাদ নেওয়া উদভ্রান্তের মতো
দোদুল্যমান মন।
খোলা পায়ে ঠান্ডা মেঝেতে
আসামীর পোশাক পরে আমি এগিয়ে
যাচ্ছি মঞ্চের দিকে। মৃত্যুর মঞ্চটা
কেমন? সেটা আমি জানি না। মৃত্যুর রঙ
কেমন? সেটাও আমি জানি না। আমি
মৃত্যু সম্বন্ধে অজ্ঞাত, সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।
পথের দুরত্ব বেশি নয়। আপাত পাপহীন
দেহ বয়ে নিয়ে যেতে কষ্টও লাগেনি
তেমন। শুধু শরীরটা বারবার কেঁপে
উঠেছে। কালো মুখোশ পরিহিত
আমাকে কেমন দেখায়? আমি তো
পৃথিবীকে অন্ধকার দেখি।
হাত, পা শক্ত করে বাঁধা। গলায়
যমসুতোর এক প্রান্ত, যার অন্য প্রান্ত
হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যম স্বয়ং।
কন্ঠনালীতে তীব্র চাপ অনুভব করলাম।
ডুবে যাওয়া অভিযাত্রীর খড়কুটো ধরে
বেঁচে থাকার আকাঙ্খার মতোই আমার
আকাঙ্খা।
"গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহুর্তের
ভিক্ষা মাগে".. আমি গলা শক্ত করে
রইলাম। এক মিনিট কেটে গেলো।
সীমা ছাড়িয়ে গেলে আটকে রাখা
কষ্টকর। গলা ছেড়ে দিলাম। দুই মিনিট
পার হয়ে গেল। শেষমেশ তিন মিনিটও।
কানটা আমার তখনও সজাগ। কেউ একজন
রুমে ঢুকে চিৎকার করে বলছে,
"আসামীর ফাঁসি কি হয়ে গেছে?
জেলার সাহেব আদেশ তো রদ করা
হয়েছে। আপনি আমার আদেশের
অপেক্ষা কেন করলেন না? হোয়াই
ডিড ইউ ডু দ্যাট? জল্লাদ নামাও
আসামীকে। খুব দ্রুত, ওকে যে কোনো মূল্যে বাচাতে হবে। দ্রুত করো দ্রুত..........।
লেখকঃ- অলিভার কুইন (শুভ)।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now