বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সায়েন্স ফিকশনঃ

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X - তুমি কোন মেয়ের সাথে কোথায় দেখা কর, সময় কাটাও ভেবেছ আমি জানি না? - কি বলছ এসব? - কি বলছি? আমার কাছে সব খবর আছে, কোন বান্ধবীর সাথে, কোন কলিগের সাথে, কোথায় যাও। কাকে কি কিনে দাও। - আজে বাজে কথা বলবে না। দুই মোবাইলের দুই পাশে এসব কথা হচ্ছে। কান একদম ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। এসব শুনতে ভাল লাগছে না। মেয়েটা বকে যাচ্ছে। ছেলেটা শুনে যাচ্ছে। একটু পর অবস্থা আরও বেগতিক হবে। পারলে মোবাইলের ওপাশ দিয়ে গলা টিপে ধরবে। এবার অন্য কিছু শোনা যাক। নাহ এদের কথা বার্তা অনেক শান্ত। মনে হচ্ছে এদের মধ্যে সম্পর্ক অনেক ভাল। - হ্যাঁ শোন, কাল কিন্তু আমরা আবার দেখা করব ঠিক আছে? - আচ্ছা। - তোমার সময় হবে তো? - কি যে বল, তোমার জন্য সারাদিন সময় আছে। - বাদামে চলবে না কাল। আমরা দুজন সারাদিন ঘুরে বেড়াবো আর দুপুরে ভারী খাবার খাব। - তোমার যা ইচ্ছা। - রেস্টুরেন্টের খাবার অত ভাল না। একটা মুরগীর পিস দিয়ে কারি কারি টাকা নিয়ে নেয়। আমি তার চেয়ে রান্না করে নিয়ে আসব তোমার জন্য। খাবারের ব্যাগ টানতে তোমার কোন অসুবিধা নেই তো? এদের কথা শুনতে খারাপ লাগছে না। বাহ কি সুন্দর কথা বার্তা। কথা গুলো শুনছে একটা ছয় তলা বিল্ডিঙের ছাদে বসে বসে। যে শুনছে তার নাম ER821. নামের অনেক বড় মর্মার্থ আছে। E হল স্টেশনের ব্লকের নাম। R হল রোড নং , 8 হল বাড়ির নাম্বার আর 21 হল বাড়িতে বাস করাদের মধ্যে ওর সদস্য নাম্বার। নাম বললেই যে কেউ ঠিকানা খুঁজে পেতে পারে। আর এখানকার মানুষদের নাম বড় অদ্ভুত। এক মেয়েকে শোনা গেল, তার পাশে বসা ছেলেটাকে ডাকছে কিলটু সোনা। অতি দ্রুত ER821 , কিলটু সোনা লিখে ডিকশনারিতে সার্চ দিল। কোন ফলাফল নেই। বাংলা ডিকশনারিতে সোনার অর্থ পাওয়া গেলেও, কিলটুর কোন অর্থ নেই। কি আজব অবস্থা। একটা তিন চাকার যানবাহন চালাচ্ছেন এক লোক। সেই লোকের নাম আবার মামা। সবাই তার নাম জানে। মামা অর্থ যে জন্ম দিয়েছেন তার ভাই। এটাও একটা অদ্ভুত নাম। তবে ঘুরতে ঘুরতে ER821 সবচেয়ে বেশী এই নামের লোকই দেখল। এক লোক ঠাণ্ডা সরবত বিক্রি করেন তার নাম মামা, গরম চা বিক্রি করেন তার নাম মামা, এক লোক ইঞ্জিন যুক্ত গাড়ি চালান তার নাম মামা, যে ভাড়া তুলেন তার নামও মামা। কি যে অবস্থা। পুরো শহর জুড়ে শুধু মামা নামের লোকজন। এর চেয়ে ER821 এর এলাকাই কত ভাল। এক নামের দুইজন নেই। ER821 থাকে যেখানে সেখানটাকে স্টেশন বলে। এখানে আবার অনেক স্টেশন। বাস স্টেশন, ট্রেন স্টেশন, লেগুনা স্টেশন। এসব স্টেশনে শুধু গাড়ি। ER821 দের মত সাজানো গুছানো এলাকা না। ER821 কে স্কুল বন্ধ কালীন সময়ে ভ্রমণে পাঠানো হয়েছে। ওর ইচ্ছা মতই পৃথিবীতে এসেছে। পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু পড়েছে অনলাইন বই গুলোতে। সেই থেকে আগ্রহ জন্মানো। কোথাও কোথাও লেখা মানুষ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। কোথাও লেখা এরা মাথা মোটা। বুদ্ধি বলতে কিছু নেই। ER821 এর কোন প্রাণ নেই। প্রাণ থাকা মানুষদের জরুরী। এদের প্রাণ হুট করে হারিয়ে যায়। এরা মরে যায়। ER821 এর ক্ষেত্রে তেমন কিছুই ঘটে না। পৃথিবীতে আসার আগে শরীর থেকে মেটালের ফ্রেম সরিয়ে পরিয়ে দেয়া হয়েছে মানুষের মত জামা কাপড়। এখন দেখতে একদম মানুষের মত লাগছে। বার বার করে বলে দেয়া হয়েছে কোন মানুষ যদি পরিচয় জিজ্ঞেস করে যেন না বলা হয়। নাম জিজ্ঞেস করলে বলতে বলা হয়েছে, টুলু। এই নামেরও কোন অর্থ নেই। এই নাম কি করে স্টেশনের প্রধান রেকানের মাথায় আসল, চিন্তার বিষয়। তাই এখানে ER821 বলা যাবে না। বলতে হবে টুলু। যে কেউ মাইন্ড রিডার দিয়ে মনের কথা বুঝে ফেলতে পারে। টুলুর এই মুহূর্তে অনেক ভাল লাগছে। ওর কাছে থাকা নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার দিয়ে নানা জনের মোবাইলে কথা বার্তা শুনে। ইচ্ছা মত, যে কোন নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সিতে ঢুকে, কথা গুলো এবসর্ব করে শুনে নিচ্ছে। কেউ কেউ অবশ্য, অন্য রকম কথা বার্তা বলে। সেসব শুনে না টুলু। একটা প্রাইভেসির ব্যাপারও আছে। একটু আগে শুনল দুজন ঝগড়া করছে, তুমুল ঝগড়া। তার পরেই শুনল অন্য দুজন বেশ নরম ভাবে ভাল ভাল কথা বলছে। এই কথা গুলো বলতে পারার পিছনে কারণ টুলুর পিছনের মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার। সেখানের চার কোণা সাদা বক্স গুলোর কাজ, নেটওয়ার্ক এ কানেকশন দেয়া। আর গোল গোল বক্স গুলোর কাজ, এক নেটওয়ার্ক থেকে অন্য নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সিতে সংযোগ দেয়া। টুলুর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। মোবাইল নেটওয়ার্ক এর ঐ গোল বক্সটার সাহায্যে একটা কাজ করে ফেলল। যে চারজনের ফোনে কথা শুনছিল টুলু। তাদের নেটওয়ার্ক এর ফ্রিকোয়েন্সি চেঞ্জ করে দিল। উলটপালট করে, অন্য জনের সাথে সংযোগ দিয়ে দিল। যারা ঝগড়া করছিল, আর যারা খুব সুন্দর করে কথা বলছিল। তাদের মধ্যে উলটপালট করে ফ্রিকোয়েন্সিতে সংযোগ দিল। এবার তাদের কথা শুনছে। - আচ্ছা তুমি কি কি রান্না করতে পার? মাছ রান্না করা মনে হয় ঝামেলা। কাল এক কাজ কর, চিংড়ি মাছ নিয়ে আসো, রান্না করে। আমার অনেক পছন্দ। দুজন খাব আর পার্কে বসে গল্প করব। - এর ভিতর চিংড়ি আসল কোথা থেকে? আমার সাথে একদম ফাজলামি করবে না। তুমি ধরা পড়ে গেছ। তুমি গতকালও তোমার কলিগকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গেছ। - তুমি এমন কর্কশ করে কথা বলছ কেন? এমন লাগছে কেন তোমার কণ্ঠ? আর কিসের কলিগ? কিসের রেস্টুরেন্ট? তুমি কাল চিংড়ি রান্না করবে না? চিংড়ি রান্না করা ঝামেলা লাগলে, তুমি চিংড়ি ভর্তা করে নিয়ে এসো। আচ্ছা? - কিসের কলিগ না? চিংড়ি ভর্তা খাবে? চিংড়ি ভর্তা কেন? বাসায় আসো তোমাকেই ভর্তা বানাব আজ আমি। টুলু শুনে মজা পাচ্ছে। নিজে নিজেই হাসছে। এমন করে কি আগে কখনও হেসেছে? মানুষের পৃথিবীতে এসে নিজের ভিতর মানুষের কিছু গুণ খুঁজে পাচ্ছে। অন্য জায়গায় কথা হচ্ছে। - দেখো এসব একদম ঠিক না। তুমি উল্টাপাল্টা কথা বলছ। - কই উল্টাপাল্টা কথা বলছি? সত্যি কথা বললাম তো কাল রান্না করে খাওয়াব। - না মানে? কিসের রান্নার কথা বলছ? - গাধা ছেলে একটু আগে বললাম না? আর তোমার কণ্ঠ এতো মোটা লাগছে কেন হঠাৎ করে? ঠাণ্ডা বাঁধিয়েছ আবার? কতবার করে বলি এসব করবে না। ওষুধ খেয়ে নাও দ্রুত। - আচ্ছা খাব। কিন্তু...... - কিন্তু টিন্তু বাদ। কাল ঘুরতে যাবার সময় কিন্তু পাঞ্জাবী পরবে। - ঘুরতে যাওয়া মানে? কই ঘুরব? - এখন কিন্তু মাথার মধ্যে একটা বারি দিব। কালকে আমরা সারাদিন ঘুরব সেসব ভুলে গেছ? - না মানে...। টুলু এখনও হাসছে। কেমন যেন ভাল লাগছে। এই ভাল লাগটার নাম কি? এমন আগে কখনও লাগে নি কেন? রেকান বলেছিলেন, হাসি কান্না এসব মানুষদের কাজ। আমাদের না। টুলু তাহলে হাসছে যে? এই পরিবর্তন সত্যি ভাবায় টুলুকে। এরপর আরও অনেকটা সময় এমন করে কাটায়। বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে ঢুকে, কথা শোনা। মাঝে মাঝে পরিবর্তন করে দেয়া। কথার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করে কার সাথে কেমন সম্পর্ক। যারা কথা বলছে, তাদের পেশা কি। এসব জানতে সহায়তা করছে নিজের ডিটেকশন মিটার টা। এটার কাজ কাউকে টার্গেট করে একটা আলোর রশ্মি ফেললে, তার সম্পর্কে সব তথ্য চলে আসে ডিটেকশন মিটারের স্ক্রিনে। সমস্যা একটাই বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই কোন নাম প্রদর্শন করে না। নামের জায়গায় লেখা থাকে, N/A(not available). এবার স্টেশনে ফিরে গিয়ে রেকানকে বলতে হবে এই যন্ত্রটা আপডেট করতে। এখন দুজনের কথা শোনা যাচ্ছে। এরা খুব একটা ভাল বিষয় নিয়ে কথা বলছে বলে মনে হয় না। দুজনেই ছেলে। একজন অনেক কিছু বলছে, আর একজন গম্ভীর গলায়। - হ্যাঁ কত দূর? - আমাদের প্রায় শেষ কাজ। আজকেই স্যার আমরা ওদের বাসায় যাব। - আজকের মধ্যে কিন্তু কাজটা শেষ করতে হবে। - অবশ্যই স্যার। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমরা প্রোফেশনাল। কোন চিহ্ন থাকবে না খুন যে করব। পুলিশ কেন, তাদের বাপ এসেও কিছু খুঁজে পাবে না। - কথা কম বল। পুলিশের বাপকে লাগবে না। পুলিশ না বুঝলেই হল। টুলু এখন অন্য একটা ফ্রিকোয়েন্সি খুঁজছে। যেখানে পুলিশ কথা বলছে। এইতো পাওয়া গেছে। - হ্যালো, রামপুরা থানা। - ও রামপুরা থানা? আমি ভাবছিলাম মহাখালী কলেরা হাসপাতাল। আচ্ছা আপনাদের কাছে মহাখালী কলেরা হাসপাতালের নাম্বার আছে? হ্যাঁ এখানেই কাজ হবে। শুধু একটু ওলট পালট করে দেয়া। গম্ভীর লোকটার সাথে কথা বলিয়ে দিতে হবে, কলেরা হাসপাতাল খোঁজা মানুষটার। আর পুলিশের সাথে প্রোফেশনাল খুনিটার। - আপনারা কি? একটা কলেরা হাসপাতালের নাম্বার জানেন না। - কিসের কলেরা হাসপাতাল? - কলেরা চিনেন না? কলেরা। ডাইরিয়ার উপরের টা। - তুমি এসব এলোমেলো কথা বলছ কেন? খুন খুব সাবধানে করবে। - কি বললেন? খুন? কলেরা হইছে বলে মরে যাবে? ফোন নাম্বার দিবেন না ভাল । তাই আপনি এভাবে বদ দোয়া করবেন। এটা লাইন লাগাতে পারলেও খুনিটার সাথে লাগাতে পারছে না টিলু। এটা খুব সাবধানে করতে হবে। পুলিশটা বিরক্ত হয়ে ফোন রাখার আগেই। পুলিশ যখন চুপ থাকবে তখন। যাহ্ হয়ে গেছে। - স্যার। ঠিকানা এটাই তো? ধানমন্ডি ১২ এ, বাসা নং ৩৮, সাংবাদিক রেজা তালুকদার। একেই তো খুন করতে হবে? আপনি নিশ্চিত থাকুন। আজ রাতেই কাজ হয়ে যাবে। পুলিশ কিছুই টের পাবেনা। আপনি টাকাটা ঠিক রাইখেন। টাকা নিয়ে উলটপালট কিছু করলে কিন্তু সমস্যা হবে। কথা গুলো শুনে একটু নড়ে চড়ে বসলেন, রামপুরা থানার কানে ফোন ধরে রাখা পুলিশটা। চুপ করে শুনলেন। কিছুই বললেন না। ঠিকানাটা টুকে রাখলেন। কোথা থেকে হঠাৎ করে কল আসল মোবাইলে। কি কি বলল। তবুও ব্যাপারটা দেখতে হবে। ধানমন্ডি থানায় ফোন দিয়ে তখনই জানিয়ে দেয়া হল, ডিবি পুলিশ যেন সাংবাদিক রেজা তালুকদারের বাসার দিকে কড়া নজর রাখে। খুনটা আর হচ্ছে না। এটা ভেবে টুলু খুশি। একটা দিন মাত্র, পৃথিবীতে থাকবে। এর ভিতর কত রকম মানুষ দেখছে। অথচ ওদের স্টেশনে সবাই এক রকম। রেকান যা বলেন তাই চলে সেখানে। সবার কাজ কর্ম অনেক গুছান। একটা হাসপাতাল দেখা যাচ্ছে, এখানে অসুস্থ, বা শরীরে গোলযোগ থাকা মানুষদের ঠিক করা হয়। ঠিক তেমন ওদের স্টেশনে, ওয়ার্ক শপে করা হয় এসব। শরীর খুলে, যন্ত্রপাতি বের করে, আবার তা লাগিয়ে ঠিক করে দেয়। তবে টুলুর কখনও ওয়ার্ক শপে যেতে হয় নি। টুলুর অনেক কিছুই করতে হয় না, যা অন্য রোবটরা ওখানে করে। টুলু ওখানে রেকানের আশেপাশেই থাকে। খুব কম বাসা থেকে বের হয়। রেকানের অনুমতি খুব কমই মিলে। মাঝে মাঝে মনে হয় টুলুর, ওকে একটু আলাদা করে রাখা হচ্ছে। অন্য সবার সাথে ঠিক যাচ্ছে না ওর। ওখানে স্কুলে পড়াশুনা করে মাত্র কয়েকজন। বাকি সবাই স্টেশনের কাজ করে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কিছু একটার সাথে আঘাত খেল টুলু। পায়ের কাছে। ব্যথা করছে। আঘাত খেয়ে কান থেকে ভয়েস কনভার্টরটা খুলে পড়ে গেল। আশেপাশের মানুষদের কথা এখন কিছুই বুঝতে পারছে না টুলু। এই কনভার্টরটার কাজ, যে কোন ভাষা কাঙ্ক্ষিত ভাষায় পরিবর্তন করে নেয়া। এই এলাকার মানুষ গুলোর ভাষা বুঝতে পারে না টুলু। টুলুরা এই ভাষায় কথা বলে না। এই কনভার্টরের কারণেই বুঝতে পারে। একটা লোক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টুলুর পাশে। - ভাই কি কিছু খুঁজছেন? টুলু হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। কি বলছে লোকটা। লোকটার কথা বুঝতে পারছে না। বুঝবার কথাও না। লোকটা একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, শহরে নতুন নাকি? সাথে আছে টাছে কিছু? টুলু তাও চুপ। বলে না কিছু। - i can't understand. লোকটা একটু সরে গিয়ে বলে, এইটা দেখি বিদেশী। ইংলিশ কয়। টুলুর কাছে এসে বলে, আমার লগে আসেন। এক জায়গায় লইয়া যাইতেছি। টুলু ইশারায় বুঝতে পারে, লোকটা ওর সাথে যেতে বলছে। কনভার্টর খুঁজে না পেয়ে, লোকটার সাথেই হাঁটতে লাগল। - বুঝলেন ভাই। এইটা হইল বাংলাদেশ। সেই কবে থেকে শুনি এইটা এমেরিকার মতন হইবে। এমেরিকা আর হয় না। খালি রাস্তা ঘাটে মুত। মুত চিনেন তো? বলে লোকটা প্যান্টের চেইন ধরে টানাটানি করে কিছু বুঝাবার চেষ্টা করল। টুলু বুঝতে পারে না। লোকটাকে নীরবে অনুসরণ করে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আস্তে আস্তে অন্ধকারহয়ে আসছে চারপাশ। একটু নির্জন জায়গায় গিয়েই লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল। পকেট থেকে ধাতুর কিছু একটা বের করে টুলুর গলার কাছে ধরল। বলল, যা আছে সাথে দে। নয়ত গলা কাইটা ফালাইয়া দিমু। টুলু ভাব ভঙ্গিতে বুঝতে পারছে, লোকটা জোর করে টুলুর কাছ থেকে কিছু চাচ্ছে। এমন কিছু পড়েছিল বইয়ে। মানুষ নাকি মানুষকে এভাবে মাঝে মাঝে মেরে ফেলে। টুলুর বড় হাসি পাচ্ছে। টুলুর কিছুই হবে না, এই লোকটা জানে না। টুলু মানুষ না। টুলু অতি উন্নত রোবট। এই ধাতুর আঘাতে ওর কিছুই হবে না। টুলুর হাসি দেখে, লোকটা চমকে উঠল। একটু দূরে সরে সূক্ষ্ম চোখে তাকাল। না ভয় পেলে হবে না। টুলুর দিকে চাকুটা নিয়ে তেড়ে আসল। এখনি বিদায় করে দিবে পৃথিবী থেকে বিদেশীটাকে। চাকুটা টুলুর গলায় কাছাকাছি আসতেই থেমে গেল লোকটা। শরীর হঠাৎ অবশ হয়ে গেছে। চোখ লেগে আসছে। টুলুর সামনে মাটিতে ঢলে পড়ল লোকটা। টুলু আশেপাশে তাকাল। কেউ নেই। এটা কি করে হল? লোকটা হঠাৎ করে এমন মাটিতে পড়ে গেল কেন? লোকটার ঠিক পিছনে কিছু একটা পড়ে আছে। কালো করে। একটু কাছে যেতেই পরিষ্কার। একদম পরিষ্কার। টুলুর কনভার্টরটা। টুলু তুলে নিল কনভার্টর। কানে পরে নিল। লোকটা এখনও অসাড়। ডিটেকশন মিটার বলছে, লোকটা মৃত। কিভাবে মারা গেল, সেটা একটা ভাবনার বিষয়। হয়ত টুলু লোকটার চেয়ে শক্তিধর, তাই আঘাত করার আগেই মরে গেছে। এসব নিয়ে আর এতো ভাবতে চাচ্ছে না। সময় দেখল টুলু, সময় বাকি আর ৬ ঘণ্টা। ছয় ঘণ্টা পর টুলু ER821 হয়ে চলে যাবে। নিজের স্টেশনে। কতদূর যেতেই টুলু শুনল একটা ছেলে কাঁদছে। কান্না, মানুষের খুব বাজে একটা বদ গুণ। রেকান প্রায়ই বলতেন, আবেগ একটা জিনিস, যেটা শুধু পৃথিবীর মানুষদের আছে। এই জিনিসটা না থাকলে, ওরা এতো দিনে আমাদের চেয়ে অনেক উপরে থাকত। আবেগ আছে বলেই এরা পিছিয়ে পড়ছে। আবেগ আছে বলেই, এরা ক্ষুদ্র জিনিসে কষ্ট পাচ্ছে। কাঁদছে। আর জীবনের অনেকটা ধাপ পিছিয়ে যাচ্ছে। টুলুর এই বাজে জিনিস দেখবার কোন ইচ্ছা নেই। পাশ কাটিয়ে চলে গেল। পিছন ফিরে আর একবার দেখল কেন যেন। আর একটা ছেলে ঐ ছেলেটার সামনে। এবার ছেলেটার চোখ চিকচিক করছে। হাতে কিছু কাগজ ধরিয়ে দিল। তাই নিয়েই মনে হল ছেলেটা খুশি। কাগজ গুলো কিসের জানতে ইচ্ছা করছে। ডিটেকশন মিটার বলছে এটা money,এই দেশে বলে টাকা। এটার ব্যাপারেও জানে টুলু। এখানে সবকিছু হয় এটার বিনিময়ে। এটা যার যত বেশী সে তত ক্ষমতাবান। যার নেই সে অসহায়। স্টেশনে তেমন কিছু নেই। ওখানে প্রায় সবাইকে এক দৃষ্টিতে দেখা হয়। রেকান সবার সব চাহিদা পূরণ করে দেন। এখানে যে কোন চাহিদা পূরণের জন্য এটা দরকার। এখানে মানুষ গুলোর কোন দাম নেই। তার চেয়েও বেশী এই কাগজগুলোর দাম। টুলু হাঁটতে শুরু করল, ডিটেকশন মিটার দিয়ে ছেলেটার ব্যাপারে জানা যায়। তবে জানতে ইচ্ছা করছে না। টুলু হাঁটতে লাগল, সোজা সামনের দিকে। পিছন থেকে মোবাইল ফোন বেজে ওঠার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ছেলেটার ফোন এসেছে। নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার দিয়ে ছেলেটার কথা শুনছে , কেন শুনছে জানে না। অপ্রয়োজনীয় কাজ একটা। অপ্রয়োজনীয় কাজ করে মানুষ, টুলু একটা রোবট। টুলুও তাই করছে তবুও। মানুষের পৃথিবীতে এসে মানুষের অনেক কিছু নিজের ভিতর আঁকড়ে ধরছে। এসব ঠিক না। ছেলেটাকে একটা মেয়ে ফোন দিয়েছে। - ভাইয়া, মায়ের অবস্থা সত্যি খুব খারাপ রে। তুই কখন আসবি? - আসতেছি আমি। - টাকা যোগাড় হইছে? মায়ের ওষুধ কিনতে পারছি না। ঘরে টাকা নেই একটাও। ওষুধের দোকান তো বন্ধ হয়ে যাবে। - হ্যাঁ মাত্র এক বন্ধুর থেকে ধার করলাম। আমি আসছি। কাঁদিস কেন পাগলী তুই? মায়ের কিছু হবে না। তোর ভাই আছে? মায়ের ছেলে আছে না? - আমার অনেক ভয় করছে। মা একটু পর পর কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। ডাক্তার বলছে, তিনদিন ইঞ্জেকশন দিতে হবে। প্রথমটা ফ্রিতে উনি দিছেন। আজ অন্যটা দিতে হবে। বাসায় আয় ভাইয়া তাড়াতাড়ি। - এইতো আসছি। আর তুই কাঁদবি না একদম। মা কাঁদতে দেখলে আরও ভেঙে পড়বে। মায়ের পাশে থাক। মোবাইল রেখে দিল ছেলেটা। রেখে নিজেই কাঁদছে। কি আজব অবস্থা, অন্যকে একটা কাজ করতে মানা করে, নিজেই সেটা করা। ছেলেটা একটা তিন চাকার যানে চরল। এটার নাম রিকশা। টুলুর হঠাৎ করে কেন যেন মন খারাপ হয়ে গেল। খুব খারাপ লক্ষ্মণ। মন খারাপের বীজও টুলুর ভিতর ঢুকে গেছে। ছেলেটা বলল রিকশা চালককে, মামা, কাওরান বাজার। এই রিকশা চালকের নামও মামা। রিকশা চলতে লাগল। রিকশা কাওরান বাজার যাচ্ছে। এই রিকশার সাথে যেতে ইচ্ছা করছে টুলুর। তবে যেতে পারবে না। টুলুর কাছেও একটা স্লিম রানার আছে। পায়ে পড়লে এটা, পৃথিবীর যে কোন বাহনের চেয়ে দ্রুত যাবে। তবে এটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধ আছে রেকানের। এটা ব্যবহার করলে সবাই বুঝে যাবে, টুলু মানুষ নয়। রোবট। তবে ছেলেটার ব্যাপারটা মাথা থেকে তাড়াতে পারছে না টুলু। মাথা থেকে কোন ভাবেই যাচ্ছে না। একবার ভাবল, ব্রেন স্ক্রানার দিয়ে একটু আগের ঘটনাটা মাথা থেকে মুছে ফেলবে। তবে সেটাও সায় দিচ্ছে না, কে যেন। কে যেন কানের কাছে বলছে, না এটা মাথা থেকে তাড়িও না। লেগে থাকো। লেগে থাকো। টুলু লেগে রইল। নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার দিয়ে ছেলেটার মোবাইলের নেটওয়ার্ক এর সাথে লেগে রইল। কোথায় কোথায় যাচ্ছে সেসব ওখানে উঠছে। যখন গন্তব্যে চলে যাবে তখন হুট করে টুলু সেখানে চলে যাবে। দেখবে কি করে। টুলু সেখানেই বসে রইল। অন্য কিছু করতে ইচ্ছা করছে না। মাথার ভিতর ঐ ছেলেটার চিন্তা। বার বার নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বারের দিকে তাকাচ্ছে। ছেলেটা এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে থেমে গেল। কাওরান বাজার? না এটা তো কাওরান বাজার না। অনেকটা সময় চলে গেল। ছেলেটার নেটওয়ার্ক ওখান থেকে নড়ছে না। টুলু আর অপেক্ষা করতে পারছে না। দরকার হলে টুলু গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবে। তাও এভাবে থেমে থাকা যাবে না। একটা মানুষ মারা যাচ্ছে, আর ছেলেটা ওখানে থেমে আছে। টুলু স্লিম রানারটা বের করল। রাস্তা দিয়ে যাওয়া সমস্যা। গিজিগিজি বাড়িঘর। এর চেয়ে ফ্লো অপশন চালু করে উড়ে যাওয়া ভাল। সাই করে ছেলেটার নেটওয়ার্ক এর জায়গায় চলে গেল। একি এতো নির্জন জায়গা। ছেলেটা যে রিকশায় বসে ছিল সেটা নেই আশেপাশে। ছেলেটাকেও দেখা যাচ্ছে না। একটা আলো জ্বালল টুলু। ছেলেটা এই তো। মাটিতে শুয়ে আছে। শরীরে লাল লাল কি সব। ডিটেকশন মিটার বলছে ছেলেটা মৃত। কি করে সম্ভব? মোবাইলটা ছেলেটার কাছে না। আশেপাশে কারও কাছে। ঐ তো দেয়ালের ওপাশে কয়েকটা ছেলে। ওদের কাছেই মোবাইলটা। নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার তাই বলছে। তার মানে টুলুর সাথে যা করতে চেয়েছিল, চাকু বের করে ঐ লোকটা। এই ছেলেটার সাথেও তাই করেছে, ঐ দেয়ালের পাশের ছেলেগুলো। ছেলেটাকে মেরে, মোবাইল আর টাকা ছিনিয়ে নিয়ে নিয়েছে। টুলুর শরীর কাঁপছে। কেন কাঁপছে জানে না। পিছনের ব্যাগ থেকে, সাইলেন্ট এটম পুশার বের করল টুলু। এটা ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা রেকানের, খুব বিপদে না পড়লে। এটার ভিতর সবচেয়ে বিষাক্ত পরমাণু গুলো সেট করা। একটা পুশ করলে টার্গেট করে, তাহলেই শেষ। টুলু সাইলেণ্ট এটম পুশার, পুশ করল। এক এক করে চারজনই মাটিতে পড়ে গেল মুহূর্তে। মোবাইলটা নিল, টুলু। নিয়ে নিল খুঁজে টাকা গুলো। এখন টাকা গুলো দিয়ে আসতে হবে ছেলেটার মায়ের কাছে। ছেলেটার মা সুস্থ হবে। আর একটা অপ্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য উঠে পড়ে লাগল টুলু। কিন্তু টুলু কাওরান বাজার চিনে না। কোনদিক দিয়ে যেতে হয় তাও জানে না। সাথে এমন কোন যন্ত্রও নেই যেটা ধরে যেতে পারে। বসে বসে উপায় খুঁজতে খুঁজতেই, টুলুর সামনে এসে দুজন দাঁড়াল। ঠিক ভাবে চেনা যাচ্ছে না। অন্ধকারে। আলো ধরতেই দেখা গেল, TY567 আর TY587, দুজন রোবট। নিশ্চয় রেকান এদের পাঠিয়েছে টুলুকে সাহায্য করতে। কাওরান বাজার খুঁজে বের করতে। টুলু ওদের দিকে হাসি মুখে এগিয়ে যেতেই এরা গম্ভীর গলায় একসাথে বলল, রেকান আমাদের পাঠিয়েছেন। আপনাকে স্টেশনে ফেরত নিয়ে যেতে। আপনার এখন আমাদের সাথে যেতে হবে। - অসম্ভব। এখনও সাড়ে চার ঘণ্টা বাকি। রেকান এটা বলতে পারেন না। - আমাদের যেটা বলা হয়েছে, আমরা সেটাই করছি। আমরা প্রথম থেকেই আপনার পাশে ছিলাম। ইনভিসিবল রে এর ভিতর। আপনি যখন বিপদে পড়েছিলেন, রেকানের নির্দেশে আপনার শত্রুকে আমরাই মেরেছিলাম। তবে তখন ইনভিসবল রে থেকে বের হবার নির্দেশ ছিল না। এখন রেকনের নির্দেশ, আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। আপনি আমাদের সাথে ইনভিসিবল রে এর ভিতর আসুন। টুলু বুঝতে পারল, সেই সময়টায় যখন লোকটা চাকু হাতে নিয়ে টুলুকে আঘাত করতে আসছিল এরাই তাকে মেরেছে। এরা প্রথম থেকেই আশেপাশে। অদৃশ্যমান রশ্মির ভেতর থাকাতে টুলু এদের অস্তিত্ব বুঝতে পারে নি। রেকান টুলু কে একা ছাড়েন নি পৃথিবীতে। সাথে করে দুজনকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু টুলু এখন যাবে না। টুলু টাকাটা সেই মায়ের কাছে দিয়ে তারপরই যাবে। - আমার কিছু কাজ বাকি আছে। একটু সেরে তোমাদের সাথে যাচ্ছি। - রেকানের আদেশ আমরা অমান্য করতে পারি না। আপনি এখন আমাদের সাথে যাবেন। - অসম্ভব। TY567 আর TY587 ইনভিসিবল রে এর মধ্যে টুলুকে নেবার আগেই টুলু নিজের স্লিম রানারের ফ্লো অপশন চালু করে ছুটতে লাগল এলোমেলো। পিছনে পিছনে ধরার জন্য TY567 আর TY587. টুলু এলোমেলো ছুটছে, আর বারবার খেয়াল করছে কোথাও কাওরান বাজার লেখা আছে কিনা। কাওরান বাজার লেখা থাকলেও ছেলেটার মা কে খুঁজে পাওয়া কষ্ট সাধ্য। কিভাবে পাবে? টুলু যে চিনে না তাদের কাউকে। একটা রোবট হয়ে মানুষের জন্য মায়া, সত্যি অবাক করা। মাথার ভিতর সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এসব ভাবছে একদিকে, অন্য দিকে নিজেকে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে, পালিয়ে বেড়াচ্ছে TY567 আর TY587 এর থেকে। এরা ছুটেই চলছে, টুলুর পিছনে। টুলু কিছু ভাবতে পারছে না। মানুষটাকে বাঁচাতে হবে যেভাবে হোক। কিন্তু পথ নেই। সব পথ বন্ধ। হঠাৎ করেই হাতের মোবাইলটা বেজে উঠল। আলো ঝলমলে স্ক্রিনে ভাসছে, একটা নাম্বার। টুলু কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কান্না জড়ানো গলা, ভাইয়া তুই আসবি না? সত্যি কথা বল? টাকাটা যোগাড় করতে পারিস নাই, তাই না? মায়ের অবস্থা আরও খারাপ। ওষুধ লাগবে না। তুই আয়, মা এর শেষ সময়ে পাশে থাক। ভাইয়া কথা বল। মেয়েটা কেঁদে যাচ্ছে। কান্না শুনে টুলুর ভিতর কি যেন হয়ে গেল। বুকের বাম পাশে চিনচিনে একটা ব্যথা হচ্ছে। মনে হচ্ছে ভিতর থেকে কোন তার ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিছুই করতে পারছে না টুলু। মেয়েটা ভাইয়ের আশায়, মা ছেলের আশায় বসে আসে। তবে সবই মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে। টুলু কান থেকে মোবাইলটা রাখতে যাবে, তখনই মাথার ভিতর কি যেন খেলে গেল। নিজের নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার একবার দেখল। এটাই দরকার। নিজের কানে মোবাইল রেখে, বলল, আমি আসছি। নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বার দিয়ে, ফ্রিকোয়েন্সিতে ঢুকল, নিজের হাতের মোবাইল আর ওপাশের মোবাইলের নেটওয়ার্ক এর। এইতো নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি এবসর্বারে লোকেশন দেখাচ্ছে। টুলু অতি দ্রুত, স্লিম রানার চালিয়ে চলে গেল, কাওরান বাজার ঐ জায়গায়। যেখানে মোবাইল দিয়ে টুলুর সাথে কথা বলা হচ্ছে। যেখানে একটা বোন ভাইয়ের অপেক্ষা করছে। যেখানে একটা মা ছেলের। যেখানে একটা জীবন মরণের কাছাকাছি কিছু কাগজের জন্য। টুলু চলে এসেছে। একটা ভাঙা বাড়িতে এরা থাকে। রাস্তার পাশে জীর্ণশীর্ণ। আশেপাশে অনেক বিল্ডিং। সেসব অনেক সুন্দর। তবে এটা তেমন না। টুলু নেটওয়ার্ক সোর্স পেয়েছে। দরজায় টোকা দিল টুলু। ভাঙা দরজার ভিতর থেকে শব্দ চলে আসছে ভিতরে কি বলছে। একটা মেয়ে বলছে, মা ভাইয়া আসছে। টাকা নিয়ে আসছে। ওষুধ কেনা হবে। তুমি সুস্থ হবে। মেয়েটা দৌড়ে চলে আসল দরজা খুলতে। টুলুর অনেক ভাল লাগছে। টাকাটা হাতে। মেয়েটাকে টাকা দিয়ে ওষুধ কিনতে বলবে। তার আগে একটু দেখা যায়, মায়ের কি অসুখ। দরজার ফোঁকর দিয়ে ডিটেকশন মিটারের আলো ফেলল, বিছানায় শুয়ে থাকা মহিলার উপর। সব এসেছে তথ্য। নাম জানা নেই। রোগের কোন বর্ণনা নেই। তবে সবসময় unknown আসা একটা অপশনে, কিছু লেখা দেখা যাচ্ছে। টুলু অবাক হয়ে লেখা গুলো পড়ছে। সেখানে লেখা, Relation- mother( according to DNA) টুলু একটু সময় নিল ব্যাপারটা বুঝতে পারার। mother বা মা এর ব্যাপারে ডিকশনারিতে লেখা ছিল, যার দ্বারা জন্ম হয়েছে। তার মানে...... মেয়েটা হাসি মুখে দরজা খুলেই একটু এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। হাসি মুখ হঠাৎ মলিন হয়ে গেল। টুলু টাকাটা বাড়িয়ে দিল মেয়েটার দিকে। মেয়েটা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে এখনও। টুলুর দিকে তাকাচ্ছে না। মেয়েটাকে ডাকল টুলু, এই যে মেয়ে, টাকা নাও। মেয়েটা তাও তাকাল না টুলুর দিকে। কি ব্যাপার? মেয়েটা অন্ধ নাকি? অন্ধ হলেও কথা তো শুনবে। তাও শুনছে না। টুলু হঠাৎ পাশে কারও অস্তিত্ব অনুভব করল। দুই পাশে TY567 আর TY587. ওরা বলে যাচ্ছে, আপনি এখন ইনভিসবল রে এর ভিতর আছেন। আমরা এখন স্টেশনের দিকে রওয়ানা দিচ্ছি।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সায়েন্স ফিকশনঃ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২৯.আমেরিকায় আরেক যুদ্ধ (২)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X ‘ব্যাপারটা কিছু বুঝতে পারছেন মিঃ গোল্ড ওয়াটার? জর্জ আব্রাহাম, এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার ও জেনারেল শেরউড অস্বাভাবিক ধরনের তাড়াহুড়া করে নিউ মেক্সিকো গেলেন কেন?’ উদ্বিগ্ন কন্ঠ জেনারেল শ্যারনের। ‘কিছু বুঝছি না। কালকের সন্ধ্যার ঘটনার সাথে এর কি কোন সম্পর্ক আছে?’ চিন্তান্বিত কন্ঠে বলল গোল্ডওয়াটার। ‘গতকালকের ঘটনা তো পরিষ্কার। এফ.বি.আই হেড কোয়াটারের ডিউটি অফিসার ম্যাগগিল শেখ আবদুল্লাহ আলী ও আহমদ মুসার সাথে জর্জ আব্রাহামের এ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যাপার আমাদের কাছে ফাঁস করে দেয়ার অপরাধে গ্রেফতার হয়েছে। এ নিয়ে জর্জ আব্রাহামের সাথে কথা বলেছি। তাকে বলেছি এ ধরনের ফাঁস করে দেয়ার ঘটনা অফিস শৃঙ্খলার বিরোধী, কিন্তু নতুন নয়। এ ধরনের ঘটনা অতীতেও ঘটেছে, কিন্তু এভাবে গুরুতর অপরাধ হিসাবে কোন সময়ই দেখা হয়নি। তিনি একথার কোন স্পষ্ট জবাব দেননি। আমিও তাকে আর কিছু বলিনি। বললে আরও পরে বলব, একজন আমলাকে তেল মাখানোর কোন প্রয়োজন নেই।’ ‘আহমদ মুসা কি ওদের কান ভারি করেছে?’ বলল গোল্ড ওয়াটার। ‘কি আর ভারি করবে। তার কি বলার আছে। মার্কিন সরকার, মার্কিন প্রশাসন কি ইহুদীদের কাজ সম্পর্কে তার চেয়ে বেশী জানে না।’ ‘কিন্তু আমি বিস্মিত হচ্ছি আহমদ মুসার বুদ্ধি দেখে। জর্জ আব্রাহামের সাথে এ গোপন এ্যাপয়েন্টমেন্ট করার পরও বাড়তি সতকর্তা হিসাবে শেখ আবদুল্লাহ আলীর নামে আরেকটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়ার চিন্তা করেছিল কেন?’ ‘এটা আহমদ মুসার একটা বৈশিষ্ট্য। পরিস্থিতির পেটে যতকথা থাকে সবই সে বুঝতে পারে। বাতাস থেকেই সে বিপদের গন্ধ পায়।’ ‘আহমদ মুসার জন্য ওৎ পেতে থাকা আপনাদের দু’জন লোক গায়েব হলো কোথায়?’ ‘সেটাও একটা বিস্ময়। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এফ.বি.আই গ্রেফতার করেনি। শেখ আবদুল্লাহ আলী রূপি আহমদ মুসাও ঠিক সময়ে সাক্ষাতের জন্যে এফ.বি.আই অফিসে পৌছেছে। সুতরাং সেও গায়েব করার কাজে জড়িত বুঝা যায় না।’ ‘কেন আহমদ মুসার সাথে কেউ থাকতে পারে, তারা তাদের ধরে নিয়ে যেতে পারে।’ ‘হ্যাঁ তা পারে। সেটা খোঁজ নেবার জন্যে বলেছি। আহমদ মুসার সাথে ওয়াশিংটনে আসা বেঞ্জামিন বেকনেরও খোঁজ নিচ্ছি আমরা।’ টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন ধরল জেনারেল শ্যারন। টেলিফোনে কথা শুনতে শুনতে গোল্ড ওয়াটারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিছু বুঝতে পারছি না গোল্ড ওয়াটার। আহমদ মুসাও নাকি গেছে জর্জ আব্রাহামদের সাথে।’ ‘আহমদ মুসা গেছে ?কেন?’ বলল গোল্ড ওয়াটার। ‘সেটাই তো কথা। তবে আমার মনে হচ্ছে, লস আলামোসের ঘটনার ব্যাপারটাই তাকে নিয়ে গেছে।’ বলল জেনারেল শ্যারন। ‘তাহলে কি বলা যায় যে, আহমদ মুসা এখন সরকারের হাতে বন্দী?’ ‘এটাই স্বাভাবিক মিঃ গোল্ড ওয়াটার।’ ‘তাহলে তো বলতে হয়, আহমদ মুসা গায়ে পড়ে এসে ধরা দিয়েছে। কিন্তু আহমদ মুসার জন্য এটা কি স্বাভাবিক?’ ‘স্বাভাবিক নয়। কিন্তু এটাই তো ঘটেছে।’ বলল জেনারেল শ্যারন। তার কপাল কুঞ্চিত। ভাবছে সে। কথা শেষ করেই জেনারেল শ্যারন আবার বলে উঠল, ‘অংক মিলছে না মিঃ গোল্ড ওয়াটার। আহমদ মুসা একটা গোলক ধাঁধা সৃষ্টি করেছে। মতলব কি তার?’ স্বগতোক্তির মত করেই কথা শেষ শ্যারনের। আবারও টেলিফোন বেজে উঠল জেনারেল শ্যারনের। টেলিফোন তুলে নিল শ্যারন। ওপারের কথা শুনেই শ্যারন বলে উঠল, ‘গুড মর্নিং, কি খবর বেন?’ ওপারের কথা শুনল জেনারেল শ্যারন। মুহূর্তেই মুখ চুপসে গেল তার। উদ্বেগ আতংকের এক অন্ধকার নেমে এল তার চোখেমুখে। বলে উঠল, ‘কিছুই তোমরা টের পাওনি? কম্পিউটার মেমরী মুছে দিতে ক’সেকেন্ড লাগে? ওরা অন্ধকূপে নেমেছে কেন?’ ওপারে দীর্ঘ কথা শুনল জেনারেল শ্যারন। শুনতে শুনতে তার মুখ মরার মত পাংশু হয়ে উঠল। টেলিফোন ধরা তার হাত কাঁপছে। টেলিফোনে কথা শেষ হওয়ার পরও কয়েক মুহূর্ত পাথরের মত নিশ্চল হয়ে বসে থাকল জেনারেল শ্যারন। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে হোয়াইট ঈগল প্রধান গোল্ড ওয়াটার। বলল, ‘কি ব্যাপার জেনারেল? খারাপ কিছু ঘটেছে?’ গোল্ড ওয়াটারের কথায় প্রায় চমকে উঠার মত তাকাল জেনারেল শ্যারন। বিমূঢ় তার চেহারা। গোল্ড ওয়াটারের প্রশ্ন সে শুনতে পেয়েছে। কি জবাব দেবে সে? প্রকৃত ঘটনা বলা যাবে না গোল্ড ওয়াটারকে। বর্ণবাদী আন্দোলন করলেও সে নিরেট আমেরিকান। এই ঘটনায় তার মত আমেরিকানরা শ্যারনদের বিরুদ্ধে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একটু ভেবে জেনারেল বলল, ‘আমরা ষড়যন্ত্রের শিকার মিঃ গোল্ড ওয়াটার।’ শুষ্ক কন্ঠ শ্যারনের। ‘কি রকম?’ ‘জর্জ আব্রাহামরা আহমদ মুসাকে নিয়ে আমাদের সবুজ পাহাড় সিনাগগে অভিযান চালিয়েছে ও দখল করে নিয়েছে।’ ‘কেন, সবুজ পাহাড় কেন? ওখানে কি আছে?’ বিস্মিত কন্ঠ গোল্ড ওয়াটারের। ‘অভিযানের প্রধান টার্গেট সিনাগগের কাগজপত্র ও কম্পিউটার। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, আহমদ মুসার খপ্পরে পড়ে ওরা কোন ষড়যন্ত্র সাজাচ্ছে আমাদের মানে ইহুদীদের বিরুদ্ধে। গোয়েন্দাবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত আহমদ মুসা মনে হচ্ছে তার দোষ আমাদের ঘাড়ে চাপাবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে।’ ‘একটা অসম্ভব কথা শুনালেন জেনারেল শ্যারন।’ ‘অর্থনীতিতে সবই সম্ভব মিঃ গোল্ড ওয়াটার। মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোডলার অনেক মার্কিন আমলারই মাথা কিনে নিচ্ছে। আহমদ মুসা জর্জ আব্রাহামের সাথে দেখা করার কারণ নিশ্চয় বড় কিছু। নিশ্চয় বড় কোন লেন-দেনের ব্যাপার ঘটেছে।’ ‘কিন্তু জর্জ আব্রাহামের সাথে সি.আই.এ চীফ এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার ও পেন্টাগনের প্রধান জেনারেল শেরউড তো আছেন?’ ‘তাদের হাত করা কি সিনিয়র আমলা জর্জ আব্রাহামের জন্যে কঠিন?’ বলে একটু দম নিল। বলল আবার, ‘শুনলাম ওরা অন্ধকূপেও নেমেছে।’ ‘অন্ধকূপে? কেন?’ ‘আমাদের লোক কিছু বলতে পারল না। আমাদের এ লোকটি কোনভাবে সরে পড়তে পেরেছে বলে টেলিফোনে খবরটা জানাতে পারল। অন্যদের সবাইকে আটক করা হয়েছে।’ ‘সাংঘাতিক কথা শুনালেন জেনারেল। কিছু একটা তো করতে হয়।’ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল গোল্ড ওয়াটার। ‘মিঃ গোল্ড ওয়াটার আপনাদেরও আমি সাহায্য চাই। বিকালে আমি আপনার সাথে দেখা করব। এখনি আমাকে বেরুতে হবে।’ বলল কম্পিত কন্ঠে জেনারেল শ্যারন। উঠে দাঁড়াল গোল্ড ওয়াটার যাবার জন্যে। বলল, ‘দুঃখিত জেনারেল এই অঘটনের জন্যে। আমাদের পূর্ণ সাহায্য আপনি পাবেন।’ গোল্ড ওয়াটার বেরিয়ে গেল ড্রইং রুম থেকে। গোল্ড ওয়াটার বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সংগেই জেনারেল শ্যারন তার মোবাইল টেলিফোন হাতে নিল। প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আলেকজান্ডার হ্যামিলনের কাছে টেলিফোন করল সে। তার চোখ মুখ থেকে উত্তেজনা ঠিকরে পড়ছে। তার দু’চোখে ক্রুর প্রতিহিংসার আগুন। জেনারেল শ্যারন টেলিফোনে গোটা বিষয় ব্রিফ করল জেনারেল আলেকজান্ডার হ্যামিলটনকে। সব কথা শুনে আলেকজান্ডার হ্যামিলটন বলল, ‘আমি আপনাকে আর সময় দিতে পারছি না। আমি প্রেসিডেন্টের কাছে যাচ্ছি, ডেকেছেন তিনি। আপনি নিশ্চিত থাকুন। যা করার আমি করব। যা বলার আমি বলে দেব জর্জ আব্রাহাম ও এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থারকে।’ প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলেকজান্ডারের সাথে কথা শেষ করে জেনারেল শ্যারন আরেকটা নাম্বার ডায়াল করতে যাচ্ছিল কিন্তু তার তর্জনি মোবাইলের ডায়াল বাটন স্পর্শ করার আগেই টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন ধরে ওপারের কথা শুনেই দ্রুত বলে উঠল, ‘বেনইয়ামিন তুমি? কি খবর?’ জেনারেল শ্যারনের কন্ঠে উদ্বেগ। ‘খবর খুব খারাপ স্যার। সবুজ পাহাড়ের অন্ধকূপ থেকে লস আলামোসের কম্পিউটার কক্ষ পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ খুঁজে পেয়েছে ওরা। ওরা একে গোয়েন্দাগিরীর পথ বলে অভিহিত করছে।’ কথাগুলো জেনারেল শ্যারনের কানে পৌছার সঙ্গে সঙ্গেই মরার মত ফ্যাকাসে হয়ে গেল তার মুখ। কেঁপে উঠল তার শরীর। হাত থেকে খসে পড়ল টেলিফোন। শিথিল হাতেই আবার টেলিফোন তুলে নিল সে। মুহূর্তের জন্যে চোখ বুজে নিজেকে সংবরণ করল জেনারেল শ্যারন। শক্ত হাতে চেপে ধরল সে টেলিফোন। ঠোঁট দু’টি তার শক্ত হয়ে উঠল। তীব্র হয়ে উঠল তার চোখের দৃষ্টি। বলল সে টেলিফোনে, ‘বেনইয়ামিন তুমি লস আলামোসের আউটার গেটের সামনে গিয়ে লুকিয়ে অপেক্ষা কর। ডি.এস.কিউ (ডেথ স্কোয়াড) সেখানে মানে লস আলামোসে যাচ্ছে। তাদের কি করণীয় আমি তাদের বলে দেব। তোমার করণীয় হলো যা ঘটে তার খবর পাঠানো।’ বলে টেলিফোন রেখে দিল জেনারেল শ্যারন। তার চোখ দু’টো বাঘের মত জ্বলছে। মনে তার ঝড়। সে ঝড়ের একটাই মূল কথা, ‘এখন জর্জ আব্রাহাম, এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার ও জেনারেল শেরউড এবং তাদের সাথে আহমদ মুসার বেঁচে থাকার অর্থ আমেরিকায় ইহুদীদের বেঁচে না থাকা।’ ড্রইং রুমে প্রবেশ করতে গিয়ে ‘বেনইয়ামিন ও লস আলামোস’ শব্দ জেনারেল শ্যারনের কন্ঠে উচ্চারিত হতে শুনে হোঁচট খাওয়ার মত থমকে দাঁড়াল সারা বেনগুরিয়ান। এক বেনইয়ামিনের নাম সে জানে। যাকে ইহুদীদের পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তির দায়ে কিছুদিন আগে চীন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। চীন থেকে সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে। আর লস আলামোসে একটা বড় ঘটনা ঘটেছে সেটাও সে জানে। ইহুদী গোয়েন্দা প্রধানের মুখে এই দুই নাম শোনাই তার হোঁচট খেয়ে থমকে দাঁড়াবার কারন তার এটাই। তার মনে হয়েছে এই কথা বলা অবস্থায় ড্রইং রুমে প্রবেশ করা জেনারেল শ্যারনের জন্যে হয়ত বিব্রতকর হতে পারে। তাছাড়া সাবা বেনগুরিয়ানের মনে কৌতূহলের সৃষ্টি হলো জেনারেল শ্যারনের কথা সম্পুর্ণটা শোনার জন্যে। সাবা বেনগুরিয়ান ইসরাইলের প্রথম প্রধান মন্ত্রী ডেভিড বেনগুরিয়ান পরিবারের সন্তান। সে ওয়াশিংটনের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতি’ বিষয়ের ছাত্রী। তার পিতা আইজাক বেনগুরিয়ান একটা ব্যাংকের মালিক। তারা সকলেই খুবই সম্মানিত। তারা মার্কিন নাগরিক হলেও নিজ জাতি ইহুদীদের প্রতি তাদের দায়িত্ব ভোলেনি। তারা ‘আমেরিকান জুইস পিপলস কমিটি’র সদস্য। এই কমিটি শুধু আন্তর্জাতিক ইহুদীবাদকে সাহায্য করা নয়, মার্কিন পলিসীকে ইহুদীমুখী রাখার জন্যেও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। মার্কিন নির্বাচনের সময় এই কমিটিই চাঁদা উঠায় এবং সুপরিকল্পিতভাবে পছন্দনীয় নির্বাচন প্রার্থীদের সহায়তা করে। জেনারেল শ্যারন সাবা বেনগুরিয়ানের আব্বা আইজ্যাক বেনগুরিয়ানের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শ্যারন ওয়াশিংটন এলে সাবাদের বাড়িতি ওঠে। সাবা বেনগুরিয়ান জেনারেল শ্যারন টেলিফোনের বেনইয়ামিনকে যে নির্দেশ দিল তার সবটাই শুনল। শুনতে গিয়ে সে চমকে উঠল ‘জি.এস.কিউ’-কে লস আলামোসে পাঠানোর কথা শুনে। এই ‘জি.এস.কিউ’র অর্থ ইহুদী ডেথ স্কোয়াড তা বুঝতে তার দেরী হলো না। এই ডেথ স্কোয়াড লস আলামোসে কেন? আর গোয়েন্দা বেনইয়ামিন লুকিয়ে কি দেখবে, কোন খবর পাঠাবে? আহমদ মুসা লস আলামোসে ঢুকেছিল। কিন্তু তার এখন ফেরার কোন সমস্যা নেই লস আলামোসে। ডেথ স্কোয়াড যাচ্ছে সেখানে, যাচ্ছে কার বিরুদ্ধে? ইহুদী ডেথ স্কোয়াডকে মার্কিন প্রশাসন কি হায়ার করছে? তাই যদি হবে, তাহলে বেনইয়ামিন লুকিয়ে থেকে কি রিপোর্ট করবে জেনারেল শ্যারনকে?’ কোন প্রশ্নের উত্তরই সাবা বেনগুরিয়ান বের করতে পারলো না। ওদিকে জেনারেল শ্যারন টেলিফোনে কথা শেষ করেছে। নিরব ড্রইং রুম। সাবা বেনগুরিয়ান প্রবেশ করল ড্রইং রুমে। ড্রইং রুমে প্রবেশ করে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল, ‘আঙ্কেল, আব্বা টেলিফোন করেছিলেন আপনাকে আমাদের সাথে আজ লাঞ্চ খেতে হবে। প্রায়ই বাইরে খান, আজ নয়।’ জেনারেল শ্যারন হাসতে চেষ্টা করে বলল, ‘কেন আজ কি কোন অকেশন আছে নাকি?’ শ্যারন হাসার চেষ্টা করলেও হাসিটা হলো তার কান্নার মত। ‘কোন অকেশন নেই, জর্জ জন আব্রাহাম জুনিয়রও আজ এখানে লাঞ্চ করবে।’ বলল সাবা বেনগুরিয়ান। ‘জর্জ আব্রাহামের ছেলে?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘সে কম্পিউটার বিজ্ঞানী না?’ ‘এই তো কয়দিন আগে সে সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুল। কয়েকটা আবিষ্কারের জন্যে তাকে বিজ্ঞানী বলা হচ্ছে বটে।’ ‘পেন্টাগনের টপসিক্রেট কম্পিউটার উইং এর কনসালট্যান্টও তো সে?’ ‘বিস্তারিত জানি না। শুনেছি পেন্টাগনে কিছু সময় সে দেয়।’ ‘হ্যাঁ সাবা সে পেন্টাগনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার বিজ্ঞানী। খুব ভাল ছেলে।’ ‘হ্যাঁ আঙ্কেল খুব ভাল ছেলে। প্রেসিডেন্ট তাকে দু’বার ডেকেছেন।’ ‘তোমার বন্ধু না?’ ‘জি, আঙ্কেল।’ সাবা বেনগুরিয়ানের মুখ লাল হয়ে উঠল। ‘তোমরা বিয়েও করছ, তাই না?’ ‘জানি না আঙ্কেল, ও খুব কনজারভেটিভ আমেরিকান।’ বলতে গিয়ে সাবার মাথা লজ্জায় নুয়ে পড়ল। ‘তাতে কি? জান না, জর্জ আব্রাহামের মা ইহুদী কন্যা ছিলেন?’ ‘তাই? আমি জানতাম না।’ ‘তুমি কি জর্জদের বাড়িতে গেছ?’ ‘হ্যাঁ গেছি।’ ‘আজ যাও না ওদের বাড়িতে, এটা অনুরোধ।’ ‘কেন এ অনুরোধ?’ চোখে মুখে বিস্ময় সাবা বেনগুরিয়ানের। ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদী স্বার্থ আজ মহাসংকটে পড়েছে। তোমার সাহায্য দরকার।’ ‘জর্জের বাড়িতে যাওয়ার সাথে এ সাহায্যের সম্পর্ক কি?’ ‘জর্জের বাড়িতে গিয়ে জর্জ জনের আব্বা জর্জ আব্রাহামের নিজস্ব স্টাডিতে তাঁর পারসোনাল কম্পিউটার তোমাকে ব্যবহার করতে হবে।’ ‘কেন? সেখানে কি করব?’ ‘তুমি জান না, জর্জ আব্রাহাম জনসন এফ.বি.আই-এর চীফ। তার বিশেষ অভ্যাস হলো, প্রতিদিন তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও ডাটা পান, যেখানেই থাকুন সঙ্গে সঙ্গেই তা মোবাইলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অফিসের মাস্টার কম্পিউটারে পাঠান। বাড়তি সর্তকতা হিসেবে সঙ্গে সঙ্গেই তা আবার তিনি তার পারসোনাল কম্পিউটারে পাঠান। তোমাকে গত দু’দিন ও সর্বশেষ সময় পর্যন্ত আসা লস আলামোস ও সবুজ পাহাড় সংক্রান্ত সকল ডকুমেন্ট মুছে ফেলতে হবে।’ লস আলামোসের নাম শুনে চমকে উঠল সাবা বেনগুরিয়ান। কিছুক্ষন আগে জেনারেল শ্যারনের মুখেই সে লস আলামোসে ডেথ স্কোয়াড পাঠানোর কথা শুনেছে। তার সাথে কম্পিউটার থেকে ডকুমেন্ট মুছার কি সম্পর্ক আছে? ভেতরে ভেতরে শংকিত হয়ে উঠল সাবা বেনগুরিয়ান। তাকে দিয়ে গোয়েন্দাগিরী করাতে চান জেনারেল শ্যারন? অস্বস্তিতে ভরে উঠল সাবা বেনগুরিয়ানের মন। বলল সে, ‘জর্জ জন জুনিয়রের অজ্ঞাতে এই কাজ করা যাবে না এবং আমি তা পারবও না। কিন্তু কেন করতে হবে ? কি ঘটেছে এমন?’ ‘সব কথা তোমাকে বলতে পারবো না মা। তবে এটুকু জেনে রাখ অবিলম্বে যদি আমরা জর্জ আব্রাহামদের গতিরোধ করতে না পারি, তারা যদি লক্ষ্যে পৌঁছে যায়, তাহলে জার্মানীতে আমাদের অবস্থা যা দাঁড়িয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটতে পারে।’ শিউরে উঠল সাবা বেনগুরিয়ান। জার্মানীর ভয়াবহ দৃশ্যগুলো ফুটে উঠল তার চোখে। আমেরিকায় তার পুনরাবৃত্তি তারা কল্পনাও করতে পারে না। ভীত হয়ে পড়ল সাবা বেনগুরিয়ান। কথা বলার শক্তিও যেন সে হারিয়ে ফেলল। কথা বলল আবার জেনারেল শ্যারনই, ‘কাজটা তুমি কিভাবে করবে জানি না। কিন্তু এখন আমার বিশ্বাস এটা একমাত্র তুমিই করতে পারবে।’ কথা বলতে পারল না সাবা বেনগুরিয়ান। কিন্তু তার মনে হলো বেনগুরিয়ান কন্যার উপর একটা দায়িত্ব এসে চেপে বসেছে, যা প্রত্যাখ্যানের কোন শক্তি তার নেই। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, জর্জ জন জুনিয়রের সাথে কোন বিশ্বাসঘাতকতা তার পক্ষে সম্ভব নয়। জেনারেল শ্যারন উঠে দাঁড়াল। নির্বাক সাবা বেনগুরিয়ানকে বলল, ‘আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। লাঞ্চের সময় ঠিক এসে যাব।’ বলে বেরিয়ে গেল জেনারেল শ্যারন। সাবা বেনগুরিয়ান ধপ করে বসে পড়ল সোফায়। দেহের ওজন যেন তার হঠাৎ করেই অনেক কমে গেছে। গাড়ি থেকে নেমে সাবা বেনগুরিয়ানের হাত ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির ভেতরে নিজের ব্যক্তিগত ড্রইংরুমে প্রবেশ করে সোফায় বসে সাবাকে টেনে নিতে নিতে বলল জর্জ জুনিয়র, ‘আজ কি যে সৌভাগ্য আমার। বেনগুরিয়ান রাজকন্যাকে সেধেও বাড়িতে আনা যায় না, সে কিনা আজ স্বেচ্ছায় ধরা দিল।’ ‘সেধে ধরা দিলেই বুঝি দাম কমে যায়?’ বাহুর বাধনটা আরও দৃঢ় করে জর্জ জন জুনিয়র বলল, ‘না দাম আরও বাড়ে।’ ‘আব্বা আম্মা কাউকে যে দেখছি না?’ ‘আব্বা গেছেন লস আলামোসে সরকারী কাজে। আর আম্মা গেছেন আজ সকালে ভাইয়ার বাড়িতে। আমিই আজ বাড়ির রাজা।’ সাবা বেনগুরিয়ান তার চুলে ঢাকা মুখটা জর্জ জন জুনিয়রের বুকে রেখে বলল, ‘রাজা মশায়, আমি কেন এসেছি জান? তোমার কৃতিত্বকে সেলিব্রেট করার জন্যে।’ ‘কোন কৃতিত্ব?’ ‘তুমি দুনিয়ার সব কম্পিউটারে গোপন কুঠুরিতে ঢোকার পথ আবিষ্কার করেছ।’ ‘হ্যাঁ সাবা, এই আবিষ্কার আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার অনেক পরিশ্রম কমিয়ে দেবে। কম্পিউটারের সিক্রেট কেবিনও আমাদের গোয়েন্দা বিভাগগুলোর মাথা ব্যথার কারণ ঘটাবে না।’ ‘সব কম্পিউটারই আনলক করতে পারে? এফ.বি.আই, সি.আই.এ’র গুলোও?’ ‘অবশ্যই। জান, এফ.বি.আই, সি.আই.এ’র কম্পিউটারগুলোর মধ্যে আব্বার পারসোনাল কম্পিউটারের সিক্রেট কেবিন সবচেয়ে প্রটেকটেড। আমি ওটাও খুলতে পারি চোখের পলকে।’ সাবা বেনগুরিয়ান জর্জ জন জুনিয়রের বুক থেকে মুখ তুলে বলল, ‘সত্যি পার?’ ‘বিশ্বাস হচ্ছে না, চল দেখাচ্ছি।’ সাবা বেনগুরিয়ানকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল জর্জ জন জুনিয়র। কম্পিউটার টেবিলে সাবা বেনগুরিয়ানকে নিজের পাশে বসিয়ে জর্জ জন জুনিয়র বলল, ‘নাও তুমিই হাত লাগাও সাবা। আমি বলে দিচ্ছি কি করতে হবে।’ অন্তরটা কেঁপে উঠল সাবার। সে প্রতারণা করছে জর্জ জন জুনিয়রকে। বিশ্বাসঘাতকতা করছে তার সাথে। জর্জ জুনিয়র সরল বিশ্বাসে তার হাতে তুলে দিচ্ছে জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ একটি কম্পিউটারের গোপনীয়তা। আর সাবা গোয়েন্দাগিরীর কূটিল মনোভাব নিয়ে তা গ্রহণ করছে। বিব্রত বোধ করল সাবা বেনগুরিয়ান। কিন্তু পরক্ষণেই জেনারেল শ্যারনের চেহারা ভেসে উঠল তার সামনে। ইহুদী গোয়েন্দা চীফের এক অলংঘনীয় হুকুম আবার তার উপর যেন চেপে বসল। তার সেই কথাও মনে পড়ল, জার্মানিতে যা হয়েছিল তার চেয়েও খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হতে পারে ইহুদীরা আমেরিকায়। আবারও শিউরে উঠলো সাবা বেনগুরিয়ান। তার মনে হলো, সেই বিপর্যয় থেকে ইহুদীদের রক্ষার একটা মিশন জেনারেল শ্যারন তুলে দিয়েছে তার হাতে। সে দায়িত্ব সে কি পালন করবে না? করতেই যে হবে তাকে। কম্পিউটারের কী বোর্ডে হাত রাখল সাবা বেনগুরিয়ান। কম্পিউটার বিজ্ঞানে সাবা বেনগুরিয়ানও দক্ষ কম নয়। ‘সাবা, সব রোগের পাশে যেমন ঔষধ থাকে, তেমনি যে কোন কম্পিউটার সমস্যার সমাধানও তার পাশে মানে কী বোর্ডেই থাকে। রোগের যেমন ঔষধ আবিষ্কার করতে হয়, তেমনি কম্পিউটার সমস্যার সমাধানও কম্পিউটার কী বোর্ড থেকেই আসে।’ বলে জর্জ জুনিয়র জগতের সবচেয়ে দুরুহ কম্পিউটারের লক আনলক করার জটিল কোড ব্রিফ করল সাবা বেনগুরিয়ানকে। সে কম্পিউটার কোডটি সাবা বেনগুরিয়ান কম্পিউটার কী বোর্ডে কাজে লাগাল। কোডটি সম্পর্ণ হবার সঙ্গে সঙ্গেই কম্পিউটার স্ক্রীনে ‘পাসওয়ার্ড ও,কে’ সিগন্যাল ভেসে উঠল। তার পরেই পরবর্তী কমান্ড চাইল কম্পিউটার। বুক কেঁপে উঠল সাবা বেনগুরিয়ানের। এবার ওপেন কী চাপলেই কম্পিউটারের গোপনগ্রন্থের পাতা তার সামনে খুলে যাবে। তারপর কী চেপে একের পর এক পাতা উল্টালেই শেষের পাতাগুলো সে পেয়ে যাবে। কম্পিত তর্জনির শীর্ষ দিয়ে ওপেন কীতে চাপ দিল সাবা বেনগুরিয়ান। কম্পিউটারের গোপনগ্রন্থের প্রথম পাতা ওপেন হলো সাবা বেনগুরিয়ানের সামনে। হৃদয়ের কাঁপুনি বেড়ে গেল সাবা বেনগুরিয়ানের। সে অনেক কষ্টে হাসার চেষ্টা করে ধন্যবাদ দিল জর্জ জুনিয়রকে। বলল, ‘সবচেয়ে গোপন দরজা খোলার মন্ত্র তুমি সত্যই আবিষ্কার করেছ জর্জ জুনিয়র।’ একদিকে এই কথাগুলো বলছিল, অন্যদিকে তার ব্যস্ত তর্জনি বোতাম টিপে একের পর এক পাতা উল্টে যাচ্ছিল। সাবা বেনগুরিয়ান কোন পাতায় কি আছে তা দেখার জন্যে বিন্দুমাত্র ওয়েট করছিল না। তার লক্ষ্য সর্বশেষ এন্ট্রিগুলো। জর্জ জুনিয়র সাবা বেনগুরিয়ানের পাশে বসে সাবার আঙ্গুলের খেলা দেখে যাচ্ছিল। সে মনে করছিল মজা বশতই সাবা কম্পিউটারের একের পর এক পাতা উল্টে যাচ্ছে। সর্বশেষ এন্ট্রির সামনে আসতেই থমকে দাঁড়াল সাবা বেনগুরিয়ানের চোখ। সেই সাথে গোটাদেহে বয়ে গেলো প্রবল অস্বস্তির একটা শীতল স্রোত। সাবা বেনগুরিয়ানের দু’টি চোখ নিবদ্ধ কম্পিউটারের সেই লেটেস্ট এন্ট্রি চার্টের উপর। আর তার তর্জনিটা ছুটে গেল ফাংশন কীর দিকে। পরপর তিনটি নির্দিষ্ট বাটন চাপলেই মুছে যাবে লেটেস্ট এন্ট্রিগুলো। কিন্তু সাবা বেনগুরিয়ানের চোখ দু’টি লেটেস্ট এন্ট্রিগুলো পড়তে গিয়ে আঠার মত লেগে গেল। চোখ ফেরাতে পারল না সে। তার তর্জনি নেমে গেছে, ফাংশন বাটনে চাপ দিতে ভুলে গেল যেন। পড়ছে সে এন্ট্রিগুলো। ইহুদী সিনাগগ কমপ্লেক্স সবুজ পাহাড়ে আহমদ মুসার বন্দী হওয়া এবং তার মুক্ত হওয়ার গোটা কাহিনী পড়ল সাবা বেনগুরিয়ান। তারপর আহমদ মুসার সাথে জর্জ আব্রাহামের সাক্ষাতের বিবরণও পড়ে ফেলল সে। সাবা বেনগুরিয়ার অনুভব করল তার দেহ মনের উপর দিয়ে বুদ্ধি বিবেচনা ভোতাকারী এক শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। পড়ে চলল সে। জর্জ আব্রাহাম, এ্যাডমিরাল ম্যাক আর্থার ও জেনারেল শেরউডের তিন সদস্য বিশিষ্ট টিম তদন্তের গেছে আহমদ মুসার দেয়া তথ্যের সত্যতা প্রমাণের জন্যে। টিম সরেজমিনে দেখবে, ইহুদী বিজ্ঞানী জন জ্যাকব সবুজ পাহাড় থেকে লস আলামোস পর্যন্ত তৈরী করা গোয়েন্দা সড়ঙ্গের কথা সত্য কিনা, সত্য হলে এ গোয়েন্দা সুড়ঙ্গ পথে কতদিন ধরে গোয়েন্দাবৃত্তি চলছে, আহমদ মুসা লস আলামোসে সাম্প্রতিক ইহুদী গোয়েন্দাবৃত্তির যে তথ্য দিয়েছে সে রকম গোয়েন্দাবৃত্তি ইহুদীরা কিভাবে, কার মাধ্যমে করছে। আহমদ মুসা কর্তৃক উদ্ধার করা সাম্প্রতিক গোয়েন্দাবৃত্তি সংক্রান্ত দলিল গোটাটাই কম্পিউটারে সে দেখল। কম্পিউটারের লেটেস্ট এন্ট্রির এখানেই শেষ। পড়ার পর সাবা বেনগুরিয়ানের গোটা দেহ যেন কাঁপছে। মনে পড়ল জেনারেল শ্যারনের সেই কথা যে, যদি জর্জ আব্রাহামদের রোখা না যায় তাহলে জার্মানীতে ইহুদীদের যে অবস্থা হয়েছিল, সেই অবস্থা হবে আমেরিকার ইহুদীদের। হৃদয়টা থরথর করে কেঁপে উঠল সাবা বেনগুরিয়ানের। এই গোয়েন্দাগিরীর কথা যদি প্রচার হয়, যদি প্রমাণ হয় বিজ্ঞানী জন জ্যাকবের মত সর্বজন শ্রদ্ধেয় লোকও যদি ইহুদীদের পক্ষে গোয়েন্দাগিরী, লস আলামোস পর্যন্ত সুড়ঙ্গ তৈরী ও গোয়েন্দাবৃত্তি করে থাকে, তাহলে কোন ইহুদীই বিশ্বাসযোগ্য নয়, এটাই স্বতঃসিদ্ধ হয়ে উঠবে। আর তখন জার্মানীতে যা হয়েছিল সেই অবস্থা এখানেও সৃষ্টি হতে পারে। কম্পিত হৃদয়ে আরও ভাবল সাবা বেনগুরিয়ান, কিন্তু এ এন্ট্রিগুলো মুছে ফেললেই কি সব প্রমাণ মুছে যাবে? হঠাৎ তার মনে পড়ল লস আলামোসে জেনারেল শ্যারন ‘ডেথ স্কোয়াড’ পাঠানোর কথা। তার মানে তদন্ত টিমের সদস্যসহ আহমদ মুসাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে জীবন্ত প্রমাণ নষ্ট করার পরিকল্পনা করেছে জেনারেল শ্যারনরা? গাটা কেঁপে উঠল আরেকদফা সাবা বেনগুরিয়ানের। সে বুঝতে পারল পরিকল্পনা। জীবন্ত প্রমাণ সরিয়ে দিতে ও কম্পিউটারের রেকর্ডগুলো মুছে ফেলতে পারলেই কেটে যেতে পারে সংকট। কিন্তু এই পরিকল্পনা সাবা বেনগুরিয়ানকে আশ্বস্ত করার বদলে আরও আতংকিত করে তুলল। সে ইহুদী বটে, কিন্তু তাই বলে জর্জ জুনিয়রের এতবড় ক্ষতি চোখের সামনে দেখতে পারবে না, জর্জ জুনিয়রের পিতাকে যারা হত্যা করতে চায়, তাদের কোন সহযোগিতা করা তার পাপ হবে। জর্জ জুনিয়র তার সব। প্রবল একটা আবেগ উথলে উঠল তার হৃদয় থেকে। চোখ দু’টি তার অশ্রুতে ভারি হয়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই জেনারেল শ্যারনের কথা , স্বজাতির কথা, তার পিতার কথা মনে হলো। তার পিতার, তার স্বজাতির কোন বিপর্যয় কি সে সহ্য করতে পারবে? পারবে না। তাহলে সে কি করবে এখন? ফাংশন বাটনের উপর তার তর্জ্জনি তখন। চাপ দেবে কি বাটনে? জর্জ জুনিয়র তার পাশেই । তার দেহের মধুর উত্তাপ সে অনুভব করতে পারছে। সে জানে না কি সর্বনাশ করতে যাচ্ছে সে। ফাংশন বাটনের উপর রাখা তার তর্জ্জনি ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল সাবা বেনগুরিয়ান দু’হাতে মুখ ঢেকে। সে এলিয়ে পড়ল চেয়ারের উপর। জর্জ জুনিয়র সাবা বেনগুরিয়ানের মতই কম্পিউটারের এন্ট্রিগুলো পড়ছিল। অকল্পনীয় একটা সত্যের মুখোমুখি হয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েছিল সেও। সাবা বেনগুরিয়ানকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে দেখে জর্জ জুনিয়র বুঝল সাবা অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। জর্জ জন সাবা বেনগুরিয়ানের পিঠে হাত রেখে বলল, ‘এ তুমি কি করছ সাবা। এগুলো ইনফরমেশন মাত্র, রুটিন এন্ট্রি। এসব নিয়ে তুমি এত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে কেন?’ সাবার কান্না আরও বেড়ে গেল। জর্জ জন জুনিয়র কম্পিউটার অফ করে দিয়ে সাবা বেনগুরিয়ানকে টেনে নিয়ে এসে বসল সোফায়। বলল, ‘তুমি এত নরম, ভাবনারও বাইরে ছিল আমার।’ সাবা বেনগুরিয়ানের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম কন্ঠে বলল জর্জ জুনিয়র। ‘জর্জ তুমি জান না, তোমার সাথে আমি কি বিশ্বাসঘাতকতা করতে যাচ্ছিলাম।’ দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্না জড়িত কন্ঠে বলল সাবা বেনগুরিয়ান। ‘তুমি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে যাবে কেন? কি যা তা বলছ তুমি?’ সাবা বেনগুরিয়ানের কথার কোন আমল দিল না জর্জ জুনিয়র। মুখ তুলল সাবা বেনগুরিয়ান। অশ্রু ধোয়া তার মুখ। তার চোখে মুখে একটা সিদ্ধান্তের ছাপ। বলল সে, ‘বিশ্বাস করবে যদি বলি ইহুদী গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল শ্যারন আমাকে এখানে পাঠিয়েছিল সাংঘাতিক একটা উদ্দেশ্যে?’ বিস্ময়ের একটা ঢেউ খেলে গেল জর্জ জুনিয়রের চোখে মুখে। কিছুক্ষণ সে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সাবা বেনগুরিয়ানের দিকে। বলল ধীরে ধীরে, ‘তুমি মিথ্যা বলবে না। তোমাকে অবিশ্বাসের প্রশ্ন নেই। কিন্তু জেনারেল শ্যারনের সাথে তোমার কোথায় দেখা হলো? সাংঘাতিক সে উদ্দেশ্যটা কি?’ ‘জেনারেল শ্যারন আব্বার বন্ধু। ওয়াশিংটন এলে আমাদের বাসাতেই ওঠেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, কম্পিউটারের লেটেস্ট এন্ট্রিগুলো মুছে ফেলা।’ বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার মত চমকে উঠল জর্জ জুনিয়র। তার বিস্ফোরিত চোখ সাবা বেনগুরিয়ানের উপর নিবদ্ধ। বলল, ‘তাহলে এন্ট্রিগুলোর সব তথ্য সত্য সাবা?’ ‘আমার তাই বিশ্বাস। না হলে জেনারেল শ্যারন ইহুদী জাতি বিপন্ন হওয়ার দোহাই দিয়ে এই কাজ করায় আমাকে রাজী হতে বাধ্য করতে আসবেন কেন?’ চোখ মুছে ভারি গলায় বলল সাবা বেনগুরিয়ান ‘কিন্তু এই এন্ট্রি মুছে ফেললেই কি সব প্রমাণ মুছে যাবে? তারা...............।’ জর্জ জুনিয়রকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠল সাবা বেনগুরিয়ান, ‘জর্জ তারা শুধু এই একটি কাজ নয়, আমার আশংকা তারা আরও ভয়াবহ কিছু ঘটাতে যাচ্ছে। জর্জ জুনিয়রের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠল। বলল, ‘ভয়াবহ? সেটা কি?।’ সাবা বেনগুরিয়ান কম্পিত গলায় বলল, ‘আজ সকালে আব্বার একটা মেসেজ জেনারেল শ্যারন আংকেলকে দেবার জন্যে আমাদের ড্রইং রুমে ঢুকছিলাম। ঠিক সে সময় আমি তাঁকে টেলিফোনে জনৈক বেনইয়ামিনকে বলতে শুনলাম যে, সে যেন লস আলামোসের প্রধান গেটের পাশে কোথাও আত্মগোপন করে থাকে এবং যে ডেথ স্কোয়াড তিনি লস আলামোসে পাঠাচ্ছেন তাদের খবরাখবর যেন সে পাঠায়।’ চমকে উঠে সোফায় সোজা হয়ে বসল জর্জ জুনিয়র। বলল, ‘ লস আলামোসে ইহুদী ডেথ স্কোয়াড? কি জন্যে? ওখানে আব্বারা আজ যাচ্ছেন, কিংবা তারা আজ ওখানেই আছেন? তাহলে কি......?’ কথা শেষ করতে পারল না জর্জ জুনিয়র। ‘আমি তোমার সাথে একমত জর্জ। তোমার আব্বার কম্পিউটার টার্গেট হবার সাথে সাথে তোমার আব্বাও টার্গেট হতে পারেন।’ কম্পিত কন্ঠে বলল সাবা বেনগুরিয়ান। তার চোখে মুখে আতঙ্ক। ঝট করে উঠে দাঁড়াল জর্জ জুনিয়র। তারপর সাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, ‘এস আব্বার কম্যুনিকেশন টেবিলে এস।’ কম্যুনিকেশন টেবিলে জর্জ জুনিয়র অয়্যারলেস কী বোর্ডের সবুজ বোতামে চাপ দিল। ‘ইয়েস স্যার।’ ওপার থেকে কথা বলে উঠল জন লিংকন। জন লিংকন এফ.বি.আই-এর অপারেশন কমান্ডার। ‘আমি জর্জ জুনিয়র। আমি আব্বার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।’ ‘কোন খবর আপনাদের কাছে আছে? আমরা তাঁর সাথে কনট্যাকটের চেষ্টা করছি।’ ‘চেষ্টা করছি মানে, অয়্যারলেস, মোবাইলে তাকে কনট্যাকট করা যায়নি?’ ‘কয়েকবার চেষ্টা করেছি, ব্যর্থ হয়েছি আমরা। আমরা ‘সান্তাফে’ ও ‘লস আলামোসে’ আমাদের ইউনিটকে বিষয়টা জানিয়ে দিয়েছি। যে কোন সময় ওদের উত্তর আশা করছি। এদিকে একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে। তাঁকে আমাদের জরুরী প্রয়োজন।’ ‘সাংঘাতিক? কি ঘটেছে?’ বলল জর্জ জুনিয়র। ‘একটা বিস্ফোরণ ঘটে আমাদের মাস্টার কম্পিউটার ধ্বংস হয়ে গেছে।’ কেঁপে উঠল জর্জ জুনিয়র। সাবার দেয়া তথ্য তাহলে একশ ভাগ সত্য। ইহুদী গোয়েন্দাগিরী ও বিশ্বাসঘাতকতার সব প্রমাণ ধ্বংসের তারা একই সাথে উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের বাসার প্রমাণ রক্ষা পেয়েছ। কিন্তু এফ.বি.আই অফিসের প্রমাণ ধ্বংস হয়েছে। লস আলামোসে তাদের ডেথ স্কোয়াড পাঠানো কি সফল হয়েছে? তার আব্বার মোবাইল ও অয়্যারলেস নিরব কেন? তার গোটা দেহে আতংকের একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। নিজেকে সামলে জর্জ জুনিয়র বলল, ‘এমন নাশকতামূলক ঘটনা কিভাবে ঘটল অমন সংরক্ষিত জায়গায়?’ ‘নাশকতামূলক ঘটনা বলছেন? কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে বৈদ্যুতিক ত্রুটি জনিত অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণ হতে পারে।’ বলল এফ.বি.আই অপারেশন প্রধান জন লিংকন। ‘না মিঃ লিংকন আমি এর প্রতিবাদ করছি। একটা শত্রু পক্ষ কম্পিউটারে সংরক্ষিত কিছু অতি সাম্প্রতিক দলিল ধ্বংস করার জন্যেই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। ওরা লস আলামোসে আব্বাদের টিমের উপরও হামলা করতে পারে আমার আশঙ্কা।’ কমান্ডার জন লিংকন দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘মাফ করবেন, এটা আপনার অনুমান, না আপনার কোন নিশ্চিত তথ্য?’ ‘মিঃ লিংকন, অনেক গুরুতর ঘটনা ঘটে গেছে তারই প্রতিক্রিয়ায় শত্রু পক্ষ প্রমাণ ধ্বংস কৌশল হিসাবে এফ.বি.আই কম্পিউটারের রেকর্ড ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়ার মত করেই ওরা লস আলামোসে আজ ডেথ স্কোয়াড পাঠিয়েছে।’ ‘সর্বনাশ! ধন্যবাদ মিঃ জর্জ জন। আমি বুঝতে পারছি। আমি এদিকের এবং লস আলামোসের বিষয়টা দেখার ব্যবস্থা করছি।’ অয়্যারলেস অফ করে দিয়ে জর্জ জন জুনিয়র ফিরল সাবা বেনগুরিয়ানের দিকে। সাবা বেনগুরিয়ার সীমাহীন উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়েছিল জর্জ জন জুনিয়রের দিকে। বলল, ‘কি ব্যাপার জর্জ?’ ‘তোমার তথ্য সত্য সাবা। ওরা প্রমাণ মুছে ফেলার জন্যে সব ব্যবস্থাই করেছে। এফ.বি.আই-এর মাস্টার কম্পিউটার ওরা ধ্বংস করেছে।’ শুকনো কন্ঠে বলল জর্জ জুনিয়র। ‘ও গড! আর তোমার আব্বার কথা?’ সাবা বেনগুরিয়ানের কন্ঠে উদ্বেগ। জর্জ জুনিয়রের মুখ মলিন হয়ে উঠল। বলল, ‘কম্পিউটার বিস্ফোরণের পর এফ.বি.আই আব্বার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। কিন্তু আব্বার মোবাইল ও ওয়্যারলেস দু’টিই কোন রেসপন্স করেনি।’ সাবা বেনগুরিয়ানের মুখ সাদা হয়ে গেল শোনার সাথে সাথেই। শুকনো ঠোঁট দু’টি তার কাঁপল, বলল, ‘স্যরি জর্জ, তোমাকে আরও আগে আমার জানানো উচিত ছিল। বিশ্বাস কর যখন আমি প্রথম ডেথ স্কোয়াডের কথা শুনি তখন কিছুই বুঝিনি। এমনকি জেনারেল শ্যারন যখন এই এ্যাসাইনমেন্টটি আমার উপর চাপিয়ে দেন, তখনও বুঝতে পারিনি। বুঝলাম এখানে এসে কম্পিউটারের লেটেস্ট এন্ট্রিগুলো পড়ার পর।’ জর্জ জুনিয়র সাবা বেনগুরিয়ানের একটা হাত হাতে নিয়ে বলল, ‘তোমার কোন ত্রুটি হয়নি সাবা, তুমি যথা সময়েই বলেছ।’ বলে একটু থামল জর্জ। একটু ভাবল। তারপর অনেকটা স্বগোতোক্তির মতই বলল, ‘ভাবছি লস আলামোসে যাব কিনা।’ ‘তুমি গেলে আমিও যাব জর্জ।’ বলল সাবা বেনগুরিয়ান। ‘ঠিক আছে, আমি আরও একটু ভাবি। তোমাকে আমি টেলিফোন করব।’ ‘ধন্যবাদ জর্জ।’ ‘এখন উঠি তাহলে।’ বলে উঠে দাঁড়াল সাবা বেনগুরিয়ান। জর্জ জন জুনিয়রও উঠে দাঁড়াল। হাঁটছিল দু’জন। জর্জের একটা হাত সাবা বেনগুরিয়ানের গলায় পেঁচানো। হাঁটতে হাঁটতে জর্জ সাবা বেনগুরিয়ানকে নিজের দিকে টেনে বলল, ‘তুমি না বললে কিছুই জানতাম না। তোমার জাতির স্বার্থে জেনারেল শ্যারনের অনুরোধ রক্ষা করলে না কেন? শুধুই কি আমার কারণে?’ সাবা বেনগুরিয়ান জর্জে দিকে চাইল। ম্লান হাসল। তারপর মুখ নিচু করল। বলল, ‘শুধুই তোমার কারণে নয়। শুধু তোমার কারনে হলে ওর দেয়া এই দায়িত্বই নিতাম না। ভাবতাম তোমাকে না জানিয়ে এ ধরনের কোন কিছুই করা ঠিক নয়। কিন্তু তা না ভেবে ভেবেছিলাম জাতির পক্ষে ঐ অনুরোধ রক্ষা করলে তা একটা অন্যায় হবে আমার জন্যে, তোমার অমর্যাদা তাতে হবে না।’ ‘তাহলে জেনারেল শ্যারনের অনুরোধ শেষ পর্যন্ত রাখলে না কেন?’ জর্জ বলল। ‘এন্ট্রিগুলোর বিষয়বস্তু দেখে আমি তা মুছে ফেলতে পারিনি।’ বলল সাবা। ‘কেন? এন্ট্রিগুলো মুছে ফেলার জন্যে তোমার আগ্রহী হওয়া উচিত ছিলে। কারণ তোমার জাতির বিপদের কথা তখন তোমার কাছে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল।’ ‘দুই কারনে পারিনি। জাতির কিছু লোকের একাজকে আমার চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হয়েছে। দ্বিতীয়ত আমি আমেরিকান, আমেরিকার নাগরিক, এই চিন্তা তখন আমার কাছে বড় হয়েছিল।’ হাসল জর্জ জন জুনিয়র। আরও কাছে টেনে নিল সাবা বেনগুরিয়ানকে। বলল, ‘তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সাবা। আমাকে আশ্বস্ত করলে।’ ‘কিভাবে আশ্বস্ত করলাম, কোন বিষয়ে?’ ব্যস্ত কন্ঠে বলল সাবা। ‘আশ্বস্ত হলাম যে, আমাকে কোন সময় তুমি ভালবাসতে না পারলেও দেশের প্রতি তুমি বিশ্বস্ত থাকবে। আর দেশের প্রতি এমন দায়িত্বশীল যে, সে তার সাথীর প্রতিও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য।’ ‘তোমাকে ধন্যবাদ জর্জ। তুমি আমাকে বুঝতে পেরেছ? বিশ্বাস করেছ। তুমি ভুল বুঝলে, অবিশ্বাস করলে আমার বাচাঁ কঠিন হয়ে উঠতো।’ কান্না ভেজা ভারি কন্ঠ সাবা বেনগুরিয়ানের। ‘কিন্তু সাবা, তোমাকে অবিশ্বাস করার যন্ত্রণা তার চেয়েও বেশি কষ্ট আমাকে দিত।’ ‘ধন্যবাদ। আমি অতি ভাগ্যবান জর্জ।’ ‘আমিও।’ গাড়ি বারান্দায় তারা পৌছে গেছে। জর্জ জন জুনিয়র এগিয়ে গিয়ে সাবা বেনগুরিয়ানের গাড়ির দরজা খুলে ধরল। সাবা ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলে জর্জ গাড়ির দরজা বন্ধ করে বলল, ‘গুড নাইট সাবা, বাই।’ ‘বাই। আমি তোমার টেলিফোনের অপেক্ষা করব জর্জ।’ বলে গাড়িতে স্টার্ট দিল সাবা বেনগুরিয়ান।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২৯.আমেরিকায় আরেক যুদ্ধ (২)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন