বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আনন্দধারা বহিছে ভুবনে মেয়েটি বাচ্চাদের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসে নি। শুয়ে থাকতে অসম্ভব বিরক্ত লাগছে। মেঝেতে চীনামাটির বাসনের বিচূর্ণ হওয়া টুকরোগুলো সাথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকগুচ্ছ চুল পড়ে আছে। একটু ভালো করে কেউ যদি খেয়াল করতো তবে বুঝতো, মেয়েটি আসলে থরথর করে কাঁপছে। তার চোখের জলে শিমুল তুলার বালিশ ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। সারা গায়ে- কাপড়ে ধুলোবালি লেপটে লেগেছে। তার ঠোঁট ফেটে গেছে। রক্ত বের হচ্ছে। একটু পর পর আঁচল দিয়ে মুছতে হচ্ছে। ব্যথায় টনটন করছে সমস্ত শরীর। ঘরের ভেতর থেকে দরজায় খিল এঁটে দেয়া আছে। জানালা বন্ধ। এই অন্ধকার থমথমে ঘরের ভেতর ঝিম মেরে শুয়ে আছে মেয়েটি। জহির এসে কয়েকবার দরজা ধাক্কাধাক্কি করে গেছে। রাগে পশুর মতো গর্জন করে চিৎকার উঠেছে- রাসেলের মাও, দরজা খুল এখনও। তোরে কিন্তুক আইজকা মাইরা ফেলব। মাগি, এক মাইরে তোর কিছু হবে না। দেখি তুই কখন বের হোস। তোরে বটি দিয়ে কুপায়ে যদি চামড়া ছিলাতে না পারি তাইলে আমি ভালো মায়ের বেটা না। মেয়েটির কান দিয়ে অবশ্য এসব শাসানি ঢুকে নি। তার মনোযোগ অন্যদিকে। চাপাতি দিয়ে মাংস কাটার শব্দ আসছে। কখনও ধুপ ধুপ ধুপ আবার কখনো ঠক ঠক ঠক। জহির মণ্ডলের ছেলে শাহিন মণ্ডলের গলা শোনা যাচ্ছে- আমি বলছিলাম না দশ কেজি হবে, খাসীটা কেনা জিতা হইছে। তাইলে কত করে কেজি পড়ল? মাড়িয়া গ্রামের শুধু এই একটা ঘরের মধ্যে কাঁদছে কেউ একজন। বদ্ধ ঘরটা পেরিয়ে জানালার ওপারের পৃথিবীতে বয়ে যাচ্ছে খুশির জলোচ্ছ্বাস। মণ্ডল বাড়ির রমণীদের খলখলানি শব্দে কেঁপে উঠছে আকাশ বাতাস। আর তাহমিনা নামের এই একজেদি গোঁয়ার রমণীর চোখ ঝেঁপে নামছে অশ্রু। মণ্ডল বাড়ির খাসি বানানো হচ্ছে আমতলায়। সেখানে ছয় বছরের রাসেল নামের উটকো এক ছেলে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। ভীতু চোখে তাকাচ্ছে এদিক ওদিক একটু পর পর। একটা মুতনাড়ি(ইউরিনারি ব্লাডার) দরকার। মুতনাড়ি দিয়ে ঢোল বানানো তার অনেক দিনের শখ। মুতনাড়ি টেনে দইয়ের হাড়ির মুখে লাগিয়ে রোদে শুকাতে হয়। শুকানোর পর চামড়া টানটান হয়ে যায়। কাঠি দিয়ে বাড়ি দিলে সুন্দর শব্দ হয়। রাসেল এক পা দু পা করে লতিফ মণ্ডলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মণ্ডলের ব্যাটা খেয়াল করেনি। -বাজি(চাচা) মুতনাড়ি দিও রে। মাড়িয়া সমাজে আইন করা হয়েছে জহির আর তার বউয়ের সাথে কথা বলা নিষেধ, যে বলবে তাকে ১০০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। তবে রাসেল যেহেতু নাবালক অতএব তার সাথে কথা বলা জায়েজ আছে। কোন জরিমানা লাগবে না। রাসেলের জবাব দেয়ার জন্য লতিফ মণ্ডলকে তাই কিছুক্ষণ ভাবতে হল- মুতনাড়ি দেয়া যাবে না। রাহিকে ঢোল বানায়ে দিব। রাহি জমির মণ্ডলের নাতি। বাবা মার সাথে শহরে থাকে। ঈদে দাদু বাড়ি এসেছে। চামড়া দিয়ে ঢোল বানানো হবে এটা নিয়ে সে খুবই এক্সসাইটেড। রাহির মা অবশ্য এসব ময়লা জিনিস দিয়ে ঢোল বানাতে নিষেধ করলেন। ওকে বাসায় গিয়ে মার্কেট থেকে ঢোল কিনে দেবেন এমন লোভ দেখানো হল। কিন্তু রাহির জেদে অবশেষে লতিফ মণ্ডল ঢোল বানিয়ে দিলেন। আমতলার পূর্ব দিকটার রোদে ঢোল শুকাতে দেয়া হয়েছে। রাসেল দাঁড়িয়ে আছে ঢোলের কাছাকাছি। একটু দুরে ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে রাহি। কয়েকটা মাছি ভেজা চামড়ার উপর উড়াউড়ি করছে। মাছিগুলোকে তাড়ানোর জন্য হাত বাড়াতেই রাহি চিৎকার দিয়ে উঠল—ঐ হাত দিবি না। হাত দিবি না। চাচ্চু রাসেল ঢোলে হাত দিচ্ছে। একটু দুরে খাসি বানানোর কাজ চলছিল। ওখান থেকে মাংস কাটতে কাটতে রাহির চাচা ধমক দিলেন- এই রাসেল বাড়ি যা। রাহিরে কান্দাস না। থাপ্পড় খাবি। যা বাড়ি যা। প্রচণ্ড রোদে ঘামে ঝরে দরদর অবস্থা। রাসেল তখনো সেখানে ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। ঢোল কিভাবে চিড়চিড় শব্দ করে শুকাচ্ছে সেটা খুব আগ্রহ ভরে দেখছে। শুকানোর পর ঢোল কত জোরে বাজবে সেটা সে দেখে যাবে, তবে তার মনের গোপন ইচ্ছে হল রাহিকে অনুরোধ করে যদি কিছুক্ষণ বাজানো যায়। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় তার মনে হল, ঢোলের চামড়া বোধ হয় শুকিয়ে গেছে। আর তর সইল না। হাতের কঞ্চি দিয়ে একটা বাড়ি দিল চামড়ার উপর। কিন্তু ঢোল তখনও শুকায় নি। চামড়া আলগাভাবে হাড়ির মুখে লাগানো ছিল। কঞ্চির আঘাত একটু জোরে হয়েছে বোধ হয়। ফলে হাড়ির কানা থেকে চামড়া ফসকে বেরিয়ে আসলো। এই ঘটনায় ব্যথিত হয়ে সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল রাহি। লতিফ মণ্ডল পশুর মতো গর্জন করে রাসেলের দিকে তেড়ে আসলেন। জোরে মারার মেজাজ নিয়ে এসেছিলেন কিন্তু তার করুণ মুখ দেখে হালকা এক চড় দিয়ে শাসাতে শুরু করলেন। ছোট ছেলের সাথে কথা বললে কোন জরিমানা লাগবে না অতএব ইচ্ছে মতো মনের খায়েশ মিটিয়ে ধমকানো যাবে— ঐ আকাম করা ছাড়া কিচ্ছু পারিস না? তখন তোরে বাড়ি যাইতে বলি নাই? যা, থাপড়ায়ে দাঁত ফেলে দিব। খবিশ কোথাকার... রাসেলদের দুই খোপ ঘর। একঘরে মা-বাপ, অন্য ঘরে সে আর মুন্না থাকে। মুন্না তাদের ছাগলের নাম। মুন্না অবশ্য আগে গাইয়ের সঙ্গে বাইরে বারান্দায় থাকতো। কিছুদিন আগে তাদের গাইগরু চুরি হয়ে যায়। তারপর থেকে ঘরে মুন্নাকে রাখা হচ্ছে। রাসেলের মা তাহমিনা প্রতিদিন সকালে জল দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয়। প্রথম কয়েকদিন গন্ধ লাগতো। এখন আর কিছু মনে হয়না। তাদের বাড়ির পূর্ব দিকের দেয়ালে