বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শরত্কাল l আকাশে বাতাসে দেবীর আহ্বানের সূচনা l এমন একটি সকালে ধ্যান ভাঙ্গলো ষষ্ঠী আচার্জির l মুখ প্রক্ষালন করে স্নান সেরে এলেন কুলীন পুকুর থেকে l সবে দাওয়ায় বসে আহ্নিকের যোগাড় করতে যাবেন এমন সময় হরিধ্বনি কানে এলো l ‘এই সাত সকালে খাবার যোগাড় করলি মা রে l’ সামনে তারা মায়ের মন্দির, কাল ভৈরবের মন্দির, সেই দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন আচার্জি l ‘ওরে ভুলো, যা তো বাবা দেখে আয় কে এলো’ অমনি পোষা কুকুর ভুলু ছুটল ন্যাজ উঁচিয়ে l সধবা মানুষ, পায়ে আলতা, মুখে কনে চন্দন, লাল চেলি, বয়সও মনে হলো অল্প – একবার দেখে নেন দূর থেকেই আচার্জি l আহা রে কার গেল আজকের দিনে l আর তারপর মেঘ নিনাদে হাঁক ছাড়লেন, ‘ওরে কে কথায় আছিস, আয়, কাঠ-টাঠ যোগাড় কর, ওরে বাদল, হারু, কানাই রে l’
এই মাত্র বলেছেন আর অমনি একটা বিশাল শোরগোল উঠলো ওই চোপর খাটের দিক থেকেই l মেয়ে মানুষের কন্ঠ l ‘ ওগো আমি মরি নাই গো, আমাকে ছেড়ে যেও না, যেও না, দয়া কর গো l’ চার-পাঁচ জন যারা খাট বয়ে এনেছিল, তারা চম্পট দিয়েছে ইতিমধ্যেই l ঝটিতি এগিয়ে যান ষষ্ঠী আচার্জি, দেখেন, যা ভেবেছেন তাই, সদ্য মড়া স্ত্রীলোক উঠে বসেছে চোপর খাটে আর দু হাত দিয়ে ফুলের মালা সরাতে চাইছে l তার গন্ড বেয়ে অশ্রু, স্বেদ্পুর্ণ কপালে চন্দন গলে পড়ছে, একমাথা সিঁদুর, কজ্জ্বল মলিন দুই চোখ l ষষ্ঠী আচার্জিকে দেখেই পায়ে পড়ে যায় সেই মেয়ে l ‘আমাকে বাঁচাও, আমি মরি নি গো, কেন এরা আমাকে নিয়ে এলো, আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও l’ চকিতে বহু বচ্ছর আগের ঘটনা মনে পড়ল আচার্জ্যির, তখন তাঁর পিতৃদেব জীবিত, এমন একজন মানুষ, সেও মরে নি, কেউ তাকে ঘরে তুলল না, পুরুষ মানুষ, বাবার সাথে সে থেকে গিয়েছিল আজীবন, পান টা ছিলিম টা গুছিয়ে দিত, রান্না করত শেষে, বাবার সাগরেদ হয়ে l কেন এমন হয়, ভাবছেন আচার্জ্য়ী l মেয়ে বলল, কিছু বল, আমাকে পাঠিয়ে দাও – আর ষষ্ঠী আচার্জি তাঁর মধ্যে দেখলেন, সাক্ষাত শক্তিরূপা মহামায়াকে l
তিনি বলতে লাগলেন –
ওম শ্রীম গ্রীম গ্লীম স ‘উম গ্ল ‘উম
প্রাথ্যান্গিরে মহা মায়ে
থেভ্য় থেভ্য় মম ভআন্জিথাম কুরু কুরু
মাম রক্ষা রক্ষা প্রাথ্যান্গিরে স্বাহা ..
ওম তারে তুত্তরে তুরে স্বাহা ll
মেয়েটি হা করে তাকিয়ে রইলো l আচার্জ্য়ী জিজ্ঞাসা করলেন – ‘তোমার নাম?’
