বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
প্রকৃতি তাঁর নিজের ভক্তদের যা
দেন, তা অতি অমূল্য দান। অনেক
দিন ধরিয়া প্রকৃতির সেবা না
করিলে কিন্তু সে দান মেলে না।
আর কি ঈর্ষার স্বভাব
প্রকৃতিরানীর- প্রকৃতিকে যখন
চাহিব, তখন প্রকৃতিকে লইয়াই
থাকিতে হইবে, অন্য কোনো দিকে
মন দিয়াছি যদি, অভিমানিনী
কিছুতেই তাঁর অবগুণ্ঠন খুলিবেন না।
কিন্তু অনন্যমনা হইয়া প্রকৃতিকে
লইয়া ডুবিয়া থাকো, তাঁর সর্ববিধ
আনন্দের বর, সৌন্দর্যের বর, অপূর্ব
শান্তির বর তোমার উপর
অজস্রধারে এত বর্ষিত হইবে, তুমি
দেখিয়া পাগল হইয়া উঠিবে,
দিনরাত মোহিনী প্রকৃতিরানী
তোমাকে শতরূপে মুগ্ধ করিবেন, নূতন
দৃষ্টি জাগ্রত করিয়া তুলিবেন, মনের
আয়ু বাড়াইয়া দিবেন, অমরলোকের
আভাসে অমরত্বের প্রান্তে উপনীত
করাইবেন।
কয়েক বারের কথা বলি। সে অমূল্য
অনুভূতিরাজির কথা বলিতে গেলে
লিখিয়া পাতার পর পাতা ফুরাইয়া
যায়, কিন্তু তবু বলা শেষ হয় না, যা
বলিতে চাহিতেছি তাহার
অনেকখানিই বাকি থাকিয়া যায়।
এসব শুনিবার লোকও সংখ্যায়
অত্যন্ত কম, ক’জন মনে-প্রাণে
প্রকৃতিকে ভালবাসে?
অরণ্য-প্রান্তরে লবটুলিয়ার মাঠে
মাঠে দুধলি ঘাসের ফুল ফুটাইয়া
জানাইয়া দেয় যে বসন্ত পড়িয়াছে।
সে ফুলও বড় সুন্দর, দেখিতে
নক্ষত্রের মতো আকৃতি, রং হলদে,
লম্বা লম্বা সরু লতার মতো ঘাসের
ডাঁটাটা অনেকখানি জমি জুড়িয়া
মাটি আঁকড়াইয়া থাকে,
নক্ষত্রাকৃতি হলদে ফুল ধরে তার
গাঁটে গাঁটে। ভোরে মাঠ, পথের ধার
সর্বত্র আলো করিয়া ফুটিয়া
থাকিত- কিন্তু সূর্যের তেজ
বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে সব ফুল
কুঁক্ড়াইয়া পুনরায় কুঁড়ির আকার ধারণ
করিত- পরদিন সকালে আবার সেই
কুঁড়িগুলিই দেখিতাম ফুটিয়া আছে।
রক্তপলাশের বাহার আছে
মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্ট ও
আমাদের সীমানার বাহিরের
জঙ্গলে কিংবা মহালিখারূপের
শৈলসানুপ্রদেশে। আমাদের মহাল
হইতে সে-সব স্থান অনেক দূরে,
ঘোড়ায় তিন-চার ঘণ্টা লাগে। সে-
সব জায়গায় চৈত্রে শালমঞ্জরীর
সুবাসে বাতাস মাতাইয়া রাখে,
শিমুলবনে দিগন্তরেখা রাঙাইয়া
দেয়, কিন্তু কোকিল, দোয়েল, বৌ-
কথা কও প্রভৃতি গায়কপাখিরা
ডাকে না, এ-সব জনহীন অরণ্য-
প্রান্তরের যে ছন্নছাড়া রূপ, বোধ হয়
তাহারা তাহা পছন্দ করে না।
এক-এক দিন বাংলা দেশে
ফিরিবার জন্য মন হাঁপাইয়া উঠিত,
বাংলা দেশের পল্লীর সে সুমধুর
বসন্ত কল্পনায় দেখিতাম, মনে
পড়িত বাঁধানো পুকুরঘাটে
স্নানান্তে আর্দ্রবস্ত্রে গমনরতা
কোনো তরুণী বধূর ছবি, মাঠের ধারে
ফুলফোটা ঘেঁটুবন, বাতাবী
লেবুফুলের সুগন্ধে মোহময় ঘনছায়া-
ভরা অপরাহ¦। দেশকে কী ভালো
করিয়াই চিনিলাম বিদেশে গিয়া!
দেশের জন্য এই মনোবেদনা দেশে
থাকিতে কখনো অনুভব করি নাই,
জীবনে এ একটা বড় অনুভূতি, যে
ইহার আস্বাদ না পাইল, সে হতভাগ্য
একটা শ্রেষ্ঠ অনুভূতির সহিত
অপরিচিত রহিয়া গেল।
কিন্তু যে-কথাটা বারবার
নানাভাবে বলিবার চেষ্টা
করিতেছি, কিন্তু কোনো বারই
ঠিকমতো বুঝাইতে পারিতেছি না,
সেটা হইতেছে এই প্রকৃতির একটা
রহস্যময় অসীমতার, দুরধিগম্যতার,
বিরাটত্বের ও ভয়াল গা-ছম্-ছম্-
করানো সৌন্দর্যের দিকটা। না
দেখিলে কি করিয়া বুঝাইব সে কী
জিনিস।
জনশূন্য বিশাল লবটুলিয়া বইহারের
দিগন্তব্যাপী দীর্ঘ বনঝাউ ও
কাশের বনে নিস্তব্ধ অপরাহ্নে
একা ঘোড়ার উপর বসিয়া এখানকার
প্রকৃতির এই রূপ আমার সারা মনকে
অসীম রহস্যানুভূতিতে আচ্ছন্ন
করিয়া দিয়াছে, কখনো তাহা
আসিয়াছে ভয়ের রূপে, কখনো
আসিয়াছে একটা নিস্পৃহ, উদাস,
গম্ভীর মনোভাবের রূপে, কখনো
আসিয়াছে কত মধুময় স্বপ্ন, দেশ-
বিদেশের নরনারীর বেদনার রূপে।
সে যেন খুব উচ্চদরের নীরব সঙ্গীত-
নক্ষত্রের ক্ষীণ আলোর তালে,
জ্যোৎস্নারাত্রের অবাস্তবতায়,
ঝিল্লীর তানে, ধাবমান উল্কার
অগ্নিপুচ্ছের জ্যোতিতে তার লয়-
সঙ্গতি।
সে-রূপ তাহার না-দেখাই ভালো
যাহাকে ঘরদুয়ার বাঁধিয়া সংসার
করিতে হইবে। প্রকৃতির সে
মোহিনীরূপের মায়া মানুষকে
ঘরছাড়া করে, উদাসীন ছন্নছাড়া
ভবঘুরে হ্যারি জন্সটন, মার্কো
পোলো, হাড্সন, শ্যাকলটন করিয়া
তোলে-গৃহস্থ সাজিয়া ঘরকন্না
করিতে দেয় না- অসম্ভব তাহার
পক্ষে ঘরকন্না করা একবার সে ডাক
যে শুনিয়াছে, সে অনবগুণ্ঠিতা
মোহিনীকে একবার যে প্রত্যক্ষ
করিয়াছে।
গভীর রাত্রে ঘরের বাহিরে একা
আসিয়া দাঁড়াইয়া দেখিয়াছি,
অন্ধকার প্রান্তরের অথবা
ছায়াহীন ধূ-ধূ জ্যোৎস্নাভরা
রাত্রির রূপ। তার সৌন্দর্যে পাগল
হইতে হয়- একটুও বাড়াইয়া বলিতেছি
না- আমার মনে হয় দুর্বলচিত্ত মানুষ
যাহারা, তাহাদের পক্ষে সে-রূপ না
দেখাই ভালো, সর্বনাশী রূপ সে,
সকলের পক্ষে তার টাল সামলানো
বড় কঠিন।
তবে একথাও ঠিক, প্রকৃতিকে সে-
রূপে দেখাও ভাগ্যের ব্যাপার। এমন
বিজন বিশাল উন্মুক্ত অরণ্য-
প্রান্তরে, শৈলমালা, ঝনঝাউ, আর
কাশের বন কোথায় যেখানে-
সেখানে? তার সঙ্গে যোগ চাই
গভীর নিশীথিনীর নীরবতার ও তার
অন্ধকার বা জ্যোৎস্নার-এত
যোগাযোগ সুলভ হইলে পৃথিবীতে,
কবি আর পাগলে দেশ ছাইয়া যাইত
না?
একদিন প্রকৃতির সে-রূপ কিভাবে
প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম, সে-ঘটনা
বলি। পূর্ণিয়া হইতে উকিলের ‘তার’
পাইলাম পরদিন সকালে দশটার
মধ্যে আমায় সেখানে হাজির হইতে
হইবে। অন্যথায় স্টেটের একটা বড়
মকদ্দমায় আমাদের হার সুনিশ্চিত।
আমাদের মহাল হইতে পূর্ণিয়া
পঞ্চান্ন মাইল দূরে। রাত্রের ট্রেন
মাত্র একখানি, যখন ‘তার’ হস্তগত
হইল তখন সতের মাইল দূরবর্তী
কাটারিয়া স্টেশনে গিয়া সে-ট্রেন
ধরা অসম্ভব।
ঠিক হইল এখনই ঘোড়ায় রওনা হইতে
হইবে।
কিন্তু পথ সুদীর্ঘ বটে, বিপদসঙ্কুলও
বটে, বিশেষ করিয়া এই
রাত্রিকালে, এই অরণ্য-অঞ্চলে।
সুতরাং তহসিলদার সুজন সিং
আমার সঙ্গে যাইবে ইহাও ঠিক হইল।
সন্ধ্যায় দুজনে ঘোড়া ছাড়িলাম।
কাছারি ছাড়িয়া জঙ্গলে পড়িতেই
কিছু পরে কৃষ্ণা তৃতীয়ার চাঁদ উঠিল।
অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় বন-প্রান্তর
আরো অদ্ভুত দেখাইতেছে।
পাশাপাশি দু’জনে চলিয়াছি- আমি
আর সুজন সিং। পথ কখনো উঁচু, কখনো
নিচু, সাদা বালির উপর জ্যোৎস্না
পড়িয়া চক্চক্ করিতেছে। ঝোপঝাপ
মাঝে মাঝে, আর শুধু কাশ আর
ঝাউবন চলিয়াছে, সুজন সিং গল্প
করিতেছে। জ্যোৎস্না ক্রমেই
ফুটিতেছে- বনজঙ্গল, বালুচর ক্রমশ
স্পষ্টতর হইতেছে। বহুদূর পর্যন্ত নিচু
জঙ্গলের শীর্ষদেশ একটানা সরল
রেখায় চলিয়া গিয়াছে- যতদূর দৃষ্টি
যায় ধূ-ধূ প্রান্তর একদিকে, অন্যদিকে
জঙ্গল। বাঁ দিকে দূরে অনুচ্চ
শৈলমালা। নির্জন, নীরব, মানুষের
বসতি কুত্রাপি নাই, সাড়া নাই,
শব্দ নাই, যেন অন্য কোনো অজানা
গ্রহের মধ্যে নির্জন বনপথে দুটি
মাত্র প্রাণী আমরা।
এক জায়গায় সুজন সিং ঘোড়া
থামাইল। ব্যাপার কি? পাশের
জঙ্গল হইতে একটি ধাড়ী বন্যশূকর
একদল ছানাপোনা লইয়া আমাদের
পথ পার হইয়া বাঁ দিকের জঙ্গলে
ঢুকিতেছে। সুজন সিং বলিল- তবুও
ভালো হুজুর, ভেবেছিলাম বুনো
মহিষ। মোহনপুরা জঙ্গলের কাছে
আসিয়া পড়িয়াছি, বুনো মহিষের ভয়
এখানে খুব। সেদিনও একজন লোক
মারিয়াছে মহিষে।
আরো কিছুদূর গিয়া জ্যোৎস্নায় দূর
হইতে কালোমতো সত্যই কি একটা
দেখা গেল।
সুজন বলিল- ঘোড়া ভয় পাবে হুজুর,
ঘোড়া রুখুন।
শেষে দেখা গেল সেটা নড়েও না
চড়েও না! একটু একটু করিয়া কাছে
গিয়া দেখা গেল, সেটা একটা
কাশের খুপরি। আবার ঘোড়া
ছুটাইয়া দিলাম। মাঠঘাট, বন, ধূ-ধূ
জ্যোৎস্নাভরা বিশ্ব-কি একটা
সঙ্গীহারা পাখি আকাশের গায়ে
কি বনের মধ্যে কোথায় ডাকিতেছে
টি-টি-টি-টি -ঘোড়ার ক্ষুরে বড়
বালি উঠিতেছে, ঘোড়া একমুহূর্ত
থামাইবার উপায় নাই- উড়াও, উড়াও-
অনেকক্ষণ একভাবে বসিয়া পিঠ
টন্টন্ করিতেছে, জিনের বসিবার
জায়গাটা গরম হইয়া উঠিয়াছে,
ঘোড়া ছাড়তোক ভাঙ্গিয়া দুলকি
চাল ধরিয়াছে, আমার ঘোড়াটা
আবার বড্ড ভয় পায়, এজন্য সতর্কতার
সঙ্গে সামনের পথে অনেক দূর
পর্যন্ত নজর রাখিয়া চলিয়াছি-
হঠাৎ থমকিয়া ঘোড়া দাঁড়াইয়া
গেলে ঘোড়া হইতে ছিটকাইয়া পড়া
অনিবার্য।
কাশের মাথায় ঝুঁটি বাঁধিয়া
জঙ্গলে পথ ঠিক করিয়া রাখিয়াছে,
রাস্তা বলিয়া কিছু নাই, সেই
কাশের ঝুঁটি দেখিয়া এই গভীর
জঙ্গলে পথ ঠিক করিয়া লইতে হয়।
একবার সুজন সিং বলিল-হুজুর, এ-
পথটা যেন নয়, পথ ভুলেছি আমরা।
আমি সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখিয়া
ধ্রুবতারা ঠিক করিলাম- পূর্ণিয়া
আমাদের মহাল হইতে খাড়া উত্তরে,
তবে ঠিক আছি, সুজনকে বুঝাইয়া
বলিলাম।
সুজন বলিল- না হুজুর, কুশীনদীর
খেয়া পেরুতে হবে যে, খেয়া পার
হয়ে তবে সোজা উত্তরে যেতে হবে।
এখন উত্তর-পূর্ব কোণ কেটে বেরুতে
হবে।
অবশেষে পথ মিলিল।
জ্যোৎস্না আরো ফুটিয়াছে-সে কি
জ্যোৎস্না! কি রূপ রাত্রির! নির্জন
বালুর চরে, দীর্ঘ বনঝাউয়ের
জঙ্গলের পাশের পথে জ্যোৎস্না
যাহারা কখনো দেখে নাই,
তাহারা বুঝিবে না এ জ্যোৎস্নার
কি চেহারা এমন উন্মুক্ত
আকাশতলে- ছায়াহীন উদাসগম্ভীর
জ্যোৎস্নাভরা রাত্রিতে, বন-
পাহাড়-প্রান্তরের পথের জ্যোৎস্না,
বালুচরের জ্যোৎস্না- ক’জন
দেখিয়াছে? উঃ, সে কি ছুট!
