বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) শেষ পর্ব

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X মিস্টার বেকার উঠে দাঁড়ালেন। সদ্য-পাওয়া হাঁসটা বগলদাবা করে বললেন, “অবশ্যই, মশাই। আমরা দিনের বেলা মিউজিয়ামে কাজ করি। মিউজিয়ামের কাছে আলফা ইন হল আমাদের প্রিয় আড্ডা। তার মালিকের নাম উইন্ডিগেট। ভারী ভাল লোক। তিনি একটা হাঁস ক্লাব স্থাপন করেছেন। প্রতি সপ্তাহে কয়েক পেনি করে চাঁদা দিলে আমরা বড়োদিনের সময় একটা হাঁস পাই। আমি আমার চাঁদা সময়মতো দিয়ে এসেছিলাম। বাকি সবটাই তো আপনার জানা। আপনার কাছে আমি ঋণী থেকে গেলাম, মশাই। আমার বয়স বা সম্মানের কথা ভাবলে, এই স্কচ বনেট জাতীয় টুপি আর এই আমাকে মানায় না।” যাওয়ার সময় তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে বেশ কেতাবি কায়দায় একটা অভিবাদন জানিয়ে গেলেন। বেশ মজা লাগল দেখে। তিনি চলে গেলে হোমস দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “এই হল মিস্টার হেনরি বেকারের গল্প। বোঝাই যাচ্ছে, তিনি ঘটনার কিছুই জানেন না। ওয়াটসন, তোমার কি খিদে পেয়েছে?” “না, কেন?” “তাহলে চলো, সন্ধ্যের খাবারটা একেবারে রাতেই খাওয়া যাবে; এইবেলা এই টাটকা সূত্রটার পিছু নেওয়া যাক।” “বেশ, তাই চলো।” বেশ শীত পড়েছিল সে রাতে। আমরা গলায় ভাল করে আলস্টার [‡‡] পরে মাফলার জড়িয়ে বের হলাম। মেঘহীন আকাশে তারা ঝিলমিল করছিল। পথের লোকেদের মুখ থেকে পিস্তলের গুলির মতো ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ডকটর’স কোয়ার্টার, উইমপোল স্ট্রিট, হার্লে স্ট্রিট, উইগমোর স্ট্রিট পেরিয়ে অক্সফোর্ড স্ট্রিটে এসে পড়লাম। আমাদের পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। আধঘণ্টার মধ্যে ব্লুমসবেরির আলফা ইনে এসে পড়লাম। হলবোর্নের দিকে যে রাস্তাটা গেছে তারই এক কোণে একটা ছোটো পাবলিক হাউস। হোমস প্রাইভেট বারের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে লাল- মুখো, সাদা অ্যাপ্রন-পরিহিত মালিকের কাছে দুই গ্লাস বিয়ার অর্ডার করল। বলল, “তোমার বিয়ার নিশ্চয় তোমার হাঁসের মতোই ভাল।” লোকটা অবাক হয়ে বলল, “আমার হাঁস!” “হ্যাঁ, আধঘণ্টা আগেই তোমার হাঁস ক্লাবের সদস্য মিস্টার হেনরি বেকারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল।” “ও, হ্যাঁ! এবার বুঝেছি। তবে কিনা, মশাই, ওই হাঁস ঠিক আমার নয়।” “তাই নাকি! তাহলে কার?” “কভেন্ট গার্ডেনের এক হাঁসওয়ালার কাছ থেকে ডজন দুয়েক আনিয়েছিলাম।” “বটে! ওখানকার কয়েকজনকে চিনি। ওগুলো ঠিক কার থেকে আনিয়েছিলে?” “লোকটার নাম ব্রেকিনরিজ।” “ও! তাকে চিনি না। আচ্ছা, এই নাও তোমার বিয়ারের দাম। তোমার ব্যবসার উন্নতি হোক। শুভরাত্রি।” বাইরের হিমেল হাওয়ায় আবার বেরিয়ে এসে সে কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল, “এবার গন্তব্য মিস্টার ব্রেকিনরিজের দোকান। বুঝে দ্যাখো, ওয়াটসন, আমরা যে লক্ষ্যে চলেছি, তার এক দিকে একটা সামান্য হাঁস। কিন্তু অন্যদিকে একটি নিরপরাধ লোক যাকে আমরা নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারলে তাকে সাত বছর বিনা অপরাধেই জেল খাটতে হবে। এমনও হতে পারে যে, আমরা দেখব আসলে চুরিটা সেই করেছে। কিন্তু ভাগ্যক্রমেই হোক, আর যেভাবেই হোক, আমাদের হাতে এমন একটা সূত্র এসে গেছে যা পুলিশের হাতেও আসেনি। এর শেষ দেখেই ছাড়ব। চলো দক্ষিণ দিকে। তাড়াতাড়ি।” হলবোর্ন পেরিয়ে এনডেল স্ট্রিটে এসে পড়লাম। বসতি এলাকার আঁকাবাঁকা পথ ধরে কভেন্ট গার্ডেন মার্কেটে পৌঁছালাম। সেখানে সবচেয়ে বড়ো দোকানগুলোর একটার নাম ব্রেকিনরিজের নামে। মালিকের মুখটা ঠিক ঘোড়ার মতো লম্বাটে। দু-পাশে ছাঁটা জুলপি। একটা ছেলেকে দোকানের শাটার ফেলতে সাহায্য করছিল। হোমস বললে, “শুভ সন্ধ্যা। বেশ শীত পড়েছে আজ রাতে।” বিক্রেতা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল। তারপর আমার সঙ্গীর দিকে প্রশ্নালু চোখে তাকাল। মার্বেলের শূন্য স্ল্যাবগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে হোম জিজ্ঞাসা করলে, “সব হাঁস বিক্রি হয়ে গেছে দেখছি।” “কাল সকালে আসুন। পাঁচশো হাঁস চাইলেও দিতে পারবো।” “সে আমার কোনো কাজে লাগবে না।” “তবে ওই যে দোকানটায় গ্যাস জ্বলছে, ওটায় যান।” “কিন্তু আমাকে যে তোমার দোকানের কথাই বলা হয়েছে।” “কে বলেছে?” “আলফার মালিক।” “ও, হ্যাঁ। আমি তাকে ডজন দুয়েক পাঠিয়েছিলাম।” “হাঁসগুলো বেশ ছিল। তা ওগুলো পেয়েছিলে কোত্থাকে?” অবাক কাণ্ড। প্রশ্নটা শুনেই বিক্রেতা রাগে ফেটে পড়ল। সে এবার ঘাড় ঘুরিয়ে কোমরে হাত দিয়ে যুদ্ধং দেহি ভূমিকায় দাঁড়াল। বলল, “পথে আসুন মশায়! কি চাইছেন বলুন দেখি! ঝেড়ে কাশুন।” “বাঁকা কথা তো কিছুই বলিনি। আমি শুধু জানতে চেয়েছি যে হাঁসগুলো তুমি আলফায় বিক্রি করেছিল, সেই হাঁসগুলো তুমি কার কাছ থেকে কিনেছিলে?” “অ! আর যদি না বলি, তাহলে কী করবে?” “কিছুই না। মামুলি ব্যাপার। কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি, এই সামান্য কথায় তুমি এতটা উত্তেজিত হচ্ছ কেন?” “উত্তেজিত হব না! এমন কথা শুনলে কার মাথার ঠিক থাকে? ভাল দামে ভাল মাল বেছবো, ব্যস, লেনদেন খতম। ‘হাঁস কোথায়?’ ‘কার থেকে হাঁস কিনেছো?’ ‘ওই হাঁসের কত দাম?’ হাঁস তো নয়, যেন আর কিছু। সামান্য হাঁস নিয়ে কত কথা!” হোমস গা-ছাড়া ভাব দেখিয়ে বলল, “কি করে জানবো বলো যে, আরও পাঁচ জন ওই হাঁসের খোঁজ করছে। তবে তুমি না বললে, বাজিটা হেরে যাবো। হাঁস-মুরগির ব্যাপারে আমি নিজেকে একরকম বিশেষজ্ঞই মনে করি। আর একজনের সঙ্গে বাজি ধরেছি যে, যে হাঁসটা আজ খেলাম সেটা পাড়াগেঁয়ে হাঁস।” হাঁসওয়ালা খুব সংক্ষেপে রাগত গলা বলল, “অ! তবে আপনি বাজি হেরেছেন। ওটা শহুরে হাঁস।” “আমার দেখে তা মনে হল না।” “আমি বলছি তাই।” “মানি না।” “ল্যাংটোবেলা থেকে হাঁস বেচছি, মশাই। আপনি আমাকে হাঁস চেনাচ্ছেন? আমি বলছি, আলফায় যে হাঁসগুলো বেচেছি, সেগুলো শহুরে হাঁস।” “তুমি বললেই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?” “তাহলে বাজি রাখুন।” “মিছিমিছি অর্থব্যয় করবেন। আমি জানি আমি যা বলছি তা ঠিক। এক সভারেন [§§] বাজি রইল; শুধু ওই বাজে তক্কো করার জন্য আপনাকে শিক্ষে দেওয়ার জন্যে।” তারপর ব্যঙ্গের হাসি হেসে দোকানদার বলল, “বিল, বইগুলো আমাকে এনে দে তো রে।” ছোটো ছেলেটা একটা ছোটো মোটা বই আর একটা বেশ বড়ো চকচকে মলাটের বই আনল। দুটো বইই একসঙ্গে ঝুলন্ত বাতির নিচে রাখা হল। হাঁসওয়ালা বলল, “এই যে হাঁসবিশেষজ্ঞ মশাই। ভেবেছিলাম আমার সব হাঁস বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু না, এখনও একটা আছে। এই ছোটো খাতাটা দেখুন।” “দেখলাম। তাতে হলটা কী?” “এটা হল আমি যাদের থেকে হাঁস কিনি তাদের নামের তালিকা। দেখেছেন? আচ্ছা, এবার দেখুন, এই পাতাটা পাড়াগেঁয়ে হাঁসের মালিকদের তালিকা। নামের পাশে যে নম্বর দেখছেন সেগুলো বড়ো লেজার বইয়ে তাদের অ্যাকাউন্ট নম্বর। এবার দেখুন। অন্য পাতায় লাল কালিতে কী লেখা আছে? এই হল আমার শহরের সরবরাহকারীদের তালিকা। এবার, তিন নম্বর নামটা পড়ুন। পড়ুন পড়ুন, আমাকে পড়ে শোনান।”হোমস পড়ল, “মিসেস ওকশট, ১১৭, ব্রিক্সটন রোড– ২৪৯।” “হ্যাঁ, ঠিক। এবার লেজারের পাতায় যান।” হোমস নির্দিষ্ট পাতাটি খুলল, “এই যে এখানে, ‘মিসেস ওকশট, ১১৭ ব্রিক্সটন রোড, ডিম ও পোলট্রি সরবরাহকারী।” “শেষ লাইনটায় কী লেখা আছে?” “‘২২শে ডিসেম্বর। সাত শিলিং ছয় পেন্স দরে ২৪টি হাঁস।’” “ঠিক। এবার, নিচে দেখুন। কী লেখা আছে?” “‘আলফার মিস্টার উইন্ডিগেটের নিকট ১২ শিলিং দরে বিক্রীত হইয়াছে।’” “এবার কী বলবেন?” শার্লক হোমস মুখখানি ব্যাজার করল। তারপর পকেট থেকে এক সভারেন বের করে স্ল্যাবের উপর ছুঁড়ে দিয়ে মহাবিরক্তির ভাব দেখিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। কয়েক ইয়ার্ড দূরে এসে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে সে তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মুখে কোনো শব্দ না করে হেসে উঠল। বলল, “এই রকম গোঁফ আর পকেট থেকে গোলাপি খাতা উঁকি দিচ্ছে দেখলেই বুঝবে, একে বাজি দিয়েই টোপ গেলাতে পারবে। ওকে একশো পাউন্ড দিলেও এত কিছু বলত কিনা সন্দেহ। কিন্তু দ্যাখো, একটা বাজির টোপ ফেলে কত সহজেই ওর পেট থেকে সব বের করে নেওয়া গেল। যাই হোক, ওয়াটসন, মনে হচ্ছে আমরা আমাদের অনুসন্ধানের শেষ পর্বে এসে পৌঁছে গেছি। এখন ভাবতে হবে, মিসেস ওকশটের কাছে আজ রাতেই যাওয়া উচিত না কাল যাবো। নিঃসন্দেহে যা বুঝলাম, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা ছাড়াও আরও কেউ উৎসাহিত। আমার উচিত…” তার কথা চাপা দিয়ে হঠাৎ দূরে একটা উচ্চ কোলাহল উঠল। যে দোকানটা থেকে এক্ষুনি বেরিয়ে এলাম সেই দোকানটার থেকেই। পিছন ফিরে দেখি একটা বেঁটেখাটো ইঁদুরমুখো লোক ঝুলন্ত আলোর বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, আর ওই হাঁসওয়ালা ব্রেকিনরিজ রাগতমুখে দোকানের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ঘুষি বাগিয়ে লোকটাকে কী সব বলছে। তার চিৎকার কানে আসছিল, “যথেষ্ট হয়েছে তোমার আর তোমার হাঁস। চুলোর দোরে যাও গে। ফের যদি ফালতু বকতে আসো তবে তোমার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেবো। মিসেস ওকশটকে এখানে নিয়ে এসো, যা বলার তাঁকেই বলব। তোমার কাছে কেন জবাবদিহি করব হে? তোমার থেকে হাঁস কিনেছিলাম নাকি?” লোকটা কুঁই কুঁই করতে করতে বলল, “না, কিন্তু ওগুলোর একটা যে আমার ছিল।” “তাহলে মিসেস ওকশটকে জিজ্ঞাসা করো গে যাও।” “উনি আমাকে বললেন তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে।” “তাহলে প্রুশিয়ার রাজাকে জিজ্ঞাসা করো গে যাও। যত্তো সব! যথেষ্ট হয়েছে। এবার বেরোও এখান থেকে।” এই বলে দোকানি রীতিমতো ঘাড়ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে বের করে দিল। লোকটাও অন্ধকারে মিশে গেল। হোমস ফিসফিসিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে, আর ব্রিক্সটন রোডে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওয়াটসন, আমার সঙ্গে এসো। এই লোকটার পিছু নেওয়া যাক।” বাজারের লোকজনের ভিড় ঠেকে হোমস এগিয়ে গেল। খানিকক্ষণের মধ্যে লোকটাকে ধরেও ফেলল। কাঁধে হাত রাখতেই লোকটা পিছন ফিরে তাকালো। গ্যাসের আলোয় দেখলাম, ভয়ে লোকটার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কে আপনারা? কী চান?” হোমস মৃদুস্বরে বলল, “মাপ করবেন, কিন্তু আপনার সঙ্গে ওই দোকানির বাক্যালাপ আমার কানে এসেছে। মনে হচ্ছে, এই ব্যাপারে আপনাকে কিছু সাহায্য করতে পারি।” “আপনি? আপনি কে? এই ব্যাপারে আপনি কী জানেন?” “আমার নাম শার্লক হোমস। আমার কাজই হল অন্যেরা যে খবর রাখে না, সেই খবরটি রাখা।” “কিন্তু আপনি তো এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না।” “আজ্ঞে না, আমি সবই জানি। ব্রিক্সটন রোডের মিসেস ওকশট ব্রেকিনরিজ নামে এক দোকানিকে কয়েকটা হাঁস বেচেছিলেন। সেই হাঁসগুলি ব্রেকেনরিজ বেচে দেয় আলফার মিস্টার উইন্ডিগেটের কাছে। উইন্ডিগেট তার ক্লাব সদস্য মিস্টার হেনরি বেকারকে সেই হাঁস বিক্রি করে। এই হাঁসটাকেই তো তুমি খুঁজছ?”লোকটা তার দুই হাত আর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “মশাই, আপনার মতো একজনকেই তো খুঁজছিলাম। আপনি ভাবতেও পারবেন না, এই ব্যাপারটার সঙ্গে আমার জীবনমরণ সম্পর্ক জড়িয়ে আছে।” একটা চার-চাকার গাড়ি যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। সেটাকে দাঁড় করিয়ে হোমস বলল, “তাহলে চলুন কোথাও একটা গিয়ে আরামসে আলোচনা করা যাক। এই বাজারে বড্ড চিৎকার চ্যাঁচামেচি। কিন্তু সবার আগে–আপনার নামটা তো জানা হল না।” লোকটা খানিক ইতস্তত করে শেষে অন্য দিকে মুখ করে বলল, “আমার নাম জন রবিনসন।” হোমস মিষ্টি গলায় বলল, “না না, আপনার আসল নামটা বলুন। বেনামিদের সঙ্গে কাজ করা বড়ো অসুবিধাজনক।” লোকটা সাদা গালদুটো লাল হয়ে এল। সে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার আসল নাম হল জেমস রাইডার।” “ভাল! তার মানে আপনিই হোটেল কসমোপলিটনের প্রধান পরিচারক। দয়া করে এই ক্যাবটিতে [***] উঠুন। যা জানতে চাইছেন, তার সবই আমার কাছে শুনবেন।” লোকটা একবার আমার দিকে একবার হোমসের দিকে আধা-ভয় আধা-আশা ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। সে বুঝতে পারছিল না যে, তার কপালে লাভ না লোকসান লেখা আছে। দোনোমোনো করতে করতেই সে ক্যাবে উঠল। আধঘণ্টায় আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের বেকার স্ট্রিটের বৈঠকখানায়। লোকটা গাড়িতে কিছুই বলল না। তবে তার ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস আর হাত কচলানি থেকে বুঝতে পারছিলাম যে, সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। ঘরে ঢুকে হোমস হাসিমুখে বলল, “হ্যাঁ, এসে গেছি বাড়ি। বেশ সুন্দর আগুন জ্বলছে। মিস্টার রাইডার, আপনি দেখি শীতে কাঁপছেন। আসুন, এই বেতের চেয়ারটায় বসুন। আমি ঘরের জুতোটা পরে আসি। তারপর আপনার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করব। হ্যাঁ, এইবার! আপনি জানতে চাইছিলেন না, ওই হাঁসগুলোর কী হয়েছে?” “হ্যাঁ, মশায়।” “অথবা, আমার যতদূর ধারণা, তার মধ্যে একটি হাঁস সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। ওই যে হাঁসটার লেজের দিকে কালো ডোরা দাগ আর বাকিটা পুরো সাদা, সেইটা।” রাইডার উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ, মশায়! বলতে পারেন ওটা কোথায় গেছে?” “ওটা এখানে এসেছিল।” “এখানে?” “হ্যাঁ, আশ্চর্য সেই হাঁস, বুঝলেন মশাই। সত্যিই আপনি ওটার প্রতি আগ্রহ না দেখালেই অবাক হতুম। সেই মরা হাঁস একটা ডিমও পেরেছিল। ছোট্ট একটা উজ্জ্বল নীল রঙের ডিম। এমন ডিম কখনও দেখিনি। সেটা আমি আমার মিউজিয়ামে রেখে দিয়েছি।” লোকটা পড়ে যাচ্ছিল। কোনো রকমে ডান হাত দিয়ে ম্যান্টলপিসটা [†††] ধরে সামলে নিল। হোমস তার স্ট্রংবক্সের ডালা খুলল। তারপর নীল পদ্মরাগটা বের করে ধরল। জিনিসটা একটা তারার মতো চকচক করছিল। একটা অদ্ভুত সুন্দর শীতল বহুকোণী আলো ঠিকরে পড়ছিল ওটা থেকে। রাইডার শুকনো মুখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল না, ওটা দাবি করাটা ঠিক হবে কিনা। হোমস শান্তভাবে বলল, “তোমার খেলা শেষ, রাইডার। না না, ধরে দাঁড়াও। নইলে পিছনের আগুনে পড়ে যাবে। ওয়াটসন, ওকে চেয়ারটায় বসিয়ে দাও। অপরাধ করতে যেরকম কলজের জোর লাগে তা ওর নেই। আর এক গ্লাস ব্র্যান্ডি খাইয়ে দাও। হ্যাঁ! এবার ওকে মানুষের মতো দেখাচ্ছে বটে। একেবারে ইঁদুরের মতো হয়ে গিয়েছিল!” সে খানিকক্ষণ টলতে লাগল। যেন পড়ে যাবে। ব্র্যান্ডি খেয়ে গালের রংটা একটু ফিরল। তারপর বসে হোমসের দিকে সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে রইল। “আমার কাছে প্রায় সব তথ্য আর প্রমাণই আছে। তাই তোমাকে বেশি কিছু বলতে হবে না। শুধু কয়েকটা কথা জানলেই আমার সব জানা পূর্ণ হবে। রাইডার, তুমি কী এই নীল পাথরটার কথা কাউন্টেস অফ মোরকারের কাছ থেকে শুনেছিলে?” লোকটা কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, “ক্যাথরিন কসাক আমাকে ওটার কথা বলে।” “ও! মাননীয়া কাউন্টেসের খাস-পরিচারিকা। আর শুনেই হঠাৎ-বড়োলোক হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেলে। যাক, এমন লোভ অনেক ভাল মানুষও সামলাতে পারে না, তুমি তো কোন ছার। তবে, রাইডার, তুমিও ভালমানুষ নও। যাকে বলে একখানি ছিঁচকে চোর। তুমি জানতে, হরনার নামে ওই কলের মিস্ত্রিটার নামে আগেও একটা কেলেঙ্কারি আছে। আই তার দিকেই সবার সন্দেহ টানতে কষ্ট হবে না। তারপর কী করলে? তুমি আর তোমার এই সহচরীটি মিলে কাউন্টেসের ঘরে গ্যাঁড়াকল করে রাখলে যাতে লোকটাকে ডাকতে হয়। তারপর সে চলে গেলে, তুমি গয়নার বাক্স থেকে গয়নাটা সরালে। তারপর অ্যালার্ম বেল বাজালে আর ওই বেচারাকে গ্রেফতার হতে হল। তারপর তুমি…” হঠাৎ রাইডার চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে নেমে গেল। তারপর হোমসের পা জড়িয়ে ধরল, কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল, “ভগবানের দোহাই, দয়া করুন! আমার বাবা-মার কথা ভাবুন। ওঁরা জানতে পারলে একেবারে ভেঙে পড়বে। আমি আগে কখনও এমন কাজ করিনি। কোনোদিন করব না। প্রতিজ্ঞা করছি। বাইবেলের দিব্যি। দয়া করে আমাকে আদালতে নিয়ে যাবেন না। খ্রিস্টের দোহাই, নিয়ে যাবেন না।”হোমস কড়া ভাষায় বলল, “চেয়ারে গিয়ে বোসো। খুব তো নাকে কাঁদছ এখন। ওই বেচারি নির্দোষ করনারকে ফাঁসাবার আগে মনে ছিল না এসব কথা!” “আমি পালিয়ে যাবো, মিস্টার হোমস। এই দেশ ছেড়েই পালিয়ে যাবো মশাই। তাহলে ওর বিরুদ্ধে মামলাটা আর টিকবে না।” “আচ্ছা! সেকথা পরে ভাবব। আগে বলো দেখি, তারপর ঠিক কী কী করলে। পাথরটা হাঁসের পেটে গেল কী করে? আর সেই হাঁসই বা খোলা বাজারে এলো কী করে? যদি বাঁচতে চাও তো সব খুলে বলো।” রাইডার একবার জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁটদুটো চেটে নিল। তারপর বলল, “যেমন যা ঘটেছে সবই বলছি, মশাই। হরনার গ্রেফতার হওয়ার পর মনে হল, পাথরটা নিজের কাছে রাখা আর নিরাপদ হবে না। যে কোনো মুহুর্তে পুলিশ আমার ঘরে খানাতল্লাশি করতে পারে। হোটেলেও এমন কোনো নিরাপদ জায়গা নেই যেখানে ওটা রাখা যেতে পারে। তাই আমার বোনের বাড়ি চলে গেলাম। আমার বোন ওকশট নামে একজনকে বিয়ে করে ব্রিক্সটন রোডে থাকে। সেখানেই সে বাজারে বিক্রির জন্য হাঁস পালন করে। মনে হচ্ছিল, সারা রাস্তায় পুলিশ আর গোয়েন্দারা আমার পিছু নিয়েছে। ওই শীতের রাতেও ব্রিক্সটন রোডে যেতে ঘেমেনেয়ে গেলাম। বোন জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, আমাকে এত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন। আমি শুধু বললাম, হোটেলে একটা দামি রত্ন চুরি গেছে। তাই মন খারাপ। তারপর বাড়ির পিছনের উঠোনে গিয়ে কী করা যায় ভাবতে লাগলাম।” “মডসলি নামে আমার এক বন্ধু আছে। স্বভাব ভাল না। পেন্টনভিলে জেল খেটে সদ্য ছাড়া পেয়েছিল। তার সঙ্গে একদিন দেখা হল। সে আমাকে চোরেদের কাজকারবারের কথা বলল। চোরাই মাল কিভাবে কোথায় বেচা যায়, সেও বলল। লোকটার কিছু গোপন কথা আমি জানি, তাই জানতাম ও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। ও থাকে কিলবার্নে। সেখানেও যাওয়া স্থির করলাম। ওই ভাল দামে মাল বিক্রির ব্যবস্থা করে দিত। কিন্তু নিরাপদে ওর কাছে যাবো কি করে? অনেক কষ্টে হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। যেকোনো মুহুর্তে আমার দেহতল্লাশ করলেই তো আমার ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে পাথরটা বেরিয়ে পড়বে। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় দেখলাম, আমার পায়ের কাছে হাঁসগুলো ঘুরছে। হঠাৎ মাথায় একটা মতলব খেলে গেল। ভাবলাম, এটাকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়ার সেরা গোয়েন্দাকেও বোকা বানিয়ে ছাড়ব। “কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বোন আমাকে বলেছিল যে আমি বড়োদিনের উপহার হিসেবে একখানা হাঁস নিতে পারি। আমার বোন কথার খেলাপ করে না। ভাবলাম, এই মওকায় একখানা হাঁস বেছে নিই, সেটাই আমার সঙ্গে কিলবার্নে পাথরটা বয়ে নিয়ে যাবে। উঠোনে একটা ছোটো ছাউনি মতন ছিল। আমি তার পিছনে একখানা হাঁসকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম। বেশ বড়োসড়ো একটা হাঁস। সাদা। কালো দাগওয়ালা লেজ। ধরলাম হাঁসটাকে। ওটার মুখ হাঁ করে যতখানি আঙুল যায় ঢুকিয়ে পাথরটা পুরে দিলাম। হাঁসটা পাথরটা গিলে নিল। কিন্তু হাঁসটা খুব ডানা ঝাপটাতে লাগল। আমার বোন ব্যাপারটা কি দেখার জন্য বেরিয়ে এল। আমি যখন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য পিছন ফিরেছি ওমনি হাঁসটা আমার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে দলের সঙ্গে মিশে গেল। “আমার বোন জিজ্ঞেস করল, ‘হাঁসটা নিয়ে কী করছিস্, দাদা?’ “আমি বললাম, ‘কিছু না। তুই বলেছিলি বড়োদিনে আমাকে একখানা হাঁস দিবি। আমি দেখছিলাম, কোনটা সবচেয়ে মোটা।’ “বোন বলল, ‘ও, ওই যে তোর জন্য আলাদা করে রেখেছি। আমরা ওটাকে বলি ‘দাদার হাঁস’। ওই যে বড়ো সাদা হাঁসটা। মোট ছাব্বিশটা আছে। একটা তোর, একটা আমাদের, বাকি দু-ডজন বাজারে যাবে।’ “আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ, ম্যাগি। তবে তোর কাছে সবগুলোই একরকম হয় তো আমি যেটা ধরেছিলাম, সেটাই নিই।’ “বোন বলল, ‘কিন্তু অন্যটার ওজন অন্তত তিন পাউন্ড বেশি। তোর জন্যই ওটাকে খাইয়ে দাইয়ে মোটা করেছি।’ “আমি বললাম, ‘আমার ওটাই বেশি পছন্দ। ওটাই নেবো। এখনই নিয়ে যাই?’ “আমার বোন একটু অসন্তুষ্ট হল। কিন্তু মুখে বলল, “আচ্ছা, তুই যা ভাল বুঝিস্! কোনটা নিবি? “‘ওই যে কালো ডোরা লেজওয়ালা সাদা হাঁসটা। পালের মধ্যে ঘুরছে।’ “‘ঠিক আছে, মেরে নিয়ে যা।’ “তারপর, মিস্টার হোমস, আমার বোন যেমনটা বলল, তেমনটাই করলাম। একটা হাঁস নিয়ে গেলাম কিলবার্নে। আমার বন্ধুকে আমার ফন্দির কথা বললাম। ওই লোকটাকেই একমাত্র সব কথা খুলে বলা যেত। আমরা খুব হাসলাম। তারপর একটা ছুরি নিয়ে হাঁসটা কাটলাম। কিন্তু পাথরটা সেখানে ছিল না। আমার তো মাথায় বজ্রাঘাত। নিশ্চয় কোনো ভুল হয়েছে। হাঁসটা ফেলে বোনের বাড়ি ছুটে এলাম। পিছনের উঠোনে গেলাম। কিন্তু সেখানে একটা হাঁসও ছিল না। “বোনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হাঁসগুলো কোথায় গেল, ম্যাগি?’ “‘দোকানে গেছে, দাদা।’ “‘কোন দোকানে?’ “‘কভেন্ট গার্ডেনের ব্রেকিনরিজের দোকানে।’ “আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা আমি যে হাঁসটা নিয়েছি, ওই রকম দেখতে আরও একটা হাঁস আছে কী?’ “‘হ্যাঁ, দাদা। ওই রকম লেজওয়ালা দুটো হাঁস আছে। একই রকম দেখতে। আমি দুটোকে আলাদা করে চিনতে পারতাম না।’ “তখনই ব্যাপারটা জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল। দৌড়ে গেলাম ওই ব্রেকিনরিজ লোকটার কাছে। কিন্তু ততক্ষণে সে সব হাঁস বেচে দিয়েছে। আমাকে বললও না, কার কাছে বেচেছে। আপনারা তার কথাই শুনেছেন আজ রাতে। সবসময় ওইরকমভাবেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে ও। আমার বোন ভাবছে, আমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছি। আমার নিজেরই মনে হচ্ছে, আমি পাগল হয়ে গেছি। আর এখন… এখন আমি দাগি চোর! যেটা চুরি করে চোর হলাম, সেটাই হারালাম। ভগবান আমাকে রক্ষা করুন! ভগবান আমাকে রক্ষা করুন।’ লোকটা দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল। অনেকক্ষণ কারো মুখে কোনো কথা ফুটল না। শুধু দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। আর টেবিলের কানায় হোমসের আঙুল চালানোর টিপ টিপ শব্দ। তারপর হোমস উঠে দরজাটা খুলল। বলল, “বেরিয়ে যাও!” “অ্যাঁ, মশায়? ও! ঈশ্বর আপনার ভাল করুন!” “একটাও কথা নয়। বেরিয়ে যাও!” কোনো কথার দরকারও পড়ল না। লোকটা ছুটে বেরিয়ে গেল। দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে রাস্তায় গিয়ে পড়ল। তারপর শুনলাম রাস্তা দিয়ে তার ছুটে পালানোর পায়ের শব্দ। পাইপটা টেনে নিয়ে হোমস বলল, “কথা হল, ওয়াটসন, পুলিশ আমাকে তাদের খামতি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য রাখেনি। হরনারের বিপদ থাকলে সে ব্যাপার আলাদা। তবে এই লোকটা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না। মামলাটাও আর টিকবে না। আমি যেটা করলাম, সেটা বেআইনি। কিন্তু এতে একটা লোককে বাঁচানো গেল। লোকটা আর চুরিচামারি করবে না। সাংঘাতিক ভয় পেয়েছে। এই লোকটাকে জেলে পাঠালে এ শেষটায় দাগি অপরাধীতে পরিণত হত। তাছাড়া এই উৎসব ক্ষমার উৎসব। কাকতালীয়ভাবে আমাদের দরজায় একটা রহস্য এসে পড়েছিল। সেটার সমাধান করতে পারাটাই আমার পুরস্কার। খাবার ঘণ্টাটা বাজাও, ডাক্তার, এবার অন্য একটা রহস্যের সমাধান করি। অবশ্য সেটাও এক পক্ষীরহস্য।” – রচনা-পরিচিতি অনূদিত নাম: নীল পদ্মরাগ মূল নাম: ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লু কারবাঙ্কল’ মূল রচনা: স্যার আর্থার কোনান ডয়েল অনুবাদ: অর্ণব দত্ত অলংকরণ: সিডনি পেজেট ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লু কারবাঙ্কল’ ব্রিটিশ লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস গল্প-সংকলন দি অ্যাডভেঞ্চার অফ শার্লক হোমস-এর বারোটি গল্পের মধ্যে সপ্তম গল্প। এটি ১৮৯২ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয় স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন-এ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) শেষ পর্ব

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২৬.ক্যারিবিয়ানের দ্বীপদেশে (৪)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X রাগে-ক্ষোভে মুখ লাল করে টেলিফোন রাখল ফার্ডিন্যান্ড। তাকাল তীব্র দৃষ্টিতে সামনে বসা অপারেশন কমান্ডার হের বোরম্যান এবং তথ্য চীফ পল-এর দিকে। বলল, ‘গোল্ড ওয়াটার দারুণ ক্ষেপেছে। বলছে, যাকে যেখানে সন্দেহ হয় সাফ করে দাও। তাঁর রাগ হলো, যে সব কথা হোয়াইট ঈগলের বাইরে কাক-পক্ষীও জানত না, তা টিভি নেটওয়ার্ক ও নিউজ এজেন্সী নেটওয়ার্কে গেল কি করে?’ ‘হোয়াইট ঈগল-এর বাইরে কাক-পক্ষীও জানে না, একথা ষোলআনা ঠিক নয় স্যার। চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছেলে তো ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিল যাদের মধ্যে অন্তত একজন লায়লা জেনিফার এখনও জীবিত আছে। এবং গ্রান্ড টার্কস দ্বীপে আমাদের লোক গায়েব করার যে ঘটনাগুলো পর পর ঘটল তা লায়লা জেনিফারের এলাকা বা লায়লা জেনিফারকে কেন্দ্র করেই।’ বলল বোরম্যান। ‘কিন্তু লায়লা জেনিফাররা মাত্র জনসংখ্যাগত একটা তথ্য জানতে পেরেছিল, আমাদের পরিকল্পনার কিছুই তো জানতে পারেনি।’ বলল বিরক্তির সাথে ফার্ডিন্যান্ড। ‘মাফ করবেন স্যার, গ্রান্ড টার্কস-এর কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালের তিনটি মৃত মুসলিম পুরুষ শিশুর প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট আমাদের হাতে এসেও হাত ছাড়া হয়ে যাওয়া এবং সবচেয়ে বড় কথা ডাঃ ওয়াভেলের বাসায় আমাদের লোকদের হাত থেকে আমাদের প্লান বাস্তবায়নের রিভিউ রিপোর্ট শত্রুর হাতে চলে যাওয়া প্রমাণ করে শত্রুর হাতে আমাদের তথ্য চলে গেছে। সে শত্রুরাই তথ্যগুলো টিভি চ্যানেল ও নিউজ এজেন্সী চ্যানেলে দিয়েছে।’ বলল হের বোরম্যান। ‘কিন্তু এই শত্রু তো এমন নয় যে, ঐ সব বিশ্ব চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ করে!’ ফার্ডিন্যান্ড বলল। ‘ঐ এশিয়ানকে পাওয়ার আগে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে না স্যার।’ বলল বোরম্যান। ‘ডাঃ মার্গারেটকে দিয়েই ঐ এশিয়ানকে পেতে হবে স্যার।’ বলল তথ্য চীফ পল। ‘হ্যাঁ মার্গারেটের প্রসঙ্গটা খুব জরুরী। আমি সে প্রসংগে আসছি, তার আগে এস একটু আলোচনা করি, এখন পরিস্থিতি কি? ঐ টিভি নিউজ ও নিউজ পেপার রিপোর্টের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কি?’ ফার্ডিন্যান্ড বলল। পল নড়েচড়ে বসল। বলল, ‘বাইরের এ পর্যন্ত চারটা প্রতিক্রিয়ার কথা জানা গেছে। এক. বৃটিশ সরকার তার টার্কস দ্বীপপুঞ্জের বিষয়টা তদন্তের জন্যে একটা তদন্ত কমিশন গঠন করেছে এবং তদন্ত কমিশনটি দু’একদিনের মধ্যেই টার্কস দ্বীপপুঞ্জে এসে পৌছবে। দুই. এ্যামনেষ্টি তার নির্বাহী কমিটির জরুরী মিটিং-এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সাত দিনের মধ্যে গোটা বিষয়ের উপর সরেজমিন রিপোর্ট চেয়েছে। তিন. জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ও ইউনিসেফও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সরেজমিন রিপোর্টের জন্যে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। আর ইউনিসেফ ক্যারিবিয়ানের প্রত্যেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পৃথক পৃথক ফান্ড দিয়ে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে ছয় মাসের জন্যে। তারা প্রত্যেক শিশুর কেস মনিটর করবে। চার. ওআইসি, রাবেতা আলমে আল ইসলামীসহ পৃথিবীর অসংখ্য মুসলিম সংগঠন বিষয়টির তীব্র প্রতিবাদ করেছে, জাতিসংঘের কাছে তদন্ত ও বিচার দাবী করেছে। ওআইসি সরকারগুলোর সাথে যোগাযোগ করে প্রত্যেক দেশেই পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে। আর অভ্যন্তরীন অবস্থা হলো, সরকারগুলো চারদিকের প্রবল প্রেসারের মুখে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। গত ছয় সাত বছরের সকল শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান ও বিবরণ সংগ্রহ করছে। সরকারগুলো তাদের সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর শিশু বিভাগে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছে। প্রতিটি অসুস্থ শিশুর প্রতি বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের জনগণের মধ্যে বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে। অসুস্থ শিশুর চিকিৎসা গর্ভবতী মহিলাদের প্রসবের জন্যে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নেয়া তারা বন্ধ করেছে। সরকার ও ইউনিসেফ উদ্যোগ নিয়েছে তাদের বুঝানোর জন্যে।’ এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো তথ্য চীফ পল। ফার্ডিন্যান্ডের চোখে মুখে বিরক্তি ও ক্রোধের ছাপ। বলল, ‘খারাপ খবরগুলো যতটা বিস্তৃত ও মনোযোগের সাথে সংগ্রহ করেছ, তার খোঁজ সউদী আরবের ওআইসি পেলে তোমাকে পুরষ্কার দেবে।’ বলে ফার্ডিন্যান্ড হের বোরম্যানের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমাদের চলমান কাজের ব্যাপারে যা বলেছিলাম, তার কি করেছ?’ ‘আপনার কথাই ঠিক স্যার। প্রত্যেক অঞ্চল থেকে আমাদের লোকেরা একই কথা বলেছে, যে বা যারা আমাদের পক্ষে কাজ করছে, তারা সবাই ভীত হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ কর্মস্থল থেকে সরে পড়েছে। এই অবস্থায় তাদেরও সকলের মত, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা যাবে না এবং কাজ বন্ধও হয়ে গেছে।’ বলল বোরম্যান। রাগে-ক্ষোভে মুখ লাল হয়ে উঠেছে ফার্ডিন্যান্ডের। বলল, ‘প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে, কিন্তু যে শয়তানরা এই বিপর্যয়ের জন্যে দায়ী, তাদের শায়েস্তা করার কাজ তীব্র করতে হবে। লায়লা জেনিফারকে যে ভাবেই হোক ধরতে হবে। ওকে জ্যান্ত কবর দিতে হবে। জর্জকেও খোঁজ কর। মনে হচ্ছে সেও একজন নাটের গুরু।’ বলে থামল। গ্লাস থেকে এক ঢোক মদ গলধঃকরণ করে বলল, ‘বল এবার শয়তান ডাক্তারের কথা।’ ‘স্যার আমরা যে ভদ্র আচরণ করছি, তা দিয়ে তার কাছ থেকে কথা বের করা যাবে না।’ বলল হের বোরম্যান। ‘কি করব এটা গোল্ড ওয়াটারের অনুরোধ। ডাঃ মার্গারেটের আব্বা এবং আমাদের গোল্ড ওয়াটার পরষ্পর পরিচিত ছিলেন। মার্গারেটের আব্বা বৃটিশ নৌবাহিনীতে থাকাকালে একবার এক বিপন্ন অবস্থা থেকে গোল্ড ওয়াটারকে বাঁচিয়েছিলেন।’ বলল ফার্ডিন্যান্ড। ‘কিন্তু স্যার তাকে মানসিক চাপ দিয়ে কথা আদায়ের সকল প্রচেষ্টা বলা যায় ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিটের সবচেয়ে দক্ষ মিঃ বেভান এবং হায়েনার মত ক্রুর ও শৃগালের মত চালাক মিস মার্টিনা তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় একটা কথাও আদায় করতে পারেনি।’ ‘পরিবেশটা কি সৃষ্টি করেছিলে?’ ‘স্যার তাকে তিন দিন থেকে ঘুমুতে দেয়া হয়নি। সর্বক্ষণ চোখ ধাঁধানো আলোর মধ্যে রাখা হয়েছে। তার সাথে হৃদয় মুচড়ে দেয়ার মত অব্যাহত শব্দের নিরন্তর আক্রমণ। মানসিক প্রতিরোধ তার নষ্ট হয়ে যাবার কথা। এরপরও কিন্তু এর কাছ থেকে একটা কথাও বের হয়নি।’ ‘চল আমি তার সাথে কথা বলব। তারপর সিদ্ধান্ত নেব কি করা যায়।’ বলেই ফার্ডিন্যান্ড উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল হের বোরম্যান এবং পল। ডাঃ মার্গারেটকে রাখা হয়েছে অফিস বিল্ডিং-এর নিচ তলায় একটি কক্ষে। হোয়াইট ঈগলের বন্দীখানাটা কলম্বাস দ্বীপের পাশেই ককবার্স দ্বীপে। সানসালভাদর শহরটা কয়েকটা দ্বীপের সমষ্টি। ডাঃ মার্গারেটকে হোয়াইট ঈগলের বন্দীখানায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। এটাও গোল্ড ওয়াটারের পরামর্শেই। গোল্ড ওয়াটারের পরামর্শ হলো, মেয়ে মানুষ তার উপর বয়স কম। কোন কৃমিনালও নয়। সুতরাং তার কাছ থেকে কথা বের করা কোন ব্যাপার নয়। বন্দী খানায় রাখার দরকার নেই।’ অফিস বিল্ডিং এবং ফার্ডিন্যান্ডের বাড়ি পাশাপাশি গায়ে গায়ে লাগানো। কিন্তু অফিস বিল্ডিংটা কলম্বাস কমপ্লেক্সের অংশ। আর ফার্ডিন্যান্ডের বাড়ি কমপ্লেক্সের বাইরে। ফার্ডিন্যান্ডের বাড়ি তিন তলা। ফার্ডিন্যান্ডের বাড়ির তিন তলা ও অফিস বিল্ডিং এর তিন তলা একটা করিডোর দিয়ে সংযুক্ত। করিডোরটি ছয়ফুট দীর্ঘ একটা ফোল্ডিং ব্রীজ। ফোল্ড (F) সুইচ টিপলে করিডোরটি প্রসারিত হয়ে দুই বিল্ডিং-এর মধ্যে একটা ব্রীজে পরিণত হয়। আর আনফোল্ড (UF) সুইচ টিপলে মুহূর্তে ব্রীজটি সরে যায়। ফার্ডিন্যান্ড এই পথেই অফিসে যাতায়াত করেন। অফিস বিল্ডিংটা দক্ষিণমুখী। আর ফার্ডিন্যান্ডের বাড়ি পূর্বমুখী। ফার্ডিন্যান্ডের বাড়ির উত্তরের জানালায় দাঁড়ালে অফিস বিল্ডিং-এর প্রধান গেট ও তার সামনের চত্বরটি পরিষ্কার দেখা যায়। ফার্ডিন্যান্ড এগুচ্ছিল সেই ফোল্ডিং ব্রীজটার দিকে। আগে আগে চলছিল ফার্ডিন্যান্ড। আর পেছনে একটু দুরত্ব নিয়ে হাঁটছিল হের বোরম্যান ও পল পাশাপাশি। ‘পল, যে মানসিক চাপ আমরা দিচ্ছি তাতে মার্গারেটের কিছুই হবে না।’ বলল বোরম্যান অনেকটা ফিসফিসিয়ে। ‘একজন সাধারণ মেয়ে মানুষ এত শক্ত?’ ‘সাধারণ কোথায় দেখলেন?’ ‘না। সাধারণ এই অর্থে যে, তিনি কোন ক্রিমিনাল নন এবং গোয়েন্দাও নন।’ ‘তা হয়তো নয়, কিন্তু মেয়েটির নার্ভ আমাকে চমকে দিয়েছে। বুঝতে পারছি না তার এ মানসিক শক্তির উৎস কি?’ ‘কিন্তু তার তথ্যে যা পাওয়া গেছে, তাতে সে একজন সাধারণ ডাক্তার মাত্র। কিন্তু একজন সাধারণ মহিলা ডাক্তার এই অসাধারণ শক্তি পেল কোত্থেকে?’ ‘আসলে এ ধরনের মেয়েরা যে মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে, সে চাপ আমরা দিতে পারিনি?’ ‘সেটা কি?’ ‘এ ধরনের নীতি বাগীশ মেয়েরা খুব বেশি স্পর্শ কাতর হয় তাদের সতিত্ব নিয়ে। আমরা তার মনের এই দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে পারিনি।’ ‘বসকে বলেননি?’ ‘বলেছি। কিন্তু তিনি গোল্ড ওয়াটারের অসন্তুষ্টির ভয় করছেন।’ ‘জানলে তবে তো তিনি অসন্তুষ্ট হবেন। জানবেন কি করে? নষ্ট হওয়ার আগে মেয়েদের যতই সুচিবাই থাকুক, নষ্ট হওয়ার পর এই ধরনের মেয়েরা বিষয়টা চেপে যায়। গোল্ড ওয়াটার কিছুই জানতে পারবে না।’ ‘দেখা যাক, বস আজ কি করেন?’ বলল হের বোরম্যান। সেই সংযোগ ব্রীজ পেরিয়ে সবাই এল অফিসের নিচ তলায়। তিন তলা থেকে লিফট নয় সিঁড়ি দিয়ে নামল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে দক্ষিণ দিকে এগুলে অফিস থেকে বের হবার প্রধান গেট। কিন্তু গেটটি এখন বন্ধ। পুরু ষ্টিল-প্লেটের দেয়াল দিয়ে স্থায়ীভাবেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তার বদলে গেট সোজা বাইরে থেকে একটা প্রশস্ত সিঁড়ি উঠে তেতলার সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর সাথে যুক্ত হয়েছে। এই সিঁড়ি পথেই এখন হোয়াইট ঈগলের অফিসে ঢুকতে হয়। দোতলা তিনতলা এখন অফিসের কাজে ব্যবহার করা হয়। এক তলাটি ষ্টোর ও বিভিন্ন গোপন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। দোতলা থেকে নিচ তলায় নামার সিঁড়ি মুখ তালাবন্ধ ফোল্ডিং গেট দ্বারা বন্ধ। এক তলায় নেমে উত্তর দিকে এগুলে প্রায় পনের ফিট পরেই অফিসের মাঝ বরাবর দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে একটা প্রশস্ত করিডোর। দু’পাশে বন্ধ ঘর। করিডোর দিয়ে পশ্চিম দিকে এগুলে অল্প পরেই উত্তরে আরেকটা করিডোর। দক্ষিণ মুখী করিডোরের মুখে দু’জন প্রহরী। হাতে তাদের ষ্টেনগান। ফার্ডিন্যান্ডদের দেখেই একটা স্যালুট দিয়ে দু’পাশে সরে দাঁড়াল। ফার্ডিন্যান্ডরা এ করিডোরে পশ্চিমের একটা দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজাটা ষ্টিলের। দরজার মাথা বরাবর উঁচুতে একটা ‘কী বোর্ড’। আলফাবেটিক্যাল ‘কী বোর্ড’-এর অর্থ দরজাটা তালাবদ্ধ। ফার্ডিন্যান্ড দরজার সামনে দাঁড়াতেই হের বোরম্যান এগিয়ে গেল এবং কী বোর্ডের কয়েকটা আলফাবেট ডিজিটের উপর আঙুলে টোকা দিল। জ্বলজ্বলে লাল কিছুটা নীল বিন্দুতে রুপান্তরিত হলো। খুলে গেল দরজা। চোখ ধাঁধানো উৎকট আলোর প্রবল ধাক্কা এসে সবার চোখকে আহত করল। সে সাথে বুকে স্পন্দন তোলা এক ঘেয়ে শব্দের গোঙানী এসে কানে ঢুকল। ঘরটির নগ্ন মেঝে। শোবার কোন ব্যবস্থা নেই। বসার কোন চেয়ারও নেই। মার্গারেটের পরনে একটা পাতলা নাইট গাউন। আর কিছু নেই। এভাবেই তাকে ধরে এনেছিল। দরজা খুলে যাবার পরপরই হের বোরম্যান পকেট থেকে রিমোর্ট কনট্রোল বের করে দু’টো সুইচ অফ করল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ ধাঁধানো আলো এবং শব্দ থেমে গেল। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল ডাঃ মার্গারেট। দরজা খোলার শব্দে সে উঠে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। তার চোখ দু’টি রক্তের মত লাল। আলো ও শব্দ অফ হবার সাথে সাথে ডাঃ মার্গারেট ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। যেন আলো ও শব্দই তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। ঘরে প্রবেশ করল ফার্ডিন্যান্ড, হের বোরম্যান ও পল। ঘরে তখন জ্বলে উঠেছে হালকা নীল রঙের এক প্রশান্ত কিন্তু রহস্যময় আলো। প্রহরীরা ইতিমধ্যেই তিনটি চেয়ার এনেছে ঘরে। ফার্ডিন্যান্ড, বোরম্যান ও পলের জন্যে। ডাঃ মার্গারেটের দেহটা মাটির উপর এলিয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে সে উঠে বসল। ফার্ডিন্যান্ড চেয়ারে বসতে বসতে বোরম্যানকে বলল, ‘আরেকটা চেয়ার আনতে বল।’ চেয়ার আরেকটা এল। চেয়ারটা প্রহরী রাখল মার্গারেটের কাছে। ফার্ডিন্যান্ড মার্গারেটের দিকে চেয়ে বলল, ‘বসুন, আপনি চেয়ারটায়।’ মার্গারেট চেয়ারে ভর দিয়ে দুর্বল দেহটা উপরে তুলে চেয়ারে বসল। ‘স্যরি ডাঃ মার্গারেট আপনি আপনার উপর অবিচার করছেন, আমাদের কোন দোষ নেই।’ বলল ফার্ডিন্যান্ড। মার্গারেট কোন উত্তর দিল না। যেমন ছিল তেমনিভাবে মাথা নিচু করে থাকল। ‘ডাঃ মার্গারেট, আমরা এক দেশের, আমরা এক জাতির। আপনার সাথে আমাদের কোন শত্রুতা নেই। আপনি আমাদের সহযোগিতা করলে সে সহযোগিতা দেশকে এবং জাতিকেই করা হবে।’ নরম কণ্ঠে বলল ফার্ডিন্যান্ড। ‘কিন্তু যে সহযোগিতা আপনারা চান, সেটা আমার বিষয় নয়।’ দুর্বল কণ্ঠে বলল মার্গারেট। ‘ডাঃ ওয়াভেলের বাসা থেকে যে এশীয়টি প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্টগুলো ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তাকে আপনি চেনেন? তার পরিচয় ও ঠিকানা আমরা জানতে চাই।’ বারবার এ উত্তর আমি দিয়েছি। ঐ ঘটনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমার পক্ষে কিছুই বলা সম্ভব নয়।’ ‘প্যাথোলজিক্যাল টেষ্ট করানোর ব্যাপারে আপনার বিশেষ ভূমিকা ছিল।’ বলল ফার্ডিন্যান্ড। ‘সেটা ডাক্তার হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল।’ ‘সেই এশিয়ানকে আপনি চেনেন। আপনি আহত অবস্থায় হাসপাতালে ছিলেন যখন, তখন সেই এশিয়ান হাসপাতালে আপনার সাথে দেখা করতে যায়।’ ‘সে জর্জের বন্ধু। সে নির্দোষ।’ ‘আমরা তার ঠিকানা চাই।’ ‘সে এখন কোথায় আমি জানি না।’ ‘দেখুন আপনি উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন।’ ‘আমাকে মাফ করবেন। আমার কাছে আপনারা অবাস্তব দাবী করছেন।’ ‘দেখুন আপনি সহযোগিতা না করলে জর্জকেও এখানে আমরা ধরে আনব।’ ভীষণ চমকে উঠল মার্গারেট। তার ভেতরটা থর থর করে কেঁপে উঠল। জর্জকে পেলে মেরেই ফেলবে ওরা। তার উপর আমি বলেছি এশীয়টি জর্জের বন্ধু। কেন বললাম? ‘জর্জের কি দোষ?’ শুকনো ও ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। ‘আপনার যে দোষ, সে দোষ তারও। এক সাথেই দু’জনকে আমরা দেখাব, দেশদ্রোহিতা জাতিদ্রোহিতার কি সাজা!’ ‘আমরা দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে কিছুই করিনি। কোন অপরাধ আমাদের নেই।’ ‘দুঃখিত ডাঃ মার্গারেট, আমরা ভদ্র আচরণ করেছিলাম। আপনি তার মূল্য দিচ্ছেন না। নিজের জীবন কিন্তু আপনি নিজেই বিপন্ন করছেন।’ শক্ত কণ্ঠে বলল ফার্ডিন্যান্ড। ‘বাঁচব সে আশা করছি না। অতএব জীবনের ভয় দেখিয়ে আর লাভ কি?’ ‘মৃত্যুর আগেও আরও অনেক ধরনের মৃত্যু আছে ডাঃ মার্গারেট। আমাদেরকে আপনি সেদিকে যেতেই বাধ্য করছেন।’ বলে ফার্ডিন্যান্ড একটু থামল। এরপর বলল, ‘শুনুন মিস মার্গারেট, এশীয় লোকটির নাম ঠিকানা আমরা জানতে চাই। কি করে হোয়াইট ঈগলের গোপন কাজের খবর টিভি ও নিউজ এজেন্সীতে গেল তা আমরা পরিষ্কার জানতে চাই। আজকের দিনটুকুই সময়। এর মধ্যে আপনি সিদ্ধান্ত নিন। সন্ধ্যে সাতটায় আমি আসব। তখন যদি সব কথা আপনার কাছ থেকে না পাই, তাহলে আপনার এক মৃত্যু আসবে। সে মৃত্যু আপনার প্রাণের মৃত্যু নয়, এক ধরনের দৈহিক মৃত্যু। এক ক্ষুধার্ত পুরুষের হাতে আপনাকে ছেড়ে দেয়া হবে। সে পুরাতন মার্গারেটের মৃত্যু ঘটিয়ে নতুন এক ধর্ষিতা মার্গারেটের জন্ম দেবে। এই মৃত্যু আপনার প্রতিরাতেই ঘটবে, যতদিন না আপনি মুখ খোলেন।’ বলেই ফার্ডিন্যান্ড উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে গেল তার ঘর থেকে। ডাঃ মার্গারেটের হৃদয়ে ফার্ডিন্যান্ডের কথাগুলো বজ্রের আঘাতের মত তীব্র হয়ে প্রবেশ করল। অসহনীয় এক যন্ত্রণায় দেহের প্রতিটি তন্ত্রী যেন তার চিৎকার করে উঠল। কিছু বলতে চাইলে সে ফার্ডিন্যান্ডকে, কিন্তু শুকনো আড়ষ্ট জিহ্বা এক বিন্দুও নড়ল না। কাঠ হয়ে যাওয়া গলা থেকে একটু স্বরও বেরুল না। তার বিস্ফোরিত চোখের সামনে ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জ্বলে উঠল সেই চোখ দগ্ধকারী আলো এবং বেজে উঠল হৃদয় কাঁপানো সেই অব্যাহত শব্দ। আছড়ে পড়ল ডাঃ মার্গারেট মেঝের উপর। তার কাছে ঐ চোখ ঝলসানো আলো এবং হৃদয় কাঁপানো শব্দ এখন কিছুই মনে হচ্ছে না। মন বলছে, এই আলো আগুন হয়ে জ্বলে উঠে তার দেহকে পুড়িয়ে ছাই করে দিক এবং শব্দ ভয়ংকর হয়ে উঠে তার কান ফাটিয়ে দিক, তবু যদি বাঁচা যায় দেহের ঐ ভয়াবহ মৃত্যু থেকে। সন্ধ্যে তো বেশি দূরে নয়! বিদ্যুতে শক খাওয়ার মত দেহটা তার কেঁপে উঠল। তার মনে হচ্ছে, এক ক্ষুধার্ত হায়েনা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সকল সম্পদ লুটেপুটে নিচ্ছে, তার সত্তাকে ছিন্ন-ভিন্ন করছে এবং তাকে একটি জীবন্ত লাশে পরিনত করছে। সে হাজার মৃত্যুর যন্ত্রণা সহ্য করতে রাজি আছে, কিন্তু এ মৃত্যু সে সইতে পারবে না। গোটা জগতের বিনিময় দিয়ে হলেও এই মৃত্যু থেকে সে বাঁচতে চায়। সে কি তাহলে বলে দেবে আহমদ মুসার নাম এবং তার সব তথ্য যা সে জানে? আহমদ মুসার কথা মনে হতেই চোখ ফেটে অশ্রুর ঢল নামল মার্গারেটের। না না, সে আহমদ মুসার নাম বা তার সম্পর্কে কোন তথ্যই এদের দিতে পারবে না। যে লোক কোনও স্বার্থ ছাড়াই আত্মীয় নয়, স্বজন নয় এমন লোকদের সাহায্যের জন্যে ছুটে এসেছে, নিজের জীবন বিপন্ন করে তাদের জন্যে কাজ করছে, ইতিমধ্যেই যে আহত হয়েছে কয়েকবার এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে বারবার এবং যার আগমনের সাথে সাথে সৌভাগ্যের সূর্যোদয় ঘটেছে মজলুম ক্যারিবিয়ানদের জীবনে, সেই আহমদ মুসার কথা সে এদের বলতে পারবে না। কিন্তু তার পরিনতি কি হবে। সে তো তার জীবনের সবকিছু হারাবে, একটা সজীব দেহের খোলস ছাড়া তো তার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এই জীবন নিয়ে বাঁচবে কি করে সে! গোটা দেহ মন তার আর্তনাদ করে উঠল। গোটা পৃথিবী এবং তার মৃত্যুর বিনিময়েও সে এই পরিনতি থেকে বাঁচতে চায়। এক আহমদ মুসা কি এই গোটা পৃথিবী এবং তার জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেল? আহমদ মুসা তার কে? কিন্তু এই প্রশ্ন উচ্চারণ করতে গিয়ে কেঁপে উঠল তার হৃদয়। হৃদয়ের কোন দরজা যেন খুলে গেল। ভীষণভাবে চমকে উঠল ডাঃ মার্গারেট। একি দৃশ্য সেখানে! হৃদয়ের সে গহীনে আহমদ মুসা যে তার জীবন ও তার পৃথিবীর চেয়ে বড় আসন নিয়ে বসে আছে। হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে যে সে সমাসীন! সবটা হৃদয় উপচে একটাই সুর জেগে উঠল, আহমদ মুসার জন্যে কোন ত্যাগই তার কাছে বড় নয়, কোন পরিণতিই তাকে পিছপা করতে পারে না। নিজেকে এইভাবে আবিষ্কার করে আঁৎকে উঠল মার্গারেট। কি অন্যায় করে সে বসে আছে! ও জানতে পারলে নিশ্চয় তাকে অন্ধ, অবিবেচক ও জঘন্য চরিত্রের বলে মনে করবে। সত্যিই সে সব জেনেও অন্ধের মত কাজ করেছে। কিন্তু কি দোষ তার! সজ্ঞানে তো আমি এমনটা কখনো চিন্তা করিনি। চোখ থেকে নেমে আসা অবিরল ধারার অশ্রু মুছে ফেলল মার্গারেট। হঠাৎ তার মনের ভয়গুলো যেন কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে। তার নিজের আর কিছুই নেই, তাই কিছু হারাবার ভয়ও নেই। তার সামনে আর কোন চাওয়া নেই, তাই আর কিছু পাওয়ারও প্রশ্ন নেই। কোন অদৃশ্য লোক থেকে যেন একটা প্রশান্তির হাওয়া নেমে এল তার হৃদয় জুড়ে। আহমদ মুসার জন্যে সে সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, এর চেয়ে বড় সাফল্য তার আর কি হতে পারে! নতুন ধরনের এক কান্না নেমে এল তার দু’চোখ জুড়ে। এ যেন আপনার চেয়ে আপন যিনি, তার জন্যে সব হারানোর প্রশান্তি। দু’হাতে চোখ চেপে উপুড় হয়ে পড়ে মেঝেতে মুখ গুজেছে মার্গারেট। যেন সে লুকাতে চায় তার একান্ত আপনার এ কান্না। কিন্তু তার এ কান্না দেখার তো কেউ নেই ঘরের চার দেয়াল ছাড়া। বাহামার সানসালভাদর। সানসালভাদরের কলম্বাস বিমান বন্দরে ল্যান্ড করল আহমদ মুসা। বিমানের সিঁড়ি থেমে সামনে তাকাতেই ছোট আকারের দোতলা টারমিনালের উপর দিয়ে দেখতে পেল কলম্বাস মনুমেন্ট। কলম্বাস মনুমেন্টটি কলম্বাস নৌবন্দরের প্রবেশ মুখে। মনুমেন্ট পেরিয়ে সমুদ্র যাত্রার জন্যে নৌবন্দরে প্রবেশ করতে হয়। কলম্বাস নৌবন্দরের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে কলম্বাস বিমান বন্দর। বিমান বন্দর থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। তার মুখে ইহুদী বারবীদের মত দাঁড়ি। মাথায় বারবীদের মতই পেয়ালা মার্কা টুপি। তাকে একবার দেখেই যে কেউ বলবে ইসরাইলের একজন তরুণ বারবী এসেছে কলম্বাসের স্মৃতি বিজড়িত সানসালভাদরে বেড়াতে। আহমদ মুসার দরকার একজন ভাল ট্যাক্সিওয়ালা। এখন তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘দি ব্লু বার্ড’ এয়ারলাইন্সের ঠিকানা। এয়ারপোর্টের কাউন্টারে এটা সে জিজ্ঞেস করতে পারতো। কিন্তু নিরাপদ মনে করেনি আহমদ মুসা। হোয়াইট ঈগল-এর জাল এ ছোট্ট বিমান বন্দরে কতটা বিস্তৃত এবং কে তাদের সাথে আর কে নেই তার কিছুই সে জানে না। জিজ্ঞেস করতে গিয়ে হঠাৎ সে তাদের চোখে পড়ে যেতে পারে। সে চায়না মার্গারেটের দেখা পাওয়ার আগে তাকে শত্রু শিবির চিনে ফেলুক। আহমদ মুসা টারমিনালের বাইরে গিয়ে হাতের ব্যাগটা মাটিতে রেখে ট্যাক্সি ষ্ট্যান্ডের দিকে তাকাতেই ট্যাক্সি ষ্ট্যান্ড থেকে একজন লোক এগিয়ে এল। আহমদ মুসার সামনে এসে বলল, ‘গাড়ি লাগবে স্যার?’ ‘হ্যাঁ। তুমি ‘দি ব্লু বার্ড’ এয়ার লাইন্স-এর অফিস চেন?’ ‘ওটা তো এয়ারলাইন্স নয় স্যার, একটা এয়ার কোম্পানী। কোন লাইনে ওরা যাতায়াত করে না, কোন যাত্রীও বহন করে না, সাধারণ কোন কার্গো ক্যারিয়ারও নয়। আমার মনে হয় রিজার্ভ ক্যারিয়ার হিসাবে কাজ করে। যে নেয় গোটা বিমান ভাড়া নেয়।’ আহমদ মুসার কাছে এ তথ্যগুলো খুবই মূল্যবান। কিন্তু এ বিষয়ে কোন কথা বলল না। জিজ্ঞেস করল ‘দি ব্লু বার্ড’-এর অফিস কোথায় কতদূর?’ ‘বেশি দূরে নয়, কলম্বাস কমপ্লেক্সের ওপাশে।’ বলল ট্যাক্সির লোকটি। ‘তাহলে চল।’ বলে আহমদ মুসা ব্যাগটি হাতে তুলে নিল। ‘স্যার কি বিমান ভাড়া-টাড়া নেবেন?’ বলল হাঁটতে হাঁটতে ট্যাক্সির লোকটি। ‘দেখি ওদের সাথে বনিবনা কেমন হয়।’ বলল আহমদ মুসা। তারা গাড়িতে উঠল। গাড়ি চলতে শুরু করলে আহমদ মুসা বলল, ‘দেশে শান্তি কেমন আছে, কোন গন্ডগোল নেই তো?’ আহমদ মুসা একটু টোকা দিয়ে তার দৃষ্টি ভংগি জানতে চাইল। ‘না স্যার কোন অসুবিধা নেই। তবে অশ্বেতাংগ বিদেশীরা থাকতে চাইলেই অসুবিধা।’ বলল লোকটি। লোকটিও অশ্বেতাগং, মিশ্র শ্রেণীর। ‘কেমন অসুবিধা?’ ‘তাদের থাকতে দেয়া হচ্ছে না।’ ‘নাগরিকত্ব নিয়ে থাকতে চাইলেও?’ ‘ক’বছর আগেও অশ্বেতাংগদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। এখন একদম বন্ধ।’ ‘কেন?’ ‘জানি না। তবে শোনা যায়, অশ্বেতাংগদের সংখ্যা আর বাড়তে দেয়া হবে না। অন্যদিকে স্যার, শ্বেতাংগদের সংখ্যা বাড়াবার জন্যে ¯্রােতের মত শ্বেতাংগদের নিয়ে আসা হচ্ছে।’ ‘কেন, এর প্রতিবাদ হয় না? অশ্বেতাংগরা তো এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।’ ‘স্যার এসব হচ্ছে আইন করে নয়, বেআইনি ভাবে। শ্বেতাংগদের নিয়ন্ত্রণে সরকার। আইনের লোকেরা চোখের আড়ালে বেআইনি কাজ করে যাচ্ছে, ধরবে কে?’ ‘আচ্ছা এই ‘দি ব্লু বার্ড’ এয়ার লাইন্সটা কাদের?’ ‘আমি জানি না স্যার। তবে এদের অফিসটা কলম্বাস কমপ্লেক্সে ছিল। স্থান সংকটের কারনে নতুন জায়গায় অফিস নিয়েছে। স্যার, যারা কলম্বাস কমপ্লেক্সে জায়গা পায় তারা খাস শ্বেতাংগ।’ ‘ধন্যবাদ। তোমার নাম কি?’ ‘জন কার্লোস।’ ‘তুমি খৃষ্টান?’ ‘আমার আব্বা খৃষ্টান ছিলেন। মা খৃষ্টান ছিলেন না।’ ‘তুমি?’ ‘মন খারাপ হলে মাঝে মাঝে গীর্জায় যাই স্যার।’ মিনিট দশেকের মধ্যেই এসে পৌছল তারা ‘দি ব্লু বার্ড’ অফিসের সামনে। রাস্তার উপর গাড়ি দাঁড় করাল কার্লোস। রাস্তার পরে ছোট্ট একটা প্রাঙ্গন। প্রাঙ্গনের পরেই তিন তলা একটা বিল্ডিং। বিল্ডিং-এ ঢোকার গেট মুখে একটা সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘দি ব্লু বার্ড লিমিটেড’। তার নিচে লেখা একটা অভিজাত প্রাইভেট এয়ার কোম্পানী।’ ড্রাইভার কার্লোস ঘুরে এসে আহমদ মুসাকে নামার জন্যে গাড়ির দরজা খুলে ধরে বলল, ‘স্যার আমি কি অপেক্ষা করব?’ ‘কিছুটা সময় দেখতে পার, দেরী হলে চলে যেয়ো।’ বলে আহমদ মুসা পঞ্চাশ বাহামা ডলারের একটা নোট তুলে দিল কার্লোসের হাতে। কার্লোস নোটটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার আমার কাছে তো ভাঙতি নেই।’ ‘নোটটা তো তোমাকে ভাঙাবার জন্যে দেইনি কার্লোস।’ কার্লোস বিস্ময়ের সাথে বলল, ‘স্যার, ভাড়া মাত্র ২০ ডলার, আপনি দিয়েছেন ৫০ ডলার।’ ‘যা ভাড়া হওয়া উচিত, তাই তোমাকে দিয়েছি।’ ‘পোর্টরিকো কিংবা ফেøারিডার হিসাবে ধরলে ঠিক বলেছেন।’ বলতে বলতে লজ্জা ও সংকোচের সাথে নোটটা কার্লোস পকেটে রাখল। আহমদ মুসা অফিসের দিকে হাঁটা শুরু করল। অফিসের বারান্দা বেশ উঁচু। বড় বড় তিনটি সিঁড়ি পেরিয়ে বারান্দায় উঠা যায়। অফিস বিল্ডিংটির দু’পাশের অংশ বারান্দার সিঁড়ির সমান্তরাল। আর প্রশস্ত অর্ধ চন্দ্রকার বারান্দাটি বিল্ডিং-এর পেট থেকে অনেকখানি জায়গা নিয়ে নিয়েছে। আহমদ মুসা বারান্দায় উঠে দেখতে পেল ভেতরে ঢোকার দরজা কাঁচের। আহমদ মুসা কাঁচের দরজা টেনে ভেতরে প্রবেশ করল। দরজার পরে একটা প্রশস্ত ঘর। ঘরের ঠিক মাঝখানে বসে আছে টেবিল-চেয়ার নিয়ে একজন। তার টেবিলে রয়েছে একটা টেলিফোন, একটা রেজিষ্টার বুক, একটা কলমদানি এবং কিছু কাগজপত্র পেপার ওয়েট দিয়ে চাপা দেয়া। আহমদ মুসা বুঝল লোকটি রিসেপশনিষ্ট। বয়সে যুবক। আহমদ মুসা ঢুকতেই রিসেপশনিষ্ট যুবক বলল, ‘এদিকে আসুন, কি চাই আপনার?’ আহমদ মুসা তার দিকে এগিয়ে বলল, ‘স্যাররা কেউ আছেন?’ ‘চেয়ারম্যান, ডিরেক্টর সবাই আছেন। কাকে চান?’ ‘চেয়ারম্যান।’ রিসেপশনিষ্ট টেলিফোন হাতে তুলে নিতে নিতে বলল, ‘কি কাজে দেখা করতে চান?’ ‘এয়ার লাইন্স নিয়ে।’ রিসেপশনিষ্ট কথা বলল টেলিফোনে। টেলিফোন রেখে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন।’ কিন্তু এক ধাপ এগিয়েই ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘একটু দাঁড়ান বাইরের দরজাটা লক করি।’ বলে সে টেলিফোনের পাশ থেকে ছোট রিমোর্ট কনট্রোল টেনে নিয়ে একটা বোতামে চাপ দিল। আহমদ মুসা বুঝল, দরজাটা রিমোর্ট কনট্রোলের অধীন। এদের সবকিছুই কি তাহলে এ ধরনের রিমোর্ট কনট্রোলের মত সর্বাধুনিক ব্যবস্থার অধীন? রিসেপশনিষ্ট হাঁটতে শুরু করেছে। আহমদ মুসা তার পেছনে পেছনে চলল। দু’তলায় উত্তর-পূর্বের একেবারে প্রান্তের একটা দরজার সামনে দাঁড়াল রিসেশনিষ্ট। নক করল সে দরজায়। তারপর প্রবেশ করল চেয়ারম্যানের পি,এ এর কক্ষে। পি,এ এর কক্ষে পৌছে দিয়েই রিসেপশনিষ্ট ফিরে গেল। পি,এ একজন শ্বেতাংগ তরুণী। আহমদ মুসাকে বসতে বলেই সে ইন্টারকমে বলল, ‘স্যার ভিজিটর এসেছেন।’ ‘আচ্ছা, পাঠিয়ে দাও।’ পি,এ তরুণীটি উঠে পাশের দরজাটা খুলে ধরে বলল, ‘যান ভেতরে স্যার।’ আহমদ মুসা প্রবেশ করল। দেখল, ঘরের প্রায় মাঝ বরাবর একটা সুদৃশ্য টেবিলের ওপাশে একটা রিভলভিং চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে একজন মাঝ বয়সী শ্বেতাংগ। বলিষ্ঠ চোয়াল, তীক্ষè চোখ লোকটির। মুখ দেখেই বুঝা যায়, শরীরে একটুকুও মেদ নেই। খেলোয়াড় কিংবা সেনাবাহিনীর লোক হলে তাকে মানাতো ভাল। লোকটি আহমদ মুসাকে দেখেই চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। সামনে টেবিলের ওপাশে চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল। ধন্যবাদ জানিয়ে আহমদ মুসা বসল। ‘বলুন, কি প্রয়োজন আপনার?’ তীক্ষè দৃষ্টি লোকটির চোখে। ‘আমি ‘বাহামা এয়ার’ অফিসে গিয়েছিলাম জানার জন্যে যে ওদের ‘চাটার্ড সিষ্টেম’ আছে কিনা। তারা দুঃখ প্রকাশ করে আপনাদের কথা বলল। সে জন্যে এসেছি।’ লোকটির চোখে বিস্ময়। বলল, ‘কি চাই আপনার?’ ‘এখান থেকে পোর্টেরিকা, এখান থেকে গ্রান্ড টার্কস, এইসব দূরত্বের ভাড়া কত? শুনলাম গতকাল আপনাদের একটা বিমান কারা যেন গ্রান্ড টার্কসে নিয়ে গিয়েছিল। ভাড়া কত ছিল?’ লোকটির প্রতিক্রিয়া জানা এবং তাকে স্বরূপে বের করে আনার জন্যেই আহমদ মুসা শেষ বাক্যটা বলল। আহমদ মুসার শেষ কথা শোনার সংগে সংগেই লোকটির চোখ চঞ্চল হয়ে উঠল। বলল, ‘গ্রান্ড টার্কস-এ যাওয়ার তথ্যও কি ওরাই দিয়েছে?’ ‘হ্যাঁ, আমি এয়ারপোর্ট থেকেই শুনেছি।’ ‘আর কি শুনেছেন? আমরা কখন কি নিয়ে ফিরলাম তা বলেনি?’ লোকটির ঠোঁটে বাঁকা হাসি। তার চোখের দৃষ্টি শক্ত। চমকে উঠল আহমদ মুসা। লোকটি তাকে সন্দেহ করেছে। আহমদ মুসার চিন্তা আর সামনে এগুতে পারল না। পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে ফিরে তাকাল। দেখল উদ্যত রিভলবার হাতে দু’জন যুবক তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সামনে তাকাল আহমদ মুসা। দেখল চেয়ারে বসা লোকটির হাতেও রিভলবার। তার বুক বরাবর তাক করা। আহমদ মুসা ফিরে তার দিকে তাকাতেই হো হো করে হেসে উঠল লোকটি। শিকারকে জালে আটকানোর তৃপ্তির হাসি এটা। বলল লোকটি, ‘দেখ তোমার সাজানো কথা খুবই কাঁচা ধরনের হয়েছে। সত্যি তুমি বিমান বন্দরে খোঁজ নিলে এই কথা বলতে পারতে না। এয়ার পোর্টের কাউন্টার ক্রু থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল সবাই জানে ‘দি ব্লু বার্ড’ শুধু প্রাইভেট নয়, একেবারে পার্সেনাল। কখনই ভাড়া খাটে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের বিমান যে গ্রান্ড টার্কস-এ গেছে, তা বিমান বন্দরের একজনও জানে না। সুতরাং তুমি মিথ্যা কাহিনী সাজিয়েছ।’ বলে একটু থামল। থেমেই আবার মুখ খুলল। কঠোর কণ্ঠে বলল, ‘কে তুমি?’ আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘আর এ কথা জিজ্ঞাসার কি প্রয়োজন আছে? আমি কে না জেনেই কি আপনারা রিভলবার বের করেছেন?’ লোকটি টেবিলে এক প্রচন্ড মুষ্ঠাঘাত করল। বলল, ‘ঠিক বলেছ।’ তারপর আহমদ মুসার পেছনে দাঁড়ানো রিভলবারধারীদের একজনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এই একে বেঁধে ফেল।’ লোকটি রিভলবারটি পকেটে পুরে প্রথমে আহমদ মুসার দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধল, তারপর দু’পা। আহমদ মুসা যেভাবে চেয়ারে বসেছিল, ঐভাবেই বসে থাকল। সামনে বসা সেই মাঝ বয়সী লোকটি তার হাতের রিভলবার টেবিলে রেখে তার মোবাইল টেলিফোনটি টেনে নিল। বলল, ‘মিঃ ফার্ডিন্যান্ডকে ব্যাপারটা জানাই।’ ‘ফার্ডিন্যান্ড কে?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। ‘তোমার বাপ।’ মুখ বাঁকা করে বলল লোকটি। টেলিফোন সংযোগের পর বলল লোকটি, ‘স্যার আমাদের অফিসে একজন লোক ধরা পড়েছে।’ তারপর গোটা বিবরণ দিয়ে বলল, ‘লোকটি ইহুদী বেহারার স্যার। কোন কিছুর গোপন অনুসন্ধানে এসেছে বলে মনে হয়।’ ‘আপনার ওখানে পাঠাব স্যার?’ ‘বুঝেছি স্যার। ওখানে ঝামেলা বাড়িয়ে কাজ নেই।’ ‘ঠিক স্যার। এসব চুনোপুঁটির দায়িত্ব আমরা নিতে পারি।’ ‘নিকেশ করে ফেলব?’ ‘ঠিক আছে। আমরা কিছু কথা বের করার চেষ্টা করি। কিছু আদায় করে আপনাকে জানিয়ে তারপর আমরা যা করার সেটা করব স্যার।’ ‘ধন্যবাদ স্যার।’ টেলিফোন রেখে দিল লোকটি। আহমদ মুসা ফার্ডিন্যান্ড নামক লোকটির টেলিফোন নাম্বারটি মনে মনে বার বার আওড়িয়ে মুখস্থ করছিল। মোবাইলে লোকটির আঙুলের মুভমেন্ট দেখেই টেলিফোন নম্বারটি ঠিক করে নিয়েছিল। আহমদ মুসা টেলিফোনের ওপারের কথা শুনতে পায়নি বটে, কিন্তু লোকটির কথাগুলো থেকে গোটা ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে আহমদ মুসা। তাকে চুনোপুঁটি বিবেচনা করে তাকে এখানেই শেষ করার দায়িত্ব ফার্ডিন্যান্ড এদের হাতে দিয়েছে। তার আগে এরা তার পরিচয় ও তার কাছ থেকে কথা আদায়ের চেষ্টা করবে। খুশী হলো আহমদ মুসা। বন্দী হওয়ার ক্ষতির মধ্যে বড় লাভ এই হবে যে, মার্গারেটকে ওরা কোথায় বন্দী করে রেখেছে তা জানার একটা পথ হবে। ফার্ডিন্যান্ড কে? তার টেলিফোন নম্বার পেয়েছে। কিন্তু মোবাইল টেলিফোন নম্বার থেকে ঠিকানা বের করা কঠিন। ফার্ডিন্যান্ড কি হোয়াইট ঈগলের কোন নেতা? নিশ্চয় কোন বড় নেতা হবে। না হলে তাকে ‘নিকেশ’ করার এত বড় সিদ্ধান্ত দিল কি করে সে? মার্গারেটকে হোয়াইট ঈগল কোথায় রেখেছে? এরা কি তা জানে? না এটা জানার জন্যে ফার্ডিন্যান্ড পর্যন্ত পৌছতে হবে? আহমদ মুসা ভাবনার সূত্র ছিঁড়ে গেল লোকটির উচ্চ কণ্ঠে। বলছিল সে, ‘একে নিয়ে যাও। ঠান্ডা করার কক্ষে রেখে দাও। আমি পরে আসছি।’ সঙ্গে সঙ্গেই দু’দিক থেকে দু’জন এসে ঘরে ঢুকল। আহমদ মুসাকে টেনে তুলে চ্যাং দোলা করে নিয়ে চলল। রিভলবারধারী দু’জন রিভলবার উঁচিয়ে তাদের পেছনে পেছনে চলল। আহমদ মুসাকে তারা নিয়ে গেল গ্র্যান্ড ফ্লোরে। সেখান থেকে ভু-গর্ভস্থ ফ্লোরে। আহমদ মুসাকে বহনকারী দু’জন ভু-গর্ভস্থ ফ্লোরের একটা কক্ষের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রিভলবারধারীদের একজন এগিয়ে এসে আলফাবেটিক্যাল কম্পিউটার লক’-এর ‘কী বোর্ড’-এর চারটা ‘কী’তে নক করল। খুলে গেল দরজা। যারা আহমদ মুসাকে বহন করছিল, তারা দরজায় দাঁড়িয়েই ছুড়ে দিল আহমদ মুসাকে ঘরের মধ্যে। আহমদ মুসার দেহের মাথার অংশটা গিয়ে পড়ল লোহার খাটিয়ার উপর এবং নিচের অংশটা মেঝের উপর। লোহার ‘এল’ টাইপ এ্যাংগল বার দিয়ে খাটিয়ার পায়াসহ চারধারের কাঠামো তৈরি। খাটিয়ার প্রান্তের এ্যাংগল বারের সাথে ধাক্কা খেয়ে আহমদ মুসার বাম পাশের কপালটা কেটে গেল। ঝর ঝর করে রক্ত নেমে এল মুখের উপর। আহমদ মুসা মাথাটা তুলে খাটিয়ায় হেলান দিয়ে সোজা হয়ে বসল। আহমদ মুসার রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসল দরজায় দাঁড়ানো ওরা। বলল রিভলবারধারীদের একজন, ‘মরতে এসেছিলে না? কেবল তো কপাল থেকে রক্ত বেরুল। বস যখন আসবেন, তখন সারা গা থেকেই রক্ত ঝরবে।’ কপালে আঘাত, রক্ত ঝরা এ সবের কোন দিকেই আহমদ মুসার খেয়াল নেই। তার গোটা চিন্তা ফার্ডিন্যান্ডকে নিয়ে আবর্তিত হচ্ছে। একটা প্রশ্ন করবার সুযোগ পেয়ে গেল ওদের কথা থেকে। বলল, ‘তোমাদের বস ফার্ডিন্যান্ড আসবেন এখানে?’ ইচ্ছা করেই খোঁচা দেয়ার মত প্রশ্নটা করল আহমদ মুসা। ‘ছো। তোমার মত চুনোপুঁটির কাছে ফার্ডিন্যান্ড আসবে কেন? জান, সে আমাদের বসের বস।’ ‘ও তাহলে তো রাজধানী নাসাউতে থাকেন না?’ হাসল রিভলবারধারীটি। বলল, ‘তুমি ঘোড়ার ডিম জান। এই তো কলম্বাস কমপ্লেক্সে উনার অফিস, বাড়িও তো ওখানে।’ ‘রসিকতা করছেন। অত বড় লোক এত ছোট জায়গায় থাকেন, বিশ্বাস হয় না।’ বলল আহমদ মুসা। ‘তুমি গন্ডমুর্খ দেখছি। সানসালভাদর, কলম্বাস কমপ্লেক্সকে তুমি ছোট জায়গা বলছ? জান তুমি গোটা ক্যারিবিয়ানের হোয়াইট ঈগল-এর হেড কোয়ার্টার কলম্বাস কমপ্লেক্সে।’ আহমদ মুসার মন আনন্দে নেচে উঠল। তার মন বলল, কপালে সে যে আঘাত পেয়েছে তার মত শত আঘাতের চেয়েও এই তথ্য মূল্যবান। মনে মনে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। শেষ বিষয়টি জেনে নেয়ার চেষ্টার মতই প্রশ্ন করল আহমদ মুসা, ‘ও তোমাদের বসের বস ফার্ডিন্যানড-এর অফিস এবং হোয়াইট ঈগলের হেড কোয়ার্টার তাহলে এক জায়গায়?’ ‘গর্দভ কোথাকার, এক জায়গায় হবে কেন, একই অফিস তো। ফার্ডিন্যান্ড তো হোয়াইট ঈগল-এর চীফ বস।’ বলেই সে দরজা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি বলল, ‘আর একটা কথা জনাব। আপনারা কয়দিন আমাকে বন্দী করে রাখবেন? ছাড়া পাব কবে?’ খুব বিপদে পড়া প্রাণ ভয়ে ব্যাকুল মানুষের মতই বিনয়ের সাথে বলল আহমদ মুসা। শুনে ওরা চারজনই মজা পাওয়ার মত হি হি করে হেসে উঠল। সেই রিভলবারধারীই বলল, ‘কোন চিন্তা নেই, কোন চিন্তা নেই। আমাদের মেহমান হওয়ার পর কেউ আমাদের কখনও ছেড়ে যায়নি। তুমিও যাবে না।’ বলেই দরজা বন্ধ করে দিল সে। দরজা বন্ধ হবার পর হাসল আহমদ মুসা। বেচারায় ওরা তাকে চুনোপুঁটি মনে করে বলার কিছুই বাকি রাখেনি। শুধু একটা বিষয়ই অস্পষ্ট থাকল তার কাছে। সেটা হলো, ডাঃ মার্গারেট কোথায় বন্দী আছে। হোয়াইট ঈগলের হেড কোয়ার্টারেই কিনা? ‘তাড়াতাড়ি তাকে এখান থেকে বের হতে হবে’ ভাবল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা হাত-পা নেড়ে দেখল হাত-পায়ের বাঁধন বেশ শক্ত। হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল এ্যাংগল বার খাটিয়ার কথা। আহমদ মুসা পেছন ফিরে এ্যাংগল বারের তৈরি খাটিয়ার পায়ার দিকে তাকাল। দেখে খুশী হলো। এ্যাংগল বারের প্রান্ত মরিচা পড়ে ধারালো হয়েছে। আহমদ মুসা পায়ার দিকে এগিয়ে গেল। পায়ার দিকে পিঠ করে বাঁধা দুই হাত দিয়ে এ্যাংগলের প্রান্ত খুঁজে নিয়ে তাতে হাতের বাঁধন ঘষতে শুরু করল আহমদ মুসা। প্লাষ্টিক কর্ডের বাঁধন। প্রায় আধ ঘণ্টার চেষ্টায় আহমদ মুসার হাতের বাঁধন কেটে গেল। পায়ের বাঁধন খুলে ফেলল সে। ঠিক এই সময়েই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ পেল আহমদ মুসা। সেই সাথে কথাও শুনতে পেল। একজন বলছে, ‘বস না এখানে রাতে আসার কথা?’ ‘ঠিক জানি না। বস বললেন, সাপ নিয়ে বেশিক্ষণ খেলতে নেই।’ আহমদ মুসা বুঝল। ওরা দরজা খুলতে এসেছে। আহমদ মুসা উঠে এক দৌড়ে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এক পাল্লার দরজা। দরজার পাল্লা ভেতরের দিকে খোলে। খোলার পর পাল্লা যে দিকে সরে যায়, সেদিকে থাকলে আড়ালে থাকা যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, দরজা খুলে যাওয়ার সংগে সংগে তাকে দেখতে না পেলে ওরা সতর্ক হয়ে যাবে। এই অবস্থায় খালি হাতে তাদের মোকাবিলা করা কঠিন হবে। এই সব চিন্তা করে আহমদ মুসা দরজার অন্যপাশে প্রায় চৌকাঠে গা ঘেঁষে দেয়াল সেঁটে দাঁড়াল। আহমদ মুসা বুঝল, ওরা দরজা খুলে বিশেষভাবে এদিকে একটু চোখ ফেললেই দেখতে পাবে তাকে। কিন্তু আহমদ মুসা চিন্তা করল, দরজা খোলার পর ওদের দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে ছুটবে ঘরের মাঝখান বা খাটিয়ার দিকে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে তাদের দৃষ্টি এদিকে আসার আগেই ওদের উপর চড়াও হতে পারবে আহমদ মুসা। গোটা দেহ মাথা দেয়ালের সাথে সেঁটে রেখে দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে চোখ রেখেছিল দরজার উপর। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল আহমদ মুসা। দরজার বাইরে তাদের বস দি ব্লু বার্ডের চেয়ারম্যানের কণ্ঠ শুনতে পেল আহমদ মুসা। সেই নির্দেশ দিল, দরজা খোলার। দরজা খুলে গেল। ঘরের মাঝ বরাবর তাক করা একটা রিভলবার এবং রিভলবার ধরা হাত আহমদ মুসার নজরে পড়ল প্রথমে। আহমদ মুসা বাজের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল ঐ রিভলবার লক্ষ্যে। আহমদ মুসার ডান হাত ছোঁ মেরে রিভলবারটি চেপে ধরল। কিন্তু তার দেহটি রিভলবারধারীর হাতে সামান্য বাধা পাওয়ার পর পড়ে গেল করিডোরের উপর। আহমদ মুসা প্রস্তুত হয়েই লাফ দিয়েছিল। তার বাম হাত ও রিভলবার কেড়ে নেয়া ডান হাত প্রথমে করিডোরে গিয়ে পড়ল। এ দু’হাতের উপর দেহের ভর নিয়ে দেহটা ছুড়ে দিল মাথার উপর দিয়ে সামনে। কারও দেহকে আঘাত করেছিল শূন্য দিয়ে সামনের দিকে ছুটে যাওয়া তার দু’টি পা। আহমদ মুসার দেহটা চিৎ হয়ে পড়ল করিডোরের উপর। আহমদ মুসার চোখ দু’টি প্রথমেই দেখল তার মাথার কাছে দু’জনকে। সেই দু’জন রিভলবারধারী। ওদের একজনের হাতে রিভলবার নেই, তার কাছ থেকেই রিভলবার কেড়ে নিয়েছে আহমদ মুসা। আর একজনের হাতে রিভলবার। কিন্তু বিমূঢ় লোকটির রিভলবার তখনও তাকে তাক করে সারেনি। আহমদ মুসার প্রস্তুত এবং ক্ষিপ্র হাতের রিভলবার দু’বার অগ্নি বৃষ্টি করল। রিভলবারের দু’টি গুলী দু’জনেরই থুথনির নিচ দিয়ে ঢুকে গেল মাথায়। আহমদ মুসা গুলী করেই তাকাল তার পায়ের দিকে। সেখানে একজন পড়ে গিয়েছিল। নিশ্চয় লোকটি হবে এদের ‘বস’ অর্থাৎ ব্লু বার্ডের চেয়ারম্যান, যে আসছিল আহমদ মুসার কাছ থেকে কথা আদায় করে তারপর ‘নিকেশ’ করে ফেলতে। আহমদ মুসা দেখল, হ্যাঁ, সে বস লোকটিই। সে উঠে দাঁড়িয়েছে এবং পকেট থেকে রিভলবার বের করছে। পকেট থেকে সে রিভলবার বের করেছে মাত্র। আহমদ মুসা তৃতীয় গুলীটি ছুঁড়ল তাকে লক্ষ্য করে। বুকে গুলী খেলে লোকটি সেখানেই ঢলে পড়ল। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। রিভলবার বাগিয়ে চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে একটু অপেক্ষা করল। না কেউ নেই, কোন সাড়া-শব্দ কোথাও নেই। ছুটল এবার আহমদ মুসা উপরে ওঠার সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ির গোড়ায় পৌছে আহমদ মুসা দেখল, সিঁড়ির মাথায় গ্রাউন্ড ফ্লোরে উপর মুখে সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ। আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠল। আহমদ মুসা খুশী হলো। এখানে বন্দীখানার মতই কম্পিউটার লক। এ্যালফাবেটিক্যাল অর্ডারে কী বোর্ড সাজানো। আহমদ মুসা দেখেছিল বন্দীখানার লক খোলার জন্যে ‘কী’ বোর্ডের যে ‘কী’গুলোতে লোকটি আঙুল ফেলেছিল তা যোগ করলে ‘EGLE’ শব্দ দাঁড়ায়। সুতরাং বন্দীখানার কম্পিউটার লক খোলার কোর্ড ওয়ার্ড ছিল ‘EGLE’ এখানেও কি তাই? আহমদ মুসা দুরু দুরু বুকে বোর্ডের চারটি ‘কী’তে তর্জ্জনি দিয়ে ‘EGLE’ শব্দ বানাল। শেষ ‘ঊ’ বর্ণে চাপ পড়ার সাথে সাথেই মাথার উপর পুরু লোহার পাত সরে গেল। আহমদ মুসা একটু অপেক্ষা করল। না কেউ এল না। লাফ দিয়ে উপরে উঠল আহমদ মুসা। কাউকে চোখে পড়ল না। বুঝল, ভূ-গর্ভের কোন শব্দ বাইরে না আসায় এরা কিছুই বুঝতে পারেনি। আহমদ মুসা চুপি চুপি সরে পড়াই ঠিক মনে করল। এখানে গোলা-গুলী খুব সহজেই বাইরের লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আহমদ মুসা দেখেছে, সিঁড়ি মুখ থেকে পুব দিকে কিছুদূর এগুবার পর উত্তরে টার্ন নিলেই রিসেপশন কক্ষে প্রবেশ করা যায়। আহমদ মুসা রিভলবার বাগিয়ে বিড়ালের মত নিঃশব্দে ছুটল পূবদিকের সেই করিডোর ধরে। দক্ষিণমুখী একটা করিডোরের মুখ তখন অতিক্রম করছিল আহমদ মুসা। একটা শব্দ পেয়ে তাকাল সেই করিডোরের দিকে। তাকিয়েই দেখতে পেল একজন লোক এবং তার উদ্যত রিভলবার তাকে তাক করা। আহমদ মুসা তার রিভলবার ঘোরাবার সুযোগ পেল না। একটা গুলী এসে তার বুড়ো আঙুল সমেত রিভলবারে আঘাত করল। হাত থেকে আহমদ মুসার রিভলবার খসে পড়ে গেল। আহমদ মুসা রিভলবারের সাথে সাথেই আছড়ে পড়েছিল মেঝের উপর। যেন গুলী বিদ্ধ হয়ে সে ঢলে পড়েছে মাটিতে। গুলী বর্ষণকারী লোকটিও মুহূর্তের জন্যে দ্বিধায় পড়েছিল এ নিয়ে। এই সুযোগেই আহমদ মুসার বাম হাত রিভলবার কুড়িয়ে গুলী করল লোকটিকে। লোকটি এত তাড়াতাড়ি পাল্টা আক্রমণের শিকার হবে বুঝেনি। তারই খেসারত হিসাবে বুকে গুলী বিদ্ধ হয়ে ঢলে পড়ল মাটিতে। আহমদ মুসা রিসেপশনের দরজায় এসে দেখল এদিকে গুলীর শব্দ শুনে রিসেপশনিষ্ট হাতে রিভলবার নিয়ে এদিকে এগুচ্ছে। আহমদ মুসাকে রিভলবার হাতে একেবারে মুখোমুখি দন্ডায়মান দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল সে। আহমদ মুসা তার দিকে রিভলবার তাক করে বলল, ‘বাঁচতে চাইলে রিভলবারটি ফেলে দিয়ে ঐ টয়লেটে ঢোকো গিয়ে।’ রিসেপশনিষ্ট যুবকটি দৌড় দিয়ে গিয়ে টয়লেটে ঢুকল। আহমদ মুসা রিভলবারটি কুড়িয়ে নিয়ে টয়লেটের সিটকিনি লাগিয়ে রিসেপশনিষ্টের টেবিলে ফিরে এসে রিমোর্ট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে বাইরের দরজা খুলে ফেলল। তারপর দৌড় দিল বাইরে। বাইরে রাস্তায় বেরিয়ে আহমদ মুসা চিন্তা করল কোন দিকে যাবে। আহমদ মুসার আশু দরকার হলো, আহত বুড়ো আঙুলটাকে একটু দেখা এবং মুখের রক্ত মুছে ফেলা। এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে যাওয়া যাবে না। ডান দিকে শহর, আর বাঁ দিকে অপেক্ষাকৃত জনবিরল, গাছপালাও প্রচুর। এ দিকে প্রয়োজনীয় আড়াল পাওয়া যাবে। আহমদ মুসা বাঁ দিকে ছুটল। কিছু এগিয়েই একটা ট্যাক্সি দেখতে পেল রাস্তার পাশে গাছের ছায়ায় দাঁড়ানো। পরক্ষণেই দেখল ট্যাক্সি ড্রাইভার বেরিয়ে এসেছে। একি? কার্লোস তো! বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। এতক্ষণ সে আছে। কাছাকাছি হয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘একি তুমি এতক্ষণ এখানে?’ আহমদ মুসার কথার দিকে কর্ণপাত না করে বিস্মিত কার্লোস বলল, ‘একি আপনার অবস্থা? হাত থেকে রক্ত পড়ছে, মুখ রক্তাক্ত। আমার সন্দেহই তাহলে ঠিক।’ ‘কি সন্দেহ করেছিলে তুমি?’ ‘ওসব কথা থাক। গাড়িতে উঠুন। আপনার আগে অন্তত ‘ফাষ্ট এইড’ প্রয়োজন।’ আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে বসতে বসতে বলল, ‘একি, আমার ব্যাগ আমি তোমার গাড়িতে ফেলে গিয়েছিলাম?’ ‘স্যার, এই ব্যাগ নিয়েই তো বিপদে পড়েছি। এই ব্যাগও আমার অপেক্ষা করার একটা কারণ।’ ‘আরেকটা কারণ কি?’ ‘স্যার, পৌনে এক ঘণ্টাতেও আপনাকে বের হতে না দেখে আমি অফিসে গিয়েছিলাম ব্যাগটা আপনাকে দেয়া যায় কিনা সে জন্যে। ওদের ব্যবহার সন্দেহজনক মনে হলো আমার কাছে। আমার ট্যাক্সিতে আপনি এসেছেন এই কথা বলে আপনার খোঁজ করতেই রিসেপশনিষ্ট বলল, ‘ও ভাড়া পাবে তো? যাও, ইহ জীবনে আর তাকে পাবে না, পরকালে নিও।’ বলে আমাকে বের করে দেয় অফিস থেকে। আমি বুঝতে পারলাম, কিছু একটা ঘটেছে। এই অবস্থায় আমি যেতে পারছিলাম না। অপেক্ষা করছিলাম কোন খোঁজ পাওয়া যায় কিনা। এই মাত্র ভাবছিলাম থানায় খবরটা দিয়ে আমি চলে যাব।’ ‘থানায় খবর দিলে থানা কি করত?’ ‘হয়তো খোঁজ নিত। কিন্তু যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি শ্বেতাংগদের তাই তাদের কোন দোষ হতো না, দোষ হতো আপনার।’ ‘তাহলে থানায় খবর দিতে কেন?’ ‘নিয়ম স্যার, এ জন্যে। আইন আছে, এ ধরনের কোন বড় সন্দেহজনক কিছু দেখলে, গাড়িতে ঘটলে সংগে সংগেই থানায় জানাতে হবে।’ বলেই কার্লোস আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কি ঘটেছিল স্যার, আমি গুলীর শব্দ শুনলাম।’ আহমদ মুসা একটু ভাবল কার্লোসকে কতটুকু বলা যায় তা নিয়ে। তারপর বলল, ‘বুঝলাম না, বিমান ভাড়া চাওয়ায় ওরা আমাকে সন্দেহ করল। বন্দী করল। শুনলাম, ওরা যাদের বন্দী করে তারা আর বাঁচে না। তাই প্রাণপণ চেষ্টা করে বেরিয়ে এলাম। কথায় কথায় ওদের কোন একজনের কাছে ‘হোয়াইট ঈগল’-এর নাম শুনলাম।’ ‘হোয়াইট ঈগল?’ বিস্মিত কণ্ঠ কার্লোসের। ‘তুমি চেন ‘হোয়াইট ঈগল’কে? ‘চিনি না। তবে দু’জন প্যাসেঞ্জারের মধ্যে আলোচনায় এই নাম শুনেছিলাম। বুঝেছিলাম, কোন ভয়ংকর দল এটা।’ ‘কোথায় পেয়েছিলে প্যাসেঞ্জার দু’জনকে?’ ‘এয়ারপোর্টে। আর নামিয়ে দিয়েছিলাম কলম্বাস কমপ্লেক্সে। পথিমধ্যে শুনেছিলাম তাদের গল্প।’ কলম্বাস কমপ্লেক্সের নাম শুনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। ব্লু বার্ড অফিসে তাকে বন্দী করা একজন রিভলবারধারীও কলম্বাস কমপ্লেক্সে হোয়াইট ঈগল-এর চীফ বস ফার্ডিন্যান্ডের অফিসের কথা বলেছে। কিন্তু তার কথায় কলম্বাস কমপ্লেক্স-এর কোথায় হোয়াইট ঈগল-এর অফিস তা জানা যায়নি। এটা আহমদ মুসার জন্যে খুব জরুরী। আহমদ মুসা প্রশ্ন করল, ‘কলম্বাস কমপ্লেক্সে ওদের অফিস নাকি?’ ‘তা জানি না। তবে ওদের যে উঠানে নামিয়ে দিয়েছিলাম, সেখানে সাইনবোর্ড দেখেছি ‘ক্যারিবিয়ান ওয়েলফেয়ার সিন্ডিকেট’-এর।’ কথা শেষ করেই কার্লোস বলল, ‘আপনাকে ছোট-খাট ডাক্তার খানায় না ক্লিনিকে নিয়ে যাব?’ ‘না কার্লোস। আমার ব্যাগে ‘ফাষ্ট এইড’ এর সবকিছুই আছে, তোমার বোতলে ভাল পানিও আছে। এখন ভাল একটা জায়গা দেখে তোমার গাড়ি দাঁড় করাও।’ বলল আহদ মুসা। আহমদ মুসার মাথায় ‘ফাষ্ট এইড’ এর চিন্তা নয়, মাথা জুড়ে এখন তার হোয়াইট ঈগল-এর অফিস। মনে মনে বার বার আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছে। সে এখন নিশ্চিত কলম্বাস কমপ্লেক্সেই হোয়াইট ঈগল-এর অফিস এবং ‘ক্যারিবিয়ান ওয়েল ফেয়ার সিন্ডিকেট’ই তার ছদ্মবেশী নাম। মেইন রোড থেকে বাইরে একটু দূরে নির্জন এক সংরক্ষিত বাগানে গাড়ি দাঁড় করাল কার্লোস। কপালের এবং বুড়ো আঙুলের ক্ষত পরিষ্কার করলো কার্লোস। কপাল বেশ গভীর হয়ে কেটে গেছে, কিন্তু ক্ষতটা ততটা মারাত্মক নয়। ডান হাতের বুড়ো আঙুলও অল্পের জন্যে বেঁচে গেছে। বুলেট আঙুলের হাড় স্পর্শ করেনি। ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে কার্লোস বলল, ‘আপনার অন্তত সপ্তাহ খানেক রেষ্ট নিতে হবে।’ ‘না কার্লোস, যে ঔষধ লাগিয়েছি দু’তিন দিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’ ‘স্যার, এখন কোথায় যাবেন?’ ‘সে চিন্তাই করছি।’ ‘স্যার, আমি থাকি বীচ এলাকায়। কাছাকাছি ‘ট্যুরিষ্ট কটেজ’ আছে। ভাড়া একটু বেশি হলেও আরামদায়ক এবং নিরাপদ।’ ‘ঠিক আছে। আবহাওয়াও ওখানকার ভাল হবে।’ দু’জনেই গাড়িতে উঠল। গাড়ি চলতে শুরু করল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২৬.ক্যারিবিয়ানের দ্বীপদেশে (৪)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন