বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
কয়েক মাস পরে। ফাল্গুন মাসের
প্রথম। লবটুলিয়া হইতে কাছারি
ফিরিতেছি, জঙ্গলের মধ্যে কুণ্ডীর
ধারে বাংলা কথাবার্তায় ও
হাসির শব্দে ঘোড়া থামাইলাম।
যত কাছে যাই, ততই আশ্চর্য হই।
মেয়েদের গলাও শোনা যাইতেছে-
ব্যাপার কি? জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়া
ঢুকাইয়া কুণ্ডীর ধারে লইয়া গিয়া
দেখি বনঝাউয়ের ঝোপের ধারে
শতরঞ্চি পাতিয়া আট-দশটি
বাঙালি ভদ্রলোক বসিয়া গল্পগুজব
করিতেছে, পাঁচ-ছয়টি মেয়ে কাছেই
রান্না করিতেছে, ছয়-সাতটি ছোট
ছোট ছেলেমেয়ে ছুটাছুটি করিয়া
খেলা করিয়া বেড়াইতেছে। কোথা
হইতে এতগুলি মেয়ে-পুরুষ এই ঘোর
জঙ্গলে ছেলেপুলে লইয়া পিকনিক
করিতে আসিল বুঝিতে না পারিয়া
অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া আছি, এমন
সময় সকলের চোখ আমার দিকে
পড়িল- একজন বাংলায় বলিল- এ
ছাতুটা আবার কোথা থেকে এসে
জুটল এ জঙ্গলে? আমব্রেলু?
আমি ঘোড়া হইতে নামিয়া তাদের
কাছে যাইতে যাইতে বলিলাম-
আপনারা বাঙালি দেখছি- এখানে
কোথা থেকে এলেন?
তারা খুব আশ্চর্য হইল, অপ্রতিভও
হইল। বলিল- ও, মশায় বাঙালি? হেঁ-
হেঁ কিছু মনে করবেন না, আমরা
ভেবেছি – হেঁ-হেঁ-
বলিলাম- না না, মনে করবার আছে
কি! তা আপনারা কোথা থেকে
আসছেন বিশেষ মেয়েদের নিয়ে-
আলাপ জমিয়া গেল। এই দলের মধ্যে
প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি একজন রিটায়ার্ড
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, রায় বাহাদুর।
বাকি সকলে তাঁর ছেলে, ভাইপো,
ভাইঝি, মেয়ে, নাতনি, জামাই,
জামাইয়ের বন্ধু-ইত্যাদি। রায়
বাহাদুর কলিকাতায় থাকিতে
একখানি বই পড়িয়া জানিতে
পারেন, পূর্ণিয়া জেলায় খুব শিকার
মেলে, তাই শিকার করিবার কোনো
সুবিধা হয় কিনা দেখিবার জন্য
পূর্ণিয়ায় তাঁর ভাই মুন্সেফ,
সেখানেই আসিয়াছিলেন। আজ
সকালে সেখান হইতে ট্রেনে
চাপিয়া বেলা দশটার সময়
কাটারিয়া পৌঁছেন। সেখান হইতে
নৌকা করিয়া কুশী নদী বাহিয়া
এখানে পিকনিক করিতে
আসিয়াছেন-কারণ সকলের মুখেই
নাকি শুনিয়াছেন লবটুলিয়া
বোমাইবুরু ও ফুলকিয়া বইহারের
জঙ্গল না দেখিয়া গেলে জঙ্গল
দেখাই হইল না। পিকনিক সারিয়াই
চার মাইল হাঁটিয়া মোহনপুরা
জঙ্গলের নিচে কুশী নদীতে গিয়া
নৌকা ধরিবেন- ধরিয়া আজ
রাত্রেই কাটারিয়া ফিরিয়া
যাইবেন।
আমি সত্যই অবাক হইয়া গেলাম।
সম্বলের মধ্যে দেখিলাম ইহাদের
সঙ্গে আছে একটা দো-নলা শট-গান্-
ইহাই ভরসা করিয়া এ ভীষণ জঙ্গলে
ইহারা ছেলেমেয়ে লইয়া পিকনিক
করিতে আসিয়াছে! অবশ্য, সাহস
আছে অস্বীকার করিব না, কিন্তু
অভিজ্ঞ রায় বাহাদুরের আর একটু
সাবধান হওয়া উচিত ছিল।
মোহনপুরা জঙ্গলের নিকট দিয়া
এদেশের জংলী লোকেরাই সন্ধ্যার
পূর্বে যাইতে সাহস করে না বন্য
মহিষের ভয়ে। বাঘ বার হওয়াও
আশ্চর্য নয়। বুনো শুয়োর আর সাপের
তো কথাই নাই। ছেলেমেয়ে লইয়া
পিকনিক করিতে আসিবার জায়গা
নয় এটা।
রায় বাহাদুর আমাকে কিছুতেই
ছাড়িবেন না। বসিতে হইবে, চা
খাইতে হইবে। আমি এ জঙ্গলে কি
করি, কি বৃত্তান্ত। আমি কি কাঠের
ব্যবসা করি? নিজের ইতিহাস
বলিবার পরে তাঁহাদিগকে সবসুদ্ধ
কাছারিতে রাত্রিযাপন করিতে
অনুরোধ করিলাম। কিন্তু তাঁহারা
রাজি হইলেন না। রাত্রি দশটার
ট্রেনে কাটারিয়াতে উঠিয়া
পূর্ণিয়া আজই রাত বারোটায়
পৌঁছিতে হইবে। না ফিরিলে
বাড়িতে সকলে ভাবিবে, কাজেই
থাকিতে অপারগ-ইত্যাদি।
জঙ্গলের মধ্যে ইহারা এত দূর কেন
পিকনিক করিতে আসিয়াছে তাহা
বুঝিলাম না। লবটুলিয়া বইহারের
উন্মুক্ত প্রান্তর বনানী ও দূরের
পাহাড়রাজির শোভা, সূর্যাস্তের
রং, পাখির ডাক, দশ হাত দূরে বনের
মধ্যে ঝোপের মাথায় মাথায় এই
বসন্তকালে কত চমৎকার ফুল ফুটিয়া
রহিয়াছে- এসবের দিকে ইহাদের
নজর নাই দেখিলাম। ইহারা কেবল
চিৎকার করিতেছে, গান
গাহিতেছে, ছুটাছুটি করিতেছে,
খাওয়ার তরিবৎ কিসে হয়, সে-
ব্যবস্থা করিতেছে। মেয়েদের মধ্যে
দুটি কলিকাতায় কলেজে পড়ে,
বাকি দু-তিনটি স্কুলে পড়ে।
ছেলেগুলির মধ্যে একজন মেডিকেল
কলেজের ছাত্র, বাকিগুলি বিভিন্ন
স্কুল-কলেজে পড়ে। কিন্তু প্রকৃতির
এই অত্যাশ্চর্য সৌন্দর্যময় রাজ্যে
দৈবাৎ যদি আসিয়াই পড়িয়াছে,
দেখিবার চোখ নাই আদৌ।
প্রকৃতপক্ষে ইহারা আসিয়াছিল
শিকার করিতে-খরগোশ, পাখি,
হরিণ-পথের ধারে যেন ইহাদের
বন্দুকের গুলি খাইবার অপেক্ষায়
বসিয়া আছে।
যে মেয়েগুলি আসিয়াছে, এমন
কল্পনার-লেশ-পরিশূন্য মেয়ে যদি
কখনো দেখিয়াছি। তাহারা
ছুটাছুটি করিতেছে, বনের ধার হইতে
রান্নার জন্য কাঠ কুড়াইয়া
আনিতেছে, মুখে বকুনির বিরাম
নাই- কিন্তু একবার কেহ চারিধারে
চাহিয়া দেখিল না যে কোথায়
বসিয়া তাহারা খিচুড়ি
রাঁধিতেছে, কোন্ নিবিড়
সৌন্দর্যভরা বনানী-প্রান্তে!