পাশাপাশি চলিতে চলিতে দুই
ঘোড়াই হাঁপাইতেছে, শীতেও ঘাম
দেখা দিয়াছে আমাদের গায়ে।
এক জায়গায় বনের মধ্যে একটা
শিমুলগাছের তলায় আমরা ঘোড়া
থামাইয়া একটু বিশ্রাম করি,
সামান্য মিনিট-দশেক। একটা ছোট
নদী বহিয়া গিয়া অদূরে কুশীনদীর
সঙ্গে মিশিয়াছে, শিমুলগাছটাতে
ফুল ফুটিয়াছে, বনটা সেখানে
চারিধার হইতে আসিয়া আমাদের
এমন ঘিরিয়াছে যে, পথের
চিহ্নমাত্র নাই, অথচ খাটো খাটো
গাছপালার বন- শিমুলগাছটাই
সেখানে খুব উঁচু-বনের মধ্যে মাথা
তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে। দুজনেরই
জল-পিপাসা পাইয়াছে দারুণ।
জ্যোৎস্না ম্লান হইয়া আসে।
অন্ধকার বনপথ, পশ্চিম দিগন্তের দূর
শৈলমালার পিছনে শেষরাত্রির
চন্দ্র ঢলিয়া পড়িয়াছে। ছায়া দীর্ঘ
হইয়া আসিল, পাখ-পাখালির শব্দ
নাই কোনো দিকে, শুধু ছায়া-ছায়া,
অন্ধকার মাঠ, অন্ধকার বন।
শেষরাত্রির বাতাস বেশ ঠাণ্ডা
হইয়া উঠিল। ঘড়িতে রাত প্রায়
চারটা। ভয় হয়, শেষরাত্রের
অন্ধকারে বুনো হাতির দল সামনে
না আসে! মধুবনীর জঙ্গলে একপাল
বুনো হাতিও আছে।
এবার আশপাশে ছোট ছোট পাহাড়,
তার মধ্য দিয়া পথ, পাহাড়ের
মাথায় নিষ্পত্র শুভ্রকাণ্ড
গোলগোলি ফুলের গাছ, কোথাও
রক্তপলাশের বন। শেষরাত্রের চাঁদ-
ডোবা অন্ধকারে বন-পাহাড় অদ্ভুত
দেখায়। পূর্ব দিকে ফর্সা হইয়া
আসিল-ভোরের হাওয়া বহিতেছে,
পাখির ডাক কানে গেল। ঘোড়ার
সর্বাঙ্গ দিয়া দর-দর-ধারে ঘাম
ছুটিতেছে, ছুট্ ছুট্, খুব ভালো ঘোড়া
তাই এই পথে সমানে এত ছুটিতে
পারে। সন্ধ্যায় কাছারি
ছাড়িয়াছি- আর ভোর হইয়া গেল।
সম্মুখে এখনো যেন পথের শেষ নাই,
সেই একঘেয়ে বন, পাহাড়। সামনের
পাহাড়ের পিছন থেকে টকটকে লাল
সিঁদুরের গোলার মতো সূর্য
উঠিতেছে। পথের ধারে এক গ্রামে
ঘোড়া থামাইয়া কিছু দুধ কিনিয়া
দুজনে খাইলাম। পরে আরো ঘণ্টা-দুই
চলিয়াই পূর্ণিয়া শহর।
পূর্ণিয়ার স্টেটের কাজ তো শেষ
করিলাম, সে যেন নিতান্ত
অন্যমনস্কতার সহিত, মন পড়িয়া
রহিল পথের দিকে। আমার সঙ্গীর
ইচ্ছা, কাজ শেষ করিয়াই বাহির
হইয়া পড়ে- আমি তাহাকে বাধা
দিলাম, জ্যোৎস্না-রাত্রে এতটা পথ
অশ্বারোহণে যাইবার বিচিত্র
সৌন্দর্যের পুনরাস্বাদনের লোভে।
গেলামও তাই। পরদিন চাঁদ একটু
দেরিতে উঠিলেও ভোর পর্যন্ত
জ্যোৎস্না পাওয়া গেল। আর কি সে
জ্যোৎস্না! কৃষ্ণপক্ষের
স্তিমিতালোক চন্দ্রের জ্যোৎস্না
বনে-পাহাড়ে যেন এক শান্ত,
স্নিগ্ধ, অথচ এক আশ্চর্যরূপে
অপরিচিত স্বপ্নজগতের রচনা
করিয়াছে- সেই খাটো খাটো কাশ-
জঙ্গল, সেই পাহাড়ের সানুদেশে
পীতবর্ণ গোলগোলি ফুল, সেই উঁচু-
নিচু পথ-সব মিলিয়া যেন কোন্
বহুদূরের নক্ষত্রলোক- মৃত্যুর পরে
অজানা কোন্ অদৃশ্যলোকে অশরীরী
হইয়া উড়িয়া চলিয়াছি- ভগবান
বুদ্ধের সেই নির্বাণলোকে, যেখানে
চন্দ্রের উদয় হয় না, অথচ অন্ধকারও
নাই।
অনেক দিন পরে যখনই এই মুক্ত জীবন
ত্যাগ করিয়া সংসারে প্রবেশ করি,
তখন কলিকাতা শহরে ক্ষুদ্র গলির
বাসাবাড়িতে বসিয়া স্ত্রীর
সেলাইয়ের কল চালনার শব্দ শুনিতে
শুনিতে অবসর-দিনের দুপুরে কতবার
এই রাত্রির কথা, এই অপূর্ব আনন্দের
কথা, এই জ্যোৎস্নামাখা রহস্যময়
বনশ্রীর কথা, শেষরাত্রের
চাঁদডোবা অন্ধকারে পাহাড়ের উপর
শুভ্রকাণ্ড গোলগোলি গাছের কথা,
শুকনো কাশ-জঙ্গলের সোঁদা সোঁদা
তাজা গন্ধের কথা ভাবিয়াছি-
কতবার কল্পনায় আবার ঘোড়ায়
চড়িয়া জ্যোৎস্নারাত্রে পূর্ণিয়া
গিয়াছি।
২
চৈত্রমাসের মাঝামাঝি একদিন
খবর পাইলাম সীতাপুর গ্রামে
রাখালবাবু নামে একজন বাঙালি
ডাক্তার ছিলেন, তিনি কাল
রাত্রে হঠাৎ মারা গিয়াছেন।
ইহার নাম পূর্বে কখনো শুনি নাই।
তিনি যে ওখানে ছিলেন, তাহা
জানিতাম না। শুনিলাম আজ বিশ-
বাইশ বৎসর তিনি সেখানে ছিলেন।
ও-অঞ্চলে তাঁহার পসার ছিল,
ঘরবাড়িও নাকি করিয়াছিলেন ঐ
গ্রামেই। তাঁহার স্ত্রী-পুত্র
সেখানেই থাকে।
এই অবাঙালির দেশে একজন
বাঙালি ভদ্রলোক মারা গিয়াছেন
হঠাৎ, তাঁহার স্ত্রী-পুত্রের কি দশা
হইতেছে, কে তাহাদের দেখাশুনা
করিতেছে, তাঁহার সৎকার বা
শ্রাদ্ধশান্তির কি ব্যবস্থা
হইতেছে, এসব জানিবার জন্য মন
অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল।
ভাবিলাম আমার প্রথম কর্তব্য
হইতেছে সেখানে গিয়া সেই
শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর
লওয়া।
খবর লইয়া জানিলাম গ্রামটি এখান
হইতে মাইল-কুড়ি দূরে, কড়ারী
খাসমহলের সীমানায়। বৈকালের
দিকে সেখানে গিয়া পৌঁছিলাম।
লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিয়া
রাখালবাবুর বাড়ি খুঁজিয়া বাহির
করিলাম। দুখানা বড় বড় খোলার ঘর,
খানতিনেক ছোট ছোট ঘর। বাহিরে
এদেশের ধরনে একখানা বসিবার ঘর,
তার তিন দিকে দেওয়াল নাই।
বাঙালির বাড়ি বলিয়া চিনিবার
কোনো উপায় নাই, বসিবার ঘরে
দড়ির চারপাই হইতে উঠানের
হনুমানধ্বজাটি পর্যন্ত সব এদেশী।
আমার ডাকে একটি বার-তের বছরের
ছেলে বাহির হইয়া আসিল; আমায়
দেখিয়া ঠেঁট্ হিন্দিতে জিজ্ঞাসা
করিল-কাকে খুঁজছেন?
তাহার চেহারা দেখিয়া মনে হয়
না যে, সে বাঙালির ছেলে।
মাথায় লম্বা টিকি, গলায় অবশ্য
বর্তমানে কাচা- সবই বুঝিলাম,
কিন্তু মুখের ভাব পর্যন্ত
হিন্দুস্থানি বালকের মতো কি
করিয়া হয়?
আমার পরিচয় দিয়া বলিলাম-
তোমাদের বাড়িতে এখন বড় লোক
কে আছেন তাঁকে ডাক।
ছেলেটি বলিল, সে-ই বড় ছেলে।
তার আর দুটি ছোট ছোট ভাই আছে।
বাড়িতে আর কোনো অভিভাবক
নাই।
বলিলাম- তোমার মায়ের সঙ্গে
আমি একবার কথা কইতে চাই।
জিজ্ঞেস করে এস।
খানিকটা পরে ছেলেটি আসিয়া
আমায় বাড়ির মধ্যে লইয়া গেল।
রাখালবাবুর স্ত্রীকে দেখিয়া মনে
হইল বয়স অল্প, ত্রিশের মধ্যে, সদ্য-
বিধবার বেশ, কাঁদিয়া কাঁদিয়া
চক্ষু ফুলিয়াছে। ঘরের আসবাবপত্র
নিতান্ত দরিদ্রের গৃহস্থালির
মতো। একদিকে একটা ছোট গোলা,
ঘরে দাওয়ায় খান-দুই চারপাই, ছেঁড়া
লেপকাঁথা, এদেশী পিতলের ঘয়লা,
একটা গুড়গুড়ি, পুরোনো টিনের
তোরঙ্গ। বলিলাম- আমি বাঙালি,
আপনার প্রতিবেশী। আমার কানে
গেল রাখালবাবুর কথা, তাই এলাম।
আমার এখানে একটা কর্তব্য আছ বলে
মনে করি। আমার কোনো সাহায্য
যদি দরকার হয়, নিঃসঙ্কোচে বলুন।
রাখালবাবুর স্ত্রী কপাটের
আড়ালে দাঁড়াইয়া নিঃশব্দে
কাঁদিতে লাগিলেন। আমি বুঝাইয়া
শান্ত করিয়া পুনরায় আমার
আসিবার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করিলাম।
রাখালবাবুর স্ত্রী এবার আমার
সামনে বাহির হইলেন। কাঁদিতে
কাঁদিতে বলিলেন- আপনি আমার
দাদার মতো, আমাদের এই ঘোর
বিপদের সময় ভগবান আপনাকে
পাঠিয়েছেন।
ক্রমে কথায় কথায় জানা গেল, এই
বাঙালি পরিবার সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও
অসহায় এই ঘোর বিদেশে।
রাখালবাবু গত এক বৎসরের উপর
শয্যাগত ছিলেন। তাঁর চিকিৎসা ও
সংসার-খরচে সঞ্চিত অর্থ সব
নিঃশেষ হইয়া গিয়াছে- এখন এমন
উপায় নাই যে তাঁর শ্রাদ্ধের
যোগাড় হয়।
জিজ্ঞাসা করিলাম- আচ্ছা
রাখালবাবু তো অনেকদিন ধরে এ
অঞ্চলে আছেন, কিছু করতে পারেন
নি?
রাখালবাবুর স্ত্রীর সঙ্কোচ ও
লজ্জা অনেকটা দূর হইয়াছিল। তিনি
যেন এই প্রবাসে, এই দুর্দিনে একজন
বাঙালির মুখ দেখিয়া অকূলে কূল
পাইয়াছেন, মুখের ভাবে মনে হইল।
বলিলেন- আগে কি রোজগার করতেন
জানি নে। আমার বিয়ে হয়েছে এই
পনের বছর- আমার সতীন মারা
যেতে আমায় বিয়ে করেন। আমি
এসে পর্যন্ত দেখছি কোনো রকমে
সংসার চলে। এখানে ভিজিটের
টাকা বড় একটা কেউ দেয় না, গম
দেয়, মকাই দেয়। গত বছর মাঘ মাসে
উনি অসুখে পড়লেন, সেই থেকে আর
একটি পয়সা ছিল না। তবে এদেশের
লোক খারাপ নয়, যার কাছে যা
পাওনা ছিল, বাড়ি বয়ে সে-সব গম
মকাই কলাই দিয়ে গিয়েছে। তাই
চলেছে, নয়তো না খেয়ে মরত সবাই।
- আপনার বাপের বাড়ি কোথায়?
সেখানে খবর দেওয়া হয়েছে?
রাখালবাবুর স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ
করিয়া থাকিয়া বলিলেন- খবর
দেবার কিছু নেই। আমার বাপের
বাড়ি কখনো দেখি নি। শুনেছিলুম,
ছিল মুর্শিদাবাদ জেলায়।
ছেলেবেলা থেকে আমি
সাহেবগঞ্জে ভগ্নীপতির বাড়িতে
মানুষ। মা-বাবা কেউ ছিলেন না।
আমার সে-দিদি আমার বিয়ের পর
মারা যায়। ভগ্নীপতি আবার বিয়ে
করেছেন। তাঁর সঙ্গে আর আমার
সম্পর্ক কি?
- রাখালবাবুর কোনো আত্মীয়স্বজন
কোথাও নেই?
- দেশে জ্ঞাতিভাইয়েরা আছে
শুনতাম বটে, কিন্তু তারা কখনো
সংবাদ নেয় নি, উনিও দেশে
যাতায়াত করতেন না। তাদের সঙ্গে
সদ্ভাবও নেই, তাদের খবর দেওয়া-
না-দেওয়া সমান। এক মামাশ্বশুর
আছেন আমার শুনতাম, কাশীতে।
তা-ও তাঁর ঠিকানা জানি নে।
ভয়ানক অসহায় অবস্থা। আপনার জন
কেহ নাই, এই বন্ধুহীন বিদেশে দুই
তিনটি নাবালক ছেলে লইয়া
সহায়সম্পদশূন্য বিধবা মহিলাটির
দশা ভাবিয়া মন রীতিমতো দমিয়া
গেল। তখনকার মতো যাহা করা
উচিত করিয়া আমি কাছারিতে
ফিরিয়া আসিলাম, সদরে লিখিয়া
স্টেট্ হইতে আপাতত এক শত টাকা
সাহায্যের ব্যবস্থা করিয়া
রাখালবাবুর শ্রাদ্ধও কোনো রকমে
শেষ করিয়া দিলাম।
ইহার পর আরো বারকয়েক
রাখালবাবুর বাড়ি গিয়াছি। স্টেট্
হইতে মাসে দশটি টাকা সাহায্য
মঞ্জুর করাইয়া লইয়া প্রথম বারের
টাকাটা নিজেই দিতে
গিয়াছিলাম। দিদি খুব যত্ন
করিতেন, অনেক স্নেহ-আত্মীয়তার
কথা বলিতেন। সেই বিদেশে তাঁর
স্নেহ-যত্ন আমার বড় ভালো
লাগিত। তারই লোভে অবসর
পাইলেই সেখানে যাইতাম।
৩
লবটুলিয়ার উত্তর প্রান্ত খুব বড়
একটা হ্রদের মতো। এ রকম
জলাশয়কে এদেশে বলে কুণ্ডী। এই
হ্রদটার নাম সরস্বতী কুণ্ডী।
সরস্বতী কুণ্ডীর পাড়ের তিনদিকে
নিবিড় বন। এ ধরনের বন আমাদের
মহালে বা লবটুলিয়াতে নাই। এ বনে
বড় বড় বনস্পতির নিবিড় সমাবেশ-
জলের সান্নিধ্যবশতই হোক বা যে-
জন্যই হোক, বনের তলদেশে নানা
বিচিত্র লতাপাতা, বন্যপুষ্পের
ভিড়। এই বন বিশাল সরস্বতী কুণ্ডীর
নীল জলকে তিনদিকে
অর্ধচন্দ্রাকারে ঘিরিয়া
রাখিয়াছে, একদিকে ফাঁকা-সেখান
হইতে পূর্বদিকের বহুদূর-প্রসারিত
নীল আকাশ ও দূরের শৈলমালা
চোখে পড়ে। সুতরাং পূর্ব-পশ্চিম
কোণের তীরের কোনো-এক জায়গায়
বসিয়া দক্ষিণ বা বাম দিকে
চাহিয়া দেখিলে সরস্বতী কুণ্ডীর
সৌন্দর্যের অপূর্বতা ঠিক বোঝা
যায়।বামে চাহিলে গভীর হইতে
গভীরতর বনের মধ্যে দৃষ্টি চলিয়া
গিয়া ঘন নিবিড় শ্যামলতার মধ্যে
নিজেকে নিজে হারাইয়া ফেলে,
দক্ষিণে চাহিলে স্বচ্ছ নীল জলের
ওপারে সুদূরবিসর্পী আকাশ ও
অস্পষ্ট শৈলমালার ছবি মনকে
বেলুনের মতো ফুলাইয়া পৃথিবীর
মাটিতে উড়াইয়া লইয়া চলে।
এখানে একখানা শিলাখণ্ডের উপর
কতদিন গিয়া একা বসিয়া
থাকিতাম। কখনো বনের মধ্যে
দুপুরবেলা আপন মনে বেড়াইতাম।
কত বড় বড় গাছের ছায়ায় বসিয়া
পাখির কূজন শুনিতাম। মাঝে মাঝে
গাছপালা, বন্যলতার ফুল সংগ্রহ
করিতাম। এখানে যত রকমের পাখির
ডাক শোনা যায়, আমাদের মহালে
অত পাখি নাই। নানা রকমের বন্য
ফল খাইতে পায় বলিয়া এবং সম্ভবত
উচ্চ বনস্পতিশিরে বাসা বাঁধিবার
সুযোগ ঘটে বলিয়া সরস্বতী কুণ্ডীর
তীরের বনে পাখির সংখ্যা অত্যন্ত
বেশি। বনে ফুলও অনেক রকমের
ফোটে।
হ্রদের তীরের নিবিড় বন প্রায় তিন
মাইলের উপর লম্বা, গভীরতায় প্রায়
দেড় মাইল। জলের ধার দিয়া বনের
মধ্যে গাছপালার ছায়ায় ছায়ায়
একটা সুঁড়িপথ বনের শুরু হইতে শেষ
পর্যন্ত আসিয়াছে- এই পথ ধরিয়া
বেড়াইতাম। গাছপালার ফাঁকে
ফাঁকে মাঝে মাঝে সরস্বতীর নীল
জল, তার উপর উপুড়-হইয়া-পড়া দূরের
আকাশটা এবং দিগন্তলীন
শৈলশ্রেণী চোখে পড়িত। ঝির্ঝির্
করিয়া স্নিগ্ধ হাওয়া বহিত, পাখি
গান গাহিত, বন্য ফুলের সুগন্ধ পাওয়া
যাইত।
একদিন একটা গাছের ডালে উঠিয়া
বসিলাম। সে-আনন্দের তুলনা হয় না।
আমার মাথার উপরে বিশাল
