বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আচরণের আয়নায় বাবা-মা

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। নীলিমার বয়স সাত। চঞ্চল, প্রাণবন্ত, আর একটু দুষ্টু– ঠিক যতটা হলে শিশুটি শিশুই থাকে। বাড়ির উঠোনে দৌড়ে বেড়ানো, দড়িলাফ, মাটিতে চক দিয়ে গোল কাটা—এসব তার প্রতিদিনের খেলা। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে নীলিমার মেজাজে যেন একটু অন্যরকম ঝাঁজ ধরা পড়েছে। মাঝে মাঝে সে রেগে যায়, হঠাৎ কান্না শুরু করে, কোনো কথা বুঝতে না পেরে গুমরে থাকে। মা মেহজাবিন ভাবেন, হয়তো এটা “বয়সের দোষ”—তাই তিনি কখনো বকেন, কখনো চড় বসিয়েও দেন। বাবা আরমানও অনেক সময় অফিসের ক্লান্তি নিয়ে এসে মেয়ের কান্নাকাটিতে বিরক্ত হন। একদিন সন্ধ্যায় ঘটল ঘটনাটা। নীলিমা তার রঙপেন্সিলগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে দিয়ে ছবি আঁকছিল। মা তাকে বারবার বলছিলেন, “খেলাধুলা করে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখবে।” কিন্তু নীলিমা যেন শুনছেই না। হঠাৎ করে কলমের পানি ভর্তি ছোট হোল্ডারটা উল্টে পড়ে। পানি গড়িয়ে রঙ ছড়িয়ে পুরো মেঝে নীল-হলুদ হয়ে গেল। মেহজাবিন তেতে উঠলেন। রাগের মাথায় মেয়ের হাতটা ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “তুই বুঝিস না? সব নষ্ট করে ফেললি!” নীলিমা থরথর করে কেঁদে উঠল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু বুকের ভেতর ভয় জমে গলায় আটকে গেল। বাবা আরমানও ঘরে ঢুকে পরিস্থিতি দেখে রুক্ষ গলায় বললেন, “এত দুষ্টুমি করলে শাস্তি ছাড়া উপায় নেই।” তারা তাকে নিজের ঘরে পাঠিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ছোট্ট মেয়েটির চোখে তখন প্রশ্ন—“আমাকে কেউ বুঝবে না?” সে রাতে নীলিমা খাওয়া পর্যন্ত করেনি। মা দরজা খুলে দেখলেন, মেয়েটি চুপচাপ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখে পানি শুকিয়ে দাগ রেখে গেছে। সেই নিস্তব্ধ দৃষ্টি মেহজাবিনকে কাঁপিয়ে দিল। মনে হলো, তিনি যেন নিজের মেয়ের ভরসার জায়গাটা ভেঙে দিয়েছেন। আরমানও চুপ হয়ে গেলেন। দুজনেই বুঝলেন, তারা ভুল করেছেন—অধিক রাগে, অস্থিরতায়। কিন্তু এখন কীভাবে ঠিক করবেন? সেই রাতেই দুজন সিদ্ধান্ত নিলেন—তারা মেয়েকে শুধু শাসন নয়, বুঝে শিখতে সাহায্য করবেন। রাগের বদলে ভালোবাসা দিয়ে পথ দেখাবেন। কারণ একটা শিশু ভুল করলে সেটা তার অপরাধ নয়—সে শিখছে, চেষ্টা করছে, বুঝতে চায়। তারা নিজেরাই যদি আঘাত দেন, সেই ছোট হৃদয়ে ভরসা জমবে কী করে? পরদিন সকালে আরমান নীলিমাকে পাশে বসিয়ে কোমল গলায় বললেন, — “বাবা, গতকাল আমরা তোমার ওপর রেগে গেছি। আমরা ভুল করেছি। তুমি কি আমাদের বলবে, কেন রঙ ছড়িয়ে গিয়েছিল?” নীলিমা একটু ইতস্তত করল, তারপর ছোট কণ্ঠে বলল, — “আমি … আমি সাগর আঁকছিলাম। পানি লাগছিল রঙটায়। কিন্তু হাত ফসকে গেল…” মেহজাবিনের চোখে পানি এসে গেল। এই ছোট্ট ব্যাখ্যা তিনি একটুও শোনেনি, শুনতেও দেননি। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন, — “তুমি ভুল করেছ, ঠিক আছে। কিন্তু আমরা শাস্তি দিয়ে ভুল করেছি। এখন থেকে আমরা তোমাকে বুঝে বলতে চাইব, তুমি-ও তোমার কথা বলবে, ঠিক আছে?” নীলিমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তার চোখে ভয় ধীরে ধীরে গলে ভরসার আলো ফুটে উঠল। এরপর তাদের ঘরে একটু একটু করে বদল এল। মেহজাবিন আর আরমান বুঝলেন—শিশু দুষ্টুমি করে কারণ সে তার বোঝার সীমার বাইরে কিছু অনুভব করে। ক্ষুধা, ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব, উদ্বেগ—সবই তাকে আচরণ দিয়ে জানানোর চেষ্টা করায়। তাই তারা নীলিমার আচরণের দিকে নজর দিতে শুরু করলেন। যেমন, দুপুরে নীলিমা যদি বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ে, মেহজাবিন বোঝেন—সে হয়তো ঘুমায়নি। সন্ধ্যায় যদি কান্নাকাটি করে, বুঝতে পারেন—হয়তো স্কুলে কোনো কিছু তাকে কষ্ট দিয়েছে। খাবার খেতে না চাইলে হয়তো সে বিরক্ত, বা কারো কথায় মন খারাপ। একদিন এমনই এক বিকেলে নীলিমা হঠাৎ কান্না শুরু করল। আগে হলে মেহজাবিন বলতেন—“এটা আবার কেমন বায়না?” কিন্তু এবার তিনি মেয়েকে কোলে নিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, — “কি হয়েছে মা?” নীলিমা নাক টেনে বলল, “স্কুলে আঁকার খাতাটা হারিয়ে গেছে। ম্যাডাম রাগ করবেন…” মা হেসে বললেন, “রাগ করলে করতেই পারেন। কিন্তু তুমি তো ইচ্ছে করে হারাওনি, তাই না? চলো, নতুন খাতা কিনে আনি। আর যদি পাওয়া যায়, ভালোই। না পাওয়া গেলে অসুবিধা নেই, হারানো জিনিস আবার নতুন করে শুরু করা যায়।” এই কথায় নীলিমার মুখে হাসি ফুটল। সে বুঝল—সমস্যা হলে মা-বাবার কাছে আসা যায়, শাস্তি নয়—সমাধান পাওয়া যায়। একদিন সন্ধ্যায় ঘটল আরেকটি ঘটনা। নীলিমা খেলতে খেলতে ফুলদানিটা ভেঙে ফেলল। শব্দ পেয়ে আরমান দৌড়ে এলেন। তিনি প্রথমে রাগতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মেয়েটির মুখ দেখে থেমে গেলেন। খুব ভয় পেয়ে গেছে, চোখে পানি জমে আছে। আরমান গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, — “বাবা, এসো একটু বসো।” ওরা দুজন একটা কোণে বসল। বাবা বললেন, — “তুমি ভেঙে ফেলেছ, ঠিক আছে। এটা ভুল। ভুল করলে কি হয়? আমরা ঠিকটা শিখি। এখন তুমি কী করতে পারো?” নীলিমা ভেবে বলল, — “আমি ঝাড়ু এনে তুলে