বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁখি ও অদৃশ্য ছায়া

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান প্রণব ভট্টাচার্য (০ পয়েন্ট)

X “আঁখি ও অদৃশ্য ছায়া লেখক-: ডাক্তার (প্রফেসর) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য এম.ডি (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) ;এফ আই সি প্যাথলজি, ডব্লু.বি.এম.ইএস (অবসরপ্রাপ্ত) লেখক-: প্রফেসর ডাক্তার প্রনব কুমার ভট্টাচার্য। এম. ডি (কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,): এফ আই সি প্যাথলজি , ডব্লু বি এম এস( অবসর প্রাপ্ত প্রফেসর ও প্রধান প্যাথলজি বিভাগের) ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ, কৃষ্ণনগর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স ,পালপাড়া মোড় , কৃষ্ণনগর, নদীয়া জেলা , পশ্চিম বঙ্গ । পূর্বতন দ্বিতীয় অধ্যক্ষ জে. এম. এন মেডিক্যাল কলেজে, পঞ্চপোতা, চাকদহ। নদীয়া জেলা। পশ্চিম বঙ্গ । পূর্বতন প্রফেসর এবং প্রধান, প্যাথলজি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস ক্যাডারের , পূর্বতন প্রোফেসর ও প্রধান, প্যাথলজি বিভাগের স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন ,কলকাতা–৭৩ পশ্চিমবঙ্গ। একাডেমিক এডভাইজার, রানীগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স, রানীগঞ্জ পশ্চিম,বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গ । এডভাইজার টু দি ভাইস চ্যান্সেলর, আফ্রিকান হেলথ রিসার্চ অর্গানাইজেশন ওপেন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন রচনা তারিখ-:.১৫.০৩ .২০২৬ এডিট করা -: . কপিরাইট-: সম্পূর্ণ ভাবেই প্রফেসর ডাঃ প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের । Belongs primarily to Prof. Dr. Pranab Kumar Bhattacharya And to his first degree and direct blood relationship under strict Copyright acts and laws of Intellectual Property Rights of World Intellectual Property Rights organisations ( WIPO) , RDF copyright rights acts and laws and PIP copyright acts of USA 2012 where Prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya is a registered member and also to his first degree blood relation only. For every one else other wise mentioned ,Please Don't try ever to infringe the copyright of the any content idea theme of philosophy dialogues events characters and scene of published manuscript in any form whatsoever it is to protect yourself from criminal offences suit filed in court of laws in any places of india and by civil laws for compensation in few millions US dollar or in pounds or in Euro in any court of laws লেখকের রেসিডেন্স এর ঠিকানা-: মহামায়া এপার্টমেন্ট। মহামায়াতলা, ১৫৪ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড,পোস্ট অফিস -গড়িয়া, কোলকাতা ৮৪, E mail profpkb@yahoo.co.in শহরের প্রান্তে, ইস্পাতের ধূসর দীপ্তি আর শিল্পকারখানার ধোঁয়ায় মোড়া এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দাঁড়িয়ে ছিল নতুন এক চিকিৎসা-শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। আধুনিকতার বাহ্যিক জৌলুসে ঝলমল করলেও তার অন্তর্গত পরিসর ছিল মানুষের অহং, আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও অদৃশ্য দ্বন্দ্বে ভরা—যেন এক নীরব নাট্যমঞ্চ। এই মঞ্চেই প্রবেশ ঘটেছিল আঁখির। আঁখি প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের, স্টীল নগরী, দুর্গাপুরের এক প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের হিউম্যান রিসোর্স ( HR) ডিপার্টমেন্টে প্রথমে অ্যাস্টিন্ট ও পরে প্রমোশন পেয়ে, ডেপুটি ম্যানেজার হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন । আঁখির বয়েস এখন প্রায় ৪১ ছুঁই ছুঁই। আঁখি উচ্চ শিক্ষিত। ইংরেজি সাহিত্যে, বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী করে, ম্যানেজমেন্ট এম বি এ করেছিল সে অনলাইন কোর্সে। এরপরে , এর আগেও পশ্চিমবঙ্গের দু দুটি মেডিক্যাল কলেজে সে কাজ করছে এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসাবে, এখানে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে ডেপুটি ম্যানেজার হিসাবে যোগ দেবার আগে। আঁখির মাস মাইনে ছিল ৩৫০০০/ মাসে। সঙ্গে অবশ্য ফ্রি এবং ফার্নিশড দুই কামরার ফ্ল্যাট , ফ্রি বিদ্যুৎ, ফ্রি জল, এসি মেশিন ও গাড়িতে যাতায়াত এবং দুপুরের ক্যান্টিনে খাবার, এই কলেজের প্রিন্সিপাল ফাল্গুন স্যার এর সুপারিশে ডিরেক্টর দীপাঞ্জন স্যারের কাছে এই সুবিধেগুলো পেয়েছিল সে । ফ্ল্যাট পাবার আগে এখানকার ম্যানেজমেন্ট তাকে একটা হোটেলে ঘর নিয়ে রেখেছিলেন। আঁখি বিবাহিত অথচ সন্তানহীনা একজন মহিলা। বছর ছয়েক আগে তার বিয়ে হয়েছে এক পুঁজিবাদী অত্যন্ত ধনী পরিবারের ব্যবসায়ী, পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সের এক ব্যবসায়ী লোকের সাথে। নানা রকমের অ্যালোপ্যাথি ,হোমিওপ্যাথি , আইউর বেদ ঔষধের ডিলারের ব্যবসা তাদের দুর্গাপুরে। আখির শ্বশুর বাড়ীটাও দুর্গাপূর সিটিতে। বেশ উচ্চবিত্ত স্বচ্ছল উচ্চ শিক্ষিত পরিবার তাদের। আঁখির বাবা ও মা অবশ্য অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের থেকে উঠে আসা। আঁখির বাবা বর্ধমানের এক গ্রামের থেকে জীবনে অনেক কষ্ট করে, অনেক স্ট্রাগল করেই, আসতে আসতে, ওপরে উঠেছিলেন। একটি আধা সরকারী কোম্পানির ম্যানেজার হিসাবে উনি অবসর গ্রহণ করেছিলেন । বর্তমানে উনি ৭৮ বছর বয়সী। কিন্তু শারিরীক দিক থেকে এখনও উনি খুব ফিট ও খুবই ডিসিপ্লিনড জীবন যাপন করা এক ভদ্রলোক। কোন রকমের নেশা ছিলো না আর নেইও। শরীরেও কোনো অসুখ নেই ওনার ।আঁখির মা সাধারণ এক গৃহবধূ ও সুন্দরী। তিনি তার স্বামীর ওপরে সারা জীবননির্ভরশীল এবং আঁখিদের সংসারে আঁখির বাবাই ছিলেন শেষ কথা। এইরকম দেখেই কিন্তু আঁখি বড় হয়ে উঠছিলেন সংসারে ।আঁখির বাবা ওনার যৌবনে, ওনার ছয় ভাইদের মানুষ করেছেন এমন কি ওনার একমাত্র বোনেরও বিয়ে দিয়েছেন। আঁখিরাও দুই বোন ও এক ভাই। আঁখি ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। আঁখির ছোট ভাই বর্তমানে কোলকাতাতে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত। সে মোটামুটি ভালোই বেতন পায়। গাড়ি আছে ও নিজেই সেটা ড্রাইভ করে। তার বিয়ে হয়েছে বছর কয়েক হল। সল্টলেকে একটা বাড়ীতে ভাড়া নিয়ে ,পরিবার নিয়ে থাকে তারা। কোম্পানিই বাড়ি ভাড়া দেয়। তাদের একটি ছোট ছেলে আছে । সে আঁখির খুবই কাছের এবং আঁখির একরকম প্রাণ ভোমরাই বলা চলে। আঁখির শ্বশুর বাড়ীও দুর্গাপূর সিটির টাউনের মধ্যেই। আঁখির এখনও কোন সন্তান হয়নি। আঁখি ও তার বর চায়না তাদের মাঝখানে আপাতত কোন সন্তান আসুক। আঁখি কিনা প্রথমে বিয়েই করবেন না বলে ঠিকই করেছিলেন। বিয়েতে প্রবল আপত্তি ছিলো আঁখির। আঁখির জীবনে প্রেম আসেনিও কখনো। আসবে কী করে? ওনার ধারে কাছে কোনো পুরুষ মানুষ ঘেঁষতে সাহস করেনি। আঁখিকে নাকি সবাই সমীহ আর ভয় করে চলত। আঁখি সেটা অবশ্য খুব গর্ব করেই বলেন। এর কারণ আঁখি ছিলেন খুবই নাক উঁচু,কঠিন স্বভাবের, উচ্চ বিত্তের,আর অসম্ভব রকমের খুতখুতে ও খিচখিচ করা স্বভাবের ফেমিনিস্ট এক মহিলা । তার কলেজ জীবনে বা ইউনিভারসিটিতে কেউই সাহস করে ওঠেনি তার ধারে কাছে ঘেঁষতে বা তাকে এগিয়ে এসে প্রেম নিবেদন করতে। তাই কোনো পুরুষের স্বাদ, প্রেমের স্বাদ, বিয়ের আগে আঁখি কখনো পায় নি। আর এটা নিয়ে আঁখিও বিন্দু মাত্র মাথা ঘামায়নি আগে। প্রেম বা ভালবাসা যাই হোক সেটা বিয়ের পরে তার স্বামীর সাথেই শুরু ও শেষ। আঁখি তার ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত রকমের স্বার্থপর, নিজের ও নিজের পরিবারে গন্ডি আর নিজেকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে শিখিয়েছ তাকে। হাসপাতল ম্যানেজমেন্ট এর লাইনে অনেক অনেক বড় হতে চায় সে। নিজের বরের ওপর বা শ্বশুর বাড়ির অন্য কারুর ওপরে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা হওয়া তার নাকি স্বভাব বিরুদ্ধ এবং সেই ভাবেই তৈরী সে। এই ভাবেই আঁখি তার ছোট বেলা থেকে গড়ে উঠেছিল । আঁখি ফেমিনিস্ট। দুর্গাপুরেই তার স্কুল ও কলেজে। আঁখির কোন বন্ধু বা বান্ধবী নেই সেই অর্থে। একমাত্র বরই তার বন্ধু ও বান্ধবী। আঁখি কোলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে নতুন একটা প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ এ হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন সম্প্রতি ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসের মাঝে। আঁখির কাজ যেমন মেডিক্যাল কলেজের জন্য শিক্ষক ফ্যাকাল্টি ,রেসিডেন্ট, টিউটর,অধ্যাপকদের নিয়োগ করা মেডিক্যাল কাউন্সিলের ২০২৩ এর গেজেট নিয়ম মেনে তেমনই নতুন এই মেডিক্যাল কলেজের জন্য অন্য স্টাফদের নিয়োগ করা নানারকম কনসালটেন্সি ফার্ম গুলোর সাথে কন্টাক্ট করে , তেমনি তাদের কাকে কত মাইনে বা প্যাকেজ দেওয়া হবে, বা কোন প্যাকেজ তারা জইন করবে, তাদের মাইনে বা টাকা পয়সা ঠিক মত ছাড়া হল কিনা প্রতি মাসে,তাদের ছুটির হিসেব রাখা ,স্টাফদের স্যালারী সিট তৈরী করা, তাদের রোজকার কলেজে এন্ট্রি ও এক্সিট এটেনডেন্স রাখা ও দেখা,তাদের কাজ কর্ম সুবিধে অসুবিধে গুলো দেখভাল করা, মেডিক্যাল কলেজের ন্যাশানাল মেডিকেল কমিশন ভিজিট করার আগে ফ্যাকাল্টি ও রেসিডেন্টদের দেওয়া ডিক্লারেশন ফর্মগুলো ওনারা ঠিকঠাক মত ভর্তি করতে পেরেছেন কিনা, ফ্যাকাল্টি বা রেসিডেন্টরা ডিক্লারেশন ফরমের সঙ্গে সব রকম ডকুমেন্টএর জেরক্স কপি দিয়েছেন কিনা সেটা বারে বারে চেক করে দেখা চেক লিস্ট ধরে এইসব । কলেজের প্রিন্সিপালকে দিয়ে সই করানোর আগে সব ড্যকুমেন্ট ওনারা দিয়েছেন কিনা চেক লিস্ট মিলিয়ে দেখা । কলেজের প্রিন্সিপাল এর এবং সি ই ও সাহেবের নির্দেশ ও এই মেডিক্যাল কলেজের ট্রাস্টি মালিকদের মর্জি ও হুকুম মত কাজ করা ও তাদের দেওয়া নির্দেশ গুলোকে ঠিক মত ভাবে পালন করা একই সাথে। এর জন্য আঁখির সাথে আরও চার জন জুনিয়র এক্সিকিউটিভ ও ছিলো। আঁখির সাথে সাথেই একজন প্রবীণ অধ্যাপকও (৬৮ বছরের প্রবীণ উনি) এই কলেজে যোগ দিয়েছিলেন ডিপার্টমেন্টাল প্রফেসর ও এই মেডিক্যাল কলেজটার প্রিন্সিপাল হিসেবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেলথ ডিপার্টমেন্ট সরকারি চাকরী থেকে উনি ৬৫ বছরে এর পরে অবসর গ্রহণ করবার পর । তিনি এই মেডিক্যাল কলেজে যোগ দেবার আগেও যেহেতু অন্য একটা প্রাইভেটে কলেজে প্রিন্সিপাল হিসাবে কাজ করছিলেন এবং অন্য আরেকটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ডিপার্টমেনাল প্রফেসর ও হেড হিসাবে কাজ করছিলেন , সরকারী চাকরী থেকে অবসর নেওয়ার পর, তাই তাকে টেম্পোরারি ভাবে মাত্র এক বছরের জন্য এই কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্বে রেখেছিলেন ট্রাস্টির মালিক তিনজন মিলে। অধ্যাপক ফাল্গুন ছিলেন—বয়সে প্রবীণ, অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ, অথচ আচরণে এক আশ্চর্য সরলতা।তিনি কোনো প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে নিজেকে বাঁধেননি।তার কথায় ছিল মাধুর্য, আচরণে ছিল মমতা, আর দৃষ্টিতে ছিল এমন এক গভীরতা—যেখানে বিচার নয়, বোঝাপড়াই ছিল মুখ্য। যদিও প্রথমের দিকে আঁখি কিন্তু নিজের মন থেকে মেনে নিতে চাননি যে ডাক্তার ফাল্গুন এই নতুন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে বেশী দিন থাকুন। আঁখি নিজেই তাই বেশ কিছুটা চালাকি করে অন্য একজন প্রফেসরকে নিয়ে এসেছিল শিশু বিভাগে প্রফেসর করে, যাতে সে পরে এই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ হতে পারে ২০২৪ এর সেপ্টেম্বর মাসের পরে পয়লা অক্টোবর এর পর থেকে । সেই হিসেবে আঁএগিয়ে যেতে। কিন্তু এই নতুন মেডিক্যাল কলেজে তার যাত্রাটা যেন তার কাছে এক অদ্ভুত ধাঁধার মতো হয়ে উঠেছিল। ডিরেক্টর দীপাঞ্জন স্যারের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিন থেকেই আঁখি বুঝেছিল, এখানে নিজের স্থান ধরে রাখতে হলে শুধু কাজের দক্ষতাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন হবে রাজনীতির কৌশলেরও। তবুও, আঁখি দৃঢ় ছিল। আঁখির কাছে এই মানুষটি ছিল এক অমীমাংসিত ধাঁধা।সে দেখত—যেখানে সে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেখানে ফাল্গুন ছেড়ে দেন;যেখানে সে কঠোরতা দেখায়, সেখানে তিনি হাসেন;যেখানে সে সম্মান দাবি করে, সেখানে তিনি নিঃশব্দে সম্মান বিলিয়ে দেন। এ যেন দুই বিপরীত দর্শনের সংঘর্ষ— একদিকে অধিকার, অন্যদিকে আত্মসমর্পণ। একদিন মেডিক্যাল কলেজের নতুন ফ্যাকাল্টি রিক্রুটমেন্টের এবং ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের ইন্সপেকশন এর প্রস্তুতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে আঁখি খুবই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই তার পরিকল্পনা গুলো পেশ করছিল। সেই সময় হঠাৎই প্রিন্সিপাল ফাল্গুন স্যার নীরবভাবে বললেন,"আঁখি, মাদ্যাম ফ্যাকাল্টি রিক্রুটমেন্ট ও ডিক্লারেশন ফরমের এই কাজটা আপনি ভালোই করছেন তাই এর পরের থেকে আপনিই করবেন আর ঊষশি ও দীপা মিলে SAF তৈরি করার কাজ গুলো সব করবে। তবে একটা কথা মনে রাখা উচিত—যে গাছ বেশি ডালপালা ছড়ায়, তার শিকড় গুলো যদি দুর্বল হয়, সে কিন্ত ঝড় এলে নিজেকে সামলাতে পারে না।" আঁখি কথাটার গুরুত্ব ততটা অনুভব করকেন না। বরং সে নিজের পথেই এগোতে লাগল নিজের মতন করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে । একটা সুপিরীরটি কমপ্লেক্সে ভুগত আঁখি। আঁখির মনে ধীরে ধীরে এক অস্থিরতা জন্ম নিতে লাগল।