বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
পনের দিন এখানে একেবারে বন্য-
জীবন যাপন করিলাম, যেমন থাকে
গাঙ্গোতারা কি গরিব ভুঁইহার
বামুনরা। ইচ্ছা করিয়া নয়, অনেকটা
বাধ্য হইয়া থাকিতে হইল এভাবে। এ
জঙ্গলে কোথা হইতে কি আনাইব?
খাই ভাত ও বনধুঁধুলের তরকারি, বনের
কাঁকরোল কি মিষ্টি আলু তুলিয়া
আনে সিপাহীরা, তাই ভাজা বা
সিদ্ধ। মাছ দুধ ঘি-কিছু নাই।
অবশ্য, বনে সিল্লী ও ময়ূরের অভাব
ছিল না, কিন্তু পাখি মারিতে
তেমন যেন মন সরে না বলিয়া বন্দুক
থাকা সত্ত্বেও নিরামিষই খাইতে
হইত।
ফুলকিয়া বইহারে বাঘের ভয় আছে।
একদিনের ঘটনা বলি।
হাড়ভাঙ্গা শীত সেদিন। রাত
দশটার পরে কাজকর্ম মিটাইয়া
সকাল সকাল শুইয়া ঘুমাইয়া
পড়িয়াছি, হঠাৎ কত রাত্রে জানি
না, লোকজনের চিৎকারে ঘুম
ভাঙিল। জঙ্গলের ধারের কোন্
জায়গায় অনেকগুলি লোক জড়ো
হইয়া চিৎকার করিতেছে। উঠিয়া
তাড়াতাড়ি আলো জ্বালিলাম।
আমার সিপাহীরা পাশের খুপরি
হইতে বাহির হইয়া আসিল। সবাই
মিলিয়া ভাবিতেছি ব্যাপারটা
কি, এমন সময়ে একজন লোক ছুটিতে
ছুটিতে আসিয়া বলিল-
ম্যানেজারবাবু, বন্দুকটা নিয়ে
শিগগির চলুন-বাঘে একটা ছোট
ছেলে নিয়ে গিয়েছে খুপরি থেকে।
জঙ্গলের ধার হইতে মাত্র দু-শ’ হাত
দূরে ফসলের ক্ষেতের মধ্যে ডোমন
বলিয়া একজন গাঙ্গোতা প্রজার
একখানা খুপরি। তাহার স্ত্রী ছ-
মাসের শিশু লইয়া খুপরির মধ্যে
শুইয়া ছিল। অসম্ভব শীতের দরুন
খুপরির মধ্যেই আগুন জ্বালানো ছিল,
এবং ধোঁয়া বাহির করিয়া দিবার
জন্য দরজার ঝাঁপটা একটু ফাঁক ছিল।
সেই পথে বাঘ ঢুকিয়া ছেলেটিকে
লইয়া পলাইয়াছে।
কি করিয়া জানা গেল বাঘ?
শিয়ালও তো হইতে পারে। কিন্তু
ঘটনাস্থলে পৌঁছিয়া আর কোনো
সন্দেহ রহিল না, ফসলের ক্ষেতের
নরম মাটিতে স্পষ্ট বাঘের থাবার
দাগ।
আমার পাটোয়ারী ও সিপাহীরা
মহালে অপবাদ রটিতে দিতে চায়
না, তাহারা জোর গলায় বলিতে
লাগিল-এ আমাদের বাঘ নয় হুজুর, এ
মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টের বাঘ।
দেখুন না কত বড় থাবা!
যাহাদেরই বাঘ হউক, তাহাতে কিছু
আসে যায় না। বলিলাম, সব লোক
জড়ো কর, মশাল তৈরি কর-চল
জঙ্গলের মধ্যে দেখি। সেই রাত্রে
অত বড় বাঘের পায়ের সদ্য থাবা
দেখিয়া ততক্ষণ সকলেই ভয়ে
কাঁপিতে শুরু করিয়াছে-জঙ্গলের
মধ্যে কেহ যাইতে রাজি নয়। ধমক ও
গালমন্দ দিয়া জন-দশেক লোক
জুটাইয়া মশাল হাতে টিন
পিটাইতে পিটাইতে সবাই মিলিয়া
জঙ্গলের নানা স্থানে বৃথা
অনুসন্ধান করা গেল।
পরদিন বেলা দশটার সময় মাইল-দুই
দূরে দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘন জঙ্গলের
মধ্যে একটা বড় আসান-গাছের তলায়
শিশুটির রক্তাক্ত দেহাবশেষ
আবিষ্কৃত হইল।
কৃষ্ণপক্ষের কি ভীষণ অন্ধকার
রাত্রিগুলিই নামিল তাহার পরে!
সদর কাছারি হইতে বাঁকে সিং
জমাদারকে আনাইলাম। বাঁকে সিং
শিকারি, বাঘের গতিবিধির
অভ্যাস তার ভালোই জানা। সে
বলিল, হুজুর, মানুষখেকো বাঘ বড় ধূর্ত
হয়। আর ক’টা লোক মরবে। সাবধান
হয়ে থাকতে হবে।
ঠিক তিনদিন পরেই বনের ধারে
সন্ধ্যার সময় একটা রাখালকে বাঘে
লইয়া গেল। ইহার পরে লোকে ঘুম
বন্ধ করিয়া দিল। রাত্রে এক অপরূপ
ব্যাপার! বিস্তীর্ণ বইহারের
বিভিন্ন খুপরি হইতে সারা রাত
টিনের ক্যানেস্ত্রা পিটাইতেছে,
মাঝে মাঝে কাশের ডাঁটার আঁটি
জ্বালাইয়া আগুন করিয়াছে, আমি
বাঁকে সিং প্রহরে প্রহরে বন্দুকের
দ্যাওড় করিতেছি। আর শুধুই কি বাঘ?
ইহার মধ্যে একদিন মোহনপুরা
ফরেস্ট হইতে বন্য-মহিষের দল
বাহির হইয়া অনেকখানি ক্ষেতের
ফসল তছনছ করিয়া দিল।
আমার কাশের খুপরির দরজার
কাছেই সিপাহীরা খুব আগুন করিয়া
রাখিয়াছে। মাঝে মাঝে উঠিয়া
তাহাতে কাঠ ফেলিয়া দিই।
পাশের খুপরিতে সিপাহীরা
কথাবার্তা বলিতেছে- খুপরির
মেঝেতেই শুইয়া আছি, মাথার
কাছের ঘুলঘুলি দিয়া দেখা
যাইতেছে ঘন অন্ধকারে ঘেরা
বিস্তীর্ণ প্রান্তর, দূরে ক্ষীণ
তারার আলোয় পরিদৃশ্যমান
জঙ্গলের আবছায়া সীমারেখা।
অন্ধকার আকাশের দিকে চাহিয়া
মনে হইল, যেন মৃত নক্ষত্রলোক হইতে
তুষারবর্ষী হিমবাতাস তরঙ্গ তুলিয়া
ছুটিয়া আসিতেছে পৃথিবীর দিকে-
লেপ তোশক হিমে ঠাণ্ডা জল হইয়া
গিয়াছে, আগুন নিবিয়া আসিতেছে,
কি দুরন্ত শীত! আর সেইসঙ্গে
উন্মুক্ত প্রান্তরের অবাধ হু-হু
তুষারশীতল নৈশ হাওয়া!
কিন্তু কি করিয়া থাকে এখানকার
লোকেরা এই শীতে, এই আকাশের
তলায় সামান্য কাশের খুপরির
ঠাণ্ডা মেঝের উপর, কি করিয়া
রাত্রি কাটায়? তাহার উপর ফসল
চৌকি দিবার এই কষ্ট, বন্য-মহিষের
উপদ্রব, বন্য-শূকরের উপদ্রব কম নয়-
বাঘও আছে। আমাদের বাংলা
দেশের চাষীরা কি এত কষ্ট করিতে
পারে? অত উর্বর জমিতে, অত
নিরুপদ্রব গ্রাম্য পরিবেশের মধ্যে
ফসল করিয়াও তাহাদের দুঃখ ঘোচে
না।
আমার ঘরের দু-তিন-শ’ হাত দূরে
দক্ষিণ ভাগলপুর হইতে আগত জনকতক
কাটুনী মজুর স্ত্রী-পুত্র লইয়া ফসল
কাটিতে আসিয়াছে। একদিন
সন্ধ্যায় তাহাদের খুপরির কাছ
দিয়া আসিবার সময় দেখি কুঁড়ের
সামনে বসিয়া সবাই আগুন
পোহাইতেছে।
এদের জগৎ আমার কাছে অনাবিষ্কৃত,
অজ্ঞাত। ভাবিলাম, সেটা দেখি
না কেমন!
গিয়া বলিলাম-বাবাজী, কি করা
হচ্ছে?
একজন বৃদ্ধ ছিল দলে, তাহাকেই এই
সম্বোধন। সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া
আমায় সেলাম করিল, বসিয়া আগুন
পোহাইতে অনুরোধ করিল। ইহা
এদেশের প্রথা। শীতকালে আগুন
পোহাইতে আহ্বান করা ভদ্রতার
পরিচয়।
গিয়া বসিলাম। খুপরির মধ্যে উঁকি
দিয়া দেখি বিছানা বা
আসবাবপত্র বলিতে ইহাদের কিছু
নাই। কুঁড়েঘরের মেঝেতে মাত্র
কিছু শুকনো ঘাস বিছানো।
বাসনকোসনের মধ্যে খুব বড় একটা
কাঁসার জামবাটি আর একটা লোটা!
কাপড় যার যা পরনে আছে- আর এক
টুকরা বস্ত্রও বাড়তি নাই। কিন্তু
তাহা তো হইল, এই নিদারুণ শীতে
ইহাদের লেপকাঁথা কই? রাত্রে
গায়ে দেয় কি?
কথাটা জিজ্ঞাসা করিলাম।
বৃদ্ধের নাম নক্ছেদী ভকত। জাতি
গাঙ্গোতা। সে বলিল-কেন, খুপরির
কোণে ঐ যে কলাইয়ের ভুসি
দেখছেন না রয়েছে টাল করা?
বুঝিতে পারিলাম না। কলাইয়ের
ভুসির আগুন করা হয় রাত্রে?
নক্ছেদী আমার অজ্ঞতা দেখিয়া
হাসিল।
-তা নয় বাবুজী। কলাইয়ের ভুসির
মধ্যে ঢুকে ছেলেপিলেরা শুয়ে
থাকে আমরাও কলাইয়ের ভুসি গায়ে
চাপা দিয়ে শুই। দেখছেন না, অন্তত
পাঁচমন ভুসি মজুত রয়েছে। ভারি ওম্
কলাইয়ের ভুসিতে। দুখানা কম্বল
গায়ে দিলেও অমন ওম্ হয় না। আর
আমরা পাবই বা কোথায় কম্বল বলুন
না?
বলিতে বলিতে একটা ছোট ছেলেকে
ঘুম পাড়াইয়া তাহার মা খুপরির
কোণের ভুসির গাদার মধ্যে তাহার
পা হইতে গলা পর্যন্ত ঢুকাইয়া
কেবলমাত্র মুখখানা বাহির করিয়া
শোওয়াইয়া রাখিয়া আসিল। মনে
মনে ভাবিলাম, মানুষে মানুষের
খোঁজ রাখে কতটুকু? কখনো কি
জানিতাম এসব কথা? আজ যেন
সত্যিকার ভারতবর্ষকে চিনিতেছি।
অগ্নিকুণ্ডের অপর পার্শ্বে বসিয়া
একটি মেয়ে কি রাঁধিতেছে।
জিজ্ঞাসা করিলাম-ও কি রান্না
হচ্ছে?
নক্ছেদী বলিল-ঘাটো।
-ঘাটো কি জিনিস?
এবার বোধ হয় রন্ধনরতা মেয়েটি
ভাবিল, এ বাঙালিবাবু সন্ধ্যাবেলা
কোথা হইতে আসিয়া জুটিল। এ
দেখিতেছি নিতান্ত বাতুল। কিছুই
খোঁজ রাখে না দুনিয়ার। সে
খিল্খিল্ করিয়া হাসিয়া উঠিয়া
বলিল- ঘাটো জান না বাবুজী?
মকাই-সেদ্ধ। যেমন চাল সেদ্ধ হলে
বলে ভাত, মকাই সেদ্ধ করলে বলে
ঘাটো।
মেয়েটি আমার অজ্ঞতার প্রতি
কৃপাবশত কাঠের খুন্তির আগায় উক্ত
দ্রব্য একটুখানি হাঁড়ি হইতে তুলিয়া
দেখাইল।
-কি দিয়ে খায়?
এবার হইতে যত কথাবার্তা
মেয়েটিই বলিল। হাসিহাসি মুখে
বলিল-নুন দিয়ে, শাক দিয়ে- আবার
কি দিয়ে খাবে বল না!
-শাক রান্না হয়েছে?
-ঘাটো নামিয়ে শাক চড়াব।
মটরশাক তুলে এনেছি।
মেয়েটি খুবই সপ্রতিভ। জিজ্ঞাসা
করিল-কলকাতায় থাক বাবুজী?
