বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আরেকটি প্রেমের গল্প
- মাহফুজ মোর্শেদ
অনেকক্ষন ধরেই জ্যামে আটকা পড়ে আছে বাস। বাইরে রোদ ঠা ঠা করছে। প্রেসার কুকারে ভাত চড়ানোর মতো সিদ্ধ হচ্ছে বাসে বসা যাত্রীরা। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে নীলা। উদাসীভাব। মাঝে মাঝে হালকা উত্তপ্ত বাতাস ছুয়ে যাচ্ছে তাকে। একগোছা চুল উড়ছে তাতে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আনমনে মাঝে মাঝে টিস্যু দিয়ে মুঝছে তা।
এদিকে বাসের ভেতরে যেনো মাছের বাজার বসে গেছে। নীলার কাছে মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে যেনো সে বসে আছে এই বাসের মধ্যে। আজকাল হকারগুলোও বড্ড বেশী বেয়ারা হয়ে উঠেছে। একবার না করে দিলেও কানের কাছে গুন গুন করতে থাকে।
যেমন একটু আগেই এক চব্বিশ পচিঁশ বছরের আমড়াওয়ালা কি ঘ্যানর ঘ্যানরটাই না করলো। একবার না করে দিয়েছে নীলা যে সে আমড়া নিবে না তারপরও "আপা নেন না , নেন না। পাচ টাকায় দুইটা দিমু। " টাইপের কথা বলে নীলার মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। যখন একরাশ বিরক্তি নিয়ে নীলা তাকালো হকারের দিকে তখন এক ধরনের বিকৃত হাসি দিয়ে সরে গেলো সে। নীলা জানে এই হাসির মর্ম। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারের আনন্দ মিশে থাকা হাসি এটা। এটা চিরাচরিত পুরুষ মানুষের হাসি। তবে এই শ্রেনীর মানুষদের নীলা দোষ দেয় না।
সাইকোলজির স্টুডেন্ট নীলা ভালোভাবেই জানে দারিদ্যসীমার নীচে বাস করা এই মানুষগুলার মনোভাব। প্রেম ভালোবাসা এদের জীবনে অনেকটা মরীচিকার মতো। এই যে সারাদিন এই কাঠফাটা রোদে বাস থেকে বাসে ঘুরে গলা চড়িয়ে এরা হকারি করবে। দিনশেষে যখন বাড়ি ফিরবে তখন তার স্ত্রী হয়তোবা তার জন্য খাবার সাজিয়ে বসে থাকবে না। হয়তো বাজার করে না নিয়ে গেলে চুলোই জ্বলবে না ঘরে। কিংবা স্বামীর পাশাপাশি স্ত্রীও ব্যাস্ত থাকে কোন কাজে। তাই সন্ধ্যা
গড়িয়ে রাত নামলেও প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি দেখা দেয় না এদের। জৈবিক
চাহিদায় বিছানায় এক সাথে মুহুর্তগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র চাহিদাই প্রাধান্য
পায় , ভালোবাসা নয়। তাই বাসে , ট্রেনে , রাস্তায় একটু খুনসুটি করে নেয়
এরা। নীলা মোটেও বিরক্ত হয় না তাতে। সে জানে কার সাথে কেমন ব্যবহার করতে
হয়।
এরা নিম্নশ্রেণীর সুবিধাবঞ্চিত লোক। এদের অনেক কিছুতেই ছাড় দেয়া যায়।
দিতে হয়। কিন্তু অনেক লোক আছে ভদ্রবেশী জানোয়ার।
বেশীরভাগ সময়ই লোকাল বাসে যাতায়াত করতে হয় নীলাকে। তাই অনেক লোককেই দেখতে হয়। অনেক ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। বেশীরভাগই সুখকর ঘটনা নয়। যেমন কয়েকদিন আগেই বাসে করে ভার্সিটি যাচ্ছিলো নীলা। বাসে সীট ছিলো না কোথাও। মহিলা আর প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ সীট সুস্থ সবল সব পুরুষরা কব্জা করে রেখেছিল।