কিছু গোবরের চাপড়ার ছাপ রয়ে গেছে। এক মাস আগে এই বাড়িতে যে গরু ছিল এই ছাপ গুলো যেন সেটাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। ঈদ উপলক্ষে সাধারণত ধনী গরীব সব বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয়। মাটির বাড়িগুলো লাল মাটি দিয়ে লেপা হয়। তাদের কিছুই করা হয়নি। দুমাস আগে যেমন ছিল এখনও তেমন আছে। ঈদের কিছুই যেন স্পর্শ করেনি এই বাড়িটায়। রাসেল দেখল বাড়িতে কেউ নেই। তার ঘর পরিস্কার করা হয় নি। বিশ্রী গন্ধ আসছে। মা’র ঘরের দরজা ভেতর থেকে আটকানো। সে কয়েকবার দরজা ধাক্কাল। কোন সাড়া নাই। আঙিনায় একটা পোল্ট্রি মুরগী ঝিম মেরে বসে আছে। সকালে ঈদের নামাযের আগে মুরগীটা আনা হয়েছে। এখনো জবাই করা হয়নি। বাড়িতে কি ঘটছে তার কিছু আঁচ করা যাচ্ছে না। ক্ষুধা লাগতে শুরু করেছে। গতকাল রাতের ভাত পানি দেয়া ছিল। নামাযে যাওয়ার আগে বাপ বেটা দুজনে খেয়েছে। রাসেল মুন্নাকে নিয়ে মাঠের দিকে বেরুল। মুন্না একটানা ভ্যা ভ্যা করেই যাচ্ছে। ঘাস খাওয়ানো দরকার। সে না হয় পান্তা খেয়ে আছে কিন্তু সকাল থেকে মুন্নার যে কিছুই খাওয়া হয়নি। গ্রামে সাত ভাগে কোরবানি দেয়া হয়, পশু জবাইয়ের পর গরীব দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার আগে কিছু মাংস ভাগীদার রা রান্নার জন্য বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে। বাড়িতে পাঠানো মাংস রান্না হয়ে গেছে। বাতাসে বাতাসে মাংসের ঘ্রাণ। রাসেলদের বয়সী ছেলেরা বড় বড় হাড় চিবাতে চিবাতে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। মাংসের গন্ধ তার ক্ষুধা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। খুব রাগ হচ্ছে, মা আর ঝগড়া করার সময় পায় না, বাইরে মুরগীটা পড়ে আছে, জবাই করে রাঁধলে কি হয়? আর আব্বাও যে ক্যান মাকে মারে। অন্তত আজকের দিনে মায়ের গায়ে হাত তোলা ঠিক হয় নি। জহির জাল নিয়ে বিলে গেছে। বিলপারের কয়েকটা পুকুর ভেসে গেছে। মাছ যা পাচ্ছে তা দিয়েই সংসার চলছে। সংসার চালানোর জন্য তাকে অনেক ধরনের কাজ করতে হয়। বাপের জমিজমা নাই, এক পেশা নিয়ে পড়ে থাকলে হয়না। বন্যার সিজনে বিলে নদীতে মাছ ধরে আর অন্য সময় মুরগীর ব্যবসা করে। মাঝে মাঝে ব্যবসা বাদ দিয়ে মানুষের কামলাও খাটে। গতকয়েকমাস আগেও ঠিকঠাক মতই চলছিল সবকিছু। হঠাৎ করে একদিন জহির একটা গুজব শুনতে পায়। তাহমিনার নাকি লাইন আছে তাদের পাড়ার মতিনের সাথে। ভালোবাসা। কয়েকজন নাকি নিজ চোখে দেখেছে। মাড়িয়া সমাজে সালিশ ডাকা হয়। জহিরকে বলা হয় বউ কে তালাক দিতে। সে গ্রামের মুরুব্বীদের কথা অমান্য করে তাহমিনার সাথে সংসার করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। মুরুব্বীরা ক্ষেপে গিয়ে তাদের একঘরে করে দেয়। অর্থাৎ তাকে সমাজ থেকে বাদ দেয়া হয়। জারি করা হয় বাকরুদ্ধ এক আইন। এই পরিবারের সাথে কথা বলা মাত্র ১০০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। তাকে কেউ কোন কাজে ডাকতে পারবে না। জহির ভালো নেই। সমাজের সাথে এই অবস্থা। মুহূর্তেই আশে পাশের মানুষকে তার অচেনা লাগে। সে যেন এখানে উদ্বাস্তু। আড্ডার বন্ধুরা এখন তাকে এড়িয়ে চলে। মোড়ের দোকানে বসতে গেলে মানুষ আড় চোখে তাকায়। মসজিদে নামায পড়তে গেলে অস্বস্তি লাগে। কিচ্ছু ভালো লাগেনা। এরমদ্ধে মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে চুরি হয়ে যায় একমাত্র গাই গরু। মানুষ পড়ে অথৈ জলে সে পড়েছে অথৈ চোরাবালিতে। এখন অস্থাবর সম্পত্তি বলতে ঐ মুন্না। জহিরের বউ তাহমিনা এসব কিছু বোঝেনা। গরিবের ঘরের মেয়ে হলেও জেদ-দেমাগের কারখানা। আত্মসম্মানের পাহাড় অতি উচু বলে মানুষের বাড়ির কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সংসারে আয়ের একমাত্র উৎস জহির। ইদানিং তার যে অবস্থা তাতে কোরবানি দেয়া সম্ভব নয়। সবাই কোরবানি দেবে। তাহমিনা অন্যের মাংস কেটে দিবে। শেষে অল্প একটু মাংস নিয়ে ঘরে ফিরবে। তারপর সে মাংস রান্না করে স্বামী সন্তানকে খাইয়ে তৃপ্তির হাসি হাসবে, এমন মেয়ে সে নয়। ঈদের কদিন আগে থেকে সে জহিরকে বলে আসছিল মুন্নাকে কোরবানি দিতে। জহির এক কথায় না করে দিয়েছে। ঈদের আগের দিন রাতেও তাহমিনা কেঁদে কেটে মিনতি করে বলেছে—ছাগলটা কোরবানি দেও, রাসেলের বাপ। ঈদের পর আমার আব্বার কাছ থাইকা টাকা আইনা দিব। জহির রাজি হয়নি। সে জানে তার শ্বশুরের টাকা দেয়ার বিন্দুমাত্র সামর্থ্য নাই। তাহমিনা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। জহিরের ঘুম হয়নি, সে বিছানার এপাশ ওপাশ করে কাটিয়েছে সারা রাত। রাসেলকে জামা প্যান্ট নিয়ে দেয়া হয়নি। ছেলেটা জামা প্যান্টের আবদার ও করেনি। গতকাল বাজারে যাওয়ার সময় শুধু বলেছিল- আব্বা একটা মমতাজ মেন্দি আইনো তো... মেন্দি আনা হয়নি। রাতে শুয়ে শুয়ে জহির ভাবে সকালে মুরগী নিতে গিয়ে একটা মেন্দি নিলেই হবে। বাচ্চা কাচ্চাদের ছোট ছোট শখ গুলো মেটানো দরকার। সকাল সাড়ে আটটায় ঈদের জামাত। ভোর থেকে মাইকে বলা হচ্ছে। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ ধ্বনিতে মুখরিত চারদিক। জহির বাজার থেকে যখন ফিরল তখন সকাল সাড়ে সাতটা। সময় বেশি নেই। গোসল করে নামাযে যেতে হবে। দেড় কেজি ওজনের একটা মুরগী কেনা হয়েছে। জহির তার হাতের প্যাকেটটা ছেলের দিকে বাড়িয়ে দিল। রাসেল হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল-আব্বা মেন্দি আনছ? -খুলে দেখ বেটা। তোর মাকে বল দিয়ে দিবে। মা কই? -মাও তো শুয়ে আছে। জহিরের দেখল বাড়িতে সকালের ঝাড়ু পড়েনি। মেজাজ মোটামুটি খারাপের দিকে। সে গটগট করে ঘরের দিকে পা বাড়াল। রাসেল চুপ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল, তার মা ভালো করে মেন্দি দিতে পারে না। দিনা অ্যান্টি খুব পারে। যা সুন্দর করে ফুল এঁকে দেয়। নাম লিখে দেয়। ঈদ মোবারক লিখে দেয়। কিন্তু দিনা অ্যান্টিকে পাওয়া গেলনা। তিনি গোসলে গেছেন। রাসেল চুপ তাদের বারান্দায় করে বসে রইল। গোসল থেকে ফিরে দিনা অ্যান্টি বললেন—আমি এখন মেন্দি দিতে পারবো না, আমার বান্ধবিরা আসবে, ওদের নিয়ে বেড়াবো। কাল রাতে আসিস নাই কেন? সবাইকে দিয়ে দিলাম। রাসেল আর কথা বলার ফুসরত পেলো না। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর কি ভেবে প্যাকেটটা খুলে নিজের হাতে নিজেই মেন্দি দেয়ার একটা বৃথা চেষ্টা করতে লাগলো। নামাযের বেশি দেরি নেই। পরে মেন্দি দিয়ে লাভ কি? সে তার বাম হাতের তালুতে একটা ফুল আঁকার চেষ্টা করছে। আসলেই এটা একটা জটিল কাজ। ফুটো দিয়ে অল্প একটু বেরোনোর পর আর বেরোয় না, জোরে চাপ দিলে এক দলা বেরিয়ে লেপটে যায় হাত। শেষমেশ ফুল তো হলই না বরং ছাপ ছাপ রঙিন হয়ে গেল পুরো হাত। অনেকটা তাদের উত্তরের দেয়ালের গোবরের চাপড়ার মতো। তবু সে খুশি। রাঙা হাত থেকে অদ্ভুত একটা সুবাস আসছিল। অন্য রকমের ভালো লাগার এক অনুভূতি দোলা দিয়ে যাচ্ছিলো তার মনে। এই সামান্য মেহেদী রঙ রাসেল নামের বালককে বুঝিয়ে দিল ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। জহির ঘরে ঢুকে দেখল তাহমিনা দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। রাগে তার গা জ্বলে যাচ্ছিল। সে শান্ত গলায় বলল—কিরে উঠিস নি এখনও, কত নিন(ঘুম) পাড়া লাগে তোর। সাড়ে আটটায় ঈদের জামাত। তাড়াতাড়ি ওঠ ঘরবাড়ি ঝাইড়ঝুড় দে। তাহমিনা জেগে আছে। অভিমানে গলাটা ধরে আছে। মুখে কোন কথা নেই। জহির কথা বলে যাচ্ছে—দেড় কেজি ওজনের মুরগী আনছি। ওঠ জবাই করে দিয়ে আমি গা ধুইতে যাবো। বাড়িতে আটা আছে তো, সাত পুতি পিঠা করবি। কিরে কথা কানে যায়না। জহির তাহমিনার হাত ধরে টেনে তুলতে গেল। তাহমিনা হ্যাঁচকা টান দিয়ে হাত ছুটিয়ে নিল। কতক্ষণ আর চুপ থাকা যায়। মেয়েমানুষ বলে কথা। মুখে যেন খৈ ফুটছিল—শুয়োর, তুই আমার গায়ে হাত দিবি না। পিঠা খাওয়ার হাউশ হইছে তোর, ম্যাগেক ডাইকা আইনা পিঠা কইরে নে। ফকিন্নির মতো ঈদের দিনে আমি মুরগী রানবো। আরে শুয়োর তুই কোরবানি দিলিনা ক্যান? আমারে ফকিন্নি পাইছিস? জহির দাঁতে দাঁত চেপে রাগে গরগর করতে করতে জবাব দিল—তোরা তো ফকিন্নি। তোর বাপ ফকির, তোর মা ফকির চোদ্দ গুষ্টি ফকির। মাগি আমারে ফকির বলিস। মাইর না খাইলে তোর গা শুলায়? কথাগুলো বলতে বলতে জহির তাহমিনার চুলের মুঠি ধরে এলোপাথাড়ি মাইর শুরু করলো। তাহমিনাও কম যায় না। তাহমিনা জহিরের হাতে কামড় দিয়ে এক খাবলা মাংশ তুলে নিলো। তারপর জহির ওর তলপেটে এক লাত্থি মেরে দিল। এই লাত্থির পর তাহমিনার আর উঠে দাঁড়ানোর শক্তি ছিল না। ভয়ঙ্কর ভাবে গোঙাচ্ছিল। ধ্বস্তাধস্তির সময় কয়েকটা চীনামাটির প্লেট তাক থেকে পড়ে ভেঙে গেল। তাহমিনার মাথা থেকে কয়েকগুচ্ছ চুল উপড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। বউ মারা পর্ব শেষ করে জহির গোসল করে নামাযে গেল। নামায থেকে এসে সে দেখল দরজা ভেতর থেকে আটকানো। সে কয়েকবার ধাক্কাধাক্কি করলো। সাড়া পাওয়া গেল না। বিশ্রী কয়েকটা গালি দিয়ে জহির জাল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল। বেলা দুইটা বাজে। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেটে নিয়ে জহির বিল থেকে বাড়ি ফিরেছে। মাছ তেমন পাওয়া যায় নি। খইলসনে কিছু ছোট মাছ পড়ছে। আজ আর বেচা হবে না, রান্না করে খাওয়া যাবে। তাহমিনা তখনো ঘর থেকে বের হয় নি। বউয়ের এতোটা স্পর্ধা সে আশা করেনি। ভেবেছিল এতক্ষণ বোধ রান্না শেষ হয়ে গেছে। বাপ বেটা দুজনে মিলে খাবে। জহির দেখল পল্ট্রি মুরগীটা আঙিনায় মরে পড়ে আছে। এতো কড়া রোদ পল্ট্রি মুরগী সহ্য করতে পারে না। ছেলেটা না খেয়ে কোথায় না কোথায় ঘুরছে। কে জানে। জহিরের মাথায় রক্ত উঠে গেছে। সে কয়েকবার দরজা ধাক্কাল। কোন সাড়া নাই। মা- বাপ তুলে যা ইচ্ছে গালাগালি করলো। শাসাল। কাজের কাজ কিছু হলনা। তারপর আরও এক ঘণ্টা সে বারান্দায় বসে রইল। তাহমিনা বের হল না। অবশেষে বিকালের দিকে জহির শাবল দিয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকল। তাহমিনা দরজার দিকে মুখ করে শুয়ে ছিল, সে ভেতরে ঢোকা মাত্র পাশ ফিরে শুলো। এবার বউকে আর কোন অনুরোধ করেনি জহির। একটা কথাও বলেনি। ঘরের জানালা বন্ধ করে খুব শান্ত মুখে বেরিয়ে এসেছে। অধিক শোকে মানুষ পাথর হয় অধিক রাগে মানুষের মধ্যে বিনয় ভাব চলে আসে। এই পর্যায়ে মানুষ ভয়ংকর কিছু করে ফেলতে পারে। সে একটা দা খুজছে। চালের ধারে রাখা ছিল। পাওয়া যাচ্ছে না। রাগ আরো বাড়ার কথা। কিন্তু বাড়ছে না। পরিস্থিতি ক্রান্তিক্রোধ অবস্থায় চলে গেছে। এই রাগ থেকে ফেরার কোন পথ নেই। রাসেল বাড়ির মধ্যে ঢুকতেই দেখল তার বাবা মুরগী জবাই করছে। দুই হাত রক্তে লাল হয়ে আছে। রাসেল বলল—আব্বা তোমার গায়ে এতো রক্ত ক্যান? জহিরের শার্টে কপালে ছোপ ছোপ রক্তের চিহ্ন। চোখে মুখে ভয়। রাগের মাথায় ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। ছেলেকে সে কথা বলা সম্ভব নয়। কোন মতে সম্ভব নয়। জহির হাসি হাসি মুখ করে বলল—হা রে বেটা। মুরগী জবাই করলাম তো। মুরগীর রক্ত। -আম্মা উঠছে আব্বা? জহিরের বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো, সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-তোমার আম্মার জ্বর হইছে। ঐ ঘরের দিকে এখন যাইয়ো না, ঠিক আছে? -আব্বা আমার খিদা লাগছে। আমরা কখন খাবো? -এইতো বাপ, মুরগী জবাই দিছি, আজ আমি রান্না করবো। প্রতিদিন তো মায়ের রান্না খাস। আজ বাপের রান্না খা। ঠিক আছে? রাসেল সুবোধ ছেলের মত মাথা নাড়াল। জহির বলল- বেটা আমি ভাত চড়ায়ে দিচ্ছি। তুই চুলাতে জাল দে। ততক্ষণে আমি মুরগীটা ছিলায়ে নিই। জহির যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। রাগের মাথায় কি করেছে কিছুই বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে এসব হয়তো স্বপ্ন। সে মুরগী ছিলাচ্ছে। রাসেল চুলায় জ্বাল ঠেলছে। এই সবই যেন ভয়ঙ্কর কোন দুঃস্বপ্ন। কড়ইয়ে মাংস দেয়া হয়েছে। কি করছে কিছুই বুঝতে পারছে না। মাংসে এখন কি দিতে হবে কিছুই বুঝতে পারছে না। কিছুই মনে পড়ছে না তার। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। একটু আগে অনেক ক্ষুধা লেগেছিল। এখন মনে হচ্ছে পেট লোহা দিয়ে ভরা। রাসেল তার বাবার কাজ কর্ম কিছুই বুঝতে পারছে না। কড়ইয়ে মাংস দিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বসে আছে। রান্নার কাজে বাবার আনাড়িপনা দেখে রাসেল নিজে নির্দেশনা দিচ্ছিল—বাবা পানি দাও। লবণ দিবে না? মরিচ দাও। ছেলের কথা একটু একটু জহিরের কানে ঢুকছে। কিন্তু ঘোর কাটছে না। রাগের মাথায় এ কি করেছে। বারবার মনে হচ্ছে এটা অবশ্যই স্বপ্ন। অবশ্যই। তরকারি প্রায় হয়ে এসেছে। বিস্বাদ ধরণের একবস্তু রান্না হয়েছে। কত টুকু মরিচ আর কতটুকু লবণ দিয়েছে সে ব্যাপারে তার কোন ধারণা নেই। রাসেল বলল—আব্বা একটা মাংস খাইয়া দেখি। কেমন হইছে? জহির আনমনে বলে উঠল—খাও বাপ খাও। তখন সন্ধ্যা। ঈদের দিনের মহা আনন্দে বিদায় জানাচ্ছে সারাপৃথিবীকে। রাসেল মুরগীর একটা রান কড়ই থেকে নিয়ে খেতে খেতে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। অতিরিক্ত ঝাল আর লবণবিহীন অতি কুস্বাদের একটা বস্তু কামড়িয়ে কামড়িয়ে খাচ্ছে। বাবার রান্না খুব একটা খারাপ লাগছে না, মনে হচ্ছে রান্নাটা অসাধারণ হয়েছে। কে জানে হয়তো জিহ্বার স্বাদ কোরকেরা আজ নিজেদের বৈশিষ্ট্য বদলে ফেলেছে শুধু মাত্র এই ছেলেটির ঈদের আনন্দের সাথে নিজেদের একাত্মতা ঘোষণা করার জন্য। রাসেল নামের বালকটি তখনো জানেনা তার জীবনে কি ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে। আজ তার দুঃখের দিন। চরম কষ্টের দিন। তার মা একটু আগে খুন হয়েছে। বাবা চুলার পাশে বসে আছে ঝিম মেরে। অপেক্ষা করছে পুলিশের জন্য। মাংসে ঝাল বেশি হয়েছে। ঝালের ঝাঁজে রাসেলের চোখ জলে টলমল করছে। গাল থুঁতনি বেয়ে টুপটাপ শব্দে মাটিতে পড়ছে সেই আনন্দ-অশ্রু। আশ্চর্য এই অশ্রু কোন বেদনা থেকে সৃষ্টি হয় নি, সৃষ্টি করেনি কোন দীর্ঘশ্বাসের...


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আনন্দধারা বহিছে ভুবনে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now