‘শ্যামা l’
‘বাহ বেশ নাম, বেশ l’
‘এখন ওই কুলীন পুকুর থেকে স্নান করে আসবে, যা যা পরে আছ, পরিত্যাগ করবে l আমি তোমাকে মায়ের কাপড় চোপর এনে দিচ্ছি l তোমার এই দেহের কাজ এখনো বাকি l তবে তুমি ঘরে আর ফিরতে পারবে না l ওরা তোমাকে নেবে না আর l এমন আগেও হয়েছে l আজ থেকে স্মশ্মান তোমার ঘর বাড়ি শ্যামা l’
মেয়েটি কেঁদে পড়ল l ‘এ কোন শাপে আমার এমন হলো ঠাকুর? আমার অমন স্বামী, আমাকে কত ভালবাসতেন, এক কথায় ফেলে পালিয়ে গেলেন ?’
ষষ্ঠী আচার্জি এতক্ষণে, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন –
‘হা হা হা হা হা …….. ওগো কন্যে, এই পৃথিবী …. আজ মলে কাল দুদিন হবে, সেই প্রেয়সী দেবে ছড়া অমঙ্গল ঘটিবে বলে l’
‘ওরে ভাব না তুই দেহহীনা, তোর্ মন নাই, বুদ্ধি নাই, অহং নাই, তুই জন্ম মৃত্যু রহিত, তুই শুধুই এক চেতন শক্তি, হ্লাদিনী শক্তি তুই, তুই শিবলিঙ্গের মতই আকারহীন এক পরমা শক্তি’ হা হা হা হা হা l’
শ্যামা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ষষ্ঠীর দিকে, তারপর চলে যায় ধীরে ধীরে অবসন্ন দেহে, কুলীন পুকুরের দিকে l
অবসন্ন দেহ ও মনের জন্য শ্যামার চিকিত্সার দরকার l ষষ্ঠী আচার্জি আয়ুর্বেদ জানেন l তত্খনাথ পাঠিয়ে দেন কানাই কে লতা গুল্মের খোঁজে, কানাই এই সব কাজে আচার্জ্য়িকে সাহায্য করে থাকে l নিয়ে এলে সেই সব খল এ মেড়ে মকরধ্বজ ও মধুর সাথে পরম যত্নে খাওয়াতে থাকেন শ্যামাকে l কিসে তার এমন হলো শ্যামা সে সব খবর দিতে পারেনা l বাড়ির লোকজন যাঁরা এসেছিল, বেমালুম হাওয়া l ষ্মশ্মানে নেওয়া মড়া আবার ঘরে তোলে নাকি কেউ l
শ্যামার ওই স্থানে প্রথম রাত ভয়ংকর ভাবে কাটে l সারারাত হরিধ্বনি, আসা যাওয়া, শিবাকুল এর চিত্কার, প্যাঁচার ডাক আর ষষ্ঠী আচার্জির নরমুন্ড সাধনা l যেন এক অলৌকিক প্রেত পুরিতে পৌঁছে গেছে শ্যামা l অথচ পালাবার পথ কি? কি নিবিড় বন জঙ্গল চারিদিকে, আর ষষ্ঠী বলেই রেখেছেন পালাতে গিয়ে ধরা পড়লে তার শাস্তি প্রচুর l লোকটাকে ভারী খারাপ লেগেছে শ্যামার তখন l এ ভাবে একজন মানুষ কে আটকে রাখা যায় নাকি …. শরীরে বল নেই, মনেও শক্তি নেই একেবারে, অপারগ তাই … শ্যামা তাঁর বাক্যই মেনে চলে l কানাই, হরি সবাই বোঝায় – মা থায়রেন, বাবা জি বড় ভালো মানুষ গো, তোমারে অনেক কিছু শিখাইবেন দেইখ্য l তাতে মন মানেনা শ্যামার l
