বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর
পাবে তা আশা করেনি শায়ন।
তাই বাসায় কোনো কিছু না বলেই
বের হয়ে এসেছে। বসের ফোন পেয়ে
সময় নষ্ট করেনি মোটেও।
এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে
দিলো সে। গাড়ির স্পিড বেড়ে
গিয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব
পৌছাতে চায় ও। গন্তব্য রাফিনের
বাসা। বস রিটায়ার্ড কর্নেল.
আনোয়ার হুসাইনের কথাটা এখনো
কানে বাজছে ওর।
“রাফিন কিডন্যাপ হয়েছে। ওর বাসায়
গিয়ে রিপোর্ট দাও আমাকে।"
আফতাব চৌধুরী রাফিন। শায়নের
সাথেই কাজ করে ছেলেটা,
বাংলাদেশ কাউন্টার
ইন্টেলিজেন্সে জয়েন করেছে বছর
দুয়েকের মত হয়েছে। শায়নের থেকে
জুনিয়র পোস্টে কাজ করলেও ছেলেটা
শায়নকে স্যার না বলে “শায়ন ভাই”
বলেই ডাকে, শায়নও ওকে বন্ধুর মতই
মতোই মনে করে, তাই
স্বাভাবিকভাবেই কিছু বলে না।
চৌকস এই ছেলেটা তার বুদ্ধি ও জ্ঞান
দিয়ে খুব সহজেই সকলের আস্থাভাজন
পাত্রে পরিণত হয়েছে। আর সেই
ছেলেটাই কিনা হঠাৎ করে
কিডন্যাপড !!! একদম মানা যায় না।
সবকিছু গোছানো,শুধু বিছানাটা
ছাড়া। চাদরটা এলোমেলোভাবে
আছে। বালিশটা এক পাশে ফেলে
রাখা। শায়ন একবার চোখ বুলিয়ে
নিলো রাফিনের ঘরটাতে। রুমে তেমন
কিছুই নেই। একটা বিছানা, বিছানার
ডান পাশে সাইড টেবিল। টেবিলে
রাখা ছোট্ট একটা টেবিল-ল্যাম্প। আর
রাফিনের একটা ছবি। রুমের বাম পাশে
বাথরুমের দরজাটা হালকা খোলা।
একবার বাথরুমেও চোখ বুলিয়ে নিলো
শায়ন। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে
পড়েনি ওর।
নাহ!! মাথায় ঢুকছেনা। কিভাবে
রাফিন কিডন্যাপ হলো তা বুঝতে
পারছেনা শায়ন।
তবে এটুকু নিশ্চিত অজ্ঞান করে নিয়ে
গিয়েছে ওকে। রুমে ঢুকেই খুব হালকা
কিন্তু পরিচিত ক্লোরোফর্মের গন্ধ
নাকে এসেছে শায়নের।
কিন্তু এমন একটা জলজ্যান্ত মানুষকে
কিভাবে তুলে নিয়ে গেলো?? তাও
আবার নিজের বাড়ি থেকেই??
রাফিনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে
একমনে ভাবছিলো শায়ন। হঠাৎ পায়ে
কিছু একটার খোঁচা লাগতেই ভীষণ
চমকে উঠলো শায়ন। তাকিয়ে দেখলো
পায়ের কাছে একটা কবুতর। ভীষণ সুন্দর
কবুতরটা। মানুষের খুব কাছাকাছি
থাকে বলে ভয় একদমই নেই। কবুতর
সাধারণত মানুষ জোড়া হিসেবে পালন
করে। একটা কবুতর দেখে একটু কৌতূহলী
হয়ে শায়ন নিচু হয়ে ধরতে চাইলেই একটু
দূরে সরে গেল কবুতরটা।
- স্যার, কোন ক্লু খুঁজে পাওয়া যায়নি।
হঠাৎ বেরসিকের মত বলে উঠল একজন
পুলিশ অফিসার।
শায়ন ব্যালকনি থেকে ঘরে প্রবেশ
করলো। ঘরে ঢুকে পুলিশ অফিসারকে
উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে গিয়ে মুখ
খুলেও আবার বন্ধ করে ফেললো। কারণ
তার চোখ আটকে গেছে রাফিনের
ঘরে একটা দেয়াল পেইন্টিং এর ওপর।
পেইন্টিংটা রুমের দরজার ঠিক পাশের
দেয়ালে। সেই পেইন্টিংটার ওপরে
একটা কাগজ আটকানো। বোঝাই
যাচ্ছে হালকা আঠা দিয়ে লাগানো
হয়েছে কাগজটা। খেয়াল করে না
তাকালে চোখে পড়তোনা এটা।
কাগজটার দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে
তাকিয়ে রইলো শায়ন।
খুব ছোট্ট করে একটা মেসেজ লেখা
আছে সেখানে।
মেসেজটা পড়ে চোয়াল শক্ত হয়ে
এলো শায়নের। হাত মুঠো পাকিয়ে
গেলো অজান্তেই। একটানে
পেইন্টিংটার ওপর থেকে কাগজটা
তুলে নিলো ও। বের হয়ে এলো
রাফিনের ঘর থেকে।
একই সাথে রুম থেকে বের হয়ে আসলো
পুলিশ অফিসারটি।
তার হাতে কাগজটা দিয়ে বললো,
"এটা ল্যাবে পাঠাও। হাতের ছাপ,
কলমের কালি, কখন লেখা হয়েছে সব
কিছুর রিপোর্ট আমার চাই!"
"ইয়েস স্যার," বলেই একটা স্যালুট ঠুকে
বের হয়ে গেলো লোকটা।
কাগজটার লেখা শায়নের মাথায়
ঘুরছে এখনো। ওর ভেতরে রাগ আর বন্ধুর
প্রতি দায়িত্ব দুটোই নাড়া দিচ্ছে।
এখনো মনে হচ্ছে চোখের সামনে
ভাসছে লেখাটা।
"Try but fail"
নিজের অফিসের ডেস্কে বসে আছে
শায়ন। শরীরটাকে চেয়ারের সাথে
হেলান দিয়ে বসে বসে ভাবছে সে।
রাফিনের বাসা থেকে সেদিন তেমন
কিছুই পাওয়া যায়নি। রাফিনের
সাথে থাকতো শুধু ওর অন্ধ চাচা। তিনি
অসুস্থ, শয্যাশায়ী। রাফিনের ছোট্ট
অ্যাপার্টমেন্টের একটা ছোট্ট রুমেই
তিনি সারাদিন শুয়ে থাকেন। তাকে
জিজ্ঞেস করে তেমন কোন লাভ হয়নি।
রাতে তিনি বেঘোরে ঘুমুচ্ছিলেন।
সন্দেহজনক কোন শব্দই নাকি পান নি।
রাফিনের কললিস্ট রিপোর্ট
আনিয়েছিল। সেগুলো দেখছে। তেমন
কারো সাথেই কথা বলেনি। তাই
কাওকে সন্দেহের চোখে দেখতেও
পারছেনা।
শায়ন কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো
চেয়ারে। এরপর মাথাটা হেলান
দিলো চেয়ারে। তাকিয়ে আছে
উপরে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের
দিকে। দরজায় টোকার শব্দ শুনে সোজা
হয়ে বসলো শায়ন। তাকিয়ে রইলো
দরজার দিকে।
- আসতে পারি স্যার?
ওদের অফিসের এক জুনিয়র অফিসার
দাড়িয়ে। হাতে ফাইল। ফাইলের ওপর
লেখা আছে রাফিনের নাম।
- আসো তাসিন।
- স্যার,, রাফিন স্যারের ফাইলটা।
- হুম! রেখে যাও। আর কিছু পেলে ওর
ব্যাপারে?
- স্যার রাফিন ভাইয়ের বাসা থেকে
আর কিছুই পাওয়া যায়নি। কিভাবে
তাকে তুলে নিয়ে গেলো সেটাও
বুঝতে পারছিনা। গত কাল রাতে
বাসায় ফিরে তিনি নাকি সরাসরি
নিজের রুমে চলে যান। রাতে খাওয়া-
দাওয়া করেননি। খুব চিন্তিত
দেখাচ্ছিল তাকে। ওদের বাসার
কাজের বুয়ার কাছে জেনেছি।
- হুম! আচ্ছা যাও। আমি একটু একা
থাকতে চাই। কেউ আসলে বলে দিয়ো
আমি ব্যস্ত। আর মুবিনকে দিয়ে এককাপ
কফি পাঠিয়ে দিয়ো।
- আচ্ছা স্যার।
আবার চিন্তার সাগরে ডুব দিলো
শায়ন। রাফিন ইন্টেলিজেন্সের
ভেতরকার অনেক কিছুই জানে, তার
কিডন্যাপ হওয়াটা অনেক বেশী
চিন্তার কারণ। বোঝাই যাচ্ছে কোন
প্রকার মুক্তিপণের জন্য রাফিনকে
কিডন্যাপ করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে
ইন্টেলিজেন্স বেশ খানিকটা হুমকির
মুখে আছে। নিজের রুমে ডেকে এ কথা
গুলা কিছুক্ষণ আগে বস বলেছেন। যদিও
বলাটা এমনিই বলা, পরিস্থিতি
বোঝার মত বুদ্ধি শায়নেরও আছে।
কিডন্যাপের সাথে কারা জড়িত যদিও
বা এখন পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না তবে
এটুকু বোঝা যাচ্ছে কাজটার সাথে এমন
কেউ জড়িত যে শুধু রাফিনকে না
শায়নকেও নিজের হাতের মুঠোতে
নিতে পারে।
কফির ধূমায়িত কাপের দিকে
তাকিয়ে রইলো ও। গরম কফির কাপ
থেকে ধোয়া বের হচ্ছে। নিজের
ভেতর থেকে নিজেরই এক অস্তিত্ব
মিশে যাচ্ছে বাতাসে। কফির কাপে
চুমুক দিতে দিতে রাফিনের ফাইলটা
টেনে সেখান থেকে ফরেনসিক
রিপোর্টের এনভেলাপটা বের করলো
শায়ন। এনভেলাপ থেকে ঐ ছোট্ট
ম্যাসেজের কাগজটার ফরেনসিক
রিপোর্টটা বের করে দেখতে
লাগলো। রিপোর্টে বলা হয়েছে
লিখাটা লিখতে সাধারন বলপয়েন্ট
কলম ব্যবহার করা হয়েছে তবে
রিপোর্টের কোনায় মন্তব্য লেখার
জায়গাটায় ছোট্ট করে একটা লেখা
আছে। সেখানে বলা হয়েছে,
লেখাটা সম্ভবত রাশিয়ান কোন
মানুষের লেখা। কেন সেটা ব্যাখ্যা
করেছেন ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের
হেড ডঃ নজরুল ইসলাম।
মন্তব্য এবং তার ব্যাখ্যা পড়ে শায়ন খুব
পুলকিত অনুভব করলো। সেই সাথে কি
যেন একটার কথা মনে পড়ি পড়ি করেও
মনে পড়ছে না শায়নের।
এনভেলাপ থেকে পরবর্তী কাগজটা
বের করল শায়ন। চিরকূটটা থেকে একটু
মাটির নমুনা পাওয়া গেছে। সেই
মাটি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা
আছে। এই মাটি বাংলাদেশের
কোথায় কোথায় পাওয়া যায় সেটাও
লেখা আছে রিপোর্টে।
যেহেতু চিরকূটটার গায়ে ঐ মাটি
পাওয়া গেছে। তার মানে হয়তোবা
লেখার সময় কাগজটা হাত থেকে পড়ে
গেছিলো মাটিতে। তার মানে
চিরকূটটা কিডন্যাপাররা শায়নের
বাসায় বসে লেখেনি, আগেই লিখে
এনেছে। প্ল্যানেরই অংশ ছিলো
চিরকূটটা, হঠাৎ করে লেখা হয়নি।
কিন্তু একটা ব্যাপার শায়ন বুঝতে
পারছে না, এতো ঝামেলার মাঝে
কেন গেল কিডন্যাপাররা? তারা তো
চাইলে রাফিনের বাসায় বসেই
কাজটা করতে পারতো। আরেকটা
ব্যাপার মোটামুটি ক্লিয়ার হয়েছে,
রাফিন খুন হয়নি। কিডন্যাপারদের
উদ্দেশ্য খুন করা নয়। খুন করতে চাইলে
তারা খুব সহজেই রাফিনের বাসায়ই
রাফিনকে খুন করতে পারতো। তাদের
উদ্দেশ্য হয় রাফিনের কাছ থেকে
ইনফরমেশন বের করা নাহয় রাফিনকে
বন্দী রেখে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু
একটা চাওয়া। এবং সেটা যে টাকা
নয় এ ব্যাপারে শায়ন মোটামুটি শিওর।
যারা রাফিনকে ধরে নিয়ে গেছে
তারা নিঃসন্দেহে প্রফেশনাল।
রাফিনের কাছ থেকে ইনফরমেশন
আদায় করাটা করাটা যেমন সহজ হবেনা
তেমনি ওরাও রাফিনকে এত সহজে
রাফিনকে ছেড়ে দেবেনা। ইনফরমেশন
গোপন রাখতে গিয়ে রাফিনকে কি
পরিমাণ টর্চার সহ্য করতে হতে পারে
এটা চিন্তা করে শায়নের কপালে
একটা ভাঁজ পড়লো। পরমুহূর্তেই চোয়াল
দৃঢ় হয়ে গেল তার। কাছের বন্ধু ও
সহকর্মীর ওপর টর্চার সে কোনভাবেই
হতে দেবেনা।
রাফিনের বাসায় যেতে হবে আবার।
হয়ত কোন ব্যাপার চোখ এড়িয়ে গছে
তার। কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে
অবশিষ্ট অংশটুকু পেটে চালান করে
দিলো সে। তারপর প্রায় দৌড়ে বের
হয়ে গেলো অফিস থেকে।
বাইরে পার্ক করে রাখা গাড়িতে
উঠেই ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে মোচড়
দিতেই স্টার্ট নিলো গাড়িটা।
এক মুহূর্ত দেরী না করে
এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে
দিলো।
রাফিনের বাসার দিকে ছুটে চলছে
গাড়ি।
হতাশ বোধ করছে শায়ন।
রাফিনের বাসায় এসে কোন লাভই
হয়নি। ‘বিকেলটাই মাটি হলো’
ভাবতে ভাবতে ব্যালকনিতে গিয়ে
একটা সিগারেট ধরালো শায়ন। হঠাৎই
চোখ গেল কবুতরটার দিকে। একটু ভালো
করে খেয়াল করে দেখলো কবুতরের
ডান পায়ে একটা রিং পড়ানো,
খানিকটা কৌতুহল বোধ করে
কবুতরটাকে খুব সাবধানে ধরে ফেললো
শায়ন। চিকন লোহার রিং টা কেন
কবুতরের পায়ে পড়ানো হয়েছে বুঝতে
পারলো না। যদি এটা কোন টাইপের
গয়না হতো তবে সেটা অন্য কোন দামী
ধাতুর হত।
- স্যার, আমারে ডাকছেন?
বুয়ার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো
শায়ন।
- জ্বী ডেকেছি। এক কাপ চা
খাওয়াতে পারবেন?
- জ্বে স্যার, পারমু। রং চা না দুধ চা?
- রং চা ই দেন।
- জ্বে আইচ্ছা।
বলে চলে যেতে উদ্যত হলো বুয়া। কি
ভেবে শায়ন আবার তাকে ডাকলো।
- খালা, শুনুন।
- জ্বে স্যার?
