বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রাতের প্রায় সাড়ে দশটার মতো বাজে।
বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে আছেন
আফসার সাহেব। শীতটা ইদানীং একটু বেশীই
লাগছে, চারিদিকে বেশ ঘন কুয়াশা। আজ
আবার চাঁদের আলোও বেশ। ঘন কুয়াশা ভেদ
করে জ্যোৎস্না চুয়ে পরছে, দেখতে ভালো
লাগছে। এমন সময় গাড়ীর আওয়াজ শোনা
গেলো, আসিফ এসেছে।
আফসার সাহেবের বাড়িটার নাম বড় সুন্দর।
বাড়ির নাম দিয়েছেন "বৃন্দাবন"। এই নাম
দেওয়ার পেছনের রহস্য একমাত্র আফসার
সাহেবই ভালো করে জানেন। বাড়িতে
ঢুকতেই সামনে পরে একটা ফোয়ারা, ছোট্ট
এক পরী সেই ফোয়ারার মধ্যমনি। চারপাশ
থেকে পানি এসে তার গায়ে পরছে।
জোৎস্নার আলোয় দেখতে বেশ লাগে। যেন
জ্যোৎস্না-স্নানে পরীটি ব্যাস্ত। ঝরনা
ঘেসেই বাগান, বেশ কিছু জায়গা নিয়ে সেই
বাগান। বাগানের কোলেই হলো ছোটখাট
দোতলা সেই "বৃন্দাবন"। তবে আজ পুরো
দোতলা বাড়ি অন্ধকার। ভেতরে একটা
লাইটও জ্বলছে না। আসিফের দোতলায় উঠতে
মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালাতে হলো।
দোতলায় উঠেই বা দিকে বাবার লাইব্রেরী
ঘর। সন্ধ্যার পর থেকে বেশ কিছু সময় বাবা
এখানে কাটান, মাঝে মাঝে মা এসে বসেন।
তখন অনেকসময় দুজনে মিলে মিহী আওয়াজে
গান শোনেন। সেই দৃশ্য দেখার মতো দৃশ্য। আজ
বাবা রিডিং রুমে নেই, আসিফ লাইব্রেরী
রুমের ভেতরে গেলো। ঘরের বারান্দা থেকে
আফসার সাহেব ডাক দিলেন!!
আফসার সাহেবঃ আসিফ...
আসিফঃ জ্বী বাবা, বলো।
আফসার সাহেবঃ তুমি এখানে বসো। তোমার
সাথে কিছু কথা বলি।
আসিফঃ বলো বাবা, কি বলবে।
আফসার সাহেবঃ আমাদের অফিস বিকেল
পাঁচটায় ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। সব স্টাফরা
সন্ধ্যা ছটার ভেতর বেরিয়ে যায়। তারপর সব
কিছু বন্ধ হতে হতে রাত আটটা। কিন্তু এখন
বাজে পোনে এগারোটা। তুমি এতটা সময়
কোথায় ছিলে??
আসিফঃ তেমন কিছু না বাবা। আজ হঠাৎ
ড্রাইভ করতে ইচ্ছে হলো তাই।
আফসার সাহেবঃ তুমি নাকি ইদানীং কেমন
মনমরা হয়ে থাকো?? সারাক্ষনই চুপচাপ
কাটিয়ে দাও?? আজকাল নাকি দুপুরের
খাবারও খাচ্ছ না??
আসিফঃ কে বললো বাবা?? মিলি??
আফসার সাহেবঃ হ্যা বাবা, মিলি।
আসিফঃ তেমন কিছু না বাবা। এমনিই....
আফসার সাহেবঃ আসিফ, বাবা আমি
তোমাকে ছোটবেলা থেকেই আদর যত্ন করে
বড় করেছি, তোমাকে পড়াশুনা করিয়েছি,
বাইরে থেকে তুমি পি এইচ ডি করে এসেছো,
সমাজে আজ তুমি প্রতিষ্ঠিত। তবে কেনো
তুমি নিজের ওপর এমন অন্যায় করছো বাবা??
তোমার কি আমার বা তোমার মায়ের
বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে??
আসিফঃ না বাবা। আমি তোমাকে এবং
মাকে খুব বেশী ভালোবাসি বাবা।
তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ
নেই। তোমরা দুজনই তো আমার পৃথিবী।
আফসার সাহেবঃ আসিফ, তোমার মায়ের খবর
রাখো তো আজকাল?? সে এ কদিন ধরেই
অসুস্থ। আজ এখন পর্যন্ত কিছুই খায় নি!
আসিফ সাথে সাথে উঠে গেলো। তার
জীবনে যা হবার হয়ে গেছে। তাই বলে এই
দুজন মানুষকে দুঃখ দেয়া পুরোই অর্থহীন।
শোবার ঘরে এসে দেখে মা ঘুমিয়ে গেছে।
তারপরও আসিফ ডাক দিলো..
আসিফঃ মা!
নাজমা আহমেদঃ আসিফ, আয় বাবা। বোস...
আসিফঃ মা, আজ সারাদিন নাকি কিছুই খাও
নি তুমি?
নাজমা আহমেদঃ আসলে বাবা, মুখে রুচি নেই
তাই খাই নি!! তুই কখন এলি?? খেয়েছিস তো??
আসিফঃ না, এখনো খাই নি। তুমি ওঠো তো,
আমার সাথে খাবে চলো।
পৃথিবীর সব একদিকে, আর নাজমা আহমেদের
কাছে তার ছেলে আরেক দিকে। গত ২৭ বছর
ধরে কোনোদিনও আসিফের কোনো কথা
তিনি ফেলেন নি। আজও পারেন নি, মুখে রুচি
নেই তো কি হয়েছে? খেতে হবে। আসিফের
সাথে বসেই খেতে হবে।
খাবারের টেবিলে সব কিছু দেওয়া আছে।
রহিমা খালা বোধহয় একটু আগেই সব গরম
করে রেখেছেন। আসিফ তার মায়ের সাথে
টেবিলে বসলো। প্লেটে ভাত তরকারী নিয়ে
মায়ের মুখে তুলে দিলো।
নাজমা আহমেদঃ আসিফ, তুই খাবি না?
আসিফঃ খাবো মা, আমি আর তুমি এক
প্লেটে খাবো আজ।
নাজমা আহমেদ কথা বাড়ালেন না, চুপচাপ
খেয়ে চলেছেন। আসিফ নিজেও খাচ্ছে। আজ
সারাদিনে আসিফ কি কি করলো তাও বকে
যাচ্ছে তার কাছে। নাজমা আহমেদ তার কথা
খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছেন আর খাচ্ছেন।
ভাতগুলোকেও আজকে অমৃত বলে মনে হচ্ছে।
আফসার সাহেব দূর থেকে সব দেখছেন। মা-
ছেলের এই ভালোবাসার সাথে তিনি গত
সাতাশটি বছর ধরে পরিচিত।
২.
নাদিয়ার কাছে ইদানীং সব কিছুই কেমন
যেন অসহ্য মনে হচ্ছে। তার কাছে প্রায়
সারাক্ষনই মনে হচ্ছে তার আশেপাশের
প্রতিটা মানুষ যেনো তার প্রতি সহানুভূতি
দেখাতে চাচ্ছে গায়ে পরে। এই একটা
সপ্তাহ আগেও সব কিছু ঠিক ঠাক ছিলো।
আসিফ ছেলেটা জীবনটাকে লন্ডভন্ড করে
দিয়েছে। নাদিয়ার কাছে যদি এখন একটা
বন্দুক থাকতো তবে তার সবকটা বুলেট সে
আসিফের বুকে ঢুকিয়ে দিতো। এই একটা
ছেলের কারনে সব কিছু শেষ। আসিফের
সম্বন্ধে আগে থেকেই যদি সব জানা থাকতো
তবে এমনটি কখনোই হতো না। এই ছেলেটাও
আরেক ধাপ্পাবাজ, সাথে তার মা। আসিফের
সাথে এক সপ্তাহ আগেও দেখা হয়েছিলো।
ফোনেও কথা হয়েছে বেশ কয়েকবার। আসিফ
যদি তখনও শুধু তাকেই সবকিছু জানাতো তবে
হয়তো নাদিয়া সবকিছু সামলে নিতো। কিন্তু
সেদিন, এতগুলো মানুষের সামনে!!! ছিহ....
মুনীরা বেগম মেয়ের ঘরে এলেন। নাদিয়া
জানালার সামনে দাড়িয়ে আছে।
মুনীরা বেগমঃ মা, কি করছিস!!!
নাদিয়াঃ চাঁদ দেখছি আম্মু।
মুনীরা বেগমঃ চাঁদ তো আকাশে রোজই ওঠে।
তুই এমন ভাবে দেখছিস যেনো আজ নতুন
কোনো চাঁদ আকাশে ওঠেছে।
নাদিয়াঃ এতদিন ধরে চাঁদটাকে সাধারনই
লাগতো। কিন্তু আজ কেন যেন মনে হচ্ছে ঐ
চাঁদের সাথে আমার একটা অদ্ভূত মিল আছে।
মুনীরা বেগমঃ তাই বুঝি? কি মিল?
নাদিয়াঃ আম্মু, লোকে বলে চাঁদের কলঙ্ক
আছে। আমার জীবনেও কলঙ্কের ছাপ পরে
গেলো। লোকে হয়তো এখন আমায় নিয়েও
কথা বলবে।
মুনীরা বেগমঃ লোকে তো কত কথাই বলে
মা। লোকের কথায় কি আসে যায়?? মানুষের
জীবনটা একটা পরীক্ষা। পরীক্ষায় যেমন
গার্ডরা দশ মিনিটের জন্যে খাতা নিয়ে
সামান্য শাস্তি দেন ঠিক তেমনি স্রষ্টাও
আমাদের এই জীবনে গুচ্ছ কিছু ঘটনা দিয়ে
আমাদের পরীক্ষাটা আরও একটু কঠিন করে
দেন। ব্যাস এই টুকুই। তোর সাথেও এমন
হয়েছে। এতে কলঙ্কের তো কিছুই নেই।
নাদিয়া তার মাকে জড়িয়ে ধরলো।
নাদিয়াঃ আম্মু, তুমি কত সহজেই কঠিন কিছু
কথা বলে ফেললে। জীবন কি সত্যিই এতো
সহজ??
মুনীরা বেগমঃ জীবন টা জীবনের মতোই মা।
আমরাই তাকে কঠিন করি, আমারাই আবার
সহজ করি।
নাদিয়াঃ আম্মু, আসিফ ছেলেটা নিশ্চই খুব
শান্তিতে আছে। তবে আমার কেনো এতো
বেশী কষ্ট লাগছে??
মুনীরাঃ কে বললো যে আসিফ শান্তিতে
আছে?? ছেলেটা হয়তো নিজেও এমন কোনো
আকস্মিক ঘটনার জন্যে প্রস্তুত ছিলো না।
আমার তো মনে হয়, সে নিজেও কিছু জানতো
না।
নাদিয়াঃ না মা, ওরা জেনেশুনেই এমন
করেছে।
মুনীরা বেগমঃ থাক, বাদ দে সেসব। এখন
ঘুমিয়ে যা। কাল থেকে কি ভার্সিটিতে
যাবি?
নাদিয়াঃ হ্যা যাবো!!!
নাদিয়া শুয়ে পরলো, মনে মনে আসিফের মৃত্যু
কামনা করছে সে।
৩.
সকাল ৮টা বাজে। অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে
আসিফ। নাদিয়াকে সে অনেকবার ফোন
দিয়েছে কিন্তু কোনো কাজ হয় নি।
নাদিয়ার ফোন বন্ধ। কিন্তু নাদিয়ার সাথে
দেখা করাটা খুবই জরুরী। আজ না হয় অফিস
থেকে ফিরতি পথে নাদিয়াদের বাসায়
যাওয়া যাবে।
বাসা থেকে বেরিয়ে পরলো আসিফ।
অনেকদিন হলো বাইকে চড়া হয় না। আজ তাই
বাইক নিয়ে বেরিয়েছে সে। না চাইতেও
আগের সব ঘটনা মনে পরছে আবার...
