বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আদনান এবং ফাইনস্টাইন
--------------------------------
*** আবিদ হোসেন জয় ***
|১|
আদনান ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার সামনে বসে থাকা লোকটির দিকে। লোকটির নাম কামাল হাসান। বয়স পঞ্চাশের ধারে কাছে। লোকটির কপালের নিচে বড় বড় চোখ। লম্বা নাকের নিচে মোটা কালো গোফ। আর মাথা ভর্তি সাদা কালো চুলের মিশ্রন। সে গায়ে কালো রং এর টি-শার্ট পড়ে আছে। টি-শার্টের ওপর আইনস্টাইনের ছবি। ছবিটা বেশ সুন্দর। আইনস্টাইনের মাথা ভর্তি অগোছালো চুল। চুলের ওপর দিয়ে তার সব বিখ্যাত সূত্রের সমীকরনগুলো উড়ছে। তবে সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে অন্যদিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। তেমনি কামাল হাসান ও অন্যদিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। তার একদমি খেয়াল নেই যে একজন তার সামনে বসে আছে। জানালার ছেড়া পর্দার ভেতর দিয়ে সূর্যরশ্মি ঘরে প্রবেশ করছে। কামাল হাসান সেদিকেই তাকিয়ে আছে। আদনান পরপর দু'বার কাশল। কামাল হাসানের মনযোগহরণ করবার চেষ্টা। চেষ্টা বৃথা যায় নি। কামাল হাসান ঘুরে তাকালো। খানিকটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,"দুঃখিত আমি একটু কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম,তুমি যে আমার সামনে বসে আছো আমার খেয়াল ছিল না"। কথাটা শুনে আদনান খানিকটা বিস্মিত হল। কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম মানে কি? সে তো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সূর্যরশ্মির দিকে। আদনান কোনো কথা বলল না। শুধু এক চিলতে হাসি দিল। কামাল হাসান আদনানের দিকে সামান্য ঝুকে এলো। গলা নামিয়ে নিচু স্বরে বলল," তুমি কি জানো যে বস্তুর ভর আছে তার বেগ কখনো আলোর বেগের সমান কিংবা তার বেশি হতে পারেনা"? কামাল হাসান উত্তরের জন্য অপেক্ষা করলেন না। তিনি আবার বললেন," ওকে ফাইন শোনো যে বস্তুর ভর আছে সেই বস্তুর উপর তুমি যত বলই প্রয়োগ কর না কেন তার বেগ কখনো আলোর বেগের সমান কিংবা বেশি হতে পারবে না,তুমি কি জানো কথাটি কোন তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে বলা হয়"? এবারও কামাল হাসান উত্তরের অপেক্ষা করলেন না। সে বলতে লাগলেন," আপেক্ষিক তত্ত্ব, আপেক্ষিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে এই কথা বলা হয়, আপেক্ষিক তত্ত্বটি আইনস্টাইনের,এটি তার বিশাল আবিষ্কার"। কামাল হাসান থামলেন। পুরোপুরি থামলেন না। আরও একটি দীর্ঘ বক্তব্যের জন্য তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছেন। আদনান এবার আর সুযোগ দিল না। হাতে ধরে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,"আপনি বোধ হয় আইনস্টাইনের একজন বড় ভক্ত"। কামাল হাসান এক গাল হাসলেন। আদনান চায়ের কাপে দ্বিতীয় চুমুক দিয়ে বলল,"আমার চাচা আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন,কেন পাঠিয়েছেন তা আপনার মুখ থেকে শুনতে বলেছেন,আপনি কি দয়া করে বলবেন"? কামাল হাসান সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন,"তোমার বাবা মা অনেক আগেই মারা গেছেন,তুমি তোমার চাচার কাছে বড় হয়েছ,এম আই রাইট"? আদনান হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। কামাল হাসান সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল,"তুমি নিঃসঙ্গ জীবন কাটাও, আমিও তোমার মতই একজন নিঃশঙ্গ মানুষ,বিয়েও করা হয়নি,গত পনের