বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) শেষ পর্ব

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X মিস্টার বেকার উঠে দাঁড়ালেন। সদ্য-পাওয়া হাঁসটা বগলদাবা করে বললেন, “অবশ্যই, মশাই। আমরা দিনের বেলা মিউজিয়ামে কাজ করি। মিউজিয়ামের কাছে আলফা ইন হল আমাদের প্রিয় আড্ডা। তার মালিকের নাম উইন্ডিগেট। ভারী ভাল লোক। তিনি একটা হাঁস ক্লাব স্থাপন করেছেন। প্রতি সপ্তাহে কয়েক পেনি করে চাঁদা দিলে আমরা বড়োদিনের সময় একটা হাঁস পাই। আমি আমার চাঁদা সময়মতো দিয়ে এসেছিলাম। বাকি সবটাই তো আপনার জানা। আপনার কাছে আমি ঋণী থেকে গেলাম, মশাই। আমার বয়স বা সম্মানের কথা ভাবলে, এই স্কচ বনেট জাতীয় টুপি আর এই আমাকে মানায় না।” যাওয়ার সময় তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে বেশ কেতাবি কায়দায় একটা অভিবাদন জানিয়ে গেলেন। বেশ মজা লাগল দেখে। তিনি চলে গেলে হোমস দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “এই হল মিস্টার হেনরি বেকারের গল্প। বোঝাই যাচ্ছে, তিনি ঘটনার কিছুই জানেন না। ওয়াটসন, তোমার কি খিদে পেয়েছে?” “না, কেন?” “তাহলে চলো, সন্ধ্যের খাবারটা একেবারে রাতেই খাওয়া যাবে; এইবেলা এই টাটকা সূত্রটার পিছু নেওয়া যাক।” “বেশ, তাই চলো।” বেশ শীত পড়েছিল সে রাতে। আমরা গলায় ভাল করে আলস্টার [‡‡] পরে মাফলার জড়িয়ে বের হলাম। মেঘহীন আকাশে তারা ঝিলমিল করছিল। পথের লোকেদের মুখ থেকে পিস্তলের গুলির মতো ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ডকটর’স কোয়ার্টার, উইমপোল স্ট্রিট, হার্লে স্ট্রিট, উইগমোর স্ট্রিট পেরিয়ে অক্সফোর্ড স্ট্রিটে এসে পড়লাম। আমাদের পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। আধঘণ্টার মধ্যে ব্লুমসবেরির আলফা ইনে এসে পড়লাম। হলবোর্নের দিকে যে রাস্তাটা গেছে তারই এক কোণে একটা ছোটো পাবলিক হাউস। হোমস প্রাইভেট বারের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে লাল- মুখো, সাদা অ্যাপ্রন-পরিহিত মালিকের কাছে দুই গ্লাস বিয়ার অর্ডার করল। বলল, “তোমার বিয়ার নিশ্চয় তোমার হাঁসের মতোই ভাল।” লোকটা অবাক হয়ে বলল, “আমার হাঁস!” “হ্যাঁ, আধঘণ্টা আগেই তোমার হাঁস ক্লাবের সদস্য মিস্টার হেনরি বেকারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল।” “ও, হ্যাঁ! এবার বুঝেছি। তবে কিনা, মশাই, ওই হাঁস ঠিক আমার নয়।” “তাই নাকি! তাহলে কার?” “কভেন্ট গার্ডেনের এক হাঁসওয়ালার কাছ থেকে ডজন দুয়েক আনিয়েছিলাম।” “বটে! ওখানকার কয়েকজনকে চিনি। ওগুলো ঠিক কার থেকে আনিয়েছিলে?” “লোকটার নাম ব্রেকিনরিজ।” “ও! তাকে চিনি না। আচ্ছা, এই নাও তোমার বিয়ারের দাম। তোমার ব্যবসার উন্নতি হোক। শুভরাত্রি।” বাইরের হিমেল হাওয়ায় আবার বেরিয়ে এসে সে কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল, “এবার গন্তব্য মিস্টার ব্রেকিনরিজের দোকান। বুঝে দ্যাখো, ওয়াটসন, আমরা যে লক্ষ্যে চলেছি, তার এক দিকে একটা সামান্য হাঁস। কিন্তু অন্যদিকে একটি নিরপরাধ লোক যাকে আমরা নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারলে তাকে সাত বছর বিনা অপরাধেই জেল খাটতে হবে। এমনও হতে পারে যে, আমরা দেখব আসলে চুরিটা সেই করেছে। কিন্তু ভাগ্যক্রমেই হোক, আর যেভাবেই হোক, আমাদের হাতে এমন একটা সূত্র এসে গেছে যা পুলিশের হাতেও আসেনি। এর শেষ দেখেই ছাড়ব। চলো দক্ষিণ দিকে। তাড়াতাড়ি।” হলবোর্ন পেরিয়ে এনডেল স্ট্রিটে এসে পড়লাম। বসতি এলাকার আঁকাবাঁকা পথ ধরে কভেন্ট গার্ডেন মার্কেটে পৌঁছালাম। সেখানে সবচেয়ে বড়ো দোকানগুলোর একটার নাম ব্রেকিনরিজের নামে। মালিকের মুখটা ঠিক ঘোড়ার মতো লম্বাটে। দু-পাশে ছাঁটা জুলপি। একটা ছেলেকে দোকানের শাটার ফেলতে সাহায্য করছিল। হোমস বললে, “শুভ সন্ধ্যা। বেশ শীত পড়েছে আজ রাতে।” বিক্রেতা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল। তারপর আমার সঙ্গীর দিকে প্রশ্নালু চোখে তাকাল। মার্বেলের শূন্য স্ল্যাবগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে হোম জিজ্ঞাসা করলে, “সব হাঁস বিক্রি হয়ে গেছে দেখছি।” “কাল সকালে আসুন। পাঁচশো হাঁস চাইলেও দিতে পারবো।” “সে আমার কোনো কাজে লাগবে না।” “তবে ওই যে দোকানটায় গ্যাস জ্বলছে, ওটায় যান।” “কিন্তু আমাকে যে তোমার দোকানের কথাই বলা হয়েছে।” “কে বলেছে?” “আলফার মালিক।” “ও, হ্যাঁ। আমি তাকে ডজন দুয়েক পাঠিয়েছিলাম।” “হাঁসগুলো বেশ ছিল। তা ওগুলো পেয়েছিলে কোত্থাকে?” অবাক কাণ্ড। প্রশ্নটা শুনেই বিক্রেতা রাগে ফেটে পড়ল। সে এবার ঘাড় ঘুরিয়ে কোমরে হাত দিয়ে যুদ্ধং দেহি ভূমিকায় দাঁড়াল। বলল, “পথে আসুন মশায়! কি চাইছেন বলুন দেখি! ঝেড়ে কাশুন।” “বাঁকা কথা তো কিছুই বলিনি। আমি শুধু জানতে চেয়েছি যে হাঁসগুলো তুমি আলফায় বিক্রি করেছিল, সেই হাঁসগুলো তুমি কার কাছ থেকে কিনেছিলে?” “অ! আর যদি না বলি, তাহলে কী করবে?” “কিছুই না। মামুলি ব্যাপার। কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি, এই সামান্য কথায় তুমি এতটা উত্তেজিত হচ্ছ কেন?” “উত্তেজিত হব না! এমন কথা শুনলে কার মাথার ঠিক থাকে? ভাল দামে ভাল মাল বেছবো, ব্যস, লেনদেন খতম। ‘হাঁস কোথায়?’ ‘কার থেকে হাঁস কিনেছো?’ ‘ওই হাঁসের কত দাম?’ হাঁস তো নয়, যেন আর কিছু। সামান্য হাঁস নিয়ে কত কথা!” হোমস গা-ছাড়া ভাব দেখিয়ে বলল, “কি করে জানবো বলো যে, আরও পাঁচ জন ওই হাঁসের খোঁজ করছে। তবে তুমি না বললে, বাজিটা হেরে যাবো। হাঁস-মুরগির ব্যাপারে আমি নিজেকে একরকম বিশেষজ্ঞই মনে করি। আর একজনের সঙ্গে বাজি ধরেছি যে, যে হাঁসটা আজ খেলাম সেটা পাড়াগেঁয়ে হাঁস।” হাঁসওয়ালা খুব সংক্ষেপে রাগত গলা বলল, “অ! তবে আপনি বাজি হেরেছেন। ওটা শহুরে হাঁস।” “আমার দেখে তা মনে হল না।” “আমি বলছি তাই।” “মানি না।” “ল্যাংটোবেলা থেকে হাঁস বেচছি, মশাই। আপনি আমাকে হাঁস চেনাচ্ছেন? আমি বলছি, আলফায় যে হাঁসগুলো বেচেছি, সেগুলো শহুরে হাঁস।” “তুমি বললেই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?” “তাহলে বাজি রাখুন।” “মিছিমিছি অর্থব্যয় করবেন। আমি জানি আমি যা বলছি তা ঠিক। এক সভারেন [§§] বাজি রইল; শুধু ওই বাজে তক্কো করার জন্য আপনাকে শিক্ষে দেওয়ার জন্যে।” তারপর ব্যঙ্গের হাসি হেসে দোকানদার বলল, “বিল, বইগুলো আমাকে এনে দে তো রে।” ছোটো ছেলেটা একটা ছোটো মোটা বই আর একটা বেশ বড়ো চকচকে মলাটের বই আনল। দুটো বইই একসঙ্গে ঝুলন্ত বাতির নিচে রাখা হল। হাঁসওয়ালা বলল, “এই যে হাঁসবিশেষজ্ঞ মশাই। ভেবেছিলাম আমার সব হাঁস বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু না, এখনও একটা আছে। এই ছোটো খাতাটা দেখুন।” “দেখলাম। তাতে হলটা কী?” “এটা হল আমি যাদের থেকে হাঁস কিনি তাদের নামের তালিকা। দেখেছেন? আচ্ছা, এবার দেখুন, এই পাতাটা পাড়াগেঁয়ে হাঁসের মালিকদের তালিকা। নামের পাশে যে নম্বর দেখছেন সেগুলো বড়ো লেজার বইয়ে তাদের অ্যাকাউন্ট নম্বর। এবার দেখুন। অন্য পাতায় লাল কালিতে কী লেখা আছে? এই হল আমার শহরের সরবরাহকারীদের তালিকা। এবার, তিন নম্বর নামটা পড়ুন। পড়ুন পড়ুন, আমাকে পড়ে শোনান।”হোমস পড়ল, “মিসেস ওকশট, ১১৭, ব্রিক্সটন রোড– ২৪৯।” “হ্যাঁ, ঠিক। এবার লেজারের পাতায় যান।” হোমস নির্দিষ্ট পাতাটি খুলল, “এই যে এখানে, ‘মিসেস ওকশট, ১১৭ ব্রিক্সটন রোড, ডিম ও পোলট্রি সরবরাহকারী।” “শেষ লাইনটায় কী লেখা আছে?” “‘২২শে ডিসেম্বর। সাত শিলিং ছয় পেন্স দরে ২৪টি হাঁস।’” “ঠিক। এবার, নিচে দেখুন। কী লেখা আছে?” “‘আলফার মিস্টার উইন্ডিগেটের নিকট ১২ শিলিং দরে বিক্রীত হইয়াছে।’” “এবার কী বলবেন?” শার্লক হোমস মুখখানি ব্যাজার করল। তারপর পকেট থেকে এক সভারেন বের করে স্ল্যাবের উপর ছুঁড়ে দিয়ে মহাবিরক্তির ভাব দেখিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। কয়েক ইয়ার্ড দূরে এসে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে সে তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মুখে কোনো শব্দ না করে হেসে উঠল। বলল, “এই রকম গোঁফ আর পকেট থেকে গোলাপি খাতা উঁকি দিচ্ছে দেখলেই বুঝবে, একে বাজি দিয়েই টোপ গেলাতে পারবে। ওকে একশো পাউন্ড দিলেও এত কিছু বলত কিনা সন্দেহ। কিন্তু দ্যাখো, একটা বাজির টোপ ফেলে কত সহজেই ওর পেট থেকে সব বের করে নেওয়া গেল। যাই হোক, ওয়াটসন, মনে হচ্ছে আমরা আমাদের অনুসন্ধানের শেষ পর্বে এসে পৌঁছে গেছি। এখন ভাবতে হবে, মিসেস ওকশটের কাছে আজ রাতেই যাওয়া উচিত না কাল যাবো। নিঃসন্দেহে যা বুঝলাম, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা ছাড়াও আরও কেউ উৎসাহিত। আমার উচিত…” তার কথা চাপা দিয়ে হঠাৎ দূরে একটা উচ্চ কোলাহল উঠল। যে দোকানটা থেকে এক্ষুনি বেরিয়ে এলাম সেই দোকানটার থেকেই। পিছন ফিরে দেখি একটা বেঁটেখাটো ইঁদুরমুখো লোক ঝুলন্ত আলোর বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, আর ওই হাঁসওয়ালা ব্রেকিনরিজ রাগতমুখে দোকানের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ঘুষি বাগিয়ে লোকটাকে কী সব বলছে। তার চিৎকার কানে আসছিল, “যথেষ্ট হয়েছে তোমার আর তোমার হাঁস। চুলোর দোরে যাও গে। ফের যদি ফালতু বকতে আসো তবে তোমার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেবো। মিসেস ওকশটকে এখানে নিয়ে এসো, যা বলার তাঁকেই বলব। তোমার কাছে কেন জবাবদিহি করব হে? তোমার থেকে হাঁস কিনেছিলাম নাকি?” লোকটা কুঁই কুঁই করতে করতে বলল, “না, কিন্তু ওগুলোর একটা যে আমার ছিল।” “তাহলে মিসেস ওকশটকে জিজ্ঞাসা করো গে যাও।” “উনি আমাকে বললেন তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে।” “তাহলে প্রুশিয়ার রাজাকে জিজ্ঞাসা করো গে যাও। যত্তো সব! যথেষ্ট হয়েছে। এবার বেরোও এখান থেকে।” এই বলে দোকানি রীতিমতো ঘাড়ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে বের করে দিল। লোকটাও অন্ধকারে মিশে গেল। হোমস ফিসফিসিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে, আর ব্রিক্সটন রোডে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওয়াটসন, আমার সঙ্গে এসো। এই লোকটার পিছু নেওয়া যাক।” বাজারের লোকজনের ভিড় ঠেকে হোমস এগিয়ে গেল। খানিকক্ষণের মধ্যে লোকটাকে ধরেও ফেলল। কাঁধে হাত রাখতেই লোকটা পিছন ফিরে তাকালো। গ্যাসের আলোয় দেখলাম, ভয়ে লোকটার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কে আপনারা? কী চান?” হোমস মৃদুস্বরে বলল, “মাপ করবেন, কিন্তু আপনার সঙ্গে ওই দোকানির বাক্যালাপ আমার কানে এসেছে। মনে হচ্ছে, এই ব্যাপারে আপনাকে কিছু সাহায্য করতে পারি।” “আপনি? আপনি কে? এই ব্যাপারে আপনি কী জানেন?” “আমার নাম শার্লক হোমস। আমার কাজই হল অন্যেরা যে খবর রাখে না, সেই খবরটি রাখা।” “কিন্তু আপনি তো এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না।” “আজ্ঞে না, আমি সবই জানি। ব্রিক্সটন রোডের মিসেস ওকশট ব্রেকিনরিজ নামে এক দোকানিকে কয়েকটা হাঁস বেচেছিলেন। সেই হাঁসগুলি ব্রেকেনরিজ বেচে দেয় আলফার মিস্টার উইন্ডিগেটের কাছে। উইন্ডিগেট তার ক্লাব সদস্য মিস্টার হেনরি বেকারকে সেই হাঁস বিক্রি করে। এই হাঁসটাকেই তো তুমি খুঁজছ?”লোকটা তার দুই হাত আর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “মশাই, আপনার মতো একজনকেই তো খুঁজছিলাম। আপনি ভাবতেও পারবেন না, এই ব্যাপারটার সঙ্গে আমার জীবনমরণ সম্পর্ক জড়িয়ে আছে।” একটা চার-চাকার গাড়ি যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। সেটাকে দাঁড় করিয়ে হোমস বলল, “তাহলে চলুন কোথাও একটা গিয়ে আরামসে আলোচনা করা যাক। এই বাজারে বড্ড চিৎকার চ্যাঁচামেচি। কিন্তু সবার আগে–আপনার নামটা তো জানা হল না।” লোকটা খানিক ইতস্তত করে শেষে অন্য দিকে মুখ করে বলল, “আমার নাম জন রবিনসন।” হোমস মিষ্টি গলায় বলল, “না না, আপনার আসল নামটা বলুন। বেনামিদের সঙ্গে কাজ করা বড়ো অসুবিধাজনক।” লোকটা সাদা গালদুটো লাল হয়ে এল। সে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার আসল নাম হল জেমস রাইডার।” “ভাল! তার মানে আপনিই হোটেল কসমোপলিটনের প্রধান পরিচারক। দয়া করে এই ক্যাবটিতে [***] উঠুন। যা জানতে চাইছেন, তার সবই আমার কাছে শুনবেন।” লোকটা একবার আমার দিকে একবার হোমসের দিকে আধা-ভয় আধা-আশা ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। সে বুঝতে পারছিল না যে, তার কপালে লাভ না লোকসান লেখা আছে। দোনোমোনো করতে করতেই সে ক্যাবে উঠল। আধঘণ্টায় আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের বেকার স্ট্রিটের বৈঠকখানায়। লোকটা গাড়িতে কিছুই বলল না। তবে তার ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস আর হাত কচলানি থেকে বুঝতে পারছিলাম যে, সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। ঘরে ঢুকে হোমস হাসিমুখে বলল, “হ্যাঁ, এসে গেছি বাড়ি। বেশ সুন্দর আগুন জ্বলছে। মিস্টার রাইডার, আপনি দেখি শীতে কাঁপছেন। আসুন, এই বেতের চেয়ারটায় বসুন। আমি ঘরের জুতোটা পরে আসি। তারপর আপনার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করব। হ্যাঁ, এইবার! আপনি জানতে চাইছিলেন না, ওই হাঁসগুলোর কী হয়েছে?” “হ্যাঁ, মশায়।” “অথবা, আমার যতদূর ধারণা, তার মধ্যে একটি হাঁস সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। ওই যে হাঁসটার লেজের দিকে কালো ডোরা দাগ আর বাকিটা পুরো সাদা, সেইটা।” রাইডার উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ, মশায়! বলতে পারেন ওটা কোথায় গেছে?” “ওটা এখানে এসেছিল।” “এখানে?” “হ্যাঁ, আশ্চর্য সেই হাঁস, বুঝলেন মশাই। সত্যিই আপনি ওটার প্রতি আগ্রহ না দেখালেই অবাক হতুম। সেই মরা হাঁস একটা ডিমও পেরেছিল। ছোট্ট একটা উজ্জ্বল নীল রঙের ডিম। এমন ডিম কখনও দেখিনি। সেটা আমি আমার মিউজিয়ামে রেখে দিয়েছি।” লোকটা পড়ে যাচ্ছিল। কোনো রকমে ডান হাত দিয়ে ম্যান্টলপিসটা [†††] ধরে সামলে নিল। হোমস তার স্ট্রংবক্সের ডালা খুলল। তারপর নীল পদ্মরাগটা বের করে ধরল। জিনিসটা একটা তারার মতো চকচক করছিল। একটা অদ্ভুত সুন্দর শীতল বহুকোণী আলো ঠিকরে পড়ছিল ওটা থেকে। রাইডার শুকনো মুখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল না, ওটা দাবি করাটা ঠিক হবে কিনা। হোমস শান্তভাবে বলল, “তোমার খেলা শেষ, রাইডার। না না, ধরে দাঁড়াও। নইলে পিছনের আগুনে পড়ে যাবে। ওয়াটসন, ওকে চেয়ারটায় বসিয়ে দাও। অপরাধ করতে যেরকম কলজের জোর লাগে তা ওর নেই। আর এক গ্লাস ব্র্যান্ডি খাইয়ে দাও। হ্যাঁ! এবার ওকে মানুষের মতো দেখাচ্ছে বটে। একেবারে ইঁদুরের মতো হয়ে গিয়েছিল!” সে খানিকক্ষণ টলতে লাগল। যেন পড়ে যাবে। ব্র্যান্ডি খেয়ে গালের রংটা একটু ফিরল। তারপর বসে হোমসের দিকে সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে রইল। “আমার কাছে প্রায় সব তথ্য আর প্রমাণই আছে। তাই তোমাকে বেশি কিছু বলতে হবে না। শুধু কয়েকটা কথা জানলেই আমার সব জানা পূর্ণ হবে। রাইডার, তুমি কী এই নীল পাথরটার কথা কাউন্টেস অফ মোরকারের কাছ থেকে শুনেছিলে?” লোকটা কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, “ক্যাথরিন কসাক আমাকে ওটার কথা বলে।” “ও! মাননীয়া কাউন্টেসের খাস-পরিচারিকা। আর শুনেই হঠাৎ-বড়োলোক হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেলে। যাক, এমন লোভ অনেক ভাল মানুষও সামলাতে পারে না, তুমি তো কোন ছার। তবে, রাইডার, তুমিও ভালমানুষ নও। যাকে বলে একখানি ছিঁচকে চোর। তুমি জানতে, হরনার নামে ওই কলের মিস্ত্রিটার নামে আগেও একটা কেলেঙ্কারি আছে। আই তার দিকেই সবার সন্দেহ টানতে কষ্ট হবে না। তারপর কী করলে? তুমি আর তোমার এই সহচরীটি মিলে কাউন্টেসের ঘরে গ্যাঁড়াকল করে রাখলে যাতে লোকটাকে ডাকতে হয়। তারপর সে চলে গেলে, তুমি গয়নার বাক্স থেকে গয়নাটা সরালে। তারপর অ্যালার্ম বেল বাজালে আর ওই বেচারাকে গ্রেফতার হতে হল। তারপর তুমি…” হঠাৎ রাইডার চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে নেমে গেল। তারপর হোমসের পা জড়িয়ে ধরল, কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল, “ভগবানের দোহাই, দয়া করুন! আমার বাবা-মার কথা ভাবুন। ওঁরা জানতে পারলে একেবারে ভেঙে পড়বে। আমি আগে কখনও এমন কাজ করিনি। কোনোদিন করব না। প্রতিজ্ঞা করছি। বাইবেলের দিব্যি। দয়া করে আমাকে আদালতে নিয়ে যাবেন না। খ্রিস্টের দোহাই, নিয়ে যাবেন না।”হোমস কড়া ভাষায় বলল, “চেয়ারে গিয়ে বোসো। খুব তো নাকে কাঁদছ এখন। ওই বেচারি নির্দোষ করনারকে ফাঁসাবার আগে মনে ছিল না এসব কথা!” “আমি পালিয়ে যাবো, মিস্টার হোমস। এই দেশ ছেড়েই পালিয়ে যাবো মশাই। তাহলে ওর বিরুদ্ধে মামলাটা আর টিকবে না।” “আচ্ছা! সেকথা পরে ভাবব। আগে বলো দেখি, তারপর ঠিক কী কী করলে। পাথরটা হাঁসের পেটে গেল কী করে? আর সেই হাঁসই বা খোলা বাজারে এলো কী করে? যদি বাঁচতে চাও তো সব খুলে বলো।” রাইডার একবার জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁটদুটো চেটে নিল। তারপর বলল, “যেমন যা ঘটেছে সবই বলছি, মশাই। হরনার গ্রেফতার হওয়ার পর মনে হল, পাথরটা নিজের কাছে রাখা আর নিরাপদ হবে না। যে কোনো মুহুর্তে পুলিশ আমার ঘরে খানাতল্লাশি করতে পারে। হোটেলেও এমন কোনো নিরাপদ জায়গা নেই যেখানে ওটা রাখা যেতে পারে। তাই আমার বোনের বাড়ি চলে গেলাম। আমার বোন ওকশট নামে একজনকে বিয়ে করে ব্রিক্সটন রোডে থাকে। সেখানেই সে বাজারে বিক্রির জন্য হাঁস পালন করে। মনে হচ্ছিল, সারা রাস্তায় পুলিশ আর গোয়েন্দারা আমার পিছু নিয়েছে। ওই শীতের রাতেও ব্রিক্সটন রোডে যেতে ঘেমেনেয়ে গেলাম। বোন জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, আমাকে এত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন। আমি শুধু বললাম, হোটেলে একটা দামি রত্ন চুরি গেছে। তাই মন খারাপ। তারপর বাড়ির পিছনের উঠোনে গিয়ে কী করা যায় ভাবতে লাগলাম।” “মডসলি নামে আমার এক বন্ধু আছে। স্বভাব ভাল না। পেন্টনভিলে জেল খেটে সদ্য ছাড়া পেয়েছিল। তার সঙ্গে একদিন দেখা হল। সে আমাকে চোরেদের কাজকারবারের কথা বলল। চোরাই মাল কিভাবে কোথায় বেচা যায়, সেও বলল। লোকটার কিছু গোপন কথা আমি জানি, তাই জানতাম ও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। ও থাকে কিলবার্নে। সেখানেও যাওয়া স্থির করলাম। ওই ভাল দামে মাল বিক্রির ব্যবস্থা করে দিত। কিন্তু নিরাপদে ওর কাছে যাবো কি করে? অনেক কষ্টে হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। যেকোনো মুহুর্তে আমার দেহতল্লাশ করলেই তো আমার ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে পাথরটা বেরিয়ে পড়বে। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় দেখলাম, আমার পায়ের কাছে হাঁসগুলো ঘুরছে। হঠাৎ মাথায় একটা মতলব খেলে গেল। ভাবলাম, এটাকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়ার সেরা গোয়েন্দাকেও বোকা বানিয়ে ছাড়ব। “কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বোন আমাকে বলেছিল যে আমি বড়োদিনের উপহার হিসেবে একখানা হাঁস নিতে পারি। আমার বোন কথার খেলাপ করে না। ভাবলাম, এই মওকায় একখানা হাঁস বেছে নিই, সেটাই আমার সঙ্গে কিলবার্নে পাথরটা বয়ে নিয়ে যাবে। উঠোনে একটা ছোটো ছাউনি মতন ছিল। আমি তার পিছনে একখানা হাঁসকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম। বেশ বড়োসড়ো একটা হাঁস। সাদা। কালো দাগওয়ালা লেজ। ধরলাম হাঁসটাকে। ওটার মুখ হাঁ করে যতখানি আঙুল যায় ঢুকিয়ে পাথরটা পুরে দিলাম। হাঁসটা পাথরটা গিলে নিল। কিন্তু হাঁসটা খুব ডানা ঝাপটাতে লাগল। আমার বোন ব্যাপারটা কি দেখার জন্য বেরিয়ে এল। আমি যখন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য পিছন ফিরেছি ওমনি হাঁসটা আমার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে দলের সঙ্গে মিশে গেল। “আমার বোন জিজ্ঞেস করল, ‘হাঁসটা নিয়ে কী করছিস্, দাদা?’ “আমি বললাম, ‘কিছু না। তুই বলেছিলি বড়োদিনে আমাকে একখানা হাঁস দিবি। আমি দেখছিলাম, কোনটা সবচেয়ে মোটা।’ “বোন বলল, ‘ও, ওই যে তোর জন্য আলাদা করে রেখেছি। আমরা ওটাকে বলি ‘দাদার হাঁস’। ওই যে বড়ো সাদা হাঁসটা। মোট ছাব্বিশটা আছে। একটা তোর, একটা আমাদের, বাকি দু-ডজন বাজারে যাবে।’ “আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ, ম্যাগি। তবে তোর কাছে সবগুলোই একরকম হয় তো আমি যেটা ধরেছিলাম, সেটাই নিই।’ “বোন বলল, ‘কিন্তু অন্যটার ওজন অন্তত তিন পাউন্ড বেশি। তোর জন্যই ওটাকে খাইয়ে দাইয়ে মোটা করেছি।’ “আমি বললাম, ‘আমার ওটাই বেশি পছন্দ। ওটাই নেবো। এখনই নিয়ে যাই?’ “আমার বোন একটু অসন্তুষ্ট হল। কিন্তু মুখে বলল, “আচ্ছা, তুই যা ভাল বুঝিস্! কোনটা নিবি? “‘ওই যে কালো ডোরা লেজওয়ালা সাদা হাঁসটা। পালের মধ্যে ঘুরছে।’ “‘ঠিক আছে, মেরে নিয়ে যা।’ “তারপর, মিস্টার হোমস, আমার বোন যেমনটা বলল, তেমনটাই করলাম। একটা হাঁস নিয়ে গেলাম কিলবার্নে। আমার বন্ধুকে আমার ফন্দির কথা বললাম। ওই লোকটাকেই একমাত্র সব কথা খুলে বলা যেত। আমরা খুব হাসলাম। তারপর একটা ছুরি নিয়ে হাঁসটা কাটলাম। কিন্তু পাথরটা সেখানে ছিল না। আমার তো মাথায় বজ্রাঘাত। নিশ্চয় কোনো ভুল হয়েছে। হাঁসটা ফেলে বোনের বাড়ি ছুটে এলাম। পিছনের উঠোনে গেলাম। কিন্তু সেখানে একটা হাঁসও ছিল না। “বোনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হাঁসগুলো কোথায় গেল, ম্যাগি?’ “‘দোকানে গেছে, দাদা।’ “‘কোন দোকানে?’ “‘কভেন্ট গার্ডেনের ব্রেকিনরিজের দোকানে।’ “আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা আমি যে হাঁসটা নিয়েছি, ওই রকম দেখতে আরও একটা হাঁস আছে কী?’ “‘হ্যাঁ, দাদা। ওই রকম লেজওয়ালা দুটো হাঁস আছে। একই রকম দেখতে। আমি দুটোকে আলাদা করে চিনতে পারতাম না।’ “তখনই ব্যাপারটা জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল। দৌড়ে গেলাম ওই ব্রেকিনরিজ লোকটার কাছে। কিন্তু ততক্ষণে সে সব হাঁস বেচে দিয়েছে। আমাকে বললও না, কার কাছে বেচেছে। আপনারা তার কথাই শুনেছেন আজ রাতে। সবসময় ওইরকমভাবেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে ও। আমার বোন ভাবছে, আমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছি। আমার নিজেরই মনে হচ্ছে, আমি পাগল হয়ে গেছি। আর এখন… এখন আমি দাগি চোর! যেটা চুরি করে চোর হলাম, সেটাই হারালাম। ভগবান আমাকে রক্ষা করুন! ভগবান আমাকে রক্ষা করুন।’ লোকটা দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল। অনেকক্ষণ কারো মুখে কোনো কথা ফুটল না। শুধু দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। আর টেবিলের কানায় হোমসের আঙুল চালানোর টিপ টিপ শব্দ। তারপর হোমস উঠে দরজাটা খুলল। বলল, “বেরিয়ে যাও!” “অ্যাঁ, মশায়? ও! ঈশ্বর আপনার ভাল করুন!” “একটাও কথা নয়। বেরিয়ে যাও!” কোনো কথার দরকারও পড়ল না। লোকটা ছুটে বেরিয়ে গেল। দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে রাস্তায় গিয়ে পড়ল। তারপর শুনলাম রাস্তা দিয়ে তার ছুটে পালানোর পায়ের শব্দ। পাইপটা টেনে নিয়ে হোমস বলল, “কথা হল, ওয়াটসন, পুলিশ আমাকে তাদের খামতি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য রাখেনি। হরনারের বিপদ থাকলে সে ব্যাপার আলাদা। তবে এই লোকটা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না। মামলাটাও আর টিকবে না। আমি যেটা করলাম, সেটা বেআইনি। কিন্তু এতে একটা লোককে বাঁচানো গেল। লোকটা আর চুরিচামারি করবে না। সাংঘাতিক ভয় পেয়েছে। এই লোকটাকে জেলে পাঠালে এ শেষটায় দাগি অপরাধীতে পরিণত হত। তাছাড়া এই উৎসব ক্ষমার উৎসব। কাকতালীয়ভাবে আমাদের দরজায় একটা রহস্য এসে পড়েছিল। সেটার সমাধান করতে পারাটাই আমার পুরস্কার। খাবার ঘণ্টাটা বাজাও, ডাক্তার, এবার অন্য একটা রহস্যের সমাধান করি। অবশ্য সেটাও এক পক্ষীরহস্য।” – রচনা-পরিচিতি অনূদিত নাম: নীল পদ্মরাগ মূল নাম: ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লু কারবাঙ্কল’ মূল রচনা: স্যার আর্থার কোনান ডয়েল অনুবাদ: অর্ণব দত্ত অলংকরণ: সিডনি পেজেট ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্লু কারবাঙ্কল’ ব্রিটিশ লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস গল্প-সংকলন দি অ্যাডভেঞ্চার অফ শার্লক হোমস-এর বারোটি গল্পের মধ্যে সপ্তম গল্প। এটি ১৮৯২ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয় স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন-এ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নীল পদ্মরাগ (শার্লক হোমসের বাংলা গোয়ন্দা গল্প) শেষ পর্ব

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২৬.ক্যারিবিয়ানের দ্বীপদেশে (৩)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X ডা: মার্গারেটের চোখের সামনেই শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার মতই মৃত্যুটিকে মনে হলো ডা: মার্গারেটের কাছে। রাজধানী গ্রান্ড টার্কস-এর একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর ছেলে এই শিশুটি। ডা: মার্গারেট পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে শিশুটির দিকে। মৃত্যুটি তার কাছে অবিশ্বাস্য। সকালে ডিউটিতে এসেই সে পরীক্ষা করেছে শিশুটিকে। সব ঠিক আছে। তার শারীরিক অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্টও ভাল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টায় কি ঘটে গেল। মরেই গেল শিশুটি। চিন্তার মধ্যে ডুবে গিয়েছিল ডা: মার্গারেট। ওয়ার্ডের ষ্টুয়ার্ড মেয়েটির কথায় সম্বিত ফিরে পেল ডা: মার্গারেট। সে বলছিল, ‘ম্যাডাম, ছেলেটিকে সরিয়ে ফেলতে হয়।’ ডা: মার্গারেট তাকাল ষ্টুয়ার্ডের দিকে। ভাবল অল্পক্ষণ। তারপর বলল, ‘ষ্টুয়ার্ড, আমি ছেলেটিকে মর্গে পরীক্ষা করাতে চাই।’ ‘কেন?’ অস্বাভাবিক কিছু সন্দেহ করেন?’ ‘ঠিক তা নয়, কিন্তু সকালে পরীক্ষার সময় একে যেমন পেয়েছি, তাতে এভাবে মরার কথা নয়। তাই কারণ জানতে চাই।’ ‘ম্যাডাম, তাহলে আপনি নোট দিন। ওয়ার্ডের হেড স্যার এবং হাসপাতালের ডিজি নোট অনুমোদন করলে তবেই মর্গে এই পরীক্ষা সম্ভব।’ ডা: মার্গারেট ভাবল কিছুক্ষণ। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আহমদ মুসার মনোহর অবয়বটি। আহমদ মুসার নির্দেশেই সে হাসপাতালের ইমারজেন্সী ওয়ার্ড থেকে অনেক তদবির করে বদলী নিয়ে প্রসূতি ও শিশু ওয়ার্ডে এসেছে। তাকে অনুরোধ করা হয়েছে, ওয়ার্ডের মুসলিম পুরুষ শিশুর উপর নজর রাখতে, তাদের কারো মৃত্যু হলে তার কারণ সন্ধান করতে। আহমদ মুসার এই অনুরোধ তার কাছে এক অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ। সে এই নির্দেশ পালন থেকে পিছাতে পারে না। ডা: মার্গারেট মুখ তুলল ষ্টুয়ার্ডের দিকে। বলল, ‘আসুন আমি নোট দিচ্ছি।’ ডা: মার্গারেট ওয়ার্ডে তার অফিসে এসে তার প্যাডে অফিসিয়াল একটা নোট লিখে ষ্টুয়ার্ডের হাতে তুলে দিল। নোট নিয়ে ষ্টুয়ার্ড চলে গেলে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল ডা: মার্গারেট। তার এই পদক্ষেপ সাধারণ দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক। অস্বাভাবিক মৃত্যুর পক্ষে সুস্পষ্ট কারণ ঘটলেই শুধু এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। একমাত্র প্রমাণহীন সন্দেহ ছাড়া তার দাবীর পক্ষে আর কিছু যুক্তি নেই। তাঁর উর্ধ্বতনরা তার সুপারিশকে কি দৃষ্টিতে দেখবেন? ডা: মার্গারেট যখন এসব ভাবনায় ডুবে আছে, তখন হন্ত-দন্ত হয়ে তার ঘরে প্রবেশ করল ডা: ওয়াভেল। প্রবেশ করেই বলল, ‘ডা: মার্গারেট আপনি কি নোট দিয়েছেন? এর কি প্রয়োজন?’ ডা: মার্গারেট উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে। বলল, ‘আমি যা মনে করেছি, সেটাই আমি নোটে লিখেছি স্যার।’ ‘ঠিক আছে। কিন্তু আপনার যুক্তি কি?’ ‘স্যার রোগীর রোগের ধরন, তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট কোন কিছুই শিশুটির মৃত্যু সমর্থন করে না। এটাই অস্বাভাবিকতা। এই অস্বাভাবিকতা কেন ডাক্তার হিসেবে আমাদের জানা কর্তব্য। এই কর্তব্যবোধ থেকেই আমি এই নোট দিয়েছি।’ বলল ডা: মার্গারেট। ‘হতে পারে রোগ নতুন কোন দিকে টার্ন নেয়ায় তার মৃত্যু ঘটেছে। যাই হোক রোগেই তার মৃত্যু ঘটেছে। এটা অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন নেই। নোট ফেরত নিন ডা: মার্গারেট।’ ‘ফেরত নেবার প্রয়োজন নেই স্যার। আপনি এবং ডিজি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই তো হবে।’ ‘ডা: মার্গারেট, আমরা ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে বাড়াবাড়ি করছি বলে মনে হয়।’ ‘দু:খিত স্যার, নোট আমার হাত থেকে চলে গেছে, এটা এখন আপনাদের এক্তিয়ারে। যা ভাল মনে করছেন, তাই করুন।’ ‘একটা নোট আমার কাছে পৌছার পর তা আমি ডিজিকে না দিয়ে পারি না। তাই বলছিলাম আপনি নোটটা প্রত্যাহার করলে ঝামেলা চুকে যায়।’ নরম সুরে বলল ডা: ওয়াভেল। ‘আপনি নোটে প্রয়োজন নেই লিখে দিন, তাহলেই তো হল।’ ‘আমি আপনার সাথে ঝগড়ায় নামতে চাচ্ছিলাম না ডা: মার্গারেট।’ ‘ঝগড়ার তো কিছু নেই। এটা মত পার্থক্যের ব্যাপার এবং এ মত পার্থক্য খুবই স্বাভাবিক।’ ‘এই মত পার্থক্যের প্রয়োজন কি? আমি এটা চাই না। আবার অনুরোধ করছি, নোটটা আপনি প্রত্যাহার করুন।’ স্তম্ভিত হলো ডা: মার্গারেট ডা: ওয়াভেলের এই অনুরোধে। তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য হলো, ডা: ওয়াভেলের মধ্যে কাকুতি মিনতির ভাব দেখে। একটা সামান্য বিষয় নিয়ে ডা: ওয়াভেলের মত একজন অত্যন্ত সিনিয়র ডাক্তার তার মত নবীন ডাক্তারের কাছে কাকুতি মিনতির পর্যায়ে নামবে কেন? এ বিষয়টাও ডা: মার্গারেটের কাছে শিশুটির মৃত্যুর মতই অস্বাভাবিক মনে হলো। এই চিন্তার সাথেই তার মনে হলো অস্বাভাবিকতার গ্রন্থি মোচন অবশ্যই হওয়া প্রয়োজন। অবশেষে বলল, ‘স্যার নোটের কথাই আবার বলছি, ডাক্তার হিসেবে আমাদের সকলেরই জানা দরকার কি কারণে বা কি রোগে তার মৃত্যু হলো। এতে আমরা জানতে পারবো আমাদের করণীয় কি।’ ‘এটাই তাহলে আপনার শেষ কথা?’ ‘আমি দু:খিত স্যার।’ ‘আপনি ভাল করলেন না ডা: মার্গারেট। আমি যা বলেছি, সব আপনার ভালোর জন্যেই বলেছি।’ ‘দু:খিত স্যার।’ ‘দু:খিত আমি আপনার জন্যে।’ বলে উঠে দাঁড়াল ডা: ওয়াভেল। ডা: ওয়াভেল চলে যাবার পর এলেমেলো চিন্তার মধ্যে আবার ডুবে গেল ডা: মার্গারেট। মন তার খারাপ হয়ে গেল একজন সিনিয়র ডাক্তারের অনুরোধ এভাবে প্রত্যাখ্যান করায়। ডা: ওয়াভেল এই ওয়ার্ডে আছেন ৫ বছরেরও বেশী কাল ধরে। পুরনো লোক উনি। কিন্তু ডা: মার্গারেট বুঝতে পারছে না, এমন পুরনো ও অভিজ্ঞ ডাক্তার অমন অযৌক্তিক অনুরোধ করতে পারলেন কেমন করে! তার চেয়ে বড় কথা হলো, তার অনুরোধের ধরন দেখে মনে হয়েছে আমি তার বিরুদ্ধে ক্ষতিকর যেন কিছু করেছি, যা থেকে আমিই তাকে উদ্ধার করতে পারি। আবার শেষের দিকে ‘আমি দু:খিত আপনার জন্যে’ বলে যে শক্ত কথা বললেন, সেটাও তাঁর ব্যক্তিগত অসন্তুষ্টি থেকে এসেছে। বিষয়টাকে এভাবে তিনি ব্যক্তিগত নিলেন কেন? মাথার চিন্তাটাকে হাল্কা করার জন্যে ওয়ার্ডে বের হলো ডা: মার্গারেট। রোগীদের খোঁজ খবর নিতে শুরু করল। এক সময় একজন এ্যাটেনডেন্ট ছুটে এল ডা: মার্গারেটের কাছে। বলল, ‘শীঘ্রী চলুন, ডি জি স্যারের টেলিফোন।’ নিজের অফিসে ফিরে এসে টেলিফোন ধরল ডা: মার্গারেট। ওপার থেকে ডিজি বলল, ‘তুমি যে নোট দিয়েছ, তা ডা: ওয়াভেল সমর্থন করেননি। শিশুটির মৃত্যুর অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে তুমি কতটা নিশ্চিত?’ ‘আমার দাবীর ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। শুরু থেকেই আমি শিশুটির রোগের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করছি। এবং আজ সকালেও যা দেখেছি, তাতে ঐ রোগে মৃত্যুটা একেবারেই অস্বাভাবিক।’ ‘তাহলে আমি সার্বিক পরীক্ষার অর্ডার দেব?’ ‘স্যার যদি আমার উপর আস্থা রাখতে পারেন।’ ‘তোমার রেকর্ড আমি জানি। সে জন্যেই টেলিফোন করলাম তোমাকে। আমি ওয়ার্ড-এর ইনচার্জের মতকেই তো ও,কে করতে পারতাম।’ ‘ধন্যবাদ স্যার।’ ‘ও.কে মাই ডটার। তোমার সাফল্য কামনা করি। ধন্যবাদ।’ টেলিফোন রেখে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল ডা: মার্গারেট। পরদিন বিকেল। ওয়ার্ডে ঘুরতে গিয়ে দুটি শিশুর অবস্থার আকস্মিক পরিবর্তন দেখে চমকে উঠল ডা: মার্গারেট। এ দু’টি শিশুর উপরও ডা: মার্গারেট ঘনিষ্ঠ দৃষ্টি রেখে আসছিল, শিশু দু’টি ভূমিষ্ঠ হয়ে বেডে আসার পর থেকে। শিশু দু’টি মুসলিম পুরুষ শিশু। গতকাল রাতে ডিউটি থেকে যাবার সময় ডা: মার্গারেট শিশু দু’টিকে দেখে গেছে। সবদিক দিয়েই ভাল ছিল। কিন্তু আজ এসে দেখছে, শিশু দু’টির প্রাণশক্তি যেন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বাইরে রোগের তেমন কোন লক্ষণ নেই, ভেতরে থাকলেও তা বলার শক্তি শিশুর নেই। অবসাদগ্রস্থতা একমাত্র লক্ষণ। ধীরে ধীরে বাড়ছে শিশু দু’টির অবসাদগ্রস্থতা। আগের শিশুটির সাথে এর দু’টি শিশুর যেটুকু পার্থক্য তা হলো, ঐ শিশুটি নীরব ঘুমের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়ে গেছে, আর এ দু’টি শিশু ঘুম নয়, এমনিতেই নিশ্চল হয়ে পড়ছে, যেন ধীরে ধীরে মৃত্যু এসে গ্রাস করছে শিশু দু’টিকে। ডা: মার্গারেট দ্রুত শিশু দু’টির ফাইলে তাদের প্যাথোলজিক্যাল টেষ্ট সুপারিশ করল এবং লাল কালিতে টপ প্রায়োরিটি লিখল। ফাইলটি আয়ার হাতে তুলে দিয়ে ডা: মার্গারেট সহকারী ডাক্তারকে ওয়ার্ডের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি একটু হাসপাতাল লাইব্রেরীতে যাচ্ছি। কেউ খোঁজ করলে বলো।’ আধ ঘণ্টা পর ওয়ার্ডে ফিরে এল ডা: মার্গারেট। ওয়ার্ডে ঢুকতেই তার সহকারী ডাক্তার মুখ শুকনো করে বলল, ‘ডা: ওয়াভেল স্যার আপনার নোট গ্রহণ না করে নিউরো টেষ্ট রিকোসেন্ড করে শিশু দু’টিকে নিউরো বিভাগে স্থানান্তরিত করেছে।’ চমকে উঠল ডা: মার্গারেট। বলল, ‘নিউরো প্রোব্লেম এখানে মূল ইস্যু নয়। নিউরো টেষ্ট দিয়ে কি হবে?’ বলে হতাশভাবে চেয়ারে বসে পড়ল ধপ করে। আর কোন কথা না বলে ডা: মার্গারেট চেয়ারে গা এলিয়ে চোখ বুজল। চোখ বুজতেই শিশু দু’টির ছবি তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। শিশু দু’টির যা অবস্থা তাদের প্যাথোলজিক্যাল টেষ্ট দরকার। তাতে শিশু দু’টিকে বাঁচানো যেত কিনা বলা মুষ্কিল, কিন্তু রোগটা জানা যাবে, রোগের কারণ জানা যাবে, জানা যাবে কেন কেমন করে দু’টি শিশু একই সময়ে একই রোগে আক্রান্ত হলো। কিন্তু কি করবে সে! এই ছোট ব্যাপার নিয়ে সে ওয়ার্ড প্রধানকে ডিঙিয়ে ডিজি’র কাছে যেতে পারে না। ওয়ার্ডে সেদিনের শেষ রাউন্ডটা শেষ করে ডা: মার্গারেট অফিস কক্ষে ফিরে হাত ব্যাগ নিয়ে বেরুচ্ছিল এমন সময় তার টেবিলের টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন ধরল ডা: মার্গারেট। ‘আমি ডা: কনরাড। আমি ডা: ওয়াভেলকে না পেয়ে তোমার কাছে টেলিফোন করলাম।’ ওপার থেকে কণ্ঠ ভেসে এল। নাম শুনেই শশব্যস্ত হয়ে উঠল ডা: মার্গারেট। বলল, ‘স্যার আমি ডা: মার্গারেট।’ ডা: কনরাড নিউরোলজীর প্রফেসর। নিউরো ওয়ার্ডের প্রধান তিনি। ‘তোমাকেই চাচ্ছি আমি। যে শিশু দু’টিকে ডা: ওয়াভেল এ ওয়ার্ডে রেফার করেছিলেন, আমি ওদের দেখেছি। আমি ওদের ফেরত পাঠালাম। তোমার নোটই ঠিক। প্রোব্লেমটা আমার ধারণায় প্যাথোলজিক্যাল। তোমরা তাড়াতাড়ি দেখ ওদিকটা। খুবই সংকটাপন্ন ওদের অবস্থা।’ বলল ডা: কনরাড। ডা: মার্গারেট খুশী হলো, উদ্বিগ্নও হলো সেই সাথে শিশু দু’টির ভবিষ্যত নিয়ে। টেলিফোন রেখে দ্রুত ওয়ার্ডে ফিরে এল ডা: মার্গারেট। ইতিমধ্যে শিশু দু’টিকে পৌছানো হয়েছে ওয়ার্ডে। ডা: মার্গারেট তাড়াতাড়ি ডা: কনরাড-এর রেফারেন্স দিয়ে আরেকটা নোট লিখল শিশু দু’টির ফাইলে। নোট লেখা শেষ করেই ডা: মার্গারেট সহকারী ডাক্তারকে বলল, ‘নোট অনুসারে এদের টেষ্টের ব্যবস্থা কর। পরবর্তী ডাক্তার ডিউটিতে না আসা পর্যন্ত আমি আছি।’ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাড়ি আসার জন্যে যখন গাড়িতে উঠল ডা: মার্গারেট, তখন মনটা তার অনেক হালকা মনে হলো। শিশু দু’টির উপযুক্ত টেষ্টের ব্যবস্থা হয়েছে। মনে মনে ধন্যবাদ দিল ডা: কনরাডকে। পরদিন হাসপাতালে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়েছে ডা: মার্গারেট। হাসপাতালে ডিউটিতে যাচ্ছে বটে, কিন্তু তার মন খারাপ। ডা: মার্গারেট শিশু বিশেষজ্ঞ না হওয়ার অভিযোগ তুলে তাকে প্রসূতি ওয়ার্ড থেকে বদলীর জন্যে ডা: ওয়াভেল গতকালই এক সুপারিশ পাঠিয়েছে ডিজি ডাক্তার ক্লার্কের কাছে। ডা: মার্গারেট শিশু বিশেষজ্ঞ নয়, এ কথা ঠিক। কিন্তু সে মেডিসিনের ডাক্তার। হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম অনুসারে প্রত্যেক ওয়ার্ডেই অন্তত একজন করে মেডিসিনের ডাক্তার থাকবে। তাছাড়া প্রসূতি ও শিশু রোগের উপর ডাক্তার মার্গারেটের একটা বিশেষ ট্রেনিং আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন মেডিকেল ইনষ্টিটিউট থেকে। ডা: মার্গারেট কিছুতেই বুঝতে পারছে না ডা: ওয়াভেল কেন তার প্রতি বিরূপ। দু’তিন দিন আগে তিনটি শিশু নিয়ে যা ঘটেছে, তা প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিনের সাধারণ দৃশ্য। একে তার অন্যভাবে নেবার কারণ নেই। তাহলে? এই তাহলের কোন উত্তর মার্গারেটের কাছে নেই। প্রস্তুত হয়ে হাসপাতালে যাবার জন্যে হাতব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল ডা: মার্গারেট। টেলিফোন বেজে উঠল। যাবার জন্যে পা তুলেও আবার ফিরে দাঁড়াল ডা: মার্গারেট। টেলিফোন ধরল। টেলিফোন ধরেই সচকিত হলো ডা: মার্গারেট। ডিজি ডা: ক্লার্কের টেলিফোন। ‘স্যার আপনি। কিছু ঘটেনি তো?’ ডা: ক্লার্কের কণ্ঠ শুনেই শশব্যস্তে জিজ্ঞেস করল ডা: মার্গারেট। ‘কিছু তো ঘটেছেই। তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি মার্গারেট। এখনই ল্যাবরেটরি থেকে ডা: বিশপ জানালেন, তিনটি শিশুর রক্তেই অস্বাভাবিক ও ভয়ংকর ধরনের উপাদান পাওয়া গেছে। তিনটি শিশুর কেউ বাঁচেনি বটে, কিন্তু তারা ভয়ংকর কোন রোগের বিষয়ে আমাদের চোখ খুলে দিয়ে গেল। তোমার সচেতনতার ফলেই তাড়াতাড়ি বিষয়টা জানা সম্ভব হয়েছে।’ বলল ডা: ক্লার্ক। ‘ধন্যবাদ স্যার। একজন ডাক্তারের যা করণীয় তার বেশি কিছু করিনি স্যার।’ ‘ধন্যবাদ, মার্গারেট। রাখি, বাই।’ ‘বাই, স্যার।’ টেলিফোন রাখল মার্গারেট। চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মার্গারেটের। গত দু’তিন দিনের উদ্বেগ ও বিষণœতা, ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল মন থেকে। তার একটা ভয় ছিল, প্যাথেলজিক্যাল টেস্টে যদি কিছু না পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্বে ডা: ওয়াভেলের অভিযোগ আরও মজবুত হবে এবং প্রসূতি ওয়ার্ড তাকে অবশ্যই ছাড়তে হবে। তা যদি হয়, তাহলে আহমদ সুসার কাছে তার মুখ দেখাবার মত থাকবে না। আহমদ মুসা হয়তো ভাববে, আমার নির্বুদ্ধিতার কারণেই আহমদ মুসার একটা পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল। এই দু:সহ অবস্থায় তাকে যে পড়তে হলো না এ জন্যে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। শিশু তিনটির প্যাথোলজিক্যাল টেস্টের এই রেজাল্ট পেলে আহমদ মুসা দারুণ খুশি হবে। কিভাবে মুসলিম পুরুষ শিশুগুলো মরছে তার কারণ সে চিহ্নিত করতে চায়। কারণ চিহ্নিত হলে কারণের উতস সে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করবে। এটা ভাবেত গিয়ে আহমদ মুসার হাস্যোজ্জ্বল মুখ ডা:মার্গারেটের চোখে ভেসে উঠল। তার সাথে সাথে তার হৃদয় এল প্রশান্তির একটা পরশ। তার মনে হলো,হৃদয়ের ফ্রেমে এ মুখটা এভাবেই সব সময় বাঁধা থাকতো! এটা ভাবতে গিয়ে চমকে উঠল ডা:মার্গারেট। একটা অনধিকার চর্চার ভয় ও লজ্জা এসে তাকে ঘিরে ধরল। মন থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে হাসপাতালে যাবার জন্যে পা বাড়াল সে। কিন্তু সংগে সংগেই পা আবার থেমে গেল। ভাবল, আহমদ মুসাকে বিষয়টা সে তো টেলিফেনে জানাতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল হাসপাতারৈ গিয়ে রিপোর্ট দেখে বিস্তারিত জানানোই ঠিক হবে। পা বাড়াল আবার সে হাসপাতালে যাবার জন্যে। নিজস্ব গাড়িতে করে যাচ্ছে সে হাসপাতালে। ডা:মার্গারেটের আব্বা ছিল একজন বৃটিশ সেনা অফিসার। সুতরাং নিজেদের গাড়ি, বাড়ি নিয়ে তারা গ্রান্ড টার্কস দ্বীপের সচ্ছল পরিবারের একটি। তাদের বাড়িকে সবাই কর্নেলের বাড়ি বলে জানে। তার আব্বা কর্নেল র‌্যাংক থেকে রিটায়ার করে। ডাক্তার মার্গারেট ও জর্জ দু’টি সন্তানই মাত্র তার। চলছে মার্গারেটের গাড়ি। গাড়িটা সুন্দর নতুন একটা কার। রাস্তায় তেমন ভীড় নেই। ডা:মার্গারেট তার গাড়ির রিয়ারভিউতে দেখল, পিছন থেকে একটা ট্রাক আসছে নির্ধারিত গতির চেয়ে অনেক বেশি তীব্র বেগে। ডা: মার্গারেট সাবধানতা হিসাবে তার গাড়িটাকে রাস্তার পাশ বরাবর চাপিয়ে নিয়ে ট্রাককে বেশি জায়গা দিয়ে দিল। পরবর্তী কয়েক সেকেন্ড কি ঘটল ডা:মার্গারেট কিছুই বুঝল না। শুধু তার মনে হলো, ট্রাকটি এসে তার গাড়ির উপর পড়েছে। তারপর কিছুই মনে নেই তার। রাস্তার পাশ বরাবর ছিল রেলিং-এর পর খাল। খালটি প্রাকৃতিক নয়, তৈরি করা। রাজধানী শহরের মধ্য দিয়ে খালটি দ্বীপের বুক চিরে সাগরে গিয়ে পড়েছে। ট্রাকের প্রচন্ড ধাক্কায় ডা: মার্গারেটের গাড়িটা রেলিং ভেঙে ছিটকে গড়িয়ে পড়ল খালে। হাসপাতাল বেডে জ্ঞান ফিরে পেয়ে ডা: মার্গারেট দেখতে পেল জর্জকে। জর্জের চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং ঠোঁটে ফুটে উঠল হাসি। মুখে ফুটে উঠল স্বস্তির চিহ্ন। ডা: মার্গারেটের ঠোঁটেও ফুটে উঠল ম্লান হাসি। ধীর কণ্ঠে বলল, ‘এখন সময় কতরে জর্জ?’ ‘বিকেল পাঁচটা।’ উত্তরটা দিয়েই জর্জ আবার শুরু করল, ‘মাথার আঘাতটাই বড়, কিন্তু তাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। খুব অল্পের জন্যে খুব বড় ক্ষতি থেকে আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়েছেন। সবাই খুশী হয়েছে। ডা: ক্লার্ক, ডা: কনরাড দু’জনেই অপারেশনের সময় হাজির ছিলেন।’ ‘ডা: ওয়াভেল ছিলেন না?’ ‘উনি এসেছিলেন, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকেননি। কি কাজ থাকায় চলে যান।’ ‘আর কেউ আসেনি?’ ‘কেন, হাসপাতালের সব ডাক্তারই এসেছিল।’ ‘আর কেউ?’ মার্গারেটের ঠোঁটে ম্লান হাসি। জর্জ ডা: মার্গারেটের মুখের দিকে চাইল, তারপর চিন্তা করল। পরক্ষণেই হেসে উঠল। বলল, ‘হ্যাঁ ভাইয়া এসেছিলেন। দু’জন এক সাথে এসেছিলাম। তোমাকে দেখে তো উনিই প্রথম বলেন, ‘আল্লাহ মার্গারেটেকে বাঁচিয়েছেন।’ ম্লান হাসল মার্গারেট। বলল, ‘উনি আছেন?’ ‘না আপা। উনি তোমাকে দেখেই দুর্ঘটনার স্পটে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে আবার হাসপাতালে এসেছিলেন। এসে আমার সাথে কিছু কথা বলেই আবার চলে গেছেন।’ বলে জর্জ তার গলার স্বরটা আর একটু নামাল এবং ডা: মার্গারেটের দিকে আর একটু ঝুকে পড়ে বলল, ‘শুরু থেকেই পুলিশ বলছে তোমার ওটা এ্যাকসিডেন্ট, সবাই বিশ্বাসও করেছে। কিন্তু আহমদ মুসা ভাই এ্যাকসিডেন্টের স্পট দেখে এসে আমাকে বলে গেলেন, ‘ট্রাকটি রাস্তার যেখানে এসে মার্গারেটের গাড়ির যে জায়গায় আঘাত করেছে, তাতে এই আঘাত নি:সন্দেহে পরিকল্পিত। সুতরাং এ্যাকসিডেন্ট নয়।’ ডা: মার্গারেটের মুখের আলোটা হঠাৎ দপ করে নিভে গেল। তার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। বলল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে, ‘ঠিক, আমারও এখন তাই মনে হচ্ছে। ট্রাকটার তীব্র গতি দেখে আমি আমার গাড়ি রাস্তার কিনার বরাবর সরিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে এসেই ট্রাকটি আঘাত করে আমার গাড়িকে। ট্রাকটি কি এ্যাকসিডেন্টে পড়েছে?’ ‘না পালিয়েছে।’ ‘একমাত্র ব্রেক ফেল হলেই ট্রাকটা ঐভাবে আমাকে পাগলের মত আঘাত করতে পারতো। সে ক্ষেত্রে ট্রাকটিও এ্যাকসিডেন্টে পড়ত। তা যখন হয়নি, তখন ঠিকই ওটা এ্যাকসিডেন্ট নয়।’ ‘কিন্তু আপা ওটা যদি এ্যাকসিডেন্ট না হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে কে তোমাকে ওভাবে হত্যা করতে চেয়েছিল?’ ‘জানি না জর্জ। আমার কোন শত্রু আছে বলে হয় না।’ বলে একটু থেমেই ডা: মার্গারেট আবার বলল, ‘উনি কোথায় গেলেন?’ ‘ভাইয়া?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘যে ট্রাকটা এ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়েছে, তার খোঁজ পাওয়া যায় কিনা উনি বলেছিলেন। কিন্তু কোথায় কি কাজে গেছেন আমি জানি না।’ ডা: মার্গারেট কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বলা হলো না। ঘরে প্রবেশ করলেন ডা: ক্লার্ক। তার সাথে ছিল ওয়ার্ডের ডাক্তার। ‘এই তো সেরে গেছ মার্গারেট। তুমি খুব লাকি। মাত্র দেড়-দু’ইঞ্চির জন্যে ভয়ানক পরিণতি থেকে বেঁচে গেছ।’ বলতে বলতে ডা: ক্লার্ক ডা: মার্গারেটের সামনে এসে দাঁড়াল। জর্জ উঠে আগেই পাশে সরে গেছে। ডা: ক্লার্ক মার্গারেটের একটা হাত তুলে নিয়ে নাড়ী দেখে বলল, ‘বাঃ সবকিছুই নরমাল।’ ‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলল মার্গারেট। ‘শুনলাম, এ্যাকসিডেন্ট খুব মারাত্মক ছিল। অবশ্য তোমার কোন দোষ ছিল না। ট্রাকটাই হঠাৎ নাকি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।’ ডা: ক্লার্ক থামল। ডা: মার্গারেট একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল, ‘স্যার মাফ করবেন, ঐ রিপোর্টগুলো আপনি পেয়েছেন?’ মার্গারেটের প্রশ্নের সাথে সাথেই ডা: ক্লার্কের মুখ মলিন হয়ে গেল। মুহূর্ত কয়েক বাকহীন হয়ে থাকার পর ডা: ক্লার্ক বলল, ‘ও তুমি ঘটনাটা এখনও জানতে পারনি। রিপোর্টগুলো এবং রিপোর্টের সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছু চুরি গেছে।’ ‘চুরি গেছে?’ ‘হ্যাঁ। ডা: বিশপ রাতে ডিউটি থেকে যাবার সময় রিপোর্ট তার ফাইলে রেখে গিয়েছিল এবং পরীক্ষিত ব্লাড, ইউরিন ইত্যাদি রীতি অনুসারে ল্যাবেই রাখা ছিল। তোমাকে টেলিফোন করার ক’মিনিট আগে ডা: বিশপ-এর টেলিফোন পাই। টেলিফোন করেই অফিসে যান। অফিসে গিয়ে রিপোর্ট এবং ওগুলোর কিছুই পাননি।’ বিষয়টা ডা: মার্গারেটের জন্যে শ্বাসরুদ্ধকর বিস্ময়ের। কিছুক্ষণ সে কথা বলতে পারল না। ডা: ক্লার্কই আবার কথা বলল বলল, ‘আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। তুমি আমার ছাত্রী এবং মেয়ের মত। বলতে বাধা নেই। বিষয়টা খুব জটিল মনে হচ্ছে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’ একটু থামল ডা: ক্লার্ক। দু’পাশে তাকাল। দেখল সাথের ডাক্তার ও নার্স ওদিকের টেবিলের দিকে গিয়ে ডা: মার্গারেটের ফাইল নিয়ে আলোচনা করছে। ডাক্তার ক্লার্ক বলল, ‘চুরির খবর জানার সাথে সাথে আমি বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি এবং থানায় কেস করার সিদ্ধান্ত নেই এবং পুনরায় লাশ তিনটিকে টেষ্টের চিন্তা করি। সংগে সংগেই বিষয়টা আমি ডা: ওয়াভেল ও ডা: বিশপকে জানিয়ে দেই। মাত্র আধ ঘণ্টা পরে আমি টেলিফোন পাই। একটা ভারি কণ্ঠ যান্ত্রিক স্বরে বলে, ‘ডাক্তার সাহেব, তিনটি শিশুর প্যাথোলজিক্যাল টেষ্টের রিপোর্ট এবং আনুসঙ্গিক জিনিসগুলো হারানোর ব্যাপারে থানায় নাকি মামলা করছেন এবং লাশগুলোকে আবার নাকি পরীক্ষা করাবেন শুনলাম। শুনুন ডাক্তার, বিশেষ প্রয়োজনে ওগুলো আমরা নিয়েছি। আমরা চাই, নতুন টেষ্ট এবং থানায় মামলা করার ব্যাপারে এক ইঞ্চি এগুবেন না। এগুলে রিপোর্টগুলো যেভাবে গায়েব হয়েছে, সেভাবে আপনিও গায়েব হয়ে যাবেন।’ শুকনো কণ্ঠে কথাগুলো বলল ডা: ক্লার্ক। তার চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন। ‘তারপর স্যার?’ ভয় মেশানো উদগ্রীব কণ্ঠে বলল ডা: মার্গারেট। ‘ডা: ওয়াভেলের সাথে আলাপ করলাম। ডা: বিশপ-এর সাথেও। ডা: ওয়াভল এই ছোট্ট বিষয় নিয়ে কোন ঝুঁকি নেয়ার বিরোধীতা করলেন। অন্যদিকে ডা: বিশপ ভীত হয়ে পড়েন। তবে মামলা ও টেষ্টের পক্ষে তিনি। কিন্তু আবার মামলার জড়িত হয়ে বিপদ ডেকে আনতে চান না। এই অবস্থায় মামলা করা ও নতুন পরীক্ষায় সাহস পাচ্ছি না।’ বলল ডা: ক্লার্ক। হতাশা নেমে এল ডা: মার্গারেটের চোখে মুখে। বলল, ‘তাহলে শিশু তিনটির মৃত্যুর কারণ জানার আর উপায় রইল না স্যার। তার ফলে এভাবে হয়তো শিশু মৃত্যু ঘটেই চলবে।’ ‘স্যরি, মাই ডটার।’ বলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ডা: ক্লার্ক বলল, ‘তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। ঈশ্বর আছেন মার্গারেট।’ ডা: ক্লার্ক চলে যাবার অনেক সময় পর। ডা: মার্গারেট তার বেডে শুয়ে। আহমদ মুসা তার পাশে চেয়ারে বসে। জর্জ দাড়িয়েছিল আহমদ মুসার পেছনে। ডাক্তার, নার্স, কেউ তখন ঘরে নেই। ডাক্তার মার্গারেট গত তিনদিনের কাহিনী বলছিল আহমদ মুসাকে। বলছিল কিভাবে সেদিন প্রথম মুসলিম শিশুটির মৃত্যু হওয়ায় সন্দেহ জাগে, কিভাবে মৃত শিশুর পোষ্টমর্টেম মার্গারেট দাবী করলে ডাক্তার ওয়াভেল তার বিরোধীতা করেন, কিভাবে ডাক্তার ক্লার্কের সমর্থনে শিশুটির লাশ পোষ্টমর্টেমে যায়, কিভাবে ১দিন পরে দু’টি মুসলিম শিশু দুর্বোধ্য রোগে সংকটজনক অবস্থায় পড়ে। ডা: মার্গারেট তার প্যাথোলজিক্যাল টেষ্টের সুপারিশ করেন এবং ডাক্তার ওয়াভেলের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন, কিভাবে তাদের টেষ্ট অবশেষে হয়, কিভাবে তিনটি টেষ্টের রিপোর্ট ও পরীক্ষিত আইটেম মিসিং হয়েছে, কিভাবে তার এ্যাকসিডেন্ট হয় এবং কিছুক্ষণ আগে ডা: ক্লার্ক তার উপর হুমকি আসার বিষয়ে কি বলে গেলেন। গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিল আহমদ মুসা। কাহিনী শেষ করে ডা: মার্গারেট থামলেও আহমদ মুসা কথা বলল না। ভাবছিল সে। তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বলল সে ডাক্তার মার্গারেটকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি দু’দিনে বহুদূর এগিয়েছ। শিশু তিনটির মৃত্যুর কারণ জানা গেল না, কিন্তু কারণের উৎস চিহ্নিত হয়ে গেছে। তোমাকে ধন্যবাদ মার্গারেট।’ ডা: মার্গারেটের চোখ-মুখ আনন্দের বন্যায় ভেসে গেল। আহমদ মুসা তার কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে, প্রশংসা করেছে, এটুকু পাওয়ায় তার সব ব্যথা-বেদনা ভুলিয়ে দিল। দুর্বোধ্য একটা আনন্দের সুখ-শিহরণ খেলে গেল তার দেহ, মনে এবং প্রতিটি রক্ত কণিকায়। একটু সময় নিয়ে ডাক্তার মার্গারেট বলল, ‘উৎস চিহ্নিত হয়েছে? আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না।’ ‘এটুকু জেনে রাখ আইসবার্গের অনেক মাথার একটা মাথা ডা: ওয়াভেল হতে পারেন।’ বিস্মিত ডা: মার্গারেট কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘ডা: ওয়াভেলের বাসা কোথায়?’ ‘হাসপাতালের পাশেই ডাক্তারদের রেসিডেন্সিয়াল ব্লকে। নম্বার এফ-১৩।’ ‘ওর কোন ক্লিনিক আছে?’ ‘নিজস্ব ক্লিনিক নেই, কিন্তু একটা ক্লিনিকে তিনি বসেন। বাসায় আমার টেলিফোন ইনডেক্সে ঠিকানা আছে।’ ‘মার্গারেট তিনটি শিশুর নাম আমার দরকার। রিপোর্টে তাদের নাম যেভাবে আছে।’ মার্গারেট তাকাল জর্জের দিকে। কাগজ কলম নিতে বলল জর্জকে। মার্গারেট নাম তিনটি বলল লিখে নিল জর্জ। নাম লেখা স্লিপটা হাতে নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ‘ধন্যবাদ মার্গারেট।’ ‘এসব নিলেন, কিছু করতে চাচ্ছেন?’ বলল মার্গারেট উদ্বিগ্ন কণ্ঠে। ‘কতটুকু কি করতে পারব জানি না। কিছু করতে তো হবেই এবং সেটা কাল সকালের আগেই।’ ‘কি সেটা?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠ মার্গারেটের। ‘সবই জানবে, তবে এখন নয়, এখানে নয়।’ বলে উঠে দাঁড়াচ্ছিল আহমদ মুসা। রুমে প্রবেশ করল লায়লা জেনিফার এবং সারা উইলিয়াম। কথা না বললে ওদের চিনতেই পারতো না আহমদ মুসা। দু’জনের পরণে ছেলের পোশাক। মাথায় হ্যাটও ছেলেদের। বলা যায় নিখুঁত ছদ্মবেশ। বাইরে বেরুলে লায়লা জেনিফারকে ছদ্মবেশ নিতে বলা হয়েছে। এটা আহমদ মুসারই নির্দেশ। বা! তোমরা সুন্দর ছদ্মবেশ নিয়েছ।’ বলল জেনিফারদের আহমদ মুসা। ‘না ভাইয়া, এ আমি পারব না। কি লজ্জা, তার চেয়ে ভাল আমি বাইরেই বেরুব না।’ মুখ লাল করে বলল জেনিফার। ‘বেশিদিন এ কষ্ট করতে হবে না জেনিফার। দেখ তোমার তালিকায় এবার মার্গারেটও পড়েছে। আজ আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। মার্গারেটকেও সাবধান থাকতে হবে।’ বলে আহমদ মুসা মার্গারেটের দিকে তাকিয়ে বলল, ’যে কয়দিন তুমি হাসপাতালে আছ, তেমন কোন ভয় নেই। কিন্তু তারপর আমার মনে হয় একটা বিপজ্জনক সময় তোমাকে পাড়ি দিতে হবে।’ ‘কেমন?’ বলল মার্গারেট। ‘সামনে তুমি শত্রুর আরও বড় টার্গেট হয়ে দাঁড়াতে পার।’ ‘জানি, আপনি বেশি বেশি ভয় দেখাচ্ছেন, যাতে আমি সাবধান হই।’ ‘না মার্গারেট, সাউথ টার্কো দ্বীপের এক পর্যায়ের লড়াই সমাপ্ত হলো। আরেক লড়াই শুরু হয়ে গেছে।’ বলল গম্ভীর কণ্ঠে আহমদ মুসা। থামল আহমদ মুসা। একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘সত্যি আমি একটু স্লো হয়ে গিয়েছিলাম, বুঝতে পারিনি, আঘাতটা দ্রুত আসবে। সবই আল্লাহর ইচ্ছা, কিন্তু আমার অসাবধানতার জন্যে মার্গারেটের জীবন বিপন্ন হয়েছিল।’ বিষন্ন হয়ে উঠল মার্গারেটের মুখ। বলল, ‘না পরিস্থিতিটা আপনাকে জানাইনি, এটা আমারই দোষ।’ ‘না মার্গারেট, আমার এখন মনে হচ্ছে, খুব একটা চিন্তা না করেই তোমাকে কঠিন এক বিপদে ঠেলে দিয়েছি। হয়তো এই কাজটা অন্যভাবে করতে পারতাম।’ ডা: মার্গারেটের মুখে ক্ষোভের চিহ্ন ফুটে উঠল। চোখের দৃষ্টি আবেগে ভারি হয়ে উঠেছে তার। বলল, ‘সব বিপদ আপনি আপনার জন্যে বরাদ্দ করে নেবেন। কেন বিপদ মোকাবিলার মন, শক্তি কিছুই বুঝি আমাদের নেই। আদেশ দিয়ে দেখুন না, আগুনেও ঝাপ দিতে পারি কিনা।’ কণ্ঠ ভারি মার্গারেটের। কথা শেষ করেই ওপাশে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে মার্গারেট। আহমদ মুসা হাসল। উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ধন্যবাদ মার্গারেট তোমাদের। আমি নিশ্চিত, লড়াইয়ে আমরা জিতব। ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চল তোমাদের যে পেয়েছে, এ জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।’ কথা শেষ করে আহমদ মুসা ফিরল জেনিফারের দিকে। আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু আহমদ মুসার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে জেনিফার বলল, ‘ভাইয়া মার্গারেট আপা’র মত সাহসীদের লক্ষ্য করে ‘তোমাদের’ শব্দ বললেন, তার মধ্যে আমি আছি কিনা?’ ‘কেমন করে থাকবে? একটা ছদ্মবেশ পরার ভয়ে বাইরে বেরুতে চাচ্ছ না। তাহলে কি পারবে তুমি বল?’ হেসে বলল আহমদ মুসা। ‘ঠিক আছে পারব না। একদিন একটা গাড়ি এ্যাকসিডেন্ট করে দেখাব।’ ‘এ্যাকসিডেন্ট করো, কিন্তু আহত, নিহত না হও সেটা দেখো।’ ‘তাতে কার কি ক্ষতি?’ ‘এ প্রশ্নের জবাব জর্জ দিতে পারবে। তবে আমার একটা ক্ষতি আছে, ঝগড়া করা ও ঝামেলা পাকাবার লোক থাকবে না।’ ‘আমি ঝামেলা পাকাই?’ ‘তুমি ঝামেলা পাকিয়েই তো আমাকে নিয়ে এসেছ।’ বলেই আহমদ মুসা ‘চলি’ বলে হাঁটা শুরু করল কক্ষ থেকে বেরুবার জন্যে। জেনিফার ছুটে গিয়ে আহমদ মুসার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমার তো আরও কথা আছে। যেতে দেব না।’ আহমদ মুসা তাকে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘সাউথ টার্কো দ্বীপে পুলিশ প্রহরা ভালো চলছে। শত্রুদের চররা কিছুদিন সাউথ টার্কো দ্বীপে সক্রিয় ছিল, কিন্তু কোন খবর সংগ্রহ করতে না পেরে, তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে, ইত্যাদি কথা বলবে তো আমি জানি।’ আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ডা: মার্গারেট আবার এ পাশ ফিরেছে। জেনিফারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমাকে উনি এত ¯েœহ করেন তাতো জানতাম না।’ ‘আর আপনাকে যে উনি আকাশে তুললেন সেটা কি?’ ‘আকাশে তোলা আর কাছে টানা এক জিনিস নয়।’ কথাটা বলেই মার্গারেট বুঝতে পারল মুখ ফসকে যা বলার নয় তাই বেরিয়ে গেছে। কথাটা সংশোধন করার জন্যে মার্গারেট সংগে সংগেই আবার বলল, ‘তোমার মত অমন কাছে হতে পারা সবার জন্যেই সৌভাগ্যের।’ জেনিফার জর্জের দিকে চেয়ে একটা দুষ্টুমি হেসে ডাঃ মার্গারেটকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ডাক্তার ও নার্স ঘরে এসে প্রবেশ করায় মুখ তেতো করে নীরব হয়ে যেতে হলো জেনিফারকে। ডাঃ মার্গারেটের কক্ষ থেকে বের হয়ে আহমদ মুসা প্রথম কাজ ঠিক করল, ডাঃ ওয়াভেল কোথায় তা জানা। আহমদ মুসা নিঃসন্দেহ যে, হয় ডাঃ ওয়াভেল নিজে রিপোর্টগুলো চুরি করেছে, না হয় সে চুরি করতে সাহায্য করেছে। সুতরাং তাকে পাওয়া দরকার। আহমদ মুসা ছুটল ডিউটি রুমের দিকে। ওয়ার্ডগুলোর প্রবেশ মুখে সিঁড়ি ও লিফট রুমের পাশেই ডিউটি রুম। ওয়ার্ডে প্রবেশের আগে ডাক্তার ও ষ্টাফরা তাদের ডিউটি কার্ড রেজিষ্টার মেশিনে ঢুকিয়ে ডেট ও টাইম এন্ট্রি করিয়ে নেয়। ডিউটি থেকে ফেরার সময়ও তাই করে। ডিউটি রুমে ডিউটি অফিসারের চেয়ারে একটি মেয়ে। কক্ষে সেই একমাত্র লোক। আহমদ মুসা ঘরে ঢুকে গুড ইভনিং জানিয়ে ডিউটি অফিসার মেয়েটিকে বলল, ‘একটা ব্যাপারে আপনার সাহায্য পেতে পারি?’ ‘অবশ্যই। কি করতে পারি বলুন?’ গোঁফওয়ালা আনকমন একজন যুবকের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চেয়ে বলল মেয়েটি। ‘আমি ডাঃ ওয়াভেল সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি ডিউটিতে আছেন কিনা।’ মেয়েটি বলল, ‘প্লিজ বসুন, এখনি জানাচ্ছি।’ বলে মেয়েটি তার সামনের কম্পুটারের দিকে মনোযোগ দিল। তার হাতের দুটো আঙুল কয়েকটি কম্পুটার নব-এর উপর ঘুরে এল। কম্পুটার স্ক্রিনে ভেসে উঠল কয়েকটি শব্দ, কয়েকটি অংক। সেদিকে একবার চোখ বুলিয়েই মেয়েটি বলল, ‘ডাঃ ওয়াভেল আধ ঘণ্টা আগে রাত ৭টায় চলে গেছেন। শরীর খারাপ বলে আজ একটু আগেই চলে গেছেন।’ শরীর খারাপ হওয়ার কথা শুনে হঠাৎ আহমদ মুসার মনে প্রশ্ন জাগল, এর মধ্যে কোন তাৎপর্য নেই তো! আহমদ মুসা চট করে প্রশ্ন করল, ‘অসুস্থ ছিলেন! কিন্তু আমাকে তো আসতে বলেছিলেন!’ ‘অসুস্থ ছিলেন না। হঠাৎ করেই খারাপ ফিল করে চলে গেছেন।’ বলল মেয়েটি। ‘এ রকম প্রায়ই তাঁর হয় বুঝি?’ বলল আহমদ মুসা। ‘না, এভাবে তার চলে যাবার দৃষ্টান্ত নেই।’ ‘তাহলে তাঁকে বাড়িতে পাওয়া যেতে পারে।’ ‘সম্ভবত।’ ‘অনেক ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসা ডিউটি রুম থেকে বেরিয়ে এল। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবল আহমদ মুসা, ‘ডাঃ ওয়াভেল নিশ্চয় অসুস্থ নন। কিন্তু অসুস্থতার কথা বলে আগেই চলে গেছেন কেন, যা তিনি কখনই করেননি। কোন জরুরী কাজে কি গেছেন? সে কাজটা কি? আহমদ মুসা এই মুহূর্তেই ডাঃ ওয়াভেলের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। হাসপাতালের উত্তর পাশে ডাক্তারদের জন্যে নির্দিষ্ট রেসিডেন্সিয়াল ব্লকে ডাঃ ওয়াভেলের বাড়ি। রেসিডেন্সিয়াল ব্লকের উত্তর প্রান্তের শেষ বাড়িটা ডাঃ ওয়াভেলের। এর পরেই শুরু হয়েছে আরেকটা রেসিডেন্সিয়াল ব্লক। বাড়িটা খুবই নিরিবিলি। আহমদ মুসা বাড়ির চারদিক দেখল। ব্লকের সব বাড়িই এক রকম। বাড়িতে ঢোকার প্রধান প্যাসেজ একটা। বাড়ির অন্য পাশে চাকর-বাকরদের জন্যে আরও একটা ছোট প্যাসেজ রয়েছে। ডাক্তারের দর্শনার্থী একজন রোগীর মত স্বাভাবিক হেঁটে আহমদ মুসা বাড়িটার দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। রাত তখন ৮টা। আহমদ মুসা তেমন একটা ছদ্মবেশ নেয়নি। মুখে একটা গোঁফ লাগিয়েছে মাত্র। মাথার হ্যাটটা কপালের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নামানো। দরজায় নক করল আহমদ মুসা। আধা মিনিটের মধ্যেই দরজা খুলে গেল। বার-তের বছরের একটা ছেলে দরজায় দাঁড়ানো। দরজা খুলে যাওয়ার সাথে সাথে আহমদ মুসার দৃষ্টি ছুটে গেল ভেতরে। দরজার পরেই একটা করিডোর। করিডোরটি প্রশস্ত। করিডোরের দক্ষিণ দেয়ালে একটা দরজা। উত্তর দেয়ালেও আরেকটা। উত্তর দরজার উপরে শিরোনাম ‘টয়লেট’। অল্প পশ্চিমে এগিয়ে করিডোরটি বড়, ফাঁকা একটা স্পেসে গিয়ে শেষ হয়েছে। ‘কে আপনি? কাকে চাই?’ ছেলেটি প্রশ্ন করল। ‘আমি ডাঃ ওয়াভেলের সাথে সাক্ষাত করতে চাই। আছেন তিনি?’ ‘আছেন। কি বলব তাকে?’ ‘হাসপাতালে গিয়ে ওকে পাইনি, তাই এখানে এসেছি। খুব জরুরী দরকার।’ ছেলেটি করিডোরের দক্ষিণ পাশের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। এক মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে বলল, ‘উনি এখন ব্যস্ত। আধঘণ্টা পরে আসুন, নয়তো কাল হাসপাতালে দেখা করতে বলেছেন।’ ‘ঠিক আছে তুমি গিয়ে বল, আমি আধঘণ্টা দাঁড়াচ্ছি।’ ছেলেটি আবার গেল সেই কক্ষে। আহমদ মুসার মনে হলো, কক্ষটি বাইরের ড্রইং রুম, নয়তো ডাঃ ওয়াভেলের পার্সোনাল কোন ঘর। করিডোরের সামনে যে সুদৃশ্য কার্পেট মোড়া স্পেস দেখা যাচ্ছে, ওটাই মূল ড্রইং রুম। ছেলেটি ফিরে এসে বারান্দায় চেয়ার দেখিয়ে বলল, ‘এখানে তাহলে বসুন।’ বলেই ছেলেটি করিডোর দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। ছেলেটি চলে যেতেই আহমদ মুসা ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর পকেটে হাত দিয়ে রিভলবার স্পর্শ করে দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে ঘরটিতে প্রবেশ করল। ঘরে তিনজন লোক। একদিকের সোফায় দু’জন, অন্যদিকে একজন। একজন মধ্য বয়সী। অন্য দু’জন যুবক। আহমদ মুসা বুঝতে পারলো মধ্য বয়সী জনই ডাঃ ওয়াভেল। তারা মুখো-মুখি বসে। তাদের মাঝখানে টেবিলের উপর একটা ছোট ফাইল। আহমদ মুসা ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিল। আহমদ মুসাকে ঢুকতে দেখেই ডাঃ ওয়াভেল ফাইলটি টেবিল থেকে সোফায় সরিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে তীব্র দৃষ্টি। বলল, ‘কে আপনি?’ আহমদ মুসার দু’হাতই পকেটে। ধীরে ধীরে এগুলো ওয়াভেলের দিকে। ডাক্তার ওয়াভেলের সামনে বসা দু’জন লোক তখনও বসে। তাদের চোখ-মুখ দেখলে মনে হয় তারা ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছে। আহমদ মুসা ডাঃ ওয়াভেলের কাছাকছি পৌছে ডাঃ ওয়াভেলকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কি চাই বলছি ডাঃ ওয়াভেল, তার আগে ঐ ফাইলটা একটু দেখে নেই।’ আহমদ মুসার কথার সাথে সাথেই ডাঃ ওয়াভেলের মুখ মরার মত পাংশু হয়ে উঠল। সোফায় বসা যুবক দু’জনও সংগে সংগে উঠে দাঁড়িয়েছে। ‘ফাইলটি দিন ডাঃ ওয়াভেল। দু’বার বললাম। আমি এক আদেশ কিন্তু দু’বার দেই না।’ চাপা কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা কথাগুলো। ডাক্তার ওয়াভেলকে কথা বলার সময় আহমদ মুসা খেয়াল করেনি যে, যুবক দু’জন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের দু’জনেরই দুই পা তীব্র গতিতে এগুলো ভারি টিপয় লক্ষ্যে। মুহূর্তেই টিপয় টেবিলটি উপরে উঠে তীব্র বেগে এল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসা যখন টের পেল, তখন সময় ছিল না। আহমদ মুসা টিপয়টির আঘাত খেয়ে পাশের সোফার উপর ছিটকে পড়ে গেল। টিপয় ছুঁড়ে দেয়ার পর ওরাও ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার ওপর। কিন্তু আহমদ মুসা টিপয়ের আড়ালে থাকায় তাকে বাগে আনা ওদের পক্ষে অসুবিধা হচ্ছিল। ওদিকে আহমদ মুসা টিপয়ের ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেও দু’হাত দিয়ে টিপয়টি সে অবশেষে ধরতে পেরেছিল। সুতরাং তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া দু’জনকে টিপয় দিয়ে ধাক্কা মেরে তার উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে সংগে সংগে উঠে দাঁড়াল এবং পকেট থেকে রিভলবার হাতে তুলে নিল। যুবক দু’জনও নিজেদের সামলে নেবার পর পকেট থেকে রিভলবার বের করেছিল এবং রিভলবার তুলছিল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু আহমদ মুসার রিভলবার আগেই উঠেছিল। আহমদ মুসার সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার পর পর দু’বার অগ্নি বৃষ্টি করল। গুলী দু’টি যুবক দু’জনের রিভলবার ধরা হাত গুড়ো করে দিল। ওদেরহাত থেকে রিভলবার ছিটকে পড়ল। দু’জনেই আহত হাত চেপে ধরে বসে পড়ল। আহমদ মুসা ওদের দু’টি রিভলবার কুড়িয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ডাঃ ওয়াভেলের দিকে। ডাঃ ওয়াভেল তখন দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। আহমদ মুসা তাঁর দিকে রিভলবার তাক করে বাম হাত বাড়াল ফাইল নেবার জন্যে। ডাঃ ওয়াভেল আহত যুবক দু’জনের দিকে একবার তাকিয়ে কম্পিত হাতে ফাইলটি সোফার উপর থেকে নিয়ে আহমদ মুসার হাতে তুলে দিল। আহমদ মুসা তার দিকে রিভলবার তাক করে থেকেই ফাইলের উপর নজর বুলাল। দেখল, কম্পুটারে টাইপ করা চার-পাঁচ শিট কাগজ হোয়াইট ঈগল নামক সংস্থার প্যাডে। শিরোনাম দেখে চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। শিরোনামে বড় বড় অক্ষরে লিখা, ‘এ রিভিউ অব মুসলিম পপুলেশন কনট্রোল প্রজেক্ট অব ক্যারিবিয়ান রিজিওন।’ কিন্তু আহমদ মুসা ফাইলে শিশু তিনটির প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট পেল না। ফাইল বন্ধ করে আহমদ মুসা তীব্র চোখে তাকাল ডাঃ ওয়াভেলে দিকে। বলল, ‘চুরি করে আনা তিনটি প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট কোথায়?’ কাঁপতে কাঁপতে মরার মত মুখ করে ডাঃ ওয়াভেল বলল, ‘আমি আনিনি, আমি জানিনা।’ আহমদ মুসার তর্জনি চাপ দিল রিভলবারের ট্রিগারে। বেরিয়ে গেল একটা গুলী নিঃশব্দে। গুলীটা ডাঃ ওয়াভেলের কানের উপর দিয়ে মাথার এক টুকরো চামড়া তুলে নিয়ে চলে গেল। শক খাওয়া মানুষের মত কেঁপে উঠল ডাঃ ওয়াভেল। আর এক মুহূর্ত দেরী করলে গুলী এবার মাথা গুড়ো করে দেবে।’ স্থির, কঠোর কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা। সংগে সংগেই ডাঃ ওয়াভেল কম্পিত হাতে পকেট থেকে কাগজের কয়েকটা শিট বের করে টিপয়ের উপর রাখল। আহমদ মুসা কাগজের শিটগুলো তুলে নিয়ে দেখল, তিনটি শিশুরই পরীক্ষাগুলোর উপাত্ত এবং ডাক্তারের ডায়াগনসিস রয়েছে। ‘ধন্যবাদ ডাঃ ওয়াভেল।’ বলে আহমদ মুসা পিছু হটে বেরুবার দরজার দিকে আসতে শুরু করল। আহত যুবকদের একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি?’ ‘মানুষ এবং চোর আর অত্যাচারীদের যম।’ আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে করিডোরে পথে বাড়ির ভেতর দিকে তাকাল। দেখল, করিডোরের মাথায় ফাঁকা স্পেসটাতে একজন বয়ষ্ক মহিলা সহ কয়েকজন ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে-মুখে ভয়ার্ত দৃষ্টি। আহমদ মুসা বুঝল, ভেতরের কথা তারা কিছু জানতে পেরেছে। পরক্ষণেই আহমদ মুসা ভাবল, ওরা কি পুলিশে খবর দিয়েছে? এই কথা ভাবার সাথে সাথেই আহমদ মুসা তাকাল বাইরের দরজার দিকে। দেখল, দরজা ভেতর থেকে লক করা। অথচ আহমদ মুসা দরজা তখন লক করে যায়নি। আহমদ মুসার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। এই সময় আহমদ মুসা বাইরে বাড়ির সামনে গাড়ির শব্দ পেল। আহমদ মুসা দ্রুত এগুলো মহিলাদের দিকে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত বলল, ‘মিসেস ওয়াভেল এই ফাইল আপনার স্বামী হাসপাতাল থেকে চুরি করে শত্রুদের দিতে যাচ্ছিল। আমি এটা উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম। দেখুন আমার দু’হাতে গ্লাভস। এ ফাইলে এবং ভেতরের কাগজ-পত্রে আপনার স্বামীর ফিংগার প্রিন্ট আছে। পুলিশের হাতে আমি এখন ফাইলটি দিলে আপনার স্বামী দেশদ্রোহীতার অভিযোগে জেলে যাবে। বাইরে পুলিশ এসেছে, আপনি তাদের কি বলবেন ভেবে দেখুন।’ মিসেস ওয়াভেলের ভয়-কাতর মুখে উদ্বেগের ছায়া ফুটে উঠল। তার সামনে দাঁড়ানো শত্রু যুবকটির ঋজু কথাকে তার মন সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য হলো। তাছাড়া তার স্বামীর কিছু অস্বাভাবিক আচরণ এবং আজ দেখা একটা ফাইলের কথা তার মনে পড়ে গেল। বাইরে থেকে নক হতে শুরু করেছে। আহমদ মুসার দিকে একবার তাকাল মিসেস ওয়াভেল। আহমদ মুসার হাতের রিভলবারও দেখল সে। তারপর এগুলো বাইরের দরজার দিকে। দরজা খুলল মিসেস ওয়াভেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ অফিসার। বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে আরও দু’জন। আরেকজন পুলিশ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে তখনও। ‘গুড ইভনিং। আপনারা?’ পুলিশদের দিকে তাকিয়ে পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে বিস্মিত কণ্ঠে বলল মিসেস ওয়াভেল। ‘কেন, আপনারা পুলিশকে টেলিফোন করেননি? আপনার বাসার নম্বার ১৫-এর এ নয়?’ ‘হ্যাঁ। কিন্তু আমরা তো এ ধরনের টেলিফোন করিনি?’ ‘এটা কি ডাঃ ওয়াভেলের বাড়ি নয়?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘আমাদের তো বলা হয়েছে ডাঃ ওয়াভেল সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।’ হেসে উঠল মিসেস ওয়াভেল। বলল, ‘কেউ নিশ্চয় আপনাদের মিস গাইড করেছে। দুঃখিত।’ ‘স্যরি, আপনাদের বিরক্ত করার জন্যে।’ বিষণœ কণ্ঠে বলল পুলিশ অফিসারটি। পুলিশের গাড়ি চলে গেল। পুলিশ চলে গেলে মিসেস ওয়াভেল ফিরে এল। ‘ধন্যবাদ মিসেস ওয়াভেল। পুলিশ চলে যাওয়ায় আমি বাড়তি ঝামেলা থেকে বাঁচলাম। আপনার স্বামীও বাঁচল। ঐ ঘরে আপনার স্বামীর সাথে দু’জন ক্রিমিনাল রয়েছে। ওদের স্বার্থেই আপনার স্বামী হাসপাতাল থেকে এই ফাইল চুরি করেছিল।’ বলে আহমদ মুসা যাবার জন্যে পা বাড়াল। ‘থামুন।’ পেছন থেকে বলল মিসেস ওয়াভেল। ফিরে দাঁড়াল আহমদ মুসা। ‘আপনি কে? আপনি হাসপাতালের লোক?’ ‘আমি মিথ্যা বলব না। তাই আপনার এ প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না। এটুকু জেনে রাখুন, আমি আপনাদের শত্রু নই। আপনারাও আমার শত্রু নন। এক ক্ষতিকর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই আমাকে এখানে এভাবে আসতে হয়েছে।’ ‘কি ষড়যন্ত্র?’ ‘আমি এখন বলতে পারবো না।’ ‘আমি বলি?’ চমকে উঠে আহমদ মুসা মিসেস ওয়াভেলের মুখের দিকে তাকাল। বলল, ‘আপনি জানেন?’ ‘জানি। ক্যারিবিয়ান এলাকা থেকে মুসলিম জনসংখ্যা বিনাশের ষড়যন্ত্র। একটা গোপন ফাইল হঠাৎ আমার হাতে আসায় আমি জেনেছি।’ ‘ষড়যন্ত্র আপনি সমর্থন করেন?’ ‘না। আমার স্বামীও করেন না। কিন্তু বাঁচতে হলে ষড়যন্ত্রে সহযোগিতা না করে তাঁর উপায় নেই।’ একটু থামল মিসেস ওয়াভেল। একটা ঢোক গিলেই আবার শুরু করল, ‘কিন্তু আপনি এমন একটা দু’টো ফাইল উদ্ধার করে, দু’চারজনকে মেরে বা হত্যা করে এ ষড়যন্ত্রের সামান্য গতিরোধও করতে পারবেন না। এ পন্ডশ্রম হবে মাত্র।’ কৌতুহলী চোখে আহমদ মুসা মিসেস ওয়াভেলে দিকে তাকাল। বলল, ‘তাহলে এ ষড়যন্ত্র অপ্রতিরুদ্ধ আপনি মনে করেন?’ ‘তা মনে করি না। কিন্তু যে আন্তর্জাতিক প্রচার-প্রতিক্রিয়া এর গতিরোধ করতে পারে, তা এখানে কারো হাতে নেই।’ বিস্মিত হলো আহমদ মুসা মিসেস ওয়াভেলের কথা শুনে। বলল, ‘আপনি শুধু মিসেস ওয়াভেল নন, কে আপনি?’ ‘আমি মিসেস ওয়াভেল, সেই সাথে চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপিকা।’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল মিসেস ওয়াভেল। ‘আপনি কেন আমাকে সহযোগিতা করলেন? ঐ ষড়যন্ত্র পছন্দ করেন না বলেই কি?’ ‘সেটা তো বটেই। আরও কারণ আছে?’ ‘কি সেটা?’ ‘আমি টার্কস দ্বীপপুঞ্জের সকল মানুষের ঐক্য ও মিলনে বিশ্বাসী।’ ‘কেন?’ ‘আপনি কে না জানলে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ আহমদ মুসা গভীরভাবে দেখছিল মিসেস ওয়াভেলকে। যেন তার দৃষ্টি প্রবেশ করেছে মিসেস ওয়াভেলের অন্তরেও। বলল আহমদ মুসা, ‘আপনার উত্তরটা আমিই দেই?’ কিছুটা বিস্ময় মিসেস ওয়াভেলের চোখে। বলল, ‘বলুন।’ ‘আপনি এই দ্বীপপুঞ্জের স্বাধীনতা চান।’ চমকে উঠল মিসেস ওয়াভেল। তার চোখে এবার রাজ্যের বিস্ময়। বিস্ময়ের ধাক্কায় কিছুক্ষণ সে কথা বলতে পারল না। একটু পর বলল, ‘কে আপনি?’ অনেক প্রশ্ন ও কৌতুহলের ভীড় তার চোখে এবং কিছুটা ভয়ও। ‘ভয় নেই। আমি সরকারী গোয়েন্দা নই।’ ‘কিন্তু কে আপনি?’ ‘দুঃখিত, আপনার এ প্রশ্নটার উত্তর এখন দিতে পারছি না। তবে পরিচয়টা আপনাকে দেয়া যাবে।’ ‘আরেকটা প্রশ্ন, আপনি অনুমানটা কিসের ভিত্তিতে করলেন?’ ‘অনুমানটা সত্যি কিনা?’ ‘দয়া করে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।’ ‘খুব সহজ উত্তর। আপনি ‘হোয়াইট ন্যাশনালিজম ষড়যন্ত্রের বিরোধী, অন্যদিকে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের সব মানুষের ঐক্য চান। কেন চান? কোন স্বার্থে চান? কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য চান? এসব প্রশ্নের উত্তর একটাই, আপনি ঐ দ্বীপপুঞ্জের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। দ্বীপপুঞ্জের সব মানুষের ঐক্যের মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।’ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে উঠল মিসেস ওয়াভেলের চোখ। বলল, ‘সত্যি কে আপনি? না বললে আমি উদ্বেগে থাকবো।’ আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘উদ্বেগের কারণ নেই। আমি বৃটিশ সরকারের লোক নই। আমি মিথ্যা কথা বলি না।’ বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে বেরুবার জন্যে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল। আহমদ মুসার চলার পথের দিকে তাকিয়ে ছিল মিসেস ওয়াভেল। ‘অদ্ভুত লোক তো আম্মা?’ ‘অদ্ভুত শুধু নয়, অকল্পনীয় এক চরিত্র।’ বলেই মিসেস ওয়াভেল ছুটল বন্ধ ড্রইং রুমের দিকে যেখানে তার স্বামী বন্ধ আছে। ফার্ডিন্যান্ড মাথা নিচু করে তিনটি মুসলিম পুরুষ শিশুর মৃত্যু নিয়ে ডাঃ মার্গারেট ও ডাঃ ওয়াভেলের কাহিনী, ডাঃ ওয়াভেল কর্তৃক প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট চুরির কথা এবং সর্বশেষ ডাক্তার ওয়াভেলের বাড়িতে একজন মাত্র যুবক এসে কিভাবে তিনজনকে আহত করে মুসলিম পপুলেশন কনট্রোল রিভিউ রিপোর্ট ও প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্টগুলো নিয়ে গেল তার কাহিনী শুনছিল। তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ডাঃ ওয়াভেলের ড্রইং রুম থেকে ফিরে আসা সেই দুই যুবক এবং পাশের একটি সোফায় বসেছিল অপারেশন চীফ হিসেবে নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত হের বোরম্যান। যুবক দু’জনের কথা শেষ হলে মাথা তুলল ফার্ডিন্যান্ড। তার দুই চোখ রক্তের মত লাল। তীব্র কণ্ঠে বলল, ‘একজন লোক এসে তোমাদের জীবনের চেয়ে মূল্যবান রিপোর্ট নিয়ে তোমাদের ঘরে বন্ধ করে বেরিয়ে গেল। আর তোমরা এটা জানাতে এসেছ?’ বলে ফার্ডিন্যান্ড পকেট থেকে রিভলবার বের করে যুবক দু’জনকে লক্ষ্য করে দু’টি গুলী করল। দু’জনেই বুকে গুলী খেয়ে ছিটকে পড়ল মেঝেয়। উঠে দাঁড়াল ফার্ডিন্যান্ড। বলল বোরম্যানকে লক্ষ্য করে, ‘জায়গাটা পরিষ্কার করতে বলে তুমি এস আমার অফিসে।’ অফিসে এসে নিজের চেয়ারে বসল ফার্ডিন্যান্ড। ভীষণ অস্থির সে। একের পর এক বিপর্যয়, সর্বশেষে অত্যন্ত গোপনীয় রিভিউ রিপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট হাত ছাড়া হয়ে যাওয়াকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল সে। না, তাতে করে অস্থিরতা আরও কিলবিলিয়ে উঠছে। উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে লাগল ফার্ডিন্যান্ড। ঘরে ঢুকল হের বোরম্যান। ফার্ডিন্যান্ড তার চেয়ারে ফিরে এল। বসল বোরম্যানও। ‘কি বুঝছ বোরম্যান?’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল ফার্ডিন্যান্ড। ‘আমার মনে হয় সেই এশীয় যুবকই সব অনর্থের মূল। চেহারার যে বিবরণ ওদের দু’জনের কাছে পাওয়া গেছে তাতে সেই এশীয়ই সেদিন রিপোর্টগুলো ছিনিয়ে নেবার মত অঘটন ঘটিয়েছে।’ ‘কিন্তু এই এশীয় কে? তাকে কোথায় পাওয়া যাবে? সে কেন আমাদের পেছনে লেগেছে? ওখানকার পুলিশ কি বলে?’ ‘পুলিশের কাছে কোন এশীয় সম্পর্কে কোন রিপোর্ট নেই, তথ্যও নেই।’ ‘সে থাকছে কোথায় কিংবা কাদের সাথে যোগাযোগ রাখছে তা না জানলে তো আমরা এগুতেই পারছি না।’ ‘ডাঃ মার্গারেট আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার পর তার কক্ষে একজন এশীয়কে ঢুকতে দেখা গেছে।’ চেয়ারে সোজা হয়ে বসল ফার্ডিন্যান্ড। তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘এ খবর তো আমাকে দাওনি?’ ‘ওদের দু’জনের কাছ থেকে আজই তো শুনলাম।’ ‘ডাঃ মার্গারেটের কক্ষে এশীয়টির যাওয়ার খবরকে তুমি কিভাবে দেখছ?’ ‘পেশেন্ট হিসেবে পরিচয়ের কারণে ডাক্তারের এ্যাকসিডেন্টের খবরে তার কাছে যেতে পারে। আবার কোন সম্পর্কের সূত্র ধরেও যেতে পারে।’ ‘আমি জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি ভাবছ?’ ‘আমার মনে হয়, সম্পর্কের সূত্র ধরেই গেছে।’ ‘তোমার এই মনে হওয়ার কারণ?’ ‘তিনটি মুসলিম পুরুষ শিশুর প্যাথোলজিক্যাল টেষ্ট করাবার যে জেদ ডাঃ মার্গারেটের এবং এ নিয়ে ডাঃ ওয়াভেলের সাথে তার যে আচরণ তা থেকে মনে হয় নিছক ডাক্তার হিসেবে নয় কোন উদ্দেশ্য নিয়েই এটা তিনি করেছেন। এই সন্দেহ হওয়ার কারণেই ডাঃ ওয়াভেলের পরামর্শে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের হোয়াইট ঈগল শাখা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল।’ ‘তোমাকে ধন্যবাদ বোরম্যান। তুমি অবশেষে ঠিক ভেবেছ। আসলে আমরা ভুল করছি, ডাঃ মার্গারেটকে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের হোয়াইট ঈগল সন্দেহ করার সংগে সংগে আমাদের সক্রিয় হওয়া দরকার ছিল।’ ‘কিন্তু টার্কস দ্বীপপুঞ্জের হোয়াইট ঈগল তো যথাসময়ে সক্রিয় হয়েছে এবং দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে ডাঃ মার্গারেটকে।’ বলল বোরম্যান। ‘এখানেই তাদের ভুল হয়েছে এবং এ ভুল আমরা শুধরে দেইনি।’ ‘ভুলটা কি?’ ‘ডাঃ মার্গারেটকে হত্যা করে কি হবে? ডাঃ মার্গারেট গেলে আরেক ডাক্তার মার্গারেট তৈরি হবে। আসল হলো, ডাঃ মার্গারেটকে দিয়ে এসব যে করাচ্ছে তাকে চিহ্নিত করা এবং তাকে হত্যা করা। তাহলেই ডাঃ মার্গারেট আর তৈরি হবে না।’ ‘ঠিক বলেছেন।’ ‘ঠিক বললাম, কিন্তু সেটা ক্ষতি হবার পর।’ ‘এশীয়টা ঐ রিপোর্টগুলো নিয়ে কি করতে পারবে! মিডিয়া তো আমাদের দখলে। সরকারকে এসব জানিয়েও কোন লাভ হবে না।’ ‘কি করবে, সেটা আমার কাছেও স্পষ্ট নয়। অপেক্ষা করতে হবে এ জন্যে। কিন্তু একটা ক্ষতি হয়েছে, আমাদের পরিকল্পনা আমাদের হাতের বাইরে চলে গেছে।’ ফার্ডিন্যান্ড থামলেও বোরম্যান কিছু বলল না। ভাবছিল সে। কিছুক্ষণ পর ফার্ডিন্যান্ডই মুখ খুলল। বলল, ‘কি ভাবছ বোরম্যান?’ ‘ভাবছি এখন কি করণীয়।’ ‘এটা নিয়ে এত চিন্তা করতে হয়? কি করতে হবে তা কি পরিষ্কার নয়?’ ‘কি সেটা স্যার?’ ‘আগের ভুলের সংশোধন।’ ‘কিভাবে?’ ‘ডাঃ মার্গারেটকে হত্যা নয়, তাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে হবে। বের করতে হবে ঐ এশীয়টির পরিচয় তার কাছ থেকে।’ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল বোরম্যানের। বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। এটাই এখন একমাত্র পথ।’ ফার্ডিন্যান্ড কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। তাকাল ইন্টারকমের দিকে। সেখানে একটা সবুজ সংকেত। ইন্টারকমের একটা বোতামে চাপ দিল ফার্ডিন্যান্ড। ওপার থেকে তথ্য চীফ মার্ক পল-এর গলা শুনা গেল। বলল, ‘কেন্দ্র থেকে একটা ডকুমেন্ট এসেছে স্যার।’ ‘নিয়ে এস।’ বলল ফার্ডিন্যান্ড। তথ্য চীফ মার্ক পল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘরে প্রবেশ করে একটা ইনভেলাপ তুলে দিল ফার্ডিন্যান্ডের হাতে। হাতে নিয়েই খুলল ইনভেলাপ ফার্ডিন্যান্ড। ভেতরের কাগজের উপর চোখ পড়তেই বুঝল, হোয়াইট ঈগল-এর হেড কোয়ার্টার থেকে আসা মাসিক সিচুয়েশন রিপোর্ট। সমকালিন পরিস্থিতির উপর এই রিপোর্টে থাকে আমেরিকান মহাদেশের উপর বিগত মাসের পর্যবেক্ষণ। ফার্ডিন্যান্ড হের বোরম্যান-এর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বস, রিপোর্টে কি আছে দেখা যাক।’ বলে রিপোর্টটা পড়তে লাগল ফার্ডিন্যান্ড, “গত মাসে গোটা আমেরিকা বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা হেড কোয়ার্টারকে যা জানিয়েছে, তা উদ্বেগজনক কিছু পুরাতন প্রবণতা নতুন করে তীব্র হওয়া এবং আমাদের পরিকল্পনা বাচনাল করার লক্ষ্যে পরিচালিত কিছু মারাত্মক ঘটানা ঘটেছে। গত মাসের পরিস্থিতির প্রধান দিকগুলো হলো: এক. রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে মুসলিম সখ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত মাসে ১০ জন রেড ইন্ডিয়ান তরুণীর সাথে মুসলিম তরুণের এবং ৮ জন মুসলিম তরুণীর সাথে রেড ইন্ডিয়ান তরুনের বিয়ে হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই রেড ইন্ডিয়ান পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেছে স্বতস্ফুর্তভাবে। উদ্বেগজনক হলো, আগে মুসলিম তরুণীরা রেডইন্ডিয়ানদের ঘরে যায়নি, কিন্তু এখন যাওয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে গত এক বছরে মাত্র তিনজন রেড ইন্ডিয়ান তরুণী আমেরিকান শ্বেতাংগ তরুণের সাথে বিয়ে হয়েছে, কিন্তু একজন রেডইন্ডিয়ান তরুণও শ্বেতাংগ তরুণীকে বিয়ে করেনি। আর উল্লেখিত তিনটি বিয়ের কোন রেড ইন্ডিয়ান তরুণীই খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেনি। দুই. মুসলিম রেড ইন্ডিয়ান বিয়ের ৫০ ভাগ হয়েছে আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী এশীয় ও আফ্রো-আমেরিকান ব্ল্যাক মুসলমানের সাথে। আর ৫০ ভাগ চীন, কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইন ও তুর্কিস্থান এলাকা থেকে সদ্য আসা আমেরিকান নাগরিকত্ব পাওয়া মুসলমানদের সাথে হয়েছে। তিন. আমেরিকানস ইন্ডিয়ানস মুভমেন্ট (AIM) নতুন করে জোরদার হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। গত মাসের ২৫ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন ষ্টেটের প্রাচীন রেডইন্ডিয়ান নগরী ‘কাহোকিয়া’তে ‘এইম’ (AIM) এর বিরাট সম্মেলন হয়েছে। সে সম্মেলনে প্রধান যে দাবী তারা তুলেছে তা হলো, মিসিসিপি ও সংলগ্ন অন্যান্য নদীর তীর বরাবর সতের শ’ রেড ইন্ডিয়ান নগরী ছিল যা ইউরোপিয়ানরা ধ্বংস করেছে, সে সব রেড ইন্ডিয়ান নগরীর পুনস্থাপন করতে হবে এবং রেড ইন্ডিয়ানদেরকে তা ফেরত দিতে হবে। দ্বিতীয় যে দাবী তারা করেছে তা হলো, ইউরোপিয়ানরা আমেরিকায় আগমনের সময় অর্থাৎ ১৪৯২ সালের দিকে আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা ছিল দুই কোটি যার মধ্যে ৫০ লাখ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই রেড ইন্ডিয়ান জনসংখ্যা গত ৫শ’ বছরে সাড়ে সাত কোটিতে উন্নীত হবার কথা ছিল। কিন্তু ইউরোপীয় গণহত্যার শিকার হয়ে তাদের সংখ্যা বাড়ার বদলে তা ৫০ লাখ থেকে আজ ১৪ লাখে নেমে এসেছে। এই গণহত্যার বিচার তারা চাচ্ছে না, কিন্তু রেড ইন্ডিয়ানদের ন্যায্য ভূখন্ডগত অধিকার রক্ষার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাংশে মিসিসিপি নদীর পশ্চিম ও পূর্ব এলাকায় তাদের রিজার্ভ এলাকার সংখ্যা ২৮৫ থেকে ১০০০-এ উন্নীত করতে হবে। চার. বিশেষ উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের টার্কস দ্বীপপুঞ্জে। গত মাসে এই দ্বীপাঞ্চল হোয়াইট ঈগলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমাদের দেড়শ’ লোক হারিয়ে গেছে অর্থাৎ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু যাদের দ্বারা এতবড় ঘটনা ঘটল তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। উপরন্তু ঐ অঞ্চলে এখন বৃটিশ পুলিশ এমন তৎপরতা শুরু করেছে যার ফলে আমাদের প্রতিশোধমূলক সশস্ত্র পদক্ষেপের কর্মসূচী বাদ দিতে হয়েছে। পাঁচ. গত মাসে আমেরিকায় অশ্বেতাংগ জনসংখ্যা বেড়েছে শূন্য দশমিক দুই পাঁচ (০.