বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বালাই—পর্ব ৫

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "বালাই" ইমরান খান ------------- পর্ব ৫ ------------- তরীকে মোটামুটি একটা শক্তিশালী ঘুমের ইঞ্জেকশন দিলেন ডাঃ রহমান। অন্য কোনও ওষুধে যখন কাজ হয় না, তখন এই ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। সারারাত আর বিন্দুমাত্র জাগার সম্ভাবনা নেই। ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে নেতিয়ে পড়ল তরী। চিন্তিত মুখে চোয়াল ডলতে ডলতে নিজের চেম্বারের দিকে চললেন ডাঃ রহমান। সিতারার ঘরের সামনে আসতেই সিতারার গলা পাওয়া গেল, " ডাক্তারবাবু! ভেতরে আসুন, কথা আছে।" ডাঃ রহমানের ভ্রু কুঁচকে গেল। এই মহিলার ত্রিসীমানায় থাকার উপায় নেই। ঠিক টের পেয়ে যাবে আর ডাকাডাকি শুরু করবে। ভাল যন্ত্রণায় পড়া গেল। অগত্যা ভেতরে ঢুকলেন। " আপনি ঘুমোননি এখনো? " " ঘুম আর আসে না রে বাবা। শয়তানের আশায় রাইত জাইগ্যা ধইরাছিলাম, সেডাই অভ্যাস হইয়া গেল। এহন ঘুমের ওষুধেও কাম হয় না। তোমায় একখানা কথা কহনের জন্য ডাইকলাম।" " জ্বি, বলেন।" আগের মতোই মাথা ঊর্ধমুখী তুলে সশব্দে গন্ধ নিল সিতারা, তারপর বলল, " খারাপ না, ভালোই।" " কি খারাপ না, ভালই?" " ওই বালাইডা"। " কি?" " আহহা, তোমারে কইছিলাম না হাসপাতালে বালাই ঢুকত্যাছে, তহন বুঝি নাই বালাইডা ভাল না খারাপ, এখন বুঝত্যাছি, বালাইডা ভালই। তয়...." " তয়?" " তয় বেশী ভালও আবার ভাল নয়।" " বুঝলাম না।" " আমিও না। সাবধান ডাক্তার, সাবধান। বাতাসে লাশের গন্ধ। সাবধান না থাকলে লাশ পড়ব, লাশের ওপর লাশ ফালাইব।" " আমি সাবধানেই থাকব, আপনি ঘুমোন।" নিজের চেম্বারের দিকে রওনা হলেন ডাঃ রহমান। পেছন থেকে তখনো সিতারার কন্ঠ শোনা যাচ্ছে, " হুঁশিয়ার ডাক্তার, হুঁশিয়ার।" এহেন মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে কল্পনাও করেন নি ডাঃ রহমান। মানুষের মনটা যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। নানারকম দ্বন্দ সংঘাতে ভরপুর মানুষের এই মন। ডাঃ রহমানও তাঁর দীর্ঘ জীবনে বহু মানসিক দ্বিধা ধন্দের সম্মুখীন হয়েছেন। মানুষকে আজীবন নানারকম সংঘাতের সম্মুখীন হতে হয়, বাস্তবতার সাথে, পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার সাথে, জীবনের সঙ্গে কিন্তু মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয় নিজের সাথে। আত্মদ্বন্দই সবচেয়ে বড় দ্বন্দ। নিজেকে যে পরাজিত করতে পারে তার চেয়ে বড় বিজয়ী আর কেউ নেই। নিজের চেম্বারে এসে জানলার সার্শিটা খুলে দিলেন ডাঃ রহমান। মগজটা তেতে আছে, একটু বাতাস লাগুক। হিমশীতল মৃদু বাতাস বইছে, কিন্তু তাতে মাঘ মাসের কুয়াশার নিরেট দেওয়াল একটুও টলছে না, যেমন টলছে না ডাঃ রহমানের দ্বিধাগ্রস্ত চিন্তা। বরফের মতো শীতল বাতাস তাঁর উত্তপ্ত মস্তিষ্ককে শীতল করতে পারছে না। ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা ঢেলে খেয়ে, একটা সিগারেট ধরিয়ে জানলার কাছে ফিরে এলেন তিনি। কুয়াশা ধূসর মোটা চাদরে ঢেকে গিয়েছে চরাচর। বেশীদূর দৃষ্টি চলে না, হাতখানেক গিয়েই বাউন্স খেয়ে ফিরে আসে রাবারের বলের মতো। এই মূহুর্তে নিজের মস্তিষ্কটাকেও একটা রাবারের বল মনে হচ্ছে, ডাঃ রহমানের কাছে। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত গিয়ে তাঁর চিন্তাও ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে প্যাভিলিয়নে। প্রথম থেকে আবার চিন্তা করতে হচ্ছে তাঁকে। একগাল সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন তিনি। সেই ধোঁয়া বাইরে কুয়াশার সাথে মিশে গিয়ে একাকার হয়ে ধোঁয়াশায় পরিণত হল। কোনটা কুয়াশা, আর কোনটা সিগারেটের ধোঁয়া, বোঝার উপায় রইল না। একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়, যার কোনটিরই সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমত, হাসপাতালে তরীর উপস্থিতি সিতারা কেমন করে টের পেল? দ্বিতীয়ত, তরী কি করে জিন্নাত আলিকে চিনল? জিন্নাত আলিকে দেখেই সে অমন ক্ষেপেই বা উঠল কেন? আর ঐ লোকটাই যে জিন্নাত আলি, তা সে কেমন করে বুঝল? তৃতীয়ত, তরী জিন্নাত আলিকে খুন করতে চায়, কেন? সর্বশেষ আর সবচেয়ে কৌতূহলজনক, তরী নিজের বাড়ির যেরকম বর্ণনা দিয়েছে, তার সাথে একমাত্র কবর ছাড়া আর কোনও কিছুর মিল পাওয়া যাচ্ছে না। একমাত্র মেরু অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও ২৪ ঘন্টা অন্ধকার থাকার কথা নয়। তার মা সবসময় ঘুমিয়ে থাকে মানে, তার মা মৃত। জীবিত মানুষ কখনো সবসময় ঘুমোয় না। আর সাদা পোশাকে আলোকিত চেহারার মানুষগুলোর সাথে কোরান হাদিশে বর্ণিত ফেরেস্তাদের বর্ণনা মিলে যায়। মেয়েটির মা কি মারা গেছে? কিন্তু তরী বলেছে যে সে তার মায়ের সাথেই থাকে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, সে মানসিকভাবে অসুস্থ। হয়ত মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না পেরে সে নিজেকে তার মায়ের সাথে কবরে কল্পনা করেছে। সে হয়ত শুনেছে, কবরে ফেরেস্তারা এসে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, তাই কবরের কল্পনার সঙ্গে এটাকেও সংযোজন করেছে সে। কিন্তু মেয়েটি একাকী শালবনে ঘুরছিল কেন? খুব কম মানসিক রোগীই নিজেকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে স্বীকার করে। এরকম কিন্নর কন্ঠের একটি মেয়ে হঠাৎ হঠাৎ করে পশুর মতো গজরায় কেন? লম্বা করে শ্বাস নিলেন ডাঃ রহমান। মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে। বরফশীতল বাতাস যেন তীক্ষ্ণধার খঞ্জরের মতোই নাক চিরে ঢুকে গেল মস্তিষ্কে আর বেরিয়ে এল গরম হয়ে। " স্যার!", নার্স রিনার উদ্বিগ্ন কন্ঠে বাস্তবে ফিরলেন ডাঃ রহমান। নিশ্চয় কোনও পেশেন্ট অসুস্থ হয়ে পড়েছে কিংবা কারোর পাগলামির প্রকোপ বেড়েছে। পেছন ঘুরে তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, " কি ব্যাপার?" রিনা উত্তেজিতভাবে বলল, " পেশেন্ট পালিয়েছে।" " কোন পেশেন্ট?" " আজ যে ভর্তি হয়েছে।" " তরী?" " জ্বি, স্যার।" কে যেন এক চাঙড় বরফ ডাঃ রহমানের ঘাড় থেকে মেরুদন্ডের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত ঘষে দিল। নিছকই কি এটা কাকতালীয় ঘটনা, না মেয়েটি তার কথা রাখল? " তুমি শেকলে ঠিকমতো তালা দাওনি?" " দিয়েছিলাম স্যার, শেকল ছিঁড়ে পালিয়েছে। " " এমন মজবুত শেকল ঐটুকু একটা মেয়ে ছেঁড়ে কি করে?" " বিশ্বাস না হয়, আপনি এসে দেখুন স্যার।" রিনার সঙ্গে ডাঃ রহমান তরীর কেবিনে এসে ঢুকলেন। রিনার কথা নির্ভুল। ভাঙা শেকলদুটো খাটের রডের সাথে যেন লাজুক ভঙ্গিতে ঝুলছে। যেন নিজেদের দায়িত্ব পালন না করতে পারার অক্ষমতায় তারা অতিশয় লজ্জিত। আজ সন্ধ্যাতেই তরীর দৈহিক শক্তির নমুনা পেয়েছিলেন ডাঃ রহমান। কিন্তু লোহার শেকল ছেঁড়ার মতো গায়ের জোর একটা মেয়ের থাকতে পারে, তা অকল্পনীয়। " দৌড় দাও", চেঁচিয়ে বলে উঠলেন ডাঃ রহমান, " ইন্টারকমে দারোয়ানকে ফোন করে জানাও। সতর্ক থাকতে বল। তরী যেন কোনও অবস্থাতেও কম্পাউন্ডের বাইরে না যেতে পারে। বাইরে গিয়ে কোনও অঘটন ঘটালে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। জলদি যাও।" রিনা তৎক্ষণাৎ ছুটল। সিতারার কেবিনের সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন ডাঃ রহমান। সিতারার ঘরের দরজার তলা দিয়ে এক ধরনের ঘন তরল চুঁইয়ে বেরিয়ে আসছে। ডাঃ রহমানের বুঝতে খানিকটা সময় লাগল যে জিনিসটা রক্ত। ধাক্কা দিয়ে কেবিনের দরজা ঠেলে ঢুকলেন তিনি। সিতারা বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছে। মাথাটা ঝুলছে বিছানার বাইরে। মুখটা হাঁ করা। বিস্ফারিত চোখদুটো দেখে মনে হচ্ছে অবশেষে সে ইবলিশ দর্শন করেই ফেলেছে। মেঝে ভর্তি রক্তের উৎস সিতারার মাথা। মাথার তালুরে দু'ইঞ্চি ব্যাসের একটা ছিদ্র, রক্তের সাথে মিশ্রিত হয়ে বেরিয়ে এসেছে হলদেটে মগজ। তরীর কাজ সন্দেহ নেই। সে বলেছিল, তার বাঁধন খুলে না দিলে সে সবাইকে হত্যা করবে। সিতারার কথাই সত্যি হল। লাশ শেষপর্যন্ত পড়ল। তরীর কাছে অস্ত্র আছে। হতে পারে তীক্ষ্ণধার একটি ছুঁড়ি কিংবা বাটালি, যা দিয়ে মানুষের মাথায় গোলাকারভাবে ফুটো করে দেওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তরী এই অস্ত্র পেল কোথা থেকে? হাসপাতালে রোগীদের নাগালের মধ্যে কোনও অস্ত্র রাখা হয় না। তবে কি সিতারার কথাই সত্যি? তরী আসলেই কোনও বালাই? যে কিনা পশুর মতো গজরায়? যার গায়ে পাশবিক শক্তি? যে লোহার শেকল রেতি দিয়ে কাটলেও আধঘণ্টা সময় লাগে, তা একটানে ছিঁড়ে ফেলতে পারে? সে কে? সে কি? কি চায় সে? ডাঃ রহমান নিজের সমস্ত রোমকূপ দিয়ে বদ্ধ হাসপাতালে এক পাশবিক শক্তির অস্তিত্ব অনুভব করলেন, যে কিনা এই মূহুর্তে পাগলিনীর বেশ ধরে একটি ক্ষুরধার অস্ত্র নিয়ে উন্মত্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, নিজের রক্তপিপাসা মেটাতে? যার কোনও যুক্তিবোধ নেই, নিজের পৈশাচিক উদ্দেশ্য ছাড়া আর কোনও কিছুই যার দৃষ্টিগোচর হয় না। কেউ একটু অসাবধান হলেই সর্বনাশ, মাথার তালু ফাঁক হয়ে চুঁইয়ে বেরিয়ে আসবে মগজ। ডাঃ রহমান নিজের ঘরে গিয়ে ড্রয়ার থেকে রিভলভারটা বের করলেন। রিভলবারের ম্যাগাজিনে গুলি ভরে নিলেন ডাঃ রহমান। তারপর তা শক্ত মুঠিতে ধরে মনে