- আচ্ছা, এই কবুতরটা কি রাফিনের?
- জ্বে, হের নিজের।
- কবুতর কি একটাই ছিল? নাকি জোড়া
ছিল?
- না স্যার, একটাই ছিল। আমি হ্যারে
অনেক দিন কইছি এইডার জোড়া
কিন্না আনতে কিন্তু হ্যায় কিছু না
কইয়্যা খালি হাসে।
- কবে কিনেছিল বলতে পারেন?
- তা হইবো প্রায় বছরখানেক। কিন্তু
এট্টুও যত্ন নেয় না হ্যায়। আমিই পালি।
কি যেন ভাবলো একটু শায়ন। তারপর
আবার জিজ্ঞেস করলো...
- আচ্ছা, ও কি কখনো কবুতরটা নিয়ে
কিছু করে? মানে আমি জানতে চাচ্ছি
কবুতরকে খাওয়ায় নাকি কিংবা আদর
করে নাকি?
- না, তেমুন একটা না। হ্যায় বাসায়ই
তো কম থাকে। থাকলেও কইতরের
ধারে যায়না। তয় মাঝে মাঝে
কইতররে উড়ায়া দিয়া হাততালি
দিয়া খেলে। কইতরডা দুইডা
ডিগবাজি দিয়া অনেক দূর যায়। হ্যায়
চাইয়্যা চাইয়্যা দ্যাহে।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি যান।
বুয়াকে বিদায় করে দিয়ে হাতে ধরা
কবুতরটার দিকে ভালো করে
তাকালো শায়ন। কবুতরটা ‘রেসিং
হোমার’ প্রজাতির। এই কবুতর খুব একটা
সহজলভ্য নয়। সাধারণত রেস খেলার জন্য
এই কবুতর ব্যবহার করা হয়। এই কবুতর কিনতে
গেলেও বেশ কিছু টাকা গুনতে হবে।
কবুতর প্রেমীদের কাছে এই কবুতর অনেক
দামী। তবে কবুতরের প্রতি রাফিনের
ব্যবহারে তাকে কবুতর প্রেমী মনে
হচ্ছেনা। শায়নের কাছে একটু রহস্যজনক
লাগলো কবুতরের বিষয়টা। কবুতরের
পায়ের দিকে তাকাতেই একটা
ব্যাপার খেয়াল করলো শায়ন। সাথে
সাথে কিছু একটা মাথায় আসলো তার।
ব্যাপারটা মাথায় আসতেই মনে হলো
এখুনি অফিসে যাওয়া দরকার। রহস্যের
জট খুলতে শুরু করছে একটু একটু।
............................................................
ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে
আছে শায়ন।
জায়গাটা সাভারের কাছাকাছি।
মোটামুটি জনমানবশূন্য এলাকা।
কিডন্যাপারদের ঘাঁটি হিসেবে অতি
উত্তম জায়গা।
সামনে দাঁড়ানো বাড়িটাতেই যে
রাফিন আছে সে ব্যাপারে
মোটামুটি শিওর শায়ন।
- তুমি বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ঢুকবে,
আমি সামনের দিকটা দেখবো। কোন
রকম শব্দ করা যাবেনা। এবং একা
কাউকে দেখতে পেলেই গুলি করবে,
যতটা নিঃশব্দে পারো। ওরা কিন্তু
সংখ্যায় অনেক বেশী থাকতে পারে।
সো কোন ভুল করা যাবেনা, সেক্ষত্রে
মার্ডারও হতে পারো। মনে রেখো
সুযোগ কিন্তু একটাই পাবে।
তাসিনকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে
দিতেই তাসিন মাথা নেড়ে
জানালো যে সে বুঝতে পেরেছে।
নির্দেশ পেয়েই তাসিন বেড়ালের
মতো নিঃশব্দে সামনে যেতে
লাগলো। আসন্ন রোমাঞ্চকর দৃশ্যের কথা
ভেবে বুকে জমে থাকা নিঃশ্বাসটা
‘হুফ’ করে ছেড়ে দিয়ে সামনে বাড়লো
শায়ন।
বাড়িটার সামনের দিকে একটা
মানুষকে দেখা যাচ্ছে। হালকা
ঝিমুচ্ছে। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে
তার সামনে গিয়ে রিভলবারের
বাঁটটা দিয়ে ঘাড়ের পেছনে আঘাত
করলো শায়ন। টুঁ শব্দ করতে পারলো না
লোকটা। নীরবে ঢলে পড়লো। আপাতত
২-৪ ঘন্টা জ্ঞান ফিরবে না আশা করা
যায়।
তাকে একটা গাছের সাথে বেঁধে
মুখে রুমাল গুঁজে বাড়ির ভেতরে
ঢোকার প্রস্তুতি নিলো শায়ন।
পুরো বাড়িটাই অন্ধকার বলা চলে। শুধু
একটা রুমে ডিম লাইটের মত হালকা
আলো জ্বলছে। সেখানেই রাফিন
আছে বলে ধারণা করছে শায়ন।
একটু এগুতেই চোখে পড়লো তাসিন
উল্টাদিক থেকে পা টিপে টিপে
আসছে। শায়নকে দেখে প্রথমে হাতের
২ আঙুল ও পরে একটা হাত গলা কাঁটার
মত করে দেখিয়ে বোঝালো ২ জনকে
খতম করে দিয়েছে।
দুজনে একসাথে হয়ে আস্তে আস্তে
এগুতে লাগলো।
“গুস্তাভ”
হঠাৎ একটা বাজখাঁই কন্ঠস্বর শুনে দুজনেই
পাশে থাকা একটা টেবিলের নিচে
আশ্রয় নিলো।
“গুস্তাভ” আবার ডাকতে লাগলো
দৈত্যটা। ডাকতে ডাকতে তাদের
এদিকেই আসছে। গুস্তাভ যে তাসিনের
গুলিতে ধরাধাম ত্যাগ করেছে সেটা
এখনো বুঝতে দৈত্য বুঝতে পারেনি,
ভেবে কিছুটা স্বস্তি পেল শায়ন।
কাছাকাছি আসতেই টেবিলের একটু
কোণা দিয়ে তাকালো শায়ন।
বাজখাঁই কন্ঠের মালিককে দেখে
বিষম খেল সে, দেখতে আসলেই
দৈত্যের মত। আবছা আলোয় চেহারা
দেখে শায়ন ঠিক বুঝতে পারলো কোন
দেশের লোক সে। হতে পারে স্পেন
বা রাশিয়ার।
টেবিলের একদম কাছাকাছি আসতেই
তাসিন একটা পা বাড়িয়ে দিল।
তাতে দৈত্যের অবস্থানের কোন
পরিবর্তনই হলো না, তবে সে বুঝে
গেলো সে নিরাপদ নয়। দৈত্য কোমরে
হাত দিতেই শায়ন আর দেরী করলো
না। উল্টাভাবে মাথা বের করে একটা
গুলি চালান করে দিল দৈত্যর চিবুক
বরাবর।
রিভলবার ধরা হাতেই স্রেফ কাটা
কলাগাছের মতো পড়ে গেল দৈত্য।
এক সেকেন্ড দেরী হলেই তার
অবস্থাটা কি হতো সেটা আর ভাবতে
চাইছে না শায়ন।
বেচারা তাসিনের দিকে তাকানো
যাচ্ছে না।
তাসিনকে ওঠার তাড়া দিলো শায়ন।
আবার রাফিনের সম্ভাব্য রুমমুখী রওনা
দিলো তারা। প্ল্যান দুজন দরজার দুদিক
দিয়ে আক্রমণ করবে। দরজার যে পাশটার
গা ঘেঁষে শায়ন দাঁড়িয়ে আছে সে
পাশ থেকে রুমের একপাশটা দেখা
যাচ্ছে। তার দৃষ্টিসীমার মাঝে সে
কোন মানুষ দেখতে পেল না।
তাসিনের দিকে তাকাতেই তাসিন
ইশারায় জানালো একজন আছে
ভেতরে। তাসিনকে পূর্বনির্দেশ মত
অপেক্ষা করার ইশারা দিয়ে আচমকা
ঘরে ঢোকার প্রস্তুতি নিতে লাগলো
শায়ন।
শেষ লোকটাকে মারতে মোটেও বেগ
পেতে হয়নি। আচমকা আক্রমণে সে খেই
হারিয়ে ফেলতেই পর পর দুটা বুলেট
তার বুকে পাঠিয়ে দিলো শায়ন।
ঘরের ভেতর একটা চেয়ারে রাফিনকে
বসে থাকতে দেখে হাসি মুখে
এগিয়ে গেল শায়ন। শায়নের দিকে
তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো রাফিন।
- আমাকে কীভাবে খুঁজে পেলে শায়ন
ভাই?
- ওসব কথা পরে হবে। আগে বলো
এখানে মোট কতজন আছে? জানো
কিছু?
- নাহ, শায়ন ভাই।
- আচ্ছা যাই হোক, এটা রাখো, আর
আমার সাথে আসো। আগে এখান
থেকে বেরোতে হবে। তারপর তোমার
সাথে অনেক কথা আছে।
কোমর থেকে অন্য একটা রিভলবার
টেনে বের করে রাফিনের দিকে
এগিয়ে দিলো শায়ন।
আস্তে আস্তে পা টিপে বাড়ির
বাইরে চলে আসলো শায়ন আর রাফিন।
- শায়ন ভাই, আপনার কাছে সারাজীবন
কৃতজ্ঞ থাকবো আমি।
হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলছিল
রাফিন।
- আরে রাখো তো।
- এবার বলেন কীভাবে আমার খোঁজ
পেলেন?
- তোমার বাসায় একটা নোট রেখে
এসেছিল কিডন্যাপাররা, আর
সেটাতে লাল মাটির নমুনা পেয়েই
আমার সন্দেহ হয়েছে, তাদের
আস্তানা এমন কোথাও যেখানে
লালমাটি আছে। আর তাদের আস্তানা
যে মোটামুটি ঢাকা থেকে
কাছাকাছি কোথাও এটা তো সহজেই
আন্দাজ করা যায়। দুয়ে দুয়ে চার
মিলিয়ে বের করে ফেললাম।
- ব্রিলিয়ান্ট শায়ন ভাই।
- তোমাকে কারা কিডন্যাপ করেছিল
সেটা সেটা জানো?
- নাহ।
- মাফিয়ার লোকজন।
শুনে রাফিনের মুখটা হা হয়ে গেল।
- আগেই অবাক হয়ো না। এখন এমন কিছু
বলবো যেটা শুনে তোমার অবাক হবার
মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
বলেই চুপ হয়ে গেল শায়ন। রাফিনের
চোখে প্রশ্ন দেখে আবার বলা শুরু
করলো শায়ন...
- আর এই মাফিয়া এবং তোমার
কিডন্যাপের সাথে জড়িত আমাদের বস
কর্নেল আনোয়ার হুসাইন।
রাফিনের চোখটা বড় বড় হয়ে গেল।
- আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল যে
আমাদের ভেতরকার কেউ
নিশ্চিতভাবে মাফিয়ার সাথে
জড়িত। নাহয় আমরা যতবারই মাফিয়ার
কোন ডনদের পেছনে লাগি তারা
কীভাবে টের পেয়ে যায়? তোমার
মনে আছে সেবারের কথা? যেবার
তুমি আর আমি তোমার বাসায় বসে
করা ৫ মিনিটের প্ল্যানে সেলিম
চৌধুরীকে ধরতে বেরিয়েছিলাম।
মনে করে দেখো, আমাদের সেই টপ
সিক্রেট প্ল্যানের কথা আমি তুমি
বাদে শুধুমাত্র বস জানতেন। সেবারো
আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এর একটাই কারণ
কোন না কোন ভাবে সেলিম চৌধুরীর
কাছে খবর পৌছে গিয়েছিল। তুমি আর
আমি তো একসাথেই ছিলাম, আমাদের
মাঝে কেউ জানায়নি, তাহলে
সেলিম চৌধুরী খবর পেল কীভাবে?
উত্তর একটাই বস জানিয়েছে। তোমার
কি মনে হয় এ বিষয়ে?
পাশে তাকাতেই দেখলো রাফিন
নেই। পিছে ঘুরে তাকাতেই বুকে
লাথি খেয়ে পড়ে গেল শায়ন।
লাথিটি দিয়েছে তারই বন্ধু রাফিন।
তাল সামলাতে না পেরে প্রায় ৬
ফিট দূরে গিয়ে পড়লো শায়ন।
কিছুটা ধাতস্থ হতেই দেখলো
রিভলবার হাতে সামনে দাঁড়িয়ে
আছে রাফিন, মুখে ক্রুর হাসি।
নিজের কোমরের দিকে হাত
বাড়াতেই রাফিন বলে উঠলো...
- উহু, এই ভুল করো না। তুমি রিভলবার
বের করতে করতেই অন্তত তিনটা বুলেট
তোমার বুকে পাঠানোর ক্ষমতা আমি
রাখি। আমার ক্ষিপ্রতা সম্পর্কে
তোমার থেকে ভালো আর কে জানে,
শায়ন আহমেদ?
বলেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে
হাসলো রাফিন।
- কিছু মনে করো না। আসলে তোমার
বিশ্লেষণ শুনে অনেক কষ্টে হাসি
চেপে রেখেছি। আর পারলাম না।
জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে শায়ন শুধু
তাকিয়ে রইলো, কিছু বলল না।
- তোমার ধারণা কিছুটা ঠিক আছে।
আমাদের ভেতর কেউ একজন মাফিয়ার
ইনফরমার হিসেবে কাজ করছে, তবে
সেটা বস নয়, সেটা আমি। লাস্ট ৭ বছর
ধরে আমি মাফিয়ার সাথে আছি।
মাফিয়ার ইনফরমার হিসেবে কাজ
করার উদ্দেশ্যেই আমার
ইন্টেলিজেন্সে জয়েন করা। আর আমার
কিডন্যাপ আমারই সাজানো।
তোমাকে এখানে টেনে আনার
জন্যে। সে উদ্দেশ্যেই মাটিটা
লাগানো হয়েছে ঐ নোটটাতে যাতে
কুকুরের মত গন্ধ শুকে শুকে তুমি এখানে
চলে আসো। এটা তুমিও পারবে তা
আমি জানতাম, তোমার ওপর আমার সে
বিশ্বাসটুকু আছে। তাই এসে ধরা দিলে
আমারই ফাঁদে। তবে এতোটা
তাড়াতাড়ি পারবে বুঝতে পারিনি।
সে জন্যে আমার কোন লোক রেডি
ছিল না, তাই আমি হারালাম আমার
কিছু চৌকস লোককে।
শায়ন কিছু বলল না।
- এখন আমি কি করবো জানো?
তোমাকে খুন করে খুব সুন্দর ভাবে এখান
থেকে পালিয়ে যাবো। সবাই ভাববে
তুমি খুন হয়েছ আমাকে বাঁচাতে এসে।
আর আমি কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে
থাকবো। তারপর বের আসবো। সবাই
ভাববে এজেন্ট রাফিন
কিডন্যাপারদের হাত থেকে
পালিয়ে এসেছে নিজ কৌশলে।
শায়ন তাও কিছু বলল না, মুখের কোনায়
একটু হাসি দেখা গেল শুধু।
- ওহ হো তোমার একটা প্রশ্ন আছে, যদিও
তুমি করনি। তাও আমি বলি, জানতে
ইচ্ছা করছে না কীভাবে সেলিম
চৌধুরী তোমার আমার প্ল্যানের
খবরটা পেল?
মুচকি হেসে জানতে চাইলো রাফিন।
শায়ন এবারও কিছু বলল না, হাসিটা
খানিকটা বিস্তৃতি পেল শুধু।
- বার্তাবাহক হিসেবে কবুতরের কোন
বিকল্প নেই, বুঝলে ভায়া?
হাসিমুখে জানলো রাফিন।
শায়ন কোমরে হাত দিল।
প্রায় সাথে সাথেই ট্রিগার চাপলো
রাফিন !!!
ক্লিক ! ক্লিক !!
কোন গুলি বের হলো না। রাফিন আশ্চর্য
হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে
আছে। উত্তেজনায় আসলে রিভলবারে
গুলি আছে কিনা সে ব্যাপারটা সে
চেক করেই দেখেনি।
ততক্ষণে শায়নের মুখে শোভা পাচ্ছে
হাসি আর হাতে শোভা পাচ্ছে
রিভলবার।
দেরী না করে রাফিন উল্টো ঘুরে
দৌড় দিতে গিয়ে দেখে ১০ ফিট দূরে
দাঁড়িয়ে আছে তাসিন। তার হাতেও
বিদঘুটেদর্শন রিভলবার। রাফিন বুঝতে
পারলো যে সে ধরা পড়ে গেছে।
- তোমার ব্যাপারে এখানে আসার
আগেই আমি জানতে পেরেছি সব। এখন
বাকিরাও জানবে সব কারণ তোমার
হাতে ধরা আমার দেয়া
রিভলবারটাতে একটা ছোট্ট টেপ
রেকর্ডার আছে। তোমার ‘রেসিং
হোমার’ কবুতরটাই তোমার সর্বনাশ
করলো। আর তাছাড়া এতো
তাড়াতাড়ি তোমাকে কীভাবে
খুঁজে পেয়েছি সেটা দেখেও তোমার
কি একটুও সন্দেহ জাগেনি?
রাফিন কিচ্ছু বলছে না। শুধু তাকিয়ে
আছে শায়নের দিকে।
- দিকনির্দেশনা দিতে কবুতরের কোন
বিকল্প নেই, বুঝলে ভায়া?
রাফিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি
হেসে চোখ টিপ দিয়ে বলল শায়ন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now
X
রাশিদি ইয়েসুগোর ড্রইং রুমে রাশিদি, মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ও লায়লা ইয়েসুগো বসে।
তাদের সবার মুখ মলিন। মুখে উদ্বেগের ছাপ।
'উনি জরুরী প্রয়োজনে হঠাৎ যদি কোথাও যেয়ে থাকেন, তাহলে এতক্ষণ কি আসবেন না?' চিন্তান্বিত কণ্ঠে বলল লায়লা ইয়েসুগো।
'কিন্তু তার নিজস্ব প্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে তিনি যাবেন কোন কিছু না বলে, তা আমি মনে করতে পারছি না।' বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
'আমারও তাই মনে হয়।' বলল ইয়েকিনি।
'তাহলে তিনি কি কোন শত্রুর কবলে পড়েছেন?' তাঁর তো শত্রু চারদিকেই।' বলল লায়লা।
'তা হতে পারে। কিন্তু গাড়ি? শত্রু তাকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু গাড়ি কোথায় গেল?' বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
'হয়তো শত্রু আগে থেকেই ফলো করছিল। সে গাড়িও দেখেছিল।' বলল লায়লা।
'কিন্তু এটা কি সম্ভব যে, আহমদ মুসার মত মানুষকে ঐ কক্ষ থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে ধরে এনে গাড়িতে তুলে হাইজ্যাক করে নিয়ে যাবে?' বলল রাশিদি ইয়োসুগো।
'সম্ভব নয়, কিন্তু সমস্যার সমাধান কি ভাইয়া? বলল লায়লা।
রাশিদি ইয়োসুগো কোন জবাব দিল না।
কথা বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি। বলল, 'আমি আহমদ মুসাকে যতটুকু চিনেছি, তাতে আমার মনে হয়, তিনি স্বেচ্ছায় কোথাও গিয়েছেন। এবং আমাদের জানিয়ে যাবার তাঁর সময় ছিল না।'
'স্বেচ্ছায় কোথায় যাবেন, 'আপনার অনুমান কি?' বলল লায়লা ইয়েসুগো।
'অনুমান করা মুষ্কিল। তবে আমার মনে হয় তিনি কিছু দেখে বা কিছু শুনে তার পিছু ছুটছেন। বলে যাবার মত সময় তাঁর ছিল না।' বলল ইয়েকিনি।
'সেই কিছু'টা কি হতে পারে?' লায়লা বলল।
'ওমর বায়ার কথা হতে পারে। ডঃ ডিফরজিসের কোন তথ্য হতে পারে।' বলল ইয়েকিনি।
'হতে পারে। কিন্তু তবু প্রশ্ন জাগে তিনি যদি স্বেচ্ছায় গিয়ে থাকেন, তাহলে খবর জানিয়ে যাবার মত দুই মিনিট সময় পাবেন না কেন?' লায়লা বলল।
'লায়লা, আমাদের রুটিনে বাধা শান্তির জীবন দিয়ে আহমদ মুসার জীবনকে বিচার করছ বলেই এমন প্রশ্ন জাগছে। আসলে প্রয়োজন নামের চাবুক একজন বিপ্লবীকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তার কাছে অন্যসব বিবেচনাই গৌণ হয়ে যায়।'
দরজায় এসে দাঁড়াল গার্ডদের একজন। তার চোখে-মুখে আনন্দের স্ফুরণ। বলল, 'বড় সাহেব এসেছেন।'
'মেহমান বড় সাহেব।'
বাড়ির আর সবাই আহমদ মুসাকে বড় সাহেব বলে ডাকে। কেউ তাদেরকে একথা বলে দেয়নি। তারা সম্ভবত সবার কাছে আহমদ মুসার সম্মান ও প্রতিপত্তি দেখেই তাকে বড় সাহেব নাম দিয়েছে।
'কি বলছিস? আমাদের মেহমান? কোথায় তিনি?'
'বাইরে দাঁড়িয়ে।'
'বাইরে কেন?'
'সাথে ইয়ামোটা একজন লোক এবং তিনটি কুকুর।
'সাথে একজন লোক এবং তিনটি কুকুর!'
রাশিদি সবার আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। রাশিদি চলতে শুরু করে দিয়েছিল। এই সময় ঘরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।
রাশিদি ইয়েসুগো এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি গিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে।
'টেনশনে আমরা শেষ হয়ে যাচ্ছি। কি ঘটনা ঘটেছিল? আপনি ভাল আছেন তো?' বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
'হঠাৎ করেই 'ওকুয়া'র দু'জন লোককে চিনে ফেলি।' তারা চলে যাচ্ছিল। ওদের ঘাটির ঠিকানা জানার উদ্দেশ্যে ওদের ফলো করেছিলাম। তোমাদের জানানোর সুযোগ হয়নি। দুঃখিত।'
'দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জা দেবেন না। আমাদের কোনই কষ্ট হয়নি। আমরা উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম আপনাকে নিয়ে।'
কথা শেষ করেই রাশিদি ইয়োসুগো আহমদ মুসাকে সোফার দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, 'তার পর কি হলো বলুন।'
আহমদ মুসা রাশিদি ইয়োসুগোকে বাধা দিয়ে সোফার দিকে না এগিয়ে বলল, 'আমি ওদের হাতে আটকা পড়েছিলাম। সব বলছি। কিন্তু তার আগে চারজন মেহমানের ব্যবস্থা করতে হবে।'
'সব ব্যবস্থা করছি। কিন্তু চারজন কোথায়? শুনলাম তো একজন!' বলল রাশিদি।
'একজন মানুষ আছে এবং তিনটি কুকুর।' বলল আহমদ মুসা।
লাললাসহ সবাই হেসে উঠল আহমদ মুসার কথা বলার ভংগিতে।
আহমদ মুসা, ইয়োসুগো, ইয়েকিনি বাইরে গেল। ব্ল্যাক বুল ও কুকুরগুলোকে ভেতরে নিয়ে এল। তাদের সব ব্যবস্থা করে দিয়ে ঘ্টা খানেক পর আহমদ মুসা, রাশিদি ইয়োসুগো এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ড্রইং রুমে আবার ফিরে এল।
ইতিমধ্যেই ব্ল্যাক বুলকে নিয়ে নাস্তার কাজও তারা সেরেছে।
আহমদ মুসা সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘ওকুয়া'র লোকদের পিছু নেবার পর যা যা ঘটেছে সব তো তোমাদের শোনা হয়ে গেছে। ওকুয়া'র কোন ঘাটির সন্ধান পাইনি বটে, তবে ব্ল্যাক বুলকে উদ্ধার করেছি। তার সাথে হারিয়ে যাওয়া থেকে একটা ইতিহাসকে উদ্ধার করেছি।’
‘ইতিহাস উদ্ধার করেছেন? সেটা কি?’ বলল রাশেদি ইয়েসুগো।
'ব্ল্যাক বুল সম্পর্কে তোমরা যেটুকু জেনেছ, তা তার পরিচয়ের সবটুকু নয়। যে ইতিহাসের কথা বলছি, ব্ল্যাক বুল সে ইতিহাসের অংশ।' বলল আহমদ মুসা।
'তার পরিচয় কি?' বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
'শুনলে বিস্মিত হবে 'ওকুয়া'র কশাই ব্ল্যাক বুলের দেহে মুসলিম রাজরক্ত রয়েছে।' আহমদ মুসা বলল।
‘মুসলিম রাজরক্ত?’ সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল রাশিদি ইয়োসুগো।
'হ্যাঁ মুসলিম রাজরক্ত।'
একটু থামলো আহমদ মুসা। তারপর বলল আবার, 'মারুয়া' খিলাফতের কথা জান রাশিদি?'
'হ্যাঁ, জানি, মানে শুনেছি। কিন্তু এ প্রশ্ন কেন? আমাদের ইয়েসুগো পরিবারেরই এ ব্রাঞ্চ ‘রাশিদি পরিবার’ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে আমাদের গারুয়া সালতানাত দ্বিখন্ডিত করে, মারুয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে।' বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
'মারুয়া খিলাফত তোমাদের বংশেরই?' আহমদ মুসার কণ্ঠে বিস্ময়।
'হ্যাঁ। তবে তাদের সাথে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক প্রথম দিকে ভাল ছিল না। কিন্তু পরে ভাল হয়। শেষে আবার খারাপ হয়ে যায়। এখন বলুন মারুয়া খিলাফতের কথা কি বলছিলেন?' বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
'যায়দ রাশিদিকে চেন?'
'মারুয়া খিলাফতের?'
'হ্যাঁ।'
'চিনি। রাশিদি পরিবারের সবচেয়ে ভাল মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে আবেগ প্রবণ। তার কাহিনী বড় করুণ।'
'ব্ল্যাক বুল তার মেয়ের একমাত্র নাতি।'
'কি বলছেন আপনি। ব্ল্যাক বুল যায়দ রাশিদীর মেয়ের নাতি!' বিস্ময়ে সোজা হয়ে উঠল ইয়োসুগো।
'হ্যাঁ। তাঁর একমাত্র ছেলে কিশোর বয়সে এই ইয়াউন্ডিতে এসেই মারা যায়। অবশিষ্ট থাকে একটি মাত্র মেয়ে আয়োশা। আয়েশার নাতি ব্ল্যাক বুল। বড় করুণ কাহিনী যায়দ রাশিদীর এবং তার পরিবারের।'
'তিনি ভাইয়ের উপর অভিমান করে সিংহাসন ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তারপর কোন খবর আর পাওয়া যায়নি। এটুকুই আমরা শুনেছি।' বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
'তার পরের কাহিনী শুন।' বলে আহমদ মুসা ব্ল্যাক বুলের কাছ থকে শোনা এবং ডাইরী থেকে পড়া কাহিনী বর্ণনা করল।
অদম্য আবেগ আর বিস্ময় নিয়ে রাশিদি ইয়োসুগো এবং ইয়েকিনি এই কাহিনী শুনল। লায়লাও এসে হাজির হয়েছিল। সেও শুনল।
কাহিনী শেষ হলো আহমদ মুসার।
কিন্তু রাশিদি ইয়োসুগো এবং লায়লা কারও মুখেই কোন কথা নেই। বেদনা এবং বিস্ময়ে তারা যেন পাথর হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল রাশিদি ইয়েসুগো। 'চলুন ভাইয়া ব্ল্যাক বুলের কাছে' -বলে সে চলতে শুরু করল। বলল, 'আল্লাহর হাজার শোকর যে, মরহুম যায়দ রাশিদির উত্তরসূরীকে তিনি আমার ঘরে এনেছেন। মারুয়ার রাজপরিবার এবং আমাদের পরিবার কত যে খুঁজেছে যায়দ রাশিদিকে। কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি। অথচ এত কাছে তারা ছিলেন। বিপর্যয়ের এত সাইক্লোন তাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে।' বলতে বলতে ইয়েসুগোর গলা আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা এবং ইয়েকিনিও উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। তারাও চলতে শুরু করেছে ইয়েসুগোর পিছু পিছু।
লায়লা উঠে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আবার সে বসে পড়ল সোফায়। চোখের প্রান্ত পর্যন্ত নামিয়ে দেয়া মাথার চাদর সরিয়ে নিয়ে শিথিল বসনা হয়ে একটু গা এলিয়ে বসল সে সোফায়।
ড্রইং রুমের দরজা পেরুবার আগে ইয়েকিনি একবার পেছন ফিরে চাইল। হয়তো বিনা কারণেই। তার চোখ গিয়ে পড়ল লায়লার উপর।
লায়লা তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে কাপড় ঠিক করে মাথার চাদর আবার টেনে নিল। মুখে ফুটে উঠল তার লজ্জা রাঙা একটা কৃত্রিম ক্রোধ। ডান হাতের মুষ্টি উঠিয়ে শাসন করল সে ইয়োকিনিকে।
ইয়েকিনি সলজ্জ মিষ্টি হেসে জোড় হাতে মাফ চাওয়ার ভংগি করে ঘুরে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার পিছু পিছু চলা শুরু করলো।
ইয়েকিনির চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল লায়লা। হারিয়ে গেল তার মন ইয়েকিনির মধ্যে। অন্তরে একটা অস্বস্তিও জেগে উঠল। এমন করে ভাবা কি পাপ? আবার সে ভাবল, ইয়েকিনিকে নিয়ে সে ভাবে, তাকে জীবন সংগী হিসেবে পেতে চায় বটে। কিন্তু কোন সীমা লংঘন তো সে করেনি।
আবার সোফায় গা এলিয়ে দিল লায়লা ইয়েসুগো।
'চীফ জাস্টিস উসাম বাইক তাহলে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে?' উত্তেজিত কণ্ঠে বলল ফ্রান্সিস বাইক।
'তাই তো প্রমাণ হচ্ছে, হাইকোর্টের রেজিস্টার রুম থেকেই টিকটিকি পিছু নিয়েছে আমাদের লোকদের। ওমর বায়ার কেসের ব্যাপার নিয়ে আমাদের লোকরা যাবে, এটা চীফ জাস্টিসই জানতেন। তিনি গোপনে লোক লাগিয়ে আমাদের ঠিকানা যোগাড় করে ডঃ ডিফরজিসকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন।' বলল পিয়েরে পল।
'এটা পরিস্কার। চীফ জাস্টিস একটা শয়তান। এখন কি করা যায় বলুন তো?'
'আগে চলুন টিকটিকির কাছে আরও কি জানা যায় দেখা যাক। তারপর ওটার ব্যবস্থা করে চীফ জাস্টিসের কেস হাতে নেয়া যাবে।'
ফ্রান্সিস বাইক ওয়াকিটকি তুলে নিল হাতে।
নির্দিষ্ট চ্যানেলে রজারের সাথে যোগাযোগ করল ফ্রান্সিস বাইক। কিন্তু রজারের কাছ থেকে কোন সাড়া পেল না। বার বার চেষ্টা করল। না উত্তর নেই।
'কি ব্যাপার রজাররা কোন জবাব দিচ্ছে না যে?'
'হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে কিংবা টয়লেটে গেছে।'
'না, টয়লেটে গেলে ওয়াকিটকি সাথে নেবার কথা।'
'তাহলে ঘুমিয়েছে নিশ্চয়।'
'ফ্রান্সিস বাইক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, না এই বেলা দশটায় কোন সময়ই ঘুমানোর কথা আমাদের অভিধানে নেই।'
একটু থামল ফ্রান্সিস বাইক। তারপর বলল, 'ওদের সাথে সর্বশেষ কখন আপনার যোগাযোগ হয়েছে?'
'আমি ওদের সাথে যোগাযোগ করিনি। ওরাই গতকাল মধ্যাহ্নের পর যোগাযোগ করে। কথা হয় টিকটিকিকে ওরা বন্দী করে রাখবে। আপনি সকালে এলে খোজ-খবর নিয়ে ব্যবস্থা করা হবে। তারপর ওরা কিংবা কেউ আর যোগাযোগ করেনি।'
'কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। এই দীর্ঘ সময়ে ওরা যোগাযোগ করবে না, এটা বিস্ময়কর। চলুন দেখা যাক।' বলল ফ্রান্সিস বাইক।
ফ্রান্সিস বাইক উঠে দাঁড়াল। তার সাথে পিয়েরে পলও উঠল। গাড়ি তাদের ছুটে চলল 'ওকুয়া'র সেই জেলখানার উদ্দেশ্যে।
ব্ল্যাক বুলের বাড়ির সেই ভাঙা গেট দিয়ে প্রবেশ করেই ফ্রান্সিস বাইক বাড়িতে প্রবেশের মূল গেটটাকে খোলা দেখতে পেল। চমকে উঠল ফ্রান্সিস বাইক।
গোটা বাড়ি ওরা খুঁজল। শেষে আন্ডার গ্রাউন্ড কক্ষে গিয়ে চারজনের লাশ পেল।।
'টিকটিকির হাতেই এরা খুন হয়েছে। এদের খুন করেই সে পালিয়েছে।' বলল পিয়েরে পল।
'কিন্তু কি করে এটা সম্ভব হলো? ব্ল্যাক বুল কোথায় গেল?' ফ্রান্সিস বাইক বলল।
'আমার মনে হয় টিকটিকির শক্তির ওরা অবমূল্যায়ন করেছিল। তারই সুযোগ গ্রহণ করেছিল টিকটিকি। আর ব্ল্যাক বুলকে আমার মনে হয় ওরা ধরে নিয়ে গেছে, কথা বের করার জন্যে।'
'চীফ জাস্টিস জঘন্যভাবে বিশ্বাস ভংগ করেছে মিঃ পল।'
'অবশ্যই। তাকে শিক্ষা দিতে হবে এবং এখনই।'
দু'জনে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে।
গাড়িতে উঠতে উঠতে ফ্রান্সিস বাইক বলল, 'কি করা যায় এখন?'
'আপনার সাহসী লোকজন কেমন আছে?'
'সব কাজ করার মত লোক আমাদের আছে।'
'তাহলে এই মুহূর্তেই চলুন, আপনার লোকদের নির্দেশ দিন চীফ জাস্টিসের পরিবারের একান্ত আপনজন কাউকে কিডন্যাপ করতে হবে এবং আজই করতে হবে।'
ফ্রান্সিস বাইকের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, 'ঠিক আছে মিঃ পল। তার টিকটিকি লেলিয়ে দেবার উপযুক্ত জবাব এটাই। কিন্তু চীফ জাস্টিসকে কিডন্যাপ করি না কেন? তাকে দেখিয়ে দেয়া যেত বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি?'
'আমাদের লক্ষ্য তাকে শাস্তি দেয়া এবং সেই সাথে কাজও উদ্ধার। চীফ জাস্টিসকে কিডন্যাপ করলে তো আমাদের কাজ উদ্ধার হবে না, শাস্তি হয়তো পাবে। আর তার মেয়েকে কিডন্যাপ করলে তাকে শাস্তিও দেয়া যাবে, কাজও করিয়ে নেয়া যাবে।'
ওরা পৌছল 'ওকুয়া'র অফিসে।
ফ্রান্সিস বাইকের বিশাল টেবিলের পাশে ওরা বসল দু'জন।
টেলিফোনে প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে এবং নির্দেশাবলী দিয়ে পিয়েরে পলের দিকে ঘুরে বসে বলল, 'সব ঠিক-ঠাক মিঃ পল। এখনই ওরা কাজ শুরু করবে।'
'কি কাজ শুরু করবে?'
'কেন, চীফ জাস্টিসের পরিবারের ডসিয়ার আমাদের কাছে আছে। প্রতি 'উইক এন্ড'-এ (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) চীফ জাস্টিস তার মেয়েকে নিয়ে ইন্ডিপেনডেন্স পার্কে গিয়ে দু'ঘন্টা সময় কাটান। ঠিক দশটায় যান, বারটায় চলে আসেন। তাদের সাথে থাকে মাত্র একজন আরদালি।'
পিয়েরে পল খুশী হয়ে উঠল। বলল, 'ধন্যবাদ ফ্রান্সিস বাইক। চমৎকার সুযোগ। আপনাদের পরিকল্পনা কি?'
'ঠিক বারোটায় ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের গেটে ওরা যখন গাড়িতে উঠতে যাবে, ঠিক সেই সময় কিডন্যাপ করা হবে চীফ জাস্টিসের মেয়েকে।'
'গেটে পুলিশ থাকে না?'
'দু'জন পুলিশ থাকে। তার মধ্যে একজন ট্রাফিক পুলিশ। ওদের আগেই ম্যানেজ করা হবে।'
'ওয়ান্ডারফুল।' বলে ঘড়ির দিকে তাকাল পিয়েরে পল। বলল, 'এখন এগারটা। তাহলে সুখবরের জন্যে আমাদের আরও সোয়া ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে।'
'হ্যাঁ। যিশু আমাদের সহায় হোন।' বলে ফ্রান্সিস বাইক তার ইন্টারকমের দিকে মুখ ঘুরাল। বলল, 'দেখি ওরা বেরোল কিনা।'
'আজই এমনটা ঘটবে বলে আশংকা করছেন ভাইয়া?' বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।
'আমি ওদের কথা শুনে যতটা বুঝেছি, তাতে আজ সকালে ফ্রান্সিস বাইক কোথাও থেকে ফিরে আসবে। তারপরই ওরা আমার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিত। কিন্তু আজ সকালে যখন ওরা দেখবে, আমি নেই, তার সাথে ওদের চারজন নিহত এবং ব্ল্যাক বুলকে আমরা ধরে নিয়ে এসেছি, তখন ওরা ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে যাবে।'
ব্ল্যাক বুল ওরফে 'আবদুলল্লাহ রাশিদি'কে আমরা ধরে নিয়ে এসেছি বুঝবে কি করে ওরা?'
ব্ল্যাক বুল-এর পিতৃদত্ত নাম ছিল 'জর্জ রাশেদি'। 'ওকুয়া'র কসাই পদ পাওয়ার পর ওরা তার নামকরণ করা হয় ব্ল্যাক বুল। আহমদ মুসা তার 'জর্জ' নাম পাল্টিয়ে করেছে আবদুল্লাহ। তার সাথে 'রাশিদি' মিলে হয়েছে 'আবদুল্লাহ রাশেদি'। ব্ল্যাক বুল নামটি সানন্দে গ্রহণ করে বলেছে, ‘আমি খৃষ্টানও ছিলাম না, মুসলিমও ছিলাম না। কিন্তু গৌরব বোধ করতাম আমাদের দাদীর জন্যে। তার ধর্ম ইসলাম আমার কাছে আপন বলে মনে হতো।’ ব্ল্যাক বুল মহা খুশী হয়েছে রাশিদি ইয়েসুগোর পরিচয় পেয়ে। তার এখন মনে হচ্ছে সে নতুন মানুষ। সে সব ফিরে পেয়েছে- তার ধর্ম, তার পরিবার- সবকিছু। তার সাথে তার মনে হয়েছে 'ওকুয়া'র মত খৃষ্টান সংগঠন তার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তার দাদীর আব্বা যায়দ রাশিদির হত্যা প্রতিশোধ নেবার দায়িত্ব এসে বর্তেছে তার উপর।
আহমদ মুসা বলল, ‘ওরা নিশ্চিত, আবদুল্লাহ রাশিদি পালাতে পারে না। ওকে না পাওয়ার অর্থই আমরা তাকে ধরে এনেছি।’
‘ওরা যে ক্ষেপা কুকুর হবেই। ওরা প্রতিশোধ নেবে বললেন। কি প্রতিশোধ নিতে পারে?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।
‘ওদের যতটা চিনেছি, তাতে চীফ জাস্টিসের পরিবারের কাউকে কিডন্যাপের চিন্তাই প্রথমে করবে।’
‘কিডন্যাপ? চীফ জাস্টিসকে? তাহলে তো সাংঘাতিক হবে।’
‘না চীফ জাস্টিসকে কিডন্যাপ করলে তাদের আসল উদ্দেশ্যই ভন্ডুল হয়ে যাবে। ওমর বায়ার সম্পত্তি হস্তান্তর তাহলে কাকে দিয়ে করাবে?’
‘তাহলে?’
‘আমার মনে হয় চীফ জাস্টিসের সবচেয়ে প্রিয় কাউকেই তারা কিডন্যাপের চেষ্টা করবে।’
বৈঠক খানায় তাদের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছিল লায়লা। সে বলল, ‘ভাইয়া আমি রোসেলিন-এর কাছে শুনেছি তাকে তার আব্বা একা চলা ফেরা করতে নিষেধ করেছে। রোসেলিন এখন একা চলাফেরা করেনা।’
‘ঠিক, রোসেলিন আমাকেও এ ধরনের কথা বলেছে। বলতে ভুলে গেছি আহমদ মুসা ভাইকে।’ বলল রাশিদি।
‘রোসেলিন কে?’
‘চীফ জাস্টিসের মেয়ে এবং ভাইয়ার....।’
লায়লা কথা শেষ করতে পারলনা। রাশিদি ইয়েসুগো তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল। বলল, ‘ওসব কথার সময় বুঝি এটা!’
আহমদ মুসার ঠোটে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘লায়লা অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলেনি। সে রোসেলিনের পরিচয় সম্পূর্ন করতে চেয়েছিল মাত্র।’
থামল আহমদ মুসা। মুখটা তার গম্ভীর হয়ে উঠল। শুরু করল আবার, ‘তাহলে বুঝা যাচ্ছে চীফ জাস্টিস আগেই সন্দেহ করেছেন।’
‘নিশ্চয় ব্ল্যাক ক্রস ও ওকুয়া তাকে ভয় দেখিয়েছে এবং তিনি মেয়ে রোসেলিনের নিরাপত্তা সম্পর্কেই উদ্বিগ্ন ছিলেন বেশী।’
‘আমারও মনে হচ্ছে, চীফ জাস্টিসের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থান তার মেয়ে। সুতরাং ওকুয়া ও ব্ল্যাক ক্রস চীফ জাস্টিসকে শাস্তি দেবে এবং তাকে বাগে আনার জন্য রোসেলিনের গায়েই হাত দিবে।’
রাশিদি ইয়েসুগোর চোখে-মুখে নেমে এল উদ্বেগ। বলল, ‘ওরা যা করবে, দ্রুতই করবে মনে হয়।’
‘অবশ্যই। কিন্তু আমি জানি না কোন সুযোগ তারা নেবে কিংবা কোন পথে তারা এগুবে। আমাদের এটা একটা সুযোগ। আমরা চীফ জাস্টিসের বাড়ী এবং বাড়ির সদস্যদের উপর নজর রাখি, তাহলে ওকুয়া এবং ব্ল্যাক ক্রস-এর লোকদের সাক্ষাত আমরা পেতে পারি এবং তাদের মাধ্যমে আমরা পৌছাতে পারি তাদের ঘাটিতে।’
‘তাহলে এখনি আমাদের কিছু করার দরকার। আমরা যেতে পারি চীফ জাস্টিসের বাসার দিকে। নজর রাখতে পারি তাদের বাড়ির উপর।’ বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।
‘হ্যা, আমরা যেতে পারি। চেন তুমি তাদের বাসা?’
‘চিনি।’
‘তাহলে উঠ, চল যাই।’
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘রাশিদিকে সাথে নিচ্ছিনা।’
‘কেন?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘তোমাকে ওদের কেউ কেউ চিনে। তোমাকে ঘুর ঘুর করতে দেখলে, তার অন্য অর্থ হতে পারে।’
রাশিদি কিছু বলল না। তার মুখটা মলিন হয়ে গেল।
লয়লা মুখ টিপে হাসল। বলল, ‘বড়ই দুঃখের কথা। রাজপুত্র যেতে পারবে না রাজকন্যাকে রক্ষার অভিযানে।’ বলেই লায়লা এক দৌড়ে পালিয়ে গেল ড্রইং রুম থেকে।
লজ্জায় রাশিদি ইয়েসুগোর মুখ লাল হয়ে উঠল। মুখ নিচু করে বলল, ‘লায়লাটা বড় দুষ্টু হয়ে গেছে ভাইয়া।’
‘ও কিছু না, একটু আনন্দ করছে।’
‘না, ওকে বিদায় করতে হবে।’
‘বিদায় করবে? কোথায়?’
‘এটা ইয়েকিনি জানে।’
ইয়েকিনির মুখে বিব্রত ভাব আর ঠোঁটে সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল। মুখ নিচু করল। কিছু বলল না।
আহমদ মুসা ইয়েকিনির পিঠ চাপড়ে হেসে বলল, ‘মুহাম্মাদ ইয়েকিনি খুব ভাল ছেলে। তোমার বিপদে সে না দেখে পারেনা।’
কথা শেষ করেই ইয়েকিনিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘চল ইয়েকিনি।’
‘চলুন।’ বলল ইয়েকিনি।
দু ‘জন বেরিয়ে এল।
রাশিদি ইয়েসুগোর গাড়ি প্রস্তুত ছিল। ড্রাইভিং সিটে বসল আহমদ মুসা। মুহাম্মাদ ইয়েকিনি তার পাশের সিটে।
‘পথ বলে দিও। সংক্ষিপ্ত পথে যাব।’
‘সংক্ষিপ্ত পথটায় খুব বেশী ট্রাফিক পয়েন্ট আছে। আর সময়টাও খুব জ্যাম-এর সময়। তার চেয়ে আমরা যদি ইয়াউন্ডি নদী তীরের হাইওয়ে ধরে ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের পাশ দিয়ে যাই, তাহলে পথ একটু লম্বা হবে কিন্তু ট্রাফিক ও জ্যামের হাত থেকে বাঁচব। পৌছতেও পারব আমরা অনেক আগে।’
‘এটাইতো চাই।’ বলে আহমদ মুসা গাড়িতে স্টার্ট দিল।
ছুটে চলল গাড়ি।
ইয়াউন্ডি নদীর তীর ঘেঁষে পরিকল্পিতভাবে লাগানো গাছের সারি। তার পাশ দিয়ে প্রশস্ত হাইওয়ে। হাইওয়ের অন্য পাশ দিয়েও সারিবদ্ধ গাছের লাইন।
‘চমৎকার রাস্তা ইয়েকিনি।’
‘একে ট্যুরিস্ট রোড বলে ভাইয়া।’
‘সার্থক নাম।’
‘নদীর ধার দিয়ে ১৫ মাইল রাস্তা এইভাবে গেছে। মাঝখানে রয়েছে ইন্ডিপেনডেন্স পার্ক।’
‘ইন্ডিপেনডেন্স পার্ক আর কতদূর?’
‘প্রায় এসে গেছি।’
ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের কাছে এসে হাইওয়েটি বেঁকে ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের তিন প্রান্ত ঘুরে আবার নদীর তীর ঘেঁষে সামনে এগিয়ে গেছে।
আহমদ মুসার গাড়ি ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে চলেছে।
ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের প্রধান গেটের পাশ দিয়েই এগিয়ে গেছে হাইওয়েটি।
ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের প্রধান গেট অতিক্রম করছে আহমদ মুসার গাড়ি।
নারী কণ্ঠের একটা চিৎকার শুনতে পেল আহমদ মুসা গেটের দিক থেকে।
একটা হার্ড ব্রেক কষল আহমদ মুসা।
ইয়েকিনি গাড়ির ড্যাশ বোর্ডের উপর মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। তার দু’টি হাতের প্রানান্ত প্রচেষ্টা তাকে রক্ষা করেছে।
আহমদ মুসা তাকিয়েছে চিৎকার লক্ষ্য করে। দেখল, দু’জন লোক একজন তরুণীকে টেনে পাশে দাঁড়ানো গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর একজন ষ্টেনগান ধরে আছে মূর্তির মত দাঁড়ানো দু’জন লোকের দিকে। লোক দু’টির পরণে পুলিশের পোষাক। মাথায় হ্যাট। কপাল ঢেকে গেছে হ্যাটে। আর একজন লোককে দেখা গেল গাড়িটির ড্রাইভিং সিটে, যে গাড়িটির দিকে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমেছে এই সময় একটা গুলীর শব্দ হলো।
গুলীর শব্দ লক্ষ্যে তাকিয়েছিল আহমদ মুসা। দেখল, হ্যাট পরা পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক দু’জনের পেছনে একটু দূরে দাঁড়ানো একটি মেয়ে গুলী করেছে। মেয়েটার গায়ে-মাথায় ওড়না।
মেয়েটি গুলী করেছে ষ্টেনগানধারীকে। ষ্টেনগানধারী গুলী খেয়ে পড়ে গেছে। ছিটকে পড়েছে তার হাত থেকে ষ্টেনগান।
গুলীর শব্দ শুনেই যে দু’জন লোক তরুণীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তাদের একজন মেয়েটিকে টেনে নিয়ে ঢাল হিসেবে সামনে ধরে বিদ্যুত গতিতে ঘুরে দাড়ালো। তার হাতে রিভলবার। সে রিভলবার তুলল রিভলবারধারী মেয়েটিকে লক্ষ্য করে। মেয়েটির হাতে উদ্যত রিভলবার। কিন্তু তার গুলী করার পথ বন্ধ। কারণ গুলী করলে সে গুলি সামনে ধরে রাখা তরুনীটির বুক এফোঁড় ওফোঁড় করবে।
রিভলবাধারী মেয়েটিকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠেছিল আহমদ মুসা। একি সম্ভব। কিন্তু চিন্তার তার সময় ছিল না। লোকটি ট্রিগার টিপছে।
আহমদ মুসার হাতে রিভলবার উঠে এসেছিল আগেই। উদ্যত ছিল তার রিভলবার। খুব সাবধানে বিপজ্জনক গুলীটা করল আহমদ মুসা।
পর পর দু’টি গুলী বের হলো আহমদ মুসার রিভলবার থেকে।
প্রথম গুলীটা গিয়ে বিদ্ধ করল রিভলবারধারী লোকটির ঠিক কানের উপর। কিন্তু তার সাথে সাথেই লোকটির রিভলবারও গর্জন করে উঠেছিল। শেষ মূহূর্তে তার হাতটি কেঁপে গিয়েছিল। তার কাঁপা হাতের গুলী কিছুটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বিদ্ধ হলো রিভলবারধারী মেয়েটির বাম বাজুতে।
আর আহমদ মুসার দ্বিতীয় গুলীটা গিয়ে বিদ্ধ করেছিল যে লোকটি তরুণীটিকে ধরে গাড়ীতে উঠাচ্ছিল তার পৃষ্ঠদেশকে।
গুলী বিদ্ধ দু’জনই সামান্য টলে উঠে মাটিতে আছড়ে পড়েছিল।
ওড়না পরা গুলীবিদ্ধ মেয়েটি আর্ত চিৎকার করে ডান হাতে বাম বাজুটি চেপে ধরে বসে পড়েছিল।
আহমদ মুসা ছুটে গিয়েছিল মেয়েটির দিকে। মেয়েটির মাথা থেকে উড়না সরে গিয়েছিল।
মেয়েটি যে সত্যিই ডোনা, তা এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা নিয়ে হাজির হলো আহমদ মুসার কাছে।
আহমদ মুসার হাতে তখনও রিভলবার।
আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে হাটু গেড়ে বসল ডোনার সামনে। বলল, ‘কি দেখছি আমি! ডোনা তুমি! কোথায় লেগেছে?’
‘গুলী গুলী’ বলে চিৎকার করে উঠল ডোনা। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল হাইজাক কারীদের গাড়ির দিকে।
তার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে আহমদ মুসা দেখল, হাইজাকারদের গাড়ী থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসেছে। তার হাতের রিভলবারটি উঠে এসেছে তাদের লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা মাথা না ঘুরিয়ে সেই অবস্থাতেই বাম হাতে ডোনাকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটি গুলী ছুটে গেল তাদের উপর দিয়ে।
আহমদ মুসার ডান হাতে রিভলবার ধরাই ছিল। সে শুয়ে পড়েই গুলী চালাল সেই রিভলবারধারী লোকটিকে লক্ষ্য করে। অব্যর্থ লক্ষ্য। লোকটি দ্বিতীয় বার লক্ষ্য ঠিক করার আগেই গুলী বিদ্ধ হয়ে ছিটকে গিয়ে পড়ল গাড়ির উপরে।
ডোনা ছিটকে এসে পড়েছিল আহমদ মুসার বাম কাঁধের উপর।
পড়ে থাকা অবস্থাতেই ডোনা মুখ ঘুরিয়ে ছিল। তার মুখটা এসে পড়েছিল আহমদ মুসার কানের কাছে। ডোনা বলল, ‘তুমি কি আহত? তোমার কিছু হয়নি তো?’
আহমদ মুসা সে কথার কোন জবাব না দিয়ে ডোনাকে নিয়েই উঠে বসল।
ডোনার শরীরের বাম দিকটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি ডোনার গাউন এর হাতাটা ছিড়ে ফেলে ডোনার ওড়নাতেই গজের মত বানিয়ে তাঁর বাম বাজুটা বাঁধতে লাগল। ইতিমধ্যে সেই তরুণী এবং হ্যাটধারী দুই ভদ্রলোক ও মুহাম্মাদ ইয়েকিনী, তাদের চারদিকে এসে দাঁড়াল।
তরুণীটি রোসেলিন, হ্যাটধারীদের একজন চিফ জাস্টিস উসাম বাইক, অন্যজন ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি।
ডোনার আব্বা রাজ্যের আনন্দ ও বিস্ময় নিয়ে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, ‘বাবা তুমি! ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
আহমদ মুসা ডোনার হাত বাঁধতে বাঁধতে বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে আমি এখনও স্বপ্ন দেখছি। আপনারা আসবেন তা কল্পনাতেও ভাবিনি।’
রোসেলিন বসে পড়ে ডোনাকে জড়িয়ে ধরেছে। আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে আর্তস্বরে বলল, ‘খুব সিরিয়াস কি?’
আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে রোসেলিনের দিকে মুখ তুলল। বলল, ‘খুব ব্লিডিং হচ্ছে। ওকে তাড়াতাড়ি ক্লিনিকে নেয়া দরকার।’
রোসেলিন তাদের আবদালির দিকে মুখ তুলে বলল, ‘গাড়ী রেডি?’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম।’ বলল আবদালি।
বাঁধা হয়ে গিয়েছিল। আহমদ মুসা ইয়েকিনির দিকে মুখ তুলে বলল, ‘মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ওদের সকলের পকেট এবং গাড়ী খুঁজে দেখ কোন প্রকার কাগজ পাও কিনা।’
ছুটল ইয়েকিনি।
ইয়েকিনির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো রোসেলিন। এতক্ষণে সে খেয়াল করেছে তাকে। রাশিদি ইয়েসুগোর বন্ধু ইয়েকিনিকে সে চেনে।
আহমদ মুসা পাঁজাকোলা করে তুলে নিল ডোনাকে। চলল গাড়ির দিকে।
ডোনা মুখ গুঁজল আহমদ মুসার বুকে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
‘খুব কষ্ট হচ্ছে ডোনা।’ বলল আহমদ মুসা।
ডোনা চোখ বুজে ছিল। চোখ খুলল। বলল ফিসফিসিয়ে, ‘একটুও না। তোমাকে এমনভাবে পেলে আমি শতবার আহত হতে পারি।’ ডোনার চোখে অশ্রু আর ঠোঁটে একটা পরিতৃপ্তির হাসি।
গাড়ির কাছে এসে গিয়েছিল।
গাড়ির পেছনের সিটে ডোনাকে শুইয়ে দিল আহমদ মুসা। রোসেলিন আহমদ মুসাকে সাহায্য করল। সে আহমদ মুসার পাশে পাশেই ছিল। সে দেখেছে ডোনার কান্না, শুনতে পেয়েছে ডোনার কথা। রোসেলিন বিস্ময় ও কৌতুহল ভরা দৃষ্টি নিয়ে দেখছে আহমদ মুসাকে। তাঁর বিস্ময় আরও এ কারণে যে, আহমদ মুসা যেভাবে তিনজন অপহরণকারীকে, বিশেষ করে শেষ জনকে হত্যা করল, সেটা তাঁর কাছে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।
চিফ জাস্টিস ওসাম বাইক পুলিশের সাথে কথা বলে গাড়ির কাছে ছুটে এসেছিল। বলল রোসেলিনকে, ‘সামরিক হাসপাতাল তুমিতো চেন, ওখানে নিয়ে যেতে হবে। ওখানে নিরাপত্তাও পাওয়া যাবে।’
তারপর ঘুরল চিফ জাস্টিস আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘গাড়িতে পুলিশ দেব?’
‘না দরকার হবে না।’
‘ধন্যবাদ।’ বলে তার পাশে দাঁড়ানো ডোনার আব্বাকে বলল, ‘চলুন আমরা গাড়িতে উঠি।’ বলে সে হাটা শুরু করল।
ডোনার আব্বা আহমদ মুসার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘বাবা তুমি যাও ডোনার পাশে বস। তাকে দেখ। ওর কি খুব কষ্ট হচ্ছে?’
এতক্ষণে ডোনার আব্বার কণ্ঠ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
আহমদ মুসা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘মারাত্মক কিছু ঘটতে পারত, তা হয়নি। বাহুর একটি অংশ ছিড়ে নিয়ে গুলী বেরিয়ে গেছে মনে হচ্ছে। কোন চিন্তা করবেন না।’
বলে আহমদ মুসা ইয়েকিনীর দিকে তাকিয়ে উচ্চ কণ্ঠে বলল, ‘তুমি এস আমাদের সাথে। ওদের গাড়ির নম্বরটাও নিয়েছ তো?’
‘জি, নিয়েছি।’ বলল ইয়েকিনী।
মিশেল প্লাতিনি চলে গিয়েছিল চিফ জাস্টিস উসাম বাইক এর সাথে।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে ডোনার মাথার কাছে বসল।
রোসেলিন নির্দেশ দিল ড্রাইভারকে গাড়ী ছাড়ার জন্য।
গাড়ির সিটের সাথে বামপাশটা ঠেস দিয়ে ঈষৎ কাত হয়ে শুয়ে আছে ডোনা। তার আহত বাম বাহুটাকে তার গায়ের উপর যেভাবে রেখেছিল, সেভাবেই আছে।
ডোনার আহত বাম হাতটি কাঁপছে।
মাথার চুল তার এলোমেলো হয়ে গেছে। কয়েক গুচ্ছ চুল গিয়ে পড়েছে কপাল পেরিয়ে মুখের উপর। চোখ দু’টি বোজা ডোনার। বোঝাই যাচ্ছে দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা হজম করার চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে ডোনার মুখ থেকে চুল সরিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে ডোনা?’
ডোনার ডান হাতটা ধীরে ধীরে উঠে এল। হাত রাখল আহমদ মুসার হাতে। চেপে ধরে থাকল অনেকক্ষণ। তারপর সে ধীরে ধীরে আহমদ মুসার হাত নামিয়ে আনল মুখের উপর। ডোনার অশ্রুর উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করল আহমদ মুসা তার হাতে।
ইচ্ছে করেই আহমদ মুসা তার হাত সরিয়ে নিল না। কাঁদছে ডোনা।
ডোনার চোখের পানিতে ভিজে গেল আহমদ মুসার হাত।
রোসেলিন বসে ছিল সামনের সিটে।
আহমদ মুসা একবার রোসেলিনের দিকে চাইল। কেউ না বললেও আহমদ মুসা বুঝছে মেয়েটি রোসেলিন। বলল, ‘মিস রোসেলিন, হাসপাতাল আর কত দূরে?’
‘আর অল্প।’ বলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার নাম রোসেলিন জানলেন কি করে?’
‘অনুমান করেছি।’
‘অনুমান করা নাম বলা সম্ভব নয়।’
‘আমি রাশিদী ইয়েসুগোর মেহমান। লায়লার কাছে এ নাম শুনেছি।’
ডোনা তার মুখ থেকে আহমদ মুসার হাত সরিয়ে নিল। অশ্রু ধোয়া চোখ আহমদ মুসার দিকে টেনে দুর্বল কণ্ঠে বলল, ‘তুমি লায়লাকে চেন? তুমি লায়লাদের ওখানে ছিলে? তাহলে ওরা কিছু বলেনি কেন?’
আহমদ মুসা বলল, ‘তুমি চেন লায়লাকে?’
‘খুব ভাল মেয়ে লায়লা। আমার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে।’
‘আপনার পরিচয় তো পেলাম না!’ আহমদ মুসাকে লক্ষ করে বলল রোসেলিন।
এ সময় গাড়ির গতি স্লো হয়ে এসে থেমে গেল। গাড়ী পৌঁছে গেছে হাসপাতালে।
গাড়ী থামতেই গাড়ী থেকে লাফ দিয়ে নামল রোসেলিন।
পেছনের দুটি গাড়ীও এসে দাড়িয়ে পড়েছিল।
চিফ জাস্টিসের গাড়ী থেকে তার আবদালী নেমেই ছুটল ইমার্জেন্সির ডিউটি রুমে। তার পেছনে পেছনে রোসেলিন।
কয়েক মুহূর্ত পরেই ডিউটিরত ডাক্তারও ছুটে এল।
চিফ জাস্টিস গাড়ী থেকে নেমেছে তখন।
ডাক্তার তাকে অভিবাদন করে বলল, ‘স্যার সব ব্যবস্থা করছি স্যার। আপনি দয়া করে ভেতরে বসুন।’
ডাক্তারের পেছন পেছনেই প্যাশেন্ট ট্রলি নিয়ে ছুটে এসেছিল চারজন।
আহমদ মুসা ডোনাকে গাড়ী থেকে নামিয়ে শুইয়ে দিল ট্রলিতে।
ট্রলি চলতে শুরু করতেই ডোনা আহমদ মুসার হাত চেপে ধরে বলল, ‘তুমি থাকবে আমার পাশে।’
‘চল আমরা সবাই থাকব। ভয় নেই ডোনা।’
ট্রলি ছুটে চলল। তার সাথে আহমদ মুসা, রোসেলিন এবং ডাক্তার। পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করল চিফ জাস্টিস ওসাম বাইক এবং মিশেল প্লাতিনি।
মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ওদের বলেছিল, ‘স্যার আমি গাড়ির কাছে আছি।’
‘ঠিক আছে বাবা। এটা দরকার।’ বলেছিল চিফ জাস্টিস উসাম বাইক।
হাঁটতে হাঁটতে চিফ জাস্টিস মিশেল প্লাতিনির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না মিশেল প্লাতিনি। এই বিস্ময়কর ছেলেটা কে? এমন ক্ষিপ্র, এমন নিপুণ, এমন নির্ভীক মানুষ এবং এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা শুধু সিনেমাতেই দেখা যায়। মনে হচ্ছে ছেলেটার সাথে আপনারা ঘনিষ্ঠ?’
হাসি ফুটে উঠল মিশেল প্লাতিনির মুখে। বলল, ‘এই ছেলেটার কথাই তো আমি আপনাকে বলেছিলাম। এইতো সেই কিংবদন্তির আহমদ মুসা।’
থমকে দাঁড়াল চিফ জাস্টিস। বিস্ময়-বিমূঢ়তায় তার মুখ যেন শক্ত হয়ে উঠেছে।
দাঁড়াল মিশেল প্লাতিনিও। হেসে বলল, ‘কল্পনার আহমদ মুসা এবং বাস্তবের আহমদ মুসা মিলছেনা না?’
‘মিলছে। তবে চেহারায় এতটা সুশীল, সুন্দর হবে ভাবিনি। ধারণা ছিল, চোখের দৃষ্টি হবে তীক্ষ্ন, শরীর হবে শক্ত, পেটা এবং আচরণ হবে দারুণ ভারিক্কি ও রহস্যময়তায় ভরা।’
‘ঠিক বলেছেন। এই দিকগুলো বিচার করলে সে বিপ্লবীদের তালিকায় পড়ে না।’
‘আমি সৌভাগ্য বোধ করছি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ঈশ্বরের কাছে। হয়তো তার মত ব্যাক্তি এসে হাজির না হলে আমার মেয়েকে দুর্দান্ত দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করা যেত না।’
‘আমার মেয়েও চিরতরে হারিয়ে যেত। দুর্বৃত্তটি গুলী খাওয়ার মুহূর্তে গুলী করায় গুলী কিছুটা লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়েছে। তা না হলে গুলীটা ঠিক বক্ষ ভেদ করতো। আল্লাহ ঠিক সময়েই সাহায্য পাঠিয়েছেন।’
হাসপাতালের বারান্দায় গিয়ে উঠল দু’জন।
ইমার্জেন্সী ওয়ার্ডের প্রশাসনিক অফিসার স্বাগত জানাল চীফ জাস্টিসকে। বলল, ‘স্যার প্যাশেন্টকে অপারেশন কক্ষে নেয়া হয়েছে। আসুন আপনারা বসুন।’
চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এবং মিশেল প্লাতিনি প্রবেশ করল বিশেষ ড্রইং রুমটিতে।
ডোনার জন্যে সামরিক হাসপাতালে বিশেষ কেবিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ্যাটেনড্যান্টের বিছানাসহ সোফা-ফ্রিজে সুসজ্জিত রুম।
ডোনা তার বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। এ্যাটেনড্যান্টের বিছানায় হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে রোসেলিন। মিশেল প্লাতিনি সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে।
চীফ জাস্টিস উসাম বাইক টয়লেট থেকে বেরিয়ে এসে সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘আহমদ মুসা কোথায়?’
রোসেলিন ইতিমধ্যে আহমদ মুসার পরিচয় পেয়েছে। অপারেশনের আগে এক সুযোগে ডোনা আহমদ মুসার পরিচয় বলেছে রোসেলিনকে। খবরটা শুনে হঠাৎ শক পাওয়া রোগীর মত অনেকক্ষণ আহমদ মুসার সাথে স্বাভাবিকভাবে রোসেলিন কথা বলতে পারেনি। বিস্ময়ের ধাক্কা কাটার পর রোসেলিন গৌরব বোধ করেছে এই ভেবে যে, তাকে আজ বাঁচাবার মাধ্যমে এবং ইয়েসুগোর মেহমান হয়ে এই বিশ্ববিপ্লবী তাদের জীবনের সাথে মিশে গেছে।
পিতার প্রশ্নের জবাব রোসেলিন সংগে সংগেই দিল, ‘উনি মুহাম্মদ ইয়েকিনির খোঁজে বাইরে গেছেন।’
‘সাথের ঐ ছেলেটা কি মুহাম্মদ ইয়েকিনি? তুমি চেন তাকে?’ বলল রোসেলিনের আব্বা।
‘জি, আব্বা। ও তো রাশিদি ইয়েসুগোর বন্ধু।’
‘আহমদ মুসা রাশিদির মেহমান হলো কি করে?’
‘শুনিনি আব্বা।’
‘ঈশ্বরের অনেক দয়া যে, ওরা ঠিক সময়ে এসে পড়েছিল।’
‘ঘটনা তো বাস্তবে ঘটেছে। তবু আমার কাছে এখনও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। তিনজন হাইজ্যাককারী চোখের পলকে নিহত হলো, আমি মুক্ত হয়ে গেলাম।’
‘আরেকজনকে তো মারিয়া মা শেষ করেছে। সত্যি আমাদের মারিয়া মা’র সাহস আছে।’
‘থাকবে না, আহমদ মুসার কিছু গুণ তো মারিয়ার মধ্যে থাকতে হবেই।’ বলেই কিন্তু লজ্জা পেল রোসেলিন। মুখ নিচু করল।
‘ডোনা কি মারিয়ার ডাক নাম প্লাতিনি?’ প্রসঙ্গটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।
‘ঠিক ডাক নাম নয়। ‘মারিয়া জোসেফাইন লুই’ ওর অফিসিয়াল নাম। কিন্তু ফ্যামিলি নাম হয়ে গেছে ওর ‘ডোনা জোসেফাইন লুই।’ বলল মি: মিশেল প্লাতিনি।
‘দু’টোই সুন্দর নাম।’
‘শুধু নাম সুন্দর নয় আব্বা, ওর সব সুন্দর।’
ডোনা এদিকে তাকিয়েছিল। ডোনার দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলে রোসেলিন মুখ টিপে হাসল।
লজ্জা পেল ডোনা। বোধহয় প্রসংগ ঘুরিয়ে নেবার জন্যেই ডোনা বলল, ‘তুমিই এখন মেজবান রোসেলিন, মেহমানরা কোথায় খোজ নেবার দায়িত্ব তোমার।’
‘জো হুকুম’ বলে মুখ টিপে হাসল রোসেলিন। উঠে দাঁড়াল বাইরে যাবার জন্যে। কয়েক পা এগিয়ে ছিল।
ঠিক এ সময়ে কেবিনে এসে প্রবেশ করল আহমদ মুসা এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।
রোসেলিন আহমদ মুসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘মারিয়া আপা বললেন, ‘আমি প্রধান মেজবান। অতএব আপনাদের খোঁজ-খবর নেবার দায়িত্ব আমার। তাই যাচ্ছিলাম।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ধন্যবাদ রোসেলিন। উনি ঠিকই বলেছেন। আপনি মহামান্য চীফ জাস্টিসের মা। সুতরাং প্রধান মেজবান তো হবেনই।’
রোসেলিন ডোনার দিকে মুখ ঘুরিয়ে কৃত্রিম রাগের সাথে বলল, ‘মারিয়া আপা, ওনাকে বলে দাও ছোট বোনকে কেউ ‘আপনি’ বলে না।’
ডোনা হাসল।
হাসল আহমদ মুসাও। বলল, ‘ধন্যবাদ বোন, তুমি বস।’
বলে আহমদ মুসা চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এবং মিশেল প্লাতিনি পাশাপাশি যে দুটো সোফায় বসেছিলেন, তার বিপরীত সোফার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি বসতে পারি জনাব?’
‘ও শিয়র। অবশ্যই বসবে, বস বাবা।’ বলল চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক।
মুহাম্মদ ইয়েকিনি দাঁড়িয়েছিল সোফার পেছনে।
রোসেলিন তার দিকে ঘুরে বলল, ‘তুমি বস ইয়েকিনি। লায়লা ভাল আছে?’
‘থ্যাংকস। ভাল আছে।’ বলে ইয়েকিনি গিয়ে আহমদ মুসার পাশের সোফায় বসল।
রোসেলিন গিয়ে বসল ডোনার বিছানায়, ডোনার পাশে।
আহমদ মুসা উসাম বাইক এবং মিশেল প্লাতিনির দিকে চেয়ে নরম ভাষায় বিনয়ের সাথে বলল, ‘আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই জনাব।’
‘বল বাবা।’ বলল ওসাম বাইক।
‘আমার মনে হয় আপনি সব জানেন কারা এই কিডন্যাপের চেষ্টা করেছিল এবং কেন করেছিল। আমি মনে করি, তাদের এই ব্যর্থতা ও লোক ক্ষয়ের পর তারা আরও হিংস্র হয়ে উঠবে এবং প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে।’
‘তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু কি ধরনের প্রতিশোধ নেবার তারা চেষ্টা করবে বলে মনে কর?’
‘কিডন্যাপ, হত্যা ইত্যাদি যে কোন পথই তারা বেছে নিতে পারে।’
চীফ জাস্টিস উসাম বাইকসহ সকলের চোখে-মুখেই একটা উদ্বেগের ছায়া পড়ল।
আহমদ মুসাই আবার কথা বলল, ‘আপনি কি পুলিশকে কিছু জানিয়েছেন?’
‘না জানাইনি। ওদের বিরুদ্ধে পুলিশ খুব কার্যকরী হয়তো হবে না। তাছাড়া ভয় হলো, পুলিশকে জানালে ডঃ ডিফরজিসের ক্ষতি হতে পারে।’
‘ঠিক বলেছেন। আমিও মনে করি, গোটা বিষয়টা পুলিশকে জানানোর প্রয়োজন নেই। তবে এই কিডন্যাপের প্রচেষ্টার কথা বলে বাড়িতে বিশেষ পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করুন।’
‘বাড়ি পর্যন্ত তারা হামলা চালাতে পারে বলে তুমি মনে কর?’
‘তারা এটা করতে পারে। এই ঘটনার পর তাদের অবস্থা ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হবার কথা।’
‘তোমার আর কি পরামর্শ?’
‘রোসেলিনের কয়েকদিন বাড়ি থেকে বের না হওয়াই ভাল। আর সম্ভব হলে আপনি এক সপ্তাহের ছুটি নিন।’
‘নিলাম। কিন্তু তারপর কি হবে?’
আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘ভবিষ্যৎ আমরা কেউ বলতে পারি না। তবে আমি মনে করি এ সময়ের মধ্যে পরিস্কার হয়ে যাবে তখন আমাদের কি করণীয়।’
‘সুন্দর বলেছ।’
‘ডোনা সম্পর্কে কি সিদ্ধান্ত হলো। সে এখানে থাকবে, না বাড়িতে যাবে?’ একবার চীফ জাস্টিসের দিকে আরেকবার ডোনার আব্বার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘তোমার কি পরামর্শ?’ বলল ডোনার আব্বা।
‘ডাক্তার ছাড়তে চাইলে বাসায় নিয়ে যাওয়াই ভাল।’
‘তুমি কি কিছু আশংকা কর এখানে?’ বলল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।
‘হাসপাতালে যতই পাহারা থাক, এখানে যা ইচ্ছা তাই করা সম্ভব।
‘ঠিক বলেছ। মারিয়া মাকে বাসায় নিয়ে যাওয়াই উচিত।’ বলল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।
‘তাহলে তো এখনি ওদের জানাতে হয়, কখন ওরা রিলিজ করতে পারবে।’ বলল ডোনার আব্বা।
‘যদি রিলিজ তাড়াতাড়ি করে, তাহলে আমরা পৌছে দিয়ে যেতে পারতাম। আমাদেরও একটু তাড়া আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কোথাও যাবে তুমি?’ বলল ডোনার আব্বা।
‘আমরা ওদের গাড়িতে দু’টি ঠিকানা পেয়েছি। একটা গাড়ির ব্লু বুকে, আরেকটা একজনের পকেটে পাওয়া লন্ড্রীর একটা স্লীপে। এর কোন একটা ‘ওকুয়া’র কোন ঘাটির হতে পারে, কিংবা ঐ দু’টো ঠিকানার সূত্র ধরে ওদের ঘাটির সন্ধান পেতে পারি। এই সন্ধানেই আমরা বেরুব।’
‘তোমরা কারা যাবে?’ জিজ্ঞেস করল মি: প্লাতিনি।
‘প্রথমত, আমি একাই যাব।’
‘কিভাবে? ‘ওকুয়া’ বা ‘কোক’- এর ঘাটিতে কেউ কিভাবে একক অভিযান চালাতে পারে?’ বলল চীফ জাস্টিস।
‘শত্রু এতটা শক্তিশালী যে দলবদ্ধ ও প্রকাশ্য অভিযান করে ওদেরে সাথে পারা যাবে না।’
‘একা কি করে পারা যাবে? বলল চীফ জাস্টিস।
শক্তিতে নয় কৌশলে ওদের উপর জয়ী হতে হবে। ছোট বা একক গোপন অভিযান এ জন্যেই প্রয়োজন।’
‘ব্যাপারটা বাজি ধরার মত। জয় অথবা পরাজয় যে কোন একটা হবে। উদ্ধারের জন্যে ওমর বায়া এবং ডঃ ডিফরজিসকে পাবে কিনা এই অনিশ্চয়তা নিয়ে এত বড় ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবেনা।’ বলল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।
‘চীফ জাস্টিস সাহেব ঠিকই বলেছেন।’ বলল ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ঝুঁকি না নিলে এসব ক্ষেত্রে কোন কাজই হয় না, করা যায় না। এ ধরনের ঝুঁকি এড়িয়ে চললে ডঃ ডিফরজিসদের উদ্ধার করা যাবে না কোন দিনই। আমরা উদ্ধার করতে চাইলে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।’
‘পুলিশের সাহায্য নেয়া যায়।’ বলল রোসেলিন।
‘তাতে লাভ নেই। মাঝখানে নিহত হবেন ডঃ ডিফরজিসরা।’ বলল চীফ জাস্টিস।
‘তুমি চীফ জাস্টিস হয়ে এই কথা বলছ আব্বা?’
হাসল চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক। বলল, ‘বলছি কারণ, এমন এবং এরচেয়েও ভয়াবহ হাজারো ঘটনা ঘটেছে আমি জানি।’
‘তাহলে তোমার জাস্টিস কোথায় থাকে আব্বা?’
‘জানা এবং প্রমান করতে পারা এক জিনিস নয়। বিচারের জন্যে প্রমাণের দরকার হয় মা।’
আহমদ মুসা প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, ‘তাহলে আমরা এখন উঠতে চাই।’
‘কিন্তু আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে।’ বলল চীফ জাস্টিস।
‘আমার কৌতুহল হচ্ছে, তোমরা কিভাবে কোথেকে ঠিক সময় সেখানে এসে পড়েছিলে?’
‘আমরা আপনার বাসার দিকে যাচ্ছিলাম।’
‘আমার বাসার দিকে? কেন?’
‘আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আপনার পরিবারের রোসেলিন বা গুরুত্বপূর্ণ কাউকে ওরা কিডন্যাপ করবে।’
‘তোমরা জানতে?’
‘ঠিক জানা নয়। অনুমান করেছিলাম।’
‘কিভাবে?’
‘গতকাল আমরা সুপ্রিমকোর্টে এসেছিলাম ওদের সন্ধানে।’
‘সুপ্রিমকোর্টে ওদের সন্ধানে কেন?’
‘বাধ্য হয়ে আপনি ওদের কাজ করে দিতে রাজী হলেও সুপ্রিমকোর্টে ওদের আসতে হবে কেসটা তোলার জন্যে।’
‘বুঝেছি। বল।’
‘সুপ্রিম কোর্টে ওদের দু’জনের সুন্ধান পাই এবং ওদের ঘাটির সন্ধানে ওদের অনুসরণ করতে গিয়ে বন্দী হই। বন্দী অবস্থায় সব জানতে পারি।’
‘গতকাল তুমি ওদের হাতে বন্দী হয়েছিলে?’ চোখ কপালে তুলল মিশেল প্লাতিনি।
‘কিভাবে ছাড়া পেলেন, কিভাবে বন্দী হলেন? খুব জানতে ইচ্ছে করছে।’ বলল রোসেলিন।
আহমদ মুসা হাসল। চাইল ডোনার দিকে।
ডোনা চেয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে বেদনার প্রশ্রবণ।
‘দুঃখের কথা শোনায় কি আনন্দ আছে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘দুঃখের কথা ওটা নয়, জয়ের কথা, বীরত্বের কথা।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘জয়, এখনও অনেক দূরে। বলতে পার, আমি বেঁচে এসেছি। আজ সকালে আমার প্রাণদন্ড হবার কথা ছিল। তা হয়নি।’
‘প্রাণদন্ড দিয়েছিল?’ সভয়ে বলল রোসেলিন।
‘হ্যাঁ। আমাকে রেখেছিল ওদের মাটির নীচের এক বধ্যভূমিতে। ওখানে যারা যায়, আর বের হয় না। আজ সকালে ‘ওকুয়া’ এবং ‘ব্ল্যাক ক্রস’ নেতারা ওখানে যাওয়ার কথা প্রাণদন্ড অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে।’
ডোনার মুখে নেমে এসেছিল অন্ধকার। আর রোসেলিনের মুখটা ভরে উঠেছিল উদ্বেগে।
ওরা কেউ কিছু বলল না।
আহমদ মুসা আবার কথা বলা শুরু করল। বলল গোটা কাহিনী।
গোগ্রাসে গেলার মত করে কাহিনী শুনল ওরা চার জন।
আহমদ মুসা থামল।
আহমদ মুসা থামলেও অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। নীরবতা ভাঙল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক। বলল, ‘অপরূপ এক রূপকথা শুনলাম। রহস্য, রোমাঞ্চ, আনন্দ, অশ্রু, সবই এর মধ্যে আছে। লিখলে এক অমর উপন্যাস হবে।’
‘কিন্তু এই কাহিনী শোনার পর আমার ভয় আরও বেড়ে গেল।’ বলল ডোনার আব্বা।
‘কেন?’ বলল চীফ জাস্টিস।
‘এবারও আহমদ মুসা আগের মতই একা যাচ্ছে।’
‘এ ধরনের অভিযানে আশংকা ও ভয় সব সময়ই থাকে। তবে এ সবকে প্রশ্রয় দিলে সামনে এগুনো যায় না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমরা সাধারণরা এভাবে এগুনোর কথা কল্পনা করতেও পারি না।’ বলল চীফ জাস্টিস।
‘এ জন্যেই দুনিয়াতে আহমদ মুসাদের সংখ্যা মাত্র দু’চারজনই থাকে।’ বলল রোসেলিন।
‘আমরা স্বীকার করি।’ বলে চীফ জাস্টিস উঠে দাঁড়াল এবং মিশেল প্লাতিনিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘চলুন মারিয়াকে কখন ছাড়তে পারে খোঁজ নিয়ে আসি।’
ইয়েকিনি এবং রোসেলিন প্রায় এক সংগেই বলে উঠল, ‘আপনারা বসুন আমি খোঁজ নিয়ে আসছি।’
‘ঠিক আছে যাও। আমরা তাহলে ততক্ষণ একটু ঘুরে ফিরে দেখি।’
বলে চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এবং ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি বেরিয়ে গেল।
ইয়েকিনি এবং রোসেলিনও উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘রাশিদি আসেনি কেন ইয়েকিনি।’ জিজ্ঞেস করল রোসেলিন।
‘রাজ কুমারীকে রক্ষার অভিযানে রাজ কুমারের আসার কথা ছিল। কিন্তূ আহমদ মুসা ভাই তার ইচ্ছে পূরণ হতে দেয়নি।’
মুখে-চোখে লজ্জার ছাপ নেমে এল রোসেলিনের। আহমদ মুসার দিকে এক পলক চেয়ে ইয়েকিনিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘রাজ কুমারের দুর্ভাগ্য, তার ভাগ্যে কোন রাজ কুমারী নেই।’ বলে রোসেলিন পা বাড়াল বাইরে যাবার জন্যে।
ইয়েকিনিও পা বাড়ালো।
রোসেলিন দরজা দিয়ে বেরুতে বেরুতে বলল, ‘মারিয়া আপা হাসপাতালের দরজা খোলা রাখা যায় না। বন্ধ করে গেলাম।’
লজ্জা মিশ্রিত একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল ডোনার মুখে।
‘মেয়েরা এ রকম দুষ্টুই হয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ছেলেরা বুঝি হয় না? ইয়েকিনি খোঁচা মারেনি রোসেলিনকে?’ বলল ডোনা।
কিছুক্ষণ নীরবতা। দু’জনেরই চোখ নীচু। নিজের চোখে নিজের উপরই নিবদ্ধ।
অনেকক্ষণ পর আহমদ মুসা চোখ নীচু রেখেই ধীরে কন্ঠে বলল, ‘আজ পার্কের-গেটে তোমাকে দেখার মত বিস্মিত জীবনে কখনও হইনি।’
‘ক্ষমা করেছ আমরা অপরাধকে?’ চোখ নীচু রেখেই বলল ডোনা।
‘অপরাধ কোথায় করলে?’
‘তোমার পিছু নিয়ে এই ক্যামেরুন পর্যন্ত এলাম।’
‘মারিয়া জোসেফাইনের যা করা উচিত ছিল তাই করেছে।’
‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, তুমি এ কথা বলছ।’ মুখে হাসি ডোনা জোসেফাইনের।
‘সত্যি বলছি। ক্যামেরুনে আসার অনুমতি চাইলে আমি তোমাকে অনুমতি দিতাম না। কিন্তু তোমাকে ক্যামেরুনে পেয়ে খুশী হয়েছি।’
‘কথা দু’টি কিন্তু বিপরীত মুখী হলো।’
‘বিপরীত মুখী নয়। একটা অতীতে কি ঘটতো সেই কথা, অন্যটা বর্তমানের কথা।’
‘সময়ের পরিবর্তনে নীতিগত অবস্থানের কি পরিবর্তন ঘটে?’
‘মৌল-নীতির ক্ষেত্রে ঘটে না। যে সব নীতিগত অবস্থান অবস্থা নির্ভর, সে সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন অবশ্যই ঘটে থাকে।’
‘ধন্যবাদ। আজ আমর বুক থেকে ভয়ের একটা পাথর নেমে গেল।’ চোখ বুজে বলল ডোনা।
‘এত ভয় নিয়ে অত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলে কেমন করে?’
‘কিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বলতে পারি না।’
‘এলিসা গ্রেসকে নিয়ে আসার তোমার সিদ্ধান্ত খুবই ভাল হয়েছে। আমি তোমাকে অভিনন্দিত করছি।’
‘আমি জানতাম ওমর বায়ার হাতে তাকে তুলে দিতে পারলে তুমি খুশী হবে।’
‘ধন্যবাদ। আমার মারিয়া জোসেফাইন যে দায়িত্ব পালন করার তাই করেছে।’
নিচু করে রাখা চোখ দু’টি বুজে গেল ডোনার। পরিতৃপ্তির একটা আনন্দ ফুটে উঠল মুখে। ‘ধন্যবাদ তোমাকে। তোমার মারিয়ার প্রতি তোমার অনেক অনুগ্রহ।’
‘তোমাকে অনুগ্রহ করেছি বলছ?’
ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল মুখে। চোখটা একটু খুলে আহমদ মুসার দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘কি বলব একে তাহলে?’
‘তুমি জান না?’
মুখ লাল হয়ে উঠল ডোনার লজ্জা ও অনুরাগের লাল রঙে দু’হাতে মুখ ঢাকল ডোনা। কোন উত্তর দিল না।
আহমদ মুসা হাসল। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, ‘আমি কিন্তূ রাগও করেছি ডোনা?’
মুখ থেকে দু’টি হাত সরিয়ে আহমদ মুসার দিকে এক পলক তাকিয়ে দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘কেন রাগ করেছ?’
‘তোমার হাতে রিভলবার উঠেছে। রিভলবার ব্যবহার করেছ।’
‘আত্মরক্ষার জন্য রিভলবার রাখার তো আনুমতি আছে।’
‘কিন্তু বিপজ্জনক একটি ক্ষেত্রে তুমি রিভলবার ব্যবহার করেছ।’
‘না করে কি উপায় ছিল?’
‘তোমার বুলেট একজন শত্রুকে শেষ করেছে এজন্য তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। কিন্তু আমার উদ্বেগ কি ঘটতে যাচ্ছিল তা নিয়ে। যে গুলীটা তোমার বাহুতে লেগেছে সেটা তো বুকে লাগার কথা ছিল।’
‘আল্লাহ তো রক্ষা করেছেন। যথা সময়ে তোমাকে পাঠিয়েছেন। আর এমন ঘটনা না ঘটলে তোমার দেখা হয়ত পেতাম না।’
‘আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি রক্ষা করেছেন। কিন্তু ডোনা তুমি জান, আমি বারুদের গন্ধ থেকে তোমাকে দূরে রাখতে চাই।’
‘নিজেকে বারুদের গন্ধে ডুবিয়ে রেখে তা কি তুমি পারবে?’
‘আমার এটা আকাঙ্ক্ষা। বারুদের গন্ধ-মুক্ত একটা শান্তির গৃহাঙ্গণ আমি চাই।’
‘জানি আমি। তোমার এ আকাঙ্ক্ষা আমাকে কষ্ট দেয়। সংগ্রামের যে জীবন তুমি বেছে নিয়েছ, সে জীবন থেকে আমি বিচ্ছিন্ন থাকব কেমন করে?’ ভারি কণ্ঠস্বর ডোনার। তার চোখের কোণা ভিজে উঠেছে।
‘বিচ্ছিন্ন থাক, আমি চাই না। কিন্তু সংগ্রামের ক্ষেত্র তো আরও আছে। কলমের সংগ্রাম, বুদ্ধির সংগ্রাম। আজ এগুলো অস্ত্রের সংগ্রামের চেয়ে লক্ষগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
‘জানি, আমি মানি। কিন্তু সংগ্রামের সে পথ তোমার মারিয়ার জন্য নয়। তোমার পথ থেকে তার পথ বিচ্ছিন্ন হবে কি করে? যে আগুনে তুমি পা দাও, সে আগুন তাকে স্পর্শ করবেই।’
‘জানি আমি, ডোনা। কিন্তু তারপরও সেটা আমার প্রিয় আকাঙ্ক্ষা।’
এ সময় দরজায় শব্দ হল।
আহমদ মুসা মনে করল রোসেলিনরা ফিরে আসছে।
কিন্তু শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা এক ঝটকায় খুলে গেল।
ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল দু’জন লোক, তাদের হাতে ভয়ানক আকারের দু’টি মেশিন রিভলবার।
দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দু’জনের হাতের মেশিন রিভলবার দু’টি উদ্যত।
ওদের দেখার সাথে সাথেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছে।
ওদের একজন চিৎকার করে উঠল, ‘কোথায় শালার চিফ জাস্টিস, কোথায় তার মেয়ে?’