বছর ধরে এই বাড়িতে একা বাস করছি,ইদানিং আমার ভেতর ভয় কাজ করে,ভূতের ভয় বলতে পার"। আদনান মৃদু হাসি দিল। হাসি মিশ্রিত স্বরে বলল,"আমি যতটুকু জানি আপনি একজন ফিজিক্সের শিক্ষক ছিলেন,আপনার মুখে ভূতের কথা মানায় না"। কামাল হাসান ক্লান্ত গলায় বললেন,"লজিক মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব রহস্যের কাছেও হার মানে,আমি ইদানিং অদ্ভুত সব রহস্যের গন্ধ পাই"। আদনান তাকে সব পরিষ্কার করে বলতে বললেন। কামাল হাসান তার হাতের বাম পাশে রাখা এস্ট্রেতে সিগারেট ফেলে দিয়ে বলতে লাগলেন,"ক'দিন ধরে আমার ভেতর ভয় কাজ করছে,তার পেছনে কাজ করছে কিছু অদ্ভুত সব রহস্য,আজকের কথাই বলি আমি গত রাতে আমার পড়ার ঘরে গিয়ে দেখলাম আমার হাত ঘড়িটা টেবিলের উপর রাখা,আমি হাতে পড়লাম তখন দেখলাম ঘড়িটা নষ্ট,আমি ঠিক করার চেষ্টা করলাম,ব্যাটারি খুললাম,আমার মনে হল ব্যাটারিটা নষ্ট তাই ফেলে দিলাম,সকালে উঠে দেখি ঘড়ি ঠিক মত চলছে অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে ব্যাটারিটা আমি ফেলে দিয়ে ছিলাম,আমার আলাদা একটা পড়ার ঘর আছে,আর অদ্ভুত সব কর্মকান্ড সে ঘড়টিতেই ঘটে,ইদানিং সে ঘরে ধুকলেই আমার মনে হয় আমি বাদেও সেখানে অন্য কারও অস্তিত্ব আছে,পঁচা গন্ধ পাই,তীব্র গন্ধ, মনে হয় কোনো লাশ কবর থেকে উঠে এসে আমার ঘরে বসে আছে"। কামাল হাসান থামলেন। তার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ।তিনি দ্বিতীয় সিগারেট ধরালেন। প্রথম টান দিয়ে ক্লান্ত গলায় বললেন,"তোমার চাচা এক সময় বিভিন্ন রহস্যের পেছনে ছুটতেন,রহস্য উৎঘাটন করতেন,শুনেছি এখন এসব কাজ সে তোমাকে দিয়ে করায় তাই তোমাকে এ বাসায় থাকতে হবে এবং এসব রহস্য উৎঘাটন করতে হবে,আমি জানি এসব আমার মনের ভুল,এসব ভুল দূর করবার দায়িত্ব তোমার,তুমি দোতলার উত্তর দিকের ঘরটায় থাকবে,আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি"। আদনান চিন্তিত মুখে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,"আমি আপনার পড়ার ঘরটায় থাকব,সেখানে বিছানার ব্যবস্থা করুন,আর আমি মাঝে মাঝে ধুমপান করি সেখানে একটা এস্ট্রে রাখবেন"। কামাল হাসান আনন্দিত হবেন নাকি বিস্মিত হবেন বুঝতে পারছেন না। তিনি তার হাতের ডান পাশের এস্ট্রেটে সিগারেটের ছাই ফেলে বললেন,"তুমি ঐ ঘরে থাকবে ?আচ্ছা আমি বিছানার ব্যবস্থা করছি আর এস্ট্রে নিয়ে ঝামেলা নেই আমার বাসায় দুটো এস্ট্রে,আমার যখন কিছু পছন্দ হয় তখন আমি তা এক জোড়া কিনি"। আদনান খানিকটা বিস্মিত হল। সে এতক্ষন পর লক্ষ্য করলো কামাল হাসানের হাতের দু'পাশে দুটো এস্ট্রে। দুটোই দেখতে এক। লোকটার অদ্ভুত ধরনের শখ তা বলতে হয়। আদনান মুখ থেকে বিস্মিত ভাব সরিয়ে বলল,"এখন আপনাকে আমি একটি ঔষধ দেব,যা আপনাকে চিন্তিত রাখতে কাজ করবে এবং তাতে আপনি ঐসব ভূত তূতের ব্যাপার ভুলে থাকবেন,এই ঔষধের নাম প্রশ্ন ঔষধ। আপনাকে আমি একটি প্রশ্ন করবো আপনি উত্তর খুঁজে বের করবেন"। কামাল হাসান নড়েচড়ে বসলেন। তার ভেতর উৎসাহ কাজ করছে। আদনান গম্ভীর ভাব নিয়ে প্রশ্ন বলতে লাগলো,
"একটি ঘরে একটি লোক একটি কার্য সম্পাদনের চেষ্টায় ছিল। সেই ঘরে এক প্রকার শক্তির উপস্থিতি ছিল। কিন্তু কার্য সম্পাদনের চেষ্টায় সে ঐ ঘরে অন্য একটি জিনিসের উপস্থিতির অভাব অনুভব করছিল। যে জিনিসটির উপস্থিতির অভাব অনুভব করছিল তা ঐ উপস্থিত শক্তির বিপরীত। হঠাৎ ঐ শক্তির অনুপস্থিতিতে যে জিনিসটির উপস্থিতির অভাব লোকটি অনুভব করছিল তার উপস্থিতি ঘটল। প্রশ্ন হচ্ছে লোকটি কি কার্য সম্পাদনের চেষ্টায় ছিল"?