বাসের হ্যান্ডেল ধরে কোনোরকমে দাড়িয়ে ছিলো সে। পেছনে ছিলেন স্যুট টাই পড়া এক ভদ্রলোক। নীলার বাবার বয়সী প্রায়। বাস যখনই ব্রেক কষছিলো তখনই উনি নীলার গায়ের উপর এসে পড়ছিলেন। প্রথম প্রথম নীলা ভেবেছিলো বৃদ্ধ লোক হয়তো ব্যালান্স রাখতে পারছেন না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন নীলা বুঝলো যে উনি ইচ্ছে করেই ব্যালান্স ঠিক রাখছেন না তখন নীলারও আর ব্যালান্স ঠিক রাখতে মন চাইলো না। পায়ে পেন্সিল হিল ছিলো নীলার। মা গো বলে আর্তনাদ করে পেছনে ছিটকে পড়েছিলো বুড়ো। নীলা চোখে করুনা ফুটিয়ে বলেছিলো " সরি আঙ্কেল। "
মাঝে মাঝে প্রতিবাদী হতে হয়। নয়তো কেউ যদি বুঝে ফেলে মেরুদণ্ড নরম তবেই সেরেছে। এই সমাজের সবাই শক্তের ভক্ত নরমের যম।
একটু একটু করে কচ্ছপের মতো আগায় বাস। একটু সামনে গিয়েই ঠাস করে ব্রেক করে। বাসের ঘুমকাতুরে কুম্ভকর্ণরা যারা বাসে উঠার দুই মিনিটের মাথায়ই ঘুমিয়ে পড়তে পারে তারা ড্রাইভারের উপর হইহই করে উঠে।
ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখে নীলা। তার পাচটায় থাকার কথা পার্কে। এখন বাজে চারটা চল্লিশ। জ্যামের যে অবস্থা বিশ মিনিটে পৌছতে পারার মতো কোন সম্ভাবনাই নেই। পায়ে হেটে যাবারো কোন ইচ্ছা নেই নীলার। এই রোদে হাটার চাইতে বাসে বসে সিদ্ধ হওয়া ঢেড় ভালো।
হেডফোন কানে গুজে গান ছেড়ে দেয় নীলা। রবীন্দ্রসংগীত ফিউশান। " মন মোর মেঘের সঙ্গী। " উদাস চোখে আকাশপানে চায় নীলা। গ্রীস্মের আকাশে মেঘের ছিটেফোটাও নেই। তারপরও নীলার চোখে মেঘ খেলা করে। সেই মেঘ বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে নীলার গাল বেয়ে।
ক্লাসের সবচাইতে সুন্দরী মেয়ে ছিলো নীলা। অনেকটা চোখ ধাধানো সুন্দরী বলতে যা বোঝায়। সেই তুলনায় অনিক কিছুই ছিলো না। রোগা পাতলা গড়পড়তা লম্বা একটা ছেলে। মাথায় আলুথালু চুল। গালে দীর্ঘদিন ধরে না কাটা দাড়ি। আর কাধে সবসময় একটা গিটার।
ক্যাম্পাসের যেকোন গানের আড্ডাতেই তার দেখা মিলত। অনিকের বিশেষত্ব ছিলো তার গানে। গিটার দিয়ে তার মতো রবীন্দ্রসংগীত কেউ গাইতে পারতো না। যেকোন রবীন্দ্রসংগীতই তার গিটারে আর গলায় উঠলে যেন অন্যরকম প্রান পেত।
সুন্দরী মেয়েরা যেমন অহংকারী হয় তেমন বোকাও হয়। এদের প্রেমে পড়তে
বেশীক্ষন লাগে না। হয়তো কেউ হেসে দিলো চোখে চোখে তাকিয়ে। ব্যাস। একেবারে কুপোকাত।
গানের আসরে বসে ছিলো একদিন নীলা। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলো অনিকের দিকে। " মানুষ এতো সুন্দর করে গায় কিভাবে? " ভাবে মনে মনে সে। হঠাৎ চোখে চোখ পড়লো দুজনার। অনিকের চোখের গভীরতায় খেই হারিয়ে ফেলেছিলো নীলা। খড়কুটোর মতো সেদিন ভেসে গিয়েছিলো সব অহংকার। " তোমার চোখেই দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ " টাইপের কিছু একটা হয়েছিলো নীলার। সত্যিই ভয়ঙ্কর কিছু হয়েছিলো।
দিন গড়াতে লাগলো। শীত পেরিয়ে বসন্ত আসলো। বাতাসে বহমান প্রেমে গা ভাসিয়ে দিলো দুজনেই।
- ভালোবাসো?
- উহু।
- তবে?
- মায়া। সবই মায়া।
- তবে আমরা কি মায়ায় আছি?