সে বুঝতে পারছিল—তার সমস্ত পরিশ্রম, দক্ষতা, নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও মানুষ তাকে ভালোবাসে না, শুধু মান্য করে।অন্যদিকে ফাল্গুন—কোনো দাবি ছাড়াই মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিচ্ছেন।এ ছিল তার কাছে এক অস্বস্তিকর সত্য। তার মনে প্রশ্ন জাগল—“সম্মান কি আদায় করা যায়, নাকি তা অর্জন করতে হয়?”কিন্তু প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর সাহস তার ছিল না। _“আমি বলছি, ঐ যে নতুন অধ্যক্ষ জয়েন করেছেন , যেন কিছুতেই আমাদের পক্ষে আসবেন না,” আঁখির গলাটা বেশ তীক্ষ্ণ, ও অগ্নিময়। সবার সামনে বসে থাকা জুনিয়র HR সুপ্রিয়কে লক্ষ্য করে বলল, “তুমি তো দেখেছ সুপ্রিয়, প্রিন্সিপাল স্যার কিভাবে সবকিছুকে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করেছেন নিজের ডিপার্টমেন্টকে আর কলেজটাকেও ?” “এখানে যে একটা HR ডিপার্টমেন্ট বলে যে কোনো পদার্থ আছে সেটা মনে হচ্ছে ধর্তব্যের মধ্যেই নেই ওনার । আর কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে ও উনি নিজের পজিশন থেকে নিজেকেও অনেক নিচে নামাচ্ছেন সকল স্টাফকে প্রশ্রয় দিয়ে, সকলের সাথে বন্ধুর মত মেলামেশা করে। তাই না? সকল স্টাফকে এতো প্রশ্রয় দেবার কি মানে? তুমি তো কলেজের প্রিন্সিপাল। চেয়ারটার আর সম্মান রেখেছে বলে মনে হয় কী তোমার কাছে ?” _“হ্যাঁ সেটা আমিও লক্ষ্য করছি বেশ কয়েক মাস ধরেই, কিন্তু আপনি কি এটা জানেন ম্যাডাম, এই নতুন অধ্যক্ষ ফাল্গুন স্যার আসলে ঠিক কতটা সম্মানিত একজন অধ্যাপক ও ব্যক্তি? সমস্ত পৃথিবী জুড়েই ওনার বেশ নাম ডাক আছে কিন্তু। আমি গুগল সার্চে এ ওনার নাম দিয়ে সার্চ করে দেখেছি। লোকটাকে দেখেও বোঝার উপায় নেই যে সমগ্র পৃথিবী জুড়েই ওনার নাম। অনেক পুরস্কারের পর পুরস্কার উনি পেয়েছেন। সুপ্রিয় মাথা নেড়ে বলল। _“ওনার অভিজ্ঞতাও কিন্তু অনেক, আবার ছাত্র অবস্থায় উনি নাকি ইউনিভার্সিটির সব পরীক্ষাতেই টপার ছিলেন কলকাতা ইউনিভার্সিটির ওয়েব পেজে সেটাও আছে উল্লেখ করা আছে আর শুনেছিতো উনি স্টুডেন্ট ইউনিয়নও করতেন মেডিক্যাল কলেজে, নকশালদের ছাত্র ইউনিয়নের হয়ে । আপনি যদি...” _“আমি যদি কি?” আঁখির চোখে মুখে তখন বেশ রাগের ছাপ। “আমিইবা খামোখা কেন তাকে এতো সম্মান দিতে যাব শুনি ? মান্য করতে যাবো? আমিও তো এখানে HR ম্যানেজার। তাই নয় কি? আমি চাই, এখানের সবাই আমার কথাই শুনুক। মেনে চলতে শিখুক। আমার চেয়ার এর সম্মানটুকু দিক”। অথচ দেখ ওনার প্রশ্রয় পেয়ে এখানে অনেকেই আমাকে পাত্তাই দিতে চায় না”। আঁখির এটাই স্বভাব হঠাৎ করেই বিনা কারণে রেগে যায় সে। আর রেগে গেলে সেটার বহিঃপ্রকাশ তেমন ভাবে বোঝা যায় না তার ব্যবহারে । শুধুই ওর চোখ মুখ দেখে বোঝা যায় সেটা। খুবই গম্ভীর হয়ে যায়।কথা বলে না সহজে ।আঁখির কখন যে মুড পরির্বতন হবে কেউ সেটা জানে না! আঁখি নিজেও বোধ করি জানে না । তখন ঘন ঘন কাকে যেন সে মেসেজ করে ওয়াটস অ্যাপ বা ল্যাপটপে মুখ নিচু করে। কী মেসেজ করে সে? কাকে মেসেজ করে কে জানে? কী বলে সে?? _“আপনি যদি এখানকার সবার প্রতি একটু নম্র হতেন ম্যাডাম …” সুপ্রিয় বলার আগেই একসাথেই বলল দীপা,_ “তাহলে হয়তো ভালো হবে। এত বেশি রাগ আর অহংকারে লাভ নেই গো ম্যাডাম। সবাইকে একটু ভালো করে বুঝিয়ে দিতে তো পারেন ঠিক কোথায় সে ভুলটা করছে । সেটাই তো লিডারশিপ । সেটা না করে সকলের সামনে তাকে অপমান করেন কেন? আপনি তো লিডার।আর অপমান করে কি লিডার হোয়া যায় ম্যাডাম? দেখুনতো আমাদের প্রিন্সিপাল সাহেবকে । সকলের সাথে কেমন মিসে গেছেন। কি সুন্দর ভাবে মিষ্টি কথায বুঝিয়ে বলেন সকলকে। আমার তো মনে হয় রাগ অপমান জিনিসটাই ভগবান ওনার শরীরে দেন নি” দীপা একজন পাস করা বি টেক আর্কিটেক ইঞ্জিনিয়ার। অংশুমানের স্ত্রী । প্রেম করেই তাদের বিয়ে তাদের বছর দুই আগে। অংশুমানও MTech ইঞ্জিনিয়ার। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ফ্যাকাল্টি ছিলো সে এখানে আসার আগে। সেখানেই দীপার সাথে তার প্রেম ও পরে বিয়ে। দিপার গায়ের রং খুব ফরসা আর বেশ সুন্দরীও সে। কনভেন্টে স্কুলে পড়া। অংশুমানের বাড়ি মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনাতে। বনেদি বংশের ছেলে সে। অংশুমান কিন্তু তবুও বিড়ি ফোকে। এক গাল না কাটা দাড়ি। আঁখি কিছুতে সহ্য করতে পারেন না বিড়ির গন্ধ একদমই আর অফিসের ঘরে বসে বিড়ী ফোকা অংশুমান আর কৃষ্ণেন্দুর। ওরা দুইজন মেডিক্যাল কলেজের বিল্ডিং ও তার ডিজাইন এবং কনস্ট্রাকশন এর দায়িত্বে আছেন। সুপ্রকাশ ( সবার কাছে উনি মামা) বাবুর আন্ডারে। আখির চেয়ে বয়সে বেশ ছোটই দুজনেই । কৃষ্ণেন্দু আঁখির চেয়ে ১২ বছরের বড়। তবুও আঁখিকে সে ম্যাডাম হিসেবেই সম্বোধন করে। অংশুমানও আঁখিকে তাই ম্যাডাম বলেই সম্বোধন করে সব সময় । আর দীপা ওনাকে আঁখিদি বলে। এরা দুজনেই কিন্তু ভেতরে ভেতরে আঁখির ওপরে কেউই সন্তুষ্ট নয়। দীপা আর আঁখির মধ্যে একটা ভালো রকমের ঠান্ডা লড়াই ভেতরে ভেতরে চলে। কেউই কাউকে সহ্য করতে পারে না। আঁখির একটা নিজস্ব মনগড়া ধারণা আছে যে দীপা এই কলেজের HR পোস্টটা ভবিষ্যতে নেবে আঁখি কে সরিয়ে দিয়ে একদিন না একদিন । দীপা ও এম বি এ করছে। ফাইনাল ইয়ারএর পরীক্ষা তার এই বছরে। দীপা এখন প্রেগন্যান্ট । মাস দুয়েকের গর্ভবতী সে এখন। দীপার ওপরে প্রিন্সিপাল ফাল্গুন স্যার ইন্সপেকশন এর SAF A, A১ ( স্ট্যান্ডার্ড অ্যাসেসমেন্ট ফর্ম) তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছেন এবং ম্যানেজমেন্টও মিটিংয়ে সেটাই মেনে নিয়েছে। এটা খুবই ঠিক কথা যে মেডিক্যাল কলেজের ইন্সপেকশন SAF যে তৈরী করে তার ক্রেডিট বা মেডিকেল কলেজের জন্য অবদান সবচেয়ে বেশি হয় একটা নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করতে এবং ন্যাশনাল মেডিক্যাল কাউন্সিলের ছাত্র ভর্তি করতে অনুমতি পেতে। তাই আঁখি ম্যাডাম প্রথমের দিকে প্রিন্সিপাল ফাল্গুন স্যারের ওপরে বেশ ক্ষুব্ধই ছিলেন আর ভেতরে ভেতরে ওনার অনেকটাই অভিমানও ছিল অধ্যক্ষের প্রতি। আঁখির কেনো যেনো একটা বদ্ধ ভুল ধারণা ছিলো .যে দীপা ঠিক মত ভাবে SAF এর কাজটা করে উঠতে পারবেই না। । সে অনেক কিছুই ভুল করবেই। গোটা মেডিক্যাল কলেজের সম্বন্ধে ডেটা আর মেডিকেল কলেজের অ্যাটাচ হাসপাতালের ডেটা ও ইনফর্মেশন থাকে এই SAF এ। তাই আঁখির ধারণা যে অংশুমানকে স্বাধীনকে ও সোম কে যেহেতু ফাল্গুন স্যার ভালবাসেন তাই দীপাকে ও উনি বেশি ভালবাসেন ও অনেক বেশি পছন্দ করেন সুন্দরী বলে এবং দীপ খুবই মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলে তাই SAF এর দায়িত্ব দিয়েছেন উনি দিপাকে। এবং আঁখি নিশ্চিত ছিল দীপা SAF তৈরি করতে গিয়ে হাজারো ভুল করবেই করবে এবং মেডিক্যাল কলেজটা ডোবার চান্সটাও অনেক বেড়ে যাবে। আর আঁখি এই মেডিক্যাল কলেজের HR ডিপার্টমেন্টে ম্যানেজার হিসেবে জইন করবে তাকে সরিয়ে _“অহংকার?” আঁখি খিল খিল করে হেসে উঠল। “এটা কে আত্মবিশ্বাস বলে, বুঝলে তো দীপা । আমি তো জানি, আমি কী করছি। আমি যে ভুল করতে শিখিনি দীপা কোনদিন আর আমি আমার কাজটাকে ও ভালো করেই জানি । এর আগেও দুই দুটো মেডিক্যাল কলেজে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তো আমার। তুমি তো প্রথম তাই না? তাছাড়া মেডিক্যাল কলেজে ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এক নয়। এটা মেডিক্যাল কলেজ দীপা সেটা মনে রেখেই তোমার কাজ করা উচিত। ” _“তুমি সত্যিই তাই ভাবছো বুঝি ? অধ্যাপক ফাল্গুনের সামনে?” দীপাও কৌতুকের সুরে বলল। “তাঁর মতো এক ব্যক্তিত্বের কাছে তোমার অহংকার ,তোমার এই আত্মবিশ্বাস তোমাকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটা তো ভাবো একবার?” _“তুমি কি জানো, চাইলে আমি সেটাও করতে পারি। হ্যা চাইলে । আমি চাইলে অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এই কলেজের । পি বি স্যারের নির্দেশও আছে কিন্তু সেইরকম ,” আঁখি বলল, তার গলায় এক ধরনের গম্ভীরতা। ভালই তো ।তবে সেটাই কর। পি বি স্যারের হাত যখন তোমার মাথায় আছে। এতো ইগো তোমার কেনো গো আঁখিদি কিছুদিন পর…., অধ্যাপক ফাল্গুনের প্রিন্সিপালের ঘরে এসে বসেন আঁখি। আঁখি কিন্তু অসম্ভব ভাবেই কর্পোরেট প্রোটোকলটা মেনে চলেন প্রথম দিন থেকেই । কর্পোরেট কালচারের কাছে তার শেখা এটা। প্রিন্সিপাল বা ডিরেক্টর বা তার চেয়ে উচ্চপদস্থ পদে কেউ থাকলে তার ঘরে নক করে,অল্প করে মুখ বাড়িয়ে তার পারমিশন নিয়ে তবেই ঘরে ঢোকা, বা তার ঘরে তাঁদের কেউ ঢুকলে তাকে “স্যার “বলে সম্বোধন করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ানো। নিজে এগিয়ে এসে তাকে চেয়ার দেওয়া , এগুলো সবই কর্পোরেট কালচার এর শিক্ষা। আঁখির মজ্জায় মিসে গেছে এখন । আর যে সেটা করে না তাকে আঁখি খুব ধমক দেন । কালচারলেস বলেন। আর এই কর্পোরেট এটিকেট কালচারে এখানে কেউই অভ্যস্ত নয়। আঁখির চোখে এক ধরনের উন্মাদনা। সেটা ডাক্তার ফাল্গুন প্রথম লক্ষ্য করেন। এগুলো ওনার চোখ সাধারণত এড়ায় না। উনি ভীষণই ঠান্ডা মাথার মানুষ ও ওনার মধ্যে অসম্ভব রকমের একটা ধৈর্য্য রয়েছে যেটা সাধারণত খুব বেশি দেখা যায় না লোকের মধ্যে। ওনার শরীরে কারুর প্রতি রাগ বা ওনার মধ্যে অপমান বোধ বলে ও কিছুই নেই। এই দশ এগারো মাসের মধ্যে উনি কারুর ওপরে আজ পর্যন্ত রাগ করেননি ,কাউকে কোন অপ্রিয় কথা বলেন নি , উনি সার্কাসটিকালি কথা বলেন ,আঁখি সেটা লক্ষ্য করে দেখছেন। ওনাকে পেছনে কেউ অপমান জনক কথা বলতে চাইলে আঁখির নিজেরও রাগ হয়েছে কিন্তু উনি গায়েই মাখননি সেই অপমানটা। সবসময়ই মিষ্টি করে বুঝিয়ে কথা বলেন সকলের সাথে । কারুর মনে ,ওনার জন্য কেউ দুঃখ পাক , উনি সেটা চান না। কলেজের ও হাসপাতালের এমন কি জি ডি এ দের সবার সঙ্গে উনি কত সহজেই যে মিশে যান সেটাও ভাবাই যায় না। সবাইকে তার যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলেন ও সেইরকম ব্যাবহারও করেন। এতটুক অহংবোধ বা অহঙ্কার বোধ, বা অধিকার বোধ ও নেই ওনার ভেতরে যে উনি একটা নতুন হতে যাওয়া একটা মেডিক্যাল কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল। মেডিক্যাল কলেজের সর্বোচ্চতম পদাধিকারী উনি। আঁখিতো এর আগেও তিন তিনটি প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপালদের সাথে কাজ করছেন। সেখানে অন্যেরা দূরের কথা তারও প্রিন্সিপালদের সাথে ধারে কাছে ঘেষা অসম্ভব ছিলো। স্লিপ দিয়েই তারপরে প্রিন্সিপাল এর ঘরে যেতে হতো। তাই HR ডিপার্টমেন্টর পিয়ন তাদের ফাইল নিয়ে যেত সই করাতে। দরকার পড়লে প্রিন্সিপাল নিজে ডেকে পাঠাতেন তাদের টেলিফোন করে। অন্য প্রিন্সিপাল স্যারেরা ষ্টাফ দের সাথে অনেকটটাই দুরত্ব বজায় রাখেন আর ইনি কিনা সকলের সাথে একেবারে বন্ধু এর মত মিশে থাকেন। সকলের সুবিধা অসুবিধার খোঁজ করেন । নিজে এসে HR ডিপার্টমেন্ট সই করেন । একাউন্টস ডিপার্টমেন্ট এ গিয়ে গল্প করেন। আঁখির ঘরে গরমে এসি মেশিন এর সুপারিশ করা থেকে,সে যাতে গাড়িতে আসাযাওয়া করতে পারে ফ্ল্যাট থেকে, আঁখির দুপুরে ও রাতে ক্যান্টিন থেকে খাবার যাতে পায় আর আঁখির মাইনে বাড়ানোর দাবী করেন মালিকদের কাছে বিশেষ করে ডাক্তার দেবাঞ্জন স্যারের কাছে । প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের এইরকম প্রিন্সিপাল আঁখি তার জীবনে সে প্রথম দেখছে। আঁখি কী ভেতরে ভেতরে এই ৬৮ উর্ধ্বে প্রিন্সিপাল লোকটার প্রেমে পড়ে যাচ্ছেন কী? সেটা কিন্তুকিছুতেই সম্ভব নয়। আঁখি নিজের কাছে নিজেই অস্বীকার করে চলেছেন সেটা। কিছুতেই যে হার মানবে না আঁখি নিজের কাছে। ভাগ্যিস প্রিন্সিপাল লোকটা এইসব প্রেম ট্রেম সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভাবেই উদাসীন থাকেন । আঁখিকে উনি একবারেই “মেয়ের মত “চোখে দেখেন। নইলে তো কবেই আঁখি ধরাপরে যেতেন লোকটার কাছে। আঁখি মনে মনে সংকল্প করে সে কোন প্রেম ভালবাসা এইসবের মধ্যেই নেই। ভালোই হয়েছে ভদ্রলোক তাকে মেয়ের চোখে দেখে। রেসপেক্টও করে। মাঝে মাঝেই তাকে উপদেশ দেয় নিজেকে পাল্টাতে । আঁখি যেনো তার মধ্যে ফিউডালিস্টিক অ্যাটিটিউড বা ব্যাবহার থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে। কিন্ত আঁখি নিজেকে পাল্টাবে না কখনও এই চল্লিশ বছর বয়েসে এসে। আঁখির পন এটা একদিন আঁখি যখন কুড়িটা ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি ডিক্লারেশন ফরমের ফাইলগুলোকে ঠিক করছিল, তখন হঠাৎ তার হাতে একটি পুরনো কাগজ আসে। সেখানে লেখা ছিল ফাল্গুন স্যারের লেখা কিছু কথা, যা তিনি তার ছাত্রছাত্রীদের প্রতি উৎসর্গ করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল:"মানুষ যত বড়ই হোক, সত্যের থেকে বড় কিছু নয়। সত্যের সঙ্গে পথচলা কঠিন, কিন্তু সেই পথেই শেষ পর্যন্ত আলো মেলে।" আঁখি কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেছিলো। সে বুঝতে পেরেছিল, ফাল্গুন স্যার তার উদ্দেশ্য গুলো অনেক আগেই বুঝে ফেলেছেন। কিন্তু তার প্রতি কোনো বিদ্বেষ প্রকাশ না করেই তিনি নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন নীরবে।তিনি জানতেন, তার বয়স এবং অবস্থান আঁখির মতো উচ্চাভিলাষী নারীর পরিকল্পনার পথে বাঁধা হতে পারে। তবুও তিনি আঁখির সঙ্গে কোনো বিরোধে যাননি। “ স্যার , আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করবেন?” সে শুরু করল। …”“আমার এখানকার কয়েকজন স্টাফের ব্যবহার আর আচরণ নিয়ে কিন্তু আজকাল কাজ করতে বেশ সমস্যাই হচ্ছে। আমাকে এরা তেl তেমন ভাবে আর মানতেই চাইছে না আজকাল ম্যানেজার হিসাবে। আমার নির্দেশও এরা মাঝে মধ্যে অমান্য করছে। কাজেও ওরা ফাঁকি দিচ্ছে বেশ। ভুলভাল রকমের কাজ করছে কেউ কেউ। এতে আমার কাজও বাড়ছে। প্রথমত কেউই সময় মত তো অফিসে আসেই না। কাজ না করে গুলতানি আর গল্প করেও দু একজন , চুকলিবাজি করেও কেউ কেউ সময় কাটাচ্ছে”। ম্যানেজমেন্টের কাছে আমার নামে লাগাচ্ছে। আমি কিন্তু এতে স্যার খুবই ডিস্টার্ব আর অপমানিতও বোধ করছি। আপনিও কিন্তু এগুলো দেখেও না দেখার ভান করে আছেন। চোখ ও কান দুটোই বন্ধ করে রয়েছেন । আপনি তো আবার মেয়েদের বা এখানকার কোন পলিটিকস এর মধ্যে ঢুকবেন না এই রকম ভীষ্মের পণ করেছেন। আমি তাই বোধ করি স্যার এখানে আর কাজ করতে পারবো না। রেজিগনেশনটা দিয়েই দেবো ঠিক করে নিয়েছি। আপনি আমার জন্য একটি ভালো জায়গা ঠিক করে দেবেন তো স্যার? আপনার তো কত চেনাশোনা রয়েছে। আর এখানকার জলবায়ুটাও আমার সহ্য হচ্ছেনা। দেখুননা মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে, টাক পড়াও শুরু হয়েছে। চামড়ায়, গাল এ লাল লাল র‍্যাস উঠছে। গায়ের রং কালো হয়ে যাচ্ছে। পেটে আজকাল ব্যথা হয়। রাতে বমি হয়। জ্বর আসে। _“অবশ্যই, আঁখি,” অধ্যাপক ফাল্গুন বললেন, “কিন্তু সমস্যা সমাধানের আগে আমাদের মধ্যের সম্পর্কটাও বোধকরি পরিষ্কার হওয়া উচিত। তুমি কি বল? ” “আমি জানি, আমি জানি স্যার আপনি কী বলবেন,” আঁখি গম্ভীরভাবে বললেন। “কিন্তু আমি স্যার একটাই জিনিস চাই , যত দিন আমি আছি এখানে, সকলেই আমাকে যথাযথ ভাবে সম্মান করুক। আমার কথা, আমার নির্দেশগুলো মেনে চলুক। আমি এখানে তো স্যার HR ম্যানেজার পোস্টে এসেছি। তাই না স্যার? আর আমি তো আমার কাজটা ভালো ভাবেই করতে জানি, তাই না ? আপনিই বলুন স্যার। কাজেও বিন্দু মাত্র ফাঁকি দেই না আমি । সেই সকাল আটটায় অফিসে আসি আমি অফিসে। সকলের আগে । আমি আর রিয়া । কী দরকার স্যার এতো তাড়াতাড়ি অফিসে আসার? সারাদিন সব কাজই প্রায় একার হাতেই করি আপনি তো নিজের চোখেই দেখতেন ও এখনো দেখেন। ফ্ল্যাটে ফিরতে ফিরতে কোনকোনদিন রাত আটটা ও বাজে । তাই না স্যার? ” কাজের জন্য লোক দেওয়া তো দূরের কথা আমাকে একটা গাড়িও দেয় না কর্তৃপক্ষ আমার যাতায়াতের জন্য। রোজ ১০০/ টাকা খরচ হয় আমার শুধু যাতায়াতের জন্যl । প্রায় দিনই না খেয়ে থাকতেও হয়। রাতে ফ্ল্যাটে ফিরে গিয়ে ও রান্না করতে যে আর ইচ্ছে করে না। গরমে ঘরে সিদ্ধ হই । এসিও দেয়নি এখনো ম্যানেজমেন্ট । রাতে ও ঘুম হয় না আমার । আমার শ্বাশুড়ী মা আর আমার বর আমাকে এখানে আর রাখতে চায় না স্যার এতো কষ্ট সহ্য করতে দেখে। তারা আমাকে দুর্গাপুরে নিয়ে যেতে চায়। আমার বাবা ও চায় না আমি এখানে এতো কষ্ট করি। কত কষ্ট করে যে বুঝিয়ে তাদের বাড়ি ফেরত পাঠাতে হয় সেটা আপনি বুঝবেন না স্যার। বরের সাথে এই নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া করতে হয়। আমাদের বিবাহিত জীবনটাও নষ্ট হচ্ছে। এতো কষ্টে কাজ করি আর সম্মানটাই না থাকলে কি কারণে এখানে কাজ করতে যাবো বলুনতো ? আমাকে আপনি রিলিজ করে দেবেন তো স্যার রেসিগনেশন দিলে?। একমাত্র আপনার জন্যই আমি কিন্তু এখানে থেকে গেছিলাম । আপনি বলেছিলেন তাই। নইলেতো কবেই ছেড়ে দিতাম এই কাজ। আমার হাতে অনেক ভালো ভালো অফার ছিল বাইরের স্টেট থেকে। আপনার কথা সময়ের সাথে সাথে আঁখি অনুভব করল—ফাল্গুনের প্রতি তার মনে এক অদ্ভুত টান তৈরি হচ্ছে। এ টান প্রেমের, না শ্রদ্ধার, না কি আত্মসমর্পণের—তা সে বুঝতে পারছিল না। সে নিজেকে বোঝাতে চাইল— “এ অসম্ভব। এ অনুচিত। এ দুর্বলতা।” কিন্তু হৃদয়ের যে অঞ্চল যুক্তির অধীন নয়, সেখানে এই অনুভূতি নীরবে নিজের জায়গা করে নিল। চাই।” _“ দেখো আঁখি আমি কিন্ত তোমাকে খুবই সম্মান করি। একটু বোধ করি সবার চেয়ে বেশীই করি । কি তাইতো আঁখি ম্যাডাম? “ আর সম্মানটা যে অর্জন করতে হয়। তুমি সত্যিই কি সম্মানিত হতে চাও এদের কাছে?” অধ্যাপক ফাল্গুনের চোখে গভীরতা ফুটে উঠল। আঁখির চোখে চোখ রেখে অধ্যাপক ফাল্গুন বললেন। আঁখি তো জানে যে ব্যক্তি চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে সে খাঁটি। খুব কম লোকই চোখে চোখ মিলিয়ে কথা বলতে পারে এবং সেটা সত্য কথা আর আঁখি নিজেও চোখে চোখ রেখেই কথা বলতে শিখেছে তার বাবার কাছে। _“আমি স্যার এর আগে সবসময় সম্মানিত হয়েই এসেছি যেখানে যেখানে কাজ করেছি ,এখানে আসার আগে। আপনি নিজেই খোঁজ নিয়ে দেখুন স্যার। সেখানে আমার অধস্তন কর্মচারীরা সবাই আমাকে দেখলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াতো। আমি অফিস থেকে বেরোবার আগে পর্যন্ত কেউ অফিস থেকে নিজের ইচ্ছেতে বেড়িয়ে চলে যেতে পারতো না। গেলে তাকে, আমাকে জানিয়ে তবে যেতো। কিন্তু এখানে কেউ কেউ আমাকে বেড়িয়ে যাবার আগে জানানোর প্রয়োজনটুকু বোধ করে না। আমি একজন মহিলা , আমরা একই কলেজে কাজ করি, অথচ অন্যরা ছটার আগেই কাউকে না জানিয়েই চলে যাচ্ছে। এটা কি ঠিক স্যার? একবার ওনারা বেরিয়ে যাবার আগে জানাবেন না আমাকে? স্যার জি ডি এ থেকে প্রিন্সিপাল সবাইকে নিয়েই আমি কিন্তু আগে চলে এসেছি। আগে যেখানে যেখানে কাজ করতাম সেখানে এখনও আমাকে সবাই খুব রেস্পেক্ট দেয়। এরা এখনও আমার সাথে যোগাযোগ রাখে। সেখানকার সি ই ও সাহেব তো আমাকে খুবই ভালবাসেন ও রেসপেক্ট দেন, আর আমাকে প্রায়ই বলেন “আঁখি তুমি চলে এসো আবার এখানে” আমিই কিন্ত যাবো না স্যার, আপনি যতদিন আছেন । আর এখানে? পরিবেশটা কেমন যেনো দিন দিনে বিষাক্ত হয়ে উঠছে আমার কাছে। আমার কী মনে হয় জানেন? চারদিকে রাবন ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার পেছনে । আমার দশ মাসের তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসারটা ভেঙে চুরে তছনচ করে দেবে এরা । যেখানে সম্মান নেই , যেখানে কাজের ডিগনিটি নেই, সেখানে তো আঁখি থাকে না ,স্যার আপনি তো জানেন সেটা” আমি তাই আর এখানে কাজ করবো না স্যার। আপনিও অন্যত্র চলে যেতে পারবেন। আমি হয়তো রেজিগনেশন দেব এন এম সি এর ইন্সপেকশনটা হয়ে যাবার পরে, লেটার অফ পারমিশন আসলে পরেই। “ আঁখি বললেন বটে, কিন্তু তার কণ্ঠে কেমন যেন অস্পষ্টতা ছিল। তেমন একটা দৃঢ়তাও ছিল না। “ এ ছাড়াও আমার হাজব্যান্ড ও শ্বশুর বাড়ির লোকেরাও চাইছে না আমি আর এখানে থাকি। “ ফাল্গুন বোঝেন আঁখি কি চাইছে এখন ” কোম্পানি তার মাইনেটা যেনো বাড়ায়, গাড়ি যেনো ফ্ল্যাট থেকে তাকে নিয়ে আসে আর দিয়ে আসে এবং তার ফুড এর ব্যবস্থা করে। ফাল্গুন চিন্তা করে নেয় মালিক ডাক্তার দেবাঞ্জনের কাছে আঁখির ব্যাপারটা নিয়ে সত্যিই এবারে কথা বলতে হবে। এই মহিলা সত্যিই কাজ জানেন, তবে খুবই খুঁতখুঁতে নিজের কাজ নিয়ে। একার হাতে সব কিছু ,সব দিক সামলায় সে। আর সেটা করতে গিয়ে কিছু কাজ ইন কমপ্লেট থেকে যায় । অন্যদের কাজ শিখতে এখনও সময় লাগবে অনেক। আঁখিকে তাই ছাড়া যাবে না কিছুতেই বিশেষ করে এই ক্রুসিয়াল একটা সময়ে। আঁখি চলে গেলে হয়তো বা একরকম ডুবেই যাবে কলেজটা। আর এই মহিলার প্রতি একটা ভালোবাসা বা মায়াও পড়ে গেছে ফাল্গুনের। মহিলা কিন্তু এমনিতেই খুব সরল প্রকৃতির। বেশ হাসি খুশি । জেদী , তবে বোকা ধরনের, কোন কিছুর আগেপিছে না ভেবেই হঠাৎ করেই সিধান্ত নেয়। নিজের মধ্যে ইগোটাকে সব চেয়ে বেশী প্রাধান্য দেয়। আর অন্যের প্রতি, সাব অরডিনেট স্টাফদের ওপরে প্রভুত্ব করবার একটা অদ্ভূত প্রবৃত্তি আছে। অন্তত তার কাছে তো সেইরকমই মনে হয়। সরল আর বোকা ভাব নাকি তার শো। পিনাক , কৃষ্ণেন্দু, সৌম্য ভাস্কর রিয়া পায়েল এরা সেটাই বলে। ভেতরে ভেতরে আঁখি যে কি করে তার খবর তো ফাল্গুন আর রাখেনা । হয়তো বা এই কলেজের অন্দর মহলে কর্পোরেট পলিটিকস এর সাথে আঁখি জড়িত থাকলেও থাকতেও পারে। কৃষ্ণেন্দুকে, সৌম্যকে এবং আরো অনেককে এমন কি তাকে নিয়েও হয়তো বা ম্যানেজমেন্ট এর কাছে অভিযোগ করেছে সে কয়েক বার। হতেও তো পারে ম্যানেজমেন্ট তেমন গুরুত্ব দেয় নি আঁখির কমপ্লেইন গুলোতে। ফাল্গুন কান দেয় নি সেইসব কথায়। একটা খুবই সত্যি যে আজকাল আঁখি ম্যাডাম সকাল সাড়ে আটটায় অফিসে এসে কাজ শুরু করে আর প্রায়ই রাত সাতটা কখনো রাত আটটায় ফ্ল্যাটে ফিরে যায়। এর মুল কারণ খুবই খুঁতখুতে সে কোন কাজে এবং অতি মাত্রায় পারফেক্ট হতে চায় সে। হতে গিয়ে এতে দেরী হয় তার কাজ কমপ্লিট করতে। ১৮০ জন ফ্যাকাল্টির ডিক্লারেশন ফর্মগুলো পুরো কমপ্লিট হয় না সবার। ফাল্গুন প্রায়দিনই সন্ধ্যায় যখন একই সাথে কলেজের থেকে কলেজ থেকে ভাড়া করে দেওয়া ফ্ল্যাটে ফেরে গাড়িতে , সেদিন গাড়িতে আঁখিকে তার ফ্ল্যাটে নামিয়ে দিয়েই তবেই ফেরে। আঁখি অবশ্য তার সাথে প্রথম প্রথমে কয়েক মাস গাড়িতে উঠতে চাইত না কিছুতেই। সংকোচ বোধ করতেন হয়তো। কষ্ট করেই পায়ে হেঁটে বা অটো করে যেত ৫০ টাকা দিয়ে অটো রিজার্ভ করে। ফাল্গুন ধমক দিলে তবেই গাড়ির পেছনে উঠে বসতো। _“ দেখ আঁখি, তুমি সব চেয়ে প্রথম এই কলেজে এসে জইন করেছ। আর তার পরদিনই আমি তোমার কথায় জে আই এস মেডিক্যাল কলেজ ছেড়ে দিয়ে এসেছি । তোমার পরে পরে দেবরাজ ,ঊষশী,স্বাধীন, আকাশ, মনোজ, দীপা ,অংশুমান ,সৌম্য, সোম ,কৃষ্ণেন্দু এরা ও এসেছে। তাই আর কেউ তোমাকে জানুক বা না জানুক আমি তো জানি যে তুমি এই কলেজের একটা স্তম্ভ, যদি এই কলেজের ভিত হিসেবে আমি আজকে আটটা স্তম্ভ কে চিহ্নিত করি তবে তুমি কিনা তাদের মধ্যে একটা। তাই তুমি হঠাৎ করে তোমার ইগোর জন্য এই কলেজ ছেড়ে চলে যাবে এটা তো আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না। আর তুমিই এখানে এক মাত্র,আমার খোঁজ খবর আমার প্রয়োজন অপ্রয়োজন সবসময়ই রাখ , আমাকে শাসন কর, আমার কি দরকার আর কি দরকার নয় এই বুড়ো বয়েসে। আমার প্রতি তোমার এই অধিকার বোধকে আমি সত্যি সম্মান করি। আমি যাতে এখানে সুস্থ্ থাকি , তুমিই কিন্ত একমাত্র তার খেয়াল রাখ। এর জন্য শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে তোমাকে আমি ছোট করবো না। তাই তুমি না থাকলে আমারও যে থাকার আর অর্থ হয় না। আমি জানি কিসের জন্য তুমি এখান থেকে চলে যেতে চাইছ। তবে তোমার ডিসিশনটা সত্যি ভুল বলে আমি মনে করি । আগে তুমি এর থেকে বেটার চাকরী পাও তারপর না হয় তুমি ডিসিশন নাও । আমি এই কলেজের মেডিক্যাল ডিরেক্টর ও চেয়ারম্যান দেবাঞ্জনকে তোমার অসুবিধে গুলো আগে বলবো । তোমার মাইনে বাড়াতে ,তোমার যাতায়াতের জন্য গাড়ির, ফ্ল্যাটে এর ঘরে এসির ব্যবস্থা করতে, তোমার ফুড এর ব্যবস্থা করতে আর তোমার স্নানের জলের যাতে ব্যবস্থা করে সেটাও বলবো। কিন্তু তোমাকেও যে দেবাঞ্জনকে নিজের মুখে একবার বলতে হবে তোমার এখানে কাজ করতে অসুবিধের কারণ গুলো। আর সামনেই তো এন এম সি ইন্সপেকশনের হিয়ারিং আছে তারপরে আছে ছাত্র ছাত্রীর ভর্তির ব্যাপারটা, এডমিশনের লেটার অফ পারমিশন এলে, ভর্তি করার নিয়ম, ইউনিভার্সিটি এর নিয়ম ,NMC এর নিয়ম এগুলো তুমিই তো একমাত্র জান স্টাফ দের মধ্যে। কারণ তুমি দুই বছর এই কাজ গুলোই করেছ। অন্যরা বেশির ভাগ ইঞ্জিনিয়ার। তাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই। তাই তুমি এইসময় আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারবে না। আমার জন্যই তুমি এখানে থেকে যাবে। আর তুমিই তো বলো তুমি আমার জন্য এখানে থেকে গেছ। “ তুমি যেখানে যাবে আমাকে নাকি বগলদাবা করে নিয়ে যাবে? ” ফাল্গুন হেসে ফেলেন। ,,_“কেনো স্যার আপনার ঊষসি, দীপাতো আছে , অরুণাংশ আছে ,রিয়া সৌম্য এরাও আছে । আরো ও অনেক লোক আছেতো আপনার” “ আমি বা থাকলেও ওরা আপনার খেয়াল রাখবে অবস্যই আঁখি জবাব দেয়। আর এতো জ্ঞানী সি ই ও পিনাক আছেন । ওরাই সামলাবে সব । আপনি কিন্তু একদমই টেনশন নেবেন না স্যার আর আমি সরে গেলে এখানে নতুন সুন্দরী, স্মার্ট HR ম্যানেজার ও আসবে। তাকে না হয় আমি বলে যাবো যাতে সে আপনার খোঁজ রাখবে। এছাড়া শুনছি নতুন একজন সিইও আসবেন। সে নাকি আবার আপনার পূর্বপরিচিত । আগের মেডিক্যাল কলেজে একসাথে কাজও করেছেন আপনারা” আর সত্যি কথা কি স্যার জানেন? আপনি কিন্তু ২০২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্তই প্রিন্সিপাল থাকবেন। ১ অক্টোবরের পর অন্য কেউ হবেন প্রিন্সিপাল। তেমন ই নির্দেশ দেওয়া আছে আমাকে । সেই মত কাগজও তৈরি করা আছে ম্যানেজমেন্ট এর নির্দেশে। আপনি তখন থাকবেন তো স্যার? উনি কিন্তু অনেক আগেই প্রিন্সিপাল হতেন। জুলাই মাসে। আমিই সেটা আটকে দিয়েছি । ওনার অ্যাপয়েনমেন্ট লেটারে দিনের তারিখ চেঞ্জ করে ডেটটা চেঞ্জ করে আর দীপাঞ্জন স্যার কে বুঝিয়ে। _”আমি কিন্তু এই ব্যাপারে তেমন কিছুই জানিনা এখনও। “ ফাল্গুন জবাব দিয়েছিলেন। _” আপনি সব, জানেন স্যার। শুধু মাত্র চুপ করে থাকেন এই যা “ এর পরে আরেকদিন…. ““কিন্তু কিছু কিছু লোক , বিশেষ করে দুজন তো আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এখানে, আমি যাতে এখান থেকে নিজেই সরে যাই। দেবাঞ্জন স্যারকে আমার বিরুদ্ধে যা সত্যি নয় তাই লাগিয়ে আসছে। ” ভীষণ ভাবেই জঘন্য মানসিকতা এদের। পরিবেশটাও দূষিত করে তুলছে। ঘুন ধরে যাচ্ছে এখানে কাজের পরিবেশে। এটা ম্যানেজমেন্ট একদিন বুঝবেই । সময় লাগবে শুধু স্যার। _“যারা ষড়যন্ত্র করছে তোমার বিরূদ্ধে তুমি ভাবছ , তাদের বিরুদ্ধে তো তাহলে লড়াই করতে হবে তোমাকে তাই না ?নাকি বিনা লড়াইতে হার মেনে নেবে তুমি আঁখি ? তুমি কেনো ম্যানেজমেন্টকে, দীপাঞ্জনকে বলছ না এইসব ? যাক একটা খবর দেই ,তোমার ডিম্যান্ডগুলো দেবাঞ্জন কিন্তু সব মেনে নিয়েছে। এখন আর কোন অসুবিধা হবার কথা নয় তোমার তাইতো। “সেটা ঠিকই স্যার। সবটাই আপনার জন্য হলো। “ _না ভুল বললে তুমি। তোমার মাইনে বাড়ানোটা কিন্তু নতুন সি ই ও করেছে। যতই তুমি তাকে অশ্রদ্ধা করো অমান্য করো। সি ই ও আর কৃষ্ণেন্দু চায় তুমি এখান থেকে চলে না যাও। কিন্তু তুমি তোমার ইগো আঁকড়ে ধরে বসে আছো “ম্যানেজমেন্ট কে আর কত কমপ্লেইন করবো স্যার আমার তো এক আপনিই আছেন যাকে আমি আমার মনের দুঃখ শেয়ার করি স্যার। দীপাঞ্জন স্যার কিন্তু খুবই ভালো মানুষ । আমায় মেয়ের মতো স্নেহ করেন। ভালোবাসেন। আমি চাইনা এইসব ছোট ব্যাপার নিয়ে ওনার মত মানুষ হয়রান হয়ে যাক। সারাদিন উনি কত ব্যস্ত থাকেন বলুন তো।” আঁখি জবাব দেয় “_আমার মনে হয় তোমার সাথে সকলের প্রবলেমটার মূল কারণ তোমার মধ্যে অহংকারের বা ইগোর জন্য। আর তোমার মধ্যে কিন্ত একটা প্রভুত্ব করার মনোভাব আছে তুমি সেটা মান বা না মানো। তুমি যেটা ঠিক মনে কর সেটাই তোমার কাছে ঠিক ” অধ্যাপক ফাল্গুন বললেন আঁখিকে। এটা কিন্তু ক্যাপিটালিজম অ্যাটিটিউড এর খুব ছোট একটা অংশ। এটাকে সরিয়ে রাখ দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। যারা তোমার থেকে সরে গেছে বা সরে যাচ্ছে তারাই তোমাকে বরণ করে নেবে আবার। পরিবেশ টা আর টক্সিক লাগবে না। “ আপনি ভুল করছেন স্যার। আমি স্যার এতটুকও অহংকারী নই!” আঁখি প্রায় কেঁদে ফেলে বলল। “তবে মানসিক ভাবে আমি স্যার খুবই স্ট্রং। সব সময়ই আমি সত্যির পথে চলে এসেছি। আমার বাবার শিক্ষা এটা। আমি স্যার ইনস্টিটিউটএর জন্য কাজ করি আর ভবিষ্যতে ও করব যাতে অর্গানাইজেশন বা ইনস্টিটিউট এর ভালো হয়। আর স্যার যে আমাকে অন্ন যোগায় তার ক্ষতি হতে দিতে আমি শিখিনি কখনো স্যার। আমার বাবা আমাকে এই ভাবেই তৈরী করেছেন।” ফাল্গুন আর কি বলবে। এই মহিলার ভেতরে একটা অন্ধ বিশ্বাস কাজ করে যে এখানকার কিছু মানুষ , তারই কলিগ তাকেHR পোস্ট থেকে সরাতে চায় আর তাদের নিজেদের লোককে এই HR ম্যানেজার পদে বসাতে চায় এবং সে যে কাজটা করছে সেটা ইনস্টিটিউট এর ভালোর জন্য। কয়েনের উল্টো পিঠটা সে কখনই দেখতে চায় না। আর যা ভালো কিছু হবে তার ক্রেডিট ওনার আর যা খারাপ হবে সেটার জন্য দায়ী অন্যেরা। _“শক্তি এবং অহংকার দুটো আলাদা বিষয়। তুমি যদি সত্যিই মন থেকে শক্তিশালী হও, তাহলে তো তোমার তো অহংকারের আর ইগোর দরকার নেই,” অধ্যাপক ফাল্গুন বললেন শান্তভাবে। তুমি কিন্তু আমার মেয়ের মত, তাই বলি “ তোমার মধ্যে যে ফুউডালিসিটিক বা ক্যাপিটালিজম বা, প্রভুত্ব করবার একটা মনোভাব অল্প হলেও আছে সেটার থেকে বেড়িয়ে এসো। তোমার ভালোর জন্য বলছি” “কিন্তু আমি চাই আপনি আমার পাশে থাকুন,” আঁখি বলল, মনে মনে ভেবে। “আপনিই এখানে একমাত্র অত্যন্ত ভাবেই ভদ্র ব্যক্তি যাকে আমি ভরসা করি এবং এখানে যিনি আমার সঙ্গে দাঁড়াতে পারেন।” অধ্যাপক ফাল্গুনের মুখে এক ধরনের হাসি ফুটল। “আমি কিন্তু তোমার পাশে সব সময় আছি, থাকবও । কিন্তু তোমাকে তোমার নিজের অহংকার আর তোমার ভেতরে ডমিনেটিং মনোভাবটা ,তোমার হঠাৎ হঠাৎ রেগে যাওয়া টা বা কাজ নিয়ে খুঁতখুঁতে মনোভাবটা ছাড়তে হবে।” “আমি চেষ্টা করব,স্যার” আঁখি বলল, যদিও মনেপ্রাণে সে কিছুতেই ছাড়তে পারছিল না তার স্বভাব । দিনগুলো , মাস গুলো এই ভাবেই চলতে থাকে। এই ভাবে জুলাই মাস আসে । আখির সাথে তার কলিগদের বিরোধ ক্রমশ বাড়তেই থাকে। আঁখি ওয়াটস অ্যাপ এ তাদের বিরুদ্ধে তার এম্প্লয়ারকে কখনো কৃষ্ণেন্দু, কখনো সৌম্য, কখনও পিনাক এদের বিরুদ্ধে ম্যানেজমেন্ট কে কমপ্লেইন করে এবং এদের সরিয়ে অন্য কাউকে অ্যাপয়েনমেন্ট দেবার জন্য অনুরোধ করে। _” আঁখি, তুমি আজকাল দেখি রোজ অফিসে এসে শুধু টেক্সটিং করো? কত ফোন আসে তোমার” দীপা একদিন গম্ভীর মুখে সার্কাসটিকালি বলল। “একমাত্র তোমারই তো এই সেলফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়!” _” আমার কাজই তো হচ্ছে সেটা ,” আঁখির চোখের কোণে একটি হাসি। “আর তুমি মনে করো, আমি এখানে এসেছি শুধু গুজব ছড়ানোর জন্য?” “ হাসি হেসে গুজব ছড়াও, কিন্তু আসল কাজটাও করতে হবে,” দীপা শরীরটি একটু ঝুঁকিয়ে বলল। “এখনও পর্যন্ত তো তুমি সবাইকে ভয়ই দেখাচ্ছো তাইনা?!” “আমি কিন্তু সবাইকেই সম্মান করি,” ,” আমি সকলের কাছ থেকেই কাজ শিখি । আমি ইনস্টিটিউট এর প্রতি মালিকদের প্রতি সবসময় লয়াল “ আঁখির ঠোঁটের কোণে একটি সরল হাসি। “তুমি সম্মান পাচ্ছো তো? সে তো একটা মিথ্যা!” দীপা বলল, একটু চটকে। “তুমি জানো, তোমার মতো ইগো-ফুলানো একজন HR-এর সঙ্গে কাজ করা কত কঠিন!” “তুমি জানো কি, দীপা? আমি শুধু আমার কাজ করি। আর কেউ যদি তা না মানে, সেটা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা,” আঁখি সোজা হয়ে বসে বলল। অন্যদিকে প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ফাল্গুনের প্রতি আঁখির মধ্যে অদ্ভুত এক ধরণের আকর্ষণ বাড়তে থাকে, যেটা আঁখি এই ,৪০ বছরের মধ্যে কখনোই অনুভব করেনি, কিন্তু তার মনের ভেতরে অহং বোধ , তার ভেতরের লুকিয়ে থাকা সুপ্রিমো বোধ ,তার ইগো, তার প্রভুত্ব করবার মনোভাব তাকে এই বিষয়ে ভাবতে বাধা দেয়। মানতে না করে মনের কথা। তার তো স্বামী আছে। তার বরকেই সে ভালবাসে এটাই ধ্রুব সত্যি। তার বর ও তাকেই একমাত্র ভালবাসে। এটা তাদের মধ্যে বিশ্বাস ।কিন্তু দুর্বলতা তার মধ্যে আসছে কেনো? সে তো কম করে ২৮ বছরের ছোট লোকটার থেকে। একজন ৬৮ বছরের প্রবীণ ডাক্তারের প্রতি তার এই মনের আনচান ভাবটা তাকে অন্তত মানায় না। সে খুবই শক্ত মনের মানুষ। আর ডাক্তার ফাল্গুনও তো তাকে মেয়ের মত চোখে দেখেন । স্নেহও করে। লোকটি তো মনে হয় বোঝেই না প্রেম বা ভালবাসা। সে যে খুবই সিডাকটিভ এক মহিলা সে নিজেও সেটা জানে। কিন্তু কোনো পুরুষ যদি তার সৌন্দর্যকে তাকিয়ে না দেখে, যদি তাকে মেয়ের আসনে বসায় তাহলে সে আর কি করতে পারে। তাকে তো হেরে যেতে যে হবেই । এই মাত্র তো। থাক না উনি তার “একমাত্র স্যার হয়েই” । এর থেকে অন্য কোনো বিশেষ রিলেশনে যাওয়াটা ঠিক নয় আশা করা টাও ঠিক নয়। যদি ওনার দিক থেকে প্রত্যাখ্যান আসে? আঘাত আসে? না না সেটা তার কাছে বড় লজ্জার হবে। “দশ মাস আগে তো আমরা কেউ তো কাউকেই চিনতাম না। তবে.. আর আমি তো ঠিকই করেছি এখন থেকে চলেই যাবো। আউট অফ সাইট হলেই আউট অফ মাইন্ড হবেই । ভগবান দেখো শুধু যাওয়া যেন আমার স্মুথ হয় ।মসৃন হয়। আমি তো জানি আমি যেদিন আমি এখান থেকে বিদায় নেবো প্রিন্সিপাল স্যারই উপস্থিত থাকবেন না। ইচ্ছে করেই সেদিন আসবেন না উনি। এতো বোকা তো আর উনি নন” জুলাই মাসের শেষের সপ্তাহের দিকে একদিন, অফিসে ঢুকেই দীপা বলল, “আঁখি ম্যাডাম , আপনি কি জানেন নতুন একজন হ্যান্ডসাম সি ই ও আসছেন এইখানে । তিনি আবার প্রিন্সিপাল স্যারের নাকি চেনা। ডিরেক্টর স্যার আজকে জয়েন করালেন। উনি আগে যে মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন সেখান সিইও হিসেবে কাজ করছেন। তারও আগে উনি দুই দুটো মেডিক্যাল কলেজে কাজ করছে সি ই ও হিসাবে। এ্যাপোলো চেন্নাইএর ও সি ই ও ছিলেন। নাসিক এর কোন মেডিক্যাল কলেজের সিইও ছিলেন _“আমি জানি,” আঁখি বলল, তার গলা কাঁপছে। “কিন্তু আমি কি করবো তাতে?” আমাকে তুমি বলছো কেন এইসব ? প্রিন্সিপাল স্যার কে গিয়ে বলো না । _“ তুমি কি আর তাকে উপেক্ষা করতে পারবে? তোমাকেই তো এখন থেকে তার নির্দেশে চলতে হবে ” দীপাও কৌতুকের সুরে বলল “ তোমার দিন শেষ হয়ে এলো বলে”। _“হ্যাঁ, আমি জানি কি ভাবে চলতে হবে আর চলতেও পারব আশা করি ,” আঁখি বলল, কিন্তু তার কণ্ঠে তেমন যেন আত্মবিশ্বাস ছিল না। এই সিইও এসে তার এই আট মাসে তিল তিল করে গড়া এখানকার সংসার টা ভেঙে দেবে নাতো। যদি তার ক্ষেত্রে হাত বাড়াতে আসে সিইও তাহলে সেই হাত কি করে ভাঙতে হবে সেটা আঁখি কিন্তু ভালো ভাবেই জানে। পরবর্তী দিন, অধ্যাপক ফাল্গুন ও নতুন সি ই ও একসঙ্গে একই ঘরে অফিসে। আঁখিও দেখছে সব। শুনেছেও সব ।তার মনেও এক ধরনের উদ্বেগ। “তুমি কি দেখছো? ম্যাডাম ” দীপা বলল। “তুমি কি আর কিছু করতে পারবে? মনে হয় না। প্রিন্সিপাল স্যার আজকাল সিইও আর ছেলেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তোমাকে তেমন ভাবে পাত্তা দিচ্ছেন না মনে হচ্ছে ।তোমার দিন গেল আঁখি ম্যাডাম “ _“আমি তো আর এখানে কিছুই করতে পারি না,” আঁখি বলল, তার চোখ ছল ছল করছে। “আমি যে সবসময় হারাই। আর আমি তো ঠিকই করেছি আমি এখানে আর থাকবো না। আমি রেজিগনেশন দিচ্ছি কয়েক দিনের মধ্যেই। আমার হাতে অনেক অনেক অনেক ভালো অফার আছে বুঝেছ। আর এই জায়গাটা আমার সত্যি শুট করেছে না। “আরে আঁখিদি তুমি নাকি একজন মানসিক ভাবে শক্তিশালী মহিলা,” দীপা বলল। “তুমি কিন্তু লড়াইটা লড়তেই পারো এই সিইও এর সাথে। এই সিইও কিন্তু শুধু মাত্র নিজের লোক ঢোকাবে এইখানে। কোথায় লড়বে তা নয় ময়দান ছেড়ে পালাবে তুমি? ” এটা তোমার সাথে যায় না। “আমি লড়াই করব? কিন্তু আমি জানি না, আমি জিততে পারব কি না,” আঁখি বলল, তার চোখে তখন হতাশা। একদিন রাতে আঁখি ফ্ল্যাটে ফিরে এসে খুব কান্না করলো। ভেঙে পড়ল। “আমি কেন এত দুর্বল?” এখন তার সামনে দুটি পথ। এক দিকে তার ইগো তার ভেতরের অহংকার, অন্যদিকে তার ভেতরে অব্যক্ত অদ্ভূত একটা অনুভুতি। যেটাকে সে আদোই চেনে না , বুঝতে পারে না বা বুঝেও বুঝতে চায় না। “আমি কী করব?” আঁখি চিন্তা করল। “আমি কি আমার ইগো আর অহংকারকে ছাড়ব, নাকি এখান থেকে একবারেই চলেই যাবো ? আর চলেযেতে চাইলেইতো যাওয়া সম্ভব নয়” রিলিজ না পেলে তাকে তো পালিয়ে যেতে হবে। সেটা আঁখি চায় না। বা এমন কিছু একটা সিচুয়েশন তৈরি করতে হবে যাতে কর্তৃপক্ষ নিজেই তাকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করে। আর সেটাই হবে সোজা পথ। আর সে এই পথটাই বেছে নেবে। নতুন সি ও হবেন কেবল এই খেলার দাবার বড়ে আখির হৃদয়ে সংঘাত চলতে থাকল। কিন্তু একদিন, সে সিদ্ধান্ত নিল। “আমি অধ্যাপক ফাল্গুনকে বলব সবকিছু। যা কিছুই হোক, আমাকে সত্যি হতে হবে।” এর মধ্যে প্রিন্সিপাল কিছুদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছিলেন । তার মধ্যে নতুন সিইও এর সাথে কিছু ঘটনা ঘটে যায়। দীপাঞ্জন স্যার সিইও ডেকে বলে “ তুমি যা কিছু করবে এই কলেজে আগে আঁখির সাথে আলোচনা করে নিয়ে করবে” পরের দিন অফিসে গিয়ে, অধ্যাপক ফাল্গুনের সামনে দাঁড়িয়ে আঁখি বললো “ আমি রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়ে দিয়েছি স্যার আপনাকে ই মেল এ। আপনি আমাকে একমাস পরে অবশ্যই রিলিজ করে দেবেন। আমার অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার এ কিন্তু একমাসের নোটিস পিরিয়ড ছিল। অধ্যাপক ফাল্গুনের চোখে বিস্ময়। “আঁখি, আমি আপনাকে সম্মান করি, কিন্তু আমি আপনার অহংকারের আর ইগোর বলি হতে পারি না।” “তাহলে আমি কী করতে পারি?” আঁখি জানালো, তার চোখে জল। “আমি কি আপনাকে হারাতে চাই?” “আপনি কিন্তু আমাকে হারাচ্ছেন না। আপনি নিজেকে হারাচ্ছেন,” অধ্যাপক ফাল্গুন বললেন। “আপনাকে আপনার এই অহংকার ছাড়তে হবে।” “আমি চেষ্টা করব,” আঁখি বলল, তার গলায় কাঁপুনি। “আমি চেষ্টা করব স্যার। _“অবশ্যই। জীবনকে বোঝার জন্য আমাদের কিছু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দরকার,” ফাল্গুন বললেন, তার কণ্ঠে গম্ভীরতা। কিন্তু আঁখি জানত, তার মনে অন্য কিছু চলছে ২০২৪ এর নভেম্বর মাসের মাঝে, ফাল্গুন স্যার নিজের থেকেই অবসর নিলেন। আঁখির পছন্দের লোককে এই কলেজের অধ্যক্ষ এর দায়িত্ব দিয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু যাবার আগে নিজের ডেস্কে রেখে গেলেন একটি ছোট্ট চিঠি। সেখানে শুধু একটি লাইন লেখা ছিল: "আপনি নিজের শিকড় শক্ত করুন। ঝড় তো আসবেই, কিন্তু আপনি স্থির থাকুন।" চিঠিটা পরদিন রিয়া আঁখি ম্যাডামের হাতে তুলে দিলো প্রিন্সিপালের ডেস্ক থেকে নিয়ে। আঁখি সেই চিঠি হাতে নিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে ছিলেন । মনে মনে অনুভব করলেন, এই প্রিন্সিপাল স্যার তার জীবনে এক অদৃশ্য ছায়া হয়ে থেকেই গেলেন, যিনি তাকে জীবনের আসল শিক্ষা দিয়ে গেলেন। ফাল্গুন চলে গেলেন এই কলেজ থেকে—কিন্তু তিনি হারিয়ে গেলেন না আঁখির জীবন থেকে। তিনি রয়ে গেলেন এক অদৃশ্য ছায়া হয়ে— যে ছায়া পথ দেখায়, প্রশ্ন তোলে, আর মানুষকে নিজের ভিতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আঁখি প্রথমবারের মতো নিজের দিকে তাকাল—কোনো মুখোশ ছাড়া, কোনো অহংকার ছাড়া। সে বুঝল— প্রেম মানে অধিকার নয়, সম্মান মানে ভয় নয়, শক্তি মানে কঠোরতা নয়।সত্যিকারের শক্তি আসে নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করার মধ্যে। উপসংহার আঁখির গল্প কোনো পরিণতির গল্প নয়— এ এক যাত্রার শুরু। যেখানে মানুষ বাইরে নয়, নিজের ভিতরে পথ খোঁজে। যেখানে জয় মানে অন্যকে হারানো নয়, নিজেকে খুঁজে পাওয়া।আর সেই পথেই, কোনো এক নীরব প্রভাতে, আঁখি বুঝতে শেখে— অদৃশ্য ছায়ারাও কখনো কখনো সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো হয়ে ওঠে। এভাবেই আঁখির জীবন বদলে যেতে শুরু করল। সে সচেতনভাবে নিজের অহংকারকে পিছনে রেখে, নতুন পথের দিকে এগিয়ে গেল। অধ্যাপক ফাল্গুনের কাছে আসার চেষ্টা করল। আর, একদিন, সে বুঝতে পারল যে প্রেমের শক্তি আসলে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে এই কাহিনীর পুরোটাই লেখকের । মস্তিষ্ক প্রসূত কল্পনায় তৈরি ছোট গল্পঃ। কারুর চরিত্র বা স্থান বা ঘটনার সাথে মিল থাকলে লেখক তার জন্য দায়ী নন। নতুন সকাল শেষ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আঁখি ও অদৃশ্য ছায়া

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now