একটু জোর পেলেন যেন। একটা সিগারেট ধরালেন। দরজায় শব্দ হতেই পাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালেন ডাঃ রহমান। রিভলভার তাক করে ধরলেন সেদিকে। দরজাটা খুলে গেল। না, তরী নয়, রিনা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। " দারোয়ানকে ফোন করেছ?', ডাঃ রহমান জিজ্ঞেস করলেন রিনাকে। রিনা কোনও জবাব দিল না। ডাঃ রহমান লক্ষ্য করলেন, রিনার ঠোঁটদুটো অল্প অল্প কাঁপছে। তার চোখদুটো দেখে একটু আগে দেখা সিতারার বিস্ফারিত চোখদুটোর কথা মনে পড়ে গেল। " কি হয়েছে রিনা?", বলেই ডাঃ রহমান লক্ষ্য করলেন, রিনার মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি বেয়ে গাঢ় লাল রক্তধারা বয়ে নেমে আসছে হিমালয় থেকে নেমে আসা কোনও সদ্যসৃষ্ট নদীর মতো। কপাল বেয়ে নাকের ডগায় এসে কয়েক ফোঁটা রক্ত টপটপ করে মেঝেতে পড়ল। ডাঃ রহমান কিছু বুঝে ওঠার আগেই উপুড় হয়ে পড়ে গেল রিনা। সেই ধাক্কায় একটা হলদেটে দলা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। রিনার মাথার তালুতে একটা ছিদ্র, আর হলদে জিনিসটা তার মগজ। ছুটে গিয়ে রিনাকে ধরে চিত করলেন ডাঃ রহমান। ওর মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিলেন। কিছু একটা বলতে চাইল রিনা, কিন্তু ব্যর্থ চেষ্টা। আসলে গুছিয়ে কথা বলতে গেলে ঘিলু দরকার যার অনেকটাই রিনা হারিয়েছে। কয়েক সেকেন্ড পরই চিরতরে চলে গেল রিনা, সেই দেশে যেখানকার কথা তরী বলেছিল। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল ডাঃ রহমানের। তাঁর এদেশে আপন বলতে কেউ ছিল না, এই মেয়েটিকে তিনি নিজের মেয়ের মতোই ভালবাসতেন, মেয়েটি কোনওদিন তা জানতেও পারল না। তিনি শুনেছেন, মেয়েটির বাবা মা নেই, মামার কাছে মানুষ হয়েছিল। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় জীবনের এতটা পথ এসেছিল সে। মামা মামী খুব একটা যত্ন করত না হিরের টুকরো এই মেয়েটিকে। অবশেষে এই হাসপাতালে চাকরীটা নিয়ে এখানেই থাকতে শুরু করেছিল সে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল তারই ভালবাসার মানুষটির সাথে। ডাঃ রহমান ঠিক করেছিলেন বিয়ের দিনই রিনাকে তিনি পিতৃস্নেহের কথাটা জানাবেন আর তাকে উপহার দেবেন একটা সোনার টিকলি। হায় রে নিয়তি, তার আগেই রক্তের টিকলি মাথায় নিয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ল তাঁর মেয়ে। নিয়তি এভাবেই মানুষকে নিয়ে নানা খেলা করে। জীবনটাকে ফুটবল বানিয়ে মাঝেমাঝে ফ্রি কিক দেয়। কখনো বল জালে ঢোকে, কখনো ক্রসবারের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। ডাঃ রহমান স্পষ্ট টের পেলেন, তাঁর মুখের চামড়া তিরতির করে কাঁপছে, শরীরের রক্ত কুলকুল করে মাথার দিকে উঠে আসছে। তাঁর প্রচণ্ড ইচ্ছে করতে লাগল, রিভলভারটা নিয়ে পুরো হাসপাতালে রাউন্ড দেন আর এলোপাথাড়ি গুলি ছোঁড়েন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন তিনি। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। নিজেকে একটু ধাতস্থ হবার সময় দিলেন ডাঃ রহমান। তারপর থানায় একটা ফোন করে ফোর্স পাঠাতে বললেন। থানা এখান থেকে বহুদূরে। মাঝখানে একটা নদী পড়ে। আজ রাতের মধ্যে আসতে পারবে কিনা কে জানে। দ্বিতীয় ফোনটা তিনি করলেন নিচের সিকিউরিটি দুজনকে। গেটে ভাল করে তালা দিতে ওদের দুজনকেই ওপরে আসতে বললেন। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ঘনঘন টান দিতে লাগলেন। গার্ডদুজন এসে সেলাম ঠুকল। ওদের দিকে তাকিয়ে ডাঃ রহমান বললেন, " আনোয়ার আর সাইদুর, তোমাদের দুজনের কাছেই অস্ত্র আছে তো?" " জ্বি সার, এই যে রাইফেল আছে।" " গুড। শোনো, আজ রাতে তোমাদের দুজনেরই ডিউটি হচ্ছে রাইফেল নিয়ে পুরো হাসপাতালে টহল দেওয়া, আর...তরীকে চেনো তো? আজ যে নতুন পেশেন্ট ভর্তি হয়েছে?" " চিনি সার।" " ওকে দেখামাত্র গুলি করবে।" " সার!" ডাঃ রহমান এগিয়ে এসে সাইদুরের কপালের মাঝখানে নিজের তর্জনী ছুঁইয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, " এইখানে গুলি করবে, এইখানে। পুরো ম্যাগাজিন খালি করবে। নইলে ওই মেয়ে তোমাদের দুজনেরও এই হাল করবে।" মেঝেয়ে পড়ে থাকা রিনার লাশটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন ডাঃ রহমান। রিনার লাশ দেখে শিউরে উঠল গার্ড দুজন। ডাঃ রহমান বললেন, " এই লাশকে এখন মর্গে নিয়ে যাও। নয় নম্বর কেবিনে দেখো সিতারার লাশ পড়ে আছে। সেটাকেও মর্গে নিয়ে গিয়ে রাখো। তারপর যা বললাম তাই কর।" ওরা চলে গেলে পুরো এই ঘটনার বৃত্তান্ত জিন্নাত আলিকে জানানো দায়িত্ব মনে করলেন ডাঃ রহমান। জিন্নাত আলি ফোনে পুরো ঘটনার বৃত্তান্ত শুনে অত্যন্ত বিমর্ষ হলেন। তাঁর স্বপ্নের হাসপাতালে এরকম রক্তারক্তি তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করল। না দেখেও ডাঃ রহমান বুঝতে পারলেন, ফোনের ওপাশে জিন্নাত আলির হাসিখুশী মুখটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি সবকিছু শুনে শুধু বললেন, " আমি আসছি ডাঃ রহমান। " ডাঃ রহমান বললেন, " সেটা ঠিক হবে না স্যর। তরী নামের মেয়েটা আপনাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে, আর তার হাতে রয়েছে একটি মারাত্মক অস্ত্র। আর সে কোনও সাধারণ মেয়ে নয় সে। তার গায়ে রয়েছে পাশবিক শক্তি। " " তবুও আমি আসব ডাঃ রহমান। আমায় না পেয়ে সে অন্যদেরকে মেরে ফেলবে, এ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারব না। আমি এমন কোনও মহৎ ব্যক্তি নই যে আমার জন্য আপনারা জীবন উৎসর্গ করবেন। আমায় পেয়ে যদি সে অন্যদের রেহাই দেয়, তবে তাই-ই ভাল।" " কিন্তু স্যর..... " " আমি আর ক'দিন ডাঃ রহমান? বুড়ো হয়েছি, আপনার চেয়ে কয়েক বছরের বড়ই হব। আমার এই জগতে এখন আর কেউ নেই। স্ত্রী ছিল, সে আমায় ছেড়ে চলে গেছে, নানারকম দুষ্ট ব্যধির শিকার হয়ে আমিও এখন জর্জরিত। হাসপাতালটাকে তো আপনারাই এগিয়ে নিয়ে যাবেন। হাসপাতালের কোনও বদনাম হলে এটা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। সেইসাথে আমার স্বপ্নও বরবাদ হয়ে যাবে। তাছাড়া আমি জানতে চাই, মেয়েটা আমায় কি করে চিনল আর কেনই বা আমার ওপর ওর এত আক্রোশ! " ভ্রু কুঁচকে ফোন রাখলেন ডাঃ রহমান। জিন্নাত আলির মতো একজন ডাকসাইটে শিল্পপতি যদি এই হাসপাতালে এসে খুন হন, তাহলে হাসপাতাল তো বন্ধ হবেই, সমস্ত স্টাফকেও কাঠগোড়ায় দাঁড়াতে হবে। আর ঘটনার যে খলনায়িকা সে আরামসে রেহাই পেয়ে যাবে। কারণ, উন্মাদদের শাস্তি আইনে নেই। ঘড়ি দেখলেন ডাঃ রহমান। রাত দেড়টা। এখনো বলতে গেলে সামনে গোটা রাতই পড়ে রয়েছে। বাইরের নিরেট অন্ধকারের সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরের জেনারেটরের উজ্জ্বল আলোর বিশেষ কোনও তফাৎ খুঁজে পেলেন না ডাঃ রহমান। আলো থাকা মানেই আলোকিত থাকা নয়। বাইরের অন্ধকার শীতজর্জর, ভেতরের এই আলো অভিশপ্ত। ছুটে ঘরে ঢুকল আনোয়ার। চিতাবাঘে তাড়া করা কুকুরের মতো হাঁফাচ্ছে সে। চোখদুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, রাইফেলের বাঁটে হাতদুটো এমনভাবে চেপে বসেছে যে হাতের শিরাগুলো নীল হয়ে ফুটে উঠেছে। " কি হয়েছে আনোয়ার? ", কাঁপা গলায় বললেন ডাঃ রহমান, " সাইদুর কোথায়? " " সাইদুররে মাইরা ফেলিছে সার", অপ্রকৃতিস্থের মতো বলল আনোয়ার, " আমার বন্ধুরে মাইরা ফেলিছে।" " কে তরী?" " হ, সার"। " তুমি তাকে দেখেছ?" " দেখেছি সার। উ মানুষ না সার।" " সাইদুরকে কিভাবে মেরেছে?" " গাঁইতি দিয়া সার।" " গাঁইতি পেল কোথায় ও?" " জানি না সার, ও মানুষ না সার।" " কি বলছ?" " হা সার, ও মানুষ না, সাক্ষাৎ শয়তান সার।" " আনোয়ার, এদিকে এসো, শান্ত হয়ে বসো, পানি খাও, তারপর বল, কি হয়েছে?" " সাইদুর আর আমি টহল দিত্যাছিলাম। আশেপাশে কেউ আছাইল না সার। সব রোগীর ঘরে তালা মাইরা দিছি। হঠাৎ দেখি, পনেরো হাত দুইরে মাইয়াডা খাড়া রহিয়াছে। আমাগোরে দেহিখ্যাই কহিল, জিন্নাত আলি কই? আমরা আপনের কথামতো রাইফেল তাক কইরতে গেলাম, তার আগেই মাইয়াডা আমাদের একহাত সামনে আইস্যা খাড়াইল। গাঁইতি দিয়া এক কোপ মারল সাইদুরের মাথায়। আমি পলাইয়া আইছি। আপনেই কন সার, কোনও মাইনষের বাচ্চা এক সেকেন্ডে পনেরো হাত আগাইয়া আইসতে পারে? ও মানুষ না সার, হাসপাতালে পিচাশ ঢুকছ্যা। আমি যাই সার।" " কোথায়?" " অহে আমি ছাড়মু না সার। আমার বন্ধুরে মাইরা ফালাইছে। অ আমার ভাইয়ের মতো আছিল। ওই মাগী শয়তানেরে আমি ছাড়ুম না। যদি বাঁইচ্যা না ফিরি, আমার লাশটা গেরামে পাঠাইয়া দেন আর বেতনডা আমার মায়েরে পাইঠ্যা দিবেন।" ডাঃ রহমান কিছু বলার আগেই আনোয়ার রাইফেল হাতে ছুটে বেরিয়ে গেল, গুলি খাওয়া ক্ষিপ্ত বাঘের মতো। বন্ধুর শোকে তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আক্কেল গুড়ুম হয়ে স্তব্ধ মনুমেন্টের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন ডাঃ রহমান। এমন অশুভ পৈশাচিক রাত তাঁর জীবনে কখনো আসেনি। সিতারা বলেছিল, সায়লাব আসবে। সেই সায়লাবের ভীষণ পদধ্বনি এখন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন ডাঃ রহমান। (চলবে)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বালাই—পর্ব ৭
→ বালাই—পর্ব ৬
→ বালাই—পর্ব ৫
→ বালাই—পর্ব ৪
→ বালাই—পর্ব ৩
→ বালাই—পর্ব ২

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now