২৫) ভাগ, আর শ্বেতাংগ জনসংখ্যা বেড়েছে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ (০.০৫) ভাগ। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত মাসে অশ্বেতাংগ বৃদ্ধি পেয়েছে শূন্য দশমিক এক পাঁচ (০.১৫) ভাগ এবং শ্বেতাংগ জনসংখ্যা কমেছে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ (০.০৫) ভাগ। উল্লেখিত এসব তথ্য প্রমাণ করছে শত শত বছরের চেষ্টায় শ্বেতাংগরা যে অধিকার অর্জন করেছে, তাতে ভাগ বসাতে আসছে অশ্বেতাংগরা। আর এ পরিস্থিতি ‘হোয়াইট ঈগল’-এর প্রয়োজনকে সর্বোচ্চে তুলে ধরেছে।’ রিপোর্ট পড়া শেষ করল ফার্ডিন্যান্ড। পড়তে পড়তেই তার মুখটা শক্ত হয়ে উঠেছিল। পড়া শেষ করেই ফার্ডিন্যান্ড টেবিলে একটা প্রচন্ড মুষ্টাঘাত করে বলল, ‘কয়েক ঘন্ডা রেড ইন্ডিয়ানকে বাঁচিয়ে রাখার কি দরকার ছিল? দাস প্রথা উচ্ছেদের আগে বা পরে কেন আমরা ব্ল্যাকদেরকে আফ্রিকায় ঠেলে দেইনি? এরাই তো অশ্বেতাংগ জনসংখ্যা বাড়াচ্ছে আমেরিকায়। আর এরাই তো আবার ইসলাম গ্রহণ করে আমেরিকায় মুসলমানদের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। এদের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানরা দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জাতি গোষ্ঠীতে পরিণত হতে যাচ্ছে।’ ‘স্যার, রেডইন্ডিয়ানদের বাঁচিয়ে রাখা এবং ব্ল্যাকদের শুধু দেশে রাখা নয়, তাদেরকে আমরা আমেরিকায় বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন অধিকার দিয়ে মাথায় তুলেছি। আজ রেড ইন্ডিয়ানরা এত বড় দাবী তুলতে পারছে কারণ অতীতে মার্কিন সরকার রেড ইন্ডিয়ানদের এ ধরনেরই দাবী নানাভাবে মেনে নিয়েছে। সত্তর দশকের শুরুর দিকে হঠাৎ করে রেড ইন্ডিয়ানরা শত শত বছর আগে শ্বেতাংগদের হাতে তাদের যে জমি চলে গেছে তা উদ্ধারের জন্যে মামলা করতে শুরু করে। পাসামোকাই ও পেনরস্কট নামে দু’টি রেড ইন্ডিয়ান গোত্র মামলা করে ‘মেইন’ ষ্টেট-এর ১২ মিলিয়ন একর অর্থাৎ রাজ্যটির দুই তৃতীয়াংশের দখল দাবী করে বসে। মার্কিন সরকার অনেক অনুরোধ করে ৮২ মিলিয়ন ডলার দিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদেরকে মামলা প্রত্যাহারে রাজী করে। আবার ১৯৮৭ সালের দিকে ম্যাসাচুসেটস ষ্টেটে ওয়ামপানগ রেড ইন্ডিয়ান গোত্রের অনুরূপ দাবী প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে রফা করে। এর আগের আরেকটা বড় ঘটনা ঘটে। ১৯৮০ সালে মার্কিন সুপ্রীমকোর্ট ১৯৮৭ সালে সাউথ ডাকোটার রেড ইন্ডিয়ানদের যে জমি শ্বেতাংগরা জোর করে কুক্ষিগত করে তার জন্যে রেড ইন্ডিয়ানদেরকে প্রায় ১২৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে মার্কিন সরকারকে বাধ্য করে। এইভাবে রেড ইন্ডিয়ানদের দাবীর যৌক্তিকতা সরকার এবং কোর্ট স্বীকার করে নিয়েছে। সন্দেহ নেই, এর উপর ভিত্তি করেই তাদের জন্যে বরাদ্দ রিজার্ভ এলাকার পরিমাণ ২৮৫ থেকে ১০০০-এ উন্নিত করার দাবী করেছে।’ বলল বোরম্যান। ‘ধন্যবাদ বোরম্যান। ঠিকই বলেছ তুমি। সরকারের আইন ও মানবতাবাদী এই সর্বনাশা চেহারা শ্বেতাংগ জনগণের কাছে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। কিন্তু রেড ইন্ডিয়ানদের ও মুসলমানদের সাথে এই দহরম-মহরমের কি করা যাবে?’ বলল ফার্ডিন্যান্ড। ‘স্যার, এটা ঐতিহাসিক সম্পর্কের একটা ফল। মূলের দিকে ফিরে যাওয়া মানুষের একটা স্বভাব বা প্রবণতা। রেড ইন্ডিয়ানরা তাই করছে। রেড ইন্ডিয়ানদের পূর্ব পুরুষ এশিয়া থেকে আমেরিকায় আসে। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার চীন, জাপান, কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, তুর্কিস্থান এলাকার মঙ্গোলীয় ও মিশ্র মঙ্গোলীয় জাতি-গোষ্ঠী বরফ ঢাকা বেরিং প্রণালী পথে আমেরিকায় আসে। এরাই আমেরিকার প্রথম মানুষ। রেড ইন্ডিয়ানরা এদেরই বংশধর। সুতরাং এশিয়ানদের প্রতি, এশিয়ান কালচারের প্রতি তাদের দূর্বলতা রয়েছে।’ ‘কিন্তু প্রশ্নটা এশিয়ানদের নিয়ে নয়, মুসলমানদের নিয়ে।’ ‘একই কথা স্যার। এশিয়ানরাই তাদের কাছে ইসলাম নিয়ে আসে। ৮ম থেকে দ্বাদশ খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে মুসলিম নাবিকরা, তাদের সাথে মুসলিম পর্যটক, ব্যবসায়ী ও মিশনারীরা পৃথিবীর গোটা সমুদ্র এলাকা চষে ফিরেছে। তাদেরই অনেকে আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এবং বেরিং প্রণালী হয়ে বা ফিলিপাইন থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় আসে। এরা ছিল এশিয়ান এবং প্রশান্ত মহাসাগর পথে যারা আসে তাদের অধিকাংশই মঙ্গোলীয় জাতি গোষ্ঠীর মুসলমান, যাদের সাথে রেড ইন্ডিয়ানদের মিল রয়েছে। রেডইন্ডিয়ানরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের এশিয়ান ভাইদের বুকে জড়াবার সাথে সাথে ইসলামকেও বুকে জড়িয়ে নেয়। মুসলামানদের প্রতি রেডইন্ডিয়ানদের বিশেষ দুর্বলতার কারণ এটাই।’ ‘জানি বোরম্যান। কিন্তু এটা যে সর্বনাশা প্রবণতা। রেডইন্ডিয়ানদের ঘরে শ্বেতাংগ মেয়ে যাওয়া বন্ধ হয়েছে, এটা একটা ভালো প্রবণতা। কিন্তু রেড ইন্ডিয়ান ও মুসলমানদের মিলন বন্ধ করা যাবে কি করে?’ ‘পথ একটাই রেড ইন্ডিয়ান ও মুসলমানদের ঘরে কোন মেয়ে দেযা যাবে না এবং তাদের মেয়ে আনাও যাবে না। উভয় ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা। মুসলমান ও রেড ইন্ডিয়ানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে অবিলম্বে। তাহলে অশ্বেতাংগ জনসংখ্যা বৃদ্ধি শূন্য দশমিক পাঁচের দিকে নেমে আসবে। অন্যদিকে শ্বেতাংগ জনসংখ্যা প্রতি মাসে অনুরূপ পরিমাণ বাড়াতে হবে।’ ‘কিভাবে? সন্তান নেয়ার প্রতি শ্বেতাংগ মেয়েদের যে অনিহা তার মোকাবিলা তো বন্দুক দিয়ে করা যাবে না।’ ‘বন্দুক দিয়ে পারা যাবে না, কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে যাবে।’ ‘সে বুদ্ধিটা কি?’ ‘খুব সহজ। মার্কিন মেয়েরা যে ব্রান্ডের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ব্যবহার করছে, সে সব ব্রান্ডের কোম্পানীগুলোতে ঢুকতে হবে এবং শতকরা ২৫ ভাগ পিলে ভেজাল ঢুকাতে হবে। অন্য দিকে যে সব ক্লিনিক সৌখিন এ্যাবরশন করায়, তাদের ঘাড় মটকাতে হবে।’ ‘ঠিক বলেছ বোরম্যান। এই কাজ এখনি আমরা শুরু করতে পারি। গোল্ড ওয়াটারকে জানাতে হবে ব্যাপারটা। এ কর্মসূচী কেন্দ্রীয়ভাবে গ্রহণ করা উচিত।’ কথা শেষ করে একটু সোজা হয়ে বসে বলল, ‘এস আমাদের কথায় ফিরি। রিপোর্টে বলেছে, টার্কস দ্বীপপুঞ্জে আমাদের দেড়শ’ লোক হত্যার জন্যে যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। কিন্তু চিহ্নিত আমরা করেছি। আমরা নিশ্চিত এশিয়ানটাই সব কিছুর মূলে রয়েছে। এই মূলকে ধরার জন্যে ডাঃ মার্গারেটকে আমরা হাতে নিয়ে আসছি। এ কথাটা গোল্ড ওয়াটারকে জানাতে হবে।’ ‘জ্বি, আজকেই টেলিফোনে কথা বলা যায়।’ ‘এখন ডাঃ মার্গারেটকে নিয়ে আসার ব্যাপারে কি চিন্তা করছ?’ ‘স্যার, একটু ভেবে দেখি। আর গ্রান্ড টার্কস থেকে আরও কিছু জানারও প্রয়োজন আছে। তারপরে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।’ ‘কিন্তু দেরী করা যাবে না। পরশু দিনের মধ্যে তাকে এখানে চাই।’ ‘তাই হবে স্যার।’ ফার্ডিন্যান্ড উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল হের বোরম্যানও। টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে রেখে সোফায় এসে বসতে বসতে ডাঃ মার্গারেট জর্জকে বলল, ‘আমার অবাক লাগছে, হঠাৎ করে উনি বিশেষ এ সময়ে টিভি প্রোগ্রাম দেখতে আসতে চাইলেন কেন!’ ‘আমারও অবাক লেগেছে আপা। উনি তো অনর্থক কোন কাজ করেন না।’ ‘কিন্তু বল তো উনি আমাদের বাড়িতে থাকছেন না গ্রান্ড টার্কসে এসেও, এর পেছনে কি অর্থ আছে?’ বলল মার্গারেট। ‘অর্থ আছে। আমি তার সিদ্ধান্তে আপত্তি করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের পরিবারকে সন্দেহের উর্ধে রাখার মধ্যেই আমাদের লাভ। হাসপাতালের ঘটনায় ডাঃ মার্গারেট ওদের সন্দেহের তালিকায় পড়তে পারে বলে আমি আশংকা করছি। আমি বিদেশী, তোমাদের ওখানে থাকলে সন্দেহ আরও গভীরতর হবে।’ বলল জর্জ। ‘আমিও এটাই বুঝেছি। অদ্ভুত এক মানুষ। সব মাথা খালি করে সব বোঝা তিনি নিজের মাথায় নেন। কিন্তু এত করেও তিনি আমাকে সন্দেহমুক্ত রাখতে পারেননি।’ ‘কি ব্যাপার?’ জর্জ বিস্ময়ের সাথে বলল। ‘গতকাল ডাঃ ওয়াভেল আমাকে বলেছেন সাবধানে থাকতে। আমি তাঁকে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘যারা প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট চুরি করতে বাধ্য করেছিল, তারা তোমাকেও সন্দেহ করছে। ওরা সাংঘাতিক। ওরা না পারে এমন কিছু নেই।’ ‘উনি কি তোমাকে ভয় দেখালেন, না আন্তরিকভাবে তোমাকে সাবধান হওয়ার জন্যে বললেন?’ ‘না জর্জ, সেদিনের ঘটনার পর উনি বদলে গেছেন। এমনকি ওঁর (আহমদ মুসার) প্রতি কোন ক্ষোভ তাঁর নেই। বরং বলেন, সেদিনের ঘটনা তাঁর জন্যে ভালই হয়েছে। এই ঘটনার অজুহাতে ওদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সুযোগ হয়েছে।’ ‘আমি যতটা শুনেছি, ওঁর স্ত্রীর কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। ঘটনার পর একদিন আহমদ মুসা ভাইয়ের সাথে মিসেস ওয়াভেলের কথা হয়েছে। মিসেস ওয়াভেল তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এবং দেখা করার জন্যে অনুরোধ করেছেন। আহমদ মুসা ভাইয়ের মতে মিসেস ওয়াভেলের রাজনৈতিক চিন্তা আমাদের সাহায্য করতে পারে।’ ‘সত্যি ওঁর উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত আছে। যে পরিবারটা তার সাংঘাতিক শত্রু হওয়ার কথা, সে পরিবার তার বন্ধু হয়ে গেল।’ ‘আপা আমার বিস্ময়টা এখনও কাটেনি। সেদিন তিনি হাসপাতালের রুম থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হয়েছিলেন। এত বড় একটা অভিযানে উনি বেরুচ্ছেন তার বিন্দু মাত্র আঁচ করা যায়নি। কি করে উনি বুঝলেন ডাঃ ওয়াভেলের বাসায় অভিযান করলে চুরি যাওয়া ডকুমেন্টগুলো পাওয়া যাবে! সামান্য ভয়ও তাঁর মনে জাগেনি। কি আশ্চর্য, তিনি শুধু ডকুমেন্টগুলো উদ্ধারই করলেন না, কঠিন এক সময়ে গোটা পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনলেন, যার ফলে মিসেস ওয়াভেল পুলিশ ডেকেও মিথ্যা কথা বলে পুলিশকে ফেরত দেন।’ ‘বোধ হয় এটাই ওঁর মৌলিকত্ব যে, তিনি যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রের শক্তির চেয়ে বুদ্ধির শক্তির উপর বেশি নির্ভর করেন।’ আটটা বাজার শব্দ হলো ঘড়িতে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জর্জ বলল, ‘আহম মুসা ভাই এতক্ষণ এলেন না।’ জর্জের কথা শেষ না হতেই দরজায় নক হলো। ছুটে গেল জর্জ দরজায়। খুলে দিল দরজা। দরজায় আহমদ মুসা। তারা সালাম বিনিময়ের পর আগে আহমদ মুসা ও পেছন পেছন জর্জ প্রবেশ করল ঘরে। ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিল আহমদ মুসা মার্গারেটকে। দরজা খোলার সংগে সংগেই ডাঃ মার্গারেট উঠে দাঁড়িয়েছিল। গায়ের কাপড় ঠিক-ঠাক করে মাথার ওড়নাটা টেনে দিয়েছিল কপালের উপর। ‘ওয়া আলাইকুম।’ বলে সালাম গ্রহণ করল ডাঃ মার্গারেট। মার্গারেটের চোখে-মুখে আনন্দ। তার সাথে সেখানে লজ্জার একটা পীড়ন। দুইয়ে মিলে অপরূপ লাবন্যের সৃষ্টি হয়েছে মার্গারেটের চেহারায়। আহমদ মুসা সালাম দেয়ার সময় ডাঃ মার্গারেটের মুখের উপর একবার চোখ পড়েছিল মাত্র। চোখ নিচু করে নিয়েছিল সংগে সংগেই। আহমদ মুসা সোফায় এসে বসল। তার পাশে এসে বসল জর্জ। আর মার্গারেট জর্জের ওপাশে আরেকটা সোফায়। টেলিভিশনটা তাদের সামনে। আহমদ মুসা সেদিকে তাকিয়ে বলল, জর্জ, ‘ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’ (FWTV) তে দাও।’ ‘আচ্ছা, ওদের তো এখন ‘ওয়ার্ল্ড ইন এক্সক্লুসিভ’ প্রোগ্রাম রয়েছে। ঐ প্রোগ্রামের কথা আপনি বলেছেন?’ ‘হ্যাঁ’ বলল আহমদ মুসা। জর্জ উঠতে উঠতে বলল, ‘ওদের এই প্রোগ্রামটা খুব নাম করেছে ভাইয়া। দেশ-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সকল জালেম ও মজলুমের কথা কোন অতিরঞ্জন ছাড়াই এরা নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরে। এ কারণেই এটা এখন দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রোগ্রাম। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াচ’-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে বিশ্বের টিভি দর্শকদের শতকরা ৭০ ভাগ নিয়মিত এই প্রোগ্রাম দেখে থাকে, যা একটি প্রোগ্রামের সর্বোচ্চ রেকর্ড।’ রিমোর্ট কনট্রোলটা এনে চ্যানেল চেঞ্জ করে FWTV তে নিয়ে এল জর্জ। ঠিক আটটা পাঁচ মিনিটে প্রোগ্রাম শুরু হলো। একজন ঘোষক বলল, আজ আমাদের দৃশ্যপট আমেরিকান কন্টিনেন্ট, বিশেষভাবে ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চল। তারপর সে বলল, ‘রীতি অনুসারে প্রথমে রিপোর্ট সারাংশ। তারপর ‘সরেজমিন’, যাতে থাকবে সাক্ষাতকার ও প্রমাণপঞ্জী। সবশেষে থাকবে ‘মন্তব্য’। ঘোষণা শুনেই জর্জ বলল, ‘লায়লা জেনিফার ও অন্যান্যদের খবরটা জানানো দরকার। নিশ্চয় বিষয়টা খুব ইন্টারেষ্টিং হবে।’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওরা সবাই জানে।’ ‘জানে?’ জর্জের মুখে বিস্ময়। বলল, ‘তাহলে এ প্রোগ্রামটা নিশ্চয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ ‘দেখে মন্তব্য করলে ভালো হবে।’ ঈষৎ হেসে বলল আহমদ মুসা। রিপোর্ট সারাংশ তখন শুরু হয়ে গেছে। সবারই সব মনোযোগ আছড়ে পড়ল টিভি’র উপর। রিপোর্টে তখন বলা হচ্ছে, ‘আজ একুশ শতকে মানুষের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার যখন সবচেয়ে বড় শ্লোগান হতে যাচ্ছে, তখন ক্যারিবিয়ান সাগরের দ্বীপাঞ্চলে চরম মানবাধিকার লংঘনের খবর পাওয়া গেছে। জানা গেছে, সেখানকার অশ্বেতাংগ বিশেষ করে মুসলিম কম্যুনিটির সদ্যজাত পুরুষ সন্তানদের অব্যাহত হত্যা এবং মুসলিশ পুরুষদের হত্যা, গুম, ইত্যাদি কর্মসূচীর মাধ্যমে সেখান থেকে মুসলিম জনসংখ্যা নির্মূলের কাজ উদ্বেগজনক গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। গ্রান্ড টার্কস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ষ্টুডেন্ট গ্রুপের বিশেষ সমীক্ষা এবং এই মানবাধিকার লংঘনের ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ‘হোয়াইট ঈগল’ নামক গোপন সংগঠনের নিজস্ব দলীল থেকে এই মানবাধিকার লংঘন-ষড়যন্ত্রের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের ষ্টুডেন্ট গ্রুপের সমীক্ষা অনুসারে গত ৬ বছরে জনসংখ্যার বিশেষ শ্রেণী মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে গড়ে ১৪ শতাংশ হারে। মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিম পুরুষ শিশুর মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। গত ছয় বছরের প্রথম বছর মুসলিম শিশুর মৃত্যু হার শতকরা ৬ ছিল, কিন্তু ষষ্ঠ বছর অর্থাৎ গত বছর এই হার ছিল শতকরা ২৫, তার আগের বছর ছিল শতকরা ২০ এবং তার আগের বছর শতকরা ১৫ ছিল। হোয়াইট ঈগলের নিজস্ব দলিলে গত তিন বছরের একটা মুল্যায়ন পাওয়া গেছে। চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের ষ্টুডেন্টদের সমীক্ষা ছিল টার্কস দ্বীপপুঞ্জের উপর, কিন্তু হোয়াইট ঈগল-এর মূল্যায়ন গোটা ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চল নিয়ে। এই মূল্যায়নে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের প্রতিটি দ্বীপ-রাষ্ট্রের চিত্র পৃথক পৃথক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মূল্যায়ন অনুসারে গত তিন বছরে গোটা ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাসের গড় হার ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে কিউবাতে সবচেয়ে কম, তিন বছরে গড়ে হ্রাস ১০ শতাংশ এবং সবচেয়ে বেশি টার্কস দ্বীপপুঞ্জে, তিন বছরে গড় হ্রাস ২১ শতাংশ। ‘হোয়াইট ঈগল’ পরিচালিত মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাসের পদ্ধতিটি চরম অমানবিক এবং হৃদয়বিদারক। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ম্যাটারনিটিতে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া মুসলিম শিশু সন্তানদের নানা মেডিকেল পদ্ধতিতে কৌশলে হত্যা করা হচ্ছে। সম্প্রতি গ্রান্ড টার্কস-এর কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে সদ্য মৃত তিনটি মুসলিম শিশুর লাশ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, একজনকে ‘স্লিপ পয়জনিং’ এবং অন্য দু’জনকে ভয়ংকর ‘ডেথ ভাইরাস’ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ‘হোয়াইট ঈগল’ নামের গোপন সংগঠন পরীক্ষার এই রিপোর্টগুলো এবং পরীক্ষার উপকরণসমূহ চুরি করে বিষয়টি ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করে। হাসপাতালের শিশু ও প্রসূতি বিভাগের প্রধান ডাঃ ক্লার্ক চুরি ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন। মনে করা হচ্ছে, কমপক্ষে গত ৬ বছর ধরে লাখ লাখ মুসলিম পুরুষ শিশুকে এই ধরনের নানা পন্থায় হত্যা করা হয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে প্রবল ডেমোগ্রাফিক ভারসাম্যহীনতার। স্যাম্পলিং সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চলে মুসলিম মেয়ে শিশু ও পুরুষ শিশুর গড় অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২০:১ এবং সবচেয়ে উপদ্রুত টার্কস দ্বীপপুঞ্জে এই অনুপাত ৩০:১-এ পৌছেছে। মনে করা হচ্ছে, এই প্রজন্ম তাদের বয়স কালে মুসলিম তরুণীরা বিয়ের জন্যে মুসলিম তরুণ পাবে না। ফলে মুসলিম মেয়েরা স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন লাভে ব্যর্থ হবে অথবা শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে তাদেরকে অমুসলিমদের ঘরে প্রবেশ করতে বাধ্য হতে হবে। প্রাপ্ত তথ্যাবলীর ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে মনে করা হচ্ছে, মানবতা বিরোধী এই জঘন্য অপরাধের সাথে ‘হোয়াইট ঈগল’ নামের গোপন সংগঠন জড়িত। এক শ্রেণীর শ্বেতাংগ পুলিশ, আমলা, ডাক্তার অথবা হাসপাতাল কর্মীরা কোথাও স্বতস্ফূর্তভাবে, কোথাও ভয়ে-প্রলোভনের কারণে বাধ্য হয়ে ‘হোয়াইট ঈগল’কে সহযোগিতা দিচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, জাতীয় সরকারগুলো ব্যাপক অনুসন্ধান চালালে ‘হোয়াইট ঈগল‘এর এজেন্ট পুলিশ, আমলা ও অন্যান্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হবে না। তবে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, ‘হোয়াইট ঈগল’-এর মত আন্তআমেরিকান সংগঠনের হুমকি ও চাপ মোকাবিলার সাধ্য ছোট ছোট জাতীয় সরকারগুলোর নেই। এ জন্যেই তারা অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোকে তাদের তৃতীয় বিশ্বের বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গঠিত টিমের মাধ্যমে তদন্ত ও উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে। অবিলম্বে এদের কালো হাত ভেঙে দিতে না পারলে গোটা আমেরিকার অবস্থাকে তারা ঐ একই পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।’ ‘রিপোর্ট সার-সংক্ষেপ’ উপস্থাপনার পর ‘সরেজমিন’ প্রতিবেদন শুরু হলো। ডা: মার্গারেট ও জর্জের চোখ টিভি’র দৃশ্যে যেন আটকে গেছে আঠার মত। গোগ্রাসে যেন তারা গিলছে সব কথা। দেখছে সবকিছু সম্মোহিত হওয়ার মত। প্রোগ্রামটি ছিল বিশ মিনিটের। প্রোগ্রাম শেষ হয়ে গেলেও সম্মোহন যেন তাদের কাটল না। তাদের মুখে কোন কথা নেই। নড়াচড়া করতেও তারা যেন ভুলে গেছে। টেলিফোন বেজে উঠল। জর্জ তার মোবাইলটা তুলে নিল পাশ থেকে। টেলিফোন ধরেই তা আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভাইয়া জেনিফারের টেলিফোন।’ আহমদ মুসা টেলিফোন ধরতেই সালাম দিয়ে জেনিফার বলল, ‘অভিনন্দন ভাইয়া। যে ঘটনা ওরা টার্কস দ্বীপপুঞ্জে আমাদের প্রচার করতে দেয়নি, তা আপনি বিশ্বময় ছড়িয়ে দিলেন। ভাইয়া, কি বলে কি দিয়ে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাব ভাইয়া।’ আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেল জেনিফারের কণ্ঠ। ‘পাগল বোন, ভাইকে বুঝি এভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়?’ ‘আমার নয় ভাইয়া, এটা জাতির কৃতজ্ঞতা।’ ‘জাতি কি আমার নয়?’ ‘তবু ভাইয়া, আমি জাতির মধ্যকার একজন।’ ‘আচ্ছা থাক এসব। শোন, একে শুধু আনন্দের নয়, আশংকার দৃষ্টিতেও দেখতে হবে। তোমাকে এবং মার্গারেটকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। ওরা এটা শোনার পর এতক্ষণে ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে গেছে। ষ্টুডেন্ট গ্রুপের সমীক্ষার তথ্য পাচার করার জন্যে তোমাকে এবং হাসপাতালের তিনটি শিশুর পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করার জন্যে মার্গারেটকেই ওরা সন্দেহ করবে। সুতরাং তোমাদেরকে খুবই সাবধান থাকতে হবে। রাস্তায় বেরুনো তোমার একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে।’ ‘আমি তো লুকিয়েই আছি। ওখানে আপনাদের সাথে এক সাথে টিভি দেখার ইচ্ছা আমার ছিল। কিন্তু রাস্তায় বেরুতে হবে, এ কারণেই তো যেতে পারলাম না। জর্জকে টেলিফোন দিন। আমি ওর সাথে ঝগড়া করবো। আমার সৌভাগ্য সে কেড়ে নিচ্ছে।’ ‘জেনিফার, তোমার আর জর্জের সৌভাগ্য আলাদা হয়ে গেল কখন? দিচ্ছি ওকে টেলিফোন, ঝগড়া কর।’ বলে আহমদ মুসা জর্জকে টেলিফোন দিল। দিতে দিতেই শুনল জেনিফার চিৎকার করছে, ‘থাক ওর সাথে আর কথা বলব না।’ জর্জ টেলিফোন ধরে বলল, ‘বেশ জেনিফার, আমি তো কথা বলতে চাইনি।’ ওপারের কথা শুনে জর্জ আবার বলল, ‘তুমি আসতে পারনি, এটা কি আমার দোষ?’ ওপারের কথার পর জর্জ পুনরায় বলল, ‘বা! বা! বা!, আমি গিয়ে তোমাকে নিয়ে এলাম না কেন, তুমি বলনি কেন? আমি তো তোমাকে চালাই না, তুমিই আমাকে চালাও। তাই........।’ জর্জের কথা শেষ হতে পারল না। ওপার থেকে টেলিফোন রেখে দিয়েছে জেনিফার। জর্জ টেলিফোন রাখতে রাখতে বলল, ‘রেগে গেছে জেনিফার’ ‘তুমি যাতা বলে ওকে রাগাও জর্জ, এটা ভাল নয়।’ বলল ডা: মার্গারেট। ‘আপা, তুমি তো কোন সময়ই জেনিফারের ত্রুটি দেখ না। ওই প্রথম আজ অযৌক্তিক কথা বলেছে।’ আহমদ মুসার ঠোঁটে হাসি। বলল, ‘ঠিক আছে জর্জ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আজ জেনিফারই ঝগড়াটা প্রথম শুরু করেছে।’ আহমদ মুসা থামতেই ডা: মার্গারেট চকিতে আহমদ মুসার দিকে একবার চোখ তুলল। তারপর কম্পিত চোখটা নামিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল, ‘FWTV’-তে এই অসম্ভব ঘটনা কিভাবে ঘটতে পারলো?’ ‘এটা তো অসম্ভব ঘটনা নয়!’ ‘আমাদের কাছে অসম্ভব। লোকাল খবরের কাগজে যে নিউজ ছাপা যায় না, সে নিউজ বিশ্ব টিভি’তে বিশ্বময় প্রচার হবে এটা অসম্ভব ঘটনা নয়?’ ‘তা ঠিক। কিন্তু FWTV –এর মত বিশ্বমানের টিভিগুলো এ ধরনের বিষয় পেলে লুফে নেয়।’ ‘কিন্তু পেল কি করে?’ ‘আমি ওদের কাছে পাঠিয়েছি।’ ‘সেটা আমরা বুঝেছি।’ হেসে বলল ডা: মার্গারেট। থেমেই ডা: মার্গারেট আবার শুরু করল, ‘কিন্তু পেয়েই ওরা প্রচার করল? BBC কিংবা VOA কে দিলে তারা কি প্রচার করত?’ ‘না করত না।’ বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আসল কথা ডা: মার্গারেট, FWTV এবং WNA-এই দু’টি সংবাদ মাধ্যম মুসলমানদের তৈরি। বিশ্বমানের সংবাদ মাধ্যম হিসাবে যে দায়িত্ব, সেটা তারা পালন করার সাথে নিজস্ব দায়িত্বও এভাবে তারা পালন করছে।’ ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ ডা: মার্গারেট ও জর্জ এক সাথেই বলে উঠল। একটু থেমেই জর্জ আবার বলল, ‘এ সংবাদ মাধ্যম দু’টির এই গোপন পরিচয় কি অন্যেরা জানে?’ ‘কেউ কেউ এটা সন্দেহ করে। কিন্তু সবাই এটা জানে, এ সংবাদ মাধ্যম দু’টিতে মুসলিম কিছু পুঁজিপতির পুঁজি আছে। কিন্তু তারা মনে করে অন্যগুলোর মতই এটা ব্যবসায়িক ভিত্তিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে এ সংস্থা দু’টোর সংবাদ প্রচারে নিরপেক্ষতা এদের সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তার সুযোগ কাউকে দিচ্ছে না। মুসলিম কোন গ্রুপ বা শাসকের দ্বারা কোন অন্যায় হলে তা এ সংবাদ মাধ্যম দু’টো সোচ্চার কণ্ঠেই প্রচার করে থাকে।’ কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ডা: মার্গারেটকে বলল, ‘তুমি কি কিছুদিনের জন্যে ছুটি নিতে পার?’ ‘কেন?’ ‘হাসপাতালে যাতায়াত তোমার নিরাপদ নয়। তাছাড়া আমি মনে করি কিছুদিন তোমার একটু সরে থাকা দরকার।’ ‘আপনি যা আদেশ করবেন তাই হবে।’ ‘এটা আমার আদেশ নয়, পরামর্শ।’ মুখ নিচু রেখেই থামল ডা: মার্গারেট। বলল, ‘নেতা যেটা দেন তা পরামর্শ নয়, নির্দেশ।’ ‘আদেশ না হয়ে পরামর্শই হওয়া ভাল নয় কি? আদেশ হলে তা তো অপরিহার্য হয়ে যায়।’ ‘আদেশ না মানতে পারি, এ ভয় তাহলে আপনার আছে?’ ‘মার্গারেট, আমার কথা বিশেষ কারো জন্যে নয়, সাধারণ নীতি হিসাবে বলেছি।’ ‘ধন্যবাদ।’ বলে ডা: মার্গারেট উঠে দাঁড়াল এবং বলল, ‘আমি উঠছি। আজ কিন্তু আপনি খেয়ে যাবেন। সব রেডি।’ কথা শেষ করেই আহমদ মুসাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মার্গারেট দ্রুত ড্রইং রুম ত্যাগ করল। মার্গারেট চলে গেলে জর্জ টিভি বন্ধ করে দিল। মুখোমুখি হলো আহমদ মুসার। বলল, ‘এরপর কি ভাইয়া? হোয়াইট ঈগল তো ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে উঠবে বলছেন। কিন্তু বিশ্ব কিছু বলবে না?’ ‘অবশ্যই বলবে। দেখবে আগামী কালের সংবাদপত্র এই নিউজ কমবেশী কভার করবে গোটা দুনিয়ায়। প্রতিক্রিয়াও কালকে থেকেই প্রকাশ হওয়া শুরু করবে। এবং এটা অবশ্যই একটা ইস্যুতে পরিণত হবে।’ ‘এর ফল কি হবে?’ ‘কি ফল হবে আমি জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি বৃটিশ সরকার, টার্কস দ্বীপপুঞ্জের এ ঘটনার জন্যে ঘরে বাইরে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়বে। সুতরাং বাধ্য হয়েই তাকে টার্কস দ্বীপপুঞ্জে ‘হোয়াইট ঈগল’-এর মূলোচ্ছেদ করতে এগিয়ে আসতে হবে।’ ‘আলহামদুলিল্লাহ। এটা হবে আমাদের জন্যে একটা বড় লাভ। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের জন্যে।’ আহমদ মুসা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু তার আগেই ভেতর থেকে জর্জের ডাক পড়ল, ‘ওঁকে নিয়ে এস জর্জ।’ সংগে সংগেই জর্জ উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন ভাইয়া। বাড়িতে আর কেউ নেই, কাজের দু’জন মেয়ে ছাড়া।’ আহমদ মুসাও উঠল। খাবার টেবিলে বসল জর্জ এবং আহমদ মুসা। খাবারগুলো ঠিক-ঠাক এগিয়ে দিয়ে ডা: মার্গারেট বলল, ‘শুরু করুন সেলফ সার্ভিস।’ ‘এটাই নিয়ম, ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আপা, তুমি বস। দাঁড়িয়ে রইলে যে!’ বলল জর্জ। ‘হোষ্ট হিসাবে তুমি তো খাচ্ছই। মেহমানের অস্বস্তির কোন কারণ নেই।’ ঠোঁটে হাসি টেনে বলল মার্গারেট। জর্জ একটু ভাবল। তারপর আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, এভাবে একত্রে খাওয়ার ব্যাপারে ইসলামের কোন নিষেধাজ্ঞা আছে?’ ‘নিরাপদ পরিবেশে পর্দাসহ বিয়ে নিষিদ্ধ নয় এমন লোককে খাবার পরিবেশন করা, তার সাথে দেখা করা, কথা বলা যায়, কিন্তু একান্ত বাধ্য না হলে এক সাথে খাওয়া যায় কিনা আমার জানা নেই।’ ‘নিরাপদ পরিবেশ কি?’ জর্জ বলল। ‘যাদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ নয় এমন দু’জন ছেলে মেয়ে কোন নিভৃত স্থানে বা কোন নির্জন কক্ষে দেখা করতে বা কথা বলতে পারে না। তবে নিরাপদ হলে পারে। অর্থাৎ সাথে যদি স্বামী ও ভাই-এর মত কেউ থাকে তাহলে পারে। সাথে স্বামী ও ভাই-এর মত অতি আপন কেউ থাকাই নিরাপদ পরিবেশ।’ ‘এক সাথে খাওয়ার ক্ষেতেও এই একই বিধান হতে পারে না কেন?’ ‘আমি মনে করি একান্ত বাধ্য হলে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে এটা আমার মনে হয় মুসলিম সংস্কৃতি বিরোধী।’ ‘কারণ?’ প্রশ্ন করল জর্জ। ‘জনাব, কারণ বলবেন না। এসব ব্যাপারে কত বই আছে, কোরআনের তফসির এবং হাদীস তো আছেই। লেখাপড়া করবে না, শুধু প্রশ্ন। এত কথা বললে খাওয়া হবে না। খেতে দাও।’ কৃত্রিম শাসনের সুরে বলল ডাঃ মার্গারেট। জর্জ আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যরি, ভাইয়া। আপা ঠিকই বলেছেন।’ আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ঠিক আছে তোমার প্রশ্নটার জবাব আরেকদিন দেব।’ ‘জর্জ কিন্তু লেখাপড়া করে না। ওর আবেগ যতটা বেশি, লেখাপড়া ততটাই কম।’ ঠোঁটে হাসি টেনে বলল মার্গারেট। ‘তাই নাকি জর্জ?’ ‘ভাইয়া আপা ইসলামের পন্ডিত হচ্ছেন, আমাকে পন্ডিত হতে বলেন।’ বলল জর্জ। ‘পন্ডিত না হও, প্রয়োজনীয় সবকিছু তোমাকে জানতে হবে।’ ‘সে চেষ্টা করছি ভাইয়া। কোরআন শরীফ আমি অর্থসহ দু’বার পড়া সম্পন্ন করেছি। মিশকাত শরীফের অর্ধেক পর্যন্ত পড়েছি। তাছাড়া মাসলা-মাসায়েলের বই নিয়মিতই দেখি।’ ‘ধন্যবাদ জর্জ। আর তোমার আপা?’ ‘সে হিসেব আমি দিতে পারবো না। ওঁর টেবিল ভর্তি বইয়ে। ডাক্তারি বিদ্যা সে ভুলতে বসার পথে।’ আহমদ মুসা তাকাল ডাঃ মার্গারেটের দিকে। বলল, ‘জর্জের অভিযোগ সত্য নয় আশা করি। তোমাকে শ্রেষ্ঠ ডাক্তার হতে হবে, সেই সাথে হতে হবে একজন শ্রেষ্ঠ মুসলমান।’ আহমদ মুসার দিকে মুহূর্তের জন্যে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল ডাঃ মার্গারেট। তার মুখ রক্তিম হয়ে উঠেছে লজ্জা এবং অপরিচিত এক আবেগে। বলল, ‘দোয়া করুন।’ বলে ডাঃ মার্গারেট কি মনে হওয়ায় দ্রুত রিফ্রেজারেটরের দিকে এগুলো। আহমদ মুসা মনোযোগ দিল খাওয়ার দিকে। টেলিফোনের শব্দে আহমদ মুসার ঘুম ভাঙল। রাত তখন ৩টা। ধরল টেলিফোন। লায়লা জেনিফারের কণ্ঠ। কান্নায় কথা বলতে পারছে না জেনিফার। ‘সময় নষ্ট করো না জেনিফার। কি ঘটেছে বল?’ একটু শক্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা। ‘মার্গারেট আপাকে কেউ ধরে নিয়ে গেছে। জর্জ আহত হয়ে বাইরে পড়ে আছে।’ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল জেনিফার। ‘কি বলছ তুমি জেনিফার? তুমি বাসা থেকে?’ ‘আমি বাসায়। জর্জের বাসায় আর কেউ নেই। কাজের মেয়েটা আমার টেলিফোন নম্বার জানত, এইমাত্র আমাকে জানাল।’ ‘তুমি টেলিফোন রেখে দাও। আমি এখনি বেরুচ্ছি।’ ‘ভাইয়া, আমি যাব।’ ‘বেশ প্রস্তুত থাক। আসছি আমি।’ রাত সাড়ে তিনটার মধ্যেই আহমদ মুসা জেনিফারকে নিয়ে জর্জদের বাড়ি পৌছল। জর্জকে তখন প্রতিবেশীরা কয়েকজন এসে ধরাধরি করে ড্রইং রুমে এনে তুলেছে। জর্জ আহমদ মুসাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আহমদ মুসা কোন কথা না বলে জর্জের মাথায় হাত বুলিয়ে জর্জের আঘাত পরীক্ষা করল। দেখল, জর্জের দু’হাত ক্ষত-বিক্ষত। বাধা দেবার জন্যে দুহাতে ছোরা ধরে ফেলারই ফল এটা। তাছাড়া তার ডান বাহুতে এবং কাঁধে মারাত্মক আঘাত। কাজের মেয়েরাও প্রতিবেশীরা ক্ষতগুলো কাপড় দিয়ে বেঁধে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে চেষ্টা করছে। আহমদ মুসা কান্নারত বিমূঢ় জেনিফারের দিকে চেয়ে বলল, ‘জেনিফার তুমি থানায় এবং হাসপাতালে টেলিফোন কর।’ বলে আহমদ মুসা কান্নারত জর্জের দিকে চেয়ে বলল, ‘জর্জ এখন কান্নার সময় নয়। তুমি আমাকে সাহায্য কর।’ আদেশের সুরে কথাগুলো বলল আহমদ মুসা। জর্জ চোখ মুছল। শান্ত হবার চেষ্টা করল। ‘বল, যারা মার্গারেটকে ধরে নিয়ে গেছে, তাদের সম্পর্কে তুমি কি বুঝেছ?’ ‘ওরা দশ বারোজন এসেছিল। সবারই মুখ মুখোশে ঢাকা ছিল। আমার সাথে ধস্তাধস্তির সময় ওদের একজনের মুখোশ খুলে যায়, জামার কয়েকটা অংশ ছিড়ে পড়ে যায়। আমার মনে হয় ওরা সবাই শ্বেতাংগ। যারা কথা বলেছে, সবাই ইংরেজি ভাষায়। ইংরেজির উচ্চারণ উত্তর বাহামা অঞ্চলের মত।’ ‘জামার অংশগুলো ছিড়ে খসে পড়েছে তা কোথায়?’ ‘আমি আপার চিৎকার শুনে ঘুমে থেকে জেগে ছুটে আসি আপার ঘরের দিকে। ওদের সাথে ঘরের দরজায় আমার ধস্তাধস্তি হয়। সম্ভবত জামার ছিড়ে পড়ে যাওয়া অংশ ও মুখোশ ওখানেই পড়ে আছে।’ শুনেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘জর্জ ওটা আমাকে দেখতে হবে। আমি দেখছি।’ বলে ছুটল আহমদ মুসা মার্গারেটের ঘরের দিকে। মার্গারেটের ঘরের সামনেই প্রশস্ত করিডোরে কালো সার্টের কয়েকটা টুকরো পড়ে থাকতে দেখল। আহমদ মুসা দ্রুত সেদিকে এগুলো এবং তাড়াতাড়ি জামার টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিল। আহমদ মুসা দেখল, টুকরোগুলো মিলালে গোটা জামাই হয়ে যায়। জামা ছিঁড়ে যাওয়া লোকটি নিশ্চয় গোটা জামা খুলে ফেলে দেয়। সাফারী ধরনের সার্টের উপরে ও নিচের চারটি পকেটই অক্ষত আছে। আহমদ মুসা পরীক্ষা করল পকেটগুলো। একটা পকেটে টাকার কয়েকটা নোট পেল। টাকাগুলো বাহামার ডলার। তাহলে লোকরো ছিল বাহামার? অন্য একটা পকেটে আহমদ মুসা ভাঁজ করা নীল রঙের পাতলা কাগজ পেল। ভাঁজ খুলল কাগজটির। একটা রশিদ ধরনের কাগজ। ভালো করে দেখল আহমদ মুসা। একটা এয়ার প্যাসেস সার্টিফিকেট। সানসালভাদরের কলম্বাস এয়ারপোর্ট ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে ‘দি ব্লু বার্ড’কে। তাড়াতাড়ি তারিখের দিকে নজর বুলাল আহমদ মুসা। তারিখ আজকের। টেক অফের সময়ও লেখা আছে রাত দশটা। চমকে উঠল আহমদ মুসা। ওরা কি সানসালভাদর থেকে বিমান নিয়ে এসেছিল! ডাঃ মার্গারেটকে ওরা বিমানেই নিয়ে যাবে। চঞ্চল হয়ে উঠল আহমদ মুসা। ওদের বিমান নিশ্চয় ল্যান্ড করেছে গ্রান্ড টার্কস বিমান বন্দরে। ডাঃ মার্গারেটকে নিয়ে তাহলে ওরা এয়ারপোর্টেই গেছে। বিষয়টা চিন্তা করেই আহমদ মুসা ছুটল জর্জের কাছে। আহমদ মুসা যেতেই জেনিফার বলল, ‘ভাইয়া, পুলিশ আসছে। হাসপাতাল থেকেও এই শিফটের এ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ অফিসার একজন ডাক্তার নিয়ে আসছেন।’ ‘আলহামদুলিল্লাহ। পুলিশ এলে জর্জ তুমি একটা মামলা দায়ের কর।’ তারপর জেনিফারের দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘ডাক্তার জর্জকে যদি হাসপাতালে নিয়ে যেতে চায়, তুমিও যেও তার সাথে হাসপাতালে। বাড়িতে একা তুমি থাকবে না।’ ‘আপনি থাকছেন না?’ বলল জর্জ। ‘আমি এখনি গ্রান্ড টার্কস এয়ারপোর্টে যাচ্ছি।’ ‘কেন?’ বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল জেনিফার। ‘সম্ভবত বিমানে করে মার্গারেটকে টার্কস দ্বীপপুঞ্জের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দেখি ওদের নাগাল পাই কিনা?’ বেদনায় অন্ধকার হয়ে উঠেছে জর্জের মুখ। বলল, ‘ওরা কারা ভাইয়া? হোয়াইট ঈগল?’ ‘নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে সন্দেহ ওদেরকেই।’ কথা শেষ করেই আহমদ মুসা বলল, ‘আসি।’ বলে দ্রুত পা চালাল আহমদ মুসা বাইরে বেরুবার জন্যে। এক ঘণ্টা পরে ফিরে এল আহমদ মুসা। এসে জর্জ এবং জেনিফারকে পেল না। শুনল, এ্যাম্বুলেন্সেই ওরা হাসপাতালে চলে গেছে। হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা। রাত সাড়ে ৪টা। সময় হাতে বেশি নেই। ছুটল সে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। ব্যান্ডেজ ইত্যাদি শেষ করে এইমাত্র জর্জকে বেডে আনা হয়েছে। আহমদ মুসা যখন কক্ষে ঢুকছিল, তখন বেরিয়ে যাচ্ছিল ডাক্তার ও নার্সরা। কক্ষে প্রবেশ করল আহমদ মুসা। জর্জ চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। আর জেনিফার বসেছিল জর্জের মাথার পাশে এক চেয়ারে। আহমদ মুসা প্রবেশ করতেই আকুল, উৎসুক্য চোখে জেনিফার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। পায়ের শব্দ পেয়ে জর্জও চোখ খুলেছে। আহমদ মুসাকে দেখেই তার চোখ দু’টি চঞ্চল হয়ে উঠল। শত প্রশ্ন ঝরে পড়ল তার চোখ থেকে। আহমদ মুসা জর্জের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। একটি হাত জর্জের বুকে আস্তে করে রেখে জর্জের শত প্রশ্ন ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না জর্জ, তোমাকে মুখে হাসি ফুটানোর মত কোন খবর নিয়ে আসতে পারিনি। যেটা এনেছি সেটা দুঃসংবাদই।’ জর্জ চোখ বুজল। ‘কি খবর ভাইয়া?’ কম্পিত গলায় প্রশ্ন করল জেনিফার। ‘আমার সন্দেহ যদি সত্য হয়, আমি এয়ারপোর্টে পৌছার আধঘণ্টা আগে মার্গারেটকে বহনকারী প্রাইভেট বিমানটি বিমান বন্দর ত্যাগ করেছে।’ ‘কোথায় নিয়ে গেছে ভাইয়া?’ জেনিফারই বলল। ‘আমার সন্দেহ সত্য হলে বিমানটি সানসালভাদরে গেছে।’ কথা শেষ করেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘জেনিফার পুলিশ এসে কি করল?’ ‘পুলিশ কেস নিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও পুলিশকে টেলিফোন করেছে। পুলিশ জানতে চাচ্ছে কাউকে আমাদের সন্দেহ হয় কিনা। জর্জ শুধু এটুকু বলেছিল, যারা সম্প্রতি প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট চুরি করেছিল তারা জড়িত থাকতে পারে। কারা চুরি করিয়েছিল আমরা জানি না।’ ‘ঠিক আছে এটুকু। ধন্যবাদ তোমাদের।’ জর্জ চোখ খুলল। বলল, ‘কিন্তু ভাইয়া, পুলিশ কেস নেয়া পর্যন্তই। কিছুই হবে না।’ জর্জের কণ্ঠে হতাশা। জর্জের গায়ে সান্ত¦নার হাত বুলিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘পুলিশ কিছু করবে এজন্যে পুলিশকে বলা হয়নি। বলা হয়েছে এজন্যে যে পুলিশের কাছে ঘটনাটা রেকর্ডেড হওয়া দরকার।’ বলে একটু থামল আহমদ মুসা। পরক্ষণেই আবার শুরু করল, ‘আমার হাতে সময় বেশি নেই জর্জ। একটা বোট ঠিক করে এসেছি। ঠিক সাড়ে ছয়টায় আমি যাত্রা করব। ফজরের নামাযও আমি সেরে নিয়েছি।’ ‘কোথায় ভাইয়া?’ দুজনেই চমকে উঠে এক সাথে প্রশ্ন করল। ‘সানসালভাদর।’ ‘আপনি কি নিশ্চিত ভাইয়া, আপাকে ওরা সানসালভাদর নিয়ে গেছে?’ ‘নিশ্চিত নই। তবে যেটুকু প্রমাণ পেয়েছি, তাতে ওরা সানসালভাদর থেকে এসেছিল, ওখানেই ফিরে গেছে। মার্গারেটকে তাদের সাথে নেবারই কথা।’ ‘মাফ করবেন, কি প্রমাণ ভাইয়া?’ ‘তুমি যে ছেঁড়া জামার কথা বলেছিলে, সে জামার পকেটে একটা এয়ার প্যাসেজ সার্টিফিকেট পাওয়া গেছে। সার্টিফিকেট অনুসারে ‘দি ব্লু বার্ড’ নামক একটা প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের একটা বিমান গত রাত দশটায় সানসালভাদর বিমান বন্দর থেকে ‘টেক অফ’ করেছিল। আমার ধারণা এই বিশেষ বিমানেই ওরা এসেছিল এবং ফিরে গেছে। এবং আমার আরো ধারণা, শুধু ডাঃ মার্গারেটকে কিডন্যাপ করার জন্যেই ছিল তাদের এ আয়োজন।’ আহমদ মুসার এই বর্ণনা যেন ভীত করল জর্জকে। তার মুখ কুঁকড়ে গেছে উদ্বেগ ও বেদনায়। কম্পিত গলায় বলল সে, ‘মনে হচ্ছে ওরা বিরাট শক্তিশালী বিশাল দল। আপনি একা। কিভাবে......।’ কথা শেষ করতে পারল না জর্জ। রুদ্ধ হয়ে গেল তার কণ্ঠ। আহমদ মুসা হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘জর্জ আমি একা নই। আমার সাথে আল্লাহ আছেন। আর আল্লাহর শক্তির কাছে ঐসব শক্তি কিছুই নয়।’ ‘নিশ্চয় আল্লাহ সকলের চেয়ে, সবকিছুর চেয়ে বড়। কিন্তু সবক্ষেত্রেই সাফল্য কি তিনি দেন? আমি যে ভাবনা মন থেকে দূর করতে পারছি না।’ বলে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল জর্জ। আহমদ মুসা হেসে উঠল। সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘জর্জ, তুমি শুধু ডাঃ মার্গারেটের ভাই এ হিসাবে ভাবলে চলবে না, তুমি আজ ‘আমেরিকান ক্রিসেন্ট’ এর সভাপতি।’ ঠোঁটে হাসি কিন্তু শক্ত কণ্ঠে কথাগুলো বলল আহমদ মুসা। জর্জ ধীরে ধীরে আহত হাত তুলে গায়ের চাদর দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলল। বলল, ‘দুঃখিত আমি ভাইয়া। আপাকে না নিয়ে আমাকে ওরা ধরে নিয়ে গেলে ভেঙে পড়াতো দূরে থাক কোন ভয়ই করতাম না।’ ‘জানি জর্জ। তোমাকে এখন শক্ত হতে হবে। আমি চলে যাচ্ছি। তোমাকে এদিকটা দেখতে হবে।’ থামল আহমদ মুসা। তারপর তাকাল লায়লা জেনিফারের দিকে। সে বিমূঢ় এক পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে। এরপর তাকাল জর্জের দিকে। ধীরে ধীরে বলল আহমদ মুসা, ‘আমি তোমাদের দু’জনকে একটা কথা বলতে চাই।’ ‘আদেশ করুন ভাইয়া।’ দুজনেই বলল। ‘FWTV -তে ঐ খবরটি প্রচারিত হবার পর ওরা নিশ্চয় পাগল হয়ে গেছে। তারই একটা প্রমাণ, বিশেষ বিমান নিয়ে এসে তারা ডাঃ মার্গারেটকে ধরে নিয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, লায়লা জেনিফারের উপর তারা আরও বেশি ক্ষেপে আছে। সুতরাং লায়লা জেনিফারের একটা শক্ত আশ্রয় ও সার্বক্ষণিক সাথী দরকার। গ্রামের বাড়ি তার জন্যে নিরাপদ নয়। তার মামার বাড়িও নয়। মেয়ে হওয়ার কারণেই অন্য কোন আশ্রয়ও তার জন্যে নিরাপদ নয়। অপর দিকে জর্জও একা হয়ে পড়েছে। আমি চাই, এই মুহূর্তে না হলেও আজই তোমরা বিয়ে কর। তোমাদের মত বল।’ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল জেনিফারের মুখ। মুখ নিচু করেছে সে। আকস্মিক এই প্রস্তাবে জর্জও লজ্জায় সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে অনেকটা। ‘বলেছি, হাতে আমার সময় নেই। তোমরা কথা বল। আমি মনে করছি, জর্জ অসুস্থ হওয়ায় জেনিফারের সঙ্গ তার জন্যে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বিয়ে এই সমস্যারও সমাধান করে দেবে।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ভাইয়া আপনার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। আপনি ওকে জিজ্ঞেস করুন। ওকে তার মতের বাইরে একবিন্দুও নড়ানো যায় না।’ বলল জর্জ। ‘ভাইয়া, ও বলতে চাচ্ছে আপনার আদেশ সেই শুধু চোখ বন্ধ করে মানে, আমি মানি না। নিজের মত বলা কি অপরাধ? ওকে জিজ্ঞেস করুন ভাইয়া, কবে কোন আদেশ আপনার আমি মানিনি!’ জেনিফারের রাঙা মুখে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। দুঃখের মধ্যেও আহমদ মুসার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল দু’জনের মধুর ঝগড়া দেখে। বলল, ‘ঠিক আছে তোমাদের দু’জনের মত আমি পেয়ে গেছি। আলহামদুলিল্লাহ।’ মুহূর্তের জন্যে থামল আহমদ মুসা। থেমেই আবার বলল, ‘আমি গাড়িতে করে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও আর একজনকে নিয়ে এসেছি। ওদের বলে দেই, আজ দিনের কোন এক সময় তারা বিয়ে পড়াবার ব্যবস্থা করবে। তোমরাও বন্ধু-বান্ধবদের ডাকতে পার।’ আহমদ মুসা থামার সাথে সাথেই জেনিফার প্রতিবাদ করে উঠল, ‘না ভাইয়া, সবার অনুপস্থিতিতে বিয়ে হতে পারে, আপনার অনুপস্থিতিতে নয়।’ ‘তাহলে?’ আমাকে তো অল্পক্ষণের মধ্যেই যেতে হবে।’ ‘এই অল্পক্ষণে বিয়ে হতে পারে না? এবং এই কক্ষেই?’ বলল জেনিফার। ‘পারে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘এতেই আমি আনন্দিত হবো ভাইয়া। এখন ওকে জিজ্ঞেস করুন।’ বলল জেনিফার। আহমদ মুসা তাকাল জর্জের দিকে। ‘ভাইয়া, আমার কোন পৃথক সিদ্ধান্ত নেই। আপনি যা বলবেন, সেটাই আমি করব। কিন্তু দেখলেন তো ভাইয়া, ও নিজের মতের ব্যাপারে কতটা সিরিয়াস। কিভাবে তার মত সে চাপিয়ে দিয়ে ছাড়ল।’ বলল জেনিফার। জেনিফার তীব্র কণ্ঠে কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে হাতের ইশারায় বাধা দিয়ে বলল, ‘বোন জেনিফার তোমাকে কিছু বলতে হবে না। আমিই জর্জের কথার প্রতিবাদ করছি।’ বলে আহমদ মুসা জর্জের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জর্জ, জেনিফারের মতামত আমার কাছে খুবই মূল্যবান। আশা করি তোমার কাছেও। মতামত দেয়ার ক্ষমতা একটা বড় গুণ। এ গুণ আমার এ বোনটির আছে। মতামতকে সম্মান করবে, রাগাবে না কখনও।’ জর্জ গম্ভীর হলো। জেনিফারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘স্যরি, রিয়েলি স্যরি জেনিফার।’ জেনিফারের মুখ লজ্জা, সংকোচে একেবারে রাঙা হয়ে গেছে। মুখ নিচু করেছে সে। ‘জর্জ, তোমার অনামিকায় হীরক বসানো যে সোনার আংটি দেখছি, সেটা তুমি জেনিফারকে পরিয়ে দাও। এটাই হবে মোট মোহরানার নগদ অংশ।’ কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে বাইরে বেরুবার জন্যে হাঁটা শুরু করে বলল, ‘তোমরা তৈরি হও, আমি গাড়ি থেকে ওদের নিয়ে আসি।’ দু’মিনিটের মধ্যেই আহমদ মুসা মসজিদ থেকে আনা ইমামসহ তিনজনকে নিয়ে হাজির হলো। আহমদ মুসা কক্ষে ঢুকে দেখল, জর্জ বাসা থেকে সাথে করে আনা বাড়তি সার্টটা পরেছে। জেনিফার যা পরেছিল সেটাই। শুধু ডান হাতের অনামিকায় শোভা পাচ্ছে জর্জের দেয়া হীরের আংটি। পোশাকে পার্থক্য শুধু এটুকুই ঘটেছে যে, মাথায় ওড়নাটা কপালের নিচে একটু বেশি পরিমাণে নেমে এসেছে।’ ইমাম সাহেবরা এসে ভেতরে বসলেন। আহমদ মুসা জর্জ ও জেনিফারের কাছাকাছি এসে একটু নিচু গলায় বলল, ‘বিয়ের জন্যে ইসলামী বিধান মতে অভিভাবকদের উপস্থিতি প্রয়োজন। তোমরা আমাকে অভিভাবকত্ব দিচ্ছ কিনা।’ ‘ভাইয়া, আল্লাহ সবচেয়ে বড় অভিভাবক। আর দুনিয়ায় আপনার চেয়ে বড় কোন অভিভাবক আমাদের নেই।’ বলল জেনিফার। ‘আমি জেনিফারের মতকে সম্মান করি ভাইয়া।’ বলল জর্জ, তার ঠোঁটে হাসি। ‘ভাইয়া, ও কি বলল দেখুন।’ হাসল আহমদ মুসা। জর্জের মাথায় আঙুল দিয়ে একটা টোকা দিয়ে বলল, ‘যাই হোক, বিয়ের পর যেন ঝগড়া দিয়ে জীবন শুরু করো না।’ বিয়ের অনুষ্ঠান হলো খুবই সংক্ষিপ্ত। আহমদ মুসা বর ও কনে দুই পক্ষের নিকট থেকে সম্মতি (এজেন) আদায়ের দায়িত্ব পালন করল। সাক্ষী মসজিদের মুয়াজ্জিন এবং আরও একজন। বিয়ে পড়াল ইমাম সাহেব। সবশেষে দোয়া করল আহমদ মুসা। এই রাতে মিষ্টি পাওয়া সম্ভব নয়। আহমদ মুসা সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সকলের হাতে একটা করে আমেরিকান ক্যান্ডি তুলে দিয়ে বলল, ‘হাসপাতালের পাশের একটা শপে এটাই পেয়েছি। আপনারা এটা গ্রহণ করে দম্পতিকে দোয়া করুন।’ ‘আপনি যে মিষ্টির কথা বলছেন, সে মিষ্টির চেয়ে অনেক দামী মিষ্টি এটা।’ বলল ইমাম সাহেব। ‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা ইমাম সাহেবদের গাড়িতে রেখে কক্ষে ফিরে এল আবার। এবার আহমদ মুসা কক্ষে প্রবেশের আগে দরজায় নক করল। জেনিফার এসে দরজা খুলে ধরলে তবেই আহমদ মুসা কক্ষে প্রবেশ করল। জর্জ এবং জেনিফার দু’জনেই লজ্জায় জড়সড়। দু’জনের চোখে মুখেই নতুন এক লজ্জার আবরণ। ‘আমার যাবার সময় হয়েছে। কয়েকটা কথা বলছি মনোযোগ দিয়ে তোমরা শুন।’ বলে আহমদ মুসা একটা দম নিল। তারপর শুরু করল, ‘জেনিফার হাসপাতালের বাইরে বেরুতে পারবে না। কাউকে দিয়ে খাবার আনিয়ে খেতে হবে। এই অবস্থায় হাসপাতালে থাকা কঠিন হবে। সুতরাং আজকেই বিকেলে হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, জর্জদের বাড়ি ওরা চিনেছে। ওখানে তোমরা দু’জন কেউ নিরাপদ নও। সুতরাং হাসপাতাল থেকে ভিন্ন কোথাও গিয়ে তোমাদের উঠতে হবে। জর্জের কোন আত্মীয়ের বাসা হলে চলবে না। আত্মীয়ের বাসার সন্ধান ওদের জন্যে সহজ হবে। এ রকম জায়গা তোমাদের খোঁজে আছে?’ ‘আমার এক ফুফা চাকরী নিয়ে সপরিবারে পোর্টেরিকা চলে যাচ্ছেন আজ, সেখানেই আজ আমার উঠার কথা। আম্মাও আসবেন। আমরা সেখানে উঠতে পারি।’ ‘ধন্যবাদ জেনিফার। একটা দুঃশ্চিন্তা থেকে আমাকে বাঁচালে।’ একটু থামল। শুরু করল আবার, ‘জেনিফারের বেরুনই চলবে না বাড়ির বাইরে। জর্জ বেরুলেও কিছু ছদ্মবেশ নিয়ে বেরুতে হবে।’ ‘ভাইয়া, আমি তো ওদের টার্গেট নই। হলে আজই তো নিয়ে যেত।’ বলল জর্জ। ‘জর্জ তোমার টার্গেট হওয়া, না হওয়া নির্ভর করছে ডাঃ মার্গারেটকে নিয়ে কি ঘটছে তার উপর। খোদা না করুন, সে যদি সব কথা বলে দিতে বাধ্য হয়, সব কিছু স্বীকার করতে বাধ্য হয়, তাহলে তুমি ওদের একটা প্রধান টার্গেট হয়ে দাঁড়াতে পার।’ উদ্বেগ, আতংকে ছেয়ে গেল জর্জ এবং জেনিফারের মুখ। বলল আর্তকণ্ঠে জেনিফার, ‘আপার উপর কি নির্যাতন করতে পারে?’ ‘জর্জ, জেনিফার তোমরা কি হবে, কি ঘটবে এসব নিয়ে ভেব না। ভবিষ্যতটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ হেফাজতকারী।’ বলে আহমদ মুসা টেবিলের উপর থেনে নিজের ব্যাগটা তুলে নিল। আহমদ মুসার যাবার প্রস্তুতি দেখে জর্জ এবং জেনিফার দু’জনেরই মুখ মলিন হয়ে উঠল। বলল জেনিফার, ‘শত শত্রুর মধ্যে গিয়ে আপনি কিভাবে কি করবেন! আপার মত আপনিও যদি বিপদে পড়েন, আমার ভয় করছে ভাইয়া।’ ভারি কণ্ঠ জেনিফারের। ‘বলেছি তো, কি হবে, কি ঘটবে এসব চিন্তাকে বড় করে দেখো না।’ একটু শক্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা। ‘আপনার খবরের জন্যে প্রতি মুহূর্তে আমরা উৎকণ্ঠিত থাকব। কিভাবে আমরা জানতে পারব।’ জর্জ অশ্রু ভেজা নরম কণ্ঠে বলল। আহমদ মুসা একটু চিন্তা করল। বলল, ‘এ ব্যাপারে আমি এখন কিছু বলতে পারবো না। তবে কোন খবর থাকলে সেটা মাকোনির কাছেই থাকবে।’ বলে আহমদ মুসা যাবার জন্যে পা বাড়িয়েও ঘুরে দাঁড়াল। বলল জেনিফারকে, যদি সম্ভব হয় তাহলে আজতেই তোমার ভাবীকে টেলিফোন করে বলবে, ‘আমি সানসালভাদরে গেছি।’ ‘আপার কথা তাঁকে বলব?’ ‘ওঁর কাছে কোন কথা আমি লুকোই না, তা যত খারাপই হোক।’ আহমদ মুসা সালাম দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে পা বাড়াল দরজার দিকে। জর্জ ও জেনিফারের চারটি চোখ আহমদ মুসা চলে গেলেও তার চলার পথের উপর আটকে থাকল। দু’জন যেন হারিয়ে ফেলেছে নিজেদেরকে। এক সময় ধীরে ধীরে মুখ খুলল জেনিফার। বলল, ‘দেখেছ জর্জ, ভাইয়া ভাবীর কথা মনে করেছেন, কিন্তু তাঁর চোখে মুখে কোন বেদনা, দুশ্চিন্তা নয়, বরং তাতে একটা প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তির ছাপ। অথচ তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছেন একটা জীবন-মৃত্যুর লড়াই-এ।’ ‘এটাই আহমদ মুসা জেনিফার। আল্লাহ ওঁকে মানুষের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মনও ঐভাবে তৈরি।’ বলল জর্জ। ‘না হলো না জর্জ। উদ্দেশ্য লক্ষ্য স্থির করার এবং মন ঠিক করার দায়িত্ব মানুষের। আহমদ মুসা তা করেছেন।’ ‘তুমি ঠিক বলেছ জেনিফার। এ অধিকার আল্লাহ মানুষের হাতেই দিয়েছেন।’ বলল জর্জ। ‘ধন্যবাদ। সত্য তুমি বিনা তর্কে মেনে নিয়েছ জর্জ।’ হেসে বলল জেনিফার জর্জের দিকে তাকিয়ে। জর্জও চোখ তুলল জেনিফারের দিকে। তারও মুখে হাসি। বলল, ‘বিশ্বাস কর জেনিফার, তোমার মতকে আমি সম্মান করি।’ ‘ধন্যবাদ, ভাইয়ার পরামর্শ যে তুমি মানছ!’ মুখে মিষ্টি হাসি জেনিফারের। ‘না জেনিফার, এ শ্রদ্ধা আমার তোমাকে জানার পর থেকেই।’ ‘তাহলে কথায় কথায় ঝগড়া বাধাও কেন?’ ‘তুমি রাগলে তোমাকে অপরূপ দেখায়।’ বলে জর্জ হাত বাড়াল জেনিফারের দিকে। ‘না মশায়, এটা হাসপাতাল। বেড রুম নয়, বাড়ি নয়।’ বলে জেনিফার দৌড় দিয়ে পালাল জর্জের কাছ থেকে। তার মুখ ভরে গেছে মিষ্টি হাসিতে। রাঙা হয়ে উঠেছে মুখ আপেলের মত।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২৬.ক্যারিবিয়ানের দ্বীপদেশে (৩)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন