বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কি অদ্ভুত নাম আমার,বাঙলা । ছোটবেলায় এটা
ভেবেই মায়ের উপর ভীষণ রাগ হত ।
পৃথিবীতে বুঝি আর কোন নাম ছিলনা,এই নামটাই
রাখতে হল । স্কুলের প্রথম দিন স্যার নাম
জিজ্ঞেস করার পর নাম বলতেই পুরো ক্লাস
হো হো করে হেসে উঠে । কেউ কেউ
আবার গনিত,সমাজ,বিজ্ঞান বলেও ক্ষ্যাপাতো ।
বাসায় ফিরে গাল ফুলিয়ে কি রাগটাই না দেখাতাম
মায়ের উপর । আর মা তার ছোট্ট পুতুল
মেয়েকে কোলে নিয়ে বলত,
"যে তোমাকে ক্ষ্যাপাবে তাকে বলবে,এর
চেয়ে সুন্দর শব্দ পৃথিবীতে নেই,আর
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দটাই হল তোমার নাম
। বাঙলা শুধু তোমার পাঠ্য বই না । বাঙলা আমাদের
মাতৃভাষা,অর্জিত অহংকার ।"
আমার ছোট মাথায় তখন কিছুই ঢুকতনা । এর মাঝে
অত সৌন্দর্যের কি আছে । মাতৃভাষা হলেই নাম
রাখতে হবে । মাতৃভূমি তো বাংলাদেশ,তাই বলে কি
আমার কোন বন্ধুর নাম বাংলাদেশ নাকি । চক্রগতির
মত ভার্সিটির প্রথম দিনেও সেই একই অবস্থা ।
পরিচয় পর্বে স্যার নাম জিজ্ঞেস করতেই মনে
মনে কিছুটা গর্ব নিয়ে বললাম,
"বাঙলা।"
হঠাৎ কি হল বুঝিনি পুরো ক্লাস অট্টহাসিতে ফেটে
পড়ল । ছোটবেলার বন্ধুরা নাহয় অবুঝ ছিল কিন্তু
এদের কি সমস্যা । স্যারও একটা সুক্ষ হাসি গোপন
করে বলল,
"তোমরা সবাই বাংলা নিয়ে পড়তে এসেছ তা তো
জানি,কিন্তু আমিতো তোমার নাম জিজ্ঞেস
করেছি।"
আমিও ততক্ষণে বুঝেছি কাহিনিটা কি,
"স্যার আমার নাম বাঙলা।"
তারপর পুরো ক্লাসের গুঞ্জন হঠাৎ করেই
থেমে গেল । স্যার ও থমথমে গলায় বললেন,
"সুন্দর নাম,বস।"
তখন মনে হচ্ছিল কি অদ্ভুত সুন্দর নাম আমার । মা
কে মনে মনে থ্যাংস ও দিচ্ছিলাম । আমার পুরো
জগতটা জুড়ে এই একটা মাত্র মানুষ,আমার মা । আমার
হাসি-কান্না,মান-অভিমানের চিত্রপটে শুধু মায়েরই
প্রতিচ্ছবি । তাকে ঘিরেই আমার বেড়ে
উঠা,খুনসুটি,আহ্লাদিপনা আর পাগলামি । আর বাবা নামক
মানুষটা আমার কাছে চিরজীবন অচেনা আর অজানাই
রয়ে গেল । ছোটবেলায় ভাবতাম সবার বাবা
আছে,কারও বেঁটে বাবা,কারও পালোয়ান বাবা আবার
কারও বাবা যেন সাক্ষাত রাজপুত্র । কিন্তু আমার বাবার
নেই কোন আকার,আকৃতি এমনকি প্রতিচ্ছবি ।
মাকে যতবার জিজ্ঞেস করতাম মা বলত,
"তোমার বাবাকে ছেলেধরা নিয়ে গেছে। "
কি আজব কথা,এত বড় মানুষকে ছেলেধরা
কিভাবে নেয় । আমার বাবা কি তালপাতার সেপাই মার্কা
বাবা । এ অদ্ভুত কথা আমি বহু বছর বিশ্বাসের জায়গায়
আগলে ধরে রেখেছিলাম । কিন্তু বড় হওয়ার
সাথে সাথে বিশ্বাসের ভিত টাও নড়তে শুরু করল ।
মনের মাঝে হাজার প্রশ্নের দানা বাঁধতে লাগল ।
প্রশ্ন আর বাধার চৌকাঠ পেড়িয়ে একদিন মায়ের
মুখোমুখি হই প্রশ্নের তীরন্দাজ হয়ে । আমার
সদা হাস্যময়ী মায়ের মুখ জীবনে প্রথম বারের