বনস্পতিদলের ঘন সবুজ পাতার
রাশি, তার ফাঁকে ফাঁকে নীল
আকাশের টুক্রা, প্রকাণ্ড একটা
লতায় থোকা থোকা ফুল দুলিতেছে।
পায়ের দিকে অনেক নিচে ভিজা
মাটিতে বড় বড় ব্যাঙের ছাতা
গজাইয়াছে। এখানে আসিয়া বসিয়া
শুধু ভাবিতে ইচ্ছা হয়। কত ধরনের কত
নব অনুভূতি মনে আসিয়া জোটে।
একপ্রকার অতল-সমাহিত অতিমানস
চেতনা ধীরে ধীরে গভীর অন্তস্তল
হইতে বাহিরের মনে ফুটিয়া উঠিতে
থাকে। এ আসে গভীর আনন্দের
মূর্তি ধরিয়া। প্রত্যেক বৃক্ষলতার
হৃৎস্পন্দন যেন নিজের বুকের রক্তের
স্পন্দনের মধ্যে অনুভব করা যায়।
আমাদের যেখানে মহাল, সেখানে
পাখির এত বৈচিত্র্য নাই।
সেখানটা যেন অন্য জগৎ, তার
গাছপালা, জীবজন্তু অন্য ধরনের।
পরিচিত জগতে বসন্ত যখন দেখা
দিয়াছে, লবটুলিয়ায় তখন একটা
কোকিলের ডাক নাই, একটা পরিচিত
বসন্তের ফুল নাই। সে যেন রুক্ষ
কর্কশ ভৈরবী মূর্তি; সৌম্য, সুন্দর
বটে, কিন্তু মাধুর্যহীন- মনকে
অভিভূত করে ইহার বিশালতায়,
রুক্ষতায়। কোমল বর্জিত খাড়ব সুর,
মালকোষ কিংবা চৌতালের ধ্রুপদ,
মিষ্টত্বের কোনো পর্দার ধার
মাড়াইয়া চলে না- সুরের গম্ভীর
উদাত্ত রূপে মনকে অন্য এক স্তরে
লইয়া পৌঁছাইয়া দেয়।
সরস্বতী কুণ্ডী সেখানে ঠুংরী,
সুমিষ্ট সুরের মধুর ও কোমল
বিলাসিতায় মনকে আর্দ্র ও স্বপ্নময়
করিয়া তোলে। স্তব্ধ দুপুরে ফাল্গুন-
চৈত্র মাসে এখানে তীর-তরুর
ছায়ায় বসিয়া পাখির কূজন শুনিতে
শুনিতে মন কত দূরে কোথায় চলিয়া
যাইত, বন্য নিমগাছের সুগন্ধি
নিমফুলের সুবাস ছড়াইত বাতাসে,
জলে জলজ লিলির দল ফুটিত। কতক্ষণ
বসিয়া থাকিয়া সন্ধ্যার পর সেখান
হইতে উঠিয়া আসিতাম।
নাঢ়া বইহার জরিপ হইতেছে
প্রজাদের মধ্যে বিলির জন্য,
আমিনদের কাজ দেখাইবার জন্য
প্রায়ই সেখানে যাইতে হয়।
ফিরিবার পথে মাইল দুই পূর্ব-দক্ষিণ
দিকে একটু ঘুরিয়া যাই, শুধু সরস্বতী
কুণ্ডীর এই বনভূমিতে ঢুকিয়া বনের
ছায়ায় খানিকটা বেড়াইবার
লোভে।
সেদিন ফিরিতেছিলাম বেলা
তিনটার সময়। খর রৌদ্রে বিস্তীর্ণ
রৌদ্রদগ্ধ প্রান্তর পার হইয়া
ঘর্মাক্ত কলেবরে বনের মধ্যে
ঢুকিয়া ঘন ছায়ায় ছায়ায় জলের ধার
পর্যন্ত গেলাম-প্রান্তরসীমা হইতে
জলের কিনারা প্রায় দেড় মাইলের
কম নয়, কোনো কোনো স্থানে আরো
বেশি। একটা গাছের ডালে ঘোড়া
বাঁধিয়া নিবিড় ঝোপের তলায়
একখানা অয়েলক্লথ পাতিয়া
একেবারে শুইয়া পড়িলাম। ঘন
ঝোপের ডালপালা চারিধার হইতে
এমনভাবে আমায় ঢাকিয়াছে যে,
বাহির হইতে আমায় কেউ দেখিতে
পাইবে না। হাত-দুই উপরে
গাছপালা, মোটা মোটা কাঠের
মতো শক্ত গুঁড়িওয়ালা কি একপ্রকার
বন্যলতা জড়াজড়ি করিয়া ছাদ রচনা
করিয়াছে-একটা কি গাছ হইতে
হাতখানেক লম্বা বড় বড় বনশিমের
মতো সবুজ সবুজ ফল আমার প্রায়
বুকের কাছে দুলিতেছে। আর একটা
কি গাছ, তার ডালপালা প্রায়
অর্ধেক ঝোপটা জুড়িয়া, তাহাতে
কুচো কুচো ফুল ধরিয়াছে, ফুলগুলি এত
ছোট যে কাছে না গেলে চোখে
পড়ে না-কিন্তু কি ঘন নিবিড় সুবাস
সে-ফুলের! ঝোপের নিভৃত তল
ভারাক্রান্ত সেই অজানা বনপুষ্পের
সুবাসে।
পূর্বেই বলিয়াছি সরস্বতী কুণ্ডীর বন
পাখির আড্ডা। এত পাখিও আছে
এখানকার বনে! কত ধরনের, কত রং-
বেরঙের পাখি-শ্যামা, শালিক,
হরট্টিট্, বনটিয়া, ফেজাণ্টক্রো,
চড়াই, ছাতারে, ঘুঘু, হরিয়াল। উঁচু
গাছের মাথায় বাজবৌরী, চিল,
কুল্লো-সরস্বতীর নীল জলে বক,
সিল্লী, রাঙাহাঁস, মানিকপাখি,
কাঁক প্রভৃতি জলচর পাখি- পাখির
কাকলিতে মুখর হইয়া উঠিয়াছে
ঝোপের উপরটা, কি বিরক্তই করে
তারা, তাদের উল্লাসভরা অবাক
কূজনে কান পাতা দায়। অনেক সময়
মানুষকে গ্রাহ্যই করে না, আমি
শুইয়া আছি দেখিতেছে, আমার
চারিপাশে হাত-দেড়-দুই দূরে তারা
ঝুলন্ত ডালপালায় লতায় বসিয়া
কিচ্কিচ্ করিতেছে- আমার প্রতি
ভ্রূক্ষেপও নাই।
পাখিদের এই অসঙ্কোচ সঞ্চরণ
আমার বড় ভালো লাগিত। উঠিয়া
বসিয়াও দেখিয়াছি তাহারা ভয়
পায় না, একটু হয়তো উড়িয়া গেল,
কিন্তু একেবারে দেশছাড়া হইয়া
পালায় না। খানিক পরে নাচিতে
নাচিতে বকিতে বকিতে আবার
অত্যন্ত কাছে আসিয়া পড়ে।
এখানেই এদিন প্রথম বন্য হরিণ
দেখিলাম। জানিতাম বন্য হরিণ
আমাদের মহালের জঙ্গলে আছে,
কিন্তু এর আগে কখনো চোখে পড়ে
নাই। শুইয়া আছি-হঠাৎ কিসের
পায়ের শব্দে উঠিয়া বসিয়া মাথার
শিয়রের দিকে চাহিয়া দেখি
ঝোপের নিভৃততর দুর্গমতর অঞ্চলে
নিবিড় লতাপাতার জড়াজড়ির মধ্যে
আসিয়া দাঁড়াইয়াছে একটা হরিণ।
ভালো করিয়া চাহিয়া দেখি, বড়
হরিণ নয়, হরিণশাবক। সে আমায়
দেখিতে পাইয়া অবোধবিস্ময়ে বড়
বড় চোখে আমার দিকে চাহিয়া
আছে- ভাবিতেছে, এ আবার কোন্
অদ্ভুত জীব!
খানিকক্ষণ কাটিয়া গেল, দুইজনেই
নির্বাক, নিস্পন্দ।
আধ মিনিট পরে হরিণশিশুটা যেন
ভালো করিয়া দেখিবার জন্য
আবার একটু আগাইয়া আসিল। তার
চোখে ঠিক যেন মনুষ্যশিশুর মতো
সাগ্রহ কৌতূহলের দৃষ্টি। আরো
কাছে আসিত কি না জানি না,
আমার ঘোড়াটা সে সময় হঠাৎ পা
নাড়িয়া গা ঝাড়া দিয়া ওঠাতে
হরিণশিশু চকিত ও সন্ত্রস্তভাবে
ঝোপের মধ্য দিয়া দৌড়াইয়া
তাহার মায়ের কাছে সংবাদটা
দিতে গেল।
তারপর কতক্ষণ ঝোপের তলায়
বসিয়া রহিলাম। গাছপালার ফাঁকে
ফাঁকে চোখে পড়ে সরস্বতী কুণ্ডীর
নীল জল অর্ধচন্দ্রাকারে দূর
শৈলমালার পাদদেশ পর্যন্ত
প্রসারিত, আকাশ নীল, মেঘের লেশ
নাই কোনো দিকে-কুণ্ডীর জলচর
পাখির দল ঝগড়া, কলরব, তুমুল দাঙ্গা
শুরু করিয়াছে-একটা গম্ভীর ও প্রবীণ
মানিকপাখি তীরবর্তী এক উচ্চ
বনস্পতির শীর্ষে বসিয়া থাকিয়া
থাকিয়া তাহার বিরক্তি জ্ঞাপন
করিতেছে। জলের ধারে ধারে বড়
বড় গাছের মাথায় বকের দল এমন
ঝাঁক বাঁধিয়া আছে দূর হইতে মনে হয়
যেন সাদা সাদা থোকা থোকা ফুল
ফুটিয়াছে।
রোদ ক্রমশ রাঙা হইয়া আসিল।
ওপারে শৈলচূড়ায় যেন তামার রং
ধরিয়াছে। বকের দল ডানা মেলিয়া
উড়িতে আরম্ভ করিল। গাছপালার
মডগালে রোদ উঠিয়া গেল।
পাখির কূজন বাড়িল, আর বাড়িল
অজানা বনকুসুমের সেই সুঘ্রাণটা।
অপরাহ্নের ছায়ায় গন্ধটা যেন
আরো ঘন, আরো সুমিষ্ট হইয়া
উঠিয়াছে। একটা বেজি খানিকদূর
হইতে মাথা উঁচু করিয়া আমার
দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া
দেখিতেছে।
কি নিভৃত শান্তি! কি অদ্ভুত
নির্জনতা। এতক্ষণ তো এখানে
আছি, সাড়ে তিন ঘণ্টার কম নয়- বন্য
পাখির কাকলি ছাড়া অন্য কোনো
শব্দ শুনি নাই, আর পাখিদের পায়ে
পায়ে ডালপাতার মচ্মচানি,
শুষ্কপত্র বা লতার টুকরা পতনের
শব্দ। মানুষের চিহ্ন নাই কোনো
দিকে।
নানা বিচিত্র ও বিভিন্ন গড়ন
বনস্পতিদের শীর্ষদেশের। এই
সন্ধ্যার সময় রাঙা রোদ পড়িয়া
তাদের শোভা হইয়াছে অদ্ভুত।
তাদের কত গাছের মগডাল জড়াইয়া
লতা উঠিয়াছে; এক ধরনের লতাকে
এদেশে বলে ভিঁয়োরা লতা-আমি
তাহার নাম দিয়াছি ভোম্রা লতা-
সে লতা যে গাছের মাথায় উঠিবে,
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াইয়া ধরিয়া থাকে।
এই সময় ভোম্রা লতায় ফুল ফোটে-
ছোট ছোট বনজুঁইয়ের মতো সাদা
সাদা ফুলে কত বড় গাছের মাথা
আলো করিয়া রাখিয়াছে। অতি
চমৎকার সুঘ্রাণ, অনেকটা যেন
প্রস্ফুটিত সর্ষে ফুলের মতো-তবে
অতটা উগ্র নয়।
সরস্বতী কুণ্ডীর বনে কত বন্য
শিউলিগাছ-শিউলিগাছের প্রাচুর্য
এক এক জায়গায় এত বেশি, যেন মনে
হয় শিউলির বন। বড় বড় শিলাখণ্ডের
উপর শরতের প্রথমে সকালবেলা
রাশি রাশি শিউলি ফুল ঝরিয়া
পড়িয়া ছিল- দীর্ঘ এক রকম কর্কশ
ঘাস সেই সব পাথরের আশপাশে- বড়
বড় ময়নাকাঁটার গাছ তার সঙ্গে
জড়াইয়াছে- কাঁটা, ঘাস, শিলাখণ্ড
সব তাতেই রাশি রাশি শিউলি ফুল-
আর্দ্র, ছায়াগহন স্থান, তাই
সকালের ফুল এখনো শুকাইয়া যায়
নাই।
সরস্বতী হ্রদকে কত রূপেই দেখিলাম!
লোকে বলে সরস্বতী কুণ্ডীর জঙ্গলে
বাঘ আছে, জ্যোৎস্নারাত্রে
সরস্বতীর বিস্তৃত জলরাশির
কৌমুদীস্নাত শোভা দেখিবার
লোভে রাসপূর্ণিমার দিন
তহসিলদার বনোয়ারীলালের চোখে
ধুলা দিয়া আজমাবাদের সদর
কাছারি আসিবার ছুতায় লবটুলিয়া
ডিহি কাছারি হইতে লুকাইয়া একা
ঘোড়ায় এখানে আসিয়াছি।
বাঘ দেখি নাই বটে, কিন্তু সেদিন
আমার সত্যই মনে হইয়াছিল এখানে
মায়াবিনী বনদেবীরা গভীর
রাত্রে জ্যোৎস্নারাতে হ্রদের জলে
জলকেলি করিতে নামে। চারিধার
নীরব নিস্তব্ধ- পূর্ব তীরের ঘন বনে
কেবল শৃগালের ডাক শোনা
যাইতেছিল- দূরের শৈলমালা ও
বনশীর্ষ অস্পষ্ট দেখাইতেছে-
জ্যোৎস্নার হিম বাতাসে
গাছপালা ও ভোম্রা লতার নৈশ-
পুষ্পের মৃদু সুবাস… আমার সামনে বন
ও পাহাড়ে বেষ্টিত নিস্তরঙ্গ
বিস্তীর্ণ হ্রদের বুকে হৈমন্তী
পূর্ণিমার থৈ থৈ জ্যোৎস্না …
পরিপূর্ণ, ছায়াহীন, জলের উপর পড়া,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীচিমালায় প্রতিফলিত
হওয়া অপার্থিব দেবলোকের
জ্যোৎস্না… ভোম্রা লতার সাদা
ফুলে ছাওয়া বড় বড় বনস্পতিশীর্ষে
জ্যোৎস্না পড়িয়া মনে হইতেছে
গাছে গাছে পরীদের শুভ্র বস্ত্র
উড়িতেছে…
আর এক ধরনের পোকা একঘেয়ে
ডাকিতেছিল- ঝিঁঝিঁ পোকার
মতোই। দু-একটা পত্র পতনের শব্দ বা
খসখস করিয়া শুষ্ক পত্ররাশির উপর
দিয়া বন্য জন্তুর পলায়নের শব্দ…
বনদেবীরা আমরা থাকিতে তো আর
আসে না! কত গভীর রাত্রে আসে কে
জানে। আমি বেশি রাত পর্যন্ত
হিম সহ্য করিতে পারি নাই।
ঘণ্টাখানেক থাকিয়াই ফিরি।
সরস্বতী কুণ্ডীর এই পরীদের প্রবাদ
এখানেই শুনিয়াছিলাম।
শ্রাবণ মাসে একদিন আমাকে উত্তর
সীমানার জরিপের ক্যাম্পে রাত্রি
যাপন করিতে হয়। আমার সঙ্গে ছিল
আমিন রঘুবর প্রসাদ। সে আগে
গবর্নমেন্টের চাকুরি করিয়াছে।
মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্ট ও এ-
অঞ্চলের বনের সঙ্গে তার পঁচিশ-
ত্রিশ বছরের পরিচয়।
তাহার কাছে সরস্বতী কুণ্ডীর কথা
তুলিতেই সে বলিল-হুজুর, ও মায়ার
কুণ্ডী, ওখানে রাত্রে হুরী-পরীরা
নামে; জ্যোৎস্নারাত্রে তারা
কাপড় খুলে রাখে ডাঙায় ঐ সব
পাথরের উপর, রেখে জলে নামে।
সে-সময় যে তাদের দেখতে পায়,
তাকে ভুলিয়ে জলে নামিয়ে ডুবিয়ে