-হ্যাঁ।
-কি রকম জায়গা? আচ্ছা, কলকাতায়
নাকি গাছ নাই? ওখানকার সব
গাছপালা কেটে ফেলেছে?
-কে বললে তোমায়?
-একজন ওখানে কাজ করে আমাদের
দেশের। সে একবার বলেছিল। কি
রকম জায়গা দেখতে বাবুজী?
এই সরলা বন্য মেয়েটিকে যতদূর
সম্ভব বুঝাইবার চেষ্টা পাইলাম
আধুনিক যুগের একটা বড় শহরের
ব্যাপারখানা কি? কতদূর বুঝিল
জানি না, বলিল-কলকাতা শহর
দেখতে ইচ্ছে হয়-কে দেখাবে?
তাহার পর আরো অনেক কথা
বলিলাম তাহার সঙ্গে। রাত
বাড়িয়া গিয়াছে, অন্ধকার ঘন হইয়া
আসিল। উহাদের রান্না শেষ হইয়া
গেল। খুপরির ভিতর হইতে সেই বড়
জামবাটিটা আনিয়া তাহাতে
ফেন-ভাতের মতো জিনিসটা
ঢালিল। উপর উপর একটু নুন ছড়াইয়া
বাটিটা মাঝখানে রাখিয়া
ছেলেমেয়েরা সবাই মিলিয়া
চারিদিকে গোল হইয়া বসিয়া
খাইতে আরম্ভ করিল।
আমি বলিলাম-তোমরা এখান থেকে
বুঝি দেশে ফিরবে?
নক্ছেদী বলিল-দেশে এখন ফিরতে
অনেক দেরি। এখান থেকে ধরমপুর
অঞ্চলে ধান কাটতে যাব- ধান তো
এদেশে হয় না-ওখানে হয়। ধান
কাটার কাজ শেষ হলে আবার যাব
গম কাটতে মুঙ্গের জেলায়। গমের
কাজ শেষ হতে জ্যৈষ্ঠ মাস এসে
পড়বে। তখন আবার খেড়ী কাটা শুরু
হবে আপনাদেরই এখানে। তারপর
কিছুদিন ছুটি। শ্রাবণ-ভাদ্রে আবার
মকাই ফসলের সময় আসবে। মকাই
শেষ হলেই কলাই এবং ধরমপুর-
পূর্ণিয়া অঞ্চলে কার্তিকশাল ধান।
আমরা সারা বছর এইরকম দেশে
দেশেই ঘুরে বেড়াই। যেখানে যে
সময়ে যে ফসল, সেখানে যাই। নইলে
খাব কি?
-বাড়িঘর বলে তোমাদের কিছু নেই?
এবার মেয়েটি কথা বলিল।
মেয়েটির বয়স চব্বিশ-পঁচিশ, খুব
স্বাস্থ্যবতী, বার্নিশ-করা কালো
রং, নিটোল গড়ন। কথাবার্তা বেশ
বলিতে পারে, আর গলার সুরটা
দক্ষিণ-বিহারের দেহাতী
হিন্দিতে বড় চমৎকার শোনায়।
বলিল-কেন থাকবে না বাবুজী? সবই
আছে। কিন্তু সেখানে থাকলে
আমাদের তো চলে না। সেখানে
যাব গরম কালের শেষে, শ্রাবণ
মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত থাকব।
তারপর আবার বেরুতে হবে বিদেশে-
বিদেশেই যখন আমাদের চাকরি।
তা ছাড়া বিদেশে কত কি মজা
দেখা যায়-এই দেখবেন ফসল কাটা
হয়ে গেলে আপনাদের এখানেই কত
দেশ থেকে কত লোক আসবে। কত
বাজিয়ে, গাইয়ে, নাচনেওয়ালী, কত
বহুরূপী সং-আপনি বোধ হয় দেখেন
নি এসব? কি করে দেখবেন,
আপনাদের এ অঞ্চলে তো ঘোর
জঙ্গল হয়ে পড়ে ছিল-সবে এইবার
চাষ হয়েছে। এই দেখুন না আসে আর
পনের দিনের মধ্যেই। এই তো সবারই
রোজগারের সময় আসছে।
চারিদিক নির্জন। দূরে বস্তিতে
কারা টিন পিটাইতেছে অন্ধকারের
মধ্যে। মনে ভাবিলাম, এই অর্গলহীন
কাশডাঁটার বেড়ার আগড়-দেওয়া
কুঁড়েতে ইহারা রাত কাটাইবে এই
শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যের ধারে,
ছেলেপুলে লইয়া-সাহসও আছে
বলিতে হইবে। এই তো মাত্র
দিনকয়েক আগে এদেরই মতো আর
একটা খুপরি হইতে ছেলে লইয়া
গিয়াছে মায়ের কোল হইতে-এদেরই
বা ভরসা কিসের? অথচ একটা
ব্যাপার দেখিলাম, ইহারা যেন
ব্যাপারটা গ্রাহ্যের মধ্যেই
আনিতেছে না। তত সন্ত্রস্ত ভাবও
নাই। এই তো এত রাত পর্যন্ত উন্মুক্ত
আকাশের তলায় বসিয়া গল্পগুজব,
রান্নাবান্না করিল। বলিলাম-
তোমরা একটু সাবধানে থাকবে।
মানুষখেকো বাঘ বেরিয়েছে জান
তো? মানুষখেকো বাঘ বড় ভয়ানক
জানোয়ার, আর বড় ধূর্ত। আগুন রাখো
খুপরির সামনে, আর ঘরের মধ্যে
গিয়ে ঢুকে পড়। ওই তো কাছেই বন,
রাত-বেরাতের ব্যাপার-
মেয়েটি বলিল-বাবুজী, আমাদের
সয়ে গিয়েছে। পূর্ণিয়া জেলায়
যেখানে ফি-বছর ধান কাটতে যাই,
সেখানে পাহাড় থেকে বুনো হাতি
নামে। সে জঙ্গল আরো ভয়ানক।
ধানের সময় বিশেষ করে বুনো
হাতির দল এসে উপদ্রব করে।
মেয়েটি আগুনের মধ্যে আর কিছু
শুকনো বনঝাউয়ের ডাল ফেলিয়া
দিয়া সামনের দিকে সরিয়া
আসিয়া বসিল।
বলিল-সেবার আমরা অখিলকুচা
পাহাড়ের নিচে ছিলাম। একদিন
রাত্রে এক খুপরির বাইরে রান্না
করছি, চেয়ে দেখি পঞ্চাশ হাত দূরে
চার-পাঁচটা বুনো হাতি-কালো
কালো পাহাড়ের মতো দেখাচ্ছে
অন্ধকারে-যেন আমাদের খুপরির
দিকেই আসছে। আমি ছোট
ছেলেটাকে বুকে নিয়ে বড়
মেয়েটার হাত ধরে রান্না ফেলে
খুপরির মধ্যে তাদের রেখে এলাম।
কাছে আর কোনো লোকজন নেই,
বাইরে এসে দেখি তখন হাতি ক’টা
একটু থমকে দাঁড়িয়েছে। ভয়ে আমার
গলা কাঠ হয়ে গিয়েছে। হাতিতে
খুব দেখতে পায় না তাই রক্ষে- ওরা
বাতাসে গন্ধ পেয়ে দূরের মানুষ
বুঝতে পারে। তখন বোধ হয় বাতাস
অন্য দিকে বইছিল, যাই হোক, তারা
অন্য দিকে চলে গেল। ওঃ,
সেখানেও এমনি বাবুজী সারা রাত
টিন পেটায় আর আলো জ্বালিয়ে
রাখে হাতির ভয়ে। এখানে বুনো
মহিষ, সেখানে বুনো হাতি। ওসব
গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে।
রাত বেশি হওয়াতে নিজের বাসায়
ফিরলাম।
দিন পনেরোর মধ্যে ফুলকিয়া
বইহারের চেহারা বদলাইয়া গেল।
সরিষার গাছ শুকাইয়া মাড়িয়া
বীজ বাহির করিবার সঙ্গে সঙ্গে
কোথা হইতে দলে দলে নানা
শ্রেণীর লোক আসিয়া জুটিতে
লাগিল। পূর্ণিয়া, মুঙ্গের, ছাপরা
প্রভৃতি স্থান হইতে মারোয়াড়ী
ব্যবসায়ীরা দাঁড়িপাল্লা ও বস্তা
লইয়া আসিল মাল কিনিতে।
তাহাদের সঙ্গে কুলির ও
গাড়োয়ানের কাজ করিতে আসিল
একদল লোক। হালুইকররা আসিয়া
অস্থায়ী কাশের ঘর তুলিয়া
মিঠাইয়ের দোকান খুলিয়া সতেজে
পুরী, কচৌরি, লাড্ডু, কালাকন্দ্
বিক্রয় করিতে লাগিল।
ফিরিওয়ালারা নানা রকম সস্তা ও
খেলো মনোহারী জিনিস, কাচের
বাসন, পুতুল, সিগারেট, ছিটের কাপড়,
সাবান ইত্যাদি লইয়া আসিল।
এ বাদে আসিল রং-তামাশা
দেখাইয়া পয়সা রোজগার করিতে
কত ধরনের লোক। নাচ দেখাইতে,
রামসীতা সাজিয়া ভক্তের পূজা
পাইতে, হনুমানজীর সিঁদুরমাখা
মূর্তি-হাতে পাণ্ডাঠাকুর আসিল
প্রণামী কুড়াইতে। এ সময় সকলেরই
দু-পয়সা রোজগারের সময় এসব
অঞ্চলে।
আর-বছরও যে জনশূন্য ফুলকিয়া
বইহারের প্রান্তর ও জঙ্গল দিয়া,
বেলা পড়িয়া গেলে, ঘোড়ায়
যাইতেও ভয় করিত-এ-বছর তাহার
আনন্দোৎফুল্ল মূর্তি দেখিয়া চমৎকৃত
হইতে হয়। চারিদিকে বালক-
বালিকার হাস্যধ্বনি, কলরব, সস্তা
টিনের ভেঁপুর পিঁপিঁ বাজনা,
ঝুমঝুমির আওয়াজ, নাচিয়েদের
ঘুঙুরের ধ্বনি-সমস্ত ফুলকিয়ার
বিরাট প্রান্তর জুড়িয়া যেন একটা
বিশাল মেলা বসিয়া গিয়াছে।
লোকসংখ্যাও বাড়িয়া গিয়াছে
অত্যন্ত বেশি। কত নূতন খুপরি,
কাশের লম্বা চালাঘর চারিদিকে
রাতারাতি উঠিয়া গেল। ঘর
তুলিতে এখানে কোনো খরচ নাই,
জঙ্গলে আছে কাশ ও বনঝাউ কি
কেঁদ-গাছের গুঁড়ি ও ডাল, শুকনো
কাশের ডাঁটার খোলা পাকাইয়া
এদেশে একরমক ভারি শক্ত রশি
তৈরি করে, আর আছে ওদের
নিজেদের শারীরিক পরিশ্রম।
ফুলকিয়ার তহশিলদার আসিয়া
জানাইল, এইসব বাহিরের লোক,
যাহারা এখানে পয়সা রোজগার
করিতে আসিয়াছে, ইহাদের কাছে
জমিদারের খাজনা আদায় করিতে
হইবে।
বলিল-আপনি রীতিমতো কাছারি
করুন হুজুর, আমি সব লোক একে একে
আপনার কাছে হাজির করাই-আপনি
ওদের মাথাপিছু একটা খাজনা ধার্য
করে দিন।
কত রকমের লোক দেখিবার সুযোগ
পাইলাম এই ব্যাপারে!
সকাল হইতে দশটা পর্যন্ত কাছারি
করিতাম, বৈকালে আবার তিনটার
পর হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
তহশিলদার বলিল-এরা বেশি দিন
এখানে থাকবে না, ফসল মাড়াই ও
বেচাকেনা শেষ হয়ে গেলেই সব
পালাবে। এর আগে এদের পাওনা
আদায় করে নিতে হবে।
একদিন দেখিলাম একটি খামারে
মারোয়াড়ী মহাজনেরা মাল
মাপিতেছে। আমার মনে হইল
ইহারা ওজনে নিরীহ প্রজাদের
ঠকাইতেছে। আমার পাটোয়ারী ও
তহশিলদারদের বলিলাম সমস্ত
ব্যবসায়ীর কাঁটা ও দাঁড়ি পরীক্ষা
করিয়া দেখিতে। দু-চারজন
মহাজনকে ধরিয়া মাঝে মাঝে
আমার সামনে আনিতে লাগিল-
তাহারা ওজনে ঠকাইয়াছে,
কাহারো দাঁড়ির মধ্যে জুয়াচুরি
আছে। সে-সব লোককে মহাল হইতে
বাহির করিয়া দিলাম। প্রজাদের
এত কষ্টের ফসল আমার মহালে অন্তত
কেহ ফাঁকি দিয়া লইতে পারিবে
না।
দেখিলাম, শুধু মহাজন নয়, নানা
শ্রেণীর লোকে ইহাদের অর্থের
ভার লাঘব করিবার চেষ্টায় ওত
পাতিয়া রহিয়াছে।
এখানে নগদ পয়সার কারবার খুব
বেশি নাই। ফিরিওয়ালাদের কাছে
কোনো জিনিস কিনিলে ইহারা
পয়সার বদলে সরিষা দেয়, জিনিসের
দামের অনুপাতে অনেক বেশি
সরিষা দিয়া দেয়- বিশেষত
মেয়েরা। তাহারা নিতান্ত নিরীহ
ও সরল, যা তা বুঝাইয়া তাহাদের
নিকট হইতে ন্যায্যমূল্যের চতুর্গুণ
ফসল আদায় করা খুবই সহজ।
পুরুষেরাও বিশেষ বৈষয়িক নয়।
তাহারা বিলাতি সিগারেট কেনে,
জুতা-জামা কেনে। ফসলের টাকা
ঘরে আসিলে ইহাদের ও বাড়ির
মেয়েদের মাথা ঘুরিয়া যায়-
মেয়েরা ফরমাস করে রঙিন
কাপড়ের, কাচের ও এনামেলের
বাসনের, হালুইকরের দোকান হইতে
ঠোঙা ঠোঙা লাড্ডু-কচৌরি আসে,
নাচ দেখিয়া গান শুনিয়াই কত
পয়সা উড়াইয়া দেয়। ইহার উপর
রামজী, হনুমানজীর প্রণামী ও পূজা
তো আছেই। তাহার উপরেও আছে
জমিদার ও মহাজনের পাইক-
পেয়াদারা। দুর্দান্ত শীতে রাত
জাগিয়া বন্য-শূকর ও বন্য-মহিষের
উপদ্রব হইতে কত কষ্টে ফসল
বাঁচাইয়া, বাঘের মুখে, সাপের মুখে
নিজেদের ফেলিতে দ্বিধা না
করিয়া সারা বছরের ইহাদের যাহা
উপার্জন,-এই পনের দিনের মধ্যে
খুশির সহিত তাহা উড়াইয়া দিতে
ইহাদের বাধে না দেখিলাম।
কেবল একটা ভালোর দিক দেখা
গেল, ইহারা কেহ মদ বা তাড়ি খায়
না। গাঙ্গোতা বা ভুঁইহার
ব্রাহ্মণদের মধ্যে এসব নেশার
রেওয়াজ নাই-সিদ্ধিটা অনেকে
খায়, তাও কিনিতে হয় না,
বনসিদ্ধির জঙ্গল হইয়া আছে
লবটুলিয়া ও ফুলকিয়ার প্রান্তরে,
পাতা ছিঁড়িয়া আনিলেই হইল- কে
দেখিতেছে।
একদিন মুনেশ্বর সিং আসিয়া
জানাইল একজন লোক জমিদারের
খাজনা ফাঁকি দিবার উদ্দেশ্যে
ঊর্ধ্বশ্বাসে পলাইতেছে-হুকুম হয় তো
ধরিয়া আনে।
বিস্মিত হইয়া বলিলাম-পালাচ্ছে
কি রকম? দৌড়ে পালাচ্ছে?
-ঘোড়ার মতো দৌড়ুচ্ছে হুজুর,
এতক্ষণে বড় কুণ্ডী পার হয়ে জঙ্গলের
ধারে গিয়ে পৌঁছল। দুর্বৃত্তকে
ধরিয়া আনিবার হুকুম দিলাম। এক
ঘণ্টার মধ্যে চার-পাঁচজন সিপাহী
পলাতক আসামীকে আমার সামনে
আনিয়া হাজির করিল।
লোকটাকে দেখিয়া আমার মুখে
কথা সরিল না। তাহার বয়স ষাটের
কম কোনোমতেই হইবে বলিয়া
আমার তো মনে হইল না- মাথার চুল
সাদা, গালের চামড়া কুঞ্চিত হইয়া
গিয়াছে, চেহারা দেখিয়া মনে হয়
সে কতকাল বুভুক্ষু ছিল, এইবার
ফুলকিয়া বইহারের খামারে
আসিয়া পেট ভরিয়া খাইতে
পাইয়াছে।
শুনিলাম সে নাকি ‘ননীচোর
নাটুয়া’ সাজিয়া আজ কয়দিনে
বিস্তর পয়সা রোজগার করিয়াছে,
গ্র্যাণ্ট সাহেবের বটগাছের তলায়
একটা খুপরিতে থাকিত, আজ কয়দিন
ধরিয়া সিপাহীরা তাহার কাছে
খাজনার তাগাদা করিতেছে কারণ
এদিকে ফসলের সময়ও ফুরাইয়া
আসিল। আজ তাহার খাজনা
মিটাইবার কথা ছিল। হঠাৎ দুপুরের
পরে সিপাহীরা খবর পায় সে
লোকটা তল্পিতল্পা বাঁধিয়া
রওয়ানা হইয়াছে। মুনেশ্বর সিং
ব্যাপার কি জানিতে গিয়া দেখে
যে আসামী বইহার ছাড়িয়া চলিতে
আরম্ভ করিয়াছে পূর্ণিয়া অভিমুখে-
মুনেশ্বরের হাঁক শুনিয়া সে নাকি
দৌড়িতে আরম্ভ করিল। তাহার পরই
এই অবস্থা।
সিপাহীদের কথার সত্যতা সম্বন্ধে
কিন্তু আমার সন্দেহ জন্মিল।
প্রথমত, ‘ননীচোর নাটুয়া’ মানে যদি
বালক শ্রীকৃষ্ণ হয়, তবে ইহার সে
সাজিবার বয়স আর আছে কি?
দ্বিতীয়ত, এ লোকটা ঊর্ধ্বশ্বাসে
ছুটিয়া পলাইতেছিল, এ কথাই বা কি
করিয়া সম্ভব! কিন্তু উপস্থিত
সকলেই হলফ করিয়া বলিল-উভয়
কথাই সত্য।
তাহাকে কড়া সুরে বলিলাম-
তোমার এ দুর্বুদ্ধি কেন হোলো,
জমিদারের খাজনা দিতে হয় জান
না? তোমার নাম কি?
লোকটা ভয়ে বাতাসের মুখে
তালপাতার মতো কাঁপিতেছিল।
আমার সিপাহীরা একে চায় তো
আরে পায়, ধরিয়া আনিতে বলিলে
বাঁধিয়া আনে। তাহারা যে এই বৃদ্ধ
নটের প্রতি খুব সদয় ও মোলায়েম
ব্যবহার করে নাই ইহার অবস্থা
দেখিয়া বুঝিতে দেরি হইল না।
লোকটা কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল,
তাহার নাম দশরথ।
-কি জাত? বাড়ি কোথায়?
-আমরা ভুঁইহার বাভন হুজুর। বাড়ি
মুঙ্গের জেলা-সাহেবপুর কামাল।
-পালাচ্ছিলে কেন?
-কই, না, পালাব কেন, হুজুর?
-বেশ, খাজনা দাও।
-কিছুই পাই নি, খাজনা দেব কোথা
থেকে? নাচ দেখিয়ে সর্ষে
পেয়েছিলাম, তা বেচে ক’দিন
পেটে খেয়েছি। হনুমানজীর
কিরিয়া।
সিপাহীরা বলিল-সব মিথ্যে কথা।
শুনবেন না হুজুর। ও অনেক টাকা
রোজগার করেছে। ওর কাছেই আছে।
হুকুম করেন তো ওর কাপড়চোপড়
সন্ধান করি।
লোকটা ভয়ে হাতজোড় করিয়া
বলিল-হুজুর, আমি বলছি আমার কাছে
কত আছে।
পরে কোমর হইতে একটা গেঁজে
বাহির করিয়া উপুড় করিয়া ঢালিয়া
বলিল-এই দেখুন হুজুর, তের আনা
পয়সা আছে। আমার কেউ নেই, এই
বুড়ো বয়সে কে-ই বা আমায় দেবে?
আমি নাচ দেখিয়ে এই ফসলের সময়
খামারে খামারে বেড়িয়ে যা
রোজগার করি। আবার সেই গমের
সময় পর্যন্ত এতেই চালাব। তার
এখনো তিন মাস দেরি। যা পাই
পেটে দুটো খাই, এই পর্যন্ত।
সিপাহীরা বলেছে, আমায় নাকি
আট আনা খাজনা দিতে হবে-তা
হলে আমার আর রইল মোট পাঁচ আনা।
পাঁচ আনায় তিন মাস কি খাব?
বলিলাম-তোমার হাতে ও
পোঁটলাতে কি আছে? বার কর।
লোকটা পোঁটলা খুলিয়া দেখাইল
তাহাতে আছে ছোট্ট একখানা
টিনমোড়া আরশি, একটা রাংতার
মুকুট-ময়ূরপাখা সমেত, গালে
মাখিবার রং, গলায় পরিবার পুঁতির
মালা ইত্যাদি- কৃষ্ণঠাকুর সাজিবার
উপকরণ।
বলিল-দেখুন, তবুও বাঁশি নেই হুজুর।
একটা টিনের বড় বাঁশি আট আনার
কম হবে না। এখানে নলখাগড়ার
বাঁশিতে কাজ চালিয়েছি। এরা
গাঙ্গোতা জাত, এদের ভুলানো
সহজ। কিন্তু আমাদের মুঙ্গের
জেলার লোক সব বড় এলেমদার।
বাঁশি না হলে হাসবে। কেউ পয়সা
দেবে না।
আমি বলিলাম-বেশ, তুমি খাজনা
দিতে না পার, নাচ দেখিয়ে যাও,
খাজনার বদলে।
বৃদ্ধ হাতে যেন স্বর্গ পাইয়াছে এমন
ভাব দেখাইল। তাহার পর গালেমুখে
রং মাখিয়া ময়ূরপাখা মাথায় ঐ
বয়সে সে যখন বারো বছরের
বালকের ভঙ্গিতে হেলিয়া দুলিয়া
হাত নাড়িয়া নাচিতে নাচিতে
গান ধরিল-তখন হাসিব কি কাঁদিব
স্থির করিতে পারিলাম না।
আমার সিপাহীরা তো মুখে কাপড়
দিয়া বিদ্রূপের হাসি চাপিতে
প্রাণপণ করিতেছে। তাহাদের চক্ষে
‘ননীচোর নাটুয়া’র নাচ এক
মারাত্মক ব্যাপারে পরিণত হইল।
বেচারিরা ম্যানেজারবাবুর সামনে
না পারে প্রাণ খুলিয়া হাসিতে,
না পারে দুর্দমনীয় হাসির বেগ
সামলাইতে।
সে রকম অদ্ভুত নাচ কখনো দেখি
নাই, ষাট বছরের বৃদ্ধ কখনো বালকের
মতো অভিমানে ঠোঁট ফুলাইয়া
কাল্পনিক জননী যশোদার নিকট
হইতে দূরে চলিয়া আসিতেছে,
কখনো একগাল হাসিয়া সঙ্গী
রাখাল বালকগণের মধ্যে চোরা-ননী
বিতরণ করিতেছে, যশোদা হাত
বাঁধিয়া রাখিয়াছেন বলিয়া কখনো
জোড়হাতে চোখের জল মুছিয়া খুঁত
খুঁত করিয়া বালকের সুরে
কাঁদিতেছে। সমস্ত জিনিস
দেখিলে হাসিতে হাসিতে পেটের
নাড়ি ছিঁড়িয়া যায়। দেখিবার
মতো বটে!
নাচ শেষ হইল। আমি হাততালি
দিয়া যথেষ্ট প্রশংসা করিলাম।
বলিলাম-এমন নাচ কখনো দেখি নি,
দশরথ। বড় চমৎকার নাচো। আচ্ছা
তোমার খাজনা মাফ করে দিলাম-
আমার নিজ থেকে এই দুটাকা
বকশিশ দিলাম খুশি হয়ে। ভারি
চমৎকার নাচ।
আর দিন-দশবারোর মধ্যে ফসল
কেনাবেচা শেষ হইয়া গেল, বাড়তি
লোক সব যে যার দেশে চলিয়া
গেল। রহিল মাত্র যাহারা এখানে
জমি চষিয়া বাস করিতেছে,
তাহারাই। দোকানপসার উঠিয়া
গেল, নাচওয়ালা, ফিরিওয়ালা
অন্যত্র রোজগারের চেষ্টায় গেল।
কাটুনী জনমজুরের দল এখনো পর্যন্ত
ছিল শুধু এই সময়ের আমোদ তামাশা
দেখিবার জন্য-এইবার তাহারাও
বাসা উঠাইবার যোগাড় করিতে
লাগিল।
২
একদিন বেড়াইয়া ফিরিবার সময়
আমি আমার পরিচিত সেই নক্ছেদী
ভকতের খুপরিতে দেখা করিতে
গেলাম।
সন্ধ্যার বেশি দেরি নাই,
দিগন্তব্যাপী ফুলকিয়া বইহারের
পশ্চিম প্রান্তে একেবারে সবুজ
বনরেখার মধ্যে ডুবিয়া টক্টকে
রাঙা প্রকাণ্ড বড় সূর্যটা অস্ত
যাইতেছে। এখানকার এই
সূর্যাস্তগুলি-বিশেষত এই
শীতকালে-এত অদ্ভুত সুন্দর যে এই
সময়ে মাঝে মাঝে আমি
মহালিখারূপের পাহাড়ে সূর্যাস্তের
কিছু পূর্বে উঠিয়া বিস্ময়জনক
দৃশ্যের প্রতীক্ষা করি।
নক্ছেদী তাড়াতাড়ি উঠিয়া
কপালে হাত দিয়া আমায় সেলাম
করিল। বলিল-ও মঞ্চী, বাবুজীকে
বসবার একটা কিছু পেতে দে।
নক্ছেদীর খুপরিতে একজন প্রৌঢ়া
স্ত্রীলোক আছে, সে যে নক্ছেদীর
স্ত্রী তাহা অনুমান করা কিছু শক্ত
নয়। কিন্তু সে প্রায়ই বাহিরের
কাজকর্ম অর্থাৎ কাঠভাঙ্গা,
কাঠকাটা, দূরবর্তী ভীমদাসটোলার
পাতকুয়া হইতে জল আনা ইত্যাদি
লইয়া থাকে। মঞ্চী সেই মেয়েটি,
যে আমাকে বুনো হাতির গল্প
বলিয়াছিল। সে আসিয়া শুষ্ক
কাশের ডাঁটায় বোনা একখানা
চেটাই পাতিয়া দিল।
তার সেই দক্ষিণ-বিহারের দেহাতী
‘ছিকাছিকি’ বুলির সুন্দর টানের
সঙ্গে মাথা দুলাইয়া হাসিতে
হাসিতে বলিল-কেমন দেখলেন
বাবুজী বইহারের মেলা।
বলেছিলাম না, কত নাচ-তামাশা
আমোদ হবে, কত জিনিস আসবে,
দেখলেন তো? অনেক দিন আসেন নি
বাবুজী, বসুন। আমরা যে শিগগির
চলে যাচ্ছি।
ওদের খুপরির দোরের কাছে লম্বা
আধশুকনো ঘাসের উপর চেটাই
পাতিয়া বসিলাম, যাহাতে
সূর্যাস্তটা ঠিক সামনাসামনি
দেখিতে পাই। চারিদিকের
জঙ্গলের গায়ে একটা মৃদু রাঙা
আভা পড়িয়াছে, একটা অবর্ণনীয়
শান্তি ও নীরবতা বিশাল বইহার
জুড়িয়া।
মঞ্চীর কথার উত্তর দিতে বোধ হয়
একটু দেরি হইল। সে আবার কি একটা
প্রশ্ন করিল, কিন্তু ওর ‘ছিকাছিকি’
বুলি আমি খুব ভালো বুঝি না, কি
বলিল না বুঝিতে পারিয়া অন্য
একটা প্রশ্ন দ্বারা সেটা চাপা
দিবার জন্য বলিলাম-তোমরা কালই
যাবে?
-হ্যাঁ, বাবুজী।
-কোথায় যাবে?
-পূর্ণিয়া কিষণগঞ্জ অঞ্চলে যাব।
পরে বলিল-নাচ-তামাশা কেমন
দেখলেন বাবু? বেশ ভালো ভালো
লোক গাইয়ে এবার এসেছিল। একদিন
ঝল্লুটোলায় বড় বকাইন গাছের তলায়
একটা লোক মুখে ঢোলক
বাজিয়েছিল, শুনেছিলেন? কি
চমৎকার বাবুজী!
দেখিলাম মঞ্চী নিতান্ত
বালিকার মতোই নাচ-তামাশায়
আমোদ পায়। এবার কত রকম কি
দেখিয়াছে, মহা উৎসাহ ও খুশির
সুরে তাহারই বর্ণনা করিতে বসিয়া
গেল।
নক্ছেদী বলিল-নে নে, বাবুজী
কলকাতায় থাকেন, তোর চেয়ে
অনেক কিছু দেখেছেন। ও এসব বড়
ভালবাসে বাবুজী, ওরই জন্যে আমরা
এতদিন এখানে রয়ে গেলাম। ও
বল্লে- না, দাঁড়াও, খামারের নাচ-
তামাশা, লোকজন দেখে তবে যাব।
বড্ড ছেলেমানুষ এখনো!
মঞ্চী যে নক্ছেদীর কে হয় তাহা
এতদিন জিজ্ঞাসা করি নাই, যদিও
ভাবিতাম বৃদ্ধের মেয়েই হইবে। আজ
ওর কথায় আমার আর কোনো সন্দেহ
রহিল না।
বলিলাম-তোমার মেয়ের বিয়ে
দিয়েছ কোথায়? নক্ছেদী আশ্চর্য
হইয়া বলিল-আমার মেয়ে! কোথায়
আমার মেয়ে হুজুর?
-কেন, এই মঞ্চী তোমার মেয়ে নয়?
আমার কথায় সকলের আগে খিল্খিল্
করিয়া হাসিয়া উঠিল মঞ্চী।
নক্ছেদীর প্রৌঢ়া স্ত্রীও মুখে আঁচল
চাপা দিয়া খুপরির ভিতর ঢুকিল।
নক্ছেদী অপমানিত হওয়ার সুরে
বলিল-মেয়ে কি হুজুর! ও যে আমার
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী।
বলিলাম-ও!
অতঃপর খানিকক্ষণ সবাই চুপচাপ।
আমি তো এমন অপ্রতিভ হইয়া
পড়িলাম যে, কথা খুঁজিয়া পাই না।
মঞ্চী বলিল-আগুন করে দিই, বড্ড
শীত।
শীত সত্যই বড় বেশি। সূর্য অস্ত
যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন হিমালয়
পাহাড় নামিয়া আসে। পূর্ব-
আকাশের নিচের দিকটা সূর্যাস্তের
আভায় রাঙা, উপরটা কৃষ্ণাভ নীল।
খুপরি হইতে কিছু দূরে একটা শুকনো
কাশঝাড়ে মঞ্চী আগুন লাগাইয়া
দিতে দশ-বারো ফুট দীর্ঘ ঘাস দাউ
দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। আমরা
জ্বলন্ত কাশঝোপের কাছে গিয়া
বসিলাম।
নক্ছেদী বলিল-বাবুজী, এখনো ও
ছেলেমানুষ আছে, ওর জিনিসপত্র
কেনার দিকে বেজায় ঝোঁক। ধরুন
এবার প্রায় আট-দশ মন সর্ষে মজুরি
পাওয়া গিয়েছিল-তার মধ্যে তিন
মন ও খরচ করে ফেলেছে শখের
জিনিসপত্র কেনবার জন্য। আমি
বললাম, গতরখাটানো মজুরির মাল
দিয়ে তুই ওসব কেন কিনিস্? তা
মেয়েমানুষ শোনে না। কাঁদে,
চোখের জল ফেলে। বলি, তবে কেন্।
মনে ভাবিলাম, তরুণী স্ত্রীর বৃদ্ধ
স্বামী, না বলিয়াই বা আর কি
উপায় ছিল?
মঞ্চী বলিল-কেন, তোমায় তো
বলেছি, গম-কাটানোর সময় যখন
মেলা হবে, তখন আর কিছু কিনব না।
ভালো জিনিসগুলো সস্তায় পাওয়া
গেল-
নক্ছেদী রাগিয়া বলিল-সস্তা?
বোকা মেয়েমানুষ পেয়ে ঠকিয়ে
নিয়েছে কেঁয়ে দোকানদার আর
ফিরিওয়ালা।-সস্তা! পাঁচ সের
সর্ষে নিয়ে একখানা চিরুনি
দিয়েছে, বাবুজী। আর-বছর তিরাশি
রতনগঞ্জের গমের খামারে-
মঞ্চী বলিল-আচ্ছা বাবুজী, নিয়ে
আসছি জিনিসগুলো, আপনিই বিচার
করে বলুন সস্তা কি না-
কথা শেষ করিয়াই মঞ্চী খুপড়ির
দিকে ছুটিল এবং কাশডাঁটার-বোনা
ডালা-আঁটা একটা ঝাঁপি হাতে
করিয়া ফিরিল। তারপর সে ডালা
তুলিয়া ঝাঁপির ভিতর হইতে
জিনিসগুলি একে একে বাহির
করিয়া আমার সামনে সাজাইয়া
রাখিতে লাগিল।
-এই দেখুন কত বড় কাঁকই, পাঁচ সের
সর্ষের কমে এমনিতরো কাঁকই হয়?
দেখেছেন কেমন চমৎকার রং!
শৌখিন জিনিস না? আর এই দেখুন
একখান সাবান, দেখুন কেমন গন্ধ, এও
নিয়েছে পাঁচ সের সর্ষে। সস্তা কি
না বলুন বাবুজী?
সস্তা মনে করিতে পারিলাম কই?
এখন একখানা বাজে সাবানের দাম
কলিকাতার বাজারে এক আনার
বেশি নয়, পাঁচ সের সর্ষের দাম
নয়ালির মুখেও অন্তত সাড়ে-সাত
আনা। এই সরলা বন্য মেয়েরা
জিনিসপত্রের দাম জানে না, খুবই
সহজ এদের ঠকানো।
মঞ্চী আরো অনেক জিনিস
দেখাইল। আহ্লাদের সহিত একবার
এটা দেখায়, একবার ওটা দেখায়।
মাথার কাঁটা, পাথরের আংটি,
চীনামাটির পুতুল, এনামেলের ছোট
ডিশ, খানিকটা চওড়া লাল ফিতে-
এইসব জিনিস। দেখিলাম মেয়েদের
প্রিয় জিনিসের তালিকা সব
দেশেই সব সমাজেই অনেকটা এক।
বন্য মেয়ে মঞ্চী ও তাহার
শিক্ষিতা ভগ্নীর মধ্যে বেশি
তফাৎ নাই। জিনিসপত্র সংগ্রহ ও
অধিকার করার প্রবৃত্তি উভয়েরই
প্রকৃতিদত্ত। বুড়ো নক্ছেদী রাগিলে
কি হইবে।
কিন্তু সবচেয়ে ভালো জিনিসটি
মঞ্চী সর্বশেষে দেখাইবে বলিয়া
চাপিয়া রাখিয়া দিয়াছে তাহা
কি তখন জানি!
এইবার সে গর্বমিশ্রিত আনন্দের ও
আগ্রহের সহিত সেটা বাহির করিয়া
আমার সামনে মেলিয়া ধরিল।
একছড়া নীল ও হলদে হিংলাজের
মালা।
সত্যি, কি খুশি ও গর্বের হাসি
দেখিলাম ওর মুখে! ওর সভ্য
বোনেদের মতো ও মনের ভাব গোপন
করিতে তো শেখে নাই, একটি
অনাবিল নির্ভেজাল নারী-আত্মা
ওর এইসব সামান্য জিনিসের
অধিকারের উচ্ছ্বসিত আনন্দের
ভিতর দিয়া আত্মপ্রকাশ
করিতেছে। নারী-মনের এমন স্বচ্ছ
প্রকাশ দেখিবার সুযোগ আমাদের
সভ্য-সমাজে বড়-একটা ঘটে না।
-বলুন দিকি কেমন জিনিস?
-চমৎকার!
-কত দাম হতে পারে এর বাবুজী?
কলকাতায় আপনারা পরেন তো?
কলিকাতায় আমি হিংলাজের
মালা পরি না, আমরা কেহই পরি না
তবুও আমার মনে হইল ইহার দাম খুব
বেশি হইলেও ছ-আনার বেশি নয়।
বলিলাম- কত নিয়েছে বল না?
-সতের সের সর্ষে নিয়েছে। জিতি
নি?
বলিয়া লাভ কি যে, সে ভীষণ
ঠকিয়াছে। এ-সব জায়গায় এ রকম
হইবেই! কেন মিথ্যা আমি নক্ছেদীর
কাছে বকুনি খাওয়াইয়া ওর মনের এ
অপূর্ব আহ্লাদ নষ্ট করিতে যাইব।
আমারই অনভিজ্ঞতার ফলে এ বছর
এমন হইতে পারিয়াছে। আমার উচিত
ছিল ফিরিওয়ালাদের
জিনিসপত্রের দরের উপরে কড়া নজর
রাখা। কিন্তু আমি নতুন লোক
এখানে, কি করিয়া জানিব এদেশের
ব্যাপার? ফসল মাড়িবার সময় মেলা
হয় তাহাই তো জানিতাম না।
আগামী বৎসর যাহাতে এমনধারা না
ঘটে, তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে।
পরদিন সকালে নক্ছেদী তাহার দুই
স্ত্রী ও পুত্র-কন্যা লইয়া এখান
হইতে চলিয়া গেল। যাইবার পূর্বে
আমার খুপরিতে নক্ছেদী খাজনা
দিতে আসিল, সঙ্গে আসিল মঞ্চী।
দেখি মঞ্চী গলায় সেই হিংলাজের
মালাছড়াটি পরিয়া আসিয়াছে।
হাসিমুখে বলিল- আবার আসব ভাদ্র
মাসে মকাই কাটতে। তখন থাকবেন
তো বাবুজী? আমরা জংলী হর্তুকীর
আচার করি শ্রাবণ মাসে- আপনার
জন্যে আনব!
মঞ্চীকে বড় ভালো লাগিয়াছিল,
চলিয়া গেলে দুঃখিত হইলাম।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now