সেদিন শুক্রবার ছিলো। এক সপ্তাহ আগের
ঘটনা। আসিফের বিয়ের দিন। আসিফের বাবা
এই শহরের অন্যতম বিজনেস টাইকুন তার
ছেলের বিয়েতে কোনো কিছুর কমতি রাখেন
নি। মেয়ে নাদিয়া, আসিফের বাবা-মায়ের
পছন্দ করা মেয়ে। আসিফেরও কিন্তু খুব পছন্দ
হয়েছিলো নাদিয়াকে। মেয়েটি একটু
শ্যামলা, আসিফের উল্টো। আসিফ টকটকে
ফর্সা, বন্ধুরা তাকে ডাকতো বিড়াল ।
আত্মীয় স্বজনরা তিন-চার দিন আগে বাসায়
চলে আসে। পুরো "বৃন্দাবন" কে কৃত্রিম আলোয়
সাজানো হয়। শহরের নামকরা ব্যাক্তিত্বরা
স্ব-পরিবারে আসিফের গায়ে হলুদে আসে।
সন্ধ্যা থেকে রাত ৩ টা পর্যন্ত হলুদের
অনুষ্ঠান চলে।
পরদিন ররযাত্রায় একটা ঘোড়াকে দেখা
গেলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ঘোড়ায় চড়ে
আসিফ বউ আনতে যাবে সাথে আছে পালকি।
পুরো ব্যাপারটাই আফসার আহমেদের কথা
মতো হয়েছে। তার মতে, "এক মাত্র ছেলের
বিয়ে। আয়োজনের কোনো কমতি থাকবে না।
প্রয়োজনে আরও টাকা ঢালবো কিন্তু
আয়োজন হতে হবে চোখে পরার মতো।"
ঘোড়ায় চড়া যে কত কঠিন সেটা আসিফ
সেদিন হারে হারে টের পেয়েছিলো।
সারাক্ষনই মনে হচ্ছিল সে একটা স্প্রিংয়ের
চেয়ারে বসে আছে, যেই চেয়ারের কাজই
হলো উপরে-নিচে উঠা-নামা করা।
যে রাস্তা দিয়ে বরযাত্রা যাবে সেটায় যান
চলাচল সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দেয়া
হয়েছিলো। শুক্রবারে তেমন চাপও নেই। তবে
কয়েকটা এম্বুলেন্সকে দেখা গেলো
বরযাত্রা ক্রস করে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে
মানুষরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখতে লাগলো
সব কিছু। সামনে পেছনে সব নামী দামী
ব্র্যান্ডের গাড়ি চলছে পিপড়ের মতো।
মাঝখানে যাচ্ছে বরযাত্রা। ঘোড়ায় করে বর
যাচ্ছে আর সব পুরুষরা তার সাথে সাথে
হাটছে। তিন-চারজন ক্যামেরা ম্যান পুরো
ব্যাপারটাকে ভিডিও করে রাখছে। যারা
হেটে হেটে যাচ্ছে তাদের অনেককেই
সচরারচর হাটতে দেখা যায় না, তাদের স্থান
হলো কালো কাঁচের ওপাশে। প্রথমেই
ঘোড়ার পাশে পাশে হাটছেন আফসার
আহমেদ, তার সাথে আছেন পররাষ্ট্র সচিব
শাফকাত মজুমদার, পুলিশের আইজি বেলাল
সফদার, জামাল করিম, কামাল উদ্দিন, করিম
রহমান, জাবেদ সরকারের মতো আরও বেশ
কিছু প্রতাপ শালী মানুষকে দেখা যাচ্ছে
আনন্দ করতে করতে বরের পাশে পাশে
যাচ্ছেন।
বরযাত্রা গ্রীন হেভেন ওয়েডিং সেন্টারে
পৌছালো দুপুর দেড়টা নাগাদ। নাদিয়ার
বাবা বশীর উদ্দিন বরযাত্রাকে স্বাগতম
জানানোর কোনো কমতি রাখেন নি। কাজী
এলেন দুটো বাজে। বিয়ে পড়ানোর পরই
খাবার দেয়া হবে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু
হয়ে গেছে, কাজী বরকে "কবুল" বলার জন্য
অনুরোধ করার প্রায় সাথে সাথে পেছনে
থেকে কে যেনো বলে ওঠলো, "আসিফ,
আফসার সাহেবের নিজের ছেলে নয়।
আসিফকে পালক নেয়া হয়েছিলো। আসিফ
পালক সন্তান"
পুরো সেন্টারটা হঠাতই একদম নীরব হয়ে
গেলো। সবাই পেছনে তাকাচ্ছে, কিন্তু
সেখানে কেউ নেই। তাছাড়া কেউ নিশ্চই
এমন বিশ্রী মজা এমন সময়ে এসে করবে না।
আফসার সাহেবের চেহারা রক্তশূন্য। আসিফও
কিছুই বুঝতে পারছে না। বশীর সাহেব
আসিফের বাবার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং
জানতে পারলেন ঘটনা সত্যি। আফসার
আহমেদ নাদিয়ার বাবার হাত ধরে ফেললেন।
তিনি অনুরোধ করলেন যেনো বিয়েটা
করানো হয়। কিন্তু কোনো সুস্থ পিতাই হয়তো
একটা বেজন্মা ছেলের কাছে তার মেয়ে
তুলে দিবেন না, হোক তার বর্তমান পিতা
আফসার আহমেদ এর মতো মানুষ। বশীর
উদ্দিনও পারলেন না, তিনি রাগে গজগজ
করতে করতে বললেন - "আপনারা কি স্ব-
সম্মানে চলে যাবেন? নাকি ঘাড়ে ধাক্কা
দিয়ে বের করে দেবো?"