ফেলব।” আরমান বললেন, — “ঠিক। আর দৌড়ানোর সময় খেয়াল রাখবে। তুমি না ভাঙতে চাওনি—কিন্তু ভুল হয়েছে। ভুল মানে শাস্তি নয়, বুঝে নেওয়া।” সেদিন প্রথম নীলিমা তার বাবার কোলে মাথা রেখে বলেছিল, — “বাবা, তুমি রাগ করোনি কেন?” আরমান হেসে বলেছিলেন, — “কারণ রাগলে তুমি ভয় পাবে। ভয় পেলে তুমি বোঝার সুযোগ পাবে না। আমি চাই তুমি বোঝো।” মেহজাবিন-আরমান যখন ভালোভাবে যোগাযোগ শুরু করলেন, বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল। আগের মত চাপা উত্তেজনা নেই। ভুল করলে শাস্তির ছায়া নেই। আছে বোঝাপড়া, কথা বলা, শান্ত স্বর। তারা মাঝে মাঝে নীলিমাকে “টাইম-আউট” দেয়—শাস্তির মতো নয়, বরং “শান্তির বিরতি” হিসেবে। — “চলো মা, দুজনেই একটু নিঃশ্বাস নেই।” নীলিমাও অভ্যাস করে ফেলল নিজের রাগ-ক্ষোভ কিছুক্ষণ আলাদা বসে সামলে নিতে। এতে সে ধীরে ধীরে দায়িত্ববোধ শিখতে লাগল। বুঝতে শিখল—প্রত্যেক কাজের ফল আছে, ভালো কাজের ভালো ফল, আর ভুল করলে সংশোধন। এতে তার ভেতরের স্থিরতা আর আত্মবিশ্বাস বাড়তে লাগল। একদিন ক্লাসে এক সহপাঠী তার রঙ চুরি করে নিয়ে যায়। আগে হলে নীলিমা হয়তো রাগ করত বা চুপ করে থাকত। কিন্তু এবার সে শিক্ষককে গিয়ে শান্তভাবে বলল, — “ম্যাডাম, সে ভুল করেছে। আপনি তাকে বলুন যেন ভবিষ্যতে না করে। আমি রাগ করি নাই।” শিক্ষিকা অবাক হলেন। মাত্র সাত বছরের শিশুর ভেতর এমন পরিপক্বতা কিভাবে? উত্তর লুকিয়ে ছিল তার ঘরে—তার বাবা-মায়ের পরিবর্তনে। রাতে মেহজাবিন শুনলেন নীলিমার কথা। — “মা, তুমি জানো? আমি কাউকে মারিনাই। বাবা যেমন বলে—শান্ত থাকলে সব ঠিক হয়।” মেহজাবিন মেয়েকে দেখে বুঝলেন—তারা ঠিক পথেই হাঁটছেন। কারণ শিশুর আয়না বাবা-মা। তারা যদি রাগ দেখান—শিশু রাগ শিখবে। তারা যদি ভালোবাসা দেখান—শিশু ভালোবাসাই শিখবে। একদিন সন্ধ্যায় তিনজন মিলে ছাদে বসে ছিল। বাতাসে ওড়ানো নীলিমার চুলে হাত বুলিয়ে আরমান বললেন, — “তুমি জানো মা, গাছ যখন ছোট থাকে নাড়াচাড়া করলেই ভেঙে যায়। কিন্তু যত্ন করলে, সময় দিলে, পানি দিলে—গাছটা বড় হয়ে শক্ত হয়। তুমি-ও তেমনই।” নীলিমা হেসে বাবার কাঁধে মাথা রাখল। মেহজাবিন মনে মনে বললেন— “শিশুকে বড় করতে শাসন নয়, ভরসা লাগে।” এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীলিমার ভেতরে শক্ত শেকড় গড়ে উঠল—ভয় নয়, ভালোবাসার শেকড়। আর যে শিশু ভালবাসার আলোয় বড় হয়, সে নিজের মতো করে একদিন আকাশ ছুঁতে পারে—অভিমান নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়ে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আচরণের আয়নায় বাবা-মা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now