বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) শেষ পর্ব
X
মিস্টার বেকার উঠে দাঁড়ালেন। সদ্য-পাওয়া
হাঁসটা বগলদাবা করে বললেন, “অবশ্যই, মশাই।
আমরা দিনের বেলা মিউজিয়ামে কাজ করি।
মিউজিয়ামের কাছে আলফা ইন হল আমাদের
প্রিয় আড্ডা। তার মালিকের নাম উইন্ডিগেট।
ভারী ভাল লোক। তিনি একটা হাঁস ক্লাব স্থাপন
করেছেন। প্রতি সপ্তাহে কয়েক পেনি করে চাঁদা
দিলে আমরা বড়োদিনের সময় একটা হাঁস পাই।
আমি আমার চাঁদা সময়মতো দিয়ে এসেছিলাম।
বাকি সবটাই তো আপনার জানা। আপনার কাছে
আমি ঋণী থেকে গেলাম, মশাই। আমার বয়স বা
সম্মানের কথা ভাবলে, এই স্কচ বনেট জাতীয় টুপি
আর এই আমাকে মানায় না।” যাওয়ার সময় তিনি
মাথা ঝুঁকিয়ে বেশ কেতাবি কায়দায় একটা
অভিবাদন জানিয়ে গেলেন। বেশ মজা লাগল
দেখে।
তিনি চলে গেলে হোমস দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে
বলল, “এই হল মিস্টার হেনরি বেকারের গল্প।
বোঝাই যাচ্ছে, তিনি ঘটনার কিছুই জানেন না।
ওয়াটসন, তোমার কি খিদে পেয়েছে?”
“না, কেন?”
“তাহলে চলো, সন্ধ্যের খাবারটা একেবারে
রাতেই খাওয়া যাবে; এইবেলা এই টাটকা সূত্রটার
পিছু নেওয়া যাক।”
“বেশ, তাই চলো।”
বেশ শীত পড়েছিল সে রাতে। আমরা গলায় ভাল
করে আলস্টার [‡‡] পরে মাফলার জড়িয়ে বের
হলাম। মেঘহীন আকাশে তারা ঝিলমিল করছিল।
পথের লোকেদের মুখ থেকে পিস্তলের গুলির মতো
ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ডকটর’স কোয়ার্টার, উইমপোল
স্ট্রিট, হার্লে স্ট্রিট, উইগমোর স্ট্রিট পেরিয়ে
অক্সফোর্ড স্ট্রিটে এসে পড়লাম। আমাদের
পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। আধঘণ্টার
মধ্যে ব্লুমসবেরির আলফা ইনে এসে পড়লাম।
হলবোর্নের দিকে যে রাস্তাটা গেছে তারই এক
কোণে একটা ছোটো পাবলিক হাউস। হোমস
প্রাইভেট বারের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে লাল-
মুখো, সাদা অ্যাপ্রন-পরিহিত মালিকের কাছে দুই
গ্লাস বিয়ার অর্ডার করল।
বলল, “তোমার বিয়ার নিশ্চয় তোমার হাঁসের মতোই
ভাল।”
লোকটা অবাক হয়ে বলল, “আমার হাঁস!”
“হ্যাঁ, আধঘণ্টা আগেই তোমার হাঁস ক্লাবের সদস্য
মিস্টার হেনরি বেকারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল।”
“ও, হ্যাঁ! এবার বুঝেছি। তবে কিনা, মশাই, ওই হাঁস
ঠিক আমার নয়।”
“তাই নাকি! তাহলে কার?”
“কভেন্ট গার্ডেনের এক হাঁসওয়ালার কাছ থেকে
ডজন দুয়েক আনিয়েছিলাম।”
“বটে! ওখানকার কয়েকজনকে চিনি। ওগুলো ঠিক
কার থেকে আনিয়েছিলে?”
“লোকটার নাম ব্রেকিনরিজ।”
“ও! তাকে চিনি না। আচ্ছা, এই নাও তোমার
বিয়ারের দাম। তোমার ব্যবসার উন্নতি হোক।
শুভরাত্রি।”
বাইরের হিমেল হাওয়ায় আবার বেরিয়ে এসে সে
কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল, “এবার
গন্তব্য মিস্টার ব্রেকিনরিজের দোকান। বুঝে
দ্যাখো, ওয়াটসন, আমরা যে লক্ষ্যে চলেছি, তার
এক দিকে একটা সামান্য হাঁস। কিন্তু অন্যদিকে
একটি নিরপরাধ লোক যাকে আমরা নির্দোষ
প্রমাণ করতে না পারলে তাকে সাত বছর বিনা
অপরাধেই জেল খাটতে হবে। এমনও হতে পারে যে,
আমরা দেখব আসলে চুরিটা সেই করেছে। কিন্তু
ভাগ্যক্রমেই হোক, আর যেভাবেই হোক, আমাদের
হাতে এমন একটা সূত্র এসে গেছে যা পুলিশের
হাতেও আসেনি। এর শেষ দেখেই ছাড়ব। চলো
দক্ষিণ দিকে। তাড়াতাড়ি।”
হলবোর্ন পেরিয়ে এনডেল স্ট্রিটে এসে পড়লাম।
বসতি এলাকার আঁকাবাঁকা পথ ধরে কভেন্ট
গার্ডেন মার্কেটে পৌঁছালাম। সেখানে সবচেয়ে
বড়ো দোকানগুলোর একটার নাম ব্রেকিনরিজের
নামে। মালিকের মুখটা ঠিক ঘোড়ার মতো
লম্বাটে। দু-পাশে ছাঁটা জুলপি। একটা ছেলেকে
দোকানের শাটার ফেলতে সাহায্য করছিল।
হোমস বললে, “শুভ সন্ধ্যা। বেশ শীত পড়েছে আজ
রাতে।”
বিক্রেতা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল।
তারপর আমার সঙ্গীর দিকে প্রশ্নালু চোখে
তাকাল।
মার্বেলের শূন্য স্ল্যাবগুলোর দিকে আঙুল
দেখিয়ে হোম জিজ্ঞাসা করলে, “সব হাঁস বিক্রি
হয়ে গেছে দেখছি।”
“কাল সকালে আসুন। পাঁচশো হাঁস চাইলেও দিতে
পারবো।”
“সে আমার কোনো কাজে লাগবে না।”
“তবে ওই যে দোকানটায় গ্যাস জ্বলছে, ওটায়
যান।”
“কিন্তু আমাকে যে তোমার দোকানের কথাই বলা
হয়েছে।”
“কে বলেছে?”
“আলফার মালিক।”
“ও, হ্যাঁ। আমি তাকে ডজন দুয়েক পাঠিয়েছিলাম।”
“হাঁসগুলো বেশ ছিল। তা ওগুলো পেয়েছিলে
কোত্থাকে?”
অবাক কাণ্ড। প্রশ্নটা শুনেই বিক্রেতা রাগে
ফেটে পড়ল। সে এবার ঘাড় ঘুরিয়ে কোমরে হাত
দিয়ে যুদ্ধং দেহি ভূমিকায় দাঁড়াল। বলল, “পথে
আসুন মশায়! কি চাইছেন বলুন দেখি! ঝেড়ে
কাশুন।”
“বাঁকা কথা তো কিছুই বলিনি। আমি শুধু জানতে
চেয়েছি যে হাঁসগুলো তুমি আলফায় বিক্রি
করেছিল, সেই হাঁসগুলো তুমি কার কাছ থেকে
কিনেছিলে?”
“অ! আর যদি না বলি, তাহলে কী করবে?”
“কিছুই না। মামুলি ব্যাপার। কিন্তু আমি আশ্চর্য
হচ্ছি, এই সামান্য কথায় তুমি এতটা উত্তেজিত হচ্ছ
কেন?”
“উত্তেজিত হব না! এমন কথা শুনলে কার মাথার
ঠিক থাকে? ভাল দামে ভাল মাল বেছবো, ব্যস,
লেনদেন খতম। ‘হাঁস কোথায়?’ ‘কার থেকে হাঁস
কিনেছো?’ ‘ওই হাঁসের কত দাম?’ হাঁস তো নয়, যেন
আর কিছু। সামান্য হাঁস নিয়ে কত কথা!”
হোমস গা-ছাড়া ভাব দেখিয়ে বলল, “কি করে
জানবো বলো যে, আরও পাঁচ জন ওই হাঁসের খোঁজ
করছে। তবে তুমি না বললে, বাজিটা হেরে যাবো।
হাঁস-মুরগির ব্যাপারে আমি নিজেকে একরকম
বিশেষজ্ঞই মনে করি। আর একজনের সঙ্গে বাজি
ধরেছি যে, যে হাঁসটা আজ খেলাম সেটা
পাড়াগেঁয়ে হাঁস।”
হাঁসওয়ালা খুব সংক্ষেপে রাগত গলা বলল, “অ!
তবে আপনি বাজি হেরেছেন। ওটা শহুরে হাঁস।”
“আমার দেখে তা মনে হল না।”
“আমি বলছি তাই।”
“মানি না।”
“ল্যাংটোবেলা থেকে হাঁস বেচছি, মশাই। আপনি
আমাকে হাঁস চেনাচ্ছেন? আমি বলছি, আলফায়
যে হাঁসগুলো বেচেছি, সেগুলো শহুরে হাঁস।”
“তুমি বললেই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?”
“তাহলে বাজি রাখুন।”
“মিছিমিছি অর্থব্যয় করবেন। আমি জানি আমি যা
বলছি তা ঠিক। এক সভারেন [§§] বাজি রইল; শুধু ওই
বাজে তক্কো করার জন্য আপনাকে শিক্ষে
দেওয়ার জন্যে।” তারপর ব্যঙ্গের হাসি হেসে
দোকানদার বলল, “বিল, বইগুলো আমাকে এনে দে
তো রে।”
ছোটো ছেলেটা একটা ছোটো মোটা বই আর
একটা বেশ বড়ো চকচকে মলাটের বই আনল। দুটো
বইই একসঙ্গে ঝুলন্ত বাতির নিচে রাখা হল।
হাঁসওয়ালা বলল, “এই যে হাঁসবিশেষজ্ঞ মশাই।
ভেবেছিলাম আমার সব হাঁস বিক্রি হয়ে গেছে।
কিন্তু না, এখনও একটা আছে। এই ছোটো খাতাটা
দেখুন।”
“দেখলাম। তাতে হলটা কী?”
“এটা হল আমি যাদের থেকে হাঁস কিনি তাদের
নামের তালিকা। দেখেছেন? আচ্ছা, এবার দেখুন,
এই পাতাটা পাড়াগেঁয়ে হাঁসের মালিকদের
তালিকা। নামের পাশে যে নম্বর দেখছেন
সেগুলো বড়ো লেজার বইয়ে তাদের অ্যাকাউন্ট
নম্বর। এবার দেখুন। অন্য পাতায় লাল কালিতে কী
লেখা আছে? এই হল আমার শহরের
সরবরাহকারীদের তালিকা। এবার, তিন নম্বর
নামটা পড়ুন। পড়ুন পড়ুন, আমাকে পড়ে শোনান।”হোমস পড়ল, “মিসেস ওকশট, ১১৭, ব্রিক্সটন রোড–
২৪৯।”
“হ্যাঁ, ঠিক। এবার লেজারের পাতায় যান।”
হোমস নির্দিষ্ট পাতাটি খুলল, “এই যে এখানে,
‘মিসেস ওকশট, ১১৭ ব্রিক্সটন রোড, ডিম ও
পোলট্রি সরবরাহকারী।”
“শেষ লাইনটায় কী লেখা আছে?”
“‘২২শে ডিসেম্বর। সাত শিলিং ছয় পেন্স দরে
২৪টি হাঁস।’”
“ঠিক। এবার, নিচে দেখুন। কী লেখা আছে?”
“‘আলফার মিস্টার উইন্ডিগেটের নিকট ১২ শিলিং
দরে বিক্রীত হইয়াছে।’”
“এবার কী বলবেন?”
শার্লক হোমস মুখখানি ব্যাজার করল। তারপর
পকেট থেকে এক সভারেন বের করে স্ল্যাবের
উপর ছুঁড়ে দিয়ে মহাবিরক্তির ভাব দেখিয়ে
পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। কয়েক ইয়ার্ড দূরে এসে একটা
ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে সে তার
স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মুখে কোনো শব্দ না করে
হেসে উঠল।
বলল, “এই রকম গোঁফ আর পকেট থেকে গোলাপি
খাতা উঁকি দিচ্ছে দেখলেই বুঝবে, একে বাজি
দিয়েই টোপ গেলাতে পারবে। ওকে একশো
পাউন্ড দিলেও এত কিছু বলত কিনা সন্দেহ। কিন্তু
দ্যাখো, একটা বাজির টোপ ফেলে কত সহজেই ওর
পেট থেকে সব বের করে নেওয়া গেল। যাই হোক,
ওয়াটসন, মনে হচ্ছে আমরা আমাদের অনুসন্ধানের
শেষ পর্বে এসে পৌঁছে গেছি। এখন ভাবতে হবে,
মিসেস ওকশটের কাছে আজ রাতেই যাওয়া উচিত
না কাল যাবো। নিঃসন্দেহে যা বুঝলাম, এই
ব্যাপারটা নিয়ে আমরা ছাড়াও আরও কেউ
উৎসাহিত। আমার উচিত…”
তার কথা চাপা দিয়ে হঠাৎ দূরে একটা উচ্চ
কোলাহল উঠল। যে দোকানটা থেকে এক্ষুনি
বেরিয়ে এলাম সেই দোকানটার থেকেই। পিছন
ফিরে দেখি একটা বেঁটেখাটো ইঁদুরমুখো লোক
ঝুলন্ত আলোর বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, আর ওই
হাঁসওয়ালা ব্রেকিনরিজ রাগতমুখে দোকানের
দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ঘুষি বাগিয়ে লোকটাকে কী
সব বলছে।
তার চিৎকার কানে আসছিল, “যথেষ্ট হয়েছে
তোমার আর তোমার হাঁস। চুলোর দোরে যাও গে।
ফের যদি ফালতু বকতে আসো তবে তোমার পিছনে
কুকুর লেলিয়ে দেবো। মিসেস ওকশটকে এখানে
নিয়ে এসো, যা বলার তাঁকেই বলব। তোমার কাছে
কেন জবাবদিহি করব হে? তোমার থেকে হাঁস
কিনেছিলাম নাকি?”
লোকটা কুঁই কুঁই করতে করতে বলল, “না, কিন্তু
ওগুলোর একটা যে আমার ছিল।”
“তাহলে মিসেস ওকশটকে জিজ্ঞাসা করো গে
যাও।”
“উনি আমাকে বললেন তোমাকে জিজ্ঞাসা
করতে।”
“তাহলে প্রুশিয়ার রাজাকে জিজ্ঞাসা করো গে
যাও। যত্তো সব! যথেষ্ট হয়েছে। এবার বেরোও
এখান থেকে।” এই বলে দোকানি রীতিমতো
ঘাড়ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে বের করে দিল।
লোকটাও অন্ধকারে মিশে গেল।
হোমস ফিসফিসিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে, আর
ব্রিক্সটন রোডে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওয়াটসন,
আমার সঙ্গে এসো। এই লোকটার পিছু নেওয়া
যাক।” বাজারের লোকজনের ভিড় ঠেকে হোমস
এগিয়ে গেল। খানিকক্ষণের মধ্যে লোকটাকে
ধরেও ফেলল। কাঁধে হাত রাখতেই লোকটা পিছন
ফিরে তাকালো। গ্যাসের আলোয় দেখলাম, ভয়ে
লোকটার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
সে কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কে
আপনারা? কী চান?”
হোমস মৃদুস্বরে বলল, “মাপ করবেন, কিন্তু আপনার
সঙ্গে ওই দোকানির বাক্যালাপ আমার কানে
এসেছে। মনে হচ্ছে, এই ব্যাপারে আপনাকে কিছু
সাহায্য করতে পারি।”
“আপনি? আপনি কে? এই ব্যাপারে আপনি কী
জানেন?”
“আমার নাম শার্লক হোমস। আমার কাজই হল
অন্যেরা যে খবর রাখে না, সেই খবরটি রাখা।”
“কিন্তু আপনি তো এই ব্যাপারে কিছুই জানেন
না।”
“আজ্ঞে না, আমি সবই জানি। ব্রিক্সটন রোডের
মিসেস ওকশট ব্রেকিনরিজ নামে এক দোকানিকে
কয়েকটা হাঁস বেচেছিলেন। সেই হাঁসগুলি
ব্রেকেনরিজ বেচে দেয় আলফার মিস্টার
উইন্ডিগেটের কাছে। উইন্ডিগেট তার ক্লাব সদস্য
মিস্টার হেনরি বেকারকে সেই হাঁস বিক্রি করে।
এই হাঁসটাকেই তো তুমি খুঁজছ?”লোকটা তার দুই হাত আর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো
বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “মশাই, আপনার মতো
একজনকেই তো খুঁজছিলাম। আপনি ভাবতেও
পারবেন না, এই ব্যাপারটার সঙ্গে আমার
জীবনমরণ সম্পর্ক জড়িয়ে আছে।”
একটা চার-চাকার গাড়ি যাচ্ছিল পাশ দিয়ে।
সেটাকে দাঁড় করিয়ে হোমস বলল, “তাহলে চলুন
কোথাও একটা গিয়ে আরামসে আলোচনা করা
যাক। এই বাজারে বড্ড চিৎকার চ্যাঁচামেচি।
কিন্তু সবার আগে–আপনার নামটা তো জানা হল
না।”
লোকটা খানিক ইতস্তত করে শেষে অন্য দিকে মুখ
করে বলল, “আমার নাম জন রবিনসন।”
হোমস মিষ্টি গলায় বলল, “না না, আপনার আসল
নামটা বলুন। বেনামিদের সঙ্গে কাজ করা বড়ো
অসুবিধাজনক।”
লোকটা সাদা গালদুটো লাল হয়ে এল। সে বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার আসল নাম হল জেমস
রাইডার।”
“ভাল! তার মানে আপনিই হোটেল কসমোপলিটনের
প্রধান পরিচারক। দয়া করে এই ক্যাবটিতে [***]
উঠুন। যা জানতে চাইছেন, তার সবই আমার কাছে
শুনবেন।”
লোকটা একবার আমার দিকে একবার হোমসের
দিকে আধা-ভয় আধা-আশা ভরা দৃষ্টি নিয়ে
তাকাল। সে বুঝতে পারছিল না যে, তার কপালে
লাভ না লোকসান লেখা আছে। দোনোমোনো
করতে করতেই সে ক্যাবে উঠল। আধঘণ্টায় আমরা
পৌঁছে গেলাম আমাদের বেকার স্ট্রিটের
বৈঠকখানায়। লোকটা গাড়িতে কিছুই বলল না।
তবে তার ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস আর হাত কচলানি
থেকে বুঝতে পারছিলাম যে, সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে
আছে।
ঘরে ঢুকে হোমস হাসিমুখে বলল, “হ্যাঁ, এসে গেছি
বাড়ি। বেশ সুন্দর আগুন জ্বলছে। মিস্টার রাইডার,
আপনি দেখি শীতে কাঁপছেন। আসুন, এই বেতের
চেয়ারটায় বসুন। আমি ঘরের জুতোটা পরে আসি।
তারপর আপনার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করব।
হ্যাঁ, এইবার! আপনি জানতে চাইছিলেন না, ওই
হাঁসগুলোর কী হয়েছে?”
“হ্যাঁ, মশায়।”
“অথবা, আমার যতদূর ধারণা, তার মধ্যে একটি হাঁস
সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। ওই যে হাঁসটার
লেজের দিকে কালো ডোরা দাগ আর বাকিটা
পুরো সাদা, সেইটা।”
রাইডার উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ, মশায়! বলতে
পারেন ওটা কোথায় গেছে?”
“ওটা এখানে এসেছিল।”
“এখানে?”
“হ্যাঁ, আশ্চর্য সেই হাঁস, বুঝলেন মশাই। সত্যিই
আপনি ওটার প্রতি আগ্রহ না দেখালেই অবাক
হতুম। সেই মরা হাঁস একটা ডিমও পেরেছিল। ছোট্ট
একটা উজ্জ্বল নীল রঙের ডিম। এমন ডিম কখনও
দেখিনি। সেটা আমি আমার মিউজিয়ামে রেখে
দিয়েছি।”
লোকটা পড়ে যাচ্ছিল। কোনো রকমে ডান হাত
দিয়ে ম্যান্টলপিসটা [†††] ধরে সামলে নিল।
হোমস তার স্ট্রংবক্সের ডালা খুলল। তারপর নীল
পদ্মরাগটা বের করে ধরল। জিনিসটা একটা তারার
মতো চকচক করছিল। একটা অদ্ভুত সুন্দর শীতল
বহুকোণী আলো ঠিকরে পড়ছিল ওটা থেকে।
রাইডার শুকনো মুখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
সে বুঝতে পারছিল না, ওটা দাবি করাটা ঠিক
হবে কিনা।
হোমস শান্তভাবে বলল, “তোমার খেলা শেষ,
রাইডার। না না, ধরে দাঁড়াও। নইলে পিছনের
আগুনে পড়ে যাবে। ওয়াটসন, ওকে চেয়ারটায়
বসিয়ে দাও। অপরাধ করতে যেরকম কলজের জোর
লাগে তা ওর নেই। আর এক গ্লাস ব্র্যান্ডি খাইয়ে
দাও। হ্যাঁ! এবার ওকে মানুষের মতো দেখাচ্ছে
বটে। একেবারে ইঁদুরের মতো হয়ে গিয়েছিল!”
সে খানিকক্ষণ টলতে লাগল। যেন পড়ে যাবে।
ব্র্যান্ডি খেয়ে গালের রংটা একটু ফিরল। তারপর
বসে হোমসের দিকে সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে
রইল।
“আমার কাছে প্রায় সব তথ্য আর প্রমাণই আছে।
তাই তোমাকে বেশি কিছু বলতে হবে না। শুধু
কয়েকটা কথা জানলেই আমার সব জানা পূর্ণ হবে।
রাইডার, তুমি কী এই নীল পাথরটার কথা কাউন্টেস
অফ মোরকারের কাছ থেকে শুনেছিলে?”
লোকটা কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, “ক্যাথরিন
কসাক আমাকে ওটার কথা বলে।”
“ও! মাননীয়া কাউন্টেসের খাস-পরিচারিকা। আর
শুনেই হঠাৎ-বড়োলোক হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে
গেলে। যাক, এমন লোভ অনেক ভাল মানুষও
সামলাতে পারে না, তুমি তো কোন ছার। তবে,
রাইডার, তুমিও ভালমানুষ নও। যাকে বলে একখানি
ছিঁচকে চোর। তুমি জানতে, হরনার নামে ওই কলের
মিস্ত্রিটার নামে আগেও একটা কেলেঙ্কারি
আছে। আই তার দিকেই সবার সন্দেহ টানতে কষ্ট
হবে না। তারপর কী করলে? তুমি আর তোমার এই
সহচরীটি মিলে কাউন্টেসের ঘরে গ্যাঁড়াকল করে
রাখলে যাতে লোকটাকে ডাকতে হয়। তারপর সে
চলে গেলে, তুমি গয়নার বাক্স থেকে গয়নাটা
সরালে। তারপর অ্যালার্ম বেল বাজালে আর ওই
বেচারাকে গ্রেফতার হতে হল। তারপর তুমি…”
হঠাৎ রাইডার চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে নেমে
গেল। তারপর হোমসের পা জড়িয়ে ধরল, কাঁদো
কাঁদো গলায় বলে উঠল, “ভগবানের দোহাই, দয়া
করুন! আমার বাবা-মার কথা ভাবুন। ওঁরা জানতে
পারলে একেবারে ভেঙে পড়বে। আমি আগে
কখনও এমন কাজ করিনি। কোনোদিন করব না।
প্রতিজ্ঞা করছি। বাইবেলের দিব্যি। দয়া করে
আমাকে আদালতে নিয়ে যাবেন না। খ্রিস্টের
দোহাই, নিয়ে যাবেন না।”হোমস কড়া ভাষায় বলল, “চেয়ারে গিয়ে বোসো।
খুব তো নাকে কাঁদছ এখন। ওই বেচারি নির্দোষ
করনারকে ফাঁসাবার আগে মনে ছিল না এসব
কথা!”
“আমি পালিয়ে যাবো, মিস্টার হোমস। এই দেশ
ছেড়েই পালিয়ে যাবো মশাই। তাহলে ওর বিরুদ্ধে
মামলাটা আর টিকবে না।”
“আচ্ছা! সেকথা পরে ভাবব। আগে বলো দেখি,
তারপর ঠিক কী কী করলে। পাথরটা হাঁসের পেটে
গেল কী করে? আর সেই হাঁসই বা খোলা বাজারে
এলো কী করে? যদি বাঁচতে চাও তো সব খুলে
বলো।”
রাইডার একবার জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁটদুটো
চেটে নিল। তারপর বলল, “যেমন যা ঘটেছে সবই
বলছি, মশাই। হরনার গ্রেফতার হওয়ার পর মনে হল,
পাথরটা নিজের কাছে রাখা আর নিরাপদ হবে
না। যে কোনো মুহুর্তে পুলিশ আমার ঘরে
খানাতল্লাশি করতে পারে। হোটেলেও এমন
কোনো নিরাপদ জায়গা নেই যেখানে ওটা রাখা
যেতে পারে। তাই আমার বোনের বাড়ি চলে
গেলাম। আমার বোন ওকশট নামে একজনকে বিয়ে
করে ব্রিক্সটন রোডে থাকে। সেখানেই সে
বাজারে বিক্রির জন্য হাঁস পালন করে। মনে
হচ্ছিল, সারা রাস্তায় পুলিশ আর গোয়েন্দারা
আমার পিছু নিয়েছে। ওই শীতের রাতেও ব্রিক্সটন
রোডে যেতে ঘেমেনেয়ে গেলাম। বোন
জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, আমাকে এত
ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন। আমি শুধু বললাম,
হোটেলে একটা দামি রত্ন চুরি গেছে। তাই মন
খারাপ। তারপর বাড়ির পিছনের উঠোনে গিয়ে কী
করা যায় ভাবতে লাগলাম।”
“মডসলি নামে আমার এক বন্ধু আছে। স্বভাব ভাল
না। পেন্টনভিলে জেল খেটে সদ্য ছাড়া
পেয়েছিল। তার সঙ্গে একদিন দেখা হল। সে
আমাকে চোরেদের কাজকারবারের কথা বলল।
চোরাই মাল কিভাবে কোথায় বেচা যায়, সেও
বলল। লোকটার কিছু গোপন কথা আমি জানি, তাই
জানতাম ও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে
না। ও থাকে কিলবার্নে। সেখানেও যাওয়া স্থির
করলাম। ওই ভাল দামে মাল বিক্রির ব্যবস্থা করে
দিত। কিন্তু নিরাপদে ওর কাছে যাবো কি করে?
অনেক কষ্টে হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম।
যেকোনো মুহুর্তে আমার দেহতল্লাশ করলেই তো
আমার ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে পাথরটা
বেরিয়ে পড়বে। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে
আছি। এমন সময় দেখলাম, আমার পায়ের কাছে
হাঁসগুলো ঘুরছে। হঠাৎ মাথায় একটা মতলব খেলে
গেল। ভাবলাম, এটাকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়ার
সেরা গোয়েন্দাকেও বোকা বানিয়ে ছাড়ব।
“কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বোন আমাকে
বলেছিল যে আমি বড়োদিনের উপহার হিসেবে
একখানা হাঁস নিতে পারি। আমার বোন কথার
খেলাপ করে না। ভাবলাম, এই মওকায় একখানা
হাঁস বেছে নিই, সেটাই আমার সঙ্গে কিলবার্নে
পাথরটা বয়ে নিয়ে যাবে। উঠোনে একটা ছোটো
ছাউনি মতন ছিল। আমি তার পিছনে একখানা
হাঁসকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম। বেশ বড়োসড়ো
একটা হাঁস। সাদা। কালো দাগওয়ালা লেজ।
ধরলাম হাঁসটাকে। ওটার মুখ হাঁ করে যতখানি আঙুল
যায় ঢুকিয়ে পাথরটা পুরে দিলাম। হাঁসটা পাথরটা
গিলে নিল। কিন্তু হাঁসটা খুব ডানা ঝাপটাতে
লাগল। আমার বোন ব্যাপারটা কি দেখার জন্য
বেরিয়ে এল। আমি যখন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য
পিছন ফিরেছি ওমনি হাঁসটা আমার হাত ছাড়িয়ে
দৌড়ে দলের সঙ্গে মিশে গেল।
“আমার বোন জিজ্ঞেস করল, ‘হাঁসটা নিয়ে কী
করছিস্, দাদা?’
“আমি বললাম, ‘কিছু না। তুই বলেছিলি বড়োদিনে
আমাকে একখানা হাঁস দিবি। আমি দেখছিলাম,
কোনটা সবচেয়ে মোটা।’
“বোন বলল, ‘ও, ওই যে তোর জন্য আলাদা করে
রেখেছি। আমরা ওটাকে বলি ‘দাদার হাঁস’। ওই যে
বড়ো সাদা হাঁসটা। মোট ছাব্বিশটা আছে। একটা
তোর, একটা আমাদের, বাকি দু-ডজন বাজারে
যাবে।’
“আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ, ম্যাগি। তবে তোর কাছে
সবগুলোই একরকম হয় তো আমি যেটা ধরেছিলাম,
সেটাই নিই।’
“বোন বলল, ‘কিন্তু অন্যটার ওজন অন্তত তিন পাউন্ড
বেশি। তোর জন্যই ওটাকে খাইয়ে দাইয়ে মোটা
করেছি।’
“আমি বললাম, ‘আমার ওটাই বেশি পছন্দ। ওটাই
নেবো। এখনই নিয়ে যাই?’
“আমার বোন একটু অসন্তুষ্ট হল। কিন্তু মুখে বলল,
“আচ্ছা, তুই যা ভাল বুঝিস্! কোনটা নিবি?
“‘ওই যে কালো ডোরা লেজওয়ালা সাদা হাঁসটা।
পালের মধ্যে ঘুরছে।’
“‘ঠিক আছে, মেরে নিয়ে যা।’
“তারপর, মিস্টার হোমস, আমার বোন যেমনটা বলল,
তেমনটাই করলাম। একটা হাঁস নিয়ে গেলাম
কিলবার্নে। আমার বন্ধুকে আমার ফন্দির কথা
বললাম। ওই লোকটাকেই একমাত্র সব কথা খুলে
বলা যেত। আমরা খুব হাসলাম। তারপর একটা ছুরি
নিয়ে হাঁসটা কাটলাম। কিন্তু পাথরটা সেখানে
ছিল না। আমার তো মাথায় বজ্রাঘাত। নিশ্চয়
কোনো ভুল হয়েছে। হাঁসটা ফেলে বোনের বাড়ি
ছুটে এলাম। পিছনের উঠোনে গেলাম। কিন্তু
সেখানে একটা হাঁসও ছিল না।
“বোনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হাঁসগুলো কোথায়
গেল, ম্যাগি?’
“‘দোকানে গেছে, দাদা।’
“‘কোন দোকানে?’
“‘কভেন্ট গার্ডেনের ব্রেকিনরিজের দোকানে।’
“আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা আমি যে
হাঁসটা নিয়েছি, ওই রকম দেখতে আরও একটা হাঁস
আছে কী?’
“‘হ্যাঁ, দাদা। ওই রকম লেজওয়ালা দুটো হাঁস আছে।
একই রকম দেখতে। আমি দুটোকে আলাদা করে
চিনতে পারতাম না।’
“তখনই ব্যাপারটা জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল।
দৌড়ে গেলাম ওই ব্রেকিনরিজ লোকটার কাছে।
কিন্তু ততক্ষণে সে সব হাঁস বেচে দিয়েছে।
আমাকে বললও না, কার কাছে বেচেছে।
আপনারা তার কথাই শুনেছেন আজ রাতে। সবসময়
ওইরকমভাবেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে ও। আমার
বোন ভাবছে, আমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছি।
আমার নিজেরই মনে হচ্ছে, আমি পাগল হয়ে
গেছি। আর এখন… এখন আমি দাগি চোর! যেটা চুরি
করে চোর হলাম, সেটাই হারালাম। ভগবান
আমাকে রক্ষা করুন! ভগবান আমাকে রক্ষা করুন।’
লোকটা দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।
অনেকক্ষণ কারো মুখে কোনো কথা ফুটল না। শুধু
দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। আর টেবিলের কানায় হোমসের
আঙুল চালানোর টিপ টিপ শব্দ। তারপর হোমস উঠে
দরজাটা খুলল।
বলল, “বেরিয়ে যাও!”
“অ্যাঁ, মশায়? ও! ঈশ্বর আপনার ভাল করুন!”
“একটাও কথা নয়। বেরিয়ে যাও!”
কোনো কথার দরকারও পড়ল না। লোকটা ছুটে
বেরিয়ে গেল। দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে
দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
তারপর শুনলাম রাস্তা দিয়ে তার ছুটে পালানোর
পায়ের শব্দ।
পাইপটা টেনে নিয়ে হোমস বলল, “কথা হল,
ওয়াটসন, পুলিশ আমাকে তাদের খামতি ধরিয়ে
দেওয়ার জন্য রাখেনি। হরনারের বিপদ থাকলে সে
ব্যাপার আলাদা। তবে এই লোকটা তার বিরুদ্ধে
সাক্ষ্য দেবে না। মামলাটাও আর টিকবে না।
আমি যেটা করলাম, সেটা বেআইনি। কিন্তু এতে
একটা লোককে বাঁচানো গেল। লোকটা আর
চুরিচামারি করবে না। সাংঘাতিক ভয় পেয়েছে।
এই লোকটাকে জেলে পাঠালে এ শেষটায় দাগি
অপরাধীতে পরিণত হত। তাছাড়া এই উৎসব ক্ষমার
উৎসব। কাকতালীয়ভাবে আমাদের দরজায় একটা
রহস্য এসে পড়েছিল। সেটার সমাধান করতে
পারাটাই আমার পুরস্কার। খাবার ঘণ্টাটা বাজাও,
ডাক্তার, এবার অন্য একটা রহস্যের সমাধান করি।
অবশ্য সেটাও এক পক্ষীরহস্য।”
–
রচনা-পরিচিতি
অনূদিত নাম: নীল পদ্মরাগ
মূল নাম: ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লু
কারবাঙ্কল’
মূল রচনা: স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
অনুবাদ: অর্ণব দত্ত
অলংকরণ: সিডনি পেজেট
‘দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লু কারবাঙ্কল’
ব্রিটিশ লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের
শার্লক হোমস গল্প-সংকলন দি অ্যাডভেঞ্চার অফ
শার্লক হোমস-এর বারোটি গল্পের মধ্যে সপ্তম
গল্প। এটি ১৮৯২ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রথম
প্রকাশিত হয় স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন-এ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now
X
সকালে নাস্তার পর শিলা সুসান তার হল ফ্ল্যাটের ষ্ট্যাডি রুমের ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে আহমদ মুসার ব্যাপারটা নিয়ে আকাশ-পাতল চিন্তা করছিল। আমেরিকান হোয়াইট ঈগল-এর হেড কোয়ার্টার কোথায়? হোয়াইট ঈগল-এর প্রধঅন গোল্ড ওয়াটারের সাথে তার পরিচয় আছে। কিন্তু বিনা কারণে তার কাছে যাওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি তার কাছ থেকে হেড কোয়ার্টারের অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানাও অসম্ভব। তাহলে কি করবে সে? কোন পথে এগুবে?
এ সময় কলিংবেল বেজে উঠল।
ভাবনায় ছেদ পড়ল।
উঠে দাঁড়াল সুসান। হোষ্টেস মার্কেটিং-এ গেছে। তাকেই খুলে দিতে হবে দরজা।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আবাসিক হল এলাকার বিশেষ হল-ফ্ল্যাট এগুলো। এ হল-ফ্ল্যাটগুলোর প্রত্যেকটিতে একটি বেড রুম, একটি ষ্ট্যাডি, একটি ড্রইং, একটি কিচেন ও টয়লেট রয়েছে। এ ফ্ল্যাটগুলো সাধারণ হল-কক্ষের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল। উচ্চবিত্তরা যাদের উড়াবার মত টাকা রয়েছে তাদের ছেলেমেয়েরা এসব ফ্ল্যাট নেয়।
শিলা সুসানের ফ্ল্যাটটিও এ ধরনেরই একটা ফ্ল্যাট। রান্না-বান্না ও ঘর-দোরের তত্ত্বাবধানের জন্যে একজন হোষ্টেস রয়েছে। মেয়েটিকে সানসালভাদর থেকে আনা হয়েছে।
দরজা খুলে দিতেই সহপাঠিনী জিনা ক্রিষ্টোফার ঘরে প্রবেশ করে জড়িয়ে ধরলো সুসানকে। বলল, ‘কোন খোঁজ নেই, এত বড় ছুটিটা বাড়িতে কাটিয়ে এলি?’
‘কেন, তুই কবে এসেছিস? আমি কাল এসেছি।’
‘ছুটির অর্ধেকটা থাকতেই চলে এসেছি।’
‘বিশ্ববিদ্যালয়টা আমার দেশে হলে আমিও নিশ্চয় তাই করতাম।’
‘এ কথা ঠিক। কিন্তু আবার এটাও ঠিক যে, বাইরের অনেকে ছুটিতে দেশেই যায়নি।’
‘ঠিক আছে। বল এবার এদিকের কথা। কেমন ছিলি?’
‘ভাল। বেশ আনন্দেই কেটেছে সময়। কিন্তু শেষ রক্ষা বোধ হয় হলো না।’
‘কেমন?’
‘তুমি জান, বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে একটা নাটক অনুষ্ঠানের কথা ছিল। সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরাই যেহেতু নাটক করবে, তাই ছাত্র-ছাত্রীদের কারও লেখা নাটক বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বেছে নেয়া হয়েছে মাষ্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী মেরী রোজ আলেকজান্ডারের নাটক ‘দি নেশন’কে। রিহার্সেলের আয়োজন সব শেষ। শেষ মুহূর্তে গন্ডগোল বাধিয়েছে মেরী রোজ।’
‘মেরী রোজ গন্ডগোল বাধিয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কি গন্ডগোল?’
‘তার অনুমতি নেয়া হয়নি, তাই আপত্তি তুলেছে তার লেখা নাটকের অভিনয়ে।’
‘যেখানে খুশী হবার কথা সেখানে আপত্তি? কিন্তু মেরী রোজ তো এমন নয়। তার কাছ থেকে কোন অবিবেচক কথা আসতে পারে না।’
‘আসল ব্যাপার হলো, নাটকে রেডইন্ডিয়ান ছাত্রের একটা চরিত্র রয়েছে। তাকে এ্যান্টি নেশন, এ্যান্টি সিভিলাইজেশন এবং সংকীর্ণ দৃষ্টি কম্যুনাল হিসেবে দেখানো হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, মেরী রোজ এই চরিত্রকে আর এভাবে দেখতে চায় না। কিন্তু এ কথা সে সরাসরি বলছেও না।’
জিনা ক্রিষ্টোফারের এ কথা শোনার সাথে সাথে শিলা সুসানের চোখের সামনে একটা মুখ ভেসে উঠল। মুখটি রেড ইন্ডিয়ান ছাত্র ‘ঈগল সান ওয়াকার’-এর। আকস্মিকভাবেই হৃদয়ের কোথঅও যেন একটা আঘাত লাগল সুসানের। একটা ব্যথা যেন চিন চিন করে উঠল মন জুড়ে। সুসানের মত মেরী রোজও সান ওয়াকারকে নিয়ে ভাবছে না তো? পরক্ষণেই আবার ভাবল, ঈগল সান ওয়াকার ও মেরী রোজ আলেকজান্ডার দু’জনেই অসাধারণ ছাত্র। কিন্তু শুরু থেকেই তো মেরী রোজ সান ওয়াকারকে কিছুটা বৈরী দৃষ্টিতে দেখে আসছে! এসব চিন্তাকে চাপা দিয়ে শিলা সুসান বলল, ‘যে কথা মেরী রোজ নিজে বলছে না, সেটা তুই বলছিস কি করে?’
‘সবাই বলছে।’
‘কিন্তু কারণ কি?’
‘কিছু একটা ঘটেছে। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে জর্জ ওয়াশিংটন দিবসের নাচ অনুষ্ঠানে সান ওয়াকারকে ঢুকতে দেয়া না হলে মেরী রোজ আলেকজান্ডার বেরিয়ে যায়।’
চমকে উঠল শিলা সুসান। তার মুখ মলিন হয়ে গেল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘এর দ্বারা কি বলতে চাচ্ছিস?’
‘সবাই বলছে সান ওয়াকারের সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণেই মেরী রোজ তার নিজের লেখা নাটক সম্পর্কেও আজ ভিন্ন মত পোষণ করছে।’
সঙ্গে সঙ্গে কথা বলতে পারলো না শিলা সুসান। হৃদয়কে মুচড়ে দেয়ার মত ব্যথা অনুভব করল সে। সান ওয়াকার এবং মেরী রোজ দু’জনেই শিলা সুসানের ক্লাসমেট। মেয়ে বান্ধবীদের মধ্যে মেরী রোজ শিলা সুসানের সবেেচয় ঘনিষ্ঠ। আর ছেলেদের মধ্যে সান ওয়াকারকে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ চোখে দেখে সুসান। সান ওয়াকারকে ভাল লাগে তার। বর্ণ বৈষম্যকে কোন সময় আমল দেয় না বলেই শিলা সুসান সান ওয়াকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছে। মনের অজান্তেই স্বপ্ন দেখেছে তাকে নিয়ে। কিন্তু সান ওয়াকার কি ভাবে, আদৌ ভাবে কিনা তা জানতে চেষ্টা করেনি সুসান কখনই। মেরী রোজ তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পরেও মেরী রোজ ও সান ওয়াকারের ঘনিষ্ঠতা বিষয়ক কিছুই তো সে দেখেনি! আজ আকস্মিক এ সংবাদে শিলা সুসান সত্যিই কষ্টবোধ করছে। তবু তাদের সম্পর্কের বিষয়টা অস্বীকার করার জন্যেই বলল, ‘মেরী রোজ-এর বিরুদ্ধে এই অভিযোগের মূলে ঐটুকু একটা ঘটনা ছাড়া আসলেই কোন সত্য আছে?’
‘মেরী রোজ খুব চাপা মেয়ে। তার ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে জানা খুব মুষ্কিল। তবু দু’একটা এমন ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়েছে, তা ঐ অভিযোগ প্রমাণের জন্যে যথেষ্ট। মনে আছে তোর, গত পিকনিকে একটা নাশতার প্যাকেট কম পড়েছিল। সান ওয়াকার সবশেষে ছিল বলে সে নাশতা পায়নি। কেউ কিছু বলার আগে সান ওয়াকার হেসে বলেছিল, তার ক্ষুধা নেই, তাছাড়া এ সময় রেডইন্ডিয়ানরা নাশ্তা খায় না। পরে দেখা গেছে মেরী রোজ নাশ্তা খায়নি এই প্রতিবাদে যে, রেডইন্ডিয়ান বলে তাকে অপমান করার জন্যেই ইচ্ছা করে তার নাশতা কম ফেলানো হয়েছে।’
চমকে উঠলো শিলা সুসান। এ ঘটনা সেও জানে। কিন্তু এ ঘটনাকে তখন তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ হিসেবেই দেখেছিল। কিন্তু আজ জিনা ক্রিষ্টোফার ঘটনাটাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করায় একেই সত্য বলে তার মনে হচ্ছে। মন আরও দূর্বল হয়ে পড়ল শিলা সুসানের। তবু বলল, ‘কিন্তু জিনা সান ওয়াকারকে অপমান ও ছোট করার জন্যে মেরী রোজ যা করেছে, সেটা দেখছিস না?’
‘সেটা অতীতের কথা সুসান। দুই প্রতিভার মধ্যে দ্বন্দ থাকে। মনে হয় মেরী রোজ প্রথম দিকে সান ওয়াকারকে প্রতিদ্বন্দ¦ী হিসেবেই ছোট করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবাই যখন রেড ইন্ডিয়ান হওয়ার কারণে সান ওয়াকারকে নানাভাবে অপমান ও ছোট করতে লাগল, তখন থেকেই মেরী রোজ সান ওয়াকারের পক্ষ নিতে শুরু করেছে।’
জিনা ক্রিষ্টোফারের কথার জবাবে শিলা সুসান কোন যুক্তি দাঁড় করাবার আর শক্তি পেল না। কোন কিছু হারাবার মত এক ধরনের বেদনা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
জিনা ক্রিষ্টোফারই আবার বলল, ‘যাই বল সুসান, মেরী রোজ ভুল করছে। সবাই একমত, নাটক মঞ্চস্থ হবেই। মেরী রোজ জেদ করলে তার ক্ষতি হবে, বেশি ক্ষতি হবে সান ওয়াকারের। এমনিতেই সান ওয়াকারের শত্রু সৃষ্টি হয়েছে প্রচুর। রেডইন্ডিয়ানদের মধ্যে এত বড় বিজ্ঞান প্রতিভা জন্মাক অনেকেই তা চাচ্ছে না। তার উপর যদি মেরী রোজও সান ওয়াকারের সম্পর্কের কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে, তাহলে সান ওয়াকারের বিরুদ্ধে তাদের ক্রোধ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।’
মনে মনে কেঁপে উঠল শিলা সুসান। জিনার কথার প্রতিটি অক্ষর যে সত্য, সুসানের চেয়ে বেশি তা আর কে জানে? বলল সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে, ‘মেরী রোজ কি সত্যিই ঐ রকম জেদ করছে?’
‘করছে মানে? মেরী রোজ এমনকি একথা পর্যন্ত বলেছে, যদি নাটকের রিহার্সেল বন্ধ না হয়, যদি তার নাটক মঞ্চস্থই করতে চায়, তাহলে সে আদালতের আশ্রয় নেবে।’
‘ঠিকই তো আদালতের আশ্রয় সে নিতে পারে। কি করার থাকবে তখন?’
‘কিন্তু তার আগেই অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে। ছাত্ররা একা নয় সুসান, ছাত্রদের বুদ্ধি দেবার লোক জুটেছে প্রচুর।’
‘কেমন?’
‘আমিও সব জানি না সুসান। কিন্তু চারদিক দেখে-শুনে আন্দাজ করি, ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে।’
একদিকে মনটা সুসানের খারাপ হয়ে গেছে। তার উপর জিনার দেয়া এই ভয়ংকর খবরে উদ্বেগ-আতংকে মনটা পূর্ণ হয়ে উঠল। কোন উত্তর সে দিল না।
জিনাই বলল, ‘সুসান, মেরী রোজ তোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তুই একটু চেষ্টা করে দেখ তাকে বিপজ্জনক পথ থেকে ফিরাতে পারিস কিনা। এটা শুধু আমার কথা নয়, ওরা সবাই আমাকে তোর কাছে পাঠিয়েছে শেষ চেষ্টা করার জন্যে।’
‘স্যাররা তো বলতে পারেন মেরী রোজকে।’
‘বিজ্ঞান বিভাগের ডীন ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছিল। তারা বলেছেন, ‘ছাত্রদের ব্যাপার ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখ। আমাদেরকে কোন পক্ষ হতে বলো না।’
‘একটু ভাবল শিলা সুসান। কি বলবে সে মেরী রোজকে? মেরী রোজ যা ভাবছে, সেটা সুসানেরও ভাবনা। তবে একটা যুক্তি আছে, বিপদ থেকে বাঁচাতে হবে মেরী রোজ ও সান ওয়াকার দু’জনকেই।
সান ওয়াকারের কথা মনে হতেই মনটা তার বেদনায় টন টন করে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবল, সান ওয়াকারকে সে জয় করতে পারেনি। মেরী রোজ যদি তাকে জয় করে থাকে, তাহলে তাদের পথে তার দাঁড়ানো ঠিক নয়।
মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল সুসানের। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
জিনা চমকে উঠল। বলল, ‘তোর কি হলো সুসান?’
সুসান নিজেকে সামলে নিল।
মুখে হাসি টানার চেষ্টা করে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি তাকে বলে দেখব। কিন্তু এ বর্ণবাদ আমারও ভাল লাগে না জিনা।’
‘বর্ণবাদ কোথায় পেলি? এটা সত্য ও স্বচ্ছতার ব্যাপার। কোন বিশেষ সম্পর্ক সত্য প্রকাশে বাধা দেবে, তা হওয়া ঠিক নয়।’
‘সত্য বলছিস কাকে জিনা?’
‘যা মেরী রোজ নিজে লিখেছে।’
‘কেউ কিছু লিখলেই তা সত্য হয়ে যায় না। মেরী রোজ এখন বলতে পারে সে এক সময় যা লিখেছিল, তা সত্য নয়।’
জিনা হাসল। বলল, ‘একজন রেডইন্ডিয়ানের সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক হবার পর তার এ বক্তব্য এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়।’
‘সম্পর্কটাকে অবৈধ বলছিস কেন?’
‘আমি বলছি না সবাই বলছে। অবৈধ বলা হচ্ছে কারণ রেডইন্ডিয়ানের ঘরে শ্বেতাংগ তরুণী যাবে তা আজকের সমাজ স্বীকার করবে না।’
‘কেন বিয়ে, প্রেম এসব তো পার্সোন রাইট-এর ব্যাপার।’
‘কোন পার্সোনাল সিদ্ধান্ত সমাজ স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে সে পার্সোনাল রাইট সমাজ মানতে পারে না।’
‘তোর এ কথা কিন্তু মার্কিন আইনের কথা নয়।’
‘আইন বড়, কিন্তু সমাজ তার চেয়ে ছোট নয়। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে।’
‘বর্তমান পরিস্থিতি কি?’
‘আজ পশ্চিমী স্বার্থ, শ্বেতাংগ স্বার্থ এবং দেশের স্বার্থ এক।’
‘একেই তো বর্ণবাদ বলেছিলাম জিনা।’
‘বলতে পারিস। কিন্তু আসলে এটা জাতি প্রেম।’
হাসল শিলা সুসান। বলল, ‘তুই বর্ণবাদী সংস্থা ‘হোয়াইট ঈগল’ এর মত কথা বলছিস।’
চমকে উঠল জিনা। বলল, ‘হোয়াইট ঈগল‘কে তুই জিনিস?’
শিলা সুসান বিষয়টাকে চেপে গিয়ে বলল, ‘শুনেছি কিছু কিছু। তুই জানিস নাকি?’
‘তোর ধারণা কি এদের সম্পর্কে?’
‘যতটুকু শুনেছি তাতে ভাল ধারণা হয়নি। বর্ণবাদী সংগঠন ওটা।’
‘ভাল বলার দরকার নেই। কিন্তু এভাবে খারাপ বলিস না। ঝামেলা বাড়িয়ে কি লাভ?’
‘ঝামেলা বাড়বে কেন?’
‘পড়া শুনার বাইরে তো কোন খবর রাখিস না। ভেতরে ভেতরে সমাজটা পাল্টে যাচ্ছে। হোয়াইট ঈগল আজ এক পরিবর্তনের প্রতীক। তাকে ভাল বলতে না পারিস, খারাপ বলার প্রয়োজন নেই।’
‘খারাপ হলে খারাপ বলবো না কেন?’
‘সান ওয়াকার ও মেরী রোজ যে বিপদে পড়েছে, সে ধরনের কোন বিপদ আনিস না। কথা কম বলা ভাল।’
‘ওদের বিপদের সাথে কি হোয়াইট ঈগল জড়িত আছে?’
‘আজ আর কোন কথা নয়।’ বলে জিনা ক্রিষ্টোফার উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘তুই এদিকটা একটু দেখ।’
বেরিয়ে গেল জিনা ক্রিষ্টোফার।
জিনা জবাব না দিলেও শিলা সুসান বুঝল, সান ওয়াকার ও মেরী রোজকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির সাথে হোয়াইট ঈগল জড়িত আছে। জিনা ক্রিষ্টোফারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ষ্টুডেন্ট বডিটা কি হোয়াইট ঈগল এর প্রভাবাধীনে চলে গেছে?
এই অবগতির বিষয়টা শিলা সুসানকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। সেই সাথে আনন্দিত হলো এই ভেবে যে, জিনারা যদি হোয়াইট ঈগলের সাথে জড়িত থাকে, তাহলে হোয়াইট ঈগল এর হেডকোয়ার্টারের সন্ধান তার জন্যে সহজ হবে।
কলিংবেল বেজে উঠল আবার। উঠে দরজা খুলে দিল শিলা সুসান। বাজার নিয়ে প্রবেশ করল পরিচারিকা।
শিলা সুসান মেরী রোজ-এর কলিংবেল চাপ দিতে গিয়ে লক্ষ্য করল, দরজা খোলা, ঈষৎ ফাঁক হয়ে আছে।
অবাক হলো শিলা সুসান। ধীরে ধীরে দরজা খুলল সে। প্রবেশ করল যে ঘরে সেটা সুসানের ফ্ল্যাটের মতই ড্রইং রুম।
মেরী রোজ এর এ ফ্ল্যাটটি শিলা সুসানের ফ্ল্যাট যে বিল্ডিং-এ, তার পাশের বিল্ডিং-এ। সব ফ্ল্যাট একই সাইজের, একই ডিজাইনের।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ধনীর দুলালী যে কয়জন রয়েছে, মেরী রোজ রয়েছে তাদের শীর্ষে। মেরী রোজ মার্কিন ফেডারেল কোর্টের চীফ জাষ্টিস জর্জ ওয়ারেন আলেকজান্ডারের একমাত্র মেয়ে। শিলা সুসান ও সান ওয়াকারের মতই পদার্থ বিজ্ঞানের মাষ্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী মেরী রোজ।
সুসান ড্রইং রুম-এর বাইরের দরজা লক করে সামনে এগুলো।
ড্রইং ও ষ্টাডি রুমের মাঝে কাঁচের স্থানান্তর যোগ্য দেয়াল। দেয়ালটি পর্দায় ঢাকা।
দেয়ালের কিছু অংশ সরানো। পর্দাও টেনে উন্মুক্ত করা।
শিলা সুসান বুঝল, কেউ একজন বাইরে থেকে মেরী রোজ এর কাছে এসেছে।
আস্তে আস্তে এগিয়ে ভেতরে উঁকি দিল সুসান। দেখে চমকে উঠল সে।
ভেতরে মুখ নিচু করে একাই বসে আছে ঈগল সান ওয়াকার।
সান ওয়াকার এখানে?
কোনদিন তো সে মেরী রোজ-এর ফ্ল্যাটে আসেনি।
কোন মেয়ের ফ্ল্যাট কেন বন্ধু-বান্ধবদের কক্ষেও সে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, লাইব্রেরী, ল্যাবরেটরী, তার নিজের হল কক্ষ এবং রাস্তা এই হলো তার ঠিকানা।
সান ওয়াকারের মুখ শুকনো দেখল শিলা সুসান।
শিলা সুসানের চোখে সান ওয়াকার অপরূপ চেহারার একটি ছেলে। রেডইন্ডিয়ান, তুর্কি ও চীনা এই তিন অবয়বকে একত্রিত করলে সবটার ভালো নিয়ে চতুর্থ যে চেহারা দাঁড়ায় সে হলো সান ওয়াকার। কালো চুল, নীল চোখ, সোনালী রং এবং তার সাথে শিল্পীর আঁকা নিখুঁত এক মুখাবয়ব।
চেহারার মতই উজ্জ্বল শিক্ষা জীবন তার। ইউরোপীয় বিজ্ঞান পুরষ্কার, আমেরিকান কন্টিনেন্টাল বিজ্ঞান পুরষ্কার এবং ষ্টুডেন্ট নোবল প্রাইজ পাওয়ার পর সে পৃথিবীর শীর্ষ উদীয়মান বিজ্ঞান প্রতিভায় পরিণত হয়েছে। অবশ্য এই কৃতিত্ব তার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ণবাদীদের ক্রোধ গিয়ে তার উপর আছড়ে পড়েছে। মেরী রোজ এর নাটক এবং মেরী রোজ এর সাথে তার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তাদের সেই ক্রোধ বিস্ফোরনোন্মুখ অবস্থা এসে পৌঁছেছে।
এই সময়ে সান ওয়াকার মেরী রোজ এর ফ্ল্যাটে!
মেরী রোজ মাথায় চিরুণি করতে করতে তার ষ্ট্যাডি রুমে এসে প্রবেশ করল।
গোসল করে এল মেরী রোজ।
একদম ফ্রেশ।
যেন একটা ফুল এই মাত্র পাপড়ীর বাধনে পেরিয়ে নিজেকে মেলে ধরল।
পরনে তার গোলাপী স্কার্টের সাথে সাদা শার্ট।
শিলা সুসান নিজে সুন্দরী, কিন্তু মেরী রোজকে কাছে পেলেই জড়িয়ে ধরে সে বলে ছেলে হলে অবশ্যই তোর প্রেমে পড়তাম। চোখ ফেরানো যায় না এমন একটি সাদা গোলাপ মেরী রোজ।
মেরী রোজ এর একাডেমিক কৃতিত্বও তার মতই অপরূপ। এ পর্যন্ত সকল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে এসেছে। অনার্সেও সে প্রথম হয়েছে।
মেরী রোজ ষ্ট্যাডি রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘স্যরি সান। তোমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। স্যরি।’
মেরী রোজকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছে সান ওয়াকার।
‘ধন্যবাদ রোজ। অসময়ে বিনা নোটিশে এসে তোমাকে বিপদে ফেলেছি। স্যরি।’ বলল সান ওয়াকার।
সান ওয়াকারের পাশে বসতে বসতে মেরী রোজ বলল, ‘কোন ‘স্যরি’ নয়। তোমাকে ওয়েলকাম সান। তুমি যে আমার ফ্ল্যাটটা চিনতে পেরেছ এ জন্যে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছি।’
‘ঠিক, ধন্যবাদ ঈশ্বরেরই প্রাপ্য। তিনিই তোমার বাসা চেনার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন।’
‘কি পরিস্থিতি তিনি সৃষ্টি করেছেন?’ গম্ভীর হয়ে উঠেছে মেরী রোজের মুখ।
গম্ভীর হয়ে উঠেছে সান ওয়াকারের মুখও। সঙ্গে সঙ্গে সে উত্তর দিল না মেরী রোজ এর প্রশ্নের।
একটু সময় নিয়ে বলল, ‘সেটা রোজ আমার চেয়ে তুমিই ভাল জান।’
সান ওয়াকারের মুখে নিবদ্ধ ছিল মেরী রোজ এর চোখ।
সান ওয়াকারের কথার পর মুখ নিচু করল রোজ। মুখ নিচু রেখেই সে বলল, ‘আমার নাটক ‘The Nation’-এর মঞ্চায়ন নিয়ে যা ঘটছে, তার কথাই তুমি বলছ?’
‘হ্যাঁ।’
একটু হাসল মেরী রোজ। বলল, ‘কিন্তু এ ব্যাপারটা তোমার পর্যন্ত গেল কি করে? এটা নিয়ে কি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে?’ মেরী রোজের কণ্ঠে উদ্বেগ প্রকাশ পেল। তার চোখে-মুখে চিন্তার একটা ছায়া।
সান ওয়াকার মেরী রোজ এর মুখ থেকে তার চোখ সরিয়ে নিল। সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘ক’দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় ষ্টুডেন্টস ইউনিয়নের কালচারাল সেক্রেটারী উইলিয়াম আমার কক্ষে গিয়েছিল। বলেছিল, আমার কারণেই নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিকী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নাট্যানুষ্ঠানে বাধা পড়েছে। তোমার ‘The Nation’ নাটকে রেড ইন্ডিয়ানদের ছোট করে দেখানো হয়েছে। এই কারণেই নাটকটির মঞ্চায়ন যাতে হতে না পারে সে জন্যে আমি তোমাকে প্রভাবিত করেছি। যখন আমি বলি, বিষয়টি নিয়ে কোনদিন তোমার সাথে আমার কোন আলোচনাই হয়নি, তখন সে বলে অত কিছু বুঝি না, তোমার কারণেই আমরা একটা সংকটে পড়েছি। তারপর বলে যে, আমি যেন তোমাকে বলি নাটক মঞ্চায়নে বাধা না দেয়ার জন্যে। বলে সে চলে যায়। গতকাল আমার কক্ষে গিয়ে হাজির বিশ্ববিদ্যালয় ষ্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি ম্যাক আর্থার। গিয়ে সোজাসুজি আমাকে বলে, সান ওয়াকার তুমি এ বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দাও। তুমি ভাল ছাত্র। দুনিয়ার যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমি ভর্তি হতে পারবে।’ আমি কিছু বলতে চাইলে সে বাধা দিয়ে বলে, আমি বলতে এসেছি, শুনতে আসিনি। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিকী অনুষ্ঠানের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ছ।’ বলে সে চলে যায়।’ থামল সান ওয়াকার।
সান ওয়াকারের দিকে তাকিয়ে এক মনে কথাগুলো শুনছে মেরী রোজ। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। চোখে-মুখে ভীষণ ক্রোধ ও অপমানিত হওয়ার চিহ্ন।
সান ওয়াকার থামার সঙ্গে সঙ্গে সে বলল, ‘ষ্টুডেন্টস ইউনিয়নের এই দু’চার নেতা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক? বিশ্ববিদ্যালয়কে তুমি কিছু জানাওনি?’
‘না রোজ।’
‘কেন?’
‘ঘটনা আর আমি বাড়াতে চাই না।’
‘ওদের ভয় পেয়েছ?’
‘তুমি কি তাই মনে কর?’
‘মনে করি না বলেই প্রশ্ন করছি।’
‘ভয় নয় রোজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই একদিকে দাঁড়ালেও সবার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস আমার আছে। কারণ জীবন ছাড়া আমাদের মত রেডইন্ডিয়ানদের আর কিছু হারাবার নেই। কিন্তু আমি চাই রোজ........।’
কথা শেষ করতে পারল না সান ওয়াকার। হঠাৎ যেন কথা আটকে গেল গলায়।
রোজের ভারি দৃষ্টি আছড়ে পড়ে আছে সান ওয়াকারের মুখের উপর। সান ওয়াকার থামতেই বলল, ‘বল সান।’ ঈষৎ কাঁপছিল মেরী রোজ-এর ফুলের মত দু’টি ঠোট।
সান ওয়াকারের মুখ নিচু।
তারও মুখ লাল হয়ে উঠেছে অবরুদ্ধ এক আবেগের উত্তাপে। বলল, ‘তোমার ‘The Nation’ নাটক মঞ্চায়ন করতে না দেয়ার কারণ যদি আমি হই, তাহলে বলব তুমি তোমার আপত্তি তুলে নাও রোজ। আমি চাই তুমি সকল বিতর্কের উর্ধ্বে থাক। বিশেষ করে বর্ণবাদের জঘন্য রাজনীতি থেকে।’
ঠোঁট দু’টি থর থর করে কেঁপে উঠল মেরী রোজ-এর। তার দু’চোখ ফেঁটে দু’ফোটা অশ্রু নেমে এল। দু’হাতে মুখ ঢাকল মেরী রোজ। কান্না আটকাবার চেষ্টা করতে গিয়ে কান্নায় সে ভেঙে পড়ল।
সোফায় হাতলের উপর মুখ গুজেছে মেরী রোজ।
সান ওয়াকার মেরী রোজ এর কাধে হাত রেখে বলল, ‘রোজ একটা নাটকে রেডইন্ডিয়ানদের কয়েকটা গালি বললেই তারা ছোট হয়ে যাবে না, আবার না বললে তারা বড় হয়ে উঠবে না। সুতরাং এটাকে এত বড় করে দেখো না।’
মেরী রোজ সান ওয়াকারের হাতটি টেনে নিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে তাতে মুখ গুজে বলল, ‘না সান, এটা বড় করা কিংবা ছোট করার ব্যাপার নয়। নীতির ব্যাপার এটা। যে নাটক আমি পরিত্যাগ করেছি, তা আমি অভিনীত হতে দেব না’।
‘কিন্তু রোজ তুমি যা পরিত্যাগ করেছ, অন্যেরা তা পরিত্যাগ নাও করতে পারে। একজন লেখকের লেখা প্রকাশ হবার পর তা জনগণের প্রোপার্টি হয়ে দাঁড়ায়।’
‘হ্যাঁ, অন্যেরা তা পরিত্যাগ না করতে পারে, কিন্তু আমার নাটক যখন মঞ্চস্থ হতে যাবে, তখন আমার অনুমতি নিতে হবে।’
সান ওয়াকার তার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মেরী রোজকে সোজা করে বসিয়ে চোখ মোছার জন্যে টিস্যু তার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘তোমার কথা ঠিক রোজ। কিন্তু তারা একটা আয়োজন করে ফেলেছে।’
‘এক. তারা আমার অনুমতি নেয়নি। দুই. এ আয়োজনটা তারা করেছে তোমার আমার বিরুদ্ধে নয়, একটা কম্যুনিটির বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবেই। আমি তাদের এ বদনিয়তকে স্বীকৃতি দেব না।’
একটু থামল মেরী রোজ। থেমেই আবার শুরু করল, ‘তার উপর তোমাকে যে হুমকি দিয়েছে, তারপর এটা আর মেনে নেয়া যায় না। মেনে নেয়ার অর্থ হবে সন্ত্রাসের কাছে নতী স্বীকার করা। আমি এটা পারবো না।’
‘তুমি যে নীতির কথা বলছ তা ঠিক আছে। কিন্তু তারা তা স্বীকার করছে না। তারা বলছে অন্য কথা।’
‘তারা তো বলছে যে, তোমার সাথে আমার সম্পর্কের কারণেই এই নাটক মঞ্চায়নে বাধা দিচ্ছি। তাদের এ কথাও কি ঠিক। কাউকে ভালোবাসা আমার পার্সোনাল রাইট এবং তার বিরুদ্ধে আমাকে ব্যবহার করতে না দেয়াও আমার ব্যক্তিগত অধিকার।’
‘রোজ, আমাদের সম্পর্ক কি এ ধরনের শত নাটকের শত কথার উর্ধ্বে নয়? একটা মূল্যহীন, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কেন তুমি বিরাট বিতর্ক ও বৈরিতার মধ্যে জড়িয়ে পড়বে?’
‘আমার বোধ হয় এটা প্রাপ্য সান। ভাল ছাত্রী হবার, অপ্রতিদ্বন্দ¦ী হবার অহমিকা নিয়ে আমি তোমার উপর অনেক অবিচার করেছি, সবার সামনে বারবার তোমাকে আমি অপমান করেছি। সবার শেষে তোমাকে নিয়ে নাটকও লিখেছি। এখন আমি তোমাকে ভালবেসে যদি অপমানিত হই, লাঞ্চিত হই, এটা হবে আমার যোগ্য প্রাপ্য। আমি এটা মাথা পেতে গ্রহণ করবো।’ মেরী রোজ কান্না জড়িত ভারি কণ্ঠে কথাগুলো বলল।
কথা শেষ করে দু’চোখে রুমাল চেপে মুখ নিচু করল রোজ।
সান ওয়াকার মেরী রোজ এর দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে তার কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, ‘তুমি অযথা নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ রোজ। তোমার কোন আঘাতই আমার কাছে আঘাত ছিল না, তোমার কোন অপমানই আমার কাছে অপমান মনে হয়নি। আমি জানতাম, মেঘের আড়ালে সূর্য আছে।’ সান ওয়াকারের ঠোঁটে হাসি।
মেরী রোজ তার কাঁধে রাখা সান ওয়াকারের হাত জড়িয়ে ধরে তাতে মুখ গুজে বলল, ‘কেন তাহলে তখন তুমি আমার ভুল ভেঙে দাওনি, কেন তুমি আমার পাগলামীকে সহ্য করে গেছ অমন করে? কেন? কেন?’
মেরী রোজ এর অশ্রুতে সান ওয়াকারের হাত ভিজে গেল।
সান ওয়াকার নিজের হাত টেনে নিয়ে মেরী রোজের চোখ মুছে দিয়ে বলল, ‘ফুলের গন্ধের জন্যে তাকে প্রস্ফুটিত হবার সুযোগ দেয়া দরকার।’
মেরী রোজ এর রাঙা হয়ে ওঠা মুখে হাসি ফুটে উঠল। সোফার হাতলে রাখা সান ওয়াকারের হাতে একটা কিল দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, ফুল ফোটাবার জন্যে যেমন তোমাকে মূল্য দিতে হয়েছে, তেমনি আমাকেও প্রায়শ্চিত্য করতে দাও।’
‘তাহলে এটা তোমার শেষ কথা?’
‘অবশ্যই। আমি ঐ সন্ত্রাসীদের কোন কথাই শুনব না। দেখি কি শক্তি আছে তাদের তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেবার।’
‘আমি ওদের ভয় করি না। কিন্তু আমি কোন গন্ডগোল চাই না।’
‘আমরা তো গন্ডগোল করছি না, তাদের অন্যায় ও বেআইনী দাবী গন্ডগোলের সৃষ্টি করছে।’
‘তাহলে আমি উঠি রোজ।’
‘না বস। তোমার প্রথম আগমন। মিষ্টি মুখ না করে তোমাকে ছাড়তে পারি না।’
কাঁচের দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের সব কথাই শিলা সুসান শুনল। তাদের কথা যেখানে এসে শেষ হলো, তাতে কেঁপে উঠল সুসান। তাহলে সান ওয়াকার ও মেরী রোজ সংঘাতে যাচ্ছে ষ্টুডেন্টস ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ তথা হোয়াইট ঈগল এর সাথে। তারা কি জানে হোয়াইট ঈগল কি? কি পরিণতি হতে পারে এর?
ভাবল শিলা সুসান, ওদের এই বিপজ্জনক পথ থেকে ফেরানো দরকার। এই ভাবনার পাশেই হৃদয়ের কোন অন্তরলোক থেকে অভিমান ক্ষুব্ধ একটা কণ্ঠ ভেসে এল, বঞ্চিত ও পরাজিত হৃদয় নিয়ে কেমন করে তুমি ওদের সামনে যাবে? কেন যাবে? কে তোমার ওরা?
মনটা মুষড়ে পড়ল শিলা সুসানের। কিন্তু আবার ভাবল সে, তার এই অভিমান, তার এই ক্ষোভ কার বিরুদ্ধে? কি দোষ সান ওয়াকারের কি দোষ মেরী রোজ এর? সান ওয়াকারের কাছে সুসান কোনদিনই নিজেকে প্রকাশ করেনি। মেরী রোজ সুসানের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, কিন্তু তার কাছেও সান ওয়াকার সম্পর্কে তার মনের কথা খুলে বলেনি সুসান। আর সবচেয়ে বড় কথা, আজ সুসান নিজ চোখে সান ও রোজ এর মধ্যকার যে গভীর প্রেম প্রত্যক্ষ করল, তা প্রশংসনীয়। সত্যিই সান ওয়াকারকে রোজ যেভাবে চেয়েছে, সুসান সেভাবে চাইতে পারেনি। সুতরাং সান ও রোজকে সে দোষী করতে পারে কেমন করে?
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল শিলা সুসান। সান ও রোজকে হোয়াইট ঈগলের সাথে সংঘাতে কিছুতেই যেতে দেয়া যাবে না। তাদেরকে ফেরাতে হবে এ পথ থেকে।
তবে আজ এই মুহূর্তে ওদের সাথে দেখা করা এবং এসব বিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না। ওদের একান্ত অন্তরঙ্গ এই বৈঠকে তার অনুপ্রবেশ বেমানান। সুযোগ করে সান ও রোজকে একত্রিত করে সুসান তাদেরকে এ কথাগুলো বলবে।
সুসান মেরী রোজ এর ড্রইং রুমের দরজা আনলক করে অতিসন্তর্পনে বেরিয়ে এল বাইরে।