কথায় আছে "মানী লোকের অপমান বজ্রপাত
তুল্য"। এখানেও তাই হলো, কিন্তু কেউই
আফসার সাহেবকে এই বিব্রতকর
পরিস্থিতিতে ফেলে চলে গেলেন না।
শাফকাত মজুমদার নাদিয়ার বাবার সাথে
কথা বলতে গেলেন, তিনি ব্যাপারটা সামাল
দেয়ার চেষ্টা করলেন কিন্তু কোনো লাভ হয়
নি। তাছাড়া এটা এমন এক পরিস্থিতি যা
হঠাৎ করে ঠিক করে ফেলা যায় না।
তারপরের দৃশ্যটা অপ্রত্যাশিত। নাজমা বেগম
অসুস্থ হয়ে পরেন। তাকে নিয়ে গাড়িতে
তোলা হয় দ্রুত। পুরো বরযাত্রা ফেরত চলে
আসে। যে গাড়ীগুলো পিপড়ের মতো করে
চলছিলো সেগুলো সাই সাই করে বেরিয়ে
যায় ওয়েডিং সেন্টার থেকে। নাজমা
আহমেদকে হসপিটালে ভর্তি করানো হলো,
দুদিন পর তিনি বাসায় এলেন। তারপর থেকেই
কেমন যেনো হয়ে গেলো সবকিছু। তিনজন
মানুষ যেন তিন ভিন্ন জগতের বাসিন্দা।
আফসার সাহেব এই অপমান হজম করেন নি।
তিনি ভালো করেই জানেন এই কাজ কার।
তিনি তার প্রতিশোধটা সুদে আসলে নেয়ার
সব প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। মোটা অংকের
টাকা কিছু মানুষের হাতে তুলে দেন, একটা
মানুষকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে
ব্যাস। কিন্তু তার আগেই নাজমার এক মাত্র
সৎ ভাইটা গাড়ীর একসিডেন্টে মরে গেছে।
আসিফ অফিসের প্রায় কাছাকাছি চলে
এসেছে এমন সময় একটা রিক্সা হঠাৎ করে
বামদিকে মোড় নেয়। তাল সামলাতে পারে
না আসিফ, মোটরসাইকেলের ব্রেকটা
সজোড়ে চেপে ধরে। সামনের চাকা থেমে
গেলেও উলটে যায় পেছনের চাকা, মুখ থুবরে
মাটিতে পরে প্রায় দুই-তিন হাত সামনে চলে
যায় সে।
হঠাৎ করে কি থেকে কি হলো কিছুই বোঝা
গেলো না। রিক্সাওয়ালার দোষ স্পষ্ট।
তাকে কয়েকজন ধরে মারা শুরু করলো। কিন্তু
ট্রাফিক সার্জেন্ট এসে পড়ায় বেচারা
ভয়ঙ্কর মারের হাত থেকে বেঁচে গেলো।
নাদিয়া তারাতারি রিক্সা থেকে নেমে
মাটিতে পরে থাকা মানুষটার কাছে গেলো।
তার কাছে প্রচুর বিরক্ত লাগছে। কোন
কুক্ষনে যে এই রিক্সায় চড়েছিলো কে
জানে। গিয়ে দেখে ছেলেটা নিথর হয়ে পরে
আছে, বোধহয় মারাই গেছে। তাড়াতাড়ি
কোনোমতে হেলমেটটা খুললো নাদিয়া।
খুলেই সে অবাক, আসিফকে চিনতে পেরেছে
ঠিকই কিন্তু থুতনির জায়গায়টা কেটে ফাক
হয়ে আছে। ডান হাত উল্টো দিকে মুচড়ে
আছে, বোঝাই যাচ্ছে ভেঙ্গে গেছে।
নাদিয়া তাড়াতাড়ি আশে পাশে তাকালো।
একটা রিক্সাকে ডেকে এনে ট্রাফিক
সার্জন্ট আর রিক্সাওয়ালার সাহায্য নিয়ে
রিক্সায় তুললো আসিফকে। সাথে সে নিজেও
ওঠলো। আসিফের পুরো ভর নাদিয়ার ওপর,
নাদিয়ার সামলে ওঠতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
আসিফের বোধহয় থুতনির জায়গাটা থেকে
রক্ত পরছেই। গায়ের ওড়নাটা সেখানে চেপে
ধরলো নাদিয়া। আসিফ বিড় বিড় করে কিসব
বলছে। নাদিয়া শুনার চেষ্টা করলো এবং যা
সে শুনলো তা বেশ অবাক করার মতো।
৪.
মুনীরা বেগম মেয়েকে দেখে তাজ্জব বনে
গেলেন। মেয়ের ডান কাধ এবং ওড়না রক্তে
ভিজে গেছে।
মুনীরা বেগমঃ কিরে, কি হলো?
নাদিয়াঃ কিছু না মা, আমার রিক্সার সাথে
এক ছেলের মোটর বাইকের একসিডেন্ট হয়।
তাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হয়েছে। তারই
শরীরের রক্ত লেগে আছে জামায়।
মুনীরা বেগমঃ বেশ করেছিস মা। আহারে!!
না জানি কার ছেলে। বেশ রক্ত ঝরেছে
ছেলেটার। তোর জামা খুলে ঝুরিতে রেখে
দে। কাল সুরমা কাজ করতে এলে ডাস্টবিনে
ফেলে দিয়ে আসবে।
নাদিয়াঃ ছেলেটা আসিফ মা!!
মুনীরা বেগমঃ বলসিছ কি!! আহারে, কেন
যেন আজকালের ছেলেগুলো এমন
বেপোরোয়া ভাবে বাইক চালায় কেন,কে
জানে।
নাদিয়াঃ মরে গেলেই বরং বেশী খুশী হতাম
মা। বেঁচে গেছে। হসপিটালে নিতেই এক
ডাক্তার আসিফকে চিনতে পারলো। সাথে
সাথে তাকে নিয়ে পুরো হসপিটালেরর
স্টাফরা ব্যাস্ত হয়ে পরলো।
মুনীরা বেগমঃ মরে যাওয়ার জন্য রাস্তায়
ফেলে এলেই পারতি। চাপচাপি করে
হসপিটালে নিতে গেলি কেনো।
নাদিয়াঃ জানি না মা!!! জানো ছেলেটাকে
হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার জন্য যখন রিক্সায়
ছিলাম তখন সে বিড় বিড় করে কি
বলছিলো?? সে বলছিলো, "আমাকে বাঁচান
প্লীজ, আমাকেই বাঁচতেই হবে। আমার বাবা-
মার জন্য বাঁচতে হবে"। একটা বেজন্মার
আবার বাঁচার কত শখ!!
মুনীরা বেগমঃ ছিহ নাদিয়া, অমন করে বলতে
নেই। যা নিজের ঘরে যা।
রাতের বেলা বশীর উদ্দিনের গলা শোনা
গেলো, "মুনীরা শুনছো?? আফসার শালার
বেজন্মা ছেলেটা নাকি আজ একসিডেন্ট
করে পরে ছিলো। তারপর কে বা কাহারা
তাকে নিয়ে হসপিটালে দিয়ে আসে!! বেশ
হয়েছে। মরে গেলেই বরং ভালো হতো"
৫.