শুয়ে শুয়ে চোখের জল ফেলে শ্যামা, মাঝে মাঝে ভাবনার জাল ছিঁড়ে যায় l আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে উদাত্ত গলায় ভেসে আসে ষষ্ঠী আচার্জ্যির স্তোত্র পাঠ –
না মে দ্ভেশা রাগাউ না মে লোভ মোহাউ
না মে ভয় মদ নৈব মাত্সর্য ভাবাহা
না ধর্ম না চার্থ না কামা না মোক্ষহা
চিদানন্দ রুপাহ শিভোহাম শিভোহাম ll
শিভোহাম, বম ভোলে এই সব ডক্কা নিনাদ্কারী শব্দে, আর অগ্নির লেলিহান যজ্ঞ শিখায় আকাশ বাতাস ভরে যায়, কখন কোন ফাঁকে চোখ বুজে আসে শ্যামার আর পুবের আকাশে লাল রং ধরে l তখন সব অঘোরী ঘরে ফেরে, শান্তি বিরাজ করে ষ্মশ্মান ভূমে l
ধীরে ধীরে শ্যামার মধ্যে পরিবর্তন আসছে l শ্যামা পরিষ্কার বুঝতে পারে, ছয় মাস আগে চোপর খাটে যে মেয়েটি ষ্মশ্মানে এসে জিন্দা হয়ে উঠেছিল, সে আর এখন তার মধ্যে নেই l এ কেমন শ্যমা ? পুকুরের স্থির জলে নিজেকে দেখে চমকে ওঠে সে l লাল সিঁদুর গোলা টিপ তার কপাল জুড়ে, আচার্জ্যির নির্দেশ, তৃতীয় নয়ন কে সিঁদুর দিয়ে পরিমার্জিত ও শক্তিশালী করতে হবে l লাল পাড় খেরো শাড়ি তার অঙ্গে, মায়ের প্রসাদী শাড়ি, যে যেমন দেয় l মাথার চুল চূড়া করে বাঁধা আর ঠোঁটে অমলিন হাসি l কখনো কখনো তার রূপ দেখে কোনো মিচকে অঘোরী ষষ্ঠী আচার্জিকে ঠাট্টা করে বলে – ‘বাবাজি বেশ জুটিয়েছ তো ভৈরবী টিকে, তা কোথায় পেলে?’
গম্ভীর হয়ে যান ষষ্ঠী আচার্জী, জলদ মন্দ্র কন্ঠস্বরে বলেন – ‘উড়তা হুয়া পরিন্দা, আ টপকা, অভি কাম যো বাকি হ্যায় l’ প্রশ্ন করে শ্যামা – ‘হ্যা গো, ওরা অমন কয় ক্যান? আমার খারাপ লাগে l ওরা যেন কেমন, আপনার মতন তো নয় l’
হা হা হা হা – হাসেন অঘোরী ষষ্ঠী, যেন এক বিরাট মহীরুহর ডাল পালায় হাওয়া খেলে যায় চকিতে l বাবাজি গান ধরেন …
‘ওরে মেয়ে, তুই কি বুঝবি, জগতের লীলা,
এরা কেউ বা ভন্ড, কেউ শিবের চেলা l
এরা ঘোরে মাঠে ঘাটে, ছড়া টড়া কাটে,
এদের বিবেক দংশে নে রে, এরা যে অবলা l
যদি সত্যি অঘোরী হয়, জানিবে নিশ্চয়,
ছোট ছোট কথায়, দেবে না রে কান,
এ সুধু জানিবে, একদিন মরিবে,
ধরা সুখ মিছে, সব খান খান l
ওরা নরমুন্ড লয়ে খেলে গেন্ডুয়া,
আসে যায় ভবের খেলায় এমন,
ওদের কুলোকুন্ডলিনি জাগে,
আর সবি মার ভোগে,
কিছু না থাকিবে, দিবা অবসানে ll
তবু প্রশ্ন হাজার একটা প্রশ্ন, শ্যামার মনে, তিনি করেন, আর বাবাজি উত্তর দেন l বোঝেন ‘এ মেয়ে তো মেয়ে নয়…………..’