একটি মেয়ে বলিল- ‘টিনকার্টা’
ঠুকবার বড্ড সুবিধে এখানে, না? কত
পাথরের নুড়ি!
আর একটি মেয়ে বলিল- উঃ, কি
জায়গা! ভালো চাল কোথাও পাবার
জো নেই- কাল সারা টাউন খুঁজে
বেড়িয়েছি- কি বিশ্রী মোটা চাল-
তোমরা আবার বলছিলে পোলাও
হবে!
ইহারা কি জানে, যেখানে বসিয়া
তারা রান্না করিতেছে, তার দশ-
বিশ হাতের মধ্যে রাত্রের
জ্যোৎস্নায় পরীরা খেলা করিয়া
বেড়ায়?
ইহারা সিনেমার গল্প শুরু
করিয়াছে। পূর্ণিয়ায় কালও রাত্রে
তাহারা সিনেমা দেখিয়াছে, তা
নাকি যৎপরোনাস্তি বাজে। এইসব
গল্প। সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতার
সিনেমার সঙ্গে তাহার তুলনা
করিতেছে। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও
ধান ভানে, কথা মিথ্যা নয়। বৈকাল
পাঁচটার সময় ইহারা চলিয়া গেল।
যাইবার সময় কতকগুলি খালি জমাট
দুধের ও জ্যামের টিন ফেলিয়া
রাখিয়া গেল। লবটুলিয়া জঙ্গলের
গাছপালার তলায় সেগুলি আমার
কাছে কি খাপছাড়াই
দেখাইতেছিল!
২
বসন্তের শেষ হইতেই এবার লবটুলিয়া
বইহারের গম পাকিয়া উঠিল।
আমাদের মহালে রাই সরিষার চাষ
ছিল গত বৎসর খুব বেশি। এবার অনেক
জমিতে গমের আবাদ, সুতরাং এবছর
এখানে কাটুনী মেলার সময় পড়িল
বৈশাখের প্রথমেই।
কাটুনী মজুরদের মাথায় যেন টনক
আছে, তাহাদের দল এবার শীতের
শেষে আসে নাই, এ সময়ে দলে দলে
আসিয়া জঙ্গলের ধারে, মাঠের
মধ্যে সর্বত্র খুপরি বাঁধিয়া বাস
করিতে শুরু করিয়াছে। দুই-তিন
হাজার বিঘা জমির ফসল কাটা
হইবে, সুতরাং মজুরও আসিয়াছে
প্রায় তিন-চার হাজারের কম নয়।
আরো শুনিলাম আসিতেছে।
আমি সকাল হইলেই ঘোড়ায় বাহির
হই, সন্ধ্যায় ঘোড়ার পিঠ হইতে
নামি। কত নূতন ধরনের লোক
আসিতে আরম্ভ করিয়াছে, ইহাদের
মধ্যে কত বদমাইশ, গুণ্ডা, চোর,
রোগগ্রস্ত-সকলের উপর নজর না
রাখিলে এসব পুলিসবিহীন স্থানে
একটা দুর্ঘটনা যখন-তখন ঘটিতে
পারে।
দু-একটি ঘটনা বলি।
একদিন দেখি এক জায়গায় দুটি
বালক ও একটি বালিকা রাস্তার
ধারে বসিয়া কাঁদিতেছে।
ঘোড়া হইতে নামিলাম।
জিজ্ঞাসা করিলাম-কি হয়েছে
তোমাদের?
উত্তরে যাহা বলিল উহার মর্ম
এইরূপঃ উহাদের বাড়ি আমাদের
মহালে নয়, নন্দলাল ওঝা
গোলাওয়ালার গ্রামে। উহারা
সহোদর ভাই-বোন, এখানে কাটুনী
মেলা দেখিতে আসিয়াছিল। আজই
আসিয়া পৌঁছিয়াছে, এবং কোথায়
নাকি লাঠি ও দড়ির ফাঁসের
জুয়াখেলা হইতেছিল, বড় ছেলেটি
সেখানে জুয়া খেলিতে আরম্ভ করে।
একটা লাঠির যে-দিকটা মাটিতে
ঠেকিয়া আছে সেই প্রান্তটা দড়ি
দিয়া জড়াইয়া দিতে হয়, যদি দড়ি
খুলিতে খুলিতে লাঠির আগায় ফাঁস
জড়াইয়া যায়, তবে খেলাওয়ালা
খেলুড়েকে এক পয়সায় চার পয়সা
হিসাবে দেয়।
বড় ভাইয়ের কাছে ছিল দশ আনা
পয়সা, সে একবারও লাঠিতে ফাঁস
বাঁধাইতে পারে নাই, সব পয়সা
হারিয়া ছোট ভাইয়ের আট আনা ও
পরিশেষে ছোট বোনের চার আনা
পয়সা পর্যন্ত লইয়া বাজি ধরিয়া
সর্বস্বান্ত হইয়াছে! এখন উহাদের
খাইবার পয়সা নাই, কিছু কেনা বা
দেখাশোনা তো দূরের কথা।
আমি তাহাদের কাঁদিতে বারণ
করিয়া তাহাদিগকে লইয়া
জুয়াখেলার অকুস্থানের দিকে
চলিলাম। প্রথমে তাহারা জায়গাই
স্থির করিতে পারে না, পরে একটা
হরীতকী গাছ দেখাইয়া বলিল- এরই
তলায় খেলা হচ্ছিল। জনপ্রাণী নাই
সেখানে। কাছারির রূপসিং
জমাদারের ভাই সঙ্গে ছিল, সে
বলিল- জুয়াচোরেরা কি এক জায়গায়
বেশিক্ষণ থাকে হুজুর? লম্বা
দিয়েছে কোন্ দিকে।
বিকালের দিকে জুয়াড়ী ধরা
পড়িল। সে মাইল তিন দূরে একটি
বস্তিতে জুয়া খেলিতেছিল, আমার
সিপাহীরা দেখিতে পাইয়া
তাহাকে আমার নিকট হাজির
করিল। ছেলেমেয়েগুলিও দেখিয়াই
চিনিল।
লোকটা প্রথমে পয়সা ফেরত দিতে
চায় না। বলে, সে তো জোর করিয়া
কাড়িয়া লয় নাই, উহারা স্বেচ্ছায়
খেলিয়া পয়সা হারিয়াছে, ইহাতে
তাহার দোষ কি? অবশেষে তাহাকে
ছেলেমেয়েদের সব পয়সা তো ফেরত
দিতেই হইল-আমি তাহাকে পুলিসে
দিবার আদেশ দিলাম।
সে হাতে পায়ে ধরিতে লাগিল।
বলিলাম-তোমার বাড়ি কোথায়?
- বালিয়া জেলা, বাবুজী।
- এ রকম করে লোককে ঠকাও কেন?
কত পয়সা ঠকিয়েছ লোকজনের?
- গরিব লোক, হুজুর! আমায় ছেড়ে দিন
এবার। তিন দিনে মোটে দু-টাকা
তিন আনা রোজগার-
- তিন দিনে খুব বেশি রোজগার
হয়েছে মজুরদের তুলনায়।
- হুজুর, সারা বছরে এ-রকম রোজগার
ক’বার হয়? বছরে ত্রিশ-চল্লিশ টাকা
আয়।
লোকটাকে সেদিন ছাড়িয়া
দিয়াছিলাম- কিন্তু আমার মহাল
ছাড়িয়া সেদিনই চলিয়া যাইবার
কড়ারে। আর তাকে কোনোদিন কেউ
আমাদের মহালের সীমানার মধ্যে
দেখেও নাই।
এবার মঞ্চীকে কাটুনী মজুরদের
মধ্যে না দেখিয়া উদ্বেগ ও বিস্ময়
দুই-ই অনুভব করিলাম। সে বারবার
বলিয়াছিল গম কাটিবার সময়ে
নিশ্চয়ই আমাদের মহালে আসিবে।
ফসল কাটার মেলা আসিল, চলিয়াও
গেল- কেন যে সে আসিল না, কিছুই
বুঝিলাম না।
অন্যান্য মজুরদের নিকট জিজ্ঞাসা
করিয়াও কোনো সন্ধান মিলিল না।
মনে ভাবিলাম, এত বিস্তীর্ণ
ফসলের মহাল কাছাকাছির মধ্যে
আর কোথাও নাই, এক কুশী নদীর
দক্ষিণে ইসমাইলপুরের দ্বিয়ারা
মহাল ছাড়া। কিন্তু সেখানে কেন
সে যাইবে, অত দূরে, যখন মজুরি উভয়
স্থানেই একই।
অবশেষে ফসলের মেলার শেষ দিকে
জনৈক গাঙ্গোতা মজুরের মুখে
মঞ্চীর সংবাদ পাওয়া গেল। সে
মঞ্চীকে ও তাহার স্বামী নক্ছেদী
ভকতকে চেনে। একসঙ্গে বহু জায়গায়
কাজ করিয়াছে নাকি। তাহারই
মুখে শুনিলাম গত ফাল্গুন মাসে সে
উহাদের আকবরপুর গবর্নমেন্ট
খাসমহলে ফসল কাটিতে
দেখিয়াছে। তাহার পর তাহারা যে
কোথায় গেল সে জানে না।
ফসলের মেলা শেষ হইয়া গেল
জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি, এমন
সময় একদিন সদর কাছারির
প্রাঙ্গণে নক্ছেদী ভকতকে দেখিয়া
বিস্মিত হইলাম। নক্ছেদী আমার
পা জড়াইয়া হাউমাউ করিয়া
কাঁদিয়া উঠিল। আরো বিস্মিত
হইয়া পা ছাড়াইয়া লইয়া বলিলাম-
কি ব্যাপার? তোমরা এবার ফসলের
সময় আস নি কেন? মঞ্চী ভালো
আছে তো? কোথায় সে?
উত্তরে নক্ছেদী যাহা বলিল তাহার
মোট মর্ম এই, মঞ্চী কোথায় তাহা
সে জানে না। খাসমহলে কাজ
করিবার সময়েই মঞ্চী তাহাদের
ফেলিয়া কোথায় পালাইয়া
গিয়াছে। অনেক খোঁজ করিয়াও
তাহার পাত্তা পাওয়া যায় নাই।
বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইলাম। কিন্তু
দেখিলাম বৃদ্ধ নক্ছেদী ভকতের
প্রতি আমার কোনো সহানুভূতি
নাই, যা কিছু ভাবনা সবই সেই বন্য
মেয়েটির জন্য। কোথায় সে গেল,
কে তাহাকে ভুলাইয়া লইয়া গেল,
কি অবস্থায় কোথায় বা সে আছে।
সস্তায় বিলাসদ্রব্যের প্রতি তাহার
যে রকম আসক্তি লক্ষ্য করিয়াছি
সে-সবের লোভ দেখাইয়া তাহাকে
ভুলাইয়া লইয়া যাওয়াও কষ্টকর নয়।
তাহাই ঘটিয়াছে নিশ্চয়।
জিজ্ঞাসা করিলাম- তার ছেলে
কোথায়?