আফসার সাহেব যেন অকূল পাথারে পরে
গেছেন। তার একটা মাত্র ছেলে। কি হতে
কি হয়ে গেলো। ডান হাতটা নাকি জয়েন্ট
থেকে খুলে গেছে, সেটা নাকি ঠিক হয়ে
যাবে আস্তে আস্তে। তবে সবচেয়ে বড় ভয়
হলো ফুসফুস নিয়ে। পাজরের একটা হার
ভেঙ্গে গিয়ে ফুসফুসে ঢুকেছে, সেটা বের
করার আপ্রান চেষ্টা করেছে ডাক্তাররা।
এখন সব ঠিক আছে। ডাক্তাররা বলছে, " চার-
পাঁচ মাস লাগবে সুস্থ হয়ে উঠতে।
আরেক সমস্যায় পরেছেন তার স্ত্রী
নাজমাকে নিয়ে। সে আসিফের
একসিডেন্টের খবরটা শুনে নিজেকে
সামলাতে পারেন নি। অসুস্থ হয়ে পরেন।
তাকে বাসায় রেখে চিকিৎসা করানো
হচ্ছে।
এক মাস পরের কথা...
হসপিটালে এলেন মুনীরা বেগম। এসে নিজেই
খুঁজে বের করেন আসিফের রুম। বিকেলের
দিকে আসেন তিনি। আসিফের রুমে কেউ
নেই। শুধু নার্স আছে একজন। আসিফ সজাগই
আছে, তাকে দেখে ব্যাস্ত হয়ে পরেছিলো
কিন্তু মুনীরা বেগম তাকে শুয়ে থাকতে
বললেন।
মুনীরা বেগমঃ বাবা, কেমন আছো?
আসিফঃ নাদিয়া কেমন আছে আন্টি?
মুনীরা বেগমঃ সে আছে তার মতো।
আসিফঃ আপনি এসেছেন ভালোই হয়েছে
আন্টি। আপনার সাথে কিছু কথা বলার
ছিলো!
মুনীরা বেগমঃ বলো! কি বলবে..
আসিফঃ আমাকে ক্ষমা করবেন আন্টি। যদিও
আমি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছি।
নাদিয়ার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছি।
সবার সামনে আপনাদেরকে অপদস্ত ও বিব্রত
করেছি। আসলে আন্টি, আমি যে পালক তা
আগে থেকে আমি জানতাম না। যদি জানতাম
তবে এই বিয়ে কিছুতেই হতো না। আন্টি,
আমার বাবা তখন এই শহরে ব্যাবসা নিয়ে
ব্যাস্ত। মা থাকেন আমার নানার বাড়িতে।
আমার নানা হলো আমার বাবার মামা। বাবা
তার মামাতো বোনকে বিয়ে করেন। মার তখন
প্রেগনেন্সি চলে, শেষের দিকে। একটা সময়
মা কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন। তবে সে
সন্তান ছিলো মৃত। আমার মা জ্ঞান ফিরলে
সব শুনে চিৎকার কর কান্নাকাটি করেন।
বাবা ততক্ষনে শহর থেকে এসে
গিয়েছিলেন। তবে নিয়তি ছিলো খারাপ।
আমার মা পরদিন থেকেই অপ্রকৃতস্থ হয়ে
পরেন। তিনি সারাক্ষনই এক কাল্পনিক
শিশুকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন। আমার নানী
ছিলো আমার মায়ের সৎ মা। সৎ হলেও তিনি
আমার মাকে নিজের মেয়ের মতো
ভালোবাসতেন। তার উপর বাবা মায়ের
বৈবাহিক জীবনে নেমে এলো অশান্তি।
আমার দাদা পাগল কোনো মেয়েকে নিজের
পুত্রবধু বলে মানতে নারাজ। একের পর এক
বিপদ যখন আমার নানা-নানী-বাবার উপর
দিয়ে যাচ্ছে তখনই এলো আরেক বিপদ। এক-
দেড় মাস পরে আমার বিধবা সৎ খালামনি
তার ছেলেকে জন্ম দিয়ে পারি জমালেন
পরপারে। তার শ্বশুড় বাড়িতে ঐ বাচ্চাটাকে
দেখার মতো কেউ ছিলো না। আমার নানী
সেই ছোট ছেলেটিকে নিয়ে এলেন তার
কাছে। আমার মা নাকি সেই শিশুটিকে নিয়ে
ব্যাস্ত থাকতেন। নিজের বুকের দুধ
খাওয়াতেন, বড় যত্ন করতেন। এক সপ্তাহ পরে
আমার মা একদম সুস্থ হয়ে গেলো। সব কিছু
আবার ঠিকঠাক হয়ে গেলো। আন্টি, আমার
মায়ের নাম নাসরিন সুলতানা বাবার নাম
আসফাক মিয়া। আমি বেজন্মা নই!! তাই না
আন্টি.....
মুনীরা বেগম আসিফের দিকে তাকিয়ে
আছেন। আসিফের চোখ বেয়ে পানি পরছে।
তিনি ওঠে গিয়ে নিজ হাতে সেই পানি মুছে
দিলেন। আসিফের কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
"বাবা, তুমি আফসার সাহেবেরই ছেলে বাবা।
তোমার এটাই পরিচয়।"
৬.
বশীর সাহেব আর নাদিয়াকে সব ঘটনা খুলে
বললো মুনীরা বেগম। দুজনই চুপ, কোনো কথা
নেই। নীরবতা ভাঙলেন বশীর সাহেব।
বশীর উদ্দিনঃ আহা, একটা বিরাট ভুল হয়ে
গেলো। ছেলেটারও কোনো দোষ নেই, না
তার বাবা-মায়ের। কিন্তু....
মুনীরা বেগমঃ আমাদেরও কোনো দোষ নেই।
আর দশটা মেয়ের পরিবার ঐ মুহুর্তে যা
করতো আমরাও তাই করেছি। কিন্তু আসল
ঘটনা এখন জানা গেলো।
বশীর উদ্দিনঃ তার মা কেমন আছে?
মুনীরা বেগমঃ আসিফের কাছে শুনলাম
ভালোই আছে।
বশীর উদ্দিনঃ আসিফ এতো কথা জানলো কি
করে?
