বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"বালাই"
ইমরান খান
------------
পর্ব ৬
------------
এক মূহুর্ত দ্বিধা করলেন ডাঃ রহমান।
তারপরেই দৌড়ে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে
কার্তুজের বাক্স থেকে দু মুঠো কার্তুজ নিয়ে
এপ্রনের পকেটে ভরলেন, তারপরই গুলিভরা
রিভলভারটা শক্ত মুঠোয় নিয়ে তিনি বেরিয়ে
এলেন কেবিন থেকে। নিজে কাপুরুষের মতো
কেবিনে বসে থাকবেন আর বাইরে একটার পর
একটা খুন হবে, এ হতে দেওয়া যায় না। যে বালাই
তিনি যেচে হাসপাতালে ঢুকিয়েছেন, তার শেষও
তিনিই দেখে ছাড়বেন।
হাসপাতালের নির্জন প্যাসেজ ধরে, হাতে রিভলভার
বাগিয়ে ধরে সন্তর্পণে এগোতে লাগলেন ডাঃ
রহমান। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, কান খরগোশের মতো
সতর্ক। ডেসিবেল মাত্রায় অতি সূক্ষ্ম শব্দও কান
এড়াবে না তাঁর। কিন্তু যদি আনোয়ারের কথাই সত্যি
হয়? যদি সত্যিই মেয়েটি অতিমানবীয় কেউ হয়?
যদি সত্যিই তার গতি হয় বিদ্যুতের মতো? রিভলভার
তাক করার সময়ও কি তিনি পাবেন? পরক্ষণেই এই
চিন্তা মাথা থেকে বাতিল করলেন তিনি। বন্ধুর
মৃত্যুশোকে আনোয়ারের নার্ভাস ব্রেকডাউন
হয়েছে। তরী মোটেও সেকেন্ডে
পনেরো হাত এগিয়ে আসে নি। সে এসেছে
নিঃশব্দে। একেবারে সামনে এসে দাঁড়ানোর পর
ওরা টের পেয়েছে, যখন আর কিছুই করার ছিল
না। মানুষ একটি মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। তরী একটি
সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্থ, উন্মাদ একটি মেয়ে। তার
পাগলামি বন্ধ করতে যথাসময় এবং যথাস্থানে একটি
গুলিই যথেষ্ট।
সিতারার ঘরের সামনে এসে এই অস্থির সময়েও
একটু নস্টালজিয়া অনুভব করলেন ডাঃ রহমান।
শয়তানের পূজারী হয়েও এই বৃদ্ধা কারোর
কোনও ক্ষতি করেনি। আর তরী? আপাতদৃষ্টিতে
শান্ত একটি মেয়ে কি তান্ডবটাই না শুরু করেছে
এখন। আগে এই ঘরের সামনে দিয়ে গেলেই,
" ডাক্তারবাবু, ভেতরে আইসেন, কথা আছে" ডাক
শোনা যেত। তখন মনে মনে কিছুটা বিরক্ত
হলেও আজ এখন তিনি বুঝছেন, সেই ডাকে মমতা
মেশান থাকত। কি অদ্ভুত এই জগৎ। মানুষ চলে যায়,
অথচ তার মমতা রয়ে যায়।
" ডাক্তারবাবু! ভেতরে আইসেন, কথা আইছ্যা"।
কে কথা বলে? সিতারা নাকি? ডাঃ রহমানের হৃদপিন্ডটা
যেন লাফিয়ে গলার কাছে উঠে এসে আলজিহ্বার
সাথে সখ্য করতে চাইল। হ্যাঁ, এ যে সিতারার গলা,
বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। বহুদিন ধরে এ গলা
শুনে শুনে তিনি এই গলা খুব ভাল চেনেন। কিন্তু
সিতারা কি করে কথা বলবে এখন? সিতারা তো এখন
অতীত। অতীত কি কখনো ফিরে আসতে
পারে? বর্তমানের রূপ ধরে? নাকি টাইম
ডাইমেনশনের কোনও গণ্ডগোল হয়েছে?
নাকি অদ্ভুত কোনও উপায়ে প্রকৃতি অতীতকে
তাঁর সামনে হাজির করেছে?
