বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

গোয়েন্দা গল্প - কিডন্যাপ (থ্রিলার)

"গোয়েন্দা কাহিনি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর পাবে তা আশা করেনি শায়ন। তাই বাসায় কোনো কিছু না বলেই বের হয়ে এসেছে। বসের ফোন পেয়ে সময় নষ্ট করেনি মোটেও। এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে দিলো সে। গাড়ির স্পিড বেড়ে গিয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌছাতে চায় ও। গন্তব্য রাফিনের বাসা। বস রিটায়ার্ড কর্নেল. আনোয়ার হুসাইনের কথাটা এখনো কানে বাজছে ওর। “রাফিন কিডন্যাপ হয়েছে। ওর বাসায় গিয়ে রিপোর্ট দাও আমাকে।" আফতাব চৌধুরী রাফিন। শায়নের সাথেই কাজ করে ছেলেটা, বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সে জয়েন করেছে বছর দুয়েকের মত হয়েছে। শায়নের থেকে জুনিয়র পোস্টে কাজ করলেও ছেলেটা শায়নকে স্যার না বলে “শায়ন ভাই” বলেই ডাকে, শায়নও ওকে বন্ধুর মতই মতোই মনে করে, তাই স্বাভাবিকভাবেই কিছু বলে না। চৌকস এই ছেলেটা তার বুদ্ধি ও জ্ঞান দিয়ে খুব সহজেই সকলের আস্থাভাজন পাত্রে পরিণত হয়েছে। আর সেই ছেলেটাই কিনা হঠাৎ করে কিডন্যাপড !!! একদম মানা যায় না। সবকিছু গোছানো,শুধু বিছানাটা ছাড়া। চাদরটা এলোমেলোভাবে আছে। বালিশটা এক পাশে ফেলে রাখা। শায়ন একবার চোখ বুলিয়ে নিলো রাফিনের ঘরটাতে। রুমে তেমন কিছুই নেই। একটা বিছানা, বিছানার ডান পাশে সাইড টেবিল। টেবিলে রাখা ছোট্ট একটা টেবিল-ল্যাম্প। আর রাফিনের একটা ছবি। রুমের বাম পাশে বাথরুমের দরজাটা হালকা খোলা। একবার বাথরুমেও চোখ বুলিয়ে নিলো শায়ন। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়েনি ওর। নাহ!! মাথায় ঢুকছেনা। কিভাবে রাফিন কিডন্যাপ হলো তা বুঝতে পারছেনা শায়ন। তবে এটুকু নিশ্চিত অজ্ঞান করে নিয়ে গিয়েছে ওকে। রুমে ঢুকেই খুব হালকা কিন্তু পরিচিত ক্লোরোফর্মের গন্ধ নাকে এসেছে শায়নের। কিন্তু এমন একটা জলজ্যান্ত মানুষকে কিভাবে তুলে নিয়ে গেলো?? তাও আবার নিজের বাড়ি থেকেই?? রাফিনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একমনে ভাবছিলো শায়ন। হঠাৎ পায়ে কিছু একটার খোঁচা লাগতেই ভীষণ চমকে উঠলো শায়ন। তাকিয়ে দেখলো পায়ের কাছে একটা কবুতর। ভীষণ সুন্দর কবুতরটা। মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে বলে ভয় একদমই নেই। কবুতর সাধারণত মানুষ জোড়া হিসেবে পালন করে। একটা কবুতর দেখে একটু কৌতূহলী হয়ে শায়ন নিচু হয়ে ধরতে চাইলেই একটু দূরে সরে গেল কবুতরটা। - স্যার, কোন ক্লু খুঁজে পাওয়া যায়নি। হঠাৎ বেরসিকের মত বলে উঠল একজন পুলিশ অফিসার। শায়ন ব্যালকনি থেকে ঘরে প্রবেশ করলো। ঘরে ঢুকে পুলিশ অফিসারকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে গিয়ে মুখ খুলেও আবার বন্ধ করে ফেললো। কারণ তার চোখ আটকে গেছে রাফিনের ঘরে একটা দেয়াল পেইন্টিং এর ওপর। পেইন্টিংটা রুমের দরজার ঠিক পাশের দেয়ালে। সেই পেইন্টিংটার ওপরে একটা কাগজ আটকানো। বোঝাই যাচ্ছে হালকা আঠা দিয়ে লাগানো হয়েছে কাগজটা। খেয়াল করে না তাকালে চোখে পড়তোনা এটা। কাগজটার দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শায়ন। খুব ছোট্ট করে একটা মেসেজ লেখা আছে সেখানে। মেসেজটা পড়ে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো শায়নের। হাত মুঠো পাকিয়ে গেলো অজান্তেই। একটানে পেইন্টিংটার ওপর থেকে কাগজটা তুলে নিলো ও। বের হয়ে এলো রাফিনের ঘর থেকে। একই সাথে রুম থেকে বের হয়ে আসলো পুলিশ অফিসারটি। তার হাতে কাগজটা দিয়ে বললো, "এটা ল্যাবে পাঠাও। হাতের ছাপ, কলমের কালি, কখন লেখা হয়েছে সব কিছুর রিপোর্ট আমার চাই!" "ইয়েস স্যার," বলেই একটা স্যালুট ঠুকে বের হয়ে গেলো লোকটা। কাগজটার লেখা শায়নের মাথায় ঘুরছে এখনো। ওর ভেতরে রাগ আর বন্ধুর প্রতি দায়িত্ব দুটোই নাড়া দিচ্ছে। এখনো মনে হচ্ছে চোখের সামনে ভাসছে লেখাটা। "Try but fail" নিজের অফিসের ডেস্কে বসে আছে শায়ন। শরীরটাকে চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে বসে বসে ভাবছে সে। রাফিনের বাসা থেকে সেদিন তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। রাফিনের সাথে থাকতো শুধু ওর অন্ধ চাচা। তিনি অসুস্থ, শয্যাশায়ী। রাফিনের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের একটা ছোট্ট রুমেই তিনি সারাদিন শুয়ে থাকেন। তাকে জিজ্ঞেস করে তেমন কোন লাভ হয়নি। রাতে তিনি বেঘোরে ঘুমুচ্ছিলেন। সন্দেহজনক কোন শব্দই নাকি পান নি। রাফিনের কললিস্ট রিপোর্ট আনিয়েছিল। সেগুলো দেখছে। তেমন কারো সাথেই কথা বলেনি। তাই কাওকে সন্দেহের চোখে দেখতেও পারছেনা। শায়ন কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো চেয়ারে। এরপর মাথাটা হেলান দিলো চেয়ারে। তাকিয়ে আছে উপরে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের দিকে। দরজায় টোকার শব্দ শুনে সোজা হয়ে বসলো শায়ন। তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে। - আসতে পারি স্যার? ওদের অফিসের এক জুনিয়র অফিসার দাড়িয়ে। হাতে ফাইল। ফাইলের ওপর লেখা আছে রাফিনের নাম। - আসো তাসিন। - স্যার,, রাফিন স্যারের ফাইলটা। - হুম! রেখে যাও। আর কিছু পেলে ওর ব্যাপারে? - স্যার রাফিন ভাইয়ের বাসা থেকে আর কিছুই পাওয়া যায়নি। কিভাবে তাকে তুলে নিয়ে গেলো সেটাও বুঝতে পারছিনা। গত কাল রাতে বাসায় ফিরে তিনি নাকি সরাসরি নিজের রুমে চলে যান। রাতে খাওয়া- দাওয়া করেননি। খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল তাকে। ওদের বাসার কাজের বুয়ার কাছে জেনেছি। - হুম! আচ্ছা যাও। আমি একটু একা থাকতে চাই। কেউ আসলে বলে দিয়ো আমি ব্যস্ত। আর মুবিনকে দিয়ে এককাপ কফি পাঠিয়ে দিয়ো। - আচ্ছা স্যার। আবার চিন্তার সাগরে ডুব দিলো শায়ন। রাফিন ইন্টেলিজেন্সের ভেতরকার অনেক কিছুই জানে, তার কিডন্যাপ হওয়াটা অনেক বেশী চিন্তার কারণ। বোঝাই যাচ্ছে কোন প্রকার মুক্তিপণের জন্য রাফিনকে কিডন্যাপ করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে ইন্টেলিজেন্স বেশ খানিকটা হুমকির মুখে আছে। নিজের রুমে ডেকে এ কথা গুলা কিছুক্ষণ আগে বস বলেছেন। যদিও বলাটা এমনিই বলা, পরিস্থিতি বোঝার মত বুদ্ধি শায়নেরও আছে। কিডন্যাপের সাথে কারা জড়িত যদিও বা এখন পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছে কাজটার সাথে এমন কেউ জড়িত যে শুধু রাফিনকে না শায়নকেও নিজের হাতের মুঠোতে নিতে পারে। কফির ধূমায়িত কাপের দিকে তাকিয়ে রইলো ও। গরম কফির কাপ থেকে ধোয়া বের হচ্ছে। নিজের ভেতর থেকে নিজেরই এক অস্তিত্ব মিশে যাচ্ছে বাতাসে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে রাফিনের ফাইলটা টেনে সেখান থেকে ফরেনসিক রিপোর্টের এনভেলাপটা বের করলো শায়ন। এনভেলাপ থেকে ঐ ছোট্ট ম্যাসেজের কাগজটার ফরেনসিক রিপোর্টটা বের করে দেখতে লাগলো। রিপোর্টে বলা হয়েছে লিখাটা লিখতে সাধারন বলপয়েন্ট কলম ব্যবহার করা হয়েছে তবে রিপোর্টের কোনায় মন্তব্য লেখার জায়গাটায় ছোট্ট করে একটা লেখা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, লেখাটা সম্ভবত রাশিয়ান কোন মানুষের লেখা। কেন সেটা ব্যাখ্যা করেছেন ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের হেড ডঃ নজরুল ইসলাম। মন্তব্য এবং তার ব্যাখ্যা পড়ে শায়ন খুব পুলকিত অনুভব করলো। সেই সাথে কি যেন একটার কথা মনে পড়ি পড়ি করেও মনে পড়ছে না শায়নের। এনভেলাপ থেকে পরবর্তী কাগজটা বের করল শায়ন। চিরকূটটা থেকে একটু মাটির নমুনা পাওয়া গেছে। সেই মাটি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা আছে। এই মাটি বাংলাদেশের কোথায় কোথায় পাওয়া যায় সেটাও লেখা আছে রিপোর্টে। যেহেতু চিরকূটটার গায়ে ঐ মাটি পাওয়া গেছে। তার মানে হয়তোবা লেখার সময় কাগজটা হাত থেকে পড়ে গেছিলো মাটিতে। তার মানে চিরকূটটা কিডন্যাপাররা শায়নের বাসায় বসে লেখেনি, আগেই লিখে এনেছে। প্ল্যানেরই অংশ ছিলো চিরকূটটা, হঠাৎ করে লেখা হয়নি। কিন্তু একটা ব্যাপার শায়ন বুঝতে পারছে না, এতো ঝামেলার মাঝে কেন গেল কিডন্যাপাররা? তারা তো চাইলে রাফিনের বাসায় বসেই কাজটা করতে পারতো। আরেকটা ব্যাপার মোটামুটি ক্লিয়ার হয়েছে, রাফিন খুন হয়নি। কিডন্যাপারদের উদ্দেশ্য খুন করা নয়। খুন করতে চাইলে তারা খুব সহজেই রাফিনের বাসায়ই রাফিনকে খুন করতে পারতো। তাদের উদ্দেশ্য হয় রাফিনের কাছ থেকে ইনফরমেশন বের করা নাহয় রাফিনকে বন্দী রেখে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু একটা চাওয়া। এবং সেটা যে টাকা নয় এ ব্যাপারে শায়ন মোটামুটি শিওর। যারা রাফিনকে ধরে নিয়ে গেছে তারা নিঃসন্দেহে প্রফেশনাল। রাফিনের কাছ থেকে ইনফরমেশন আদায় করাটা করাটা যেমন সহজ হবেনা তেমনি ওরাও রাফিনকে এত সহজে রাফিনকে ছেড়ে দেবেনা। ইনফরমেশন গোপন রাখতে গিয়ে রাফিনকে কি পরিমাণ টর্চার সহ্য করতে