বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সাদা-হলুদের কম্বিনেশনের হ্যান্ডব্যাগটা অনেকক্ষন থেকেই দেখছি।ঘুরে-ফিরে চোখ ঐদিকেই চলে যাচ্ছে।ব্যাগ আর স্যান্ডেল;এই দুইটা জিনিসের প্রতি আমার দুর্বলতা অনেক আগে থেকেই।পাশে দাঁড়ানো লোকটাকে কি বলবো, ‘’ব্যাগটা আমার পছন্দ হয়েছে।কিনে দেওয়া যায় কি?’’ কি করবো বুঝতে পারছি না,অস্বস্তি ঘিরে ধরে আছে।যে লোকটাকে মাত্র একসপ্তাহ ধরে চিনি তার কাছে কোন জিনিস চাওয়ার আবদার করতে পারছি না।লোকটাকে প্রথম দেখায় ভীষন অহংকারী মনে হয়,যে নিজেকে ছাড়া আর কিছুই বোঝে না,আশেপাশের সবাই মূল্যহীন।আমারও তাই মনে হয়েছিলো।কিন্তু তবুও আমাকে তার ঘাড়েই গছিয়ে দিয়েছেন আমার খালা-খালু।আপাতদৃষ্টিতে অহংকারী এই লোকটা আমার স্বামী।
দশ বছর বয়স থেকে যে মেয়ে খালা-খালু’র কাছে মানুষ হয় তার অনেক সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হয়,কষ্ট পেলেও হাসিমুখে থাকার অভ্যাস করতে হয়,কথায় কথায় কান্নাকাটি করলে চলে না,চট করে বাস্তবতার সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিতে হয়।খালার বাসায় জীবন শুরু করার পর থেকে আমি কঠিন বাস্তববাদী মেয়ে।কোন শখ-আহ্লাদ নেই।এইটা পছন্দ না,ওইটা ভালো লাগছে না এসব কথার কোন সিন নেই।খালা যা এনে দেবে,যা খেতে দেবে মুখ বুজে মেনে নিতে হবে।মা-বাবা মরা এতিম মেয়ে কি’না!তাও খালা নিজের কাছে এনে রেখেছে এই না আমার কত ভাগ্য!আমি নিজেই যেখানে চুলে ঝুঁটি করা,ফ্রক পড়া ছোট বাচ্চা ছিলাম সেখানে আমাকেই আমার দুই বছর বয়সের পিচ্চি বোনটাকে সারাদিন দেখে রাখতে হত।খালা-খালু অফিস চলে যাওয়ার পর আমিই টুকটাক ঘরের কাজ করতাম।ব্যাপার না!আমার সহ্য হয়ে গিয়েছিলো।বাবা-মা’র অতি আদরের মেয়েটা হঠাৎ অন্য জগতে ঢুকে চট করে সব শিখে নিয়েছিলো।তবুও আপনজন বলতে খালা-খালু আর এই বোনটাই আমার সব।তারা যা করেছেন তাই বা কয়জন করে!
বাইরে থেকে আমি অত্যন্ত কাঠখোট্টা,আবেগহীন একটা মেয়ে।অতি হাসির কথায়ও আমার হাসি পায় না,দুঃখের ঘটনায়ও আমার চোখে জল আসে না।ভার্সিটিতে আমার নাম দেওয়া হয়েছিলো ‘ঢেউটিন’!কেন এই নাম দেওয়া হয়েছিলো আমি জানি না,জানার আগ্রহও হয় নি।আমার আবেগ যেমন কম সেরকম আমার আগ্রহ-কৌতূহল সবই কম।ভার্সিটিতে আমি ক্লাস করতে যেতাম,থার্ড বা ফোর্থ বেঞ্চে বসতাম,মন চাইলে লেকচার তুলতাম নয়তো না,গ্যাপ টাইমে ক্যান্টিনে একটা সিঙ্গারা-সমুচা আর এককাপ চা খেয়ে কমনরুমে চলে যেতাম;হয় ঘুমাতাম না’হয় গান শুনতাম।রেজাল্ট করতাম মাঝারি মানের।আহামরি স্টুডেন্ট আমি কখনোই ছিলাম না।