বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আকস্মিক
কাহিনী : নীহাররঞ্জন গুপ্ত
কথা হচ্ছিল আমাদের এক বন্ধু বিভূতিকে নিয়েই।
প্রায় দশ-বারো দিন ধরে আমাদের আড্ডায় সে অনুপস্থিত। কোনও খবর পর্যন্ত নেই। অথচ দলের মধ্যে সেই-ই সবচেয়ে আড্ডাবাজ। রোজকার মতো আমরা আমাদের ক্লাবঘরে এসে সেদিনও সন্ধ্যায় জমায়েত হয়েছি এবং কখন যে আকাশ ভেঙে মুষলধারায় বৃষ্টি নেমেছে টেরও পাইনি। খেয়াল হল রাত সাড়ে নটা নাগাদ। এবারে বাড়ি ফেরা দরকার, কিন্তু দরজা খুলতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তাতে সঙ্গে সঙ্গে আবার দরজাটা বন্ধ করে দিতে হল।
ঝমঝম করে তখনও বৃষ্টি ঝরছে এবং বৃষ্টিছাঁটের ঘন কুয়াশায় চারদিক একাকার। সমস্ত গলিটা জলে ডুবে গিয়েছে, ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত জল থৈ থৈ করছে। সঙ্গে কারো একটা ছাতা বা ওয়াটারপ্রুফ কিছুই নেই। বের হলেই একেবারে স্নান করে যেতে হবে।
তাই সকলে আবার ক্লাবঘরের ভেতরে জাঁকিয়ে বসলাম।
মহীন বলল, " বেরনোই যখন যাবে না তখন ভূতের গল্প শোনা যাক। সরোজ, একখানা জমাটি ভূতের গল্প শোনা দেখি।"
আমাদের মধ্যে বন্ধু সরোজই সাহিত্যিক। শুধু সে সাহিত্যই নয়, চমৎকার গল্প বলবারও তার একটা ক্ষমতা আছে। কিন্তু মহীনের প্রস্তাবে বাধা দিল দিব্যেন্দু, বলল, " না, আমি চাই শচীন আমাদের নতুন কোনও ম্যাজিক দেখাক।"
আমি প্রস্তাবে এবারে সায় দিলাম.." হ্যাঁ, সেই ভাল। শচীন শুরু কর।"
আমাদের দলের মধ্যে শচীন এ্যামেচার ম্যাজিশিয়ান না হলেও ম্যাজিকে সত্যিই তার বাহাদুরি ছিল। আশ্চর্য রকম ম্যাজিক এক এক সময় আমাদের দেখিয়ে সে কতদিন তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঘরের এক কোণে একটা চেয়ারে বসে শচীন আপনমনে একটা সিগ্রেট টানছিল, আমার প্রস্তাবে সে বলল, " ম্যাজিক যে দেখাব, জিনিসপত্র কই?"
ঠাট্টা করে সরোজ বলল, " জিনিসপত্র না হলে ম্যাজিক দেখাতে পারবি না...তবে কিসের ছাই তোর ম্যাজিক?"
শচীন বলল, " ঠিক আছে, শুধু হাতেই দেখাব।"
সকলে উৎসাহিত হয়ে উঠলাম।
" ঘরের আলোটা নিভিয়ে দে", শচীন বলল, " আলোটা নিভিয়ে একটা ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে টেবিলের ওপর রাখ।"
শচীনের কথামতো তাই করা হল। একটা মাত্র ক্যান্ডেলের আলো ঘরের মধ্যে অদ্ভুত আলোছায়ার সৃষ্টি করেছে। আলোকশিখার একটা ছায়া সেই আধো আলো, আধো আঁধারে দেওয়ালের গায়ে কাঁপছে। বাইরে সমানে বৃষ্টি পড়ছে। শচীন তার পূর্বের আসনেই বসা। আমরা ক'জন ঘরের একদিকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছি।
" কি রে, কই, শুরু কর তোর ম্যাজিক", সরোজ বললে।
" চুপ কর। কথা বলিস না", ভারী গলায় বলল শচীন।
তারপর সবাই চুপচাপ। এক মিনিট, দু মিনিট করে প্রায় পনেরো মিনিট কেটে গেল। সবাই অধৈর্য হয়ে উঠেছে।
একসময় সরোজ আবার প্রশ্ন করল, " কি রে শচে, ঘুমোলি নাকি বাবা?"
" চুপ!", শচীন চাপা ধমক দিয়ে উঠল, " দরজাটা খুলে দে, কে এসেছে দ্যাখ"!
সত্যিই! জলের ছপছপ একটা শব্দ আমরা সকলেই শুনতে পেলাম। শব্দটা ক্রমে এগিয়ে এসে বন্ধ দরজার কাছেই থামল।
তারপর দরজার গায়ে শব্দ উঠল....টুক টুক।
" কে?" আমি বলে উঠলাম।
আবার শব্দ টুক টুক। আমিই উঠে গিয়ে দরজাটা খুললাম। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকালো। সেই ক্ষণিক আলোর দীপ্তিতে দেখলাম কে যেন একজন দরজার ঠিক দোরগোড়াতেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে অস্পষ্ট একটা ছায়ার মতো।
" কে?" আমি বললাম।
কিন্তু আগন্তুক আমার প্রশ্নের কোনও সাড়া দিল না, খানিকটা জমাট কুয়াশার মতোই যেন পাশ কাটিয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকতেই আমি দরজাটা যেমন বন্ধ করেছি, সঙ্গে সঙ্গে দমকা হাওয়ায় ঘরের একটি মাত্র ক্যান্ডেলের আলোটি নির্বাপিত হল। মূহুর্তে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার চারদিক গ্রাস করল। এবারে শচীন প্রশ্ন করল, " তুমি কে?"
" আমি বিভূতি ", চাপা দীর্ঘশ্বাসের মতো স্বাভাবিক গলায় সাড়া এল।
" বিভূতি? কে বিভূতি?" শচীন প্রশ্ন করল।
" বিভূতি চক্রবর্তী ", চাপা দীর্ঘশ্বাস আবার শোনা গেল।
হাত বাড়িয়ে দরজাটার ঠিক কাছেই দেয়ালে আলোর স্যুইচটা টিপলাম। খট করে একটা শব্দ হল মাত্র, কিন্তু ঘরের আলো জ্বলল না। আর সেই মূহুর্তেই মনে হল, কে যেন ঠিক আমার পাশেই দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের অজ্ঞাতেই দু পা পিছিয়ে একেবারে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম। ভয়ে তখন আমার গলা পর্যন্ত শুকিয়ে উঠেছে। হঠাৎ এমন সময় মনে পড়ল বিভূতি, বিভূতি চক্রবর্তী, আমাদের বন্ধু। তবে......
সঙ্গে সঙ্গে ভয়টা কেটে গেল।
সোৎসাহে বললাম, " বিভূতি..... তুই!"
" হ্যাঁ!" পূর্বের মতো সেই চাপা কণ্ঠস্বর শোনা গেল। মনে হল যেন বড় কষ্ট হচ্ছে তার কথা বলতে।
আমার মনে পড়ল, বিভূতি তো থাকে সেই ভবানীপুরে। প্রায় দশ বারোদিন আমাদের আড্ডায় আসে না। সে এই প্রচণ্ড বর্ষণমুখর রাতে সেই ভবানীপুর থেকে এসেছে!
একটু বিস্ময়ই লাগে। আমি এবারে প্রশ্ন করলাম, " এই ঝড়জলের মধ্যে এত রাত্রে তুই! ব্যাপার কি বিভূতি? "
বিভূতি আমার প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়ে শচীনকে সম্বোধন করে বলল, " শচীন, তুই আমায় ডাকছিলি কেন?"
প্রশ্ন করল এবার সরোজ, " এই জলের মধ্যে তুই এলি কি করে রে বিভু?"
" জল!"
" হ্যাঁ, বাইরে তো ভীষণ বৃষ্টি! "
" তা হবে।"
" তা হবে কি রে.... চারদিকে জল থৈ থৈ করছে না? আগেই বুঝি বের হয়েছিলি?", সরোজ প্রশ্ন করল।
" না ত! শচীন ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই তো এলাম।"
" ভিজে গেছিস তো একেবারে! " সরোজ বলল।
" না তো!"
আমরা অবাক। বলে কি বিভূতি! ওর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে নাকি!
হঠাৎ আবার বিভূতি বলল, " আমি যাই ভাই!"
" যাবি! কোথায় যাবি এই বৃষ্টির মধ্যে! মাথা খারাপ হল নাকি তোর!"
" আমার বড় কষ্ট হচ্ছে রে, আর থাকতে পারছি না। চললাম", বিভূতির কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা যেন খুলে গেল। আর ঠিক সেই মূহুর্তে ঘরের আলোটা দপ করে জ্বলে উঠল।
কিন্তু কোথায় বিভূতি! আমরা ঘরের মধ্যে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
" বিভূতি! বিভূতি! " আমি ছুটে দরজার বাইরে গেলাম।
বৃষ্টি তখন থেমে গিয়েছে। গলির মধ্যে জল অনেকটা কমে এসেছে। যতদূর দৃষ্টি যায় কাউকে দেখতে পেলাম না। কেবল জলের মধ্য দিয়ে কারোর হেঁটে যাবার ছপছপ শব্দ কানে ভেসে এলো।
পরের দিন দুটো সংবাদ জানতে পারলাম।। একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, গত রাতে প্রচণ্ড তিন ঘন্টাব্যাপী বৃষ্টির মধ্যে শহরের শ্যামবাজার অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ মিনিট কুড়ির জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, রাত্রি নটা পঁয়তাল্লিশ থেকে দশটা পাঁচ পর্যন্ত।
আর একটি খবর....গত রাতে দিনকয়েক ভোগবার পর টাইফয়েডে আমাদের বন্ধু বিভূতি চক্রবর্তী রাত সাড়ে ন'টায় মারা গিয়েছে।
তারপর কতদিন কেটে গিয়েছে কিন্তু সমস্ত ঘটনাটা আজও অস্পষ্ট হয়ে আছে। তবে স্বীকার করতে পারিনি তেমন ব্যাপারটার মধ্যে শচীনের কোন ম্যাজিকের কেরামতি আছে কিনা, যেমনি এও স্বীকার করে নিতে মন চায় নি যে ব্যাপারটার মধ্যে কিছু ভৌতিক আছে। তবে যা ঘটেছিল তা বর্ণে বর্ণে সত্যি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now