- সে নেই। বসন্ত হয়ে মারা গিয়েছে
মাঘ মাসে।
অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম শুনিয়া।
বেচারি পুত্রশোকেই উদাসী হইয়া,
যেদিকে দু-চোখ যায়, চলিয়া
গিয়াছে নিশ্চয়ই। কিছুক্ষণ চুপ
করিয়া থাকিয়া বলিলাম – তুলসী
কোথায়?
- সে এখানেই এসেছে। আমার
সঙ্গেই আছে। আমায় কিছু জমি দিন
হুজুর। নইলে আমরা বুড়োবুড়ি, ফসল
কেটে আর চলে না। মঞ্চী ছিল, তার
জোরে আমরা বেড়াতাম। সে আমর
হাত-পা ভেঙ্গে দিয়ে গিয়েছে!
সন্ধ্যার পর নক্ছেদীর খুপরিতে
গিয়া দেখিলাম তুলসী তাহার
ছেলেমেয়ে লইয়া চীনার দানা
ছাড়াইতেছে। আমায় দেখিয়া
কাঁদিয়া উঠিল। দেখিলাম মঞ্চী
চলিয়া যাওয়াতে সেও যথেষ্ট
দুঃখিত। বলিল- হুজুর, সব ঐ বুড়োর
দোষ। গোরমিণ্টের লোক মাঠে সব
টিকে দিতে এল, বুড়ো তাকে চার
আনা পয়সা ঘুষ দিয়ে তাড়ালে।
কাউকে টিকে নিতে দিল না।
বললে, টিকে নিলে বসন্ত হবে। হুজুর,
তিন দিন গেল না. মঞ্চীর ছেলেটার
বসন্ত হোলো, মারাও গেল। তার
শোকে সে পাগলের মতো হয়ে গেল-
খায় না, দায় না, শুধু কাঁদে।
- তারপর?
- তারপর হুজুর, খাসমহল থেকে
আমাদের তাড়িয়ে দিলে। বললে-
বসন্তে তোমাদের লোক মারা
গিয়াছে, এখানে থাকতে দেবো না!
এক ছোকরা রাজপুত মঞ্চীর দিকে
নজর দিত। যেদিন আমরা খাসমহল
থেকে চলে এলাম, সেই রাত্রেই
মঞ্চী নিরুদ্দেশ হোলো। আমি
সেদিন সকালে ঐ ছোকরাটাকে
খুপরির কাছে ঘুরতে দেখেছি। ঠিক
তার কাজ, হজুর! ইদানীং মঞ্চী বড়
কলকাতা দেখব, কলকাতা দেখব,
করত। তখনই জানি একটা কিছু ঘটবে।
আমারও মনে পড়িল মঞ্চী আর-বছর
কলিকাতা দেখিবার যথেষ্ট আগ্রহ
দেখাইয়াছিল বটে। আশ্চর্য নয়, ধূর্ত
রাজপুত যুবক সরলা বন্যমেয়েটিকে
কলিকাতা দেখাইবার লোভ
দেখাইয়া ভুলাইয়া লইয়া যাইবে।
আমি জানি এ অবস্থায় এদেশের
মেয়েদের শেষ পরিণতি হয়
আসামের চা-বাগানে
কুলিগিরিতে। মঞ্চীর অদৃষ্টে কি
শেষকালে নির্বান্ধব আসামের
পার্বত্য অঞ্চলে দাসত্ব ও নির্বাসন
লেখা আছে?
বৃদ্ধ নক্ছেদীর উপর খুব রাগ হইল। এই
লোকটা যত নষ্টের মূল। বৃদ্ধ বয়সে
মঞ্চীকে বিবাহ করিতে গিয়াছিল
কেন? দ্বিতীয়, গবর্নমেণ্টের
টিকাদারকে ঘুষ দিয়া বিদায়
করিয়াছিল কেন? যদি উহাকে জমি
দিই, সে ওর জন্য নয়, উহার প্রৌঢ়া
স্ত্রী তুলসী ও ছেলেমেয়েগুলির
মুখের দিকে চাহিয়াই দিব।
দিলামও তাই। নাঢ়া-বইহারে শীঘ্র
প্রজা বসাইতে হইবে, সদর আপিসের
হুকুম আসিয়াছে, প্রথম প্রজা
বসাইলাম নক্ছেদীকে।
নাঢ়া-বইহারে ঘোর জঙ্গল। মাত্র দু-
চার ঘর প্রজা সামান্য জঙ্গল
কাটিয়া খুপরি বাঁধিতে শুরু
করিয়াছে। নক্ছেদী প্রথমেই জঙ্গল
দেখিয়া পিছাইয়া গিয়াছিল,
বলিল-হুজুর দিনমানেই বাঘে খেয়ে
ফেলে দেবে ওখানে-কাচ্চাবাচ্চা
নিয়ে ঘর করি-
তাহাকে স্পষ্ট বলিয়া দিলাম, তার
পছন্দ না হয়, সে অন্যত্র দেখুক।
নিরুপায় হইয়া নক্ছেদী নাঢ়া-
বইহারের জঙ্গলেই জমি লইল।
৩
সে এখানে আসা পর্যন্ত আমি
কখনো তাহার খুপরিতে যাই নাই।
তবে সেদিন সন্ধ্যার সময় নাঢ়া
বইহারের জঙ্গলের মধ্যে দিয়া
আসিতে দেখি ঘন জঙ্গলের মধ্যে
খানিকটা ফাঁকা জায়গা-নিকটে
কাশের দুটি ছোট খুপরি। একটার
ভিতর হইতে আলো বাহির হইতেছে।
সেইটাই যে নক্ছেদীর তা আমি
জানিতাম না, ঘোড়ার পায়ের শব্দ
শুনিয়া যে প্রৌঢ়া স্ত্রীলোকটি
খুপরির বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল-
দেখিলাম সে তুলসী।
- তোমরা এখানে জমি নিয়েছ?