আমার এসব রোবটিক আচরণের মাঝেই আমি খুব লুকিয়ে,আড়াল করে একটা স্বপ্ন দেখতাম।চোখ বুজলেও দেখতাম,চোখ খুলে রেখেও দেখতাম।আমি ছোট থেকেই যে বড় ভালোবাসার কাঙ্গাল,আমার এই কাঙ্গালপনাটা মুখোশ দিয়ে ঢেকে রাখতাম কিন্তু মনে মনে গুমড়ে কাঁদতাম।কেউ একজন,কোনএকদিন ভরাট কন্ঠে,আবেগী হয়ে,চোখে চোখ রেখে আমাকে বলবে ‘’ইপ্সিতা,তোমাকে এত ভালোবাসবো যেন তোমার জীবনে ভালোবাসার অভাব আর কখনো না হয়।‘’ খুবই সিনেম্যাটিক একটা কথা,কিন্তু তবুও আমি এমনই ভাবতাম।কেউ তো একজন আছে,কেউ।যে আমার কথা শুনতে চাইবে,বাইরের এই আবেগহীন ইপ্সিতাকে না ভিতরের মায়াবী ইপ্সিতাকে দেখতে পাবে।কিন্তু না,এরকম কিছু হয় নি।স্বপ্নটা আমার থেকে গেছে স্বপ্নের রাজ্যেই,বাস্তব আর হয়নি।
খালা-খালু আমার জন্য অতি অহংকারী এক ছেলে পছন্দ করলো,আমাকে কিছু বলার প্রয়োজন মনে না করে বিয়ে ঠিক করে ফেললো।আমার অভ্যাস আছে এসবের তাই আমিও চুপচাপ রাজি হয়ে গেলাম!আর কত বোঝা হবো তাদের উপর!ছোট থেকেই ঝামেলা হয়েই আছে তাদের কাছে।ছেলেটাকে প্রথম দেখে আমার কেন যেন প্রচণ্ড হাসি পাচ্ছিলো।না,সে দেখতে মোটেও জোকারের মত না।দেখতে-শুনতে ভালোই।হাসি পাচ্ছিলো কারন ছেলেটাকে পুরা আমার কার্বন-কপি মনে হচ্ছিলো।কেমন যেন পাথর-পাথর চোখ-মুখ!আমার বোন তার হবু দুলাভাইয়ের সাথে কি যেন ঠাট্টা-মস্করা করছিলো কিন্তু সে বেচারা কাঠ-কাঠ হয়ে বসেছিলো।মুখে কোন ভাঁজ নেই,একেবারে খোদাই করা মূর্তি!আমার কেন যেন হঠাৎ হাপ-পা শিরশির করতে লাগলো।সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন আবেগহীন মানুষ একটা সংসার শুরু করবে,যেখানে কোন ভালোবাসা থাকবে না,সব হবে মাপা মাপা,কথাও হয়তো হবে না,এরকম একটা অদ্ভুত জীবনের কথা ভেবে হয়তো বা ভয় লাগছিলো।আমার ভয় আবার বেশিক্ষন স্থায়ী হয় না,এটাও হলো না!আমিও পাথর-পাথর মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।পাথরে পাথরে কাটাকুটি;ঘর্ষণে জ্বলবে আগুন!
সেই ছেলের সাথেই আমার বিয়ে হয়ে গেলো।একেবারে সাদামাটা বিয়ে।কোন জাঁকজমক নেই।ছেলেটারও বাবা-মা কেউ নেই।সে মামার কাছে মানুষ!হায়রে!আমার কার্বন-কপি তো আর এমনিই মনে হয় নি।এরও ভালোবাসা পেয়ে বোধহয় অভ্যাস নেই।শুরু হলো ইমন রায়হান নামক অতি অহংকারী লোকের সাথে আমার অদ্ভুত জীবন।
সে সকালে অফিস চলে যায়,দুপুরে একবার খেতে আসে,সন্ধ্যা সাতটার দিকে ফেরে।ঘুমাতে যায় রাত বারোটায়।সব রুটিন মাফিক।আমি আর সে ছাড়া বাসায় আর কেউ নেই।অদ্ভুত নিস্তব্ধতা সারাদিন ঘিরে থাকে এই বাড়িকে।প্রয়োজনের বেশি আমরা কেউ কোন কথা বলি না!তার সাথে আমার কথা হয় এরকম,
-ভাত বাড়বো?
-হুম।
-তরকারী খেতে কেমন হয়েছে?
-ঠিক আছে।
-আলোটা নিভিয়ে দিলে ভালো হয়;চোখে লাগছে।
-আচ্ছা,দিচ্ছি।
-দুপুরে খেতে আসা হবে?
-হুম।আসবো।
শেষ।এর বেশি কিছু না।মজার ব্যাপার হলো আমরা দুজনই কথা বলি ভাববাচ্যে।কেউ কাউকে ‘আপনি-তুমি’ কিছুই সম্বোধন করি না।তবুও সংসারটা আমার খুব একটা খারাপ লাগছে না,বরং ভালো লাগছে,ভীষন ভালো।সবকিছু নিজের মনে হচ্ছে।একেবারে আপন।এই কম কথা বলা,অহংকারী মানুষটাকেও।
আজ একটু কেনাকাটা করতে বের হয়েছিলাম।ঘর গোছানোর জিনিসপত্র।কেনাকাটা শেষ।বাসায় চলে এসেছি।না।সেই ব্যাগটার কথা লোকটাকে আর বলা হয় নি।অস্বস্তি,অদ্ভুত ধরনের এক অস্বস্তি।প্যাকেটগুলো খুলছি এক এক করে।হঠাৎ একটা প্যাকেট খুলে চমকে উঠলাম।আমি সহজে যদিও চমকাই না,তবুও এবার চমকালাম।সাদা-হলুদে মেশানো সেই ব্যাগ;আমার পছন্দ করা ব্যাগটা।সে খেয়াল করেছে!কখন?আবার অস্বস্তি লাগছে,আগেরবারের চেয়ে বেশি।
-ব্যাগটা পছন্দ হয়েছে?
-হুম।
-বললেই হত।আমি কি বাঘ না ভাল্লুক?
-তা তো আমি বুঝতে পারি না।
-বোঝার চেষ্টা করা হয়?
-না।তাও হয় না।কেন যেন ইচ্ছে হয় না।
-এত ইচ্ছে না করলে চলবে কি করে?আমাদের বাচ্চা-কাচ্চা তো একেকটা রোবট হবে।বোমা মারলেও টূঁ শব্দ বের হবে না!
আমার মুখে কেন যেন একটু হাসি ফুটে উঠলো।একেবারে অল্প।
-ইপ্সিতা,একটু হাসো তো!তোমার হাসি দেখি।আমার সবসময় ইচ্ছে ছিলো জানো,আমি ভীষন মিষ্টি হাসির একটা মেয়েকে বিয়ে করবো,যার হাসি মনে এমনিই আনন্দ আনে।
-আমি তো হাসতে জানি না।হাসলে আমাকে বিশ্রী লাগে।
-কে বলেছে?
-কেউ বলেনি।আমার মনে হয়।
-আমার হাসিও না’কি হায়নার মত।এই দেখো......।
লোকটা কি একটা মুখভঙ্গী করলো,পেট গুলিয়ে হাসি চলে আসলো।অনেকদিন এভাবে হাসি না আমি,অনেকদিন।
-এই মেয়ে,তোমার তো দেখি বাম গালে টোল পড়ে।দেখলে বুকের বাম পাশে ব্যাথা করে।
-তাই?
-মেয়ে,আমাকে ভালোবাসবে?অনেকখানি?খুব ভালোবাসবে?আমার চারপাশ খুব নিঃস্ব ছিলো;চারদিকে কেউ নেই।তুমি আমার সবটুকু হবে?মায়ায় চারদিক ভাসিয়ে দেবে?
আবেগহীন আমার চোখে জল আসলো কি?গাল ভেজা ভেজা লাগে।কাঁদছিই বোধহয়।কাঁদাও ভুলে গিয়েছিলাম।এই লোক আমাকে হাসালো,আবার এখন কাঁদাচ্ছেও।আমরা দুই ভালোবাসার কাঙ্গাল মানুষ আমাদের চারপাশ মায়ায় ভরিয়ে দেবো,এতদিন ভালোবাসা না পাওয়ার সব কষ্ট-দুঃখ এক করে সুখ বানিয়ে দেবো।উপরের কঠিন মুখোশটা আজ থেকে আর পড়বো না,আজ থেকে আবেগের এক ডিব্বা হবো!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now