বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শরতের কোন এক ঈদ পূর্ববর্তী সন্ধ্যাশেষে প্রান্তিকার মন ও মেজাজ দুটোই চুয়াল্লিশ ধারা জারিকৃত অবস্থায় আছে। সে তার বাবার সাথে ঢাকায় থাকে আর রংপুরের নিজেদের বাড়িতে মা আর একটা ছোট ভাই আছে। ছোট্ট একটা বাসায় তাদের ছোট্ট সংসার। প্রান্তিকা আর তার বাবা, তৃতীয় ব্যক্তি আর কেউ নেই। কিন্তু আজকে প্রান্তিকার মনটা খুব খারাপ। কারণ, তার কলেজে ঈদের ছুটি হয়েছে কিন্তু বাবা এখনো ছুটি পাননি। বাবা বাড়িতে যেতেও পারেন নাও যেতে পারেন। কিন্তু এখন প্রান্তিকাকে একলাই বাড়িতে ফিরতে হবে। মা আর ভাইটার সাথেও দেখা নেই দীর্ঘকাল। এদিকে প্রান্তিকার শরীরটাও বিশেষ ভালো নেই; নানা প্রকার দাবী নিয়ে শরীর ক্লান্ত। তবু নিজের পরিচিত মুখের তাগিদে, খুব সম্ভবত হৃদয়ের সুপ্রাচীন দু চারটা তন্তুর টানে প্রান্তিকা তার ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে বাবার সাথে চলে আসল বাসস্ট্যান্ডে।
তৃতীয় সারিতে বামদিকে সিটটাকে দেখে প্রান্তিকার মনে হচ্ছিল যেন কোন বিচিত্র কারণে সিটটা তার ভার বহনে নিতান্তই অপ্রস্তুত। প্রায় ছয় ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা, তাই তো পাশের সহযাত্রী নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত সে। বাস ছাড়তে এখনো প্রায় তিরিশ মিনিট বাকি। বাবা চলে যেতে চাইছিলেন না তবুও প্রান্তিকাই তাকে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছে। অযথা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা অর্থহীন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বাবা থাকলেই হত, কেমন একলা একলা লাগছে। নিতান্ত অনিচ্ছায় জানালা দিয়ে সে তাকিয়ে আছে এমন সময়ে বাসের ভেতর থেকে ইতস্তত ভঙ্গিতে একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠল,
- প্রান্তিকা, তুমি কেমন আছ?
ফিরে তাকিয়ে প্রান্তিকা দেখল একটা গাঢ় নীল পাঞ্জাবী পরিহিত এলোমেলো চুলের শ্যামলা ছেলে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।
ছেলেটাকে বেশ পরিচিত মনে হল। কিন্তু এসব চেপে প্রান্তিকা দৃঢ়তা নিয়ে বলল
- ভালো আছি, আপনাকে তো ...
-আমি অর্ক, তোমাদের বাসার নিচে একটা হোস্টেলে থাকি। এবার ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিব বলে ঢাকায় আসা। তোমার বাবার সাথে তোমাদের বাসার গলিতে আমার একদিন আলাপ হয়েছিল। তাছাড়া তোমাকেও প্রায়ই দেখি আমাদের বাসার সামনে। আজকে তো দেখাই হয়ে গেল, হা হা হা
ছেলেটার হাসি দেখে প্রান্তিকার নিজের ই হাসি পাচ্ছে। তবু সে বলল,
- ও আচ্ছা আপনাকেও চিনতে পেরেছি। আপনিও বাড়িতে যাচ্ছেন বুঝি?
- হুম। ছুটি পেয়ে গেলাম, আজকের টিকিট ও পেয়ে গেলাম ভাগ্যবশত। কী ব্যাপার, আঙ্কেল আসেননি?
- না, বাবা ছুটি পাননি এখনো, তাই আমি একাই যাচ্ছি।
ইতিমধ্যে পেছন থেকে যাত্রীরা অর্ককে সামনে এগোতে বলল। অর্ক কথা না বাড়িয়ে বলল,
- ছয় নম্বর সিটটা আমার, তোমার কোনকিছু দরকার হলে আমাকে বলবে।
যথাসময়ের দশ পনের মিনিট পর আকাশভাঙ্গা রোদ আর যানজট ঠেলে বাসটি এগোতে লাগল।
ড্রাইভারের সিটের পিছনে উপরের দিকে টিভি রাখার জায়গাটা একটা হালকা নীল কাঁচ দিয়ে আটকানো। রোদ এসে পড়ছে ওখানে সেই রোদ এসে আবার প্রান্তিকার চোখে বিঁধছে। একটুবাদে বাসটি একটা মোড় ঘুরল আর রোদ সলজ্জে সরে গিয়ে সেখানে প্রতিফলন দেখাল। হুম, সেই ছেলেটাকেই দেখা যাচ্ছে। ছেলেটার হাতে বই, জীবনানন্দ। বুকের উপর বই রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আহা ! সুন্দর দৃশ্য। একটুবাদে অর্ক জেগে উঠল। এই কাঁচটা তার ও দৃষ্টিগোচর হল, দুজন দুজন কে নিয়মিত বিরতিতে দেখতে লাগল, চোখে চোখ পড়লেই অস্থির এবং স্মিত দুচারটা হাসি দিয়ে দুপক্ষ তাকিয়েই থাকল।
যাত্রা
বিরতি। তিরিশ মিনিট।
রোজার মাস তাই খাওয়াদাওয়ার ঝামেলা নেই। রেস্টুরেন্টে শেষপ্রান্তে একটা ছোট্ট বারান্দা, বারান্দা থেকে বিকেলের রোদ দেখা যাচ্ছে, সন্ধ্যার আয়োজনে ব্যস্ত সূর্যের প্রতিমা দেখা যাচ্ছে। প্রান্তিকা হাতমুখ ধুয়ে এই বারান্দায় এসে দেখে অর্কও এখানে। অর্ক'র হাতে সেই বইটা, প্রান্তিকাকে দেখেই লজ্জায় সিগারেট লুকিয়ে ফেলল।
-কী অবস্থা, এখানে একা একা কী করছেন?
লজ্জিতস্বরে অর্ক বলল,
- এইত কিছু না। চারিদিকে অনেক মানুষ এই জায়গাটা একটু খালি ...
মুচকি হাসি দিয়ে প্রান্তিকা বলল -
-ও তাই নাকি! সিগারেট খাওয়া হচ্ছিল বুঝি?
অর্ক হেসে ফেলল।
-আপনার হাতে জীবনানন্দসমগ্র সবসময় থাকে?
-হুম থাকে। তোমাকে একটা কবিতা পড়ে শোনাই?
প্রান্তিকা কে অবাক করে দিয়ে অর্ক দ্বিতীয় কোন কথা, কোন সম্মতির অপেক্ষা ছাড়াই কবিতা পড়া শুরু করল,
'তুমি তা জানোনা কিছু, না জানিলে -
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে ! '
'আমি চলে যাব -তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধরে সেই দিন পৃথিবীর পরে ;-
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে ! '
প্রান্তিকার ভেতরটা শূণ্য শূণ্য লাগছে ...এই রোদ তার কাছে প্রাণান্ত অন্ধকার মনে হচ্ছে ... প্রান্তিকা ডুবে যাচ্ছে ...
অর্ক পড়া শেষ করে নিমিষে চুপ হয়ে গেল। নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মন চাইছে, এ ও কি সম্ভব? চোখ থেমে যেতে চাইচ্ছে।
উভয়ে বুঝতে পারল এই রোদ অনেকদিনের জমানো অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলে যাচ্ছে অবিরত।
কেউ আর কোন কথা বলল না, দুজন ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকল। তিরিশ মিনিটের ছোট্ট পরিসর টা কতটা মূল্যবান হতে পারে, কতটা অসঙ্গায়িত কতটা প্রকট কতটা আকাখার হতে পারে এই নিরবতা বাতাসের বেশে শো শো শব্দে বুঝিতে দিল দুজনকে। সবচে প্রাচীন কল্পনাময় এই চিত্রকল্পের সঙ্গায়নে সময় কিছুই না, সব কিছু যেন আগে থেকে ঠিক করা। এই অনুভূতির তৃষ্ণায় চির ধরিয়ে ভেসে আসল রেস্টুরেন্টের রিসেপশ্নিস্টের যান্ত্রিক স্বর,' ঢাকা থেকে রংপুরগামী ...'
ওরা দুজন পুনরায় বাসে গিয়ে নিজেদের সিটে বসল, কিছুই হয়নি যেন, দুজনই যেন বাসের ইঞ্জিনের মত যন্ত্রবিশেষ, ইঞ্জিন তবু শব্দ করতে পারে তারা তাও যেন ভুলে গিয়ছে কোন গভীর দুঃখে, সুগভীর আনন্দে। প্রান্তিকার ইচ্ছে করছে অর্কের সিটের পাশের সিটে বসে সারাটা জীবন এই শব্দময়, গতিময় বাসে বসে কাটিয়ে দিতে। তার আর কিছুই দরকার নেই যেন।
রাত সোয়া সাতটার দিকে বিপরীত দিক থেকে আগত অপর একটি বাসের ধাক্কায় দুমড়ে মুচড়ে গেল বাসদুটির সামনের অংশ।
একটা অজানা অচেনা রডের মত অংশ ঢুকে গেল অর্কের বুকে ... কিছুই যেন হয়নি পরবর্তী কয়েক সেকেন্ডে।
প্রবল শীতে কয়েকটা স্মৃতি এসে তাকে ডাকছে যেন ...
সেই ক্লাস এইটে বৃত্তি পাবার পর তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন ...
সে পৃথিবীর সুন্দরতম বিকেলে একটি মেয়েকে কবিতা পড়ে শুনিয়েছিল ...
সে বুঝতে পারল এই টুকরো মৃত্যুর আগে সে কাউকে ভালবেসেছিল ...।
জানালার কাঁচ ভেঙ্গে প্রান্তিকা মারাত্বকভাবে জখম হল, সে অজ্ঞান হয়েছিল প্রায় দেড় দিন।
জ্ঞান ফিরবার পর প্রান্তিকা বহুদিন এক অশুদ্ধ অসহনীয় ঘোরের ভেতরে ডুবে ছিল, এই ঘোরে কতটুকু দুঃখ ছিল কতটুকু ব্যাথা ছিল সেটা আলাদা করা যায়নি।
সুদীর্ঘ আট বছর পর এক বর্ষার রাতে রৌদ্রঝরা শরতের বিকেলবেলা ফিরে এসেছিল প্রান্তিকার জীবনে। রক্তকরবী ফোটা বাসরে তাকে তার স্বামী এসে বলল ,
-প্রান্তিকা, কেমন আছো?
- ভালো। আপনি?
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লোকটা বলল
-প্রান্তিকা, একটা কবিতা শুনবে?
কোনপ্রকার অপেক্ষা ছাড়া লোকটা চোখ বন্ধ করে কবিতা পড়তে শুরু করল,
'আমি সেই পুরোহিত - সেই পুরোহিত!
যে নক্ষত্র মরে যায় তাহার বুকের শীত '
'তোমারে রাখিবে ধরে সেই দিন পৃথিবীর পরে ;-
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে! '
প্রান্তিকা ছায়াধূপের গন্ধে বিমোহিত হল,
প্রান্তিকার মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে,
কিন্তু মৃত্যু যেন আটকে গেছে ভালোবাসার অখন্ড প্রক্রিয়ায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now