মারে। জ্যোৎস্নার মধ্যে দেখা যায়
মাঝে মাঝে পরীদের মুখ জলের
উপরে পদ্মফুলের মতো জেগে আছে।
আমি দেখি নি কখনো, হেড
সার্ভেয়ার ফতে সিং একদিন
দেখেছিলেন। একদিন তারপর তিনি
গভীর রাত্রে একা ওই হ্রদের ধারে
বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন
সার্ভে-তাঁবুতে -পরদিন সকালে তাঁর
লাশ কুণ্ডীর জলে ভাসতে দেখা
যায়। বড় মাছে তাঁর একটা কান
খেয়ে ফেলেছিল। হুজুর, ওখানে
আপনি ও-রকম যাবেন না।
৪
এই সরস্বতী কুণ্ডীর ধারে একদিন
দুপুরে এক অদ্ভুত লোকের সন্ধান
পাইলাম।
সার্ভে-ক্যাম্প হইতে ফিরিবার
পথে একদিন হ্রদের তীরের বনপথ
দিয়া আস্তে আস্তে আসিতেছি,
বনের মধ্যে দেখি একটি লোক মাটি
খুঁড়িয়া কি যেন করিতেছে। প্রথমে
ভাবিলাম লোকটা ভুঁই-কুমড়া
তুলিতে আসিয়াছে। ভুঁই-কুমড়া
লতাজাতীয় উদ্ভিদ, মাটির মধ্যে
লতার নিচে চালকুমড়ার আকারের
প্রকাণ্ড কন্দ জন্মায়- উপর হইতে
বোঝা যায় না। কবিরাজী ঔষধে
লাগে বলিয়া বেশ দামে বিক্রয় হয়।
কৌতূহলবশত ঘোড়া হইতে নামিয়া
কাছে গেলাম, দেখি ভুঁই-কুমড়া নয়,
কিছু নয়, লোকটা কিসের যেন বীজ
পুঁতিয়া দিতেছে।
আমায় দেখিয়া সে থতমত খাইয়া
অপ্রতিভ দৃষ্টিতে আমার দিকে
চাহিল। বয়স হইয়াছে, মাথায় কাঁচা-
পাকা চুল। সঙ্গে একটা চটের থলে,
তার ভিতর হইতে ছোট একখানা
কোদালের আগাটুকু দেখা
যাইতেছে, একটা শাবল পাশে
পড়িয়া, ইতস্তত কতকগুলি কাগজের
মোড়ক ছড়ানো।
বলিলাম- তুমি কে? এখানে কি করছ?
সে বলিল-হুজুর কি ম্যানেজারবাবু?
-হ্যাঁ। তুমি কে?
-নমস্কার। আমার নাম যুগলপ্রসাদ।
আমি আপনাদের লবটুলিয়ার
পাটোয়ারী বনোয়ারীলালের
চাচাতো ভাই।
তখন আমার মনে পড়িল, বনোয়ারী
পাটোয়ারী একবার কথায় কথায়
তাহার চাচাতো ভাইয়ের কথা
তুলিয়াছিল। উঠাইবার কারণ,
আজমাবাদের সদর কাছারিতে-
অর্থাৎ আমি যেখানে থাকি-
সেখানে একজন মুহুরীর পদ খালি
ছিল। বলিয়াছিলাম একটা ভালো
লোক দেখিয়া দিতে। বনোয়ারী
দুঃখ করিয়া বলিয়াছিল, লোক তো
তাহার সাক্ষাৎ চাচাতো ভাই-ই
ছিল, কিন্তু লোকটা অদ্ভুত
মেজাজের, এক রকম খামখেয়ালি
উদাসীন ধরনের। নইলে কায়েথী
হিন্দিতে অমন হস্তাক্ষর, অমন
পড়ালেখার এলেম্ এ-অঞ্চলের বেশি
লোকের নাই।
জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, কেন, সে
কি করে?
বনোয়ারী বলিয়াছিল-তার নানা
বাতিক হুজুর, এখানে ওখানে ঘুরে
বেড়ানো এক বাতিক। কিছু করে না,
বিয়ে-সাদি করেছে, সংসার দেখে
না, বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, অথচ
সাধু-সন্নিসিও নয়, ঐ এক ধরনের
মানুষ।
এই তাহা হইলে বনোয়ারীলালের
সেই চাচাতো ভাই?
কৌতূহল বাড়িল, বলিলাম- ও কি পুঁতছ
ওখানে?
লোকটা বোধ হয় গোপনে কাজটা
করিতেছিল, যেন ধরা পড়িয়া
লজ্জিত ও অপ্রতিভ হইয়া গিয়াছে
এমন সুরে বলিল- কিছু না, এই -একটা
গাছের বীজ-
আমি আশ্চর্য হইলাম। কি গাছের
বীজ? ওর নিজের জমি নয়, এই ঘোর
জঙ্গল, ইহার মাটিতে কি গাছের
বীজ ছড়াইতেছে- তাহার
সার্থকতাই বা কি? কথাটা
তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম।
বলিল- অনেক রকম বীজ আছে হুজুর,
পূর্ণিয়ায় দেখেছিলাম একটা
সাহেবের বাগানে ভারি চমৎকার
বিলিতি লতা- বেশ রাঙা রাঙা
ফুল! তারই বীজ, আরো অনেক রকম
বনের ফুলের বীজ আছে, দূর দূর থেকে
সংগ্রহ করে এনেছি, এখানকার
জঙ্গলে ও-সব লতাফুল নেই। তাই পুঁতে
দিচ্ছি, গাছ হয়ে দু-বছরের মধ্যে
ঝাড় বেঁধে যাবে, বেশ দেখাবে।
লোকটার উদ্দেশ্য বুঝিয়া তাহার
উপর আমার শ্রদ্ধা হইল। লোকটা
সম্পূর্ণ বিনা-স্বার্থে একটা বিস্তৃত
বন্যভূমির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিবার
জন্য নিজের পয়সা ও সময় ব্যয়
করিতেছে, যে বনে তাহার নিজের
ভূস্বত্ব কিছুই নাই- কি অদ্ভুত
লোকটা!
যুগলপ্রসাদকে ডাকিয়া এক গাছের
তলায় দুজনে বসিলাম। সে বলিল-
আমি এর আগেও এ কাজ করেছি হুজুর,
লবটুলিয়াতে যত বনের ফুল দেখেন,
ফুলের লতা দেখেন, ওসব আমি আজ
দশ-বারো বছর আগে কতক পূর্ণিয়ার
বন থেকে, কতক দক্ষিণ ভাগলপুরের
লছমীপুর স্টেটের পাহাড়ি জঙ্গল
থেকে এনে লাগিয়েছিলাম। এখন
একেবারে ও-সব ফুলের জঙ্গল বেঁধে
গিয়েছে।
- তোমার কি এ কাজ খুব ভালো
লাগে?
- লবটুলিয়া বইহারের জঙ্গলটা ভারি
চমৎকার জায়গা- ওইসব ছোটখাটো
পাহাড়ের গায়ে কি এখানকার বনে-
ঝোপে নতুন নতুন ফুল ফোটাব, এ
আমার বহুদিনের শখ।
- কি ফুল নিয়ে আসতে?
- কি করে আমার এদিকে মন গেল,
তা একটু আগে হুজুরকে বলি। আমার
বাড়ি ধরমপুর অঞ্চলে। আমাদের
দেশে বুনো ভাণ্ডীর ফুল একেবারেই
ছিল না। আমি মহিষ চরিয়ে
বেড়াতাম ছেলেবেলায় কুশীনদীর
ধারে ধারে, আমার গাঁ থেকে দশ-
পনেরো ক্রোশ দূরে। সেখান থেকে
বীজ নিয়ে গিয়ে দেশে লাগাই, এখন
আমাদের অঞ্চলের পথের ধারে
বনঝোপ কি লোকের বাড়ির পেছনে
পোড়ো জমিতে ভাণ্ডীর ফুলের
একেবারে জঙ্গল। সেই থেকে আমার
এই দিকে মাথা গেল। যেখানে যে
ফুল নেই, সেখানে সেই ফুল, গাছ,
লতা নিয়ে পুঁতব, এই আমার শখ।
সারাজীবন ওই করে ঘুরেছি। এখন
আমি ও-কাজে ঘুণ হয়ে গেছি।
যুগলপ্রসাদ দেখিলাম এদেশের বহু
ফুল ও সুদৃশ্য বৃক্ষলতার খবর রাখে। এ
বিষয়ে সে যে একজন বিশেষজ্ঞ,
তাহাতে আমার সন্দেহ রহিল না।
বলিলাম- তুমি এরিস্টলোকিয়া লতা
চেন?
