বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
এই বাড়িতে কাজ করছি আজ অনেকদিন হলো। সংখ্যায় হিসেব করলে প্রায় বিশ বছর! এতোদিনে বাড়ির সবার সাথে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
বাড়ির কর্তা, কর্তার এক ছেলে আর এক মেয়ে, কর্তার বাবা-মা সবাই আমার আপনজন হয়ে উঠেছেন। কর্তার ছেলে-মেয়েদের তো আমাকে ছাড়া চলেই না। আর কর্তার বাবা-মা তো আমার নিজেরও বাবা-মা হয়ে উঠেছেন।
প্রথম যখন এই বাড়িতে আসি, তখন আমার বয়স মাত্র ১৯। এক সদ্য তরুণী হয়ে ওঠা কিশোরী আমি। পরিবার থেকে জোর এসেছিল। তাই চিরকালের বাধ্য মেয়ে হিসেবে এই বাড়িতে কাজ করতে রাজি হয়ে গেলাম।
এই বাড়িতে কাজ করার বিনিময়ে কিছুই পাই না। কারণ আমি এখানে "পার্মানেন্ট" কাজের লোক। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আর ঈদে কিংবা অন্য কোনো উৎসবে জামাকাপড় পাচ্ছি, এইই তো ঢের। আর কী চাই?
তবে কিনা কখনো কখনো অসহ্য লাগে এই কাজ। কোনো কাজে একটু ভুল হলেই শুনতে হয় নানান রকম কটু কথা। ক্ষমা চাইলেও লাভ নেই। শুনতে হয়, "এতোদিন ধরে এই কাজ শিখেছ!"
আমিও তো মানুষ। আমারও তো ভুল হবে। সবসময়ই যে ভুল হচ্ছে এমন তো না। তারপরও নীরবে মাথা নত করে কাজ করে যাচ্ছি।
আমার বাবা এখন বেঁচে নেই। যদি বেঁচে থাকতেন তবে হয়তো এনারা এমনটা করতে পারতেন না। এই বাড়িতে আসার চার বছর পরেই বাবা গত হয়েছেন।
ও বাবা, আমায় তুমি শুনতে পাচ্ছ? ঐ দূরের নীল আকাশ থেকে? শুনতে পাচ্ছ আমার কথাগুলো? তুমি কেন এতো তাড়াতাড়ি দুনিয়া থেকে চলে গেলে? আমি না তোমার রাজকন্যা। তাহলে তুমি কেন আমাকে একা ফেলে চলে গেলে? এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে? আমাকে একা রেখে তুমি ওপরে মজা করছ, তাইনা? পঁচা বাবা!
********************
বাড়ির কর্তা তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাঝে মাঝে ঘুরতে যান। আমি প্রথম প্রথম যেতাম। কিন্তু কর্তার বোন আর ভাই আমার যাওয়াটা পছন্দ করেন না। তাই এখন আর আমার যাওয়াটাও হয়ে ওঠে না।
সারাদিন ঘরেই থাকতে হয়। কত্ত কাজ আমার!
সকালে উঠে প্রথমেই ঘর ঝাড়ু দাও। তারপর বাড়ির সবার জন্য নাস্তা তৈরি করা। তারপর কর্তার ছেলে-মেয়ের জন্য টিফিন রেডি করে দেওয়া। ওরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আমারও তো স্বপ্ন ছিল একদিন আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো। তবে এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের পর চাচারা মিলে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল। বাবা চাইছিলেন না যে আমি আমার স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে দেই। তবে চাচারা অনেক জোর করা শুরু করে দিলেন। তাই পড়ালেখাটা বাদই দিতে হলো।
কর্তাকেও টিফিন রেডি করে দিতে হবে। সেটাও করে দেই। তারপরেও তিনি আমাকে অনেক কটু কথা শোনান। এরপর সারাদিন কতো কাজ করে যাই।
সবচেয়ে বিরক্ত লাগে তখন, যখন রান্না শেষ করে ফেলার পর বাবা বলেন তার প্রিয় মরিচের ভর্তা করতে। অথবা মা ফরমায়েশ দেন নতুন কিছু রান্না করতে। কিছু না বলে, কোনো বিরক্তি প্রকাশ না করে আমি কাজগুলো করে যাই। এছাড়া যে আর কোনো উপায় নেই। আমার কাজই তো এটা।
*********************
প্রথম যেদিন এই বাড়িতে এসেছিলাম সেদিন থেকে অনেকদিন তেমন কোন কাজ করতে হয়নি। বরং ভেবেছিলাম যে ওনারা সবাই নিজের কাজে সাহায্য করার জন্য আমাকে রেখেছেন। তবে মাস দুয়েক যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম যে আমি একাই বাড়ির সব কাজ করছি। অবশ্য এজন্যই তো এই বাড়িতে আসা।
প্রথমদিকে ওনারাও আমার প্রতি সদয় ছিলেন। তবে আমার ছেলের জন্মের পর থেকেই ওদের পরিবর্তনটা আস্তে আস্তে লক্ষ্য করলাম।
আমি তখন তাদের কাছে অবহেলিত এক জীব। যার কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকতে নেই।
অবশ্য আমার আর এমন কী আশা করার আছে ওদের কাছে। কিচ্ছুটি নেই। একদম নেই। কারণ আমার ছেলে-মেয়ে দুটোকেই যে আমি মানুষ করতে পেরেছি।
হ্যাঁ, এই বাড়ির বড় বউ আমি। বড় কর্তার স্ত্রী।
এক বেতনহীন চাকরানী! যে শুধু দিয়েই গিয়েছে বিনিময়ে কিছু চায়নি। বরং ফুলের মতো দুটি ছেলে-মেয়ে পেয়েছে।
বড় কর্তার অবহেলার কাছে এটা কিছুই না।
**********************সমাপ্ত***********************
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
উৎসর্গ- আমাদের বেতনহীন "চাকরানী" মায়েদের। তবে অবশ্যই প্রথমে আছেন আমার নিজের "চাকরানী" মা।
অনুপ্রেরণায়- একটা গল্পের "বেতনহীন চাকরানী" শব্দদ্বয় আমাকে এই গল্পটি লেখার জন্য উৎসাহিত করেছে।
আমার কথা- এটা কিন্তু কোনো সাধারণ গল্প নয়। এটা আমাদের সমাজের প্রতিটি ঘরের গল্প। এমনকি আমার নিজের ঘরেরও। এই মায়েরা বেতন ছাড়াই আমাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। যাচ্ছেন না?
শেষ কথা- অনুপ্রাণিত হয়ে লিখলেও এটা আমার নিজেরই লেখা। আপনি যদি চান তবে আমার সব লেখাগুলো কপি করতে পারেন। আপনি চাইলে আমার নাম উল্লেখ করতে পারেন, না উল্লেখ করলেও কোনো সমস্যা নেই। কপি করার পর কালেক্টেড/সংগৃহীত লিখে না দিলেও কোনো সমস্যা নেই। তবে একটা কথা, আপনি যদি কপি করে দাবী করেন যে এটা আপনার নিজেরই লেখা তবে....... মনে রাখবেন, আপনার মৃত্যুর পর সব কিছুরই হিসেব দিতে হবে।*(এই অংশটার অনুপ্রেরণায় আছেন শুভ ভাইয়া।)
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now