‘ওরা একটু বাইরে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তোমরা কে?’ বলল দু’জনের একজন।
‘আমি একজন এশিয়ান তরুণ, আর ও ফরাসী তরুণী।’ আহমদ মুসার কথায় বিদ্রুপ।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়েছিল একটি লম্বা ‘টিপয়’-এর ধারে। আর ডোনা শুয়েছিল কম্বল মুড়ি দিয়ে। তার দু’হাতই কম্বলের ভেতরে।
বালিশের তলায় ডোনার রিভলবার। কম্বলের ভিতরে ডোনার ডান হাতটা অতি সন্তর্পণে এগিয়ে রিভলবারটা স্পর্শ করল।
ওদের দ্বিতীয়জন বলল, ‘চিনেছি এদের। এরা শয়তান চীফ জাস্টিসের সাথে ছিল। এরাই হত্যা করেছে আমাদের...।’
তার কথা শেষ হতে পারল না। একটা গুলীর শব্দ হলো। গুলী বিদ্ধ হয়ে লোকটি লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
কম্বলের তলা থেকে ডোনার ডান হাত গুলী করেছিল লোকটিকে।
গুলীর শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম লোকটি তার মেশিনগান ঘুরিয়ে নিচ্ছিল ডোনার দিকে।
সেই মুহূর্তে আহমদ মুসার ডান পা’টা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। চোখের পলকে ‘টিপয়’ টা বুলেটের মত গিয়ে আঘাত করল মেশিন রিভলবার সমেত প্রথম লোকটিকে।
লোকটি আঘাতটা সামলাবার জন্য পেছনের দিকে বেঁকে গিয়েছিল। তার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল মেশিন রিভলবার।
আঘাত সামলে নিয়ে লোকটা সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ততক্ষণে আহমদ মুসা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার উপর।
লোকটি ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেয় আছড়ে পড়ল। তার সাথে আহমদ মুসাও।
আহমদ মুসা গিয়ে পড়েছিল লোকটির উপর। পড়ে স্থির হবার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা দুইটি ঘুষি চালাল লোকটির চোয়ালে।
তারপর তার শার্টের কলার ধরে তাকে মাটি থেকে তুলল।
মাটিতে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ লোকটি এক হাতে বুক চেপে ধরে মাথা তুলেছে। তার মেশিন রিভলবার উঠে এসেছে আহমদ মুসার লক্ষ্যে।
ডোনার দৃষ্টি ছিল আহমদ মুসার দিকে।
শেষ মুহূর্তে লোকটির উদ্যত রিভলবার দেখতে পেল ডোনা এবং আহমদ মুসা দু’জনেই।
আহমদ মুসা মাটি থেকে টেনে তোলা লোকটির গলায় হাত পেঁচিয়ে তার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল এবং তার গলা সাঁড়াশির মত চেপে ধরল নিজের দেহের সাথে।
অন্যদিকে রিভলবার তুলেছিল ডোনাও।
প্রায় একসঙ্গেই দু’টি গুলীর শব্দ হলো।
ডোনার গুলী মাথা গুড়িয়ে দিল মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির। আর এ লোকটির মেশিন রিভলবারের কয়েকটি গুলী গিয়ে ঝাঁঝরা করে দিল আহমদ মুসার ধরে থাকা লোকটির দেহ।
আহমদ মুসা লোকটিকে ছেড়ে দিল। পড়ে গেল লোকটি মেঝের উপর।
বাইরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথমেই ঘরে এসে প্রবেশ করল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি এবং রোসেলিন। তারপর দু’জন গার্ড পুলিশ এবং ডোনার আব্বা ও রোসেলিনের আব্বা চীফ জাস্টিস প্রবেশ করল ঘরে। এরপরে হাসপাতালের একদল স্টাফ।
মুহাম্মাদ ইয়েকিনি, রোসেলিন, চীফ জাস্টিস এবং ডোনার আব্বা, সকলের চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া। তাদের মুখে নিদারুণ উদ্বেগের ছাপ।
সব শুনে গার্ডদের একজন টেলিফোন করল পুলিশ স্টেশনে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ এসে হাজির হলো।
তারা ঘটনার বিবরণ রেকর্ড করে দু’টি লাশ নিয়ে গেল। পুলিশ অফিসার সবিনয়ে দুঃখ প্রকাশ করল যে, পুলিশের সংখ্যা আরও বেশি না করে এবং আরও সতর্ক না থেকে তারা ভুল করেছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক অফিসার এসেও ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং ডোনাকে অন্য কক্ষে অবিলম্বে সরিয়ে নেবার নির্দেশ দিল।
চীফ জাস্টিস উসাম বাইক প্রশাসনিক অফিসারকে জানাল, ‘ডাক্তার সম্মত হয়েছেন, আমরা মিস মারিয়াকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।’
‘স্যার তাহলে এক ভ্যান পুলিশকে সাথে যাবার অনুমতি দেবেন।’, বলল পুলিশ অফিসারটি।
‘ঠিক আছে।’, বলল চীফ জাস্টিস।
‘স্যার, আপনার বাড়িতেও মোতায়েন কৃত পুলিশের সংখ্যা বাড়াবার নির্দেশ হয়েছে।’, বলল পুলিশ অফিসারটাই আবার।
‘ধন্যবাদ’, বলল চীফ জাস্টিস।
ডোনাকে ইতিমধ্যে রিলিজ করে নেয়া হয়েছিল। গাড়িও রেডি ছিল।
রোসেলিন ডোনাকে ধরে তুলে নিয়ে চলল।
আহমদ মুসাও তাদের পাশে পাশে চলছিল।
‘আমাকে পৌঁছে দিবে না?’ চলতে চলতে বলল ডোনা।
‘অবশ্যই।’
‘আবার পিস্তলের ব্যবহার করেছি। রাগ করেছ?’ ডোনার ঠোঁটে হাসি।
আহমদ মুসা কিন্তু হাসল না। বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ, সঠিক সময়ে তুমি রিভলবারের সঠিক ব্যবহার করেছ।’
একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, ‘আমি তো বলেছি ওটা আমার আকাঙ্ক্ষা, আদেশ নয়।’
ডোনা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আব্বাকে দাঁড়াতে দেখে ঠোঁট আর খুলল না ডোনা।
কাছাকাছি ডোনার আব্বা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বাবা, তুমি আমাদের সাথে যাচ্ছ তো?’
‘জ্বি, আমরা পৌঁছে দিয়ে যাব।’
ডোনাদের গাড়ির পেছনের সিটে উঠল ডোনা এবং রোসেলিন।
ড্রাইভিং সিটে বসল আহমদ মুসা। আর তার পাশের আসনে ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি।
ক্যামেরুনের ফরাসী দূতাবাস ডোনাদের ব্যবহারের জন্য একটা গাড়ি দিয়েছে। এই গাড়ি ডোনাই ড্রাইভিং করে এসেছিল পার্কে।
তিনটি কার ও একটি পুলিশভ্যানের একটা গাড়ি বহর এগিয়ে চলল চীফ জাস্টিসের বাড়ির দিকে। ঠিক হয়েছে ডোনা সুস্থ না হয়ে ওঠা পর্যন্ত চীফ জাস্টিসের ওখানে রাসেলিনের সাথে থাকবে।
চীফ জাস্টিসের গাড়ি বারান্দায় সকলে নামার পর চীফ জাস্টিস উসাম বাইক আহমদ মুসাকে বলল, ‘আমার বাড়িতে পাঁচ মিনিট বসে এক কাপ কফি খেলে আমি নিজেকে খুব ধন্য মনে করব।’
রোসেলিন ডোনাকে ধরে নিয়ে এগিয়ে চলল। তার পেছনে সকলে।
রোসেলিনের ফ্যামিলি ড্রয়িংরুম।
ডোনা ছাড়া সবাই বসে।
কথা বলছিল তখন চীফ জাস্টিস, ‘আহমদ মুসা, তোমার আশংকা এবং তোমার কথা যে আমরা হাসপাতালে থাকতে থাকতেই ফলে যাবে, তা ভাবতে বিস্ময় বোধ হচ্ছে।’
‘আমাদের খুঁজতেই এসেছিল। আমি ও আব্বা থাকলে কি ঘটত তা ভাবতেও ভয় করছে।’, বলল রোসেলিন।
‘যা ঘটেছে এটাই ঘটতো।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মারিয়া আপার দারুণ সাহস ও বুদ্ধি। সেখানেও একজনকে মেরেছে, এখানেও একজনকে।’, বলল রোসেলিন।
‘সত্যি, ডোনা ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।’, বলল আহমদ মুসা।
বলেই কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে কফির পেয়ালা টেবিলে রেখে বলল, ‘আমি এখন উঠি।’
আহমদ মুসার কথার দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে রোসেলিনের আব্বা চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক বলল, ‘আমার প্রতি তোমার আর কি পরামর্শ? পুলিশকে কি সব জানাব?’
‘পুলিশকে জানিয়ে খুব লাভ হবে না, বরং ক্ষতি হতে পারে। আপনার সাথে যদি ‘ওকুয়া’র কথা হয়, তাহলে আপনি আপনার তরফ থেকে কথা ভঙ্গ হয়নি, পুলিশকে আপনি বলেননি, এই কথাই ওদের বলবেন। বলবেন যে, আপনি আগের কথার উপরই আছেন। 'ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি' (FWTV) এবং 'ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সী' (WNA)- এর নিউজের বরাত দিয়ে আপনি তাদের জানাবেন যে, নিশ্চয় তৃতীয় কোন পক্ষ তাদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। এই ভাবে আপনি তাদের কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় করতে পারবেন। তাতে নিরুপদ্রব আরও কিছু সময় পাওয়া যাবে।'
'তোমাকে ধন্যবাদ বাবা। চমৎকার পরামর্শ তুমি দিয়েছ। কিন্তু তারা কি টেলিফোন করবে?' বলল চীফ জাষ্টিস ওসাম বাইক।
'নিশ্চয় করবে। কাজ উদ্ধার তাদের টার্গেট। আপনার উপর চাপ সৃষ্টির জন্যেই তারা এসব কিছু করছে।' আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, 'আমি চলি।'
রোসেলিনও উঠে দাঁড়াল। বলল, 'মারিয়া আপা অসুস্থ, ওকে বলে যাবেন......'
রোসেলিন কথা শেষ করার আগেই আহমদ মুসা বলল, 'ও কোথায়?'
'আমার ঘরে, আসুন।'
বলে রোসেলিন ঘুরে দাঁড়িয়ে উপরে উঠার সিঁড়ির দিকে চলল।
রোসেলিন ডোনাকে নিয়ে নিজের ঘরে একেবারে নিজের খাটে জায়গা দিয়েছে। তার পাশে ক্যাম্প খাট পেতে নিজের থাকার ব্যবস্থা করেছে।
ডোনা এতে আপত্তি করেছিল। রোসেলিন বলেছিল, ‘ফ্রান্সের রাজকুমারী, সেই সাথে আহমদ মুসার বাগদত্তা- এমন দূর্লভ মানবীর ছোঁয়া যদি আমার বেড পায়, সেটা হবে সারা জীবন স্মরণ করার মত আমার সৌভাগ্য। আমি এ সুযোগ ছাড়ব কেন?'
রোসেলিন ও আহমদ মুসা যখন রোসেলিন-এর ঘরে পৌঁছল, তখন ডোনা কম্বল মুড়ি দিয়ে চোখ বুঁজে শুয়ে ছিল।
'মারিয়া আপা দেখ কাকে নিয়ে এসেছি।' বলল রোসেলিন।
ডোনা চোখ খুলল।
কথা শেষ করেই একটা চেয়ার বেডের পাশে টেনে আহমদ মুসাকে বসতে দিয়ে বলল, 'আমার ঘরে এই দূর্লভ দৃশ্য স্মরণীয় করে রাখার জন্যে আমার ক্যামেরা নিয়ে আসি। আপনি বসুন।'
বলে রোসেলিন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, 'এখন কেমন বোধ করছ ডোনা?'
'ভাল। তুমি বস।'
'না, আর বসব না। অনেক দেরী হয়ে গেছে।
'না, তোমার সময় নষ্ট করব না। এখানে তোমার মিশন কি, জানতে ইচ্ছা করছে।'
আহমদ মুসা বসল। বলল, 'ওমর বায়া ও ডক্টর ডিফরজিসকে ওদের হাত থেকে উদ্ধার করা এবং খৃষ্টান সংস্থা-সংগঠনের হাত থেকে মুসলমানদের বিষয়-সম্পত্তি উদ্ধার করে তাদের বাড়ি-ঘরে তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা।'
'প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয় কাজটা অনেক বেশী কঠিন। কিভাবে এই অসাধ্য সাধন করবে?'
'ওকুয়া ও কোক-এর মত সংগঠনের ঘৃণ্য কাজের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করে এবং ঐ খৃষ্টান সংগঠনগুলোকে বাধ্য করে।'
'বুঝেছি জনমতকে সচেতন করার কাজ FWTV ও WNA-এর মাধ্যমে করছ। কিন্তু ওদের বাধ্য করবে কিভাবে?'
'কোক-এর কয়েকজন আঞ্চলিক বড় নেতাকে আমরা বন্দী করে রেখেছি, মাথার ক'জন হাতে পেলেই এ কাজটা আমরা করতে পারব।'
'এতটুকুতে কাজ হবে?'
'হবে। কারণ ইতিমধ্যেই ক্যামেরুন সরকার চাপের মধ্যে পড়েছে। তাদেরকে বাধ্য হয়ে তদন্তে নামতে হচ্ছে। আর আমরা আশা করছি, চীফ জাষ্টিসের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয়ের সাহায্য আমরা পাব। আইন মন্ত্রী এবং আইন সচিব দু'জনই তার ঘনিষ্ঠ মানুষ।'
'ধন্যবাদ'। অনেক এগিয়েছ তুমি।
'আল-হামদুলিল্লাহ। উঠি তাহলে?'
'একটা কথা দাও।'
'কি?'
'নিজের নিরাপত্তার প্রতি সবচেয়ে বেশী খেয়াল রাখবে।'
'কিন্তু নিজের কথা এত ভাবলে অন্যের ভাবনাটা যে গৌণ হয়ে যায়।'
'কিন্তু তুমি নিজে ঠিক না থাকলে অন্যকে সাহায্য করবে কেমন করে?'
'এদিকে আমার নজর অবশ্যই আছে ডোনা।'
'তাহলে বল একা কোন অভিযানে যাবে না।'
'এমন কথা আমার কাছ থেকে আদায় কর না ডোনা। রক্ষা করতে পারবো না।'
'আমি কি উদ্বেগে থাকি তুমি বুঝবে না।' ডোনার দু'চোখের কোণ থেকে দু'ফোটা অশ্রু নেমে এল।
'আমি দুঃখিত ডোনা, আমি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি। কিন্তু কি করব আমি! আমরা গোটা মুসলিম জাতি একটা বিপজ্জনক সময় অতিক্রম করছি।'
'না, তুমি কষ্ট দাওনি। আমি আমার অবুঝ মন নিয়ে কষ্ট পাচ্ছি। হয়তো তোমার ক্ষতি করছি।'
'না ডোনা, তোমার এই উদ্বেগ, হৃদয় নিঙড়ানো তোমার এই শুভ কামনা, অসীম ভালবাসার অশ্রু ভেজা তোমার দু'চোখের অপেক্ষমান দৃষ্টি আমার শক্তি ও সাহসের একটা উৎস-বাঁচারও একটা প্রেরণা।' আবেগে ভারী হয়ে উঠেছে আহমদ মুসার কন্ঠ।
ডোনা দু'হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল, 'আমার চেয়ে সৌভাগ্যবতী দুনিয়ায় কেউ নেই।'
'আল্লাহ তোমার কথা গ্রহণ করুন।' বলে আহমদ মুসা একটু থেমেই বলল, 'ডোনা তাহলে উঠি।'
ডোনা দু'হাত সরাল মুখ থেকে। তার চোখ ও গন্ড চোখের পানিতে সিক্ত।
ঘরে প্রবেশ করেছে রোসেলিন। ক্যামেরা হাতে। দু'টি স্ন্যাপ নিয়েছে সংগে সংগেই। বলল, 'আমি দুঃখিত অসময়ে প্রবেশের জন্যে। কিন্তু একটা ঐতিহাসিক ছবি তুলেছি।'
ডোনা চোখ মুছল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা রোসেলিনের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কিন্তু 'ঐতিহাসিক' ছবিটি যেন তোমার বাইরে না যায়।'
'আমি সেটা জানি। আহমদ মুসার সাথে কয়েক ঘন্টা থেকে অনেক বুদ্ধি আমার হয়েছে।' বলল রোসেলিন।
'ধন্যবাদ।' বলল আহমদ মুসা। তারপর চলে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়াবার আগে সালাম দিল ডোনাকে। ডোনা সালাম গ্রহণ করে দ্রুত কন্ঠে বলল, 'ওদের ঘাঁটির যে দু'টি ঠিকানা পেয়েছ, তা কি আমাকে দেবে?'
আহমদ মুসা থমকে দাঁড়িয়ে ভাবল। তারপর বলল, 'দেব। কিন্তু এই শরীর নিয়ে বাইরে বেরুবে না কথা দিতে হবে।'
'কথা দেয়ার দরকার নেই। তোমার ইচ্ছার আদেশই আমার জন্যে যথেষ্ট।'
'ধন্যবাদ।'
'ধন্যবাদ। ইয়েকিনিকে বলব সে রোসেলিনকে ঠিকানা দু'টি দিয়ে যাবে।'
আবার সালাম দিয়ে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল।
বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
তার সাথে সাথে রোসেলিন।
ডোনার তৃষ্ণার্ত চোখ দু'টি অনুসরণ করল আহমদ মুসাকে।