বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বাবার চোখের জলের মূল্য....
তখন আমি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা
কেন্দ্র পড়েছে বাড়ি থেকে প্রায় কিলোমিটার
দুরের এক স্কুলে। স্কুলের বন্ধুরা সবাই গাড়ি ভাড়া
করেছে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য।
বাড়িতে এসে বাবাকে বললাম আমিও গাড়ি করে
পরীক্ষা দিতে যাবো। বাবা আমার দিকে কটমট
করে তাকিয়ে বললো "না, তুই বাসে করে যাবি,। (অবশ্য সেই শক্ত চোখেও একটা কি জানি লুকানো ছিলো তা তখন বুঝি নি)
রোজ বাসভাড়া যাবার সময় নিয়ে যাবি।"
সেদিন বুঝিনি বাবা কেনো গাড়ি করে যেতে মানা
করেছিলো। কিন্তু আজ এই জীবনের পঁচিশটা
বসন্ত পার হয়ে ঠিক উপলব্ধি করি কেনো গাড়ি
করে যেতে মানা করেছিলো।
রোজ পরীক্ষা দিয়ে বিকালে ফিরে আসতাম,
আমাকে দেখেই বাবা বলতো "যা আগে খেয়ে
নে।"
খাওয়ার পরেই বাবা আমায় ডেকে নিতো।
প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে প্রথম দেখতো। তারপর
আবার বাবার সামনে বসে আমায় পরীক্ষা দিতে
হতো।
সময় শেষ হলেই বাবা খাতা নিয়ে নিতো। তারপর
প্রায় কুড়ি মিনিটে খাতা দেখা শেষ করে খাতায় নাম্বার
বসিয়ে দিতো।
বাবার পেছনে একটা ছড়ি সবসময়েই থাকতো। ওটা
বার করে আমার পায়ে একটা বসিয়ে দিয়ে বলতো
""তুই ৭২ পাবি। অমুক প্রশ্ন কেনো লিখিসনি? অমুক
প্রশ্ন কেনো ছেড়ে দিয়ে এসেছিস? ""
আমি পায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলতাম "সময় পাইনি
বাবা"।
বাবা আবার পায়ে একটা ছড়ি বসিয়ে বলতো "এ
প্রশ্নটা তো দুদিন আগেই তোকে করিয়েছি।
লিখিসনি কেনো? ""
এইভাবে পাই টু পাই প্রশ্ন ধরে আমায় ছড়ি মারতো।
আর আমি শুধু পায়ে হাত বুলাতাম, চোখের থেকে
জলও পড়তো।
রেজাল্টের দিন দেখা যেতো বাবা খাতায় যে
নাম্বার বসিয়েছে সেই নাম্বারের আসে পাসে
নাম্বার আসতো।
ছোটোবেলায় আমি অলস প্রকৃতির ছিলাম। বেশি
খাটতাম না। অং বং চং করে পড়াশোনা করতাম। বাবা এটা
বুঝতো যে ছেলের পড়াশোনার প্রতি অনিহা।
পরীক্ষার আগের দিনগুলোতে বাবা আমায় গোটা
রাত বসিয়ে রাখতো। আর নিজেও আমার কাছে
বসে থাকতো। পড়া দিতো, পড়া ধরতো। পড়া না
দিতে পারলে ছড়ি।
আমিও সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম কখন বাবার ঘুম
পাবে, আর বাবা একটু ঢুলে গেলে আমি বলতাম
""পড়া হয়ে গেছে। বই গুছাবো""?
বাবা ঘুমের ঘোরে বলতো "গোছা"।
সকালে যখন বাবা পড়া ধরতো তখন পারতাম না। বাবার
তখন রাগ দ্বিগুন হয়ে যেতো। ডাবল ছড়ি মারতো।
মানে যেখানে তিনটা ছড়ি খেতাম, তো সেখানে
ছয়টা ছড়ি খেতাম।
মা দৌড়ে আসতো, আর বলতো "মেরো না,
মেরো না" এই বলে আমার সামনে দাঁড়াতো। বাবা
ছড়ি ফেলে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে
যেতো। ঘন্টা দুই পরে ফিরে এসে ছড়ি নিয়ে
ফের পড়া ধরতো।
খাওয়া আর ঘুম বাদ দিয়ে প্রায় সতেরো ঘন্টা আমায়
বসিয়ে রাখতো বাবা, আর নিজেও বসতো।
মন মেজাজ ভালো থাকলে বাবা বলতো "বুঝলি বাবু,
এই মাধ্যমিকটাই হলো লাইফের টার্নিং পয়েন্ট।
রেজাল্ট ভালো হওয়া চাই""।
আমি একানে শুনতাম আর ওকানে বার করে দিতাম।
পড়াশোনা আমার ভালো লাগতো না। আমার নজর
থাকতো কখন টুটুলের (জেঠুর ছেলে) কাছ
থেকে ভিডিও গেমটা নিয়ে একটু খেলবো। টুটুল
দিতো না। টুটুল ঘুমিয়ে গেলে জেঠির কাছ
থেকে নিয়ে খেলতাম।
জেঠু টুটুলের জন্য একটা তিনচাকার একটা সাইকেল
কিনে দিয়েছিলো। টুটুল ভুম ভুম করে বাড়ির উঠান
রাউন্ড মারতো। আর আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে
দেখতাম। পড়া বাদ দিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে থাকতাম।
এটা একদিন বাবার নজরে পড়লো। বাবা টুটুলের
কাছে গিয়ে সাইকেল কেড়ে নিয়ে লাথি মেরে
সাইকেলটাকে ভেঙে বাড়ির পাসের পুকুরে
ফেলে দিলো।
জেঠুও কিছু বাবাকে বলতে সাহস পায়নি। এমনই
ছিলো বাবার ব্যাক্তিত্ব। পরিবারের সবাইকে তটস্থ
করে রাখতো বাবা।
বাবা কিছু রুল এণ্ড রেগুলেশন চালু করেছিলো পড়ার
জন্য। বিশেষ করে আমার জন্য। আমার টেক্সট বই
বাবার পুরো ঠোঁটস্ত। পরীক্ষায় কি কি প্রশ্ন
আসবে সেটা বাবা একদম পারফেক্ট বলে দেয়।
মাধ্যমিকের সিলেবাস যেনো গিলে খেয়েছে
বাবা।
প্রশ্ন কোন অধ্যায় থেকে আসবে আর কোন
অধ্যায় থেকে আসবে না সেটা বাবা বুঝতে পারে।
পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে দুটো। বলা হয় এটা অথবা
ওটা। মানে দুটো অধ্যায় থেকে দুটো প্রশ্ন
আসে। লিখতে বলা হয় যেকোনো একটা। তো
বাবা আমায় বলতো গরু গাধার মতো খেটে
কোনো লাভ নেই। যে কোনো একটি
অধ্যায়ের সব প্রশ্ন সড়গড় করতে হতো আমায়।
ওই অধ্যায় থেকে প্রশ্ন আসবেই মাস্ট। অন্য
অধ্যায় বাবা আমায় পড়তে দিতো না।
আসলে আমি পরীক্ষার জন্য যতটা না খাটতাম, আমার
থেকে অনেক বেশি বাবা খাটতো।
মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত লাগতো। মাকে বুঝিয়ে
সুজিয়ে মামা বাড়ি চলে যেতাম। বাবা গিয়ে কান ধরে
আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতো।
.
মাধ্যমিক রেজাল্ট বাবার মনোমত হয়নি। বাবা যতটা
আমার কাছে চেয়েছিলো, আমি ততটা বাবাকে
দিতে পারিনি। রেজাল্টের দিন মার্কশিট স্কুল থেকে
নিয়ে এসে বাবাকে দেখালাম।
বাবা মার্কশিট হাতে নিয়ে কিছুক্ষন থম মেরে
রইলো। আর আমি ছড়ি খাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছি।
কারন জানি এখন আমার পায়ে ছড়ি পড়বে।
কিন্তু বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বাবার চোখের
থেকে জল নামছে। বাবা কাঁদছে। তখন আমি
বুঝতে পারিনি কেনো বাবা কাঁদছিলো। কিন্তু এখন
বুঝতে পারি বাবার সব আশা আকাঙ্ক্ষায় আমি পুরো
জল ঢেলে দিয়েছি। বাবার সব স্বপ্ন আমি ভেঙে
চুরমার করে দিয়েছি।
যা হবার তো হয়েই গেছে। কিন্তু সেদিনের
সেই বাবার চোখের জল আমায় এখনো খুব কষ্ট
দেয়।....
এরপর আমি মনে মনে শপথ নিই। বাবার চোখের জলের মূল্য আমাকে দিতেই হবে। আমি এখন জীবনের মায়া ত্যাগ করে পড়ালেখা করে বুয়েট এ পড়ি।
হয়ত বাবার চোখের জলই আমাকে এতদুর ভাসিয়ে নিয়ে এসেছে.....ধন্যবাদ বাবা।
আই লাভ ইউ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now