প্রশ্ন শুনে কামাল হাসান চিন্তায় পড়ে গেলেন। ক্ষনে ক্ষনে মাথার চুলে বিলি কাটতে লাগলেন। তার চোখে মুখে চিন্তার ছাপ দেখে আদনানের খুব ভাল লাগছে। লোকটিকে দেখে চালাক মনে হয়। চালাক মানুষদের চিন্তায় ফেলবার অন্য রকম আনন্দ। আদনান মৃদু হেসে বলল,"কি কামাল সাহেব? প্রশ্নের সমাধান করবেন না? আমি জানি আপনি করবেন because Albert Einstein said,
A clever person solves a problem. A wise person avoids it. "
কামাল হাসান কিছু বুঝতে পারলেন না। তিনি তাকিয়ে থাকলেন আদনানের দিকে। তার চোখে মুখে চিন্তার ছাপ ।
|২|
ডায়নিং টেবিলে লাঞ্চের আয়োজন করা হয়েছে। বেশ ভাল আয়োজন। চিংড়ি দিয়ে কড়োলা ভাজি,কৈ মাছ ভুনা,বেগুন ভাজা আর পাতলা ডাল। আদনান এবং কামাল হাসান আয়েশ করে খাচ্ছেন। কাজের ছেলে পিন্টু খাবার সার্ভ করছে। আদনান বেছে বেছে একটি চিংড়ি মুখে দিয়ে বলল,
-রান্নার হাত বেশ ভাল।
কামাল হাসান উত্তর দিলেন,
-আমার এই কাজের ছেলে বেশ ভাল রান্না করে,শাহবাগে এক হোটেলে কাজ করতো,উঠিয়ে নিয়ে এসেছি।
-হুম বুঝলাম।
-আদনান,তোমার ঔষুধটা বেশ কাজে দিয়েছে,আমি রীতিমত চিন্তায় পড়ে গেছি।
-উত্তর খুঁজে পেলেন?
