বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সময় তো পার হয় নাই ভাইজান। সময় আছে আর আমার শইলও আছে। যেদিন কুপ্রস্তাব পাব আপনারে প্রথম জানাব। এটা আমার ওয়াদা।
রহিমার মার বিয়ে হয়নি এবং রহিমা নামে তার কোনো মেয়েও নেই। সে ১৫-১৬ বছর বয়সে কাজ করতে গেল। কোনো বেগম সাহেব তাকে রাখে না। কুমারী মেয়ে রাখবে না। সে নিজেই তখন বুদ্ধি করে রহিমার মা নাম নিল। দেশের বাড়িতে তার স্বামী আছে, রহিমা নামের মেয়ে আছে। তখন চাকরি হলো। আমাদের এখানে দুই বছর ধরে আছে।
পরিবারের সবার কথাই তো মোটামুটি বলা হলো। এখন যে বাড়িতে থাকি তার কথা বলি। বাড়ি একটি জীবন্ত বিষয়। বাড়ির জন্ম-মৃত্যু আছে। রোগব্যাধি আছে। কোনো কোনো বাড়ির আত্মাও আছে। আবার আত্মা শূন্য নিষ্ঠুর বাড়িও আছে। আমরা থাকি ঝিগাতলার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছাকাছি, একটা গলির ভেতর। গলির নাম ছানাউল্লাহ সড়ক। ছানাউল্লাহ আওয়ামী লীগের এক নেতা। গলির নামকরণ ছানাউল্লাহ সাহেব নিজেই করেছেন। নিজ খরচায় কয়েক জায়গায় সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা ছানাউল্লাহ সড়ক বলে না। বলে মসজিদের গলি। গলির শেষ মাথায় মসজিদ আছে বলেই এই নাম। মসজিদের গলিতে বাবা ছকাঠা জায়গায় একতলা বাড়ি বানিয়েছেন। দোতলা করার শখ আছে। শখ মিটবে এ রকম মনে হচ্ছে না। বাবার জমি কেনার কিছু ইতিহাস আছে। জমিটা তিনি এবং তাঁর এক বন্ধু ফজলু চাচা কিনেছিলেন। জমি কেনার এক সপ্তাহের মাথায় ফজলু চাচা মারা যান। জমি রেজিস্ট্রি এবং নামজারি বাবা নিজের নামে করে নেন।
ফজলু চাচার স্ত্রী তাঁর বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে কয়েকবার এই বাড়িতে এসেছিলেন। প্রতিবারই বাবা অতি ভদ্রভাবে বলেছেন, ভাবি! ফজলু এবং আমি দুজনে মিলেই জায়গাটা কিনতে চেয়েছিলাম। শেষ মুহূর্তে ফজলু টাকাটা দিতে পারেনি। টাকা নিয়ে সে রওনা হয়েছিল এটাও সত্যি। পথে টাকা ছিনতাই হয়। ফজলু সাত দিনের মাথায় মারা যায়। টাকার শোকেই মারা যায়।
ভদ্রমহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমার গয়না বিক্রি করা টাকা। পদ্মর বাবা বলেছিল, টাকা আপনার হাতে দিয়েছে।
আপনাকে শান্ত করার জন্যে বলেছে ভাবি। এতগুলো টাকা ডাকাতরা নিয়ে গেল। কাউকে বলাও তো কঠিন।
ভাই, আমি এখন কী করব বলুন। পড়াশোনা নাইন পর্যন্ত। কেউ তো আমাকে কোনো চাকরিও দেবে না।
বিভিন্ন অফিসে চেষ্টা করতে থাকুন। নতুন নতুন মার্কেট হচ্ছে, তাদের সেলস গার্ল দরকার। তারা বেতনও খারাপ দেয় না। আমিও চেষ্টা করব।
বাবা যতক্ষণ কথা বলছিলেন বাচ্চা মেয়েটা ততক্ষণই একটা কঞ্চি হাতে ছোটাছুটি করছিল। আমি বললাম, এই খুকি কী করছ?