- হয়তো। মায়া যতোদিন আছে ততোদিন একসাথে। যেদিন নেই সেদিন হয়তো আলাদা।
- যদি মরার আগ পর্যন্ত না কমে এই মায়া। তবে? ভালোবাসবে?
- ভালোবাসি।
- ছাই বাসো।
বাসের হর্নে চমকে উঠে নীলা। ওর গন্তব্য এসে গেছে। বাস থেকে নেমে ফুটপাত ধরে হাটতে থাকে সে। সামনেই পার্ক। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে নীলয়।
নীলয়ের সাথে নীলার পরিচয় ফেসবুকে। তাদের নামের মধ্যে অদ্ভুত মিল। তাই তারা প্রেম করে। যদিও নীলা জানে তাদের এই প্রেম দেহসর্বস্ব। ভালোবাসা নেই এখানে। এখানে আছে মায়া।
নীলয়ের বাসা থেকে ফিরে হসপিটালের দিকে যায় নীলা। আজ তার রুটিন চেকআপের দিন।
ক্যাম্পাসের শেষ দিনগুলোতে হটাৎ করেই গায়েব হয়ে যায় অনিক। যোগাযোগের কোন মাধ্যমই রেখে যায়নি যাবার আগে। অনিকের বাসাও চেনে না নীলা। তারা যে অন্তরঙ্গ মূহুর্তগুলো কাটিয়েছে সেটাও হয় নীলার বাসায় নয়তো অনিকের কোন বন্ধুর বাসায়। অনিকের কোন বন্ধুর কাছ থেকেও কোন ধরনের সহায়তা পেলো না নীলা। কেউই জানে না অনিকের সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম।
হটাৎ একদিন খবর এলো নীলার কাছে হাসপাতালে ভর্তি অনিক। পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিল নীলা সেদিন। বুকের মধ্যে জমা বরফ খন্ড পানি হয়ে নেমে এসেছিলো চোখ বেয়ে। অনিককে চেনার কোন উপায় ছিলো না। দূর থেকে দেখে নীলা ভেবেছিলো বিছানায় একটা কঙ্কাল শুইয়ে রাখা হয়েছে। ইশারায় কাছে এসে বসার অনুরোধ করেছিল অনিক নীলাকে। হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো এক টুকরো কাগজ।
" সরি নীলা। তোমার প্রতি আমার সবটাই ছিলো মায়া। কখনো ভালোবাসতে পারিনি। মরে যাওয়ার আগেও পারলাম না। ভালো থেকো। "
প্রানঘাতী এইচ আই ভি এইডস বাসা বেধেছিলো অনিকের শরীরে। তাতেই তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছিলো অনিক। মেডিকেল টেস্টে নীলার শরীরেও দেখা দিল এই মরন ভাইরাস। এক নিমিষেই ধূসর হয়ে গেলো নীলার রঙ্গিন পৃথিবী।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে বাসায় ফিরতে রাত হয়ে গেলো নীলার। মাথাটা কয়েকদিন ধরেই প্রচন্ড যন্ত্রনা করছিলো। সেটার জন্য কয়েকটা টেস্ট করিয়েছিলো।
রেজাল্ট হাতে নিয়ে বাসায় ফিরেছে। ব্রেইন টিউমার। লাস্ট স্টেইজ। হটাৎ
পৃথিবীটার প্রতি বড্ড বেশী টান অনুভব করে নীলা। নীলা জানে এর সবই মায়া। মানুষ মায়ার দাস। আজকে এই পৃথিবীর মায়া অনুভব করছে। কাল হয়তো পরপারের সেই অদেখা পৃথিবীর জন্য মায়া অনুভব করবে। মায়া নামক জিনিসটা সত্যিই ভয়ঙ্কর।অথচ বিধাতা এই মায়াটাই বেশী বেশী করে ভরে দিয়েছেন মানুষের মধ্যে। মায়াময় নির্মমতা।
মিউজিক সিস্টেমে গান ছাড়ে নীলা। জানালার পাশে বসে গিয়ে। আকাশে মেঘ করেছে। আষাঢ় মাসের শুরু আজ হতেই। কানে ভেসে আসছে রুপঙ্কর বাগচীর গাওয়া গান। "চিরসখা হে , ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না …………"
✔ ভাল লাগলে ১ হলেও রেটিং দিন এতে করে অন্যরাও গল্পটা পরতে উৎসাহীত হবে ✔
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now