নক্ছেদী কোথায়?
তুলসী আমায় দেখিয়া থতমত খাইয়া
গিয়াছে। ব্যস্তসমস্ত হইয়া সে গমের
ভুসি-ভরা একটা চটের গদি পাতিয়া
দিয়া বলিল-নামুন বাবুজী- বসুন একটু।
ও গিয়েছে লবটুলিয়া, তেল নুন কিনে
আনতে দোকানে। বড় ছেলেকে
সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে।
- তুমি একা এই ঘন বনের মধ্যে আছ?
- ও-সব সয়ে গিয়েছে, বাবুজী। ভয়ডর
করলে কি আমাদের গরিবদের চলে?
একা তো থাকতে হত না-কিন্তু অদৃষ্ট
যে খারাপ। মঞ্চী যত দিন ছিল,
জলে জঙ্গলে কোথাও ভয় ছিল না।
কি সাহস, কি তেজ ছিল তার
বাবুজী!
তুলসী তাহার তরুণী সপত্নীকে
ভালবাসিত। তুলসী ইহাও জানে এই
বাঙালি বাবু মঞ্চীর কথা শুনিতে
পাইলে খুশি হইবে।
তুলসীর মেয়ে সুরতিয়া বলিল-
বাবুজী, একটা নীলগাইয়ের বাচ্চা
ধরে রেখেছি, দেখবেন? সেদিন
আমাদের খুপরির পেছনের জঙ্গলে
এসে বিকেলবেলা খস্খস্ করছিল-
আমি আর ছনিয়া গিয়ে ধরে
ফেলেছি। বড় ভালো বাচ্চা।
বলিলাম-কি খায় রে?
সুরতিয়া বলিল-শুধু চীনার দানার
ভুসি আর গাছের কচি পাতা। আমি
কচি কেঁদ পাতা তুলে এনে দিই।
তুলসী বলিল-দেখা না বাবুজীকে-
সুরতিয়া ক্ষিপ্রপদে হরিণীর মতো
ছুটিয়া খুপরির পিছন দিকে অদৃশ্য
হইল। একটু পরে তাহার বালিকা-
কণ্ঠের চিৎকার শোনা গেল-আরে
নীলগাইয়া তো ভাগলুয়া হৈ রে
ছনিয়া-উধার-ইধার-জলদি পাকড়া-
দুই বোনে হুটাপুটি করিয়া
নীলগাইয়ের বাচ্চা পাকড়াও
করিয়া ফেলিল এবং হাঁপাইতে
হাঁপাইতে হাসিমুখে আমার সামনে
আনিয়া হাজির করিল।
অন্ধকারে আমার দেখিবার সুবিধার
জন্য তুলসী একখানা জ্বলন্ত কাঠ উঁচু
করিয়া ধরিল। সুরতিয়া বলিল, কেমন,
ভালো না বাবুজী? একে খাবার
জন্যে কাল রাত্রে ভালুক এসেছিল।
ওই মহুয়া গাছে কাল ভালুক উঠেছিল
মহুয়া ফুল খেতে-তখন অনেক রাত-
বাপ মা ঘুমোয়, আমি সব টের পাই-
তারপর গাছ থেকে নেমে আমাদের
খুপরির পেছনে এসে দাঁড়াল। আমি
একে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে শুই
রাতে-ভালুকের পায়ের শব্দ পেয়ে
ওর মুখ হাত দিয়ে জোর করে চেপে
আরো জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলুম-
-ভয় করল না তোর, সুরতিয়া ?
-ইস্! ভয় বই কি! ভয় আমি করি নে।
কাঠ কুড় ুতে গিয়ে জঙ্গলে কত
ভালুক-ঝোড় দেখি-তাতেও ভয় করি
নে। ভয় করলে চলে বাবুজী?
সুরতিয়া বিজ্ঞের মতো মুখখানা
করিল।
বড় বড় কলের চিমনির মতো লম্বা,
কালো কেঁদ গাছের গুঁড়ি ঠেলিয়া
আকাশে উঠিয়াছে খুপরির
চারিধারে, যেন কালিফোর্নিয়া
রেডউড গাছের জঙ্গল। বাদুড় ও
নিশাচর কাঁকপাখির ডানা-ঝটাপটি
ডালে ডালে, ঝোপে ঝোপে
অন্ধকারে জোনাকির ঝাঁক
জ্বলিতেছে, খুপরির পিছনের বনেই
শিয়াল ডাকিতেছে-এই কয়টি ছোট
ছেলেমেয়ে লইয়া উহাদের মা যে
কেমন করিয়া এই নির্জন বনে-
প্রান্তরে থাকে, তাহা বুঝিয়া ওঠা
কঠিন। হে বিজ্ঞ, রহস্যময় অরণ্য,
আশ্রিত জনের প্রতি তোমার সত্যই
বড় কৃপা।
কথায় কথায় বলিলাম-মঞ্চী নিজের
জিনিস সব নিয়ে গিয়েছে?
সুরতিয়া বলিল-ছোট মা কোনো
জিনিস নিয়ে যায় নি। ওর যে
বাক্সটা সেবার দেখেছিলেন-
ফেলেই রেখে গিয়েছে। দেখবেন?
আনছি। বাক্সটা আনিয়া সে আমার
সামনে খুলিল। চিরুনি, ছোট আয়না,
পুঁতির মালা, একখানা সবুজ-রঙের
খেলো রুমাল-ঠিক যেন ছোট খুকির
পুতুলখেলার বাক্স! সেই হিংলাজের
মালাছড়াটা কিন্তু নাই, সেবার
লবটুলিয়া খামারে সেই যেটা
কিনিয়াছিল।
কোথায় চলিয়া গেল নিজের ঘর-
সংসার ছাড়িয়া কে বলিবে?
ইহারা তো জমি লইয়া এতদিন পরে
গৃহস্থালি পাতাইয়া বসবাস শুরু
করিয়াছে, ইহাদের দলের মধ্যে সে-
ই কেবল যে-ভবঘুরেই রহিয়া গেল!