কিন্তু ডাঃ রহমান ভয় পেতে শেখেননি। লম্বা একটা
দম নিয়ে এক ধাক্কায় সিতারার কেবিনের দরজাটা
খুলে ঢুকে পড়লেন তিনি। তাঁর হাতে রিভলভারটা
শিকারী কুকুরের মতো উন্মুখ।
সারা ঘর খাঁ খাঁ করছে। কোনও প্রাণীর চিহ্নও
নেই কোথাও। ডাঃ রহমান বুঝলেন, তাঁর
হ্যালুসিনেশন হচ্ছে, অডিটরি হ্যালুসিনেশন। ঘরের
ওপাশের আলনায় সিতারার কয়েকটা শাড়ি এখনো
ঝুলছে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। সিতারার শরীর
থেকে একটা কেমন কর্পূরের গন্ধ আসত,
এখনো সেই গন্ধ বদ্ধ কেবিনের বাতাসে
ঘুরপাক খাচ্ছে। কেমন যেন হয়ে গেলেন ডাঃ
রহমান। সিতারার বেডে বসে বিছানার চাদরে হাত
বোলাতে লাগলেন তিনি। হঠাৎ কি যেন একটা
ঠেকল তাঁর হাতে। একটা পুরনো, ক্ষয়ে যাওয়া
অচল পয়সা। কোনটা হেড, কোনটা টেল, আজ
আর বোঝার উপায় নেই। শয়তানী পূজোর
কোনও অংশ কিনা কে জানে। সিতারার স্মৃতিচিহ্ন
হিসেবে সেটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন ডাঃ
রহমান। হোক না সে নিতান্তই মূর্খ একজন গ্রাম্য
মহিলা, যে কিনা এক ভন্ড সন্ন্যাসীর পাল্লায় পড়ে
শয়তানের পূজো করে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে
পড়েছিল, তবুও সে যেন কেমন কাছের মানুষ
হয়ে পড়েছিল ডাঃ রহমানের। তার প্রত্যেক কথায়,
প্রত্যেক আচরণে গভীর মমতা মেশান থাকত।
মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও বলেছিল, " ডাক্তার,
শয়তানের পূজো আর না। আমি মানুষ, মুসলমান,
আল্লাহই আমার সব। এখন থেকে ভাল জিনিসের
পূজো করুম। কিন্তু শয়তান কি আমারে ছাড়ান দিবে?
আমি তারে ছেড়েছি জানলে সে আমারে মাইরাই
ফেলিবে।"
সিতারার বেডে বসে বসে এসবই ভাবতে ভাবতে
কিরকম বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন ডাঃ রহমান।
চোখের সামনে সিতারার হাসিখুশী মুখটা ভাসছিল।
সে হাসলে তার চোখদুটোও হাসত। কখনো কিছু
বলার আগে মাথা উঁচু করে গন্ধ শুঁকে বুঝতে
চেষ্টা করত, কেউ আড়ি পেতে শুনছে কিনা।
ভাবতে ভাবতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন
ডাঃ রহমান। হঠাৎ তাঁর কানের কাছে সিতারার গলা, "
ডাক্তার! "
চমকে তাকালেন ডাঃ রহমান কিন্তু শূন্যতা ছাড়া আর
কিছুই নজরে পড়ল না তাঁর।
" ডাক্তার! ",আবারও সেই কন্ঠ। চমকে উঠে
দাঁড়ালেন ডাঃ রহমান। বহুদূরের অন্য কোনও জগত
থেকে ইথারের মাধ্যমে যেন ভেসে আসছে
সিতারার গলা।
" কে?", ডাঃ রহমানের গলা একটু না কেঁপে পারল
না।
এবার পুরোপুরি স্পষ্ট শোনা গেল, " পালাও
ডাক্তার, পালাও।"
ডাঃ রহমানের মনে হল, তাঁর থেকে দু হাত দূরেই
বিছানায় বসে আছে সিতারা, হাত বাড়ালেই বুঝি বা
স্পর্শ করা যাবে।
" পালাও ডাক্তার। সে তোমার আশেপাশেই
আছে। এদিকেই আইতেছে সে। সে জানে,
তুমি এখানেই আছ। দৌড়ও।"
" সিতারা....কোথায় আপনি?"
" পালাও, ডাক্তার, পালাও।"
ক্ষীণ হতে হতে সিতারার কন্ঠ আবার দূর জগতে
মিলিয়ে গেল। তখনিই ঘরের বাইরে একটা খট
করে শব্দ শোনা গেল। মনে হল, জজসাহেব
তাঁর হাতুড়ি দিয়ে টেবিল ঠুকে অর্ডার বললেন।
তারপর কেমন একটা খসখস করে কারোর পায়ের
শব্দ শোনা গেল। অত্যন্ত সন্তর্পণে পা টিপে
টিপে কেউ যেন এদিকেই এগিয়ে আসছে।
অপার্থিব এক আতঙ্কে ডাঃ রহমানের কণ্ঠনালী
পর্যন্ত শুকিয়ে গেল। এমন ভয় তিনি তাঁর দীর্ঘ
জীবনে কখনো পান নি। পায়ের শব্দ ক্রমশ
এগিয়ে আসছে এদিকে। ডাঃ রহমান রিভলভারটা তাক
করে রইলেন দরজার দিকে। ডান হাতের
তর্জনীটা ট্রিগারে। পায়ের শব্দ যত এগিয়ে
আসছে, ট্রিগারের ওপর তর্জনীর চাপ তত
বাড়ছে। ঘরের বন্ধ দরজার ঠিক সামনে এসে
থেমে গেল পা'দুটো। লম্বা একটা শ্বাস নিল
যেন পা'দুটোর মালিক। ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা।
তারপরেই দড়াম শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল।
" আস্তে!", চেঁচিয়ে বলে উঠলেন ডাঃ রহমান।
" সার আপনে?" আনোয়ারের গলা।
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল ডাঃ রহমানের। বললেন, "
দিয়েছিলে আর একটু হলে আমায় সাবাড় করে।
আমি নেহাত আগে থেকে তোমার পায়ের
আওয়াজে চিনতে পেরেছি, তাই রক্ষা। নইলে
আজ হয় আমি পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হতাম, নয়তো তুমি",
বলতে বলতে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়লেন
তিনি।
আনোয়ার বলল, " আমি তো ভিতর হইত্যা কথাবার্তা
শুইন্যা ভাবত্যাছিলাম ঐ হারামজাদী। " বলতে বলতে
সে-ও ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়ল।
ডাঃ রহমান এপ্রনের হাতায় মুখ মুছে বললেন, " কথা
আমিই বলছিলাম।"
আনোয়ার হাসল, " সার বুঝি বয়েসকালে এক্টিং
করত্যান?"
অবাক হয়ে তাকালেন ডাঃ রহমান, " এরকম কেন
মনে হল তোমার? আমি কি যাত্রাপালার বিবেকের
মতো ডায়লগ দিচ্ছিলাম নাকি?"
" না সার যেমনে আপনে দুইজনের পার্ট একাই
করাইলেন!"
" মানে?"
" মানে একবার আপনে বেডা মাইনষের গলায় আর
একবার আপনে মাইয়ার গলায় কথা কইলেন, তাই...."
" তুমিও তা হলে শুনেছ?", ডাঃ রহমানের শিরদাঁড়া খাড়া
হয়ে উঠল।
" জি সার, শুনছি তো।"
মাথার ভেতরটা অসম্ভব ফাঁকা লাগছে ডাঃ রহমানের।
সিতারার কন্ঠ তা হলে হ্যালুসিনেশন ছিল না?
একইসঙ্গে দুজন মানুষের শ্রুতিবিভ্রম কখনো
হতে পারে?
" আনোয়ার! "
" জ্বি সার!"
" আমার চেম্বারে চলো। একটু বিশ্রাম নিয়ে পানি
খাওয়া দরকার আমাদের। তারপর ঠিক করব, আমাদের
পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে?"
" চলেন সার।"
চেম্বারে এসে ফুলস্পিডে পাখা চালিয়ে দিলেন ডাঃ
রহমান। ফিল্টার থেকে কত গ্লাস পানি খেলেন তা
গুনতে ক্যালকুলেটর লাগবে। আনোয়ারেরও
একই অবস্থা। পানি খেয়ে, পাখার হাওয়ায় শরীরটা
একটু জুড়োলে তিনি আনোয়ারকে নির্দেশ
দিলেন, " আনোয়ার, কেবিনের দরজাটা লক
করে দাও।"
এই অত্যন্ত জরুরী কাজটা আনোয়ারও ভুলে
গিয়েছিল। বাইরে মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ একটা
মেয়ে গাঁইতি হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেই
অবস্থায় দরজা খুলে রাখাটা মারাত্মক অন্যায় হিসেবে
বিবেচিত হবার কথা। ডাঃ রহমানের নির্দেশে
আনোয়ার তাড়াতাড়ি গিয়ে কেবিনের দরজাটা ভেতর
থেকে লক করে দিল।
সিগারেট ধরালেন ডাঃ রহমান। লম্বা টান দিলেন।
হুড়মুড়িয়ে একরাশ নিকোটিন ঢুকে গেল
মস্তিষ্কের কোষগুলোতে। সাথে সাথে তাঁর
মনে হল, হতে পারে। একইসঙ্গে দুজনের
হ্যালুসিনেশন হতে পারে, যদি দুজনের মানসিক
অবস্থা একই স্তরে থাকে।
এই মূহুর্তে ডাঃ রহমান রিভলভিং চেয়ারে বসে যা
ভাবছেন এবং আশঙ্কা করছেন , সেই সময়
মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে থাকা আনোয়ারও
সেই কথাই ভাবছে।
" আনোয়ার! "
" জ্বি সার।"
" চলো বেরনো যাক।"
" কোথায় যাব সার?"
" ঘরে বসে থেকে লাভ কি? বাইরে মৃত্যু ঘুরে
বেড়াচ্ছে, ভয় করে কি হবে? রিনা, সিতারা আর
সাইদুরের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে হবে না?"
সাইদুরের নাম কানে যেতেই শিরদাঁড়া সোজা হয়ে
উঠল আনোয়ারের। বলল, " অবশ্যই হবে সার,
চলেন। "
" তবে আমাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।
চোখকান খোলা রাখতে হবে। আমি সামনের
দিকটা দেখব, তুমি পেছনটা কাভার করবে।"
" জ্বি সার।"
" চলো তবে।"
দরজা জানলা বন্ধ থাকায় হাসপাতালের অভ্যন্তরে
কোনও হাওয়া চলাচল করছে না। বাতাস স্থির,
চারদিকে কবরের স্তব্ধতা। সেই স্তব্ধতার মাঝে,
সেই স্থির বাতাসে শুধু ন্যুনতম তরঙ্গ তুলছে দুজন
মানুষের নিঃশব্দ প্রায় নিশ্বাস। অত্যন্ত সন্তর্পণে পা
ফেলছে দুজনেই। উদ্দেশ্য, পুরো হাসপাতালটায়
চক্কর দেওয়া আর তরীর অবস্থান নির্ণয় করা।
হাঁটতে হাঁটতে আবারও সিতারার ঘরের সামনে এসে
পড়লেন দুজনে। আবারও কি ডাকবে সিতারা? ডাঃ
রহমান মনেপ্রাণে চাইছিলেন, আবার ডাকুক সিতারা।
সত্যিই ব্যাপারটা হ্যালুসিনেশন কিনা তিনি একবার পরখ
করতে চান। এই হাসপাতাল ঘিরে একটা কিংবদন্তী
রচনা হয়ে আশেপাশের দশটা গ্রামের লোকের
মুখে মুখে ফিরুক, তিনি চান না।
" ডাক্তারবাবু! ভিতরে আইস, কথা আছে!"
আনোয়ারের মুখের দিকে তাকালেন ডাঃ রহমান।
বুঝলেন, সেও শুনেছে এই ডাক। মাছের
পেটের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তার মুখ।
ডাঃ রহমান তাকে ফিসফিস করে বললেন, " আমি
ভেতরে ঢুকছি। তুমি বাইরেটা নজর রাখো।"
" ভেতরে যাইয়েন না সার, ওই ডাইনী হইত্যা
পারে।"
" আমরা তো তাকেই খুঁজছি, তাই না?"
" আমিও আইছি সার তাহইলে আপনের সাথে। একলা
যাওন ঠিক হইবো না।"
" না, সবদিক সমান নজর রাখা প্রয়োজন। "
ডাঃ রহমান খতিয়ে দেখতে চাইছিলেন, ব্যাপারটা
সত্যিই হ্যালুসিনেশন কিনা। আর যদি সত্যিই সিতারা
মরণের ওপার থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলে
থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে তরীর ব্যাপারে
আরও কিছু জেনে নেওয়া যাবে।
সিতারার কেবিনের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লেন
ডাঃ রহমান। ঘর যথারীতি ফাঁকা। কোনও কথাও আর
শোনা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা যে একটা স্রেফ
হ্যালুসিনেশন ছিল, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ
রইল না তাঁর। আসলে সিতারার ব্যাপারে এখানকার
সবারই একটু আধটু আগ্রহ ছিল। কেউ তার ঘরের
সামনে দিয়ে বিড়াল পায়ে হেঁটে গেলেও সে
টের পেত আর ডাকাডাকি করত। কাজেই সিতারার
ঘরের সামনে এলেই সবারই মনে হচ্ছে যেন
সিতারা ডাকছে। আর এই শ্রুতিবিভ্রমে ইন্ধন
জোগাচ্ছে আজকের এই ভয়াবহ রাতটা। ছোট
একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন ডাঃ রহমান। এই
ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও তাঁর যুক্তিবোধ নষ্ট হয়ে
যায়নি ভেবে একটু আত্মশ্লাঘা অনুভব করলেন।
ঠিক এইসময় দড়াম করে পেছনে একটা শব্দ হল।
চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন ডাঃ রহমান।
দেখলেন কেবিনের দরজাটা বন্ধ হয়ে
গেছে। এবার ঘরের ভেতর ঘাড় ঘুরিয়ে
দেখলেন, সিতারার বেডের ওপাশে তরী
দাঁড়িয়ে আছে। আলুথালু চুল, সুন্দর মুখখানাতে
পৈশাচিক দৃষ্টি। রূপসী পিশাচিনীর মতো লাগছে
তাকে। হাতে তীক্ষ্ণধার গাঁইতিটা উঁচু করে ধরা।
ধোঁকা! সিতারার কন্ঠ নকল করে তাঁকে এ ঘরে
ডেকে এনেছে এই মেয়ে। এমন বুদ্ধিমতী
মানসিক রোগী তিনি জীবনেও দেখেন নি।
" জিন্নাত আলি কই?"
একি মানুষের কন্ঠ! শকুন যদি কথা কইতে পারত,
তাহলে বোধহয় এরকমই শোনাত।
" জিন্নাত আলিরে আমার বড় দরকার। নইলে আমি
বাঁচুম না। সেই শুয়োরের বাচ্চা কই?"
" তরী!" ডাঃ রহমান শান্ত কন্ঠে বললেন, " শান্ত
হও। এখন তোমার কেবিনে চলো। কাল সকালে
তোমার কথা শুনব।"
এরপর ডাঃ রহমান যা দেখলেন তা অবিশ্বাস্য। সাড়ে
তিন হাত লম্বা খাটটা চোখের পলক ফেলতে না
ফেলতেই একলাফে পেরিয়ে এল তরী। ডাঃ
রহমান কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলেন, তরী
তাঁর দেড়হাত সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বিদ্যুৎগতিতে
মাথার ওপর গাঁইতি তুলল সে।
ডাঃ রহমান রিভলভার তুললেন আলোর গতিতে। মাত্র
ছ'ইঞ্চি দূর থেকে ডান চোখে ভারী
বুলেটের আঘাতে বিছানায় ছিটকে পড়ল তরী।
তারপর উলটে পড়ে গেল বিছানার ওপাশে।
তখনি দরজা ঠেলে ছুটে ঘরে ঢুকল আনোয়ার।
" কি হয়েছে সার? দরজা বন্ধ কইরল কে? "
আয়েশী ভঙ্গিতে একটা সিগারেট ধরালেন ডাঃ
রহমান। বললেন, " বেডের ওপাশে তরীর লাশ
পড়ে আছে। ওটা এখানে নিয়ে এসো। "
আনোয়ারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, "
মরছে মাগী? " তারপর খাটের ওপাশে গিয়ে
চেঁচিয়ে বলল, " কই সার? কিছুই তো নাই!"
ঠোঁট থেকে সিগারেট পড়ে গেল ডাঃ
রহমানের। দৌড়ে গেলেন আনোয়ারের পাশে।
খাটের তলায় খুঁজলেন, জানলা খুলে বাইরে
দেখলেন, পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলেন।
আহত অথবা মৃত কোনও অবস্থাতেই তরীকে
পাওয়া গেল না। একেবারে যেন হাওয়ায় উবে
গেছে।
গাঁইতি সহ বিলকুল উবে গেছে সদ্য গুলি খেয়ে
উলটে পড়া মেয়েটা।
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now