বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লুনা-- তোমার বাবার জন্য একটু শান্তিতেও থাকা যায় না।
আমি-- কেন আব্বা কী করেছে?
লুনা-- কী করছে মানে, ওনার যন্ত্রনায় আর বাসায় থাকা যাবে না।
আমি- আরে আব্বা কী করেছে সেইটা তো বুঝতে পারছি না।
লুনা-- ওনার জন্য একটু শান্তিতে টিভিতে সিরিয়াল দেখতে পারি না, একটু পর পর শুধু বউমা চা দাও, এটা দাও ওটা দাও বলতে থাকে, ওহ গড একদম অসহ্য।
আমি-- আব্বা তো বুড়ো মানুষ তাই একটু এমন করে, প্লিজ তুমি একটু মানিয়ে নেবার চেষ্টা করো।
লুনা-- আর কত সহ্য করবো? যেদিন আর সহ্য হবে না সেদিন আমি নিজেই চলে যাবো বাড়ি ছেড়ে।
আমি-- আচ্ছা আমি দেখছি কী করা যায়।
"""
এতক্ষণ কথা হচ্ছিল আমার আর লুনার মধ্যে। লুনা আমার স্ত্রী। প্রায় ৬ মাস হলো আমরা বিয়ে করেছি।
আমার বাবাকে একদম সহ্য করতে পারে না সে। ছোট বেলায় মাকে হারানোর পর বাবাই আমাকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছে। আর লুনাকেও আমি অনেক ভালোবাসি, তাই তো ওকেও তেমন কিছু বলতে পারি না।
বুঝতে পারলাম লুনার প্রচণ্ড মন খারাপ।
আমি-- কী ব্যাপার পাগলী বউটার কি মন খারাপ?
লুনা-- না, আমি অনেক ভালো আছি। কিছুটা রাগ করে বললো।
আমি-- আরে পাগলী মন খারাপ করে বসে থাকলে কি ভালো দেখায়?
লুনা-- তোমার বাবাকে আমার আর সহ্য হচ্ছে না।
আমি-- কেন আবার কী করেছে আব্বা?
লুনা-- আজকে ভাত খাওয়ার সময় প্লেট ভেঙে ফেলছে, চা খেতে গিয়ে কাপ ভেঙে ফেলছে।
আমি-- আরে আব্বার তো বয়স হয়েছে তাই ভারসাম্য রাখতে পারেন না।
লুনা-- হইছে আর বলতে হবে না, সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে আমি যে কী করবো তার ঠিক নেই।
আমি-- আচ্ছা আমি আব্বাকে বুঝাচ্ছি।
এই ৬ মাসে লুনা প্রতিদিন আমাকে হোটেল থেকে তরকারি আনতে বলতো। আমি অফিস থেকে ফেরার সময় তরকারি আনতাম।
একদিন বাবা এসে বলতেছে,
বাবা-- বাবা ফারাবি কয়টা টাকা দিবি?
আমি-- টাকা দিয়ে কী করবেন আব্বা?
বাবা-- জানিস বাবা কতদিন ধরে ভালো কিছু খাই না, তোর মা যখন বেঁচে ছিল তখন কতকিছু রান্না করতো তোর আর আমার জন্য।
বাবার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। বাবা যখন কথাগুলো বলছিল তখন বাবার চোখে স্পষ্ট পানি দেখতে পেলাম।
তার মানে লুনা ভালো কিছু রান্না করে না, তাই তো আমাকে হোটেল থেকে তরকারি আনতে বলে আর সেই তরকারি সে বাবাকে দেয় না।
আমি-- আব্বা এই নেন ৫০০ টাকা, হোটেল থেকে খেয়ে নিবেন।
বাবাকে টাকা দিয়ে আমি অফিসে চলে গেলাম।
জানতাম লুনা বাবাকে ভালো খাবার দেবে না, তাই সেদিনের পর থেকে প্রতিদিন হোটেল থেকে বাবার জন্য আলাদা করে খাবার আনতাম।
লুনা এটা সহ্য করতে পারেনি, জানি না সে কেন এমন করে।
আচ্ছা সে বাবাকে নিজের বাবা ভাবতে পারে না? আসলে আমাদের সমাজটাই এরকম। অনেকে নিজের বাবাকে আপন ভাবি না, আবার অনেকে অন্যের বাবাকেও আপন এর আসনে বসাতে পারি না। সামান্য একটা বিএ পাস, এমএ পাস করে অহংকারি আর স্বার্থপর হয়ে যাই, নিজেকে অনেক বড় ভাবি। সম্মানবোধটুকু হারিয়ে ফেলি আমরা, নির্যাতন আর অত্যাচার করি বাবাদের উপর। আমরা কি জানি আমাদের B.A পাসের চেয়ে একটা বাবার সম্মান অনেক। কারণ বাবারা ডাবল B.A।
BA+BA=Baba.
সামান্য শিক্ষাটুকু অর্জন করে আমরা মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে ফেলি। কয়েকটা টাকা বেশি চাওয়ায় রিক্সাওয়ালাদের প্রতি অত্যাচার করি। সামান্য একটু শিক্ষিত হয়ে বাবার বয়সি রিক্সাওয়ালাদের বলি- এই যাবি নাকি অমুক জায়গায়।
আমাদের লজ্জাবোধটুকু নেই, আমরা বাবার বয়সীদের তুই বলে সম্বোধণ করি, আরও কত গালি দিই সেটা নাহয় নাই বললাম।
কেন আমরা সবাইকে আপন এর আসনে বসাতে পারি না?
কেন তাদের সাথে খারাপ আচরণ করি? তারাও তো কারো না কারও বাবা।
প্রতিদিন লুনার অভিযোগ শুনতে শুনতে আমিই যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। অভিযোগের খাতাটা প্রত্যহ যেন একটু একটু করে পূর্ণ হতে থাকলো। লুনার প্রত্যেকটা অভিযোগ আমি শুনে যাই, কিন্তু বাবাকে কিছুই বলি না, এই মানুষটার জন্যই তো আজ আমি পৃথিবীতে, আর প্রতিষ্ঠিত।
লুনা-- আমি আর এই বাসায় থাকবো না।
আমি-- কেন কী হয়েছে?
লুনা-- তোমার বাবাকে অন্য কোথাও রেখে আসো, নয়ত আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।
লুনা কথাগুলো বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। লুনার বেরিয়ে যাওয়ার পর মনে হল আরও কেউ একজন আড়াল থেকে চলে গেল, পায়ের শব্দ অনুভব করলাম। হয়তো বাবা লুনার কথাগুলো শুনেছে।
চিন্তা করতে লাগলাম কী করা যায়। কী করবো আমি এখন, একদিকে জন্মদাতা অন্যদিকে জীবনসাথি। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ভাবতে লাগলাম। ভাবনার অবসান না হতেই লুনা আবার রুমে প্রবেশ করে বলতে লাগলো,
লুনা-- আমি জানিনা তুমি কী সিদ্ধান্ত নেবে, তবে যেটা নেবে সেটা কালকের মধ্যেই নেবে।
আমি-- কীসের সিদ্ধান্ত? আমি তো কিছু বুঝলাম না।
লুনা-- এই বাড়িতে তোমার বাবা থাকবে নাকি আমি থাকবো এই সিদ্ধান্তের কথা বলছি।
আমি-- ঠিক আছে আমি ভেবে দেখি কী করা যায়।
লুনা রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সেদিন আর অফিস যাওয়া হলো না, সারাদিন ভাবতে লাগলাম কী সিদ্ধান্ত নেব আমি। বিকেলে বের হলাম রাস্তায় হাঁটতে। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে, রাস্তার পাশে এরশাদ ভাইয়ের চায়ের দোকানে বসলাম।
চা খাচ্ছি, এরশাদ ভাই হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন,
এরশাদ-- ফারাবি ভাই, মনে হচ্ছে আপনার মনটা খারাপ।
আমি-- না ভাই, তেমন কিছু না।
এরশাদ-- আমি বুঝতে পারছি আপনি অত্যন্ত চিন্তিত।
আমি-- কী আর বলবো রে ভাই, ঘরের অশান্তি কি আর বাইরে প্রকাশ করা যায়।
এরশাদ-- ঘরে অশান্তি! কোনো সমস্যা না হলে আমাকে বলতে পারেন।
আমি-- দুঃখের কথা কী আর বলবো, আমার বউটা বড্ড খারাপ হয়ে গেছে, আমার আব্বাকে একদম সহ্য করতে পারে না।
এরশাদ-- কী বলেন ভাই, এরকম হলে তো খুবই সমস্যা।
আমি-- হ্যাঁ, আব্বার বয়স হয়েছে, একটু-আধটু সমস্যা করতেই পারে, কিন্তু আমার বউ সেটা মানতে নারাজ।
এরশাদ-- শোনেন ভাই, আপনার তো মা-ও নেই, এই একমাত্র বাবা-ই আপনার সম্বল, আপনি কী সিদ্ধান্ত নিবেন সেটা আমি জানি না, তবে মনে রাখবেন এই বাবার জন্যই আজকে আপনি পৃথিবীতে, আর তাঁর জন্যই আজ আপনি প্রতিষ্ঠিত।
আমি-- হ্যাঁ ভাই, আচ্ছা আজ আসি, পরে কথা হবে।
এরশাদ ভাইয়ের দোকান থেকে সোজা বাসায় চলে আসলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেও জানি না।
মধ্যরাতে কারো কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। অনুভব করলাম শব্দটা আব্বার রুম থেকেই আসছে। দরজাটা হালকা ফাক করে দেখতে পেলাম আব্বা নামায শেষে জায়নামাযে বসে কাঁদছে।অজান্তেই তখন নিজের চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগলো।
চোখের পানি মুছে আব্বার পাশে গিয়ে বসলাম।
আমি-- আব্বা আপনি কাঁদছিলেন কেন?
বাবা-- নারে বাবা এমনি।
আমি-- আপনি লুনার কথায় কাঁদছেন আমি বুঝতে পারছি।
বাবা-- বউমা ঠিক বলেছে রে আমাকে অন্য কোথাও রেখে আয়, আমার জন্য তোদের সমস্যা হচ্ছে।
আমি-- আচ্ছা বাবা দেখি কী করা যায়, আপনি এখন চুপ করে ঘুমিয়ে পড়েন।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি লুনাকেই বাড়ি থেকে বের করে দেবো। আমার সিদ্ধান্তের কথা আব্বাকে জানাইনি, কারণ তাঁকে জানালে তিনি লুনাকে যেতে দেবেন না।
খুব সহজ-সরল এই মানুষটা। সকাল হতে না হতেই লুনা আবার বকবকানি শুরু করলো,
লুনা-- কী হলো তুমি কী সিদ্ধান্ত নিলে?
আমি-- দুষ্টু গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল অনেক ভালো।
লুনা-- মানে, কী বলতে চাও তুমি।
আমি-- তোমার মতো মেয়ে এ বাসায় থাকার চেয়ে না থাকা অনেক ভালো, তুমি যেতে পারো।
লুনা-- এত কম ভালোবাসো আমাকে, একটা বুড়ো বাবার জন্য আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছো?
বুড়ো, এই কথাটা সহ্য করতে পারলাম না, শোনার সাথে সাথেই ঠাস্ করে একটা থাপ্পড় দিলাম লুনার গালে।
আমি-- হ্যাঁ, এই বুড়োর জন্যই তোমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছি, কারণ এই বুড়ো মানুষটার জন্য আজ আমি পৃথিবীতে, ওনার কারনেই আজ আমি প্রতিষ্ঠিত।এই মানুষটার নি:স্বার্থ ভালবাসার কাছে তোমার মতো স্বার্থপরের ভালোবাসা তুচ্ছ,তুমি যেতে পারো, বিদায়।
কথাগুলো বলে লুনাকে বের করে দিলাম বাসা থেকে।
লুনার মতো মেয়েরা যে সংসারে যাবে সেই সংসারের প্রতিটা বাবা-মা হবে নির্যাতিত।
বাবা-মা হাজারো কষ্ট সহ্য করে ত্যাগ স্বীকার করে আমাদেরকে ছোট থেকে বড় করে তোলে আর ওদের মতো মেয়েরা সংসারে এসে সেই ছেলেকে নিজের গোলাম বানিয়ে ফেলে, বাবা-মার উপর চালায় নির্যাতন।
ঘৃণা করি এমন ছেলেদের, যারা বউয়ের গোলাম।
বাবা-মাকে কষ্ট দিও না, যদি পারো ওদের মতো মেয়েদের লাথি মেরে বের করে দাও বাসা থেকে।
বাবা-মায়ের এক ফোঁটা চোখের পানি আপনার জন্য বয়ে আনতে পারে সফলতা আবার বয়ে আনতে পারে দূর্ভাগ্য। চোখের পানিটা যদি আপনাকে ভালোবেসে ঝরে যায় তাহলে আপনার জন্য মঙ্গল,আর যদি কষ্ট পেয়ে চোখের পানি ঝরে তাহলে আপনি পৃথিবীতে আর আখিরাতে ধ্বংস হবেন।
গল্পঃ বাবা
লেখকঃ আকরাম হোসেন ফারাবি
""সমাপ্ত""
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now