মত ফ্যাকাসে দেখে আচমকা বিদ্যৎস্পৃষ্ট হই ।
সম্মোহিতের মত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে
থাকে,মুখ থেকে কোন কথা সরেনা । মনে
হয়েছিল অনেক কষ্ট করে বুকে চেপে রাখা
পাথরটা সরিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে । কিন্তু
পারেনি,শুধু বলেছিল,
"আমাকে দুটো দিন সময় দেও,তোমার
প্রশ্নের উত্তর পাবে।"
কেন জানি মাকে কষ্ট দিয়ে কিছু জানার ইচ্ছেটা
একদম ই মরে গেল । তবে মা কথা
রেখেছিল,হাতে একটা ডায়েরি ধরিয়ে দিল ঠিক
দুদিন পর । কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়েরি টা নিয়ে আর
কৌতূহল নিবারণ করতে পারিনি । ফ্ল্যাশব্যাক করে
চলে গিয়েছিলাম সময়ের অনেকটা পিছনে,
****************************************************************************
সময়টা ছিল ১৯৭১ এর গোড়ার দিকে । ছোট্ট
একটা মফঃস্বল শহরে মধ্যবিত্ত এক পরিবার । আছে
মা,বাবা,স্কুল পড়ুয়া কিশোরী আর কলেজের
গণ্ডি পার হওয়া তরুণ । তরুণের চোখে অনন্ত
স্বপ্ন । স্বপ্নের হাতছানি পর্বেই জীবনের
নতুন একটা ধাপের সাথে পরিচিত হয় সে । মায়ের
পীড়াপীড়িতে বিয়ে করে গ্রাম্য এক
কিশোরীকে । কিশোরীর বয়স কতইবা হবে
১৪/১৫, মুখে তার শিশুসুলভ সরলতা আর চেহারার
মাঝে এ এক অন্য রকম লাবন্যতা । বিয়ের গাঁট
বেধে দিল পরিবার কিন্তু মনের গাঁট কি আর অত
সহজে বাধা পড়ে । সদ্য পুতুল খেলার বয়স
পেড়িয়ে আসা কিশোরীর কাছে বিয়েটাও যেন
পুতুল বিয়ের মতই । বৈবাহিক জীবন বলতে বরকে
দেখে খিলখিল করে হেসে উঠা,লজ্জায় মাথায়
ঘোমটা টেনে মুখ লুকানো পর্যন্তই । সাথে
আছে খুনসুটি,একজন আরেকজনের পিছে
লেগে থাকা আর কথা কাটাকাটি । তবুও সব মিলিয়ে
বেশ ভালই কাটছিল দিনগুলো । কিন্তু মাঝে মাঝে
উড়ে আসা দেশের কিছু খবরে স্বপ্নবাজ
তরুনের স্বপ্নে ভাটা পড়তে থাকে । বাংলাদেশ
বেতার থেকে ভেসে আসা আকাশবাণী শুনে
অজানা আশঙ্কায় ধূসর হতে থাকে তার সময়গুলো ।
যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আওয়ামিলীগ জয়ের পর ৩
মার্চ ঢাকায় প্রথম অধিবেশনে ভুট্টো আসবে কি
না,সাথে স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার দিন আর
ভেসে আসা শ্লোগানের একাংশ(তোমার আমার
ঠিকানা-পদ্মা,মেঘনা,যমুনা) শুনে রক্ত গরম হয়ে
উঠত তার । সারাদিন রেডিওর নব ঘুরাতে ঘুরাতে ঘুম
নিদ হারাম করে নিজের । এসব দেখে মায়ের মন
মানত না । অমন হাসিখুশি ছেলে তার,সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন
হয়ে কি যেন ভাবে ।
..."তোর এ ট্রানজিস্টর আমি বেইচ্যা দিমু
দেহিস,মুখডারে কালা মেঘের মত কইরা কি অত
ভাবস।"
..."দেশের অবস্থা ভালো না আম্মা,যুদ্ধ টুদ্ধ
লাগতে পারে।"
..."কার লগে কার যুদ্ধ?"
..."শত্রু যদি ঘরে থাকে বাইরের শত্রুর কি
দরকার।"
ছেলের কথার মাথা মুণ্ডু কিছুই বোঝেনা মা,তবুও
অজানা ভয় এসে ভীড় করে মনে।
দেশের অবস্থা আরও বিপর্যয়ের দিকে । ৭ইমার্চ
ভাষণের পর মনের মাঝে উত্তাল তরঙ্গগুলো
যেন এক একটা লেলিহান শিখা । গোপনে প্রস্তুতি
নিয়ে শুধু কিশোরী নববধুকে জানিয়ে মধ্যরাতে
বেরিয়ে পড়ে তরুণ । গন্তব্য কোথায় জানেনা
কিন্তু উদ্দেশ্য প্রোজ্জ্বল,দেশকে স্বাধীন
করা । সেই রাতে কিশোরীর চোখের জলের
বাধ আর থামেনা । হয়ত সেটাই ছিল ভালবাসার শুরু ।
স্বামী যুদ্ধে,বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল,মনের
মাঝে শঙ্কা আর ত্রাস সব কিছু যেন খুব দ্রুত তার
বয়স বাড়িয়ে দিল এক নিমিষে । তাদের সুন্দর
মফঃস্বল শহরটা দিনে দিনে মরূদ্যানে পরিনত হতে
লাগল । শহর ছেড়ে সবাই পাড়ি দিচ্ছিল অদূর গ্রামে
অথবা শরণার্থী হয়ে বর্ডারের ওপারে । মিলিটারিরা
এ শহরে তাদের আগমন জানান দেয় অসংখ্য ঘরবাড়ি
পুড়িয়ে । আবার নাকি রাজাকার বাহিনী গঠন করেছে
। তাদের বদৌলতে হয়ত জেনে যাবে এ বাড়ির
ছেলে যুদ্ধে,তখন বুঝি তাদের আর রক্ষা নেই
। একদিন সে ভয়ার্ত দিন নেমে আসে তাদের
জীবনে । রক্তাত্ত হয় পুরো পরিবার । শুধু ছিন্ন
দেহে শকুনের আঁচড় নিয়ে লুটিয়ে পড়ে থাকে
কিশোরী বধু । নিঃসাড় দেহে প্রান ছাড়া আর কিছুর
অস্তিত্ব টের পায়না সে । আত্মহননের চেষ্টা
করেও পারেনি । নিজেকে বন্দি করে রাখে
ঘরের চার দেয়ালে । আলো পড়তে দেয়নি
ঘরের ভেন্টিলেটর দিয়েও । লজ্জা আর
ঘৃণামিশ্রিত অস্বাদিত এক জীবন । যে জীবনের
সব রং বিলীন হয়ে গেছে এক ঝটকায় । বহু
অপেক্ষার প্রহর গোনার পর আসে মুক্তির
দিন,স্বাধীনতার দিন । কিশোরী তখনও জানেনা
আদৌ তার স্বামী বেঁচে আছে কি নেই । আবারও
অনন্ত প্রতীক্ষা । প্রিয় মানুষকে কাছে পাওয়ার
আর্তনাদ । একদিন,দুদিন,সপ্তাহ পেরিয়ে যায়
অবশেষে প্রতিক্ষার প্রহর ফুরায় কিন্তু ততদিনে
কিশোরী টের পায় তার ভেতরে আরেকটা
প্রাণের অস্তিত্ব । নিজের প্রতি ধিক্কার ছাড়া আর
কিছুই করার থাকেনা তার । ঠিক করে,আঁতুড় ঘরেই
শিশুটিকে বিলিন করে দিবে ধরণী থেকে ।
কিন্তু দেশের তরে নিজেকে সমর্পণ
করেছে যে স্বামী,সেই তরুণ স্বামীর মনটা
বুঝি আকাশের মতই বিশাল । নিজেই শিশুটিকে
স্বীকৃতি দিল নিজের সন্তান হিসেবে । চারদিকে
যখন জয়ের নিশান উড়ছিল সে সময় শিশুটির জন্ম ।
বাবা তাই শিশুটির নাম রাখল জয়ী । যুদ্ধশিশু জয়ী এক
বীরাঙ্গনার সন্তান ।
(ডায়েরির ঠিক এটুক পড়ে স্তব্ধ হয়ে যাই । সেই
যুদ্ধশিশু জয়ী আমার মা । অজস্র চিন্তা এসে ভর
করে মাথায় । সাময়িক ছেদ পড়ে মনোযোগে ।
আবার ডায়েরিতে মুখ গুঁজে মনোযোগের
চেষ্টা করি...)
