বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পাঁচ
হারবারের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে সাগরের দিকে ঘুরে গেল
ফরচুনা। থ্রটল খুলে দিল দৈত্যাকার কাফ্রি সরদার, বো উঁচু করে
নতুন শক্তিতে বিরাট ঢেউগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সাদা ইয়ট।
সার্জেন্ট এনভার নেকমেতিনের পুলিশ লঞ্চটা অনেকটা পিছিয়ে
পড়েছে।
‘কী হয়েছে বলুন,’ জিজ্ঞেস করল রানা।
‘বিস্ফোরণের প্রচণ্ড আওয়াজ শুনলাম। তাকাতেই দেখি
আকাশ থেকে সরাসরি রিফের ওপর পড়ে যাচ্ছে পে−নটা।’
‘আপনি সাহায্য করতে যাননি?’ জানতে চাইল রানা।
‘আমার ওই ঝক্করমার্কা, পুরনো বোট নিয়ে? সার, না দেখলে
বুঝবেন না সাগর কেমন ফুঁসছে। জান নিয়ে যে এখানে খবর
দিতে আসতে পেরেছি, সেটাই আমার ভাগ্য।’
আশ্চর্য একটা শান্ত ভাব চলে এসেছে রানার মধ্যে। খারাপভাল
সমস্ত চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলেছে ও, শুধু মনে রেখেছে
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অকুস্থলে পৌঁছাতে হবে ওদেরকে, তবেই
যদি কিছু করা যায়। কাফ্রি সরদার সালেভানের পাশে দাঁড়িয়ে
রয়েছে ও, প্রয়োজনে যাতে হুইল ধরতে পারে।
হঠাৎ জোরে একটা শব্দ হলো। চমকে উঠে ঘাড় ফেরাল
সবাই। হাত থেকে রাম-এর বোতলটা ফেলে দিয়েছেন মোরেল।
সামান্য টলছেন তিনি, মুখটা সাদা হয়ে গেছে, বার ধরে স্থির
করলেন নিজেকে।
‘কতটুকু চান্স আছে ওদের?’ ওর আরেক পাশ থেকে জানতে
চাইলেন মেনদেরেস।
‘ফর গড’স সেক, শক্ত হোন,’ তাঁকে বলল রানা। ‘গায়ে
একটা কোট চাপান, তারপর চলুন বেরোই।’
‘প্রচুর,’ বলল রানা। ‘পুরানো হলে কী হবে, ওটা তো একটা
ওয়ালরাস সিপে−ন, ডুবতে যথেষ্ট সময় নেবে। তা ছাড়া, সামদানি
টহফবৎ ঞযব খরপবহপব ঙভ ঈৎবধঃরাব ঈড়সসড়হং অঃঃৎরনঁঃরড়হ-ঘড়হপড়সসবৎপরধষ-ঝযধৎব অষরশব
িি.িগঁৎপযঙহধ.পড়স
২১
সেদিন বলছিল, তার পে−নে সবসময় শুধু লাইফজ্যাকেট নয়,
রাবারের ভেলাও থাকে।’
‘রিফটা কেমন, যেখানে পড়েছে পে−নটা?’
‘সেটাই চিন্তার বিষয়,’ জবাব দিল কাফ্রি সরদার।
মুখ থেকে পাইপ নামিয়ে বুড়ো খিজির হায়াত বলল,
‘আবহাওয়া খারাপ থাকলে সাগর উদ্ভট আচরণ করে।’
একটা ঢেউয়ের মাথায় চড়ছে ফরচুনা, ছুটে এসে পাশে
আঘাত করল জোরাল দমকা বাতাস। গোটা ইয়ট থরথর করে
কেঁপে উঠল, ঢাল থেকে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে।
মেনদেরেস ও হায়াত ছিটকে পড়ল একদিকে। সালেভানের
মস্ত কাঁধ ধরে ভারসাম্য রক্ষা করল রানা।
খপ করে হুইল ধরে দ্রুত ঘোরাল সরদার, আরেকটা ঢেউ
চলে আসবার আগেই সিধে করে নিল ফরচুনাকে।
কম্পাস হাউজিং-এর আলোয় অসুস্থ ও সন্ত্রস্ত দেখাল
মেনদেরেসকে। সেলুনের দরজা খুলে গেল, আলো পড়ল বাইরে।
কম্পানিয়নওয়ে ধরে উঠে আসছেন জিমি মোরেল, হাতে
জগ ভর্তি কফি ও মগ। ‘ওরেব্-বাপ, সাগর দেখছি সত্যি
খেপেছে!’
‘হের মোরেল, কেমন আছেন আপনি?’ জানতে চাইলেন
মেনদেরেস।
‘যেমন থাকার কথা, খালি বমি আসছে,’ বললেন মোরেল।
‘আমার আসলে ডাঙাতেই থাকা আসা উচিত ছিল।’
মেঘ কেটে যাওয়ায় বৃষ্টি থেমেছে।
কফি এত গরম যে জিভ পুড়ে যাচ্ছে, তারপরও ঘন ঘন চুমুক
দিচ্ছে রানা। লাল ও সবুজ নেভিগেশন লাইট অদ্ভুত আভা
ফেলছে দুলন্ত ডেকের উপর। ইয়টের চারধারে শুধু আঁধার ও
মাতাল সাগর ছাড়া আর কিছু নেই।
ছেঁড়া মেঘগুলো সরে যেতে চাঁদ উঠল, কিছু তারাও দেখা
দিল। বড় বড় ঢেউয়ের উপর দিয়ে অনায়াসে এগোচ্ছে ফরচুনা।
তারপর ইঞ্জিনের আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠল অন্য রকম একটা
গর্জন, একটু যেন ফাঁপা, সেই সঙ্গে চাঁদের আলোয় দেখা গেল
সাদা পানির একটা ঝরনা পঞ্চাশ ফুট উঁচু হয়ে আছে।
‘আরে, দেখুন তো, কী ওটা?’ ঘাবড়ে যাওয়ায় বেসুরো
শোনাল মেনদেরেসের কণ্ঠস্বর।
‘বো− -হোল,’ জানাল কাফ্রি সরদার।
‘সেটা কী জিনিস?’ জানতে চাইলেন মেসদেরেস।
‘পানির নীচে পাহাড়-প্রাচীর আছে,’ ব্যাখ্যা করছে সরদার।
‘ওই প্রাচীরের গায়ে বিশাল একটা গর্ত আছে। গর্তটার উপরে
ছাদ নেই, ফাঁকা, আকাশ দেখা যায়। খারাপ আবহাওয়ার সময়
সাগরের পানি তীব্রবেগে গর্তে ঢুকে ওপর দিয়ে বেরিয়ে আসলে এ
রকম দেখায়। রিফের ভেতর দিকটা আসলে ফাঁপা।’
অকুস্থলে পৌঁছাচ্ছে ওরা। কথাবার্তা থেমে গেল। রিফের যে
অংশটা পানির উপর মাথা তুলে আছে, সেটা দুর্গের কালো
প্রাচীরের মত দেখতে, এবড়োখেবড়ো, ত্রিশ ফুট উঁচু। পানির
নীচের একটা প্রবাহ টেনে নিতে চাইল ওদেরকে, তবে সরদার
হুইল ঘুরিয়ে পোর্ট-এর দিকে বাঁক নিচ্ছে বলে কোনও বিপদ ঘটল
না। অবশ্য ফরচুনার কিল-এর গায়ে চাপড় মারার ফাঁপা এক
ধরনের শব্দ হলো। একদিকে বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে
বিপুল পানি, ফেনা হয়ে উঠে যাচ্ছে অনেক উপরে; বাকি সবদিকে
সাদাটে কী সব দেখা যাচ্ছে। ওগুলো এবড়োখেবড়ো পাথর,
পানির উপর মাথা তুলে আছে।
থ্রটল বন্ধ। বড়সড়, সবুজ একটা পাথরের দিকে মন্থর বেগে
ভেসে চলেছে ওরা। রিফের দক্ষিণ কোণ ঘুরছে ইয়ট। ওই
দিকটায় বাতাস ও সাগরের অস্থিরতা অনেক কম হবে।
পানির উপর মাথা তোলা পাথর বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে,
চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় দেখা যাচ্ছে সব। যতদূর দৃষ্টি যায়
২২
কোথাও রাহি সামদানির সিপে−নের চিহ্নমাত্র নেই।
সামনের জানালাটা খুলল সরদার। স্পটলাইটের সুইচ অন
করল রানা, ধীরে ধীরে একদিক থেকে আরেকদিকে ঘোরাচ্ছে
ওটা। পানির উপর দিয়ে রিফের দিকে এগোচ্ছে আলো।
উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল খিজির হায়াত, হাত তুলে কী
যেন দেখাচ্ছে। রুপালি ফিউজিলাজের একটা অংশে স্পটলাইটের
আলো পড়েছে। হুইলটা রানার হাতে ছেড়ে দিয়ে নোঙর ফেলার
জন্য ইয়টের পিছনদিকে ছুটল সরদার। ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল
রানা।
মেনদেরেস ও হায়াত ডেকে বেরিয়ে গেছে। হুইলহাউস
থেকে বেরিয়ে তাদের দিকে এগোচ্ছে রানা, হঠাৎ সিরিয়ান
মিলিওনেয়ার আতঙ্কে গুঙিয়ে উঠলেন।
দ্রুত হুইলহাউসের মাথায় উঠে এল রানা, মেনদেরেসের দৃষ্টি
অনুসরণ করে স্পটলাইটটা ঘোরাল। দৃশ্যটা দেখামাত্র মোচড়
দিয়ে উঠল ওর পেট। এক টুকরো মাংস নিয়ে কুকুররা যেমন
মারামারি করে, চোখ ধাঁধানো সাদা আলোয় ঠিক তেমনি উন্মত্ত
আচরণ করছে কয়েক ডজন হাঙর। একটা রাক্ষসের কুৎসিত
মাথা পানি ছেড়ে উপরে উঠল, দুই দাঁতের মাঝখানে আটকানো
রয়েছে মানুষের ছিঁড়ে আনা একটা হাত।
লাফ দিয়ে ডেকে নেমে কেবিনের দিকে ছুটল রানা। একটু
পরেই বেরিয়ে এল, হাতে একটা অটোমেটিক কারবাইন নিয়ে।
রেইলের সামনে দাঁড়াল, হাঙরগুলোর চকচকে গা লক্ষ্য করে
একের পর এক ফায়ার করছে।
আহত হাঙরগুলো মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট শুরু করল, চারদিকে
পানি ছিটাচ্ছে। আশপাশের সাগর লাল হয়ে উঠল। এদিক
সেদিক ভেসে যাচ্ছে কাঁচা মাংসের টুকরো ও ফালি। এক মিনিট
পর থামল রানা, কোনও লাভ হবে না জেনে অসহায় বোধ
করছে। যা হওয়ার হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।
হাতের খালি রাইফেলটা ডেকে ফেলে দিল রানা, এলোমেলো
পা ফেলে নীচে নেমে গেল। অসহায় ভঙ্গিতে নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি
বিনিময় করল বাকি সবাই। এক সময় ঘুরল কাফ্রি সরদার,
হুইলহাউসে ঢুকে নিভিয়ে দিল স্পটলাইট।
সেলুনে রয়েছে রানা। একটা চেয়ারে বসে আছে, সামনে
খালি একটা গ−াস। বোতলটা ধরতে যাচ্ছে, এই সময় দরজা খুলে
কেয়ার ফ্রি ক্লাবের মালিক জিমি মোরেল ভিতরে ঢুকলেন।
তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে উল্টোদিকের চেয়ারটায় ধপ করে বসে
পড়লেন তিনি। ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাঁকে।
‘কেমন দেখলেন ওদিকটা?’ জিজ্ঞেস করল রানা। ‘ওগুলো
এখনও আছে?’
জবাব না দিয়ে দু’হাত তুলে মুখ ঢাকলেন মোরেল। ‘পে−নটা
রিফ থেকে নেমে গেছে,’ বিড়বিড় করে বললেন তিনি।
গ−াসে খানিকটা হুইস্কি ঢেলে তাঁর দিকে বাড়িয়ে ধরল রানা।
‘নিন।’
মুখ থেকে হাত সরিয়ে মাথা নাড়লেন মোরেল। ‘তার চেয়ে
একটা সিগারেট ধরাই।’ কাঁপা হাতে সিগারেট ধরিয়ে ঘন ঘন
কয়েকটা টান দিলেন।
খানিক পর মুখ খুলল রানা। ‘আপনি তখন বললেন আমার
সুরাইয়া।’
‘দিলরুবা আমাকে নিজের স্যুইটে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
আপনাদের ব্যাপারটা সংক্ষেপে শোনালেন আমাকে। আপনি
তাঁকে ভালবাসেন, তিনিও আপনাকে ভালবাসেন ইত্যাদি।’
‘কোথায় যাচ্ছিল ও?’ জানতে চাইল রানা। ‘বৈরুতে?’
মাথা ঝাঁকালেন মোরেল। ‘হ্যাঁ। হিযবুল−াহ-র তরফ থেকে
একটা অনুরোধ পেয়েছেন তিনি। ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটা
দেশে গান গেয়ে একটা ফান্ড তৈরি করে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে
তারা। ওই টাকা খরচ হবে ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে আহত
২৩
হিযবুলা− হদের চিকিৎসায়।’
‘কিন্তু আমাকে কিছু না বলে চলে যাচ্ছিল কেন?’
‘দিলরুবার ধারণা, এভাবে বিদায় নেয়াটাই সবচেয়ে ভাল।’
মাথা নাড়ল রানা। ‘এ আমি মেনে নিতে পারছি না। এর
মধ্যে নিশ্চয়ই অন্য কোনও কারণ আছে। কী সেটা?’
রানার দিকে দীর্ঘ এক মুহূর্ত একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর
মোরেল বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি ঠিক ধরেছেন, এর মধ্যে অন্য
একটা কারণ আছে। তবে সেটা আপনাকে জানাতে নিষেধ
করেছেন তিনি।’ রানা কিছু বলতে যাচ্ছে দেখে হাত তুলে বাধা
দিলেন মোরেল। ‘যেহেতু দিলরুবা বেঁচে নেই, কথাটা আপনাকে
বলা যেতে পারে।’ খুক করে কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন
তিনি। ‘তাঁর ব−াড ক্যান্সার। আর মাত্র তিন মাস বাঁচতেন।’
টেবিল থেকে বোতলটা তুলে নিয়ে হুইলহাউসে ঢুকল রানা।
খিজির হায়াত ও কাফ্রি সরদারের সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলছেন
মেনদেরেস। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে ডেকে বেরিয়ে এল ও,
রেলিঙের সামনে দাঁড়িয়ে সাগরের দিকে তাকাল।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে বলতে পারবে না রানা, একসময়
খেয়াল করল অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে, পানির উপর
থেকে সরে যাচ্ছে কুণ্ডলী পাকানো কুয়াশা।
দুঃস্বপেড়বর ইতি ঘটেছে। সাগরে এখন শান্ত ঢেউ, রিফের
গোড়ায় আছাড় খেয়ে সামান্যই ফেনা তুলছে ওগুলো। বে−া-হোল
চুপ করে আছে। ফিরে গেছে হাঙরগুলো। সিপে−ন ওয়ালরাসের
ফিউযিলাযটাকে আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
পোর্ট সাইডের ত্রিশ কি চলি−শ গজ দূরে নোঙর ফেলেছে
পুলিশ লঞ্চ। হুইলহাউস থেকে বেরিয়ে এসে হাত নাড়ল সার্জেন্ট
এনভার নেকমেতিন। তারপর পানিতে ফেলা ডিঙ্গিতে চড়ে বৈঠা
চালাতে শুরু করল, ফরচুনার দিকে আসছে।
ইয়টের ডেকে উঠে এসে সার্জেন্ট বলল, ‘সরকারী ডকে খবর
পাঠিয়েছি আমি। ওরা একটা স্যালভেয বোট ও দুজন ডাইভার
পাঠাচ্ছে। আশা করছি দুপুরের মধ্যে পৌঁছে যাবে।’
মাথা নাড়ল রানা। ‘তার দরকার নেই। আমি নিজেই ডুব
দেব।’
‘পাগলামি করবেন না, হের রানা!’ তীক্ষ্ন কণ্ঠে বললেন
মোরেল, হুইলহাউস থেকে বেরিয়ে আসছেন। তাঁর পিছু নিয়ে
বাকি সবাইও আসছে। সন্দেহ নেই রানা ও সুরাইয়ার ব্যক্তিগত
সম্পর্কটা মোরেলের মাধ্যমে ইতোমধ্যে জেনে ফেলেছে তারা।
‘আমাকে নামতেই হবে,’ শান্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলল রানা।
কাফ্রি সরদার নরম সুরে বলল, ‘ওখানে কিছু পাবেন না, সার,
মিস্টার রানা। দু’একটা টাইগার শার্ক থাকতে পারে, কেউ কিছু
ফেলে গেছে কি না দেখছে খুঁজে।’
‘নিজের চোখে দেখতে হবে আমাকে,’ বলে নেকমেতিনের
দিকে ফিরল রানা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাফ্রি সরদারের দিকে ফিরল
সার্জেন্ট। ‘আপনাদের এক্সট্রা অ্যাকুয়ালাঙটা দয়া করে রেডি
করুন, সরদার। ওঁর সঙ্গে আমিও নামব।’ রানার দিকে ফিরে
ক্লান্ত ভঙ্গিতে একটু হাসল সে। ‘আপনি হয়তো ভুলে গেছেন যে
এদিকের সব দায়িত্ব আমারই পালন করার কথা।’
‘আপনারা দুজন সত্যি পাগল নাকি?’ মেনদেরেস বললেন।
তাঁর কথায় কান না দিয়ে জুতো ও জ্যাকেট খুলতে শুরু করল
রানা। দেখাদেখি সার্জেন্ট নেকমেতিনও।
ঠাণ্ডা কম লাগবে ভেবে প্যান্ট ও শার্ট খুলল না ওরা। সেলুন
থেকে ইকুইপমেন্ট নিয়ে এল কাফ্রি সরদার। হায়াতের সাহায্যে
দ্রুত সেগুলো পরে নিল রানা ও নেকমেতিন।
রেইল টপকে ইয়টের কিনারায় দাঁড়াল দুজন, তারপর
একসঙ্গে লাফ দিল। প্রচণ্ড ঘুসির মত আঘাত করল ওদের ঠাণ্ডা
২৪
পানি। সারফেসের ঠিক নীচে ঝুলে রয়েছে রানা, এয়ার সাপ−াই
অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে স্বচ্ছ পানির গভীরে ডুব দিল, সঙ্গীর জন্য
অপেক্ষা করল না।
রানার মনে হলো সময়টা যেন একটা ঘোরের কাটছে, যে-
কোনও মুহূর্তে কেটে যাবে সেটা, আর তখন হাত বাড়ালেই ছুঁতে
পারবে ও সুরাইয়াকে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ছায়ার ভিতর ঝুলে থাকতে দেখল রানা
ওয়ালরাস পে−নটাকে। রিফের গোড়া থেকে বিস্তৃত সামুদ্রিক
ঘাসের উপর পড়ে রয়েছে ওটা। সেদিকে এগোবার সময় সাগরের
তলায় প্রবাহিত একটা স্রোতের আকর্ষণ অনুভব করল রানা, ওকে
টেনে নিয়ে যেতে চাইছে বিশাল একটা গহ্বরের দিকে। ওই
অতল অন্ধকার গহ্বর থেকেই উঠে এসেছে রিফ, অর্থাৎ পাহাড়প্রাচীরটা।
পে−নের মূল কাঠামো এখনও অক্ষত রয়েছে, তবে লেজ ও
ব্যাগেজ কমপার্টমেন্ট পুরোটাই বিচ্ছিনড়ব হয়ে ভেসে গেছে কোথাও,
ফিউজিলাজের একদিকে রেখে গেছে বিরাট একটা এবড়োখেবড়ো
গর্ত। ছিনড়বভিনড়ব, তোবড়ানো ধাতব কাঠামো কালো হয়ে আছে।
রানা ধারণা করল, পে−নে প্রচণ্ড একটা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ওকে
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাশে এসে স্থির হলো নেকমেতিন।
সামান্য ভাঁজ পড়ল সার্জেন্টের কপালে। আশ্বস্ত করবার
ভঙ্গিতে ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকাল রানা, তারপর দুজন একসঙ্গে
সাঁতরে পে−নটার ভিতর ঢুকল। সিটগুলো আছে এখনও, কন্ট্রোল
কেবিনের দরজাটা স্রোতের সঙ্গে মৃদু নড়ছে, তবে কোথাও
কোনও লাশ নেই। μু-আরোহীরা যেন স্রেফ অদৃশ্য হয়ে গেছে।
কেবিনে ঢুকল নেকমেতিন। ফিউজিলাজ ধরে বাইরে থাকল
রানা। সারফেসের উপরে সূর্য উঠছে, পানি ভেদ করে নেমে
আসছে আলোর আভা। তবে প্রাণের কোনও উপস্থিতি চোখে
পড়ছে না।
কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে রানার কাঁধে টোকা দিল সার্জেন্ট,
তারপর হাত তুলে সামুদ্রিক ঘাসগুলো দেখাল রিফের গোড়া
থেকে শুরু, শেষ হয়েছে পাহাড়-প্রাচীরের কিনারায় পৌঁছে,
স্রোতের টানে শুয়ে আছে সব। সঙ্গে সঙ্গে ধরতে পারল রানা, কী
বোঝাতে চাইছে সে।
বছরের পর বছর জোরালো স্রোত বিরতিহীন আঘাত করে
করে পাহাড়-প্রাচীরের গোড়া খেয়ে ফেলেছে, নীচে তৈরি হয়েছে
বিশাল একটা গুহা। হয়তো হাঙরগুলো আসবার আগেই স্রোতের
টানে দু’একটা লাশ ওই গুহায় গিয়ে পড়েছে।
পে−ন ছেড়ে দিয়ে পাহাড়-প্রাচীরের গোড়া লক্ষ্য করে এগোল
রানা। গুহার মুখটা গাঢ় ও মোটা লম্বা একটা দাগ, মাত্র তিন ফুট
চওড়া। মাথা নিচু করে ভিতরে ঢুকে সার্জেন্টের জন্য অপেক্ষা
করছে ও।
গুহার ভিতর ছোট ছোট রঙ-বেরঙের মাছের কোনও অভাব
নেই, বেশিরভাগই গায়ে রঙধনু নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর মাথার
উপর ক্যাথেড্রাল-এর খিলান তৈরি করেছে ওগুলোর একটা বিরাট
ঝাঁক, ছাদের বে−া-হোল হয়ে নীচে নামছে দিনের প্রম রোদ।
আশ্চর্য শান্ত পরিবেশ, যেন পৃথিবীর বাইরে কোথাও রয়েছে
রানা। হঠাৎ ওর পাশে চলে এল সার্জেন্ট, অমনি মাছের বিশাল
মেঘটা ভেঙে গেল, দেখা গেল গুহার ছাদে একটা লাশ আটকে
রয়েছে, নীচের দিকে মুখ করা।
রাহি সামদানির লাশ। বাতাস ভর্তি একটা লাইফ-জ্যাকেট
পরে থাকায় ছাদের সঙ্গে সেঁটে আছে দেহটা। চোখ দুটো বন্ধ,
হাত-পা স্থির। শরীরের কোথাও কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই।
নেকমেতিন ও রানা একসঙ্গে উঠছে, ওদের পথ থেকে ছুটে
পালাচ্ছে মাছগুলো। সাঁতরে গুহার মুখের দিকে ফিরে আসছে
ওরা দুজন।
বিশ ফুটে ডিকমপ্রেশন-এর জন্য কয়েক মিনিট থামল ওরা,
২৫
সারফেসে মাথা তুলল ফরচুনার পিছন দিকে। সবার আগে খিজির
হায়াতই দেখতে পেল ওদেরকে। উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলেও,
ওদের বোঝাটাকে চিনতে পেরে অকস্মাৎ বুজে এল তার গলা।
হঠাৎ নীরবতা নেমে এল। হায়াত শুধু একবার জোরে নিঃশ্বাস
ফেলল, তা ছাড়া অনেকক্ষণ আর কোনও শব্দ নেই। তারপর,
ধীরে ধীরে জানতে চাইলেন মোরেল, ‘আপনি বলতে চাইছেন,
ইয়টের পাশে একটা মই নামিয়ে রেখেছে কাফ্রি সরদার, সার্জেন্ট, ব্যাপারটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়?’
সেটা বেয়ে দ্রুত নেমে এল সে, হাত বাড়িয়ে শক্ত করে ধরে
ফেলল মৃত পাইলটের লাইফ-জ্যাকেট। তাকে সাহায্য করবার
জন্য মইয়ের মাথা থেকে নীচের দিকে ঝুঁকলেন আদনান
মেনদেরেস। সবার শেষে রানা যখন মইয়ের মাথায় উঠে এল,
রাহি সামদানির লাশটা ততক্ষণে চিৎ করে শোয়ানো হয়েছে
হুইলহাউসের পাশে।
নিজের অ্যাকুয়ালাঙ ডেকে নামিয়ে রাখল রানা, তারপর
হায়াতের হাত থেকে একটা তোয়ালে নিয়ে রাহি সামদানির মুখটা
ঢেকে দিল। সিধে হলো, আশ্চর্য শান্ত দেখাচ্ছে ওকে, সরাসরি
নেকমেতিনের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘না,’ সার্জেন্ট জবাব দিল। ‘ব্যাপারটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়,
কোনও সন্দেহ নেই, স্যাবোটাজ।’
‘গায়ে কোনও দাগ নেই,’ অবাক হয়ে বলল খিজির হায়াত।
‘ওগুলো ওকে ধরেনি কেন?’
মাস্কটা মাথার দিকে ঠেলে দিল রানা, মুখ থেকে বের করল
রাবার মাউথপিস। ‘ওকে আমরা রিফের তলা থেকে পেয়েছি।
পে−ন পানিতে পড়ার সময় সম্ভবত কন্ট্রোলে ছিল ও। কেবিন
থেকে বেরুতেই জোরাল একটা স্রোত সোজা গুহার ভেতর টেনে
নেয়।’
‘তা হলে ওর লাইফ-জ্যাকেট ফোলা কেন?’ ছয়
নিজের স্যুইটে ফিরে এসে সোজা বেডরুমে ঢুকল রানা। যেমন
রেখে গেছে বিছানা ধস্তাধস্তির ফলে এলোমেলো এখনও
তেমনি আছে। বালিশের একটা অংশ এখনও নিচু হয়ে আছে,
যেখানে মাথা রেখেছিল সে। ঝুঁকে সেখানটায় হাত বুলাল ও।
তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
‘সম্ভবত তলিয়ে যাবার সময় রিফ্লেক্স অ্যাকশনে বাতাস ভরে
নিয়েছে। হয়তো বুঝতে পেরেছিল কী ঘটতে যাচ্ছে, ভেবেছিল
বে−া-হোল দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে।’
মেনদেরেস জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাকি সবাই?’
‘ওখানে আর কিছুই নেই,’ জবাব দিল সার্জেন্ট নেকমেতিন।
‘আমার মনে হলো পে−নে কিছু একটার বিস্ফোরণ ঘটেছে।’ পরদিন শাওয়ার সেরে নতুন কাপড় পরছে রানা, নক করে
ভিতরে ঢুকল তরুণ সার্জেন্ট নেকমেতিন। ড্রইং রুমের সিঙ্গেল
সোফায় বসে একটা কাগজ বাড়িয়ে ধরল রানার দিকে। ‘রাহি
এয়ার অ্যান্ড সি ট্রাভেল থেকে সিপে−ন ওয়ালরাস ফ্লাইটের
প্যাসেঞ্জার লিস্টটা নিয়ে এসেছি। মাত্র চারজন। দিলরুবা ওরফে
ভ্র কোঁচকালেন মেনদেরেস। ‘কিছু বলতে কী? দুই ইঞ্জিনের
একটা?’
মাথা নাড়ল সার্জেন্ট। ‘যাই ফেটে থাকুক, জিনিসটা ব্যাগেজ
কমপার্টমেন্টে ছিল। লেজের পুরোটা উড়িয়ে নিয়ে গেছে।’
২৬
সুরাইয়া, ফ্রাজিয়ো নামে এক ব্রাযিলিয়ান ব্যবসায়ী, মিসেস
সিমসন নামে এক ব্রিটিশ ট্যুরিস্ট ও সেলিম মোস্তাকিম।’
ধীরে ধীরে ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল রানা। ‘সেলিম
মোস্তাকিম? তুর্কি সাইপ্রিয়ট?’ তীক্ষè হলো চোখের দৃষ্টি।
সার্জেন্ট বলল, ‘না, ফিলিস্তিনি।’ তাঁর সম্পর্কে যা জানে বলে
গেল সে।
মধ্যবয়স্ক, একটু খোঁড়াতেন। সেলিম মোস্তাকিম নয়, তাঁর
আসল নাম ডক্টর মোসাদ্দেক মাসলান। প্যালেস্টাইনের রামাল−ায়
মোসাদের হাতে বন্দি হয়েছিলেন এই বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী।
ছাড়া পাওয়ার পর থেকে খোঁড়াতেন।
বৈরুতে পালিয়ে এসে হিযবুল−াহকে নানাভাবে সাহায্য
করেছেন ডক্টর মোসেদ্দেক মাসলান, বিশেষ করে ইজরায়েলের
সঙ্গে যুদ্ধের সময়। তখনই ইজরায়েলিদের বোমা হামলায় আহত
হন। চিকিৎসা নিতে তুর্কি সাইপ্রাসে চলে আসতে হয় তাঁকে।
এখানে এসে একটা ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি যে লেবাননে
ফিরে যাচ্ছেন, তা সে জানত না।
‘প্রতিপক্ষরা ঠিকই জানত,’ বিড়বিড় করল রানা। ‘তবে
ব্যাগেজ কমপার্টমেন্টে বোমাটা তারা রাখল কীভাবে?’
