বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১০
তিন
ইয়ট ফরচুনা। গভীর সাগর।
সেল ফোনে বিসিআই হেডকোয়ার্টার ঢাকার সঙ্গে আবার
যোগাযোগ করল রানা। এটা বিসিআই চিফ, ওর বস্ রাহাত
খানের নম্বর। তাঁকে রিপোর্ট করল রানা, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বেশ
কয়েকটা দেশের ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট ঘোরাফেরা করছে এদিকে।
কী ব্যাপার কিছু বুঝতে পারছি না, সার।’
বস বললেন, ‘ওদের কাজ ওদেরকে করতে দাও।’ মাত্র
দু’এক কথায় একটা ধারণা দিলেন কী করছে ওরা, তারপর
যোগাযোগ কেটে দিলেন।
ট্যুরিস্টের কাভার ঠিক রাখবার জ্যন্য গভীর সাগরে মাছ
ধরতে এসেছে রানা। কিছু মাছ ধরাও হলো। তারপর ফিশিং রড
কাফ্রি সরদারকে ধরিয়ে দিয়ে নিজের কেবিনে ঢুকল ও,
মেডিটেশনে বসবে।
ঠিক দু’ঘণ্টা পর গভীর ধ্যান শেষ হলো রানার। প্রশান্ত ও
তাজা একটা ভাব নিয়ে কেবিন থেকে বেরুচ্ছে, কাফ্রি সরদার
মাথা চুলকে বলল, ‘মিস্টার রানা, একটা ঝামেলা হয়েছে।’
‘কী ঝামেলা?’
‘কথার কথা হিসেবে মিস্টার মেনদেরেসকে মাছ ধরার
দাওয়াত দিয়েছিলেন আপনি, মনে আছে তো? ভদ্রলোক সেটাকে
সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলেছেন। খানিক আগে একটা বোট তাঁকে
পৌঁছে দিয়ে গেল।’
‘তাই?’ হেসে ফেলল রানা, তারপর ডেকে চোখ বুলাল।
‘কোথায় তিনি?’
‘খানিক আগে রিফ-এ গেছেন, স্পিয়ার দিয়ে মাছ ধরবেন।’
‘একা?’
মাথা ঝাঁকাল কাফ্রি সরদার। ‘মানা করেছি, কিন্তু আমার কথা
হেসে উড়িয়ে দিলেন।’
‘আমাকে ডাকতে পারতেন,’ অন্যমনস্কভাবে বলল রানা,
কন্ট্রোল কেবিন থেকে ডেকে বেরিয়ে এসে সাগরের উপর চোখ
বুলাল।
মাইলখানেক দূরে জোড়া মাস্তুল সহ একটা ইয়ট দেখা গেল,
পোল-এর মাথায় পতপত করে তুর্কি পতাকা উড়ছে, পানি কেটে
তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে স্যালামেস বন্দরের দিকে। তারপর
রানার দৃষ্টি কেড়ে নিল ছোট একটা সিপে−ন। দক্ষিণ-পুব দিক
থেকে আসছে ওটা, রোদ লাগায় ঝলসে উঠল রুপালি ও নীল
ফিউযিলাজ।
‘চলতি মরশুমে বৈরুত থেকে প্রচুর ট্যুরিস্ট নিয়ে আসছে রাহি
সামদানি,’ কম্প্যানিয়নওয়ে ধরে উঠে এসে রানার হাতে কফি
ভর্তি একটা মগ ধরিয়ে দিল কাফ্রি সরদার, ধোঁয়া উঠছে সেটা
থেকে। রানার দৃষ্টি অনুসরণ করে আবার সিপে−নটার দিকে
তাকাল। ‘খুব ভাল আয় করছে।’ আয়েশ করে চুমুক দিল নিজের
মগে, তারপর একটা চুরুট ধরাল।
‘ওড়াচ্ছেও দু’হাতে,’ বলল রানা। ‘রোজ রাতে জুয়ার বোর্ডে
যেভাবে হারছে...’ কথাটা শেষ না করে কাঁধ ঝাঁকাল।
মগটা শেষ করল রানা। ‘কী যেন নাম বললেন Ñ আদনান
মেনদেরেস। ভদ্রলোক একা গিয়ে কাজটা ভাল করেননি।’
‘যাই, দেখছি আমি,’ বলে কেবিনে ঢুকে অ্যাকুয়ালাঙ নিয়ে
১১
এল কাফ্রি সরদার।
‘আপনি গেলে বোট দেখবে কে?’ জিজ্ঞেস করল রানা।
‘তাও তো ঠিক,’ বলল সর্দার। ‘তা হলে আপনাকেই যেতে
হয়। অ্যাকুয়ালাঙ পরতে রানাকে সাহায্য করল সে, স্ট্র্যাপগুলো
জায়গামত আটকে দিচ্ছে।
‘স্পিয়ার গান?’ জিজ্ঞেস করল রানা।
কাঁধ ঝাঁকাল সরদার। ‘আমি একটা ভেঙে রেখেছি, মেরামত
করা হয়নি। আরেকটা মিস্টার মেনদেরেস নিয়ে গেছেন।’
‘এতক্ষণে বোধহয় ওটা দিয়ে নিজের পা ফুটো করে
ফেলেছেন,’ বলল রানা, ডাইভিং মাস্কটা মুখে পরে লাফিয়ে পড়ল
স্বচ্ছ পানিতে। এক মুহূর্ত থেমে এয়ার সাপ−াই অ্যাডজাস্ট করল,
তারপর তির্যক একটা পথ ধরে নামতে শুরু করল পানির গভীরে।
শব্দহীন পরিবেশে একা ভেসে বেড়াতে দারুণ লাগে। ঢেউয়ে
বাধা পাওয়ায় বাঁকা হয়ে নীচে নেমেছে রোদ। সাগরের মেঝেতে
ঝলমলে কার্পেটের মত বিছানো রয়েছে সবুজ ঘাস, তার ফাঁকে
ফাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝাঁক ঝাঁক রংবেরঙের মাছ। ফাঁকা জায়গায়
বালির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে লাল স্টারফিশ।
রিফটা আসলে বিচিত্র ভঙ্গিতে মোচড় খাওয়া ও বিদঘুটে
আকৃতির প্রবাল দিয়ে তৈরি একটা জঙ্গল। কোথাও অপূর্ব সুন্দর,
কোথাও রীতিমত কুৎসিত, আবার কোথাও এত ধারালো যে,
মারাত্মক বিপজ্জনক।
প্রবালের একটা ঝোপের ভিতর বড়সড় কয়েকটা রুপালি
মাদামোয়াযেলকে দেখা গেল, পরস্পরকে ধাওয়া করছে। একটু
থেমে ওগুলোকে দেখল রানা, তারপর ফিন লাগানো পা দুটো
জোরে ছুঁড়ে সামনে এগোল, ওকে এড়াবার জন্য ছিটকে দূরে সরে
গেল মাছগুলো।
প্রবাল জঙ্গলের পিছনে সাগরের তলা অদৃশ্য হয়ে গেছে।
গভীর পানিতে এক ঝাঁক রেইনবো ফিশ গাঢ় নীল বিস্তৃতি দখল
করে রেখেছে, ঝলমলে মেঘের আকৃতি নিয়ে কখনও নীচে
নামছে, কখনও উপরে উঠছে, প্রতিটি নড়াচড়ার সঙ্গে বদলে
যাচ্ছে প্রতিটি মাছের রঙ। আশ্চর্য এক দৃশ্য!
কয়েকটা নীল ম্যাকরলকে ধাওয়া করছে একটা হাঙর, হঠাৎ
দিক বদলে রেইনবোর ঝাঁকে ঢুকে পড়ল ওগুলো। ঝাঁকটা
বিস্ফোরিত হয়ে অসংখ্য রুপালি মেঘে পরিণত হলো। অকস্মাৎ
একটা হাত হ্যাঁচকা টান দিয়ে সরিয়ে নিল রানাকে, পরমুহূর্তে ওর
গা ঘেঁষে ছুটে গেল প্রকাণ্ড হাঙরটা। রানা ধারণা করল নিশ্চয়ই
ওটা মেনদেরেসেরই হাত হবে।
খাড়া পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে চওড়া একটা ফাটল দেখা
যাচ্ছে, সেটার কিনারা ধরে বিশ সেকেন্ড বিশ্রাম নিল রানা।
ফাটলের ভিতরটা ঝাপসা, যেন সবুজ কুয়াশা ঝুলে আছে। ওদিক
থেকে সাঁতরে বেরিয়ে এলেন আদনান মেনদেরেস, তারপর মুখ
তুলে উপরদিকে তাকালেন।
তাঁর এক হাতে হার্পুন গান, অপর হাতের স্পিয়ারে গাঁথা
রয়েছে একটা মাদামোয়াযেল। তাঁর দিকে এগোচ্ছে রানা, পানির
গায়ে হেলান দেওয়ার ভঙ্গিতে পোজ নিলেন ভদ্রলোক, মাছটা
নেড়ে দেখালেন ওকে। তাঁর ডান কাঁধের কাছে বেশ খানিকটা
রক্ত ঠিক যেন খয়েরি মেঘ হয়ে ঝুলে আছে, লম্বা কয়েকটা
ফিতের আকৃতি নিয়ে ভেসে যাচ্ছে নীল পানির ভিতর দিয়ে।
আরও কাছাকাছি হওয়ার পর রানা দেখল মেনদেরেসের ডান
হাতের উপরদিকটা খুব খারাপ ভাবে চিরে গেছে। সন্দেহ নেই
প্রবালে ঘষা লাগার ফল।
হাসলেন মেনদেরেস, যেন মারাত্মক কিছু নয় বলে আশ্বস্ত
করতে চাইলেন রানাকে। পরমুহূর্তেই তাঁর চোখ দুটো বড় হয়ে
উঠল। পিছন ফিরতে যাবে রানা, প্রচণ্ড শক্তিতে কী যেন ধাক্কা
খেল ওর পিঠে, পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে ছিটকে পড়ল শরীরটা।
নীল ও রুপালি একটা ঝলক সচেতন করে তুলল রানাকে,
১২
ঘাড় ফেরাতে দেখল সবুজ কুয়াশার ভিতর হারিয়ে যাচ্ছে একটা
আট ফুটি ব্যারাকুডা।
হঠাৎ ভয় পাওয়ায় মেনদেরেসের হাত থেকে স্পিয়ার গান
ছুটে গেছে, পিছনে রিকভারি লাইন নিয়ে সাগরের গভীরে নেমে
যাচ্ছে সেটা।
তাড়াতাড়ি সেদিকে ডাইভ দিল রানা। লাইনটা খপ করে ধরে
নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে গানটাকে। দ্রুত রিলোড করবার সময়
দেখল সরু একটা ফাটলের ভিতর সেঁধোবার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন
মেনদেরেস।
এতক্ষণে সবুজ কুয়াশা থেকে বেরিয়ে এল ব্যারাকুডা,
পজিশন নিল মেনদেরেসের কাছ থেকে বিশ ফুট দূরে। এক
সেকেন্ড পর ওটার পাশে আরেকটা হাজির হলো। রক্তের গন্ধ
পেয়ে মেনদেরেসকে ধরতে এসেছে ওগুলো। হাড়ে হাড়ে টের
পাচ্ছেন ভদ্রলোক একা আসাটা তাঁর মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে।
ভাসমান খয়েরি রক্তের মেঘ আকারে আরও বড় হচ্ছে। রানা
জানে এই রক্ত আরও হিংস্র মাছকে ডেকে আনবে। ফিন পরা পা
ছুঁড়ে উপর দিকে উঠতে শুরু করল ও, সেই সঙ্গে কাছাকাছি
ব্যারাকুডার সাদা পেট লক্ষ্য করে পয়েন্ট ব−্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ফায়ার
করল।
ব্যথায় মোচড় খাচ্ছে ব্যারাকুডা, ঝাঁকি লাগায় রানার হাত
থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল অস্ত্রটা। শরীরটাকে গড়িয়ে দেওয়ার
ভঙ্গিতে পাক খাচ্ছে আহত মাছ, লেজের অবিরাম বাড়ি লাগায়
আরও লাল হয়ে উঠছে পানি।
মেনদেরেসের দিকে এগিয়ে এল রানা, টেনে তাঁকে বের
করল ফাটলের মুখ থেকে। ওরা ঘুরছে, দেখল দ্বিতীয় ব্যারাকুডা
তার সঙ্গীর পাশে চলে এসেছে, নীচের চোয়াল ঝুলে পড়ায়
ভিতরে ভয়ালদর্শন দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। পানিতে তীব্র
আলোড়ন ও কম্পন উঠল, বুদ্বুদ সরে যেতে দেখা গেল মাংসের
ফালি ও হাড় ঝুলছে ওটার মুখ থেকে।
সবুজ কুয়াশার ভিতর থেকে রুপালি আরও মাছ উঠে
আসছে। তাড়াতাড়ি মেনদেরেসের একটা বাহু খামচে ধরল রানা,
তাঁকে নিয়ে উঠে আসছে সারফেসে।
অগভীর পানিতে সরে এল ওরা, প্রবালের উপর দিয়ে
সাঁতরাচ্ছে। খানিক পর মাথার উপর ফরচুনার খোল দেখা গেল।
সেটার পিছনে, সারফেসে মাথা তুলল দুজন।
মই বেয়ে প্রমে উপরে উঠলেন মেনদেরেস, রেলিং টপকাতে
তাঁকে সাহায্য করল কাফ্রি সরদার।
ডেকে উঠে এসে মাস্ক ও অ্যাকুয়ালাঙ খুলছে রানা, দেখল
চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁপাচ্ছেন মেনদেরেস, চোখ দুটো বন্ধ। রীতিমত
রাগ হচ্ছে ওর, বলল, ‘আপনার জানা ছিল না স্পিয়ার ফিশিং-এর
সময় শরীর থেকে রক্ত বেরুলে কী হতে পারে?’
