বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
ভিতর ও বাহির
"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MELiSA (০ পয়েন্ট)
X
আমাদের মন সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ বাহিরের_অন্য ভাগ ভিতরের।
মনের যেদিকটা বাহিরের তাহা ভদ্র, তাহা সামাজিক সভ্য।
ভিতরের মনটা কিন্তু সবসময় সভ্য ও সামাজিক নয়_ তাহার চালচলন চিন্তাপ্রণালী বিচিত্র।
বাহিরের মনের কার্যকলাপ দেখিয়া ভিতরের মন কখনোও হাসে, কখনোও বা কাঁদে এবং ক্বচিৎ সায় দেয়। দুইভাগের কলহও নিত্যনৈমিত্তিক।
রামকিশোরবাবুর ভিতরের মনটা বহুকালবধি মৃতপ্রায়। বাহিরের মনের অত্যাচারে সেটাকে জরজর করিয়া ফেলিয়াছল।
রামকিশোরবাবু উকিল। খুনিকে বাঁচাইবার জন্য মিথ্যা সাক্ষী সৃষ্টি করিবার প্রয়াস, বড়লোক জমিদারের হইয়া গরিব প্রজার সর্বনাশসাধন, জাল উইল সৃষ্টির পরামর্শদান ইত্যাদি সর্বপ্রকার কার্যেই তিনি বাহিরের ব্যবহারিক মনটার সাহায্য লইয়াছিলেন। ভিতরের মনটা প্রথম প্রথম তীব্র প্রতিবাদ করিয়া অনেক অনর্থ সৃষ্টি করিয়াছিল_ আজকাল আর সে কিছু করে না।
সেদিন সকালে রামকিশোরবাবু তাঁহার কেশবিরল মস্তকে হাত বুলাইতে বুলাইতে বাগানে ভ্রমণ করিতেছিলেন।
একজন বিধবার সম্পত্তিঘটিত একটা মামলা তাঁহাকে কিছুকাল যাবৎ বিব্রত করিতেছে। আজ কেসটা কোর্টে উঠিবে_ সে জন্য তিনি একটু উদ্বিগ্ন অন্যমনস্ক আছেন।
এমন সময় আর একজন প্রৌরগোছের ভদ্রলোক আসিয়া নমস্কার করিয়া বলিলেন যে, তিনি কোনো বিষয়ের পরামর্শ লইতে চাহেন।
রামকিশোরবাবু ভদ্রলোককে চিনিতেন না। সুতরাং অসংকোচে বলিলেন, 'আইন-সংক্রান্ত কোনো পরামর্শ দিতে হলে 'ফি' নিয়ে থাকি, তা জানেন তো?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ। _ কত দিতে হবে আপনাকে?'
'বত্রিশ টাকা!'
'আচ্ছা, বেশ_।'
উভয়ে বৈঠকখানায় গিয়া বসিলেন।
আগন্তুক বলিলেন, 'আমার একজন আত্মীয় আছেন_ তাঁর একমাত্র ছেলের বিবাহ হয়েছে আজ প্রায় দশ বৎসর। সন্তানাদি তারও কিছুও হয়নি। সম্ভাবনাও কম।'
ডাক্তার দেখিয়েছিলেন?'
'হ্যাঁ, তাঁদেরও মত যে ছেলেপিলে হওয়া শক্ত।'
'ছেলেটি বেশ স্বাস্থবান তো?'
'হ্যাঁ, ছেলের কোনো রোগ নেই।'
'আমার কাছে কোন বিষয়ে পরামর্শ চান', বলিয়া রামকিশোরবাবু একটি নস্যদানি হইতে এক টিপ নস্য গ্রহণ করিলেন।
'এ সম্বন্ধে আপনার কাছে শুধন এইটুকুই জানতে আশা যে, যদি বংশ লোপই পায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সম্পত্তিটা কারা পাবে?'
নস্যের টিপটা নাসারন্ধ্র লইয়া রামকিশোরবাবু বলিলেন,' ছেলে যখন স্বাস্থবান তখন সে আবার স্বচ্ছন্দে বিয়ে করতে পারে। হিন্দু ল' অনুসারে তাতে কোনো বাধা নেই।'
'তা তো নেই! কিন্তু আইনের বাধা না থাকিলেও সবসময় কি সব জিনিস করা সম্ভব?'
রামকিশোরবাবু একটু হাসিয়া বলিলেন,' সেন্টিমেন্ট অনুসারে চললে কি আর দুনিয়ায় চলা যায় মশাই! এইসব বাজে সেন্টিমেন্ট নিয়েই তো আমরা ডুবতে বসেছি!'
