বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
বর্ষাকালের ভোর। চারদিক ভিজে আছে টিপটিপ বৃষ্টির জলে। গ্রামের মাটির ঘরে বসে আছেন ফজলুল হক মাস্টার। বয়স পঁয়ষট্টি ছুঁইছুঁই, মুখে সাদা দাড়ি, চোখে চশমা। ছোট্ট একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সারা জীবন শিক্ষকতা করেছেন। অবসর নেওয়ার পরও তাঁর কাছে প্রতিদিন আসে অনেক ছেলে-মেয়ে, কারও হোমওয়ার্ক বুঝতে সমস্যা, কারও আবার বই কেনার সামর্থ্য নেই—সবাই যেন ভরসা খোঁজে তাঁর কাছে।
এই মানুষটির জীবনটাই শিক্ষা দিয়ে গড়া। তিনি সবসময় বলতেন,
“শিক্ষা মানে শুধু বই পড়া নয়, শিক্ষা হলো মনকে আলোকিত করা, সত্যকে চিনতে শেখা।”
ফজলুল হকের একমাত্র ছেলে কামরুল। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছোটবেলা থেকে বাবার কাছে শিখে এসেছে, শিক্ষা ছাড়া জীবনের আলো জ্বলে না। কিন্তু শহরের চাকচিক্যে এসে সেই বিশ্বাস একটু টলমল হয়ে গিয়েছিল। তার বন্ধুদের কেউ ব্যবসা শুরু করেছে, কেউ দ্রুত টাকা কামানোর পথ ধরেছে। কামরুল মাঝেমাঝে ভাবত—“শুধু পড়াশোনা করে কী হবে? টাকাই তো সব।”
তবুও বাবার কণ্ঠ তার কানে বাজত—“মানুষ গড়ার শক্তি শুধু শিক্ষার হাতে।”
একদিন ঈদের ছুটিতে কামরুল গ্রামে ফিরল। সে দেখল, গ্রামের অনেক কিশোর স্কুল ফাঁকি দিচ্ছে। কেউ মাঠে দিনমজুরির কাজে যাচ্ছে, কেউ আবার শহরে ছোটখাটো ব্যবসা করতে ছুটছে। তাদের চোখে অভাবের ছাপ, স্বপ্ন নেই বললেই চলে।
কামরুলের মনে হলো, এরা যদি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে ভবিষ্যতে সমাজের কী হবে? সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আব্বা, এরা তো পড়াশোনা করছে না কেন?”
ফজলুল হক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“অভাব, বাছা। অনেকে ভাবে, পড়াশোনায় পেট ভরে না। অথচ শিক্ষা ছাড়া পেট তো একদিনও ভরবে না। পেট ভরবে না, মনের আলোও জ্বলবে না।”
কামরুল সেদিন রাতে ঘুমাতে পারল না। তার ভেতরে যেন নতুন একটা আগুন জ্বলে উঠল। সে ঠিক করল, পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু করবে।
কিছুদিনের মধ্যে সে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য একটা ছোট্ট লাইব্রেরি শুরু করল। নিজের পুরনো বই, বাবার সংগ্রহ আর বন্ধুদের দান করা বই দিয়ে সাজাল ঘরটা। প্রথমদিকে খুব বেশি কেউ আসত না। কিন্তু ধীরে ধীরে গ্রামের শিশু-কিশোররা আসতে শুরু করল। তাদের চোখে কৌতূহল, বই হাতে স্বপ্নের ঝিলিক।
রাইহান নামে এক দরিদ্র ছেলে, যে আগে প্রতিদিন ভাঙারি কুড়াত, এখন প্রতিদিন আসে পড়তে। বইয়ের গল্প পড়ে সে একদিন বলল,
“ভাইয়া, আমিও একদিন বড় ডাক্তার হবো।”
কামরুলের বুক ভরে গেল। সে বুঝল, শিক্ষা শুধু দেহ-মনের বিকাশ নয়, শিক্ষা মানুষের স্বপ্নের ডানাও জোগায়।
অন্যদিকে গ্রামের মানুষও পরিবর্তন টের পেতে শুরু করল। আগে যারা মেয়েদের পড়াশোনার প্রয়োজন নেই বলে মনে করত, তারা দেখল, মেয়েরা স্কুলে গিয়ে যখন সুন্দরভাবে লিখতে-পড়তে পারে, তখন সংসারের হিসাবও ভালো রাখতে পারে। মেয়েরা গাইতে পারে কবিতা, লিখতে পারে আবেদনপত্র। ধীরে ধীরে সামাজিক সংকীর্ণতা ভাঙতে লাগল।
