বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ভাত খাওয়ার চেয়ে আনন্দ কিছু নেই

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রামীম (০ পয়েন্ট)

X মসজিদের উঁচু মিনার থেকে একদিন লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়বে আমার মৃত্যু সংবাদ। ভাবতেই কেমন লজ্জা লাগছে- মুহম্মদ ইমদাদ তখনও আমাদের চাষ-সম্ভব জমিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি আসেনি। প্রযুক্তিতে তখনও নিরক্ষর আমার পূর্বপুরুষের ফসলী জমি। বড় বড় বৃষ্টি ফোটাকে সাক্ষী রেখে দুটা গরু, জোয়াল আর লাঙল, ফলা আর বেহিসেবি শ্রম আর ঘাম দিয়ে যখন শক্ত মাটি নরম করার কৌশল করছিল আমার বাবা, তখন আমি প্রথম পৃথিবীর মুখ দেখি। বাবা যে ভালো কৃষক তার বড় প্রমাণ আমাদের সাত ভাই-বোন। সে সময় গ্রামে হয়তো মাইক্রোক্রেডিট মাত্র মাথা ঢুকিয়েছে, কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের আধুনিক পদ্ধতি ঢোকেনি। ফলে সারাবছর ক্ষেত-খামার, গরু-ছাগল লালন-পালন আর বছরে বছরে সন্তান উৎপাদন ছাড়া তেমন কোনো কাজ ছিল না গ্রামের মানুষদের। বাবা মায়ের রুটিন ওয়ার্কের ভেতরেই আমার আসা। ঘটা করে যে এসেছি তা না। শুধু ঝমঝম বৃষ্টি হয়েছিল বলে শুনেছি। আর নদীতে অনেক মাছ ধরা পড়েছিল। বৃষ্টিকে আমলে না নিয়ে গ্রামের সবাই যে যার মতো মাছ ধরার হাতিয়ার নিয়ে নদীতে নেমেছিল আর খুশিমনে বাড়ি ফিরেছিল। বাড়ির পেছনে রান্নাঘর লাগোয়া একটি পাখির বাসায় সেদিন অনেকগুলো ডিম ফুটেছিল আর একটা কাক ভিজে একশা হয়ে চুপচাপ বসেছিল বারান্দায়। বৃষ্টিমুখর সেই দিনে আমি না এলেও বাৎসরিক ফসল হিসেবে আমার জায়গায় অন্য কেউ আসতো। সেই অন্য কেউ হয়তো এখন তার নিজেকে লিখতো যেমন আমি লিখছি। হয়তো লিখতো না। হয়তো অন্য কিছু করতো। সে হয়তো বাবা মার পছন্দ অনুযায়ী হয়ে যেত বিসিএস ক্যাডার কোনো। হয়তো হতো পুলিশ আর চরিত্র দোষে হয়তো রাত-বিরাতে কাউকে ধরে বলতো- যা আছে দিয়ে যা, না হলে চালান দেবো। ভালো মানুষও হয়তো হতে পারতো সে। খুব হয়তো নাম কামাতো, দাম কামাতো কিংবা জীবনে না-কামানো দাড়ি, না কামানো গোঁড়ামি নিয়ে হয়তো হতো হেফাজতে ইসলামী। আমার বদলে যেমন অন্য কেউ আসতো। অন্য কারও বদলে হয়তো আমি এসেছি। তাই নিজেকে পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে করি না। আমি মানে একটি সংখ্যা। আমি যদি হুট করে হারিয়ে যাই, ফুরিয়ে যাই, ধসে যাই কিংবা নাই হয়ে যাই; এই না হওয়ায় একটা সংখ্যা কমে যাওয়া ছাড়া আর কিছু তৈরি করবে না। করবে কি? মানুষ হিসেবে আমি খুব শৈশব কাতর। এই যে লিখি এটা তো কাতরতাই? মাঝে মাঝে আমার হাফপ্যান্ট বেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। মায়ের কাছে গিয়ে দৌড়ে খুব ঘেঁষে বসতে ইচ্ছে করে। খুব অতীত ছুঁতে ইচ্ছে করে। কৈশোরে গ্রামের মাঠে শতাধিক গরুর রাখাল ছিলাম আমিও। এক হাতে থাকতো ঘুড়ি আর অন্য হাতে লাঠি। পকেটে বাঁশিও থাকতো। বাজাতে জানতাম না। তবু বাঁশি ছিল। এখন যেমন মনের মধ্যে একটা বাঁশি আছে। অবিরাম বেজে চলে। সন্ধ্যের আগে গ্রামের সবাই যে যার গরু বুঝে নিতো। আর আমি নিজেদের গরু নিয়ে বাড়ির উঠোনে গোয়াল ঘরের দিকে যেতাম। তারপর সন্ধ্যে হতো। হারিকেন জ্বলতো। আমি পড়তে বসতাম। আমি কি আমার রাখাল জীবন ছেড়ে তবে বিদ্যান হতে চাইতাম? আরও আছে। আছে মাছ ধরা, আছে ক্ষেতে ভাত নিয়ে যাওয়া, আছে জমিতে আগাছা বাছা, আছে ধান মাড়াইয়ে গরুর পেছনে দেওয়া গোল ঘূর্ণি। আর আছে আমার মাথায় রোদের নিঠুরতা। আছে সবাই ঘুমিয়ে গেলে নিঃশব্দে খিড়কি খুলে পাশের গ্রামে যাত্রাপালা দেখতে যাওয়া আর শেষ রাতে ঘরে ফিরে বড় চাচার হাতে ধরা পড়ে দেখা গ্রাম্য সালিশ যেখানে আমিই আসামি। মনে পড়ে শৈশব-কৈশোর। ঘোড় দৌড়। চায়ের দোকানের টিনের দেয়ালে সাঁটানো দুই কালার পোস্টার। সন্ধ্যার পর জুয়াড়িদের মেলা। খড়ের বিছানা। গোলগাল জুয়ার আসরে বসে থাকা চুপচাপ। শক্ত কাগজের কাছে মানুষের হেরে যাওয়া, জিতে যাওয়া দেখতাম। ভোর হলে জুয়াড়িকে জিজ্ঞেস করতাম- হারলেন? উত্তর আসতো-আজ হেরেছি, কিন্তু কাল জিতেছিলাম। অবসন্ন আজ এবং গতকাল এর যোগফলে হেরে যাওয়া মানুষ প্রকৃত অর্থেই জিতে যাওয়া একজন হারানো মানুষ, তখন কি আর বুঝতাম? আমি আজও বসে থাকি চুপচাপ। খড়ের বিছানায় নয়, ভাঙা বেঞ্চিতে, নগরে, মেলায়। টাকা নয়, স্বপ্নের জুয়াড়িরা এখানে গোলগাল বসে। সবাই হারে, সবাই জিতে। প্রকৃত প্রস্তাবে কেউ ঠকে না। প্রকৃত প্রস্তাবে কেউ জিতেও না। মাঝে মাঝে মনে হয় অতীত একটা অভিমানী শিশু। যে মুখ বাঁকা করে কাঁদছে আবারও ফিরে আসার লোভে। আমি কি তার হাত ধরবো? জানি এই ইচ্ছে ও কল্পনার নাম পাগলামী। বয়স ক্রমশ বেড়ে ওঠার সাথে সাথে অতীতও ক্রমশ ধাওয়া করছে। অতীত যেন কোনো এক অচেনা ছায়া। তার কি মৃত্যু মুহূর্ত ছুঁয়ে আসার পণ? নগরে থাকলে কী হবে, নগরের মানুষের ভাষা বুঝি না। তারাও বোঝে না আমায়। অথচ গ্রাম থেকে আসা একটা মানুষের প্রশ্বাসের ধ্বনিতে একসঙ্গে অনেকগুলো গল্প পড়তে পারি। কি হবে আমার এই নাগরিক ভুল জীবন নিয়ে? ভুল পোশাক পরে খুব কষ্টে পেছনে হাত নিয়ে অবিরাম পিঠ চুলকানোর বিব্রতকর যাপনের চেয়ে বরং এই ভালো-গ্রামে ফিরে যাই, মাঝরাতে গান গাইতে গাইতে নদীতে মাছ ধরি আর নৌকার গলুইয়ে বসে ক্ষিদে পেলে ভাত খাবো। ভাত খাওয়ার চেয়ে আনন্দ আর কিছুতে নেই। ছোটবেলায় একবার অন্যমনস্ক হেঁটে যাওয়ার সময় পায়ের আঙুলের নখ উল্টে গিয়েছিল। হাত থেকে স্কুল ব্যাগ ছুঁড়ে দিয়ে রক্তাক্ত নখ চেপে ধরে যে অস্ফুট চিৎকার করেছিলাম সেই চিৎকার ছিল- মা আ- আ-গো-অ — অ…। বড় হয়ে প্রায়ই মানুষের আচরণে, নখ উল্টে যাওয়ার মতো ব্যথা হয় মনে, তখনও যে চিৎকারে ভেতরে প্রতিধ্বনিত হয় সেটাও ‘মা- আ আ -গো-অ- অ’…. বুঝি, মা ছাড়া এই ব্যথার অনুবাদ করার যোগ্যতা রাখে না কেউ। শুধু ব্যথা নয়, জবাই করা মোরগের গলা চেপে ধরা মুহূর্তে যে গোঙানি বের হয় সেই গোঙানির মতো অমানবিক কষ্টের অব্যক্ত সব কথা মাকে বলে দিতে ইচ্ছে করে। খুব ইচ্ছে করে বলি-মা, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেও আমার মোটেও ঘুম হয় না। জেগে থাকাও আমার কাছে এক গভীর দুঃস্বপ্ন। অচেনা পথ-অচেনা ক্ষতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনাকাক্সিক্ষত রুটিন পাহারা দিচ্ছি আর দিন দিনে নিজের কাছে বড় বেশি অচেনা হয়ে যাচ্ছি। অচেনা আমার অনেক গল্প জমে জমে আজ পাথর। সেইসব পাথর ভেঙে ভেঙে মাকে শোনাতে চাই সব ক’টি গল্প। বলে যেতে চাই সব, যে কথার অনুবাদ মা ছাড়া কেউ জানে না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ভাত খাওয়ার চেয়ে আনন্দ কিছু নেই

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now