-নাহ,তবে শীঘ্রই পাব।
আদনানের খাওয়া শেষ। প্লেটে হাত ধুয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো। কামাল হাসান বললেন,
-তোমার রুমের ব্যবস্থা করা হয়ে গেছে,কাজের ছেলেকে দিয়ে বিছানা পেতে দিয়েছি আর এস্ট্রেও রেখে আসা হয়েছে।
-ধন্যবাদ
-আদনান আমি একটু বাইরে যাব,আসতে আসতে রাত হবে,আমার পড়ার ঐ ঘরে টেবিলের উপরে কিছু দরকারি চিঠি আর একটি ডায়েরি রাখা আছে,তুমি একটু আমার ঘরে রেখে যেও।
আদনান মৃদু হেসে বলল,"আপনার ঐ ঘরে যেতে ভয় করছে নাকি"? কামাল হাসান কোনো উত্তর দিলেন না। লজ্জিত ভঙ্গিতে খেতে লাগলেন।
আদনান, কামাল সাহেবের পড়ার ঘরে এসে বসেছে। বেশ বড় জায়গা। এক পাশে পড়ার টেবিল অন্য পাশে বিছানার ব্যবস্থা। টেবিলের পাশে দুটো বুক সেল্ফ। বুক সেল্ফ ভর্তি মোটামোটা সব বই। আদনান টেবিলের কাছে গিয়ে দাড়ালো। কিছু চিঠি আর একটি ডায়েরি চোখে পড়লো। দেখে মনে হচ্ছে বেশ পুরোনো ডায়েরি। কয়েকটি চিঠি খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। এক পাশে খাম এক পাশে চিঠি। আদনান একটি চিঠি হাতে নিল। চিঠিগুলোও বেশ পুরোনো। চিঠির সম্বোধন দেখে অদ্ভুত লাগলো। ছোট ছোট অক্ষরে লিখা "প্রিয় নাসরিন"। তার মানে এ বাড়িতে অন্য একজনেরও বসবাস ছিল। সে চিঠির পাশে রাখা খাম হাতে নিল। খামে এ বাড়ির ঠিকানা লিখা। খাম দেখে সপ্ষ্ট বোঝা যায় এসব চিঠি কুরিয়ারে পাঠানো হয়েছিল। খামের উপরে কুরিয়ারের সিল। প্রাপকের নাম "রেবেকা নাসরিন"। প্রেরকের নাম "মুনা আক্তার"। আদনান সিগারেট ধরালো। চেয়ার টেনে বসলো। চিঠির খাম গুলো দেখতে লাগলো। কোন কোন তারিখে চিঠিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে সেদিনগুলোর তারিখ লিখা রয়েছে। তারিখগুলো দেখে আদনানের খটকা লাগলো। ২০০৬ সালের চিঠি। তার মানে দশ বছর আগের। কামাল হাসান বলেছিলেন তিনি গত পনের বছর যাবৎ নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। তার মানে তিনি একটি মিথ্যে কথা বলেছেন। যেখানেই মিথ্যে সেখানেই রহস্য। আসলেই এই ঘরটা রহস্যময়। আদনান সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মনে মনে একটি সিদ্ধান্ত নিলো। সে ভূত থেকে শুরু করে এ ঘরের সব রহস্য উৎঘাটন করবে। কে জানে? পরে যদি দেখা যায় দুটো রহস্যই এক সুতোয় বাধা! আদনান ডায়েরি আর চিঠি গুলো টেবিলের উপরে গুছিয়ে রাখলো। কোন খাম কোন চিঠির সব গুছিয়ে রাখলো। কামাল হাসান বাসা থেকে বের হলেই এসব নিয়ে আর একবার বসতে হবে। আদনান তার হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। ঘড়ির কাঁটাগুলো ঘুরছে না। ঘন্টার কাঁটা বন্ধ হয়ে আছে দশটার ঘরে।
|৩|
সন্ধ্যা হবে হবে করছে কিন্তু এখনো হয়নি। বাইরে আলো আধারের সংমিশ্রন। কামাল হাসান বাসায় নেই। আদনান নতুন বিছানায় পা তুলে বসেছে। তার সামনে পুরোনো ডায়েরি আর চিঠিগুলো। আর বিছানার পাশে এস্ট্রে। কামাল হাসানের বলা একটি মিথ্যে কথার পেছনে কোনো একটি রহস্য লুকিয়ে আছে। আদনানের অখন্ড মনযোগ এখন সেখানে। এই রহস্য উৎঘাটন করার জন্য এখন সে তার প্রিয় সুত্রের খেলা খেলবে। প্লাস মাইনাসের সুত্র। তার প্লাস দরকার। তার জন্য দুটি