মুনীরা বেগমঃ আসিফ তার বাবার কাছে
শুনেছে সব।
বশীর উদ্দিনঃ এখন তো আর কিছুই করার নেই।
বাদ দাও সবকিছু!!! দোয়া করি, ছেলেটা সুস্থ
হয়ে উঠুক।
নাদিয়া তার নিজের ঘরে শুয়ে আছে। সবকিছু
যেনো কেমন অদ্ভূত লাগছে। আসিফ
ছেলেটার প্রতি কেমন যেনো মায়া অনুভব
করছে সে। সেই প্রথমবার আসিফকে দেখেই
বেশ ভালো লেগেছিলো নাদিয়ার। এই
ছেলেকে বোধহয় স্রষ্টা মেয়ে বানাতে
গিয়ে একেবারে শেষ মুহুর্তে ছেলে বানিয়ে
ফেলছিলো। নাদিয়া লাজ-লজ্জা ফেলে এক
দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো। ছেলেটার জোড়া
ভ্রু, চোখের পাপড়ি গুলো বেশ ঘন, হলদে
সাদা গায়ের রং তার। ক্রিম কালারের
একটা শার্ট, কালো একটা প্যান্টের সাথে ইন
করে পরেছিলো। শুধু নাদিয়া কেনো, যে
কোনো মেয়েরই পছন্দ হবে আসিফকে। তারপর
আরও দুবার দেখা হয়। আসিফ খুবই লাজুক
প্রকৃতির, নাদিয়া মোটামুটি শিউর এই
ছেলেকে নিয়ে তার বান্ধবীরা বেশ মজা
করতো। আসিফের বাবা মা, কারোর সাথেই
তার চেহারার মিল ছিলো না। ব্যাপারটা
নাদিয়ার কাছে তখন তেমন কোনো খটকা
ধরায় নি। আসিফ কথা খুবই কম বলতো।
সর্বোপরি বলা যায় দুজনেরই দুজনকে মনে
ধরেছিলো।
নাদিয়ার বিয়ের দিনের ঘটনাটা স্পষ্ট মনে
পরছে আবার। সেদিন বেশ করে সেজেছিলো
সে। দুহাতে কনুই পর্যন্ত মেহেদী পরেছিলো।
আসিফের নামটা আলপনার আড়ালে লিখিয়ে
নিয়েছিলো সে। সেদিন নব বধূ রুপে তাকে
বেশ লাগছিলো দেখতে। আসিফকে নিয়ে
মনে মনে কত জল্পনা-কল্পনা করেছিলো সে।
হঠাৎ করেই সব ভেস্তে গেলো। পুরোটা
বিয়ের আসর যেন মৃত্যুপুরী হয়ে গেলো
ক্ষনিকেই।
নাদিয়া মনে মনে ঠিক করলো কাল একবার
আসিফকে দেখতে যাবে। আশ্চর্য কান্ড,
একরাশ ঘৃনা হঠাৎ করে উধাও।
পরদিন সকালে নাদিয়াকে দেখা গেলো
শাদা একটা জামা পরে ফুলের দোকানের
সামনে দাড়িয়ে আছে। সে গত আধ ঘন্টা ধরে
দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছে ফুল নেবে কি না।
পরে ফুল না নিয়েই রওনা দিলো।
নাদিয়া মায়ের কাছ থেকে রুম নং জেনে
এসেছে। সে আসিফের রুমের সামনে এসে
ভাবছে ভেতরে যাবে কি না!!!
তারপর সে ভেতরে গেলো, আসিফ একটা
ছবির দিকে তাকিয়ে আছে। তার উপস্থিতি
টের পেয়ে আসিফ তার দিকে তাকালো!!
নাদিয়াঃ কেমন আছো??
আসিফঃ ভালো, তুমি??
নাদিয়াঃ এই তো!! তোমার স্বাস্থ্যের কি
অবস্থা??
আসিফঃ উন্নতির দিকে!! দাড়িয়ে কেনো
আছো, বসো।
নাদিয়াঃ সেদিন মা এসেছিলো। তুমি রুমে
একা ছিলে, আজ আমি এলাম আজও একা।
আসিফঃ মা অসুস্থ। বাবা অফিস আর মা কে
সামলাচ্ছেন। মাঝে মাঝে আসেন। তাছাড়া
একজন নার্স আছেন সার্বক্ষনিক।
নাদিয়াঃ ও, কিন্তু তারপরও। একেবারে একা
একা....
আসিফঃ না, একা লাগে না। অবসরে বই পড়ি।
মাঝে মাঝে মিলি আসে, দুজনে মিলে গল্প
করি।
নাদিয়াঃ মিলি কে?
আসিফঃ আমার পারসোনাল এসিসট্যান্ট।
আমি অসুস্থ তাই তারও কোনো কাজ নেই।
মাঝে মাঝে আসে।
নাদিয়াঃ ছবিটা কার?? মিলির বুঝি...
কথাটা বলেই নাদিয়া হেসে ফেললো। আসিফ
অবাক, সে হয়তো এতকিছুর পরেও এমন
সাবলীল দুষ্টামি আশা করে নি।
আসিফঃ ছবিটা আমার মায়ের!!
নাদিয়াঃ কোন মায়ের??
কথাটা নাদিয়ার নিজের কানেই কেমন
যেনো বেক্ষাপ্পা শোনালো। আসিফ
ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবেই নিলো...
আসিফঃ আমার আসল মায়ের ছবি।
নাদিয়াঃ তাই বুঝি!! দেখি তো...
ছবি দেখে নাদিয়া অবাক। আসিফের সাথে
ছবির নারীর চেহারার পুরো মিল। পাশে
দাড়ানো মহিলাটা হলো নাজমা আহমেদ,
ওদের দু বোনের ছবি। আসিফের দুই মা
একসাথে।
আসিফঃ নাদিয়া, আমি দুঃখিত...
নাদিয়াঃ হুম!! বুঝতে পারছি।
আসিফঃ বিশ্বাস করো, আমি যদি আগে
থেকে জানতাম তবে তোমাকে অবশ্যই
জানাতাম। তাছাড়া সেদিন তোমাদের
বাসায় যাবো বলেও ঠিক করে রেখেছিলাম।
আমি তোমাকে অনেকবার ফোন দিয়েছি
কিন্তু তোমার ফোন ছিলো বন্ধ।
নাদিয়াঃ আমি আমার আম্মুর কাছে সব
শুনেছি। থাক বাদ দাও সেসব, যা হবার হয়ে
গেছে। আমাদের থেকে বেশী অপদস্ত
তোমরা হয়েছ।
আসিফ কিছু বললো না। মুচকি হাসলো শুধু।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, নাদিয়ারও
ওঠা দরকার।
নাদিয়াঃ আচ্ছা, আমি যাই তাহলে।
আসিফঃ ঠিক আছে, যাও।
নাদিয়া রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
হসপিটালের করিডোরে আরেকটি মেয়েকে
আসতে দেখা গেলো। নাদিয়া পেছনে
তাকিয়ে দেখে সে আসিফের রুমে যাচ্ছে।
এই মেয়ে নিশ্চই মিলি।
৭.