তাহাকে ফুলের গড়ন বলিতেই সে
বলিল, হংসলতা? হাঁসের-মতো-
চেহারা ফুল হয় তো? ও তো এ দেশের
গাছ নয়। পাটনায় দেখেছি বাবুদের
বাগানে।
তাহার জ্ঞান দেখিয়া আশ্চর্য
হইতে হয়। নিছক সৌন্দর্যের এমন
পূজারীই বা ক’টা দেখিয়াছি? বনে
বনে ভালো ফুল ও লতার বীজ
ছড়াইয়া তাহার কোনো স্বার্থ
নাই, এক পয়সা আয় নাই, নিজে সে
নিতান্তই গরিব, অথচ শুধু বনের
সৌন্দর্য-সম্পদ বাড়াইবার চেষ্টায়
তার এ অক্লান্ত পরিশ্রম ও উদ্বেগ।
আমায় বলিল-সরস্বতী কুণ্ডীর মতো
চমৎকার বন এ অঞ্চলে কোথাও নেই
বাবুজী। কত গাছপালা যে আছে,
আর কি দেখেছেন জলের শোভা!
আচ্ছা, আপনি কি বিবেচনা করেন
এতে পদ্ম হবে পুঁতে দিলে? ধরমপুরের
পাড়াগাঁ অঞ্চলে পদ্ম আছে অনেক
পুকুরে। ভাবছিলাম গেঁড় এনে পুঁতে
দেব।
আমি তাহাকে সাহায্য করিতে
মনে মনে সঙ্কল্প করিলাম। দুজনে
মিলিয়া এ বনকে নতুন বনের ফুলে,
লতায়, গাছে সাজাইব, সেদিন হইতে
ইহা আমাকে যেন একটা নেশার
মতো পাইয়া বসিল। যুগলপ্রসাদ
খাইতে পায় না, সংসারে বড় কষ্ট,
ইহা আমি জানিতাম। সদরে
লিখিয়া তাহাকে দশ টাকা বেতনে
একটা মুহুরীর চাকুরি দিলাম
আজমাবাদ কাছারিতে।
সেই বছরে আমি কলিকাতা হইতে
সাটনের বিদেশী বন্য পুষ্পের বীজ
আনিয়া ও ডুয়ার্সের পাহাড় হইতে
বন্য জুঁইয়ের লতার কাটিং আনিয়া
যথেষ্ট পরিমাণে রোপণ করিলাম
সরস্বতী হ্রদের বনভূমিতে। কি
আহ্লাদ ও উৎসাহ যুগলপ্রসাদের!
আমি তাহাকে শিখাইয়া দিলাম এ
উৎসাহ ও আনন্দ যেন সে কাছারির
লোকের কাছে প্রকাশ না করে।
তাহাকে তো লোকে পাগল
ভাবিবেই, সেইসঙ্গে আমাকেও বাদ
দিবে না। পর বৎসর বর্ষার জলে
আমাদের রোপিত গাছ ও লতার ঝাড়
অদ্ভুতভাবে বাড়িয়া উঠিতে
লাগিল। হ্রদের তীরের জমি অত্যন্ত
উর্বর, গাছপালাগুলিও যাহা
পুঁতিয়াছিলাম, এদেশের আবহাওয়ার
উপযোগী। কেবল সাটনের বীজের
প্যাকেট লইয়া গোলমাল
বাধিয়াছিল। প্রত্যেক প্যাকেটের
উপর তাহারা ফুলের নাম ও কোনো
কোনো স্থলে এক লাইনে ফুলের
সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও দিয়াছিল।
ভালো রং ও চেহারা বাছিয়া
বাছিয়া যে বীজগুলি লাগাইলাম,
তাহার মধ্যে ‘হোয়াইট বিম’ ও
‘রেডক্যাম্পিয়ন্’ এবং ‘স্ট্রিচওয়ার্ট’
অসাধারণ উন্নতি দেখাইল।
‘ফক্সগ্লাভ’ ও ‘উড-অ্যানিমোন্’ মন্দ
হইল না। কিন্তু অনেক চেষ্টা
করিয়াও ‘ডগ রোজ’ বা ‘হনিসাক্ল্’-এর
চারা বাঁচাইতে পারা গেল না।
হলদে ধুতুরা-জাতীয় এক প্রকার গাছ
হ্রদের ধারে ধারে পুঁতিয়াছিলাম।
খুব শীঘ্রই তাহার ফুল ফুটিল।
যুগলপ্রসাদ পূর্ণিয়ার জঙ্গল হইতে
বন্য বয়ড়া লতার বীজ আনিয়াছিল,
চারা বাহির হইবার সাত মাসের
মধ্যেই দেখি কাছাকাছি অনেক
ঝোপের মাথা বয়ড়া লতায় ছাইয়া
যাইতেছে। বয়ড়া লতার ফুল যেমন
সুদৃশ্য, তেমনি তাহার মৃদু সুবাস।
হেমন্তের প্রথমে একদিন দেখিলাম
বয়ড়া লতায় অজস্র কুঁড়ি ধরিয়াছে।
যুগলপ্রসাদকে খবরটা দিতেই সে
কলম ফেলিয়া আজমাবাদ কাছারি
হইতে সাত মাইল দূরবর্তী সরস্বতী
হ্রদের তীরে প্রায় দৌড়িতে
দৌড়িতেই আসিল।
আমায় বলিল- লোকে বলেছিল হুজুর,
বয়ড়া লতা জন্মাবে, বাড়বেও বটে,
কিন্তু ওর ফুল ধরবে না। সব লতায়
নাকি ফুল ধরে না। দেখুন কেমন কুঁড়ি
এসেছে।
হ্রদের জলে ‘ওয়াটার ক্রোফ্ট’
বলিয়া এক প্রকার জলজ ফুলের গেঁড়
পুঁতিয়াছিলাম। সে গাছ হু-হু করিয়া
এত বাড়িতে লাগিল যে,
যুগলপ্রসাদের ভয় হইল জলে পদ্মের
স্থান বুঝি ইহারা বেদখল করিয়া
ফেলে।
বোগেনভিলিয়া লতা লাগাইবার
ইচ্ছা ছিল, কিন্তু শহরের শৌখিন
পার্ক বা উদ্যানের সঙ্গে এতই ওর
সম্পর্কটা জড়ানো যে আমার ভয় হইল
স্বরস্বতী কুণ্ডীর বনে ফুলে-ভরা
বোগেনভিলিয়ার ঝোপ উহার বন্য
আকৃতি নষ্ট করিয়া ফেলিবে।
যুগলপ্রসাদেরও এসব বিষয়ে মত
আমার ধরনের। সেও বারণ করিল।
অর্থব্যয়ও কম করি নাই। একদিন
গনোরী তেওয়ারীর মুখে শুনিলাম,
কারো নদীর ওপারে জয়ন্তী
পাহাড়ের জঙ্গলে একপ্রকার অদ্ভুত
ধরনের বনপুষ্প হয়- ওদেশে তার নাম
দুধিয়া ফুল। হলুদ গাছের মতো পাতা,
অত বড়ই গাছ- খুব লম্বা একটা ডাঁটা
ঠেলিয়া উঁচুদিকে তিন-চার হাত
ওঠে। একটা গাছে চার-পাঁচটা ডাঁটা
হয়, প্রত্যেক ডাঁটায় চারটি করিয়া
হলদে রঙের ফুল ধরে-দেখিতে খুব
ভালো তো বটেই, ভারি সুন্দর তার
সুবাস! রাত্রে অনেক দূর পর্যন্ত সুগন্ধ
ছড়ায়। সে ফুলের একটা গাছ
যেখানে একবার জন্মায় দেখিতে
দেখিতে এত হু-হু করিয়া বংশ বৃদ্ধি
হয় যে, দু-তিন বছরে রীতিমতো
জঙ্গল বাঁধিয়া যায়।
শুনিয়া পর্যন্ত আমার মনের শান্তি
নষ্ট হইল। ঐ ফুল আনিতেই হইবে।
গনোরী বলিল, বর্ষাকাল ভিন্ন
হইবে না; গাছের গেঁড় আনিয়া
পুঁতিতে হয়-জল না পাইলে মরিয়া
যাইবে।
পয়সা-কড়ি দিয়া যুগলপ্রসাদকে
পাঠাইলাম। সে বহু অনুসন্ধানে
জয়ন্তী পাহাড়ের দুর্গম জঙ্গল হইতে
দশ-বারো গণ্ডা গেঁড় যোগাড়
করিয়া আনিল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now