বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আরেকটা রোদের দিনের অপেক্ষায়

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আরেকটা রোদের দিনের অপেক্ষায় ------------------------------ আমার জন্ম হল দু হাজার তের সালে এসে। তেইশ বছর বয়সে। কুসুম কুসুম হলুদরঙা এক বিকেলে আমি জানতে পারলাম এতদিন আমার জন্ম ভুল ছিল। সকাল সাড়ে আটটা থেকে বিকেল পর্যন্ত ক্লাস করা, টিউশনি করা, বাসায় ফিরে পড়তে বসা আর রাত বারটার পর শোয়েবকে ফোন করে ঘন্টা দেড়েক গল্প করে ঘুমিয়ে পড়া রুটিনটা ভুল ছিল। ভালো সিজিপিএ নিয়ে পাশ করে চাকরিতে ঢুকে যাব, তারপর শোয়েবকে বলব বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাও, এরপর চলে যাব ওর সাথে লাল-নীল সংসার করতে এই পরিকল্পনাও সঠিক ছিল না। ব্যাপারটা অদ্ভুত। তেইশ বছরের এক তরুণী এ দেশের ব্যস্ততম এক শহরে দিব্যি দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক ছিল, পড়ালেখা, প্রেম, চাকরি এরপর বিয়ে। ব্যস আর কি চাই? কিন্তু সব হয়ে গেলো এলোমেলো, মেলোএলো। আমার মনে হল আমার জীবনের গন্তব্যের অনেকটুকু পর এগিয়ে এসে মাঝপথে আমি থমকে গিয়েছি। আমি ভুলে গিয়েছি আমার কোথায় যাওয়ার কথা ছিল। আমি কোথা থেকে এসেছি। আমার শুধু মনে আছে আমি খুব দ্রুত কোন একটা গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। খুব খুব তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে থমকে গেলাম। আমাকে থমকে দিলো একটা হলুদ ফুল। যে ফুলের সাতটা পাপড়ি, ফুলের বুকটুকু গাঢ় খয়েরি। সেই বুকের দিকে তাকালে মন ডুবডুব করে ওঠে। আমি সেই ফুল দেখে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লাম। দুহাতে আলতো করে ফুলটা নিলাম তারপর আমি বুঝতে পারলাম, সবকিছু ভুল ছিল। ক্লাসে গেলাম না অনেক দিন, টিউশনিটা ছুটে গেল। ছাত্রের মা ফোন করে যাচ্ছেতাই কথা শুনালো। আমি সেই কথাগুলোর কোন মর্মাথই বের করতে পারলাম না। শোয়েবের সাথে রাতে কথা বলার সময় কেন যেন কী খেলে? কখন বাসায় এলে? কাল কী কাজ? এমনসব চিরচারিত কথাগুলো বলতে পারলাম না। ও একাই বকবক করে গেলো। গুড নাইট বলার আগে ফোনে কিছু শুকনা চুম্বন দিল। আমি চুপ করে থাকলাম। সপ্তাহখানেক পর আমাকে দীপ্তি ফোন করল। -হইসে কী তোমার? -ভুল ছিল। -আরে কী ভুল ছিল? বলবা তো? গায়েব ক্যান তুমি? -থাকাটাই ভুল ছিল না। না থাকাটাই আসলে ঠিক… -তুমি ঠিক আছ? শোয়েবের সাথে কিছু হইসে নাকি? আমি চুপ করে থাকি। ফোনের ওপাশ থেকে দীপ্তি অস্থির হয়ে প্রশ্ন করতে থাকে। আমি কিছুই বলতে পারি না। দীপ্তির অস্তিরতা অসহিষ্ণুতায় রূপ নেয়। আমি মূক ও বধির হয়ে থাকি। আমার চোখের তারায় কাঁপে একটা হলুদ ফুল, যে ফুলের বুকে আছে খয়েরি ভ্রমর। রাতে শোয়েব ফোনে নানা কথা বলে, ওর বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাবার কথা, অফিসের কথা, কাজের চাপের কথা, ব্যস্ততার কথা, নতুন দেখা সিনেমার কথা, কলকাতা কাচ্চির প্লেটের দাম বেড়ে যাবার কথা আরও কত কী। আমি হাতে মুঠোফোন ধরে, কানে নীল ইয়ারফোন গুঁজে আমার ঘরের উঁচু খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে থাকি। দু পা নাচাই তালে তালে। যেন অনেক বড় এক সবুজ মাঠে আছে একটা বিশাল গাছ। সেই গাছে কেউ অলংকারের মত সাজিয়ে গেছে একটা কাঠের দোলনা। সেই দোলনায় বসে আমি দু পা নাচিয়ে দুলছি। এই আগাচ্ছি, এই পিছাচ্ছি, এই তো আবার শূন্যে ভাসছি। কথা বলতে বলতে এক সময় শোয়েব বলে, কী ব্যাপার, আজকাল এত কম কথা বলো কেন তুমি? বোরিং হয়ে যাচ্ছ কেমন যেন। আমি একটা লম্বা নিঃশ্বাস গোপন করে বলি, হু। ও বলে- ঘুমিয়ে যাই। সকালে উঠতে হবে। বাই। তারপর লাইন কেটে দেয়। আমি দীর্ঘ সময় মুঠোফোন হাতে নিয়ে দোলনায় দোল খাই। তারপর খুব যত্ন করে ঘুমাতে যাই। বিছানায় লম্বা করে শুয়ে গায়ে টেনে দেই পাতলা চাদর। তারপর আলতো করে বন্ধ করি চোখ। বুঝতে পারি আমার ঘরের দরজা গলে সমুদ্রের নীল জল আসছে কূলকুল করে। জানালা দিয়ে আসছে হিমহিম ঠাণ্ডা বাতাস। আমার সারা ঘর জলের গানে ভরে উঠে। জলে ছেয়ে যায় আমার ঘরের সব আসবাবপত্র। আমিও ডুবতে থাকি আর ডুবতে থাকি। আমার পায়ের পাতা ডুবে যায়, এরপর কোমর, এরপর বুক ছাপিয়ে জল চলে আসে চোখের পাতায়। তলিয়ে যাই আমি। অতল জলে আমি ঘুরপাক খেতে থাকি। এই জল অনেক মসৃণ, অনেক নরম। আমার চোখের কোণ গড়িয়ে অশ্রু গড়ায়। ফুসফুস নিঃশ্বাসের জন্য আঁকুপাঁকু করে, কিন্তু আমার মন ভিজে থাকে জলে। আমি একদিন বাসা থেকে বের হয়ে বাস নিতে ভুলে যাই। তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই ফুলার রোডে। প্রচণ্ড রোদের মাঝে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি অনেকক্ষণ। আমার মনে পরে আমি কখনও সমুদ্র দেখি নি, দেখি নি চাতক পাখি। আমি নিঝুম রাতের ঢাকা দেখি নি। সবুজ অরণ্যে বৃষ্টি হলে আকাশ দেখতে কেমন লাগে আমার জানা নেই। আমি জানি না পৃথিবীতে কত রঙের বাগানবিলাস আছে? আমি মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাই। আমার মনে হয় আমার খুব বড় কোন অসুখ হয়েছে। যে অসুখের কোন চিকিৎসা নেই। আমার অন্তর্স্থল থেকে একটা মনমরা শ্যাওলা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে। আমি আজকাল সবার কাছ থেকে লুকিয়ে থাকি। যেন আমি একটা শামুক কিংবা একটা বেড়াল ছানা। আমি কোথাও গেলেই আমাকে সবাই দেখে ফেলবে। আমি ঘরের ভেতর দোলনায় বসে থাকি। রাতে ঘুমানোর সময় আমার ঘরে সমুদ্রের জল আসে। আমি ডুবে যাই। শোয়েব আমাকে নিয়ে বিরক্ত, দীপ্তি আমাকে নিয়ে চিন্তিত। আমার বাসার সবাই আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। শুধু আমি নির্ভার। আমি আড়াল থাকলেও এমনভাবে থাকি যেন আমি একদম ঠিক আছি। আমি খুব স্বাভাবিক। আজকাল আমার মাঝে মাঝে খুব চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে। আমাদের পাঁচ বছরের সম্পর্কে আমাকে শোয়েব কখনো কোনো চিঠি লিখে নি। আমিও ওকে লিখি নি। আমার কাছে পড়ার মত চিঠি নেই। আমি চিঠি লিখলেও আমাকে চিঠির কোন প্রাপক নেই। আমার জীবন যদি কোন গল্প হয় তো সেই গল্পের খুব সাদামাটা আর বিরক্তিকর একটি চরিত্র আমি। যে চরিত্রটির কোন নির্দিষ্ট ভূমিকা নেই। যে শুধু জানে তার জন্ম ভুল ছিল, এখন তার জন্ম তো হয়েছে কিন্তু তার কী করণীয় তা সে জানে না। এইদিন খুব ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে উত্তরা গেলাম। আমার বাসা থেকে একবারে রিকশায় করে উত্তরা যাওয়া যায় না। রিকশা বদলে, ভেঙে ভেঙে উত্তরা পৌঁছাতে হল। উত্তরা গিয়ে একা একা অহেতুক ঘুরলাম অনেকক্ষণ। দীপ্তি ফোন করলো অনেকবার। ধরলাম না। শোয়েব ফোন করে না পেয়ে মেসেজ দিল, ‘কোথায় তুমি? দিন দিন এত কেয়ারলেয়াস আর ইরিটেটিং হয়ে যাচ্ছ কেন?’ বাংলা মেসেজ এর দুটো ইংরেজি শব্দ যেন প্রকটভাবে বিরক্তি প্রকাশ করল। আমি মেসেজ পড়ে ফোনটা বন্ধ করে ব্যাগে রেখে দিলাম। বাড়ি ফিরলাম রাত এগারটায়। সারাক্ষণ আমার গায়ের রঙ, সিজিপিএ আর বিয়ে নিয়ে চিন্তা করা আম্মা জীবনে এই প্রথম আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। দরজা খুলে আমাকে দেখে বকতে গিয়েও বকলেন না। খপ করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর শব্দ করে কেঁদে ফেললেন। দীপ্তি আমাকে দেখতে এলো বেশ কিছুদিন পর। এক মরা দুপুরে। তারপর জোর করে টেনে নিয়ে গেলো বাইরে। আমরা দুজনে মিলে একসাথে রিকশায় খুব ঘুরলাম। আমার শরিরটা খুব দুর্বল লাগছিল। গলা শুকিয়ে আসছিল বার বার। তবুও কেন যেন ঘুরতে ভালো লাগছিলো। আমরা ঘুরতে ঘুরতে ফুলার রোডে গেলাম। রিকশা ছেড়ে দিয়ে আইসক্রিম খেলাম। আকাশ পেরিয়ে বিকেল মিলিয়ে যাচ্ছিলো পশ্চিম দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে আকাশ দেখতে গিয়ে অন্য কারো দিকে চোখ আটকে গেল আমার। লম্বা পা ফেলে এদিকেই এগিয়ে আসছে সে। আমি দ্রুত চোখ সরাতে চাইলাম। পারলাম না। চোখ পাথর হয়ে গেল। সেই পাথরে মৃদু মৃদু বাষ্প জমতে থাকল। সে এগিয়ে এলো, ভারী পাওয়ারের চশমার আড়াল থেকে ঝকমকে চোখ নাচিয়ে বলল- আরে তুমি? কেমন আছ? তুমির শেষটুকু বেশ লম্বা ছিল। কেমন যেন একটা রেশ থেকে গেল। আমার শুনে মনে হল আকাশটা লম্বা হয়ে গিয়েছে। মাথার ওপরের গাছগুলো হঠাৎ করে তরতর করে মেঘের আড়ালে চলে গিয়েছে। পথটা হয়ে গেছে এয়ারপোর্টের কোন রানওয়ে। সেখানে রুগ্ন, দুর্বল একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই মেয়েটি আমি। যে মেয়েটাকে তার পাঁচ বছরের সম্পর্কে থাকা প্রেমিক কোনদিন নিজ থেকে জিজ্ঞেস করে নি ‘কেমন আছ?’ যে মেয়েটিকে খুব সুন্দর ছকের ভেতর জীবন কাটাচ্ছিল। কিন্তু খুব আকস্মিকভাবে একদিন সে বুঝতে পারল, এই ছকটা আসলে একটা বিভ্রম। তার চারপাশের সবকিছুই আসলে বিভ্রম। সে কাউকে কোন দিন ভালোবেসে কষ্ট পায় নি। কেউ তাকে তীব্রভাবে কখনও ভালোবাসে নি আর কষ্ট ও দেয় নি। ছকের বাইরে যাবার অনুভূতি সে জানে না। সে আসলে হাতে গোনা কিছু জিনিস বাদে আর কিছুই জানে না। সে আসলে কিছু কৃত্রিম আলোর প্রচ্ছন্ন ছায়ায় বেঁচে ছিল, কিংবাহয়ত বেঁচে থাকার ভান করছিল। সে দাঁড়িয়ে ছিল আমার কাছ থেকে মাত্র গোটাকয়েক হাত দূরে। সেই দূরত্বকে আমার মনে হয় পাহাড়সম। আমার মনে হল আমি হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁই। তার উত্তরার বাড়ির বারান্দার উইন্ড চাইমটার মত রিনঝিন স্বরে কথা বলি। কিংবা ফুলার রোডের কৃষ্ণচূড়া গাছের ফুলের মত রাঙা হই, কিন্তু আমি কিছু করতে পারি না। আমার মনের ভেতরে কোন অচিন বাঁশি বেজে উঠে না, আকাশে কোন পাখি উড়ে না। আমি হয়ে যাই ছায়া ছায়া। দু হাজার তের সালে আমার জন্ম হয়, দু হাজার তের সালেই মৃত্যু। - একুয়া রেজিয়া


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আরেকটা রোদের দিনের অপেক্ষায়

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now