‘ছিল,’ চোখ মেলে বললেন সিরিয়ান ভদ্রলোক। ‘তবে শুনে
শেখা ও ঠেকে শেখার মধ্যে পার্থক্য আছে। বিশ্বাস করুন, আমার
জন্মের শিক্ষা হয়ে গেছে। ধন্যবাদ, মিস্টার রানা মৃত্যুর মুখ
থেকে ফিরিয়ে আনার জন্যে। দ্বীপে ফিরে আপনাকে আমি শিভাস
রিগাল খাওয়াব।’
‘বাহ্, চমৎকার! তা হলে শোধবোধ হয়ে গেল,’ বলল রানা।
‘আপনাকেও ধন্যবাদ, হাঙরের পথ থেকে আমাকে সরিয়ে নেয়ার
জন্যে।’ তাঁকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল রানা। ‘চলুন নীচে
যাই, আপনার কাঁধে ব্যান্ডেজ করতে হবে। গিয়ারগুলো সরদার
তুলে রাখবে।’
পা ঝুলিয়ে একটা বাঙ্কের কিনারায় বসেছেন মেনদেরেস,
কাঁধে একটা তোয়ালে, একটু একটু কাঁপছেন। একটা গ−াসে
খানিকটা ব্র্যান্ডি ঢেলে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিল রানা। চুমুক দিয়ে
হাসলেন ভদ্রলোক।
রানা বলল, ‘আরেকটা কথা। ব্যবহার করার পর সব সময়
১৩
রিলোড করতে হবে স্পিয়ার গান, কারণ কেউ বলতে পারে না
আবার কখন ওটা আপনার দরকার হবে।’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে অসহায় একটা ভঙ্গি করলেন মেনদেরেস।
‘দেখা যাচ্ছে, ইয়াং ম্যান, আপনার কাছ থেকে অনেক কিছুই
শেখার আছে আমার।’
‘নিশ্চই আমারও আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার
আছে,’ বলে হাতঘড়ির উপর চোখ বুলাল রানা। ‘এখনই রওনা
হলে সন্ধ্যার কাছাকাছি স্যালামেসে পৌঁছাতে পারব আমরা।’
‘জী।’
‘মিস্টার সালেভান!’ ডাকল রানা। ‘চলুন ফিরি।’
হুইলহাউসে ঢুকে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল কাফ্রি সরদার। এক মুহূর্ত
পর থ্রটল খুলে দিয়ে ফ্যামাগুস্তা বে-র দিকে ঘুরিয়ে নিল
ফরচুনাকে।
পুব দিগন্তে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বোধহয় একটা ঝড়
আসবে।
সন্ধে ঠিক সাতটায় হারবারে পৌঁছে পুবদিকের পাথুরে জেটিতে
ইয়ট ভিড়াল কাফ্রি সরদার। তরুণ তুর্কি পুলিশ অফিসার এনভার
নেকমেতিন নিচু পাঁচিলে বসে চুরুট খাচ্ছিল, সিধে হয়ে কাফ্রি
সরদারের ছুঁড়ে দেওয়া রশিটা খপ করে ধরে ফেলল।
ইতোমধ্যে বাতাসের গতি বেড়ে গেছে, সাগর হয়ে উঠছে
উত্তাল। চেয়ারের পিঠ থেকে জ্যাকেটটা নিল রানা, কেবিন থেকে
বেরিয়ে এসে দেখল ওর জন্য অপেক্ষা করছেন মেনদেরেস।
মরচে ধরা লোহার মই বেয়ে জেটিতে উঠল ওরা।
সার্জেন্ট নেকমেতিন জানতে চাইল, ‘কিছু পেলেন, মিস্টার
রানা?’
‘অল্প কয়েকটা।’
‘গায়ে ইউনিফর্ম দেখছি না চলুন, সার্জেন্ট, আপনিও
আমাদের সঙ্গে গলা ভেজাবেন,’ আমন্ত্রণ জানালেন মেনদেরেস।
‘সাদা পোশাকে ডিউটিতে আছি, মিস্টার মেনদেরেস,’ বলল
সার্জেন্ট নেকমেতিন। ‘পরে।’
তার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল কাফ্রি সরদার। জেটি ধরে সামনে
এগোচ্ছে রানা, ওর পিছু নিলেন মেনদেরেস।
জেটি থেকে সোজা বিচ ক্লাব কেয়ার ফ্রিতে চলে এল ওরা।
কিছুক্ষণ আগে প্রম অনুষ্ঠান শেষ করেছে সুরাইয়া, প্রস্তুতি চলছে
দ্বিতীয়টার। ডান্স ফ্লোরটা যথেষ্ট বড়, তারপরেও টেবিলগুলো খুব
কাছাকাছি ফেলা হয়েছে।
একটা টেবিলও খালি পাওয়া গেল না। অগত্যা বার-এ বসল
ওরা, রাহি সামদানির পাশে। তার জ্যাকেটের সবগুলো বোতাম
খোলা, চোখে-মুখে বেপরোয়া ভাব, হাতে খালি হয়ে আসা একটা
গ−াস।
রানাকে দেখে হাসল তরুণ পাইলট। ‘বিকেলে খোলা সাগরে
দেখলাম আপনাকে। কিছু পেলেন?’
মাথা ঝাঁকাল রানা। ‘আপনার ব্যবসা কেমন?’
‘অভিযোগ করলে আল−াহ বেজার হবেন। বৈরুত থেকে আজ
ফুল লোড নিয়ে এসেছি।’
‘মিস্টার রানাকে হুইস্কি খাওয়াচ্ছি, আপনিও আমন্ত্রিত,’
তাকে বললেন মেনদেরেস।
গ−াসটা এক ঢোকে খালি করে টুল ছাড়ল সামদানি। ‘ধন্যবাদ,
আরেকদিন।’
‘আরে, বসুন, বসুন!’ বললেন মেনদেরেস। ‘এত ব্যস্ততা
কীসের?’
‘রিফুয়েলিঙের জন্যে এক্ষুনি এয়ারপোর্টে যেতে হচ্ছে,’ বলল
সামদানি।
‘এবার কোথায় চললেন, বৈরুতে?’ জানতে চাইল রানা।
‘হ্যাঁ, কিছু লোককে বৈরুতে নিয়ে যাচ্ছি, ওখান থেকে তারা
১৪
মাঝরাতে লিবিয়ার ফ্লাইট ধরবে।’
‘ও, তা হলে তো আপনাকে দেরি করিয়ে দেয়া উচিত হবে না
আমাদের,’ বলল রানা।
‘মিস্টার মেনদেরেস, পি−জ,’ অনুরোধ করল সামদানি।
‘সুযোগ পেলে দিলরুবাকে বলবেন Ñ দুঃখিত, ওর দ্বিতীয়
অনুষ্ঠানটা মিস করলাম আমি।’
‘ঠি-ঠিক আছে,’ এক সেকেন্ড ইতস্তত করে বললেন
মেনদেরেস।
সামদানি বিদায় নিয়ে চলে যেতেই সরাসরি মেনদেরেসের
দিকে তাকাল রানা। ‘আপনার সঙ্গে তা হলে দিলরুবার পরিচয়
আছে?’ শান্তকণ্ঠে জানতে চাইল ও।
‘হ্যাঁ, মিস্টার সামদানি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন,’ হাসিমুখে
বললেন সিরিয়ান এসপিওনাজ এজেন্ট, তারপর বারম্যানকে
ডেকে হুইস্কির দাম মেটালেন μেডিট কার্ড দিয়ে। রানার দিকে
ফিরে আবার বললেন, ‘স্যুইটে ফিরে আমি এখন শাওয়ার সারব।
তারপর আমরা হয়তো একসঙ্গে ডিনার খেতে পারি, কী বলেন?’
‘ধন্যবাদ,’ বলে মাথা নাড়ল রানা। ‘আজ নয়।’
‘নতুন একটা হার্পুন গান পাওনা হয়েছে কাফ্রি সরদারের,’
বললেন মেনদেরেস। ‘ভাবছি কাল কোনও এক সময় দিয়ে
আসব।’
‘সকালের দিকে যেতে পারেন, এই আটটার দিকে।’
মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক।
হুইস্কির গ−াসে মাত্র চুমুক দিয়েছে রানা, এই সময় দ্রিম দ্রিম
শব্দে ড্রাম বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা হয়ে গেল ডান্স ফ্লোর।
চারপাশের আলো ¤া− ন হয়ে এল। ব্যান্ড-এর পাশে খিলানের নীচে
স্থির হলো একটা স্পটলাইটের বৃত্তাকার আলো।
রঙচঙে পুঁতি দিয়ে বানানো পরদা সরিয়ে ডান্স ফ্লোরে ঢুকছে
সুরাইয়া, হঠাৎ পিন-পতন নীরবতা নেমে এল ক্যাসিনোর ভিতর।
কালো জিন্সের ট্রাউজার পরেছে সে, সাদা সিল্ক শার্ট দিয়ে গিঁট
মেরেছে কোমরে, মাথার কর্ডোভান হ্যাট খানিক বাঁকা হয়ে ছায়া
ফেলেছে তার মুখে। নাভীর কাছে ঝুলছে ¯ি−ঙে বাঁধা গিটার।
এক মুহূর্ত ওখানে দাঁড়িয়ে থাকল সুরাইয়া, কীসের জন্য যেন
অপেক্ষা করছে, তারপর তার আঙুল গিটারের তারে মৃদু টোকা
দিল, সেই সঙ্গে মধুর সুরে ধরল গান।
সন্দেহ নেই, ভাবল রানা, গলার এই অপূর্ব মাধুর্য নিয়ে
একদিন গোটা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ গায়িকাদের সারিতে দাঁড়াতে পারবে
সুরাইয়া। তবে নিশ্চয়ই কোথাও একটা বাধা আছে, তা না হলে
রয়াল অ্যালবার্ট হল-এর সেই অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকত না ও
কিছুতেই।
সুরাইয়ার বিপদটাকে মোটেও ছোট করে দেখছে না রানা।
পরপর দুটো গান গেয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছে সুরাইয়া,
শ্রোতাদের করতালিতে গোটা ক্যাসিনো যেন ফেটে পড়তে
চাইল।
খিলানের কাছে পৌঁছে থামল সুন্দরী গায়িকা, ঘুরল,
শ্রোতাদের উপর চোখ বুলাচ্ছে ধীরে ধীরে। রানার সঙ্গে
চোখাচোখি হতে স্থির হয়ে গেল তার দৃষ্টি। হাতের গ−াসটা একটু
উঁচু করল রানা, উত্তরে ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকাল সুরাইয়া। সন্দেহ
নেই ওকে চিনতে পেরেছে সে।
সুরাইয়া চলে যাওয়ার পর নেপথ্যে রবাব বেজে উঠল, সেই
সঙ্গে ফ্লোরে হাজির হলো একদল নর্তকী।
টুল ছাড়ল রানা, ক্যাসিনো সেকশনে যাওয়ার জন্য ভিড় ঠেলে
একটা দরজার দিকে এগোল।
ক্যাসিনোয় ঢুকে ভিতরে প্রচুর ভিড় দেখল রানা, রুলেত-এর
একটা টেবিলও খালি নেই। আজ রোববার, ছুটির দিন, ভাবল
ও। সেই সঙ্গে মনে পড়ল আজ মাঝরাতেও একটা অনুষ্ঠান আছে
সুরাইয়ার।
১৫
রিসেপশনকে পাশ কাটিয়ে এলিভেটরের দিকে যাচ্ছে রানা,
উল্টোদিক থেকে আসতে দেখা গেল কেয়ার ফ্রির মালিক জার্মান
জিমি মোরেলকে। অমায়িক হেসে ওর পথ আগলালেন তিনি।
‘আসুন, হের রানা, কোথাও বসে একটু গলা ভেজাই। আপনার
সঙ্গে আমার কথা আছে।’
ইতস্তত করছে রানা। ‘বলুন, কী কথা।’
রানার হাত ধরে একপাশে সরিয়ে আনলেন মোরেল। ‘আপনি
কি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল?’ নিচু গলায় প্রশড়ব করলেন
তিনি, চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলেন কেউ তাঁর কথা শুনছে
কি না।
‘হ্যাঁ, অবশ্যই,’ বলল রানা। ‘কেন বলুন তো? হঠাৎ এরকম
একটা প্রশড়ব?’
‘জ্ঞানী-গুণী কয়েকজন ফিলিস্তিনি আসতে চান,’ বললেন
জার্মান মোরেল। ‘আমার প্রশড়ব হলো, তাদেরকে আমরা সাহায্য
করতে পারি কি না?’
‘এরকম অবাস্তব কথা আপনার মাথায় এল কেন?’ অবাক
হয়ে জানতে চাইল রানা।
‘অবাস্তব হতে যাবে কেন? মানুষ মানুষের জন্য। মানুষের
প্রতি মানুষের দরদ থাকবে না?’
চুপ করে তাকিয়ে আছে রানা।
‘আপনারা মুসলমান নন? ফিলিস্তিনি মুসলমানদের জন্যে
আপনাদের কিছু করা উচিত নয়?’ আবার বললেন মোরেল, তাঁর
নরম সুরে একটু যেন তিরস্কার।
‘ওদের জলসীমায় সারাক্ষণ টহল দিচ্ছে পেট্রল বোট... ’
‘আমরা সাহায্য করব জানলে তারা ওগুলোকে ফাঁকি দিয়ে
সাগর পাড়ি দিতে রাজি আছে...’
বাধা দিয়ে বলল রানা, ‘তারপরেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে।’
‘এত বড় একটা মহৎ কাজ করতে গেলে ঝুঁকি ছাড়া কি হয়?’
হাসলেন মোরেল। ‘তবে ওদেরকে সাগর থেকে তোলার কাজটা
নিজেরা না করে অন্য লোকদের দিয়েও করানো যায়।’
‘আপনার এত আগ্রহের কারণ কী বলুন তো?’ ভ্র কোঁচকাল
রানা। ‘আপনি জার্মান, ফিলিস্তিনি বা মুসলমান নন।’
‘তা নই, তবে ছোটবেলায় আমিও ওদের মত শরণার্থী ছিলাম
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। রিফিউজি ক্যাম্পের জীবন যে কেমন করুণ
হতে পারে, আমার খুব ভাল করে জানা আছে। সেজন্যেই ওদের
জন্যে এতোটা ফিল করি আমি।’
মোরেলের কাঁধে একটা হাত রেখে মৃদু চাপ দিল রানা।
‘হের রানা, ভাববেন না জুয়া খেলিয়ে আয় করি বলে আমার
ভেতর মনুষ্যত্বও শেষ হয়ে গেছে,’ বললেন মোরেল। ‘ফ্যামাগুস্তায়
আশ্রয় নেয়া ফিলিস্তিনিদের ওয়েলফেয়ার ফান্ডে আমি নিয়মিত চাঁদা
দিই।’
‘এ নিয়ে পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব, কেমন?’ মোরেলকে
পাশ কাটিয়ে নিজের পথে রওনা হয়ে গেল রানা।
‘প্রস্তাবটা কিন্তু বিবেচনা করে দেখবেন, পি−জ,’ পিছন থেকে
গলা চড়িয়ে বললেন মোরেল। ‘আপনারা রাজি থাকলে লোক
যোগাড় করার দায়িত্ব আমার।’
যেমনটি আশা করেছে রানা, নিজের স্যুইটে ওর জন্য অপেক্ষা
করছিল সুরাইয়া। নক করতে কেউ সাড়া না দিলেও, দরজাটা
নিজে থেকেই একটু ফাঁক হলো। কবাটে হাত রেখে চাপ দিল ও,
এবার পুরোপুরি খুলে গেল ওটা।
ভিতরে ঢুকল রানা। ছোট্ট প্যাসেজ, সরাসরি সামনে ড্রইং
রুমের খোলা দরজা, একটা সোফার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে
অপরূপা বেদুঈন কন্যা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now