মুখে বলেন না কিছুই l শ্যামা মাঝে মাঝেই তার প্রশ্নের ঝাঁপি নিয়ে হাজির হয় তাঁর কাছে l ‘আচ্ছা আপনি শব সাধনা যেদিন প্রথম করলেন, ভয় লাগে নি l আচ্ছা, আপনি ওই অতগুলো পেরেকের উপর শুয়া থাকেন কি করে l আচ্ছা এই যে আপনি বিবস্ত্র নারীর উপর বসে সাধনা করেছেন শুনি, আপনি কি করে অমন পারলেন l আচ্ছা আপনি গাছদের সাথে কথা বলেন কি করে আমাকে শেখাবেন l ষষ্ঠী আচার্জি কিছুটা অপত্য স্নেহে দেখেন শ্যামাকে l বুঝিয়ে বলেন যথাসম্ভব l শ্যামার জ্ঞান্চক্খুতে টোকা মারেন l বলেন ‘নাহ, এখনো হয়নি সময়, এখনো তুই কাঁচা আছিস l ভালো করে সাধনা করবি যেমনটি বলেছি l’ চোখ বুঝে বসে থাকে শ্যামা আর তার মনে চলে যায়, অনেক দুরে, তার স্বামীর ভিটেতে … জানলার গরাদ ধরে সে অপেক্ষা করে স্বামীর ফেরার, আর ধবলী গাই ডেকে ওঠে গোয়ালে, মা মা …. সম্বিত ফেরে শ্যামার … তাড়াতাড়ি ছোটে, আচার্জ্যির রান্না বসাতে l
এর মধ্যে ঘটল এক ঘটনা – দুপুরের দিকে কারা বয়ে নিয়ে এলো একজনকে l আর তাকে দেখেই আছাড়ি পিছারী গেল শ্যামা l তাঁর স্বামী l এতদিন শ্মশানে থেকেও তার ষ্মশ্মান বৈরাগ্য এলো না l অবাক হন একটু ষষ্ঠী আচার্জী l
তারপর সব চুপচাপ l শান্তিতে কাজকম্ম হলো l সবাই ঘরে গেলে শ্যামা জিজ্ঞাসা করলো –
‘তা হা গো ইনি যে চললেন, এখন যাবেন কোথায় ?’
‘কেন গো মেয়ে ওনার ঘরে l’
‘সে কি এই তো ঘর ছেড়ে এলেন. যে ঘরে আমাকে তোলেন নি আর উনি, সেই ঘর ই তো ‘
‘সে তো আসল ঘর নয় রে, এখন উনি দেহ বোধ ছেড়ে, নিজের সত্ত্বায় নিজে বিলীন হলেন l’
‘আর এই কথা আমরা অঘোরীরা জেনেই বসে থাকি, তাই আমাদের দেহ বোধ নাই, ন্যাংটা হয়ে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াই, ছাই মাখি, ছাই আমাদের আস্তরণ, আর কুলকুন্ডলিনি জাগাবার আয়োজন করি l’
এবারে বুঝলুম গো ঠাকুর, এই বারেই আমার শিক্ষে সম্পূর্ণ হলো l
‘যাহ, এখন থেকে তুই ভৈরবী হলি, আমার মুক্তি l’……… হা হা হা হা
ষ্মশ্মানএর বুক বিদীর্ণ করে অট্টহাস্য করে উঠলেন ষষ্ঠী আচার্জী l
আর ভৈরবী চললেন পঞ্চমুন্ডির আসনের দিকে l
সন্ধ্যে হয়ে আসছে, পঞ্চমুন্ডির আসন জেগে উঠেছে, সময় হয়েছে নব অভিষেকের l
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now