হতে পারে এটা চিন্তা করে শায়নের কপালে একটা ভাঁজ পড়লো। পরমুহূর্তেই চোয়াল দৃঢ় হয়ে গেল তার। কাছের বন্ধু ও সহকর্মীর ওপর টর্চার সে কোনভাবেই হতে দেবেনা। রাফিনের বাসায় যেতে হবে আবার। হয়ত কোন ব্যাপার চোখ এড়িয়ে গছে তার। কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে অবশিষ্ট অংশটুকু পেটে চালান করে দিলো সে। তারপর প্রায় দৌড়ে বের হয়ে গেলো অফিস থেকে। বাইরে পার্ক করে রাখা গাড়িতে উঠেই ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই স্টার্ট নিলো গাড়িটা। এক মুহূর্ত দেরী না করে এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে দিলো। রাফিনের বাসার দিকে ছুটে চলছে গাড়ি। হতাশ বোধ করছে শায়ন। রাফিনের বাসায় এসে কোন লাভই হয়নি। ‘বিকেলটাই মাটি হলো’ ভাবতে ভাবতে ব্যালকনিতে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো শায়ন। হঠাৎই চোখ গেল কবুতরটার দিকে। একটু ভালো করে খেয়াল করে দেখলো কবুতরের ডান পায়ে একটা রিং পড়ানো, খানিকটা কৌতুহল বোধ করে কবুতরটাকে খুব সাবধানে ধরে ফেললো শায়ন। চিকন লোহার রিং টা কেন কবুতরের পায়ে পড়ানো হয়েছে বুঝতে পারলো না। যদি এটা কোন টাইপের গয়না হতো তবে সেটা অন্য কোন দামী ধাতুর হত। - স্যার, আমারে ডাকছেন? বুয়ার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো শায়ন। - জ্বী ডেকেছি। এক কাপ চা খাওয়াতে পারবেন? - জ্বে স্যার, পারমু। রং চা না দুধ চা? - রং চা ই দেন। - জ্বে আইচ্ছা। বলে চলে যেতে উদ্যত হলো বুয়া। কি ভেবে শায়ন আবার তাকে ডাকলো। - খালা, শুনুন। - জ্বে স্যার? - আচ্ছা, এই কবুতরটা কি রাফিনের? - জ্বে, হের নিজের। - কবুতর কি একটাই ছিল? নাকি জোড়া ছিল? - না স্যার, একটাই ছিল। আমি হ্যারে অনেক দিন কইছি এইডার জোড়া কিন্না আনতে কিন্তু হ্যায় কিছু না কইয়্যা খালি হাসে। - কবে কিনেছিল বলতে পারেন? - তা হইবো প্রায় বছরখানেক। কিন্তু এট্টুও যত্ন নেয় না হ্যায়। আমিই পালি। কি যেন ভাবলো একটু শায়ন। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলো... - আচ্ছা, ও কি কখনো কবুতরটা নিয়ে কিছু করে? মানে আমি জানতে চাচ্ছি কবুতরকে খাওয়ায় নাকি কিংবা আদর করে নাকি? - না, তেমুন একটা না। হ্যায় বাসায়ই তো কম থাকে। থাকলেও কইতরের ধারে যায়না। তয় মাঝে মাঝে কইতররে উড়ায়া দিয়া হাততালি দিয়া খেলে। কইতরডা দুইডা ডিগবাজি দিয়া অনেক দূর যায়। হ্যায় চাইয়্যা চাইয়্যা দ্যাহে। - আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি যান। বুয়াকে বিদায় করে দিয়ে হাতে ধরা কবুতরটার দিকে ভালো করে তাকালো শায়ন। কবুতরটা ‘রেসিং হোমার’ প্রজাতির। এই কবুতর খুব একটা সহজলভ্য নয়। সাধারণত রেস খেলার জন্য এই কবুতর ব্যবহার করা হয়। এই কবুতর কিনতে গেলেও বেশ কিছু টাকা গুনতে হবে। কবুতর প্রেমীদের কাছে এই কবুতর অনেক দামী। তবে কবুতরের প্রতি রাফিনের ব্যবহারে তাকে কবুতর প্রেমী মনে হচ্ছেনা। শায়নