বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বেলা ফুরাবার আগে

"ইসলামিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান সফর(guest) (০ পয়েন্ট)

X আরিফ আজাদ _______বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম ---------১৮. চলাে বদলাই । [ক] মক্কার চারদিকে তখন মূর্তিপূজার ঘনঘটা। লাত-উযযা আর মানাতের মতাে অসংখ্য, অগণিত দেব-দেবীর পূজো-অর্চনা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত মক্কার অধিবাসীরা। এই অঞ্চলেই তাওহিদের গােড়াপত্তন করে গিয়েছিলেন পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। স্ত্রী হাজেরা আর পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামকে সাথে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একত্ববাদের ইমারত। দীপ্তকণ্ঠে ঘােষণা করেছিলেন, আল্লাহ এক এবং তাঁর কোনাে শরিক নেই। কিন্তু সময়ের পালাবদলের সাথে সাথে তাওহিদের শােভামণ্ডিত এই ভূমিতে নেমে এলাে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তাওহিদের মশালে উদ্ভাসিত এই উর্বর ভূমিতে উদিত হওয়া সূর্যটা আস্তে আস্তে মেঘের আড়ালে চলে গেল। এক সত্য ইলাহকে ছেড়ে মানুষ খুঁজে নিল বহু ইলাহ আর বহু মাবুদ। মানুষ ভুলে গেল তার সত্যিকার রবকে। সেই একত্ববাদের বলয় থেকে যখনই মানুষের বিচ্যুতি ঘটেছে, তখনই মানুষ ভুলে বসেছে পৃথিবীতে তার আগমনের কারণ ও উদ্দেশ্য। কেন্দ্র থেকে বিচ্যুতি ঘটলেই যেভাবে পতন হয় সুবিশাল নক্ষত্রের, ঠিক সেভাবেই তাওহিদ থেকে দূরে সরে যাওয়াতে মানুষও হয়ে পড়েছে দিশাহীন। শেকড় ভুলে গেলেও শেকড়ের কিছু চিহ্ন মানুষ অজান্তে বুকের ভেতরে ধারণ করে রাখে। মক্কার মুশরিকদের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। তারা ভুলে গিয়েছিল একত্ববাদ,কিন্তু সেই একত্ববাদের নিশান বয়ে চলা মানুষগুলাের কিছু স্মৃতি তাদের অন্তর থেকে বিস্মৃত হয়নি কখনােই। এমন একটা স্মৃতি হলাে সাফা-মারওয়া পাহাড়ে। দৌড়ানাে। এটা আমাদের একেবারে শেকড়ের কাহিনি। মক্কা উপত্যকায় তখন কোনাে জনবসতি গড়ে ওঠেনি। চারদিকে কেবল ধু-ধু মরুভূমি। বালির এই বিশাল প্রন্তরে কোথাও কোনাে জনমানুষের চিহ্ন নেই। এমনই এক সময়ে পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তার স্ত্রী হাজেরা এবং পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামকে রেখে যান এই উপত্যকায়। মাথার ওপর প্রকাণ্ড সূর্য, পায়ের নিচে তপ্ত বালু। ক্ষুধা আর তৃয়ায় শিশু ইসমাঈলের প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত প্রায়। চোখের সামনে শিশুপুত্রের এমন আর্তনাদ আর আহাজারি দেখে যেন মাতা হাজেরা আলাইহাস সালামের বুক ফেটে যায়। ইসমাঈলের তৃয়া নিবারণের জন্য এক ফোঁটা জলের আশায় তিনি দিগবিদিক ছুটতে থাকেন। একটু জলের জন্য তিনি সাফা পর্বত থেকে মারওয়া পর্বতে, মারওয়া পর্বত থেকে সাফা পর্বতে ছুটোছুটি করেছিলেন সেদিন। যদি মিলে যায় একটুখানি জল! মাতা হাজেরা আলাইহাস সালামের সেদিনকার সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে পরবর্তীতে সাফা-মারওয়া পর্বতে দৌড়ানােকে হজের একটি পবিত্র রীতিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। এরপর, মক্কা উপত্যকা থেকে তাওহিদ বিলুপ্ত হলেও এই রীতিগুলাে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তারা এক আল্লাহকে ভুলে গেছে ঠিক, কিন্তু বংশপরম্পরায় চলে আসা এই রীতিগুলােকে তারা ঠিকই বুকের ভেতরে জায়গা দিয়েছিল। এ রকম এক জাহিলিয়াতের মধ্যে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করেছিল মক্কা এবং তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষগুলাে। জন্মের পর থেকেই তারা উপাসনা করে এসেছে মিথ্যে ইলাহ, মিথ্যে রবের। নিজেদের পূর্বপুরুষদের দেখাদেখি সেই মিথ্যে ইলাহদের বানিয়ে নিয়েছিল জীবনের সবকিছু। তবে, একত্ববাদের বলয় থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়লেও তারা আগের মতাে যথারীতি সাফা-মারওয়াতে দৌড়াদৌড়ি করত। এটাকে তারা মনে করত ইবাদত-বন্দেগির অংশ। তারা শেকড় ভুলে গেছে, কিন্তু ভুলতে পারেনি শেকড়ের চিহ্নকে। মনের অজান্তে সেটাকে বুকে বয়ে বেড়াচ্ছিল যুগের পর যুগ। এরপর, মহান রবের বদান্যতায় যখন সেখানে আবার তাওহিদের পুনরুত্থান হলাে, যখন তাওহিদ-সহ আবির্ভাব ঘটল মহামানব রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তখন আবার আস্তে আস্তে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করল মৃত মক্কা নগরী। শুকিয়ে যাওয়া পত্রপল্লব আবার সবুজ হয়ে উঠতে লাগল। যেন মৃত গাঙে ফিরে এলাে প্রাণের জোয়ার। সেই ডাক, সেই সুর আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে চারদিক থেকে দলে দলে মানুষ আবার প্রবেশ করতে লাগল একত্ববাদের বলয়ে। এ যেন দিশেহারা পথিকের দিশা। পথহারা পথিকের পথ আর কূলহারা নাবিকের কূল। এই তল্লাটে যেন এক বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটে গেল! গতকালকের ডাকাত লােকটা আজকে হয়ে উঠল সম্পদের আমানতদার। গতকাল যে মানুষটা যিনা আর ব্যভিচারে মজে ছিল, কোনাে এক অনন্য পর্শে আজ সে আগাগােড়া অন্য রকম। তাওবা করে বলেছে সে আর কোনােদিন ও-মুখী হবে না। সে তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত। গতকাল রাতে যে লােকটা তার সদ্যজাত কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার চিন্তা করছিল, কোনাে এক বিচিত্র কারণে আজ সে তার কন্যার গলা জড়িয়ে ধরে কান্না করছে। যে পিতার গতকাল হবার কথা ছিল হত্যাকারী, আজ সেই পিতা হয়ে গেছে কন্যার পরম অভিভাবক। কোন সে জিয়নকাঠি, যার অনুপম স্পর্শে রাতারাতি বদলে গেল তারা? সেটা হলাে ইসলাম। সাহাবি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু জাহিলিয়াতের এই নিয়মের সাথে পরিচিত ছিলেন। মক্কা এবং মদিনার মুশরিকরা যে সাফা-মারওয়াতে দৌড়াদৌড়ি করত এবং এই কাজকে তারা যে ইবাদতের অংশ মনে করত; তা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন তিনি। একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হলাে, আচ্ছা, আপনি কি সাঈ করতে ঘৃণা করতেন? হজের সময়ে সাফা-মারওয়া পর্বতে দৌড়াদৌড়ি করাকে সাঈ বলা হয়। মাতা হাজেরা আলাইহাস সালামের স্মৃতি রক্ষার্থে এই রীতিকে হজকেন্দ্রিক রীতিনীতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যখন বলা হলাে যে তিনি এই রীতিকে, অর্থাৎ সাফা-মারওয়ায় দৌড়ানােকে ঘৃণা করতেন কি না, তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমরা এটাকে ঘৃণা করতাম। কারণ এটা ছিল জাহিলিয়াতের রীতি। জাহিলিয়াতে থাকাবস্থায় আমরা এমনটি করতাম। কিন্তু, এই রীতিকে আমরা ততক্ষণ ঘৃণা করেছি যতক্ষণ না কুরআনের এই আয়াত নাযিল হয়১] অবশ্যই সাফা এবং মারওয়া পর্বত দুটো আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্যতম। অতএব, তােমাদের কেউ যদি হজ কিংবা উমরা করার ইচ্ছা করে, তাহলে তার জন্য এ দুটোতে (সাফা-মারওয়াতে) তাওয়াফ করাতে দোষের কিছু নেই সাহাবি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই কথা থেকে আমরা কয়েকটা। জনিস বােঝার চেষ্টা করব। জাহিলিয়াত থেকে উঠে এসে যারা নতুন ভােরের সােনারঙা রােদে রাঙিয়েছেন জীবন, যারা এতদিনকার যাপিতজীবনের সকল পাঠ ছেড়ে সূচনা করেছেন জীবনের নতুন অধ্যায়ের, তাদের কাছে সাঈ অর্থাৎ সাফা এবং মারওয়া পর্বতে দৌড়ানােকে বেশ অদ্ভুত ঠেকল। আজীবনের পরিচিত এবং প্রিয় এই রীতিকে তারা ঘৃণা করতেন। ভাবতেন, “আরে! এটা তাে জাহিলদের কাজ! জাহিলিয়াতের রীতি। আমরা এখন মুসলিম। চিন্তায় আর বিশ্বাসে বিশুদ্ধ আত্মা। আমরা কেন জাহিলিয়াতের রীতিনীতি পছন্দ করব? ঈমান আনার সাথে সাথে তারা ভুলে গেলেন বাপ-দাদাদের সব রীতিনীতি। পূর্বপুরুষদের আনীত, পালিত সকল বিধিবিধানকে রাতারাতি বুড়াে আঙুল দেখানাের সাহস যারা দেখাতে পারেন, তাদের ঈমানের পারদ কত উচুতে তা কল্পনাও করা যায় না। এরপর, যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে আয়াত নাযিল করে সাফা-মারওয়ায় দৌড়ানােকে সত্যায়িত করে দিলেন, যখন আল্লাহ তাআলা বললেন সাফা মারওয়ায় তাওয়াফে দোষের কিছু নেই, তখনই আবার তারা এই রীতিকে ভালােবাসতে শুরু করলেন। এতদিন এই রীতির বিরুদ্ধে মনের মধ্যে যে ঘৃণার পাহাড় তারা তৈরি করেছিলেন, আল্লাহর বিধান শােনামাত্রই সেই ঘৃণার পাহাড় ধূলিসাৎ হয়ে গেলাে। এটাই তাে প্রেম! এটাই অনুপম ভালােবাসা! আল্লাহর জন্যই ভালােবাসা আর আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করা! [খ] ফুযাইল ইবনু ইয়ায। একজন বিখ্যাত তাবিয়ি। তার দুনিয়াবিমুখতা এবং পরহেযগারি ছিল সবার মুখে মুখে। কিন্তু, একেবারে শুরুর জীবনে তিনি মােটেও ধর্মভীরু ছিলেন । তিনি ছিলেন সাংঘাতিক রকমের একজন ডাকাত। এলাকাবাসী তার ভয়ে সর্বদা তটস্থ থাকত। তাকে লােকজন এতটাই ভয় পেত যে, রাতের বেলা মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পর্যন্ত যেতে চাইত না। সকাল হবার জন্য অপেক্ষা করত। ভাবত, রাতে বের হলে নির্ঘাত ফু্যাইলের খপ্পরে পড়ে সর্ব হারাতে হবে। সেই ফুফাইল ইবনু ইয়াযের প্রথম জীবনের ঘটনা। তিনি পড়শির একটি সুন্দরী মেয়েকে ভালােবাসতেন। একরাতে ওই মেয়ের বাড়িতে হানা দেন তিনি। মেয়েটির ঘরে ঢােকার জন্য দেওয়াল টপকাতে যাবেন, এমন সময় কোথা থেকে যেন তার কানে একটি সুমধুর সুর ভেসে আসে। সেই সুর, সেই ঝংকারধ্বনি পাগলপারা করে দেয় ফুযাইলের মনকে। তার জীবনে এনে দেয় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। দুনিয়ার মােহে ডুবে থাকা ফুযাইলের অন্তরে শুরু হয় এক মহাসাইক্লোন। সেই সাইক্লোনে হৃদয়ের অলিন্দে জমে থাকা ধুলােবালি, মরচে পড়া বিস্মৃতির আস্তরণ মুহূর্তেই উড়ে চলে যায়। কোন সেই সুর, যা তছনছ করে দিয়েছিল ফু্যাইলের হৃদয়কে? কোন সেই অমৃত সুধা যা ঘুরিয়ে দিয়েছে তার জীবনের মােড়? সেটি হলাে পবিত্র কুরআনের সুরা আল হাদীদের একটি আয়াত যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন- ألم يأن للذين آمنوا أن تخشع قلوبهم ليكر الله وما تل مين الحق যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তাতে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি[1] এই আয়াত শােনার সাথে সাথে ফুযাইল বলে উঠলেন, অবশ্যই, হে আমার রব, সেই সময় উপস্থিত। ব্যস, এই একটি আয়াত বদলে দিল ফুযাইল ইবনু ইয়া রাহিমাহুল্লাহর জীবন। এরপর বাকি জীবনে তিনি আর কোনােদিন পাপ কাজের নিকটবর্তী হননি। পরের জীবনটাকে তিনি সাজিয়ে নিয়েছেন মহান আল্লাহ তাআলার বিধান অনুসারে। আল্লাহর রঙে রাঙিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। তার পরহেযগারি এবং দুনিয়াবিমুখ জীবনযাপনের জন্য তিনি পরবর্তী মানুষদের জন্য আদর্শে রূপান্তরিত হন।[২] পাপে ভরা জীবনে আমরা যখন মিথ্যার দিকে ধাবিত হই, লােক ঠকাই, তখন কি আমাদের একবারও মনে পড়ে না যে, এই কাজগুলাে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পছন্দ করেন কি না? একবারও মনে হয় না যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনীত দ্বীনের সাথে আমরা তামাশা করছি? যখন কোনাে পাপের নিকটবর্তী হই, তখন কি মনের মধ্যে একবারও আখিরাতের ভয় এসে দাঁড়ায় ? একটি আয়াত বদলে দিয়েছে ফু্যাইল ইবনু ইয়া রাহিমাহুল্লাহর গােটা জীবন; অথচ আমাদের সামনে গােটা কুরআনটাই বিদ্যমান। নিত্য আমাদের কানে আসে কুরআনের সুর-লহরি। তথাপি কখনাে কি ভেবেছি, এই কুরআন আমাদের হৃদয়ে কেন ঝড় তুলতে পারছে না? কেন এই কুরআন আমাদের হৃদয়ে সেভাবে দাগ কাটে না, যেভাবে দাগ কেটেছিল ফুযাইল রাহিমাহুল্লাহর মনে? [গ] খন্দকের যুদ্ধের সময়। মদিনার ইহুদি গােত্র বনু কুরাইজা মুসলিমদের সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করেছে। মদিনা শহরকে বহিরাগত শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার নিমিত্তে মুসলিমদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার যে চুক্তি তারা করেছিল, তা থেকে সরে এসে নিজেদের দুর্গে বসে আছে। এই ঘটনা মুসলিম শিবিরে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে সাহাবি আবু লুবাবা বনু কুরাইজা গােত্রের কাছে গেলেন। বনু কুরাইজা গােত্র চুক্তিভঙ্গ এবং তার ফলে আসন্ন শাস্তি নিয়ে বেশ ভীতসন্ত্রস্ত। তারা বারবার আবু লুবাবার কাছে জানতে চাচ্ছে, হে আবু লুবাবা! আমরা যদি দুর্গ থেকে বের হই, তুমি কি জানাে আমাদের কী শাস্তি হতে পারে? বারবার তাদের এমন জিজ্ঞাসার মুখােমুখি হয়ে আবু লুবাবা শেষ পর্যন্ত ইশারায় কিছু একটা বলে বসলেন। তিনি তার হাত দিয়ে গলায় ছুরি চালানাের ভঙ্গি করে বােঝাতে চাইলেন যে, ‘শাস্তি হিশেবে তােমাদের হত্যা করা হবে। তাই তােমরা দুর্গের বাইরে এসাে না। এই কাজটা করে আবু লুবাবা মুহূর্তেই অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে ফেলেছেন। তাদের আমানত নষ্ট করেছেন। মুসলিমদের পক্ষ থেকে এসে মুসলিমদের ব্যাপারে তিনি বনু কুরাইজা গােত্রকে সাবধান করছিলেন; অথচ এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আমানতের খিয়ানত। তিনি ভাবলেন, নিজ থেকে এই কথা বলে তিনি বড় ধরনের পাপ করে ফেলেছেন, যে পাপের কোনাে ক্ষমা নেই। তিনি দৌড়ে বনু কুরাইজার দুর্গ থেকে বের হয়ে মসজিদে নববিতে এসে থামলেন। মসজিদে নববির একটা খুটিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন আর বলতে লাগলেন, “আমি গুরুতর পাপ করে ফেলেছি। ও আল্লাহ, আমি গুরুতর পাপ করে ফেলেছি। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা না করলে আমি এই অবস্থা থেকে নিজেকে কোনােভাবেই মুক্ত করব না। এভাবে সাত দিন তিনি ওই খুঁটি জড়িয়ে কেঁদেছিলেন। কেবল খাওয়া আর সালাতের সময়গুলাে ব্যতীত বাকি সবটুকু সময় তিনি ওই খুঁটি জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন আর বলতেন, “আমি পাপ করে ফেলেছি। আমি মহাপাপ করে ফেলেছি। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা না করলে আমি এই অবস্থা থেকে নিজেকে কোনােভাবেই মুক্ত করব না । পরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে ক্ষমা করেন এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি কুরআনের আয়াতও নাযিল করেন।[১] কেবল একটা ইশারা! এই ইশারা করেই সাহাবি আবু লুবাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনে হলাে যে, তিনি বিরাট কোনাে পাপ করে ফেলেছেন। এরপর সেই পাপ থেকে বাঁচতে সাত সাতটা দিন নিজেকে খুঁটির সাথে জড়িয়ে রেখেছেন আর ক্ষমাপ্রার্থনা করে কেঁদেছিলেন। সাহাবি আবু লুবাবার মতন এমন সতর্ক হৃদয় কি আমাদের আছে? আমরা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতার পরে এভাবে ভয়ে শিউরে উঠি? অস্থির হয়ে যাই? নত হই? ফিরে আসি? একটা পাপের গুনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সাহাবি আবু লুবাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যে যে আকুলতা, সেই আকুলতা কি আমাদের মাঝে আছে আদৌ? [ঘ] ঐতিহাসিক তুসতার যুদ্ধের কথা। পারসিকদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের লড়াই। প্রতিটা মুহূর্ত কাটছে চরম নাভিশ্বাসের সাথে। জয়-পরাজয় আর মৃত্যুর হাতছানি বারবার উকি দিচ্ছে পারসিক আর মুসলিম উভয় শিবিরে। রাতভর যুদ্ধ হলাে। যুদ্ধের ফলাফল এলাে সূর্যোদয়ের ঠিক একটু পরেই। অবশেষে মুসলিমরা পারসিকদের ওপর বিজয়ী হলাে। তবে, সেদিনের ফজরের সালাত ছুটে গেল সকল মুসলিম সৈন্যের। যুদ্ধের প্রচণ্ড দামামার মাঝে কারও একটু ফুরসত মেলেনি ফজর আদায়ের। অন্য অনেকের মতাে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুরও সেদিন ফজরের সালাত কাযা হয়ে যায়। শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এতে তিনি পাপী সাব্যস্ত হবেন না। গুনাহগার হবেন না। যুদ্ধকালীন অবস্থার অপারগতার জন্য তাদের ছাড় দেয় ইসলামি শরিয়ত। তবু সেদিনের ফজর সালাত ছুটে যাওয়ার ব্যথা সারা জীবনেও আর ভুলতে পারেননি। সাহাবি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু। যখনই তার তৃসতার যুদ্ধের কথা মনে পড়ত, তখনই তিনি অঝােরে কাঁদতে শুরু করতেন। তার মুখে প্রায়ই শােনা যেত, “তােমরা আমাকে তুসতার বিজয়ের কথা বলছ? এ তাে নস্যি! আমার যে সেদিন ফজরের সালাতটাই ছুটে গিয়েছিল। এই সালাতের বিনিময়ে যদি উপহার হিশেবে পুরাে পৃথিবীও আমার সামনে উপস্থিত করা হয়, তবু আমি তা পছন্দ করব না।'[1] কেবল এক ওয়াক্ত সালাত কাযা হয়েছিল! তা-ও শরিয়তের দৃষ্টিতে সেই ছাড় তার জন্য বরাদ্দ ছিল। তারপরও এক ওয়াক্ত সালাত কাযা হয়ে যাওয়ায় আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনের যে অবস্থা, হৃদয়ে যে হাহাকার, ছুটে যাওয়া এক ওয়াক্ত সালাতের বিনিময়ে তিনি যে পুরাে দুনিয়াটাকেও তুচ্ছ ভাবছেন, তার এমন ভাবনা থেকে আমরা কী শিখতে পারি? আমরা শিখতে পারি, দ্বীনের বুনিয়াদি বিষয়গুলাের ব্যাপারে কীভাবে তৎপর হতে হয়। দ্বীনের প্রতিষ্ঠিত বিষয়ের জন্য আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনের গহীনে যে ব্যাকুলতা, সেই ব্যাকুলতা আমাদের আছে কি? জীবনে কত হাজার ওয়াক্ত সালাত আমরা ছেড়ে দিয়েছি তার কি কোনাে হিশেব আছে? এই যে হিশেবহীনভাবে সালাত কাযা করেই যাচ্ছি রােজ, এর জন্যে আমাদের অন্তরের কোথাও কি একটু অনুশােচনা জাগে? কখনাে কি একবার আমরা সাহাবি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতাে করে ভাবতে পেরেছি? গুরুত্ব বুঝতে পেরেছি? হুহু করে কাঁদতে পেরেছি? আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু কেবল এক ওয়াক্ত সালাতের জন্য দুনিয়াটাকেই তুচ্ছ ভেবেছিলেন, আর আমরা দুনিয়ার জন্য নিত্যদিনকার সালাতগুলােকে তুচ্ছ ভেবে দিন কাটাই। [ঙ] মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং রােমকদের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল। একপর্যায়ে উভয় দলের মাঝে একটি সন্ধি হয় যে, তারা আপাতত যুদ্ধ বিরতিতে যাবে। সন্ধিরও একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হলাে। তবে মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু সন্ধির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মুসলিম সৈন্যদের রােমক সীমান্তের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, সন্ধির মেয়াদ শেষ হওয়ামাত্র রােমকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। এতে করে রােমকরা পুনরায় যুদ্ধপ্রস্তুতি নেওয়ার আগেই তাদের পরাস্ত করে ফেলা যাবে। তারা কল্পনাও করতে পারবে না যে, মুসলিমরা যুদ্ধ বিরতির পর এত দ্রুত আক্রমণ করে বসবে। তা-ই হলাে। মুসলিম সৈন্যরা রােমক সীমান্তে গিয়ে অবস্থান নিল এবং সন্ধির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ামাত্রই তারা অপ্রস্তুত রােমকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রােমকরাও আর পেরে উঠল না মুসলিমদের সাথে। তারা পিছু হটতে শুরু করল। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বিজয়ের আশা নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সামনে অগ্রসর হতে দেখে পেছন থেকে একজন লােক ঘােড়ায় চড়ে দ্রুত বেগে তার সামনে চলে এলাে। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! মুসলিমদের আদর্শ হলাে অঙ্গীকার রক্ষা করা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা নয়। নিকটবর্তী হওয়ার পর দেখা গেল ইনি হলেন সাহাবি আমর ইবনু আবাসা রাযিয়াল্লাহু আনহু। তাকে কথাগুলাে বলতে দেখে মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমরা তাে অঙ্গীকার ভঙ্গ করিনি। নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হওয়ার পরে আক্রমণ করেছি। তখন আমর ইবনু আবাসা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনাে জাতির সঙ্গে কোনাে অঙ্গীকার করে, তাহলে সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কিংবা স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার শেষ হওয়ার ঘােষণা দেওয়া পর্যন্ত সে অঙ্গীকার ওই ব্যক্তি খুলবেও না, বাঁধবেও না। অর্থাৎ অঙ্গীকারবিরােধী কোনাে কাজ সে করবে না।[১] আমর ইবনু আবাসা রাযিয়াল্লাহু আনহু এই হাদিস দ্বারা মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে, কোনাে জাতির সাথে কৃত অঙ্গীকার স্পষ্টরূপে বাতিলের ঘােষণা দেওয়া ব্যতীত উক্ত জাতির বিরুদ্ধে কোনাে পদক্ষেপই নেওয়া যাবে না। যুদ্ধ তাে আরও অনেক পরের ব্যাপার। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু যেভাবে রােমকদের অতর্কিত আক্রমণ করে বসেছেন তা শরিয়তের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। মুসলিম বাহিনী একেবারে বিজয়ের দোরগােড়ায়। বিশাল শক্তিবহরের রােমক বাহিনীকে তারা প্রায় পরাস্ত করেই ফেলেছে। এমন সময় সেখানে একজন সাহাবি এসে জানালেন ভিন্ন কথা। ফিরে যেতে হবে মুসলিমদের, কারণ শেষােক্ত এই আক্রমণ শরিয়ত মােতাবেক বৈধ নয়। দলিল হিশেবে তিনি উপস্থিত করেছেন কেবল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটিমাত্র হাদিস। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে দুটো পথ। হয় তিনি আমর ইবনু আবাসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথাকে অগ্রাহ্য করে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন এবং বিজয় লাভ করে দখল করবেন রােমকদের দুর্গ। নয়ত তিনি একেবারে বিজয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে সিহতে ফেরত আসবেন। তার ঝুলিতে থাকবে না কোনাে প্রাপ্তি। বিজয়ের সকল আয়ােজন ভেস্তে দিয়ে তাকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে বিফল মনােরথে। যদি আমরা দুনিয়াবি দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করি, মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর জায়গায় যদি অন্যকেউ হতেন, কোন পথে অগ্রসর হতেন তিনি? যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী বিজয় ফেলে রেখে বেছে নিতেন পরাজয়ের মালা? কখনােই নয়। কিন্তু মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু তা-ই করলেন। বিজয়ের অলিন্দ থেকে তিনি সকল সৈন্যবাহিনী নিয়ে ফিরে চলে এলেন কেবল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করে। নবিজির কেবল একটি হাদিস তাকে ফিরিয়ে এনেছে সম্মুখ সমরের নিশ্চিত বিজয় থেকে। যুদ্ধে জয়লাভের গৌরব, বিজয়ের ফলে অর্জিত হতে যাওয়া সকল সম্ভাব্য অর্জনকে তিনি বিসর্জন দিয়ে দেন কেবল আল্লাহর রাসুলের আনুগত্য করবেন বলে। কেবল একটি হাদিস, একটি বাণী তাদের যুদ্ধজয়ের এ রকম চরম মুহূর্ত থেকেও ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল। আমাদের সামনে তাে গােটা কুরআন, হাদিস পড়ে আছে। আমরা জানি, কুরআন আমাদের যিনার কাছে ঘেঁষতে নিষেধ করে, সুদ-ঘুস খেতে নিষেধ করে। সালাত প্রতিষ্ঠা করতে বলে, যাকাত আদায় করতে বলে। সং হিশেবে বাঁচতে বলে। নবিজির সুন্নাহতে আমরা আমাদের জীবন গঠনের পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র দেখতে পাই। তবু কি আমরা এ সকল পাপ থেকে নিজেদের নিবৃত্ত করতে পারি? পারি না। যে ইসলাম, যে কুরআন, যে রাসুল তাদের জন্য এসেছিল, ঠিক একই ইসলাম, একই কুরআন, একই রাসুল আমাদের জন্যও। তবুও কী বিশাল পার্থক্য তাদের আর আমাদের ঈমানের মাঝে। [চ] বর্তমান সময়টা জাহিলিয়াতের সেই সময়ের চাইতে কোনাে অংশে কম নয়। চারদিকে কত রং-বেরঙের ফিতনা। নানান রকম ফাঁদ আর বিচিত্র সব চোরাবালির সমারােহ। একটু পা ফসকালেই ডুবে যেতে হবে অথৈ ফিতনার অতল গহ্বরে। পৃথিবী তার সমস্ত আয়োজন নিয়ে বসে আছে আমাদের বিভ্রান্ত, উদভ্রান্ত আর গঞ্চিতন করার জন্যে। আমাদের চিরশg ইবলিস শয়তানের রূপেও এসেছে বাহারি পরিবর্তন। সে এখন নানান রকম বেশে উপস্থিত হয় আমাদের কাছে। কখনাে বন্ধু বেশে, কখনাে-বা পরামর্শদাতা হিশেবে। দুনিয়ায় প্রাপ্ত বড় একটি নিআমত হলাে মুসলিম হিশেবে জন্মগ্রহণ করা। কিন্তু এই নিআমাত তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন আমরা এর যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারব। মুসলিম হয়ে কী লাভ হলাে, যদি আমি পদে পদে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকি? আমার জন্য নাযিল হওয়া জীবনবিধান অনুসারে জীবন যদি না-ই সাজাতে পারি, কী মূল্য আছে তবে এই মুসলমানিত্বের? আমি কুরআন পেয়েছি, হাদিস পেয়েছি, কিন্তু আমি কি আনাস ইবনু মালিকের মতাে হয়ে উঠতে পেরেছি? আমি কি পেরেছি আমার জাহিলিয়াত থেকে পুরােপুরি উঠে আসতে? আমি কি পেরেছি আমার জাহিলিয়াতের কর্মকাণ্ডকে ঘৃণা করতে? আমি মুসলিম, কিন্তু আমার জীবনে কি ফুযাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহর মতন কুরআনের প্রভাব আছে কোনাে? কুরআনের কোনাে আয়াত নিয়ে কি গভীরভাবে ভাবার এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার সময় আমার কখনাে হয়েছে? প্রতিদিন আমি তিলাওয়াত করি, ইহদিনাস সিরাত্বাল মুস্তাকীম—আমাদের সরলপথে পরিচালিত করুন। অথচ মসজিদ থেকে বের হলেই আমি আবার পাপের মধ্যে ডুবে যাই। ফিরে যাই আমার চির-পরিচিত সেই নাটক, সিনেমা আর আত্মপ্রবঞ্চনার জগতে। ভাবছেন, এসব আবার জাহিলিয়াত কীভাবে হয়? আদতে আমরা তাে পুরােপুরিই জাহিলিয়াতের মধ্যে ডুবে আছি। মােবাইল আর কম্পিউটারের ব্রাউজার হিস্টোরি যেগুলােকে আমরা এক ক্লিকে মুছে ফেলি, সেগুলােই তাে আমাদের জাহিলিয়াতের প্রমাণ। কত নিষিদ্ধ, অশুদ্ধ এবং অশ্লীল সাইটেই আমরা ঘােরাফেরা করি রােজ। যুগের আধুনিকতা পতিতাপল্লীকে আমাদের হাতের মুঠোয় পুরে দিয়েছে। সেই নিষিদ্ধ পল্লীর নিয়মিত খদ্দের আমরা। এই যে ভার্চুয়াল যিনা আর ব্যভিচারের মধ্যে আমাদের দু-চোখ আর দু-হাত ডুবিয়ে রেখেছি, এটা জাহিলিয়াতের চেয়ে কম কীসে? আমরা জানি, মিথ্যে বলা গুনাহের কাজ। এই নির্জলা সত্যটা জেনেও আমরা উঠতে-বসতে মিথ্যে কথা বলি। মানুষকে কষ্ট দেওয়া, লােক ঠকানাে, প্রতারণা করা, বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া, হারাম রিলেশানশিপে জড়িয়ে থাকা ইত্যাদি নানারকম জাহিলিয়াতে নিমগ্ন আমরা। কখনাে কি এই জাহিলিয়াতগুলােকে আমরা মন থেকে ঘৃণা করেছি বা করার চেষ্টা করেছি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতাে? পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ব্যাপারে কতই-না উদাসীন আমরা! অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতকে আমাদের জন্য ফরয করেছেন। ফরয মানে অবশ্য কর্তব্য, অবশ্য পালনীয়। বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ এবং বাতাসে কার্বন-ডাই অক্সাইড ছাড়ার মতােই জরুরি। অক্সিজেন গ্রহণ আর কার্বন-ডাই অকাইড ত্যাগ করতে না পারলে আমাদের অস্তিত্ব যেমন সংকটে পড়ে যায়, ঠিক সেভাবে সালাত আদায় না করলে আমাদের মুসলমানিত্বও সংকটে পড়ে যায়। অক্সিজেন সংকটে পড়ে যাওয়া মুমূর্ষ রােগীটা যেভাবে হাসপাতালে ছুটে আসে অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণের জন্য, মুসলমানিত্বের সংকটে পড়ে যাওয়া কোনাে ব্যক্তি কি সেভাবে মসজিদে ছুটে আসে? আসে না। কারণ, অক্সিজেন সংকটের ব্যাপারটা দৈহিক আর মুসলমানিত্বের ঘাটতিটা আত্মিক। আমরা আমাদের শরীর নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন আর চিন্তিত, আত্মা নিয়ে ততটাই ভাবলেশহীন। এই সংকট আর দুরবস্থা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের বদলাতে হবে। বদলাতে হবে ফুযাইল ইবনু ইয়া রাহিমাহুল্লাহর মতন—রাতারাতি, মুহূর্তেই। আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতাে জাহিলিয়াতকে ঘৃণা করতে হবে। সবার আগে নিজের দিকে তাকাতে হবে। আমাদের হতে হবে সাহাবি আবু লুবাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতন। যদি মনে হয় আমার দ্বারা অন্যায় হয়ে গেছে, পাপ কাজ হয়ে গেছে, মুহূর্তকাল না ভেবেই তাওবা করতে হবে। আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। আমাদের হৃদয় হতে হবে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতন। এক ওয়াক্ত সালাতের জন্য ছটফট করতে থাকবে আমাদের হৃদয়। হতে হবে মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের কাছে নিজের বিজয়, বীরত্ব, অহমিকা সবকিছুকে বিসর্জন দেওয়া শিখতে হবে। আমার কী করার কথা ছিল আর আমি কী করছি—এই ফর্মূলাতে নিজেকে কল্পনা করে যদি আমরা আমাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারি, তাহলেই আমরা এই জাহিলিয়াত থেকে আমাদের উত্তরণ করতে পারব, ইন শা আল্লাহ। আমরা যে গান শুনি আর রাতভর মুভি দেখি, এই কাজ কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পছন্দ করেন? অনুমােদন করেন? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে সেগুলাে থাকুক। আর যদি উত্তর না হয়, তাহলে এক্ষুনি, এই মুহুর্তে মােবাইল আর কম্পিউটারের প্রতিটি ফোল্ডারে থাকা সবগুলাে গান আর মুভি এক ক্লিকে ‘অল ডিলেট করে দিই। আমার ফোনের গ্যালারিতে থাকা আমার বান্ধবীর ছবিগুলাে দেখার অনুমতি কি আমার ধর্ম আমাকে দিয়েছে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে সমস্যা নেই। আর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে আমার কি উচিত নয় এই মুহূর্তেই সেগুলাে ডিলেট করে দেওয়া? রিলেশানশিপের ব্যাপারটা ভাবা যাক। যার সাথে দিনে রাতে আমি ভালােবাসা আদানপ্রদান করছি, রেস্টুরেন্টে খাচ্ছি, পার্কে হাত ধরাধরি করে ঘুরছি, বিবাহ- বহির্ভূত একটা সম্পর্কে জড়িয়ে যাকে আমি জাদু, ময়না, টিয়া আর সােনাপাখি সম্বােধন করে যাচ্ছি রােজ—এই কাজ কি আমার জন্য আদৌ হালাল? আদৌ কি আমার ধর্ম এটা সমর্থন করে? আদৌ কি একজন মুসলিম এভাবে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়াতে পারে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে এটা চলমান থাকুক। আর, উত্তর যদি না হয়, তাহলে আমার কি উচিত নয় আজকেই এসব ছেড়ে দেওয়া? তাওবা করা? আল্লাহর কাছে পূর্বের সকল কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়া? এভাবেই, রাস্তায় যখন কোনাে বেগানা নারীর দিকে নজর চলে যাবে, তার দিকে ড্যাবড্যাব চোখে তাকানাের আগে আমাদের ভাবতে হবে, এই কাজ কি মুসলিম হিশেবে আমার পক্ষে সাজে? যখন মুখ দিয়ে মিথ্যে কথা বেরিয়ে আসতে চাইবে, আমাদের ভাবতে হবে, আমি ততা মুসলিম। আমি কি মিথ্যে বলতে পারি? যখন কোনাে রিকশাওয়ালাকে ধমকাতে যাব, তার আগে ভাবা উচিত, এই আচরণ কি আমার সাথে যায়? যখন কোনাে লােককে ঠকাতে যাব, তখন ভাবব, ‘মুসলিম হয়ে আমি কি এটা করতে পারি? প্রতিটি কাজের আগে আমরা যদি নিজেকে একবার প্রশ্ন করতে পারি, তাহলেই অনেক সমস্যা, অনেক সংকট থেকে সহজেই আমরা বেরিয়ে আসতে পারব। আমাদের সংকল্প হতে হবে আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতােই। জাহিলিয়াত যতই সুন্দর, মনােহর আর আকর্ষণীয় হােক না কেন, যদি তা আমার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অনুমােদন না করেন, তাহলে সেটাকে আমরা মনেপ্রাণে ঘৃণা করব। আমাদের জীবন গঠন করতে হবে ফুযাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লার মতন; আল্লাহর বাণী শুনেই কেঁপে উঠেছিল যার অন্তরাত্মা। আমাদের হতে হবে সাহাবি আবু লুবাবার মতন; কেন্দ্র থেকে সামান্যতম বিচ্যুতিও যেন আমাদের অস্থির করে তােলে। আল্লাহর কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত হৃদয় যেন তড়পাতে থাকে অবিরাম। জ্ঞানার্জনের কথা বলতে গিয়ে সক্রেটিস বলেছিলেন, Know Thyself. মানে হলাে, নিজেকে জানাে। তিনি মনে করতেন, নিজেকে জানতে পারলেই জগৎকে জানা সহজ হয়ে যায়। পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযােজ্য। Change Yourself. নিজেকে পরিবর্তন করলেই আশেপাশে পরিবর্তন করা সহজ হয়ে যায়। সুতরাং, চলাে বদলাই। ∆"বেলা ফুরাবার আগে" বইটা সম্পূর্ণটাই গল্পেরঝুড়িতে দেওয়া হলো।∆


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে
→ বেলা ফুরাবার আগে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now