মাইনাস দরকার। মাইনাসে মাইনাসে হয় প্লাস। তাই তাকে মাইনাস হিসেবে পরপর দুটি নেগেটিভ কাজ করতে হবে। তাতে যদি রহস্য উৎঘাটন হয় তবে সেটাই হবে কাঙ্খিত প্লাস। প্রথম যে নেগেটিভ কাজটি করতে হবে তা হচ্ছে কামাল হাসানকে বলতে হবে এই ঘরে সে কোনো চিঠি আর ডায়েরি পায় নি। দ্বিতীয় নেগেটিভ কাজটি হচ্ছে কামাল হাসানের পারমিশন ছাড়াই ডায়েরি আর চিঠিগুলো পড়তে হবে। আদনান সবগুলো চিঠি থেকে সর্বশেষ সংগ্রহ করা চিঠিটি আলাদা করলো। যেদিন সংগ্রহ করা হয়ে সেদিনের তারিখটা একটি সাদা খাতায় লিখলো। ২৬শে জুন ২০০৬। আদনান সেই চিঠিটি পড়তে শুরু করলো। অদ্ভুত ব্যাপার। চিঠিটি পড়ে মনেই হচ্ছে না যে প্রেরক কোনো মহিলা। স্পষ্ট বোঝা যায় যিনি চিঠি লিখেছেন সে একজন পুরুষ। এবং এটি একটি প্রেম নিবেদন পত্র। আদনান আরও কয়েকটি চিঠি পড়লো। সবগুলো চিঠি একই ধরনের। প্রেম নিবেদন পত্র। এবং প্রেরকের পরিচয় অস্পষ্ট। কিছু কিছু জায়গায় কামাল হাসানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে "ফাইনস্টাইন" বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এবং "ফাইনস্টাইন" নামটা দ্বারা তাকে নিয়ে খানিকটা কটুক্তি করা হয়েছে। আদনান চিঠিগুলো রাখলো। এবার ডায়েরি খুললো। আশ্চর্যজনক ব্যাপার ডায়েরিটিও ২০০৬ সালের। আদনান ভাল মতো ডায়েরির পাতাগুলো দেখতে লাগলো। তেমন কোনো কিছু চোখে পড়লো না। প্রতিটি পৃষ্ঠার লিখাই বেশ সুন্দর এবং স্বাভাবিক বাংলা ভাষা। হঠাৎ তার একটি পৃষ্ঠা দেখে খটকা লাগলো। লাল কালি দিয়ে লিখা একটা কবিতা-
আমার জন্য আহত তুমি আমি অপরাধি
নাটকের পর্দা সরিয়ে ফেললেন নিজেই প্রকৃতি
তোমাকে খুঁজতে নম্র হৃদয় বিষাদের সাথে গেছে মিশে
শত কলহ পরে আজ ছিন্ন আমি,তোমার থেকে দূরে সরে
খটকার বিষয় এই কবিতার কিছু কিছু জিনিস গাড়ো করে লিখা। কলম দিয়ে জোরে চাপ দিয়ে লিখা হয়েছে দেখলেই বুঝা যায়। আমার এর আ, জন্য এর জ,আহত এর আ,তুমি এর মি,নাটক এর না,সরিয়ে এর সরি,ফেললেন এর ন,তোমাকে এর কে,খুঁজে এর খু,নম্র এর ন,কলহ এর ক,পরে এর রে,ছিন্ন এর ছি। কলম দিয়ে চেপে এই লিখাগুলো আদনান দেখতে লাগলো। এখন মাথায় কিছু ধুকছে না। সময় নিয়ে ভাবতে হবে।
আদনান তার সাদা খাতায় আরও কয়েকটি তথ্য লিখলো।
প্রেরক: রুনা আক্তার(পুরুষ)
প্রাপক: রেবেকা নাসরিন
চিঠি সমূহ: প্রেম নিবেদন পত্র
কামাল সাহেব = ফাইনস্টাইন
কবিতা
মেইন ফোকাস: ২৬শে জুন ২০০৬।
আদনান খাতা রেখে জানালার কাছে গিয়ে দাড়াঁলো। জানালা দিয়ে তাকালেই একটি ডাস্টবিন চোখে পড়ে। সেখানে কিছু কুকুর খাবার খুঁজছে। চিকন চিকন দু'পা দিয়ে ময়লাগুলো সরিয়ে খুঁজছে। আদনান সিগারেট ধরালো। তার ইচ্ছে করছে কুকুর গুলোকে কিছু রুটি কিনে দিতে।
|৪|
বেশ ক'দিন পার হয়ে গেছে আদনানের কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। অগ্রগতি যে একদম নেই তাও বলা যায় না। কিছু কাজ আদনান করে
রেখেছে এখন শুধু শিওর হবার পালা। শিওর হয়ে দেখতে হবে সে কি ঠিক পথে হাঁটছে কিনা। তাই নেই শব্দটা কাজ করছে। এখন সকাল নয়টা। আদনান আর কামাল হাসান ডাইনিং টেবিলে বসে চা খাচ্ছে।
কামাল হাসান চায়ের কাপে চুমুক দিলো। চিন্তিত মুখ নিয়ে বলল,"আদনান তুমি কি সেদিন সত্যিই আমার টেবিলের উপর কোনো চিঠি আর ডায়েরি পাওনি"? আদনান না সূচক মাথা নাড়িয়ে বলল,"না পাইনি"। কামাল হাসান বললেন,"দেখেছো? বললাম না ? ঐ ঘরে ভূতুরে সব কান্ড ঘটে"। আদনান বলল,"আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন?" কামাল হাসান বললেন,"না পাইনি তবে খুঁজছি"। আদনান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াঁলো। কামাল হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল,"আমি একটু শাহবাগ থানায় যাচ্ছি,আমার এক বন্ধুকে গত রাতে থানায় নিয়ে এসেছে,যাই গিয়ে একটু দেখে আসি"। কামাল হাসান ক্লান্ত স্বরে বলল,"টাকা পয়সা লাগবে তোমার? লাগলে নিয়ে যাও"।
না লাগবেনা ফাইনস্টাইন সাহেব,আমি যাই- বলেই আদনান দ্রুত ঘর ছেড়ে বের হল। কামাল হাসান আতকে উঠলেন। তারা মাথা কাজ করছে না। আদনান কি "ফাইনস্টাইন সাহেব" বললো নাকি "আইনস্টাইন সাহেব" বললো? প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো ।
রাত দশটা বাজে আদনান এখনো বাসায় ফেরেনি। তবে সে নিয়ে কামাল হাসান মাথা ঘামাচ্ছেন না। তিনি অখন্ড মনযোগে আদনানের প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। ঘরে একটি শক্তির উপস্থিতি ছিল। শক্তি টা কি? এটা জানতে পারলে উত্তরটা বের করা সহজ হতো। কামাল হাসান হঠাৎ দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগলেন। কেন যেন ইচ্ছে করছে পড়ার ঘরটায় যেতে। তিনি হাঁটতে হাঁটতে পড়ার ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাড়াঁলেন। ভেতরে অদ্ভুত ভয় কাজ করছে। তিনি হালকা ধাক্কা দিয়ে দরজা খুললেন। অলস পায়ে ভেতরে ধুকলেন। চারদিকে থমথমে অন্ধকার। হঠাৎ তার মনে হলো সেখানে তিনি ছাড়া আরও একজন আছে। তিনি অনুমান করে টেবিলের দিকে অগ্রসর হলেন। হঠাৎ তার হাতের ধাক্কায় টেবিলের উপর রাখা পানি ভর্তি গ্লাস টেবিলের উপর পড়লো। তারপর গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেলো। ঝন্ ঝন্ শব্দে ভেঙ্গে গেল গ্লাস। তিনি আতকে উঠলেন। গ্লাসের পানিতে তার ডান হাত ভিজে গেছে সেখানে তার খেয়াল নেই। তিনি ডান হাত দিয়ে অন্ধকারে সুইচ বোর্ড খুঁজতে লাগলেন। তাৎক্ষনিক তিনি সুইচের সংস্পর্শে এসে ছোটখাটো একটি শক খেলেন। তিনি চিৎকার দিয়ে নিচে পড়ে গেলেন। ঠক্ করে মাথা মাটিতে লাগলো। হাতের একটা অংশ পড়লো ভাঙ্গা কাঁচের উপর। কাজের ছেলে পিন্টু চিৎকার শুনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। পিন্টুর গলার স্বর উপরে উঠে গেছে। উচ্চস্বরে বলছে-"সাহেব কি হইছে আপনার?কি হইছে?"
ঘন্টার কাঁটা এগারটার ঘরে ঘুরছে। কামাল হাসানকে তার বিছানায় নিয়ে আসা হয়েছে। হাতে সাদা ব্যান্ডেজ। আর মাথায় ভেজা কাপড়ের পট্টি। ভয় পেয়ে জ্বর ১০৪ডিগ্রিতে উঠে গেছে। আদনান তার পাশে বসে বসে মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছে। কামাল হাসান নিচু স্বরে বললেন,"আদনান তুমি কখন এলে?দেখলে কি হয়েছে আমার?" আদনান উত্তর দিলো"জ্বি দেখলাম তো"।
-আদনান আমার একজায়গায় যেতে খুব ইচ্ছে করছে,তুমি কাল সকালে আমায় সেখানে নিয়ে যাবে?
-কোথায় যাবেন?
-একবার আমার স্কুলটায় যাব,রিটায়ার্ড করার পর থেকে মাঝে মাঝেই সেখানে যাই,ছোট ছোট ঘাস ভর্তি মাঠে বসে থাকি।
-আচ্ছা নিয়ে যাব কিন্তু আপনারতো জ্বর?
-এই জ্বর সকালেই ঠিক হয়ে যাবে।
-আচ্ছা
-আদনান আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি কিন্তু পারছিনা তুমি একটু লাইট টা অফ করে দিয়ে চলে যাও।
আদনান উঠে দাড়াঁল। সুইচ টিপে লাইট অফ করে বলল-
কামাল সাহেব এখন ঘুম আসছে?
-হ্যা আসছে
-এতক্ষন লাইট জ্বলছিল,লাইট থেকে আমরা কি পাই?
-আলো
-আলো কি?
-এক প্রকার শক্তি
-আপনি ঘুমানোর জন্য এতক্ষন কিসের উপস্থিতি অনুভব করছিলেন?
-অন্ধকারের
-আলোর বিপরীত কি?
-অন্ধকার
-এখনকি আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন?
কামাল হাসান কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছেন। আদানান দ্রুত পায়ে রুম ছাড়লো। নিজের ঘরে এসে দেখলো ভাঙ্গা গ্লাসের কাঁচের টুকরো পড়ে আছে। সে সাবধানে সেগুলো সরাতে লাগলো। হঠাৎ দেখলো টেবিলের নিচে একটি ঘড়ির ব্যাটারি পড়ে আছে। সে ব্যাটারিটি হাতে নিল। তারমানে কামাল সাহেব ঠিক বলেছেন। তিনি ব্যাটারিটি ফেলে দিয়েছিলেন। আদনান ছোট গোলাকার ব্যাটারিটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।
|৫|
আদনান আর কামাল হাসান মাঠে বসে আছেন। কামাল হাসান ঠিক বলেছিলেন স্কুলের মাঠ ভর্তি সবুজ ঘাস। খুব সুন্দর ঘাস। একবার বসলে আর উঠতে ইচ্ছে করেনা। আকাশও মেঘলা। রোদের ঝামেলা নেই। কামাল হাসান আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,"আদনান তোমার রহস্য উৎঘাটনের কাজ কতদূর হল"? আদনান ও আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,"কাজ শেষ"। কামাল হাসান উৎসাহ নিয়ে বললেন-
একএক করে সব বলো।
-এখনই শুনবেন?নাকি বাসায় গিয়ে শুনবেন?
-এখনই বলো।
-প্রথমে ঘড়ি দিয়ে শুরু করি,ঘড়ির ব্যাপারটা খুবই সাধারন,আপনার একটা অদ্ভুত শখ আছে,আপনার যখন কিছু পছন্দ হয় আপনি তা এক জোড়া কিনেন।ঘড়িটাও আপনি এক জোড়া কিনেছিলেন। তার মধ্যে একটি ঘড়ি ছিল নষ্ট যা টেবিলের উপর ছিল। সেটার ব্যাটারি আপনি খুলে ফেলে দিয়েছিলেন,আর সকালে যে ঘড়িটি দেখে ছিলেন ঠিক সেটা আপনার অন্য আরেকটি ঘড়ি,আপনি চিন্তিত থাকার কারনে এ ব্যাপারটি খেয়াল করেন নি। তারপর আসি গন্ধের ব্যাপারটায়,আপনার বাসার পাশেই একটি পরিত্যক্ত জায়গা আছে যেখানে মানুষ ময়লা ফেলে,সেখান থেকেই মাঝে মাঝে পঁচা গন্ধ আসে,আর আপনার মনের ভুলের কারনে আপনি সেই ঘরে অন্য কারও অস্তিত্ব অনুভব করেন এবং ডাস্টবিনের গন্ধকে লাশ পঁচা গন্ধ মনে করেন। আর আপনার মনের ভুলগুলো হচ্ছে একটি ভয়ের কারনে। সেই ভয়ের রহস্যটাও আমি উৎঘাটন করেছি।
এ কথা শুনে কামাল হাসানের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। যেন চোখগুলো বাইরে বের হয়ে আসছে। আদনান আরও একটি বড় বক্তব্যের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে বলতে লাগলো,
"আপনার টেবিলের উপর যে চিঠিগুলো ছিল তা দেখে আমার খানিকটা খটকা লাগে,এই চিঠিগুলো রেবেকা নাসরিন নামক একজন মহিলার,বেশ কয়েকটি চিঠি পড়েই বুঝতে পারলাম চিঠিগুলো প্রেম নিবেদন পত্র,সেখানে পরক্রিয়ার ছাপ স্পষ্ট এবং রেবেকা নাসরিন সম্পর্কে আপনার কিছু হয়। কিন্তু আপনি আমাকে মিথ্যে বলেছিলেন। আপনি বলেছিলেন পনের বছর ধরে আপনি একা বাস করেন তাই এই মিথ্যের রহস্যের পেছনে আমি ছুঁটতে থাকি। রেবেকা নাসরিনকে যে চিঠিগুলো পাঠাতো সে তার নাম গোপন রাখে। আমি সর্বশেষ সংগ্রহ করা চিঠিটার তারিখ খুঁজি। তা ছিল ২৬শে জুন ২০০৬। আপনার ডায়েরিটিও ২০০৬সালের। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে আপনি আপনার ডায়েরির জুনের ২৬ তারিখের পৃষ্ঠাতে আপনার লিখা কবিতায় এক অদ্ভুত ইঙ্গিত প্রকাশ করেন। কিছু কিছু জিনিস কলমে জোড়ে চাপ দিয়ে একটু গাড়ো করে লিখেন। গাড়ো করে লিখা অংশগুলো যদি সিরিয়াল অনুযায়ি বসাই তাহলে হয় "আজ আমি নাসরিনকে খুন করেছি"। তখনই আমি ধারনা করি রেবেকা নাসরিন আপনার স্ত্রী এবং অন্য কারও সাথে প্রেমের সম্পর্ক থাকার কারনে আপনি তাকে খুন করেন। শিওর হবার জন্যই আমি সেদিন আপনাকে মিথ্যে কথা বলে আপনাদের শাহবাগ থানায় যাই। আমি জানতাম আপনি অবশ্যই ২৬শে জুন ২০০৬তারিখে আপনারে স্ত্রীর নামে থানায় একটি মিসিং ডায়েরি করে থাকবেন যাতে সবাই ধারনা করে আপনার স্ত্রী মিসিং। পরিচিত পুলিশ অফিসার থাকার কারনে সে আমাকে হেল্প করে এবং আমার ধারনাটাই সঠিক হয়। আপনি একটি মিসিং ডায়েরি করেন। আমার ধারনা আপনি খুনটা আপনার পড়ার ঘরে করেন তাই সেখানে গেলেই আপনার ভয়টা কাজ করে।
কামাল হাসান হাত দিয়ে ইশারা করে আদনান কে থামিয়ে দিল। ক্লান্ত স্বরে বলল,"থাক আর কিছু বলতে হবে না"। আদনান চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। চারিদিকে এক অদ্ভুত নিরবতা নেমে এসেছে। হঠাৎ কামাল হাসান নিরবতা ভেঙ্গে বললেন,"আদনান একটা রিক্সা ঠিক কর,থানায় যাব,আমি সব স্বীকার করব"।
তিন চাকার রিক্সা ছুঁটছে। আদনান এবং ফাইনস্টাইন সাহেব পাশাপাশি বসে আছেন। চারিদিকে অন্ধকার বিরাজ করছে। পুরোপুরি অন্ধকার না। আলো অন্ধকারের সংমিশ্রন। হঠাৎ হাওয়া বইতে লাগলো। ঝড়ো হাওয়া। রিক্সাও দ্রুত ছুঁটতে লাগলো প্যাডেলের পর প্যাডেলে। যেন আপেক্ষিক তত্ত্ব ভেঙ্গে আলোর বেগে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now