বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আড়ালে ভালবাসা
ইরেজার হাসান
রহস্য গল্প
শেষ পর্ব
(ঈ)
চা বানাতে গিয়ে স্বস্তি পেল না মিরাজ। উপন্যাসের কাহিনীটা তার মাথায় জেঁকে বসেছে। ওটা যারপরনাই অশান্তি তৈরী করছে তার ভেতরে। আচমকা মিরাজের মনে হলো, উপন্যাসের পান্ডুলিপিটা পুড়িয়ে ফেললে কেমন হয়? 'কেমন হয়?' এই কথাটা ভাবতে চাচ্ছে না সে। যে করেই হোক, পান্ডুলিপিটা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। নয়তো এই লেখাটাই তার মাথা নষ্ট করে ছাড়বে।
ভাবতে ভাবতেই সে পান্ডুলিপিটা কিচেনে নিয়ে এলো। জেরিন তখনও ডাইনিং রুমে। মিরাজ পান্ডুলিপির দিকে একবার চোখ বুলালো। তারপর গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে নিলো। কাঁপা কাঁপা হাতে সেটার একাংশ গ্যাসের চুলার আগুনের উপর ফেলে দিলো। কাগজগুলোতে আগুন
লেগে গেল! মিরাজের শরীর বেয়ে দরদরিয়ে ঘাম ঝরছে। কাগজগুলোর কিছু অংশ পোড়ার পর সে কাঁপা কাঁপা গলায় চিৎকার করে জেরিনকে ডাকলো। অমঙ্গল আশঙ্কায় জেরিন দৌঁড়ে এলো কিচেনে। এসে যা দেখলো তাতে জেরিনের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল!
পান্ডুলিপিটার ষাট ভাগ পুড়ে গেছে! মিরাজ দক্ষ অভিনেতার মত মন খারাপ করে, অস্থির ভঙ্গিমায় জানালো, সে উপন্যাসটা আবার পড়ার জন্য এখানে
নিয়ে এসেছিল। এরপর চুলার ঠিক উপরের তাকে সেটা রেখে চায়ের কাপ পরিষ্কার করছিলো সে। এর মধ্যেই
কাগজগুলো উপরের তাক থেকে সোজা চুলার আগুনের উপর পড়ে গিয়েছিল। মিরাজের অভিনয় দেখে তার সব কথা বিশ্বাস করলো জেরিন। জেরিন জানে, মিরাজ কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে তার খারাপ চাইবে না।
জেরিনের হাতে হাত রেখে বেশ কয়েকবার দুঃখ প্রকাশ করলো মিরাজ। সে নিজেকে অপরাধী বলে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। মিরাজ সত্যিই কাঁদতেছিল। কিন্তু সেই কান্নাটা শুধু আজকের এই ঘটনার জন্য নয়, বরং জেরিনের অনুপস্থিতে নেশার ঘোরে, অসুস্থ মস্তিষ্কে লোকচক্ষুর আড়ালে যে পাপটা করেছে, সেটার জন্যেও।
মিরাজ জেরিনকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না। সেদিন যে কীভাবে যে কী করে ফেলেছে সেটা সে ঠাহর করতে পারেনি। ঐ ঘটনার পর থেকে তার বার বার মনে হয়েছে, সে জেরিনের মত সরল মেয়েটার কাছে অপরাধী। সে যা করেছে সব অন্যায় করেছে। এসব ভেবে ভেবে গত আট মাস সে একবারের জন্যেও ফুরফুরে
মেজাজে জেরিনের সাথে মিশতে পারেনি।
আসলে নেশার ঘোরে অনেক বড় ঘটনাটা ঘটে গেছে তো, তাই সে মনে শান্তি পাচ্ছিলো না। কাঁদতে কাঁদতে মনে মনে
সে জেরিনের কাছে ক্ষমা চাইতে থাকলো, 'আমাকে মাফ করো জেরিন। আমি ইচ্ছা করে ঐ অন্যায়টা করিনি। আমি তোমাকে কষ্ট দেয়ার কথা ভাবতেও পারি না। আমার মনের অশান্তি দূর করার জন্যেই আজ উপন্যাসটা পুড়িয়ে ফেলতে হলো। পুড়িয়ে ফেললেও আড়ালে তোমার সৃষ্টির প্রতি আমার অগাধ ভালবাসা আছে। আমি মন থেকে দোয়া করি তুমি একদিন অনেক বড় লেখিকা হবে। এ যাত্রায় আমাকে মাফ করে দিও বউ পাখিটা।'
(উ)
দুই মাস পর বইমেলা শুরু হয়ে গেল। জেরিনের উপন্যাসটা আর বেরুলো না। নানা ব্যস্ততার মাঝে নতুন করে আর উপন্যাসটা লেখা হয়ে ওঠেনি। এদিকে জেরিন সন্তান সম্ভবা। উপন্যাস বের না হওয়াটাকে দূর্ভাগ্য মেনে নিয়ে মিরাজ ও জেরিন তাদের আগত অতিথি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মিরাজ জেরিনের যত্নের কোনো ত্রুটি করছে না। সবকিছুই এখন স্বাভাবিক চলছে। কিন্তু এতসব স্বাভাবিক কাজের মধ্যে আবার একটা অস্বাভাবিক কান্ড ঘটে গেল!
মিরাজ বইমেলায় গিয়ে কিছু বই কিনে নিয়ে এলো। প্রত্যেকটা বই পড়তে গিয়ে 'সন্তান' নামক বইটা পড়ে তার মাথা ঘুরে গেল! এটা কীভাবে সম্ভব? এতো দেখছি তার করা ধর্ষণ ও খুনের কাহিনীর উপর রচিত বই! মনে হলো তার মাথায় বোম ফাটলো! তার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। মুহুর্মুহু শ্বাস নিয়ে বইটার লেখকের নামটা দেখলো সে। ডা. রাইয়ান। লেখক পরিচিতিতে তার সম্পর্কে বিস্তারিত দেয়া আছে।
মিরাজ এক মুহূর্ত দেরী না করে ডা. রাইয়ানের সাথে দেখা করলো। সে ডা. রাইয়ানকে জানালো, এমন দুর্দান্ত উপন্যাস সে খুবই কম পড়েছে। লেখক এই উপন্যাসের প্লটটা কীভাবে তৈরী করেছে সেটা কৌশলে জানতে চাইলো সে। ডা. রাইয়ান একজন শিল্পপতীর কাছ থেকে এত প্রশংসা পেয়ে খুশীতে গদ গদ হয়ে গেল। তারপর সে তার উপন্যাসের প্লট পাওয়ার ঘটনাটা এভাবে বর্ণনা করলো-
'আমি একদিন জরুরী কাজে আটকা পড়ে ডাক বাঙলোতে রাত কাটিয়েছিলাম। ভোর বেলা যখন গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে ফিরছিলাম, তখন রাস্তার ধারে জলাশয়ের পাড়ে একটা মেয়েকে পড়ে থাকতে দেখি। কাছে গিয়ে দেখি মেয়েটা জীর্ণ অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার বুকের বাম পাশটা গুলিবিদ্ধ ছিল। আমি তাকে গাড়িতে করে হসপিটালে নিয়ে আসি। আল্লাহর অশেষ রহমতে মেয়েটা বেঁচে যায়। যে তাকে গুলি করেছিল সে হয়তো ভেবেছিল হৃৎপিন্ড বরাবর গুলি করলে তার বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে মেয়েটা ছিল ডেক্সট্রোকার্ডিয়াক। অর্থাৎ, তার হৃৎপিন্ড ছিল বুকের ডান পাশে। তাই তাকে বাঁচানো গিয়েছিল। জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারলাম মেয়েটার আপনজন কেউ নেই। তাই মেয়েটাকে আমার কাছেই রেখে দিলাম।
পরবর্তীতে মেয়েটার কাছ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনলেও, অনেক চেষ্টা করেও সেই মানুষ রূপী পশুর পরিচয়টা জানতে পারিনি। মেয়েটা এ ব্যপারে আর কিছুই বলেনি। সবচেয়ে অবাক করা ব্যপার কী জানেন? মেয়েটা এখন সন্তান সম্ভবা। কোনোভাবেই সে তার সন্তান নষ্ট করতে রাজী হয়নি। আগামীকাল তার ডেলিভারী হবে।'
মিরাজ কথাগুলো শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! মনে হচ্ছে তার পৃথিবীটা দুলছে। মাই গুডনেস! মেয়েটা তাহলে মারা যায়নি! কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো মেয়েটা কেন পরিচয় প্রকাশ করেনি? চাইলেই তো মেয়েটা তার পরিচয় সবাইকে বলে দিয়ে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে পারতো। জেরিনের কাছে তার পাপের কথা বলে দিয়ে তাদের সুখী সংসারে বিষ ঢেলে দিতে পারতো। কিন্তু মেয়েটা তা করেনি। হয়তো তাদের সংসারের অনেক দিন কাজ করার কারণে সংসারে প্রতি ভালবাসা থেকেই মিতু কোনো কিছু প্রকাশ করেনি। আবার মেয়েটা তার সন্তান নষ্ট করেনি! কেন সে অন্যায়ের শিকারী হয়ে তার ফল পেটে ধারণ করে আছে? সব কিছুর আড়ালেই হয়তো ছিল ভালবাসা।
এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা নেই তার। মেয়েরা অনেক আশা ও গভীর মায়ার প্রকাশ থেকেই পেটে সন্তান লালন করেন। কিশোরী মিতুও হয়তো এই অল্প বয়সেই সন্তানের প্রতি মায়ার আঁধার বুকে জমিয়ে তার সন্তানকে বাঁচিয়ে রেখেছে। উফ! আর ভাবতে পারছে না মিরাজ। তার মাথাটা চক্কর দিলো। মিতুর বেঁচে থাকার কথা শুনে তার মনে অপরাধবোধ তীব্রভাবে কাজ করেছে। এই প্রথমবারের মতো এই পাপের প্রায়শ্চিত করতে ইচ্ছা করছে তার। কিন্তু কীভাবে এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবে সেটা জানা নেই তার।
(সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now