যুদ্ধশিশু জয়ী ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে
লাগল সুস্থ,স্বাভাবিক সমাজে । কোন কালগ্রাস
এসে আঁচ ফেলেনি তার স্বাভাবিক জীবনে ।
আর দশটা মেয়ের মত পার করছিল প্রবর্তনের
এক একটা ধাপ । একটা সময় পঙ্খীরাজে চড়ে তার
জীবনেও এক রাজপুত্রের আগমন হয় । মহা
ধুমধাম করে বিয়ে হয় তাদের । ভালই চলছিল অনাবিল
আনন্দের দিনগুলো । সুখের চাদরে ঘেরা প্রতিটা
ক্ষণ । সুখগুলো আরও সুবাসিত হতে লাগল যখন
তাদের ঘরে নতুন মুখের আগমনী বার্তা এল ।
কিন্তু হঠাৎ একটা মাত্র উড়ে আসা খবর তার
জীবনের সমস্ত সমীকরণ পাল্টে দিল ।
স্বাধীনতার এত বছর পরেও,তার বাবার কাছ
থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও জয়ীর শরীরে
সিল পড়ল সে ছিল একটা যুদ্ধশিশু । যার স্থান কোন
সভ্য সমাজে নেই,পরিবারে স্থান দেওয়াতো
দুরের কথা । এক মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেল তার
সাজানো পৃথিবী । সে যেন একটা কীট,দুমড়ে
মুচড়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হল তাকে । তারপর
থেকে শুরু হল তার নতুন করে টিকে থাকার যুদ্ধ ।
তার ভিতরে বেড়ে উঠা নতুন প্রানের জন্য
বেঁচে থাকার অদম্য সংগ্রাম । এক মুহূর্তে সব
বেদনা ধুয়ে গেল যেদিন জয়ীর কোলে
আসে দশ মাস দশ দিন ধরে আগলে রাখা তার
ছোট্ট পৃথিবী বাঙলা । সদ্য প্রস্ফুটিত সুনির্মল এই
ফুলটাই তার পুরো জগত ।
**************************************************************************
প্রথম যেদিন ডায়েরিটা পড়ি সেদিন মাকে জড়িয়ে
ধরে সারাটা রাত চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিলাম
। আর সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে ভাবছিলাম আমি কত
ভাগ্যবতী,এই মমতাময়ী নারী আমার মা । আমার মা
বীরাঙ্গনার সন্তান এটা জেনেও ভীষণ গর্ব
হচ্ছিল । যে শুধু সংগ্রাম করেছে আমার জন্য আর
আমায় মমতামিশ্রিত ভালবাসায় আগলে ধরে
রেখেছে প্রতিটি মুহূর্তে । তার পুরো জগত টা
সমর্পণ করেছে আমার মাঝে । ভীষণ ভালবাসি মা
তোমায় । শুধু আফসোস,মাকে উজাড় করে কিছুই
দিতে পারিনি । মায়ের জন্য সামান্য কিছু করার তাগিদ
অনুভব করি সেই থেকে । ছোট্ট একটা
ডকুমেন্টারি করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ।
অতীতগুলোকে ঘিরে বসে আছি । বহুবার পড়া
ডায়েরিটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি । আমার অসামান্য মায়ের
জন্য খুব সামান্য কিছু করার প্রয়াস । কিন্তু ভাললাগার
ব্যাপ্তিটা যে কত বিশাল তা হয়ত নিজেও অনুধাবন
করতে পারবনা ।
(ফারিয়া তানজিলা রিবন্তী)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now