‘খুব সহজে,’ বলল নেকমেতিন। ‘হ্যাঙ্গারে বা রানওয়েতে
তেমন লোকজন থাকে না, সন্ধের পর পে−নের কাছে পৌঁছানো
কারও জন্যে কোনও সমস্যা নয়।’
‘এখন কী করবেন আপনারা?’
‘কমিশনার-এর সঙ্গে গ্রিক সাইপ্রাসে যাচ্ছি আমি লারনাকা
বে-র ধেকেলিয়া-য়,’ বলল নেকমেতিন। ‘ওখানে ইউ.এন. আর্মড
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিটিং আছে। আশা করছি সন্ধের
আগেই ফিরতে পারব। কিছু জানতে পারলে বলব আপনাকে।
মেয়েটির কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছে, মিস্টার রানা। আমি
সত্যিই দুঃখিত।’
সার্জেন্ট চলে যাওয়ার দশ মিনিট পর স্যুইট থেকে বেরিয়ে
বার-এ চলে এল রানা।
কেউ নেই বারে। তবে টেরেসে পাওয়া গেল জিমি
মোরেলকে, বেলা করে ব্রেকফাস্ট খাচ্ছেন। ‘আসুন, হের রানা।
ব্রেকফাস্ট খান।’
মাথা নাড়ল রানা। ‘শুধু কফি।’
কফি দিয়ে গেল ওয়েটার। ধীরে ধীরে কাপটা খালি করল
রানা। মোরেলের বয়স হলে কী হবে, স্বাস্থ্য খুব ভাল, খিদেও
প্রচুর। সময় নিয়ে খাচ্ছেন তিনি।
‘আদনান মেনদেরেসকে দেখেছেন?’ জিজ্ঞেস করল রানা।
‘সার্জেন্ট নেকমেতিন মনে হয় গ্রিক সাইপ্রাসে গেলেন, হের
মেনদেরেসকেও তাঁর সঙ্গে যেতে দেখলাম।’
রানার জানা আছে, দুই সাইপ্রাসে আসা-যাওয়া করতে
পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না।
‘ডক্টর মোসাদ্দেক মাসলান সম্পর্কে আপনাকে কিছু বলেছেন
সার্জেন্ট নেকমেতিন?’
সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল জিমি মোরেলের। মাথা
ঝাঁকালেন। ‘ইজরায়েলিদের এই অন্যায় আচরণ কোনওমতে
মেনে নেয়া যায় না।’
‘বোমাটা কখন কীভাবে রাখা হয় পে−নে, তার একটা ধারণা
দিয়েছেন সার্জেন্ট,’ প্রসঙ্গ বদলে বলল রানা। ‘সেটা ভুল।’
‘কী রকম?’ কৌতূহলী দেখাল মোরেলকে। ‘আমার তো সেটা
যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা বলেই মনে হয়েছে।’
‘প্রমে আমারও তাই মনে হয়েছিল,’ বলল রানা। ‘পরে
শুনলাম রাহি সামদানি সব সময় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে লোডিং-এর
কাজটা করত। বছর কয়েক আগে এক শিপিং ক্লার্ক তার পে−নে
দুই কিলো হেরোইন তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়,
সেই থেকে কোনও রকম ঝুঁকি নিত না সে। তা ছাড়া, লাগেজ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now