রামকিশোরবাবু সেন্টিমেন্টের অপকারিতা সম্বন্ধে নাতিদীর্ঘ একটি বক্তৃতা দিলেন। বাহিরের মন তাঁহার যুক্তি ও কথা জোগাইল।
আগন্তুক তখন বলিলেন , 'ধরুন যদি ওরা ছেলের বিয়ে আর না দেন তাহলে সম্পত্তি কারা পাবে?'
আইন অনুযায়ী যাহারা যাহারা উত্তরাধিকারী হইতে পারে_ রামকিশোরবাবু তাহা গড়গড় করিয়া বলিয়া গেলেন।
পরিশেষে তাঁহার স্বকীয় মতটা পুনরায় তিনি বলিতে ছাড়িলেন না: 'ছেলের আবার বিয়ে দিন মশাই বাঁজা বউ নিয়ে সংসারে সুখ হয় কি? ছেলেপিলে না থাকলে সংসার তো শ্মশান! আমি মশাই যেটা উচিত মনে করছি তাই আপনাকে বললাম_আপনার সেন্টিমেন্টে যদি আঘাত লেগে থাকে মাপ করবেন।'
আগন্তুক বলিলেন.' না না_ কিছুমাত্র না। আপনি স্পষ্টবাদী লোক এবং মক্কেলের ঠিক সত্যিকার হৈতিষী_ এইসব শুনেছি বলেই তো আপনার কাছে আসা।'
বত্রিশ টাকা ফি দিয়া ভদ্রলোক বিদায় লইলেন।
চার পাঁচ দিন পরে একদিন একটি গাড়ি আসিয়া রামকিশোরবাবুর বাড়ির সম্মুখে দাঁড়াইল। গাড়ি হইতে একটি অল্পবয়সী স্ত্রীলোক নামিয়া ভিতরে চলিয়া গেলেন।
রামকিশোরবাবু বিপত্নীক। বাড়িতে ঠাকুর চাকরের সংসার। দ্বিপ্রহরে বিশেষ কেহ নাই_ একটা ছোঁড়া-চাকর মাত্র আছে।
রামকিশোরবাবু কোর্টে । ছোঁড়া চাকরটা ট্রাংক জিনিসপত্র বিছানা প্রভৃতি নামাইয়া ভিতরে লইয়া গেল। ট্রাংকের উপরে নাম লেখা _ 'সরোজিনী দেবী'।
ব্যবহারে বোঝা গেল ছোঁড়া চাকরটা সরোজিনী দেবীকে চিনে না। তা ছাড়া তরুণীর ব্যবহারে সে আশ্চর্য হইয়া গেল।
সরোজিনী ভিতরে বারান্দায় গিয়া বাক্স-বিছানা রাখিয়া চাকরটাকে জিজ্ঞাসা করিল, 'বাবু কোথায়?'
'কাছারিতে।'
'কখন আসবেন?'
'জানি না।'
তিনি বারান্দায় নিজের বাক্সটার উপর বসিয়া রহিলেন। বিষাদের প্রতিমা।
রামকিশোরবাবু কোর্ট হইতে ফিরিয়া অবাক হইয়া গেলেন, 'এ কী সরি, তুই হঠাৎ খবর না দিয়ে এলি যে!'
'ও বাড়িতে থাকা আর পোষাবে না।'
'কেন? ব্যাপার কী?'
রামকিশোরবাবু কন্যার ব্যবহারে ক্রমশই বিস্মিত হইতেছিলেন।
'পোষাবে না, মানে?'
'ওরা ছেলের আবার বিয়ে দিচ্ছে! তুমিও তো মত দিয়েছ।'
'আমি মত দিয়েছি, _ মানে?'
'ওরা একজন অচেনা লোক তোমার কাছে পাঠিয়ে তোমার ঠিক মতটা জেনে নিয়ে গেছে। তুমি নাকি বলেছ_ ছেলের বিয়ে দেওয়াই ভালো_'
রামকিশোরের নেপথ্যবাসী ভিতরের মনটা তখন বাহিরের মনের টুঁটি চেপে ধরিয়াছে।
হতবাক রামকিশোর তাঁহার একমাত্র কন্যার মুখের দিকে অসহায়ভাবে চাহিয়া রহিলেন।
সরোজিনী জিজ্ঞাসা করিল, 'সত্যি তুমি বলেছ, বাবা?'
••••••••••
লেখক- বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now