ঘোড়ায় উঠিবার সময় সুরতিয়া
বলিল-আর একদিন আসবেন বাবুজী-
আমরা পাখি ধরি ফাঁদ পেতে। নূতন
ফাঁদ বুনেছি। একটা ডাহুক আর একটা
গুড়গুড়ি পাখি পুষেছি। এরা ডাকলে
বনের পাখি এসে ফাঁদে পড়ে-আজ
আর বেলা নেই-নইলে ধরে
দেখাতাম-
নাঢ়া-বইহারের বন-প্রান্তরের পথে
এত রাত্রে আসিতে ভয় ভয় করে।
বাঁয়ে ছোট একটি পাহাড়ি ঝরনার
জলস্রোত কুলকুল করিয়া বহিতেছে,
কোথায় কি বনের ফুল ফুটিয়াছে,
গন্ধে ভরা অন্ধকার এক-এক জায়গায়
এত নিবিড় যে ঘোড়ার ঘাড়ের লোম
দেখা যায় না, আবার কোথাও
নক্ষত্রালোকে পাতলা।
নাঢ়া বইহার নানাপ্রকার বৃক্ষলতা,
বন্যজন্তু ও পাখিদের আশ্রয়স্থান-
প্রকৃতি ইহার বনভূমি ও প্রান্তরকে
অজস্র সম্পদে সাজাইয়াছে, সরস্বতী
কুণ্ডী এই নাঢ়া-বইহারেরই উত্তর
সীমানায়। প্রাচীন জরিপের থাক-
নক্সায় দেখা যায় সেখানে কুশী
নদীর প্রাচীন খাত ছিল-এখন
মজিয়া মাত্র ঐ জলটুকু অবশিষ্ট
আছে- অন্যদিকে সেই প্রাচীন খাতই
ঘন অরণ্যে পরিণত-
পুরা যত্র স্রোতঃ পুলিনমধুনা তত্র
সরিতাম-
কি অবর্ণনীয় শোভা দেখিলাম এই
বনভূমির সেই নিস্তব্ধ অন্ধকার
রাত্রে! কিন্তু মন খারাপ হইয়া গেল
যখন বেশ বুঝিলাম নাঢ়া-বইহারের এ
বন আর বেশি দিন নয়। এত ভালবাসি
ইহাকে অথচ আমার হাতেই ইহা
বিনষ্ট হইল। দু-বৎসরের মধ্যেই সমগ্র
মহালটি প্রজাবিলি হইয়া কুশ্রী
টোলা ও নোংরা বস্তিতে ছাইয়া
ফেলিল বলিয়া। প্রকৃতি নিজের
হাতে সাজানো তার শত বৎসরের
সাধনার ফল এই নাঢ়া-বইহার, ইহার
অতুলনীয় বন্য সৌন্দর্য ও দূরবিসর্পী
প্রান্তর লইয়া বেমালুম অন্তর্হিত
হইবে। অথচ কি পাওয়া যাইবে
তাহার বদলে?
কতকগুলি খোলার চালের বিশ্রী ঘর,
গোয়াল, মকাই জনারের ক্ষেত,
শোনের গাদা, দড়ির চারপাই,
হনুমানজীর ধ্বজা, ফনিমনসার গাছ,
যথেষ্ট দোক্তা, যথেষ্ট খৈনী,
যথেষ্ট কলেরা ও বসন্তের মড়ক।
হে অরণ্য, হে সুপ্রাচীন, আমায়
ক্ষমা করিও।
আর একদিন গেলাম সুরতিয়াদের
পাখি-ধরা দেখিতে।
সুরতিয়া ও ছনিয়া দুটি খাঁচা লইয়া
আমার সঙ্গে নাঢ়া-বইহারের
জঙ্গলের বাহিরে মুক্ত প্রান্তরের
দিকে চলিল।
বৈকালবেলা, নাঢ়া-বইহারের মাঠে
সুদীর্ঘ ছায়া ফেলিয়া সূর্য
পাহাড়ের আড়ালে নামিয়া
পড়িয়াছে।
একটা শিমুলচারার তলায় ঘাসের
উপর খাঁচা দুটি নামাইল। একটিতে
একটি বড় ডাহুক অন্যটিতে গুড়গুড়ি। এ
দুটি শিক্ষিত পাখি, বন্য পাখিকে
আকৃষ্ট করিবার জন্য ডাহুকটি অমনি
ডাকিতে আরম্ভ করিল।
গুড়গুড়িটা প্রথমত ডাকে নাই।
সুরতিয়া শিস্ দিয়া তুড়ি দিয়া
বলিল-বোলো রে বহিনিয়া-তোহর
কির-
গুড়গুড়ি অমনি ডাকিয়া উঠিল-গুড়-ড়-
ড়-ড়-
নিস্তব্ধ অপরাহে¦ বিস্তীর্ণ মাঠের
নির্জনতার মধ্যে সে অদ্ভুত সুর শুধুই
মনে আনিয়ে দেয় এমনি
দিগন্তবিস্তীর্ণতার ছবি, এমনি
মুক্ত দিক্চক্রবালের স্বপ্ন,
ছায়াহীন জ্যোৎস্নালোক নিকটেই
ঘাসের মধ্যে যেখানে রাশি রাশি
হলুদ রঙের দুধলি ফুল ফুটিয়াছে তারই
উপর ছনিয়া ফাঁদ পাতিল-যেন
পাখির খাঁচার বেড়ার মতো, বাঁশের
তৈরি। সেই বেড়া ক’খানা দিয়া
গুড়গুড়ি-পাখির খাঁচাটা ঢাকিয়া
দিল।
সুরতিয়া বলিল-চলুন বাবুজী, লুকিয়ে
বসি গে ঝোপের আড়ালে, মানুষ
দেখলে চিড়িয়া ভাগবে।-সবাই
মিলিয়া আমরা শাল-চারার
আড়ালে কতক্ষণ ঘাপটি মারিয়া
বসিয়া রহিলাম।-
ডাহুকটি মাঝে মাঝে থামিতেছে-
গুড়গুড়ির কিন্তু রবের বিরাম নাই-
একটানা ডাকিয়াই চলিয়াছে- গুড়-ড়-
ড়-ড়-
সে কি মধুর অপার্থিব রব! বলিলাম-
সুরতিয়া, তোদের গুড়গুড়িটা বিক্রি
করবি? কত দাম?