বারান্দায় বসে বসে চা খাচ্ছে নাদিয়া।
আসিফ ছেলেটাকে সেদিন হসপিটালে না
নিলেই বোধহয় বেশ ভালো হতো। ছেলেটা
মাথার ভেতর গেথে গেছে একেবারে।
সারাক্ষনই তার কথা মাথায় ঘুরে। একটু পরে
হাতে চায়ের কাপ নিয়ে এসে মুনীরা বেগমও
বসলেন।
মুনীরা বেগমঃ কিরে?? কি ভাবছিস বসে
বসে??
নাদিয়াঃ কিছু না আম্মু..
মুনীরা বেগমঃ আসিফের সাথে কথা হলো
তোর?
নাদিয়াঃ হ্যা, হয়েছে।
মুনীরা বেগমঃ ছেলেটা বেশ। সত্যি কথা
বলতে একদমই ভয় পায় না।
নাদিয়াঃ জানো আম্মু, সে না একদম তার
মায়ের মতো দেখতে।
মুনীরা বেগমঃ তাই নাকি?? তুই কি করে
জানলি??
নাদিয়াঃ ও আজ তার মায়ের ছবি দেখালো
আমায়।
মুনীরা বেগমঃ ছেলেটা আজও একা ছিলো,
তাই না??
নাদিয়াঃ হ্যা আম্মু, তাকে দেখার মতো
কেউ নেই। আসলে তার বাবা বেশ ব্যাস্ত।
মুনীরা বেগমঃ বিয়েটা সেদিন হয়ে গেলে
বোধহয় আসিফের একাকীত্বটা কেটে
যেতো।
নাদিয়াঃ হ্যা আম্মু, তাই।
মুনীরা বেগমঃ কি??
নাদিয়াঃ না মানে, আসলে আম্মু...
মুনীরা বেগমঃ আচ্ছা বাদ দে। একটা
বেজন্মাকে নিয়ে কথা বলে আর লাভ নেই।
সে তার মতো থাক, আর আমরা আমাদের
মতো।
নাদিয়াঃ আহ আম্মু। অমন করে কেনো বলছো!!
সে বেজন্মা কোথায়। তার মা তাকে জন্ম
দিয়ে মরে গেছে, আমার শ্বাশুড়ি তাকে
বুকের দুধ খায়িয়েছেন। এতে করেই তো তিনি
আসিফের মাই হলেন তাই না। তাছাড়া, জন্ম
দিলেই তো আর বাবা-মা হওয়া যায় না।
মুনীরা বেগমঃ সব কিছু তো ঠিকঠাকই
বলেছিস, কিন্তু..
নাদিয়াঃ কিন্তু কি?
মুনীরা বেগমঃ আসিফের মা তোর শ্বাশুড়ি
হলো কবে থেকে?
নাদিয়া লজ্জায় মায়ের দিকেও তাকাতে
পারছে না। এই আসিফ ছেলেটা শেষমেষ তার
সর্বনাশ করেই ছাড়লো। ধুত্তুরি ছাই,
সর্বনাশা ছেলে।
মুনীরা বেগম হাসছেন। তার মেয়ে দেখা যায়
আসিফ ছেলেটার প্রেমে পরে গেছে।
পাগলী একটা।
*****
নাজমা আহমেদ চুপচাপ বসে আছেন। তার
শরীরটা এখন ভালো আছে। গত এক মাস সময়ে
আসিফকে দেখেছেন মাত্র দু বার। যেই
ছেলেকে না দেখে তিনি দু দন্ড থাকতে
পারেন না সেই ছেলেটা আজ একটা মাস একা
একা হসপিটালে পরে আছে। নাজমা
আহমেদের বুকটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠলো।
আফসার সাহেবঃ কি ভাবছো, নাজমা?
নাজমা আহমেদঃ কিছু না। আমার আসিফটা
কত একা। ছেলেটা কতদিন ধরে পরে আছে
হসপিটালে।
আফসার সাহেবঃ আমি যখনই সময় পাই দেখে
আসি তাকে। তোমার শরীরটাও তো ভালো
নেই। কি করবো বলো, আমি একা মানুষ
এতকিছু কি করে সামলাবো। বয়স বেড়ে
গেছে, বয়সের কাছে যে বড় অসহায় নাজমা।
নাজমাঃ সবকিছু ঠিক ছিলো, আমার
ছেলেটার জীবনেই এমন দাগ পরতে হলো। আর
ঐ মেয়েটার না জানি কি দশা। দুটো জীবন
শেষ হয়ে গেলো। বিয়ের আসরে যেই কাজটা
করেছে তার জায়গা নরকেও যেনো না হয়।
আফসার সাহেবঃ গুছিয়ে ওঠার সময় পাইনি
নাজমা। না হয় ঐ মেয়ের বাড়ি গিয়ে তাদের
কাছে ক্ষমা চেয়ে আসতাম।
নাজমা আহমদেঃ আমার আসিফটা ভালো
হয়ে উঠুক। তারপর যাবো তাদের বাড়িতে।
আমরা নিজেরা গিয়ে ক্ষমা চাইবো।
৮.
বশীর উদ্দিনঃ মুনীরা, তুমি জানো তো তুমি
কি বলছো??
মুনীরা বেগমঃ জানি। আমি জেনে শুনেই
বলছি।
বশীর উদ্দিনঃ শোনো, এটা আর পাঁচজন নয়
মুনীরা। এটা আফসার আহমেদ, তিনি নিশ্চই
সেদিনের অপমান ভুলে যান নি।
মুনীরা আহমেদঃ ভুলে যান নি ঠিক আছে,
কিন্তু যদি তিনি চাইতেন তবে আমাদের উপর
এর প্রতিশোধ নিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু
নেন নি, তাই না।
বশীর উদ্দিনঃ তা অবশ্য ঠিক, কিন্তু...
মুনীরা বেগমঃ আর কোনো কিন্তু নেই। যা
বলছি করো...
বসার ঘরে ঢুকেই চমকে ওঠলেন আফসার
সাহেব। বশীর সাহেব আর ওনার স্ত্রী বসে
আছেন। আফসার সাহেব এগিয়ে গেলেন।
আফসার আহমেদঃ ভাই হঠাৎ আমার বাড়িতে,
কি হয়েছে ভাই?? নাদিয়া ভালো আছে তো!!
সব ঠিক ঠাক আছে তো?
বশীর উদ্দিনঃ না ভাই, সবকিছু ঠিকঠাক
আছে।নাদিয়া ভালো আছে।
আফসার আহমেদঃ তবে ভাই!
বশীর উদ্দিনঃ আসলে ভাই....
মুনীরা বেগমঃ আমরা আসলে সব জেনেছি
ভাই। আমার আকাশের সাথে কথা হয়েছিলো।
আমাদের আসলে সেদিন হঠাৎ উত্তেজিত
হয়ে পরাটা ঠিক হয় নি। আমাদের ভুল
বোঝাবুঝির জন্যেই হয়তো আজ নাদিয়া-
আসিফের এই অবস্থা।
আফসার আহমেদঃ দোষটা আমাদের। আমার ও
আমার স্ত্রীর উচিৎ ছিলো আপনাদেরকে সব
জানানোর কিন্তু সুযোগ হয়ে ওঠে নি।
বশীর উদ্দিনঃ সেসব কথা থাক। আমি চাই
নাদিয়া আসিফের বিয়েটা হয়ে যাক। শুধু শুধু
ছেলে মেয়ে দুটোকে কষ্টে রেখে লাভ নেই।
হহআফসার আহমেদঃ আরে বাহ। এতো বেশ
খুশীর খবর। দাড়ান ভাই, আমার
স্ত্রীকেডেকে আনছি।
৯.
সাত মাস পরের কথা। আজ আসিফের আবার
বিয়ে। বাসর ঘরে বসে আছে নাদিয়া। আসিফ
এখনো আসে নি। তবে কিছুক্ষন আগে তার
শাশুড়ি নাজমা আহমেদ এসেছিলেন।
ভদ্রমহিলা দেখতে যেমন মিষ্টি কথাও বলেন
বেশ মিষ্টি করে।
তিনি বললেন, "জানিস আজ তোকে দেখে
বেশ হিংসে হচ্ছে। এতদিন আসিফকে শুধু
আমি একা ভালোবাসতাম, আজ থেকে আসিফ
শুধুই তোর হয়ে গেলো। আরি বাবা, দেখো
দেখো। মেয়ের লজ্জা দেখো।"
আসিফ এলো আরও কিছু সময় পর। নাদিয়া ইয়া
বড় এক ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। আসিফ এসে
ঘোমটা ওঠালো। নাদিয়া আসিফের দিকে
তাকালো। আসিফের থুতনি বরাবর একটা
ফাটা দাগ। নাদিয়া মনে মনে মোটর
সাইকেলের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছেড়ে
দিলো। আসিফ তার দিকে তাকিয়ে আছে
এখনো। নাদিয়াকে আজ অপূর্ব লাগছে। ঠিক
পূর্নিমার পরিপূর্ন চাঁদ, যে চাঁদের সব আলো
আজ শুধুই আসিফের জন্য।
নাদিয়াঃ তাকিয়ে আছো কেনো অমন
ভাবে।
আসিফঃ আমি আমার বিয়ে করা বউয়ের
দিকে তাকিয়ে আছি, কোনো সমস্যা।
নাদিয়াঃ সমস্যা নেই কোনো। তবে আপনার
বিয়ে বউ সেই সকাল থেকে এক পোশাকে
আছে। তার কি এবার পোশাক পাল্টানো টা
উচিৎ না।
আসিফঃ অবশ্যই উচিৎ। দাড়াও আমি
তোমাকে সাহায্য করছি।
নাদিয়াঃ দাড়াও এক মিনিট। তুমি কি
সাহায্য করবে আবার!!
আসিফঃ জানি না। তবে আমার অধিকার
আছে। পরিপূর্ন অধিকার।
নাদিয়াঃ তাই বুঝি...
নাদিয়া দু হাত মেলে ধরলো আসিফের
সামনে। এখানে তোমার নাম লিখা আছে।
কোথায় আছে খুঁজে বের করো তো।
আসিফ পারলো না।
নাদিয়া মুখ বাকা করে বললো, "এহ, আসছে
আবার আমার বউ আমার বউ করতে। যাও তো
সরো"
ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসলো
নাদিয়া। কানের দুল, হাতের চুড়ি একে একে
সব খুলতে লাগলো। শাড়ি পাল্টাতে হবে না,
টায়ার্ড লাগছে। আসিফ ছেলেটা নাকি পি
এইচ ডি করেছে। মেহেদীর নকশা থেকে
নিজের নাম বের করতে পারে না তার আবার
পি এইচ ডি, হুহ।
গলার হার খুলতে গিয়েই যতো বিপত্তি
ঘটলো। এটার ফিতার অংশটা বোধহয় পিছনে
ব্লাউজের সাথে আটকে গেছে কোথাও।
টানটানি করেও লাভ হলো না। এমন সময়
কাধের একটু নিচে আসিফের হাতের স্পর্শ
পেলো নাদিয়া। পুরো শরীরে এক অদ্ভূত
শিহরন বয়ে গেছে তার। আসিফ নাদিয়ার
কানের পাতায় মুখ ঠেকিয়ে বললো, "বলে
ছিলাম না,, সাহায্য লাগবে।"
নাদিয়াকে এবার পেছন থেকে জড়িয়ে
ধরলো আসিফ। নাদিয়ের কাধে মুখ রেখে
বললো, "সুন্দরী, গল্পের মতোই সুন্দরী। আমার
সুন্দরীর নজড় না লাগুক"। আসিফ নাদিয়ার
গলায় আলতো করে চুমু খেলো...
বোকা ছেলে। এই মুহুর্তে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া
তার সুন্দরীকে আর কেও দেখছে না। কে
জানে, তিনিও হয়তো পর্দা ফেলে দিয়েছেন।
আজ সেই পূর্নচন্দ্রে গ্রহন হবে, চন্দ্রগ্রহণ।
"চন্দ্রগহন"
(কাল্পনিক গল্প, সব চরিত্র কাল্পনিক)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now