কামরুল শহরে ফিরে গিয়ে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের বলল,
“চল, আমরা একটা সংগঠন গড়ি। যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা বিনা খরচে পড়াশোনা শিখবে, নিজেদের দক্ষতা বাড়াবে।”
বন্ধুরা রাজি হলো। তারা সপ্তাহে একদিন গ্রামের লাইব্রেরিতে আসতে লাগল। কেউ ইংরেজি শেখাত, কেউ কম্পিউটার চালানো শেখাত, কেউ আবার স্রেফ গল্প করে সচেতনতা ছড়াত।
গ্রামের মানুষের চোখে তখন ভিন্ন দৃশ্য। যারা একসময় ভাবত—শিক্ষা মানে সময় নষ্ট, তারা এখন বুঝতে শুরু করল—শিক্ষা মানে ভবিষ্যতের আলো।
ফজলুল হক প্রতিদিন বারান্দায় বসে দেখতেন, তাঁর লাইব্রেরি ভরে উঠছে কোলাহলে। চোখের কোণে জল জমে যেত। তিনি ভাবতেন,
“আমার জীবন বৃথা যায়নি। শিক্ষা বীজ বপন করলে তা একদিন গাছ হয়ে সমাজকে ছায়া দেয়।”
কামরুলও বুঝল, শিক্ষা শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে পাল্টে দেয়। শিক্ষা সংকীর্ণতা ভাঙে, মানুষকে সচেতন করে, বৈষম্য দূর করে। যে ছেলে একদিন ভাঙারি কুড়াত, সে এখন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। যে মেয়ে একদিন সংসারের কাজে বন্দি ছিল, সে এখন লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
বছর ঘুরল। রাইহান সত্যিই মেডিকেলে ভর্তি হলো। গ্রামের অন্য মেয়েরা শিক্ষক হলো, কেউ আবার ছোট ব্যবসা শুরু করল। সবকিছুতেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ল।
কামরুল বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে গ্রামে ফিরে এল। সে বলল,
“আমি শহরে চাকরি করব না। আমি গ্রামেই থেকে যাবো। এখানকার মানুষ যদি শিক্ষায় উন্নত হয়, তবে পুরো দেশই এগিয়ে যাবে।”
তার বন্ধুরা প্রথমে অবাক হলো। কিন্তু পরে তারাই এসে তার সাথে যোগ দিল। গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হলো একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কেন্দ্র, যেখানে বইয়ের সাথে সাথে শেখানো হয় সৎভাবে বাঁচা, দায়িত্ব নেওয়া, দেশকে ভালোবাসা।
গ্রামের বৃদ্ধরা একদিন ফজলুল হককে বলল,
“মাস্টার সাহেব, আপনার বীজই ফল ধরেছে। আগে আমরা শুধু টাকার কথা ভাবতাম। এখন বুঝি, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির মুক্তি নেই।”
ফজলুল হক মৃদু হেসে বললেন,
“শিক্ষাই সভ্যতার মূল চালিকা শক্তি। তোমরা তা টের পেয়েছ, এটাই আমার শান্তি।”
সন্ধ্যার আকাশে সূর্য ডুবছিল। চারদিকে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছিল। ফজলুল হক বারান্দায় বসে দেখলেন, গ্রামের ছোট্ট ছেলেমেয়েরা বই হাতে হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছে। তার চোখ ভিজে উঠল। তিনি ফিসফিস করে বললেন—
“মানব জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এটা শুধু আমার নয়, এ প্রজন্মেরও বিশ্বাস হয়ে উঠুক।”
এভাবেই একটি গ্রামের ভেতরে শিক্ষা শুধু ব্যক্তির নয়, সমাজের, রাষ্ট্রের, সভ্যতার—সবকিছুর রূপ পাল্টে
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now