সুরতিয়া বলিল-চুপ চুপ বাবুজী, কথা
বলবেন না-ঐ শুনুন বুনো পাখি
আসছে-
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিবার পরে
অন্য একটি সুর মাঠের উত্তর দিকে
বন-প্রান্তর হইতে ভাসিয়া আসিল-
গুড়-ড়-ড়-ড়।
আমার শরীর শিহরিয়া উঠিল। বনের
পাখি খাঁচার পাখির সুরে সাড়া
দিয়েছে।
ক্রমে সে সুর খাঁচার নিকটবর্তী
হইতে লাগিল।
কিছুক্ষণ ধরিয়া দুইটি পাখির রব
পাশাপাশি শোনা যাইতেছিল,
ক্রমে দুইটি সুর যেন মিশিয়া এক
হইয়া গেল…হঠাৎ আবার একটা সুর…
একটা পাখিই ডাকিতেছে…খাঁচার
পাখিটা।
ছনিয়া ও সুরতিয়া ছুটিয়া গেল,
ফাঁদে পাখি পড়িয়াছে। আমিও
ছুটিয়া গেলাম।
ফাঁদে পা বাঁধাইয়া পাখিটা ঝট্পট্
করিতেছে। ফাঁদে পড়িবার সঙ্গে
সঙ্গে তাহার ডাক বন্ধ হইয়া
গিয়াছে-কি আশ্চর্য কাণ্ড! চোখকে
যেন বিশ্বাস করা শক্ত।
সুরতিয়া পাখিটা হাতে তুলিয়া
দেখাইল-দেখুন বাবুজী, কেমন ফাঁদে
পা আটকেছে। দেখলেন?
সুরতিয়াকে বলিলাম-পাখি তোরা
কি করিস!
সে বলিল-বাবা তিরাশি-
রতনগঞ্জের হাটে বিক্রি করে
আসে। এক একটা গুড়গুড়ি দু’পয়সা-
একটা ডাহুক সাত পয়সা।
বলিলাম-আমাকে বিক্রি কর, দাম
দেব।
সুরতিয়া গুড়গুড়িটা আমায় এমনি
দিয়া দিল-কিছুতেই তাহাকে পয়সা
লওয়াইতে পারিলাম না।
৪
আশ্বিন মাস। এই সময় একদিন
সকালে পত্র পাইলাম রাজা দোবরু
পান্না মারা গিয়াছেন, এবং
রাজপরিবার খুব বিপন্ন-আমি সময়
পাইলে যেন যাই। পত্র দিয়াছে জগরু
পান্না, ভানুমতীর দাদা।
তখনি রওনা হইয়া সন্ধ্যার কিছু
পূর্বে চক্মকিটোলা পৌঁছিয়া
গেলাম। রাজার বড় ছেলে ও নাতি
আমাকে আগাইয়া লইয়া গেল।
শুনিলাম, রাজা দোবরু গোরু চরাইতে
চরাইতে হঠাৎ পড়িয়া গিয়া হাঁটুতে
আঘাতপ্রাপ্ত হন, শেষ পর্যন্ত হাঁটুর
সেই আঘাতেই তাঁর মৃত্যুর কারণ
ঘটে।
রাজার মৃত্যুসংবাদ পাওয়া মাত্র
মহাজন আসিয়া গোরু-মহিষ বাঁধিয়া
রাখিয়াছে। টাকা না পাইলে সে
গোরু-মহিষ ছাড়িবে না। এদিকে
বিপদের উপর বিপদ, নূতন রাজার
অভিষেক-উৎসব আগামীকল্য সম্পন্ন
হইবে। তাহাতেও কিছু খরচ আছে।
কিন্তু সে-টাকা কোথায়? তা ছাড়া
গোরু-মহিষ মহাজনে যদি লইয়া যায়,
তবে রাজপরিবারের অবস্থা খুবই
হীন হইয়া পড়িবে-ঐ দুধের ঘি
বিক্রয় করিয়া রাজার সংসারের
অর্ধেক খরচ চলিত-এখন তাহাদের না
খাইয়া মরিতে হইবে।
শুনিয়া আমি মহাজনকে
ডাকাইলাম। তার নাম বীরবর সিং।
আমার কোনো কথাই সে দেখিলাম
শুনিতে প্রস্তুত নয়। টাকা না
পাইলে কিছুতেই সে গোরু-মহিষ
ছাড়িবে না। লোকটা ভালো নয়
দেখিলাম।
ভানুমতী আসিয়া কাঁদিতে লাগিল।
সে তাহার জ্যাঠামশায় অর্থাৎ
প্রপিতামহকে বড়ই ভালবাসিত-
জ্যাঠামশায় থাকিতে তাহারা
যেন পাহাড়ের আড়ালে ছিল,
যেমনি তিনি চোখ বুজিয়াছেন, আর
অমনি এইসব গোলমাল! এইসব কথা
বলিতে বলিতে ভানুমতীর চোখের
জল কিছুতেই থামে না। বলিল-চলুন
বাবুজী, আমার সঙ্গে-
জ্যাঠামশায়ের গোর আপনাকে
দেখিয়ে আনি পাহাড়ের উপর
থেকে। আমার কিছু ভালো লাগছে
না বাবুজী, কেবল ইচ্ছে হচ্ছে ওঁর
কবরের কাছে বসে থাকি।
বলিলাম-দাঁড়াও, মহাজনের একটা
কি ব্যবস্থা করা যায় দেখি। তারপর
যাব-কিন্তু মহাজনের কোনো
ব্যবস্থা করা আপাতত সম্ভব হইল না।
দুর্দান্ত রাজপুত মহাজন কারো
অনুরোধ উপরোধ শুনিবার পাত্র নয়।
তবে সামান্য একটু খাতির করিয়া
আপাতত গোরু-মহিষগুলি এখানেই
বাঁধিয়া রাখিতে সম্মত হইল মাত্র,
তবে দুধ এক ফোঁটাও লইতে দিবে না।
মাস দুই পরে এ দেনা শোধার উপায়
হইয়াছিল-সেকথা এখন নয়।
ভানুমতী দেখি একা ওদের বাড়ির
সামনে দাঁড়াইয়া। বলিল- বিকেল
হয়ে গিয়েছে, এর পর যাওয়া যাবে
না, চলুন কবর দেখতে।
ভানুমতী একা যে আমার সঙ্গে
পাহাড়ে চলিল ইহাতে বুঝিলাম
সরলা পর্বতবালা এখন আমাকে
তাহার পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও
পরমাত্মীয় মনে করে। এই পাহাড়ি
বালিকার সরল ব্যবহার ও বন্ধুত্ব
আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে।
বৈকালের ছায়া নামিয়াছে সেই
বড় উপত্যকাটায়।
ভানুমতী বড় তড়বড় করিয়া চলে,
ত্রস্তা হরিণীর মতো। বলিলাম-
শোন ভানুমতী, একটু আস্তে চল,
এখানে শিউলিফুলের গাছ কোথায়
আছে?
ভানুমতীর দেশে শিউলিফুলের নাম
সম্পূর্ণ আলাদা। ঠিকমতো তাহাকে
বুঝাইতে পারিলাম না। পাহাড়ের
উপরে উঠিতে উঠিতে অনেক দূর
পর্যন্ত দেখা যাইতেছিল। নীল
ধন্ঝরি শৈলমালা ভানুমতীদের
দেশকে, রাজ্যহীন রাজা দোবরু
পান্নার রাজ্যকে মেখলাকারে
ঘেরিয়া আছে, বহুদূর হইতে হু-হু
খোলা হাওয়া বহিয়া আসিতেছে।
ভানুমতী চলিতে চলিতে থামিয়া
আমার দিকে চাহিয়া বলিল-
বাবুজী, উঠতে কষ্ট হচ্ছে?
-কিছু না। একটু আস্তে চল কেবল-কষ্ট
কি।
আর খানিকটা চলিয়া সে বলিল-
জ্যাঠামশাই চলে গেল, সংসারে
আমার আর কেউ রইল না, বাবুজী-
ভানুমতী ছেলেমানুষের মতো কাঁদ-
কাঁদ হইয়া কথাটা বলিল।
উহার কথা শুনিয়া আমার হাসি
পাইল। বৃদ্ধ প্রপিতামহই না হয় মারা
গিয়াছে, মাও নাই, নতুবা উহার
বাবা, ভাই, ঠাকুরমা, ঠাকুরদা সবাই
বাঁচিয়া, চারিদিকে জাজ্বল্যমান
সংসার। হাজার হোক, ভানুমতী
স্ত্রীলোক এবং বালিকা, পুরুষের
একটু সহানুভূতি আকর্ষণ করিবার ও
মেয়েলি আদর-কাড়ানোর প্রবৃত্তি
তার পক্ষে স্বাভাবিক।
ভানুমতী বলিল-আপনি মাঝে মাঝে
আসবেন বাবুজী, আমাদের
দেখাশুনো করবেন-ভুলে যাবেন না
বলুন-
নারী সব জায়গায় সব অবস্থাতেই
সমান। বন্য বালিকা ভানুমতীও সেই
একই ধাতুতে গড়া!
বলিলাম-কেন ভুলে যাব? মাঝে
মাঝে আসব নিশ্চয়ই-
ভানুমতী কেমন একরকম অভিমানের
সুরে ঠোঁট ফুলাইয়া বলিল- হাঁ,
বাংলা দেশে গেলে, কলকাতা
শহরে গেলে আপনার আবার মনে
থাকবে এ পাহাড়ে জংলী দেশের
কথা-একটু থামিয়া বলিল-আমাদের
কথা-আমার কথা-
স্নেহের সুরে বলিলাম-কেন, মনে
ছিল না ভানুমতী? আয়নাখানা পাও
নি? মনে ছিল কি ছিল না ভাব-
ভানুমতী উজ্জ্বল মুখে বলিল- উঃ
বাবুজী, বড় চমৎকার আয়না-সত্যি,
সে-কথা আপনাকে জানাতে ভুলেই
গিয়েছি!
সমাধিস্থানের সেই বটগাছের তলায়
যখন গিয়া দাঁড়াইলাম, তখন বেলা
নাই বলিলেও হয়, দূর পাহাড়শ্রেণীর
আড়ালে সূর্য লাল হইয়া ঢলিয়া
পড়িতেছে, কখন ক্ষীণাঙ্গ চাঁদ
উঠিয়া বটতলায় অপরাহে¦র এই
ঘনছায়া ও সম্মুখবর্তী প্রদোষের
গভীর অন্ধকার দূর করিবে, স্থানটি
যেন তাহারই স্তব্ধ প্রতীক্ষায়
নীরবে দাঁড়াইয়া আছে।
ভানুমতীকে কিছু বনের ফুল কুড়াইয়া
আনিতে বলিলাম, উহার
ঠাকুরদাদার কবরের পাথরে
ছড়াইবার জন্য। সমাধির উপর ফুল-
ছড়ানো-প্রথা এদের দেশে জানা
নাই, আমার উৎসাহে সে নিকটের
একটা বুনো শিউলি গাছের তলা
হইতে কিছু ফুল সংগ্রহ করিয়া
আনিল। তাহার পর ভানুমতী ও আমি
দুজনেই ফুল ছড়াইয়া দিলাম রাজা
দোবরু পান্নার সমাধির উপরে।
ঠিক সেই সময় ডানা ঝট্পট্ করিয়া
একদল সিল্লী ডাকিতে ডাকিতে
উড়িয়া গেল বটগাছটার মগডাল
হইতে-যেন ভানুমতী ও রাজা দোবরুর
সমস্ত অবহেলিত অত্যাচারিত
প্রাচীন পূর্বপুরুষগণ আমার কাজে
তৃপ্তিলাভ করিয়া সমস্বরে বলিয়া
উঠিলেন-সাধু! সাধু! কারণ
আর্যজাতির বংশধরের এই বোধ হয়
প্রথম সম্মান অনার্য রাজ-সমাধির
উদ্দেশে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now