সে বলল, আমার নাম খুকি না। আমার নাম পদ্ম।
আমি বললাম, এই পদ্ম, তুমি কঞ্চি নিয়ে কী করছ?
বিড়াল তাড়াচ্ছি।
বিড়াল কোথায়?
তোমাদের বাড়িতে অনেকগুলো বিড়াল। তুমি দেখতে পাচ্ছ না। আমি পাচ্ছি। ওই দেখ একটা কালো বিড়াল।
পদ্ম কঞ্চি হাতে কালো বিড়ালের দিকে ছুটে গেল।
ভাইয়ার কাছে শুনেছি, দু-তিন মাস পরপর ভাইয়াকে দিয়ে বাবা ফজলু চাচার স্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। মেয়েদের এক স্কুলে আয়া শ্রেণীর চাকরিও জোগাড় করে দিয়েছিলেন। আমাদের এই বাড়ির আর্কিটেক্ট বাবা। মাঝখানে খানিকটা খালি জায়গা রেখে চারদিকে ঘর তুলে ফেলেছেন। বড় ঘর, মাঝারি ঘর, ছোট ঘর-ঘরের ছড়াছড়ি। এর মধ্যে দুটি ঘর তালাবদ্ধ। এই দুটি হলো গেস্টরুম। গেস্ট আসে না বলে তালা খোলা হয় না।
আমার মার ধারণা, বাড়িতে কোনো ঘর দীর্ঘদিন তালাবন্ধ থাকলে সেখানে ভূত-প্রেত আশ্রয় নেয়। মা মোটামুটি নিশ্চিত তালাবন্ধ ঘরের একটিতে একজন বৃদ্ধ ভূত বাস করে। মা অনেকবার খড়ম-পায়ে ভূতের হাঁটার শব্দ শুনেছেন এবং খক খক কাশির শব্দ শুনেছেন। মনে হয় যক্ষ্মা রোগগ্রস্ত ভূত। ভূত সমাজে অসুখ-বিসুখ থাকা বিচিত্র কিছু না। ভূতটা খড়ম পায়ে হাঁটে কেন তা পরিষ্কার না। খড়ম বাংলাদেশ থেকে উঠে গেছে। গ্রামের দিকেও স্পঞ্জের স্যান্ডেল। আমাদের এই ভূত অপ্রচলিত খড়ম কোথায় পেল কে জানে।
বৃদ্ধ ভূতের কিছু কর্মকাণ্ড আমি নিজের কানে শুনেছি। আমাদের বাড়ির ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় একটা চাপকল। এক রাতে শুনি চাপকলে চাপ দিয়ে কেউ পানি তুলছে। ঘটং ঘটং শব্দ হচ্ছে। বাইরে এসে দেখি, ফকফকা চাঁদের আলো। চাপকলের ধারে কাছে কেউ নেই। আমি দৌড়ে ভাইয়ার ঘরে ঢুকলাম। ভূত দেখতে পাওয়া যেমন ভয়ংকর, দেখতে না পাওয়াও ভয়ংকর। এরপর থেকে আমি রাতে ভাইয়ার সঙ্গে ঘুমাই। কী দরকার ভূত-প্রেতের ঝামেলায় যাওয়ার!
ভাইয়া অবশ্য চাপকলের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে। ভাইয়ার ব্যাখ্যা হচ্ছে চাপকলের ভেতর থাকে পানি। মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক কারণে পানির স্তর ওঠানামা করে। এমন কোনো ঘটনা ঘটলে চাপকলের ভেতরের রিং স্ল্যাভ ওঠানামা করবে। বাইরে থেকে মনে হবে অদৃশ্য কেউ চাপকল চাপছে।
ভাইয়া যেকোনো বিষয়ে সুন্দর যুক্তি দিতে পারে। মাথার কাছে আইনস্টাইনের ছবি থাকায় মনে হয় এ রকম হচ্ছে।
আমাদের বিষয়ে যা বলার মোটামুটি বলা হয়ে গেছে। এখন মূল গল্পে আসা যেতে পারে। না না, মূল গল্পে আসার আগে আমাদের গাড়ি কেনার গল্পটা বলে নেই। সোমবারের বাবার দুটা ক্লাস। এই দিন তিনি সকাল সাতটার আগেই বাসা থেকে বের হন। এত সকালে রহিমার মার ঘুম ভাঙে না বলে নাশতা তৈরি হয় না। আমাকে দোকান থেকে নাশতা নিয়ে আসতে হয়। দুটা পরোটা, বুন্দিয়া আর একটা ডিম সেদ্ধ। বাবা ডিমের কুসুম খেয়ে সাদা খোসা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন লবণের ছিটা দিয়ে খেয়ে ফেল।
অন্যের উচ্ছিষ্ট খাওয়া নোংরা ব্যাপার। বাবার দিকে তাকিয়ে প্রতি সোমবার আমাকেই এই কাজটি করতে হয়। দুটা পরোটা তিনি খেতে পারেন না অর্ধেকটা বেঁচে যায়। এই অর্ধেকের ভেতর বুন্দিয়া দিয়ে তিনি রোলের মতো বানিয়ে বলেন, খেয়ে ফেল। বুন্দিয়া রোলও আমাকে খেতে হয়। সোমবার ভোর আমার জন্যে অশুভ।
আজ সোমবার। বাবা ইউনিভার্সিটি যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছেন না। চাপকলের কাছে প্লাস্টিকের লাল চেয়ারে টিভি বিজ্ঞাপনের এনএফএলের চেয়ারম্যানের মতো বসে আছেন। আমি বললাম, ‘টাকা দাও নাশতা নিয়ে আসি।’
বাবা বললেন, তুই আমাকে ডিকশনারিটা এনে দে।
আমি ডিকশনারি এনে দিলাম, বাবা গম্ভীর ভঙ্গিতে ডিকশনারির পাতা উল্টাতে লাগলেন।
আগেই বলেছি মা কখনোই ১০-১১টার আগে ঘুম থেকে উঠতে পারেন না। আজ সবই এলোমেলো, আটটার সময় মার ঘুম ভেঙে গেল। মা উঠানে এসে চিন্তিত গলায় বললেন, কী হয়েছে ইউনিভার্সিটি যাবে না?
বাবা বললেন, না।
না কেন শরীর খারাপ?
বাবা ডিকশনারি বন্ধ করতে করতে বললেন, কাছে আসো। Come closer.
মা ভীত গলায় এগিয়ে গেলেন। বাবা ফিস ফিস করে মাকে কিছু বললেন। কী বললেন আমি শুনতে পেলাম না, তবে নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা। মার মুখের হাঁ বড় হয়ে গেল। বুকে হাত দিয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। তাঁর মাথা মনে হয় ঘুরছে, তিনি পড়ে যাওয়ার মতো ভঙ্গি করছেন। বাবা চেয়ার থেকে উঠে মাকে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। আমি মার সামনে দাঁড়ালাম। চিন্তিত গলায় বললাম, মা কোনো সমস্যা?
মা বললেন, তোর বাবা গাড়ি কিনেছে। ক্রিম কালারের গাড়ি। নয়টার সময় ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসবে। ড্রাইভারের নাম ইসমাইল। কী কাণ্ড দেখেছিস? তোর বাবা গাড়ি কিনে ফেলেছে। আল্লা গো আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হয় স্বপ্ন দেখছি। কে জানে মনে হয় স্বপ্ন। টগরকে ডেকে তুলে গাড়ি কেনার কথা বল। এত বড় একটা ঘটনা, সে ঘুমাচ্ছে এটা কেমন কথা। রহিমার মাকেও ডেকে তোল। সে শুনলে খুশি হবে।
ভাইয়াকে বাবা নিজেই ডেকে তুললেন। গম্ভীর গলায় বললেন, তুই ইঞ্জিনিয়ার মানুষ গাড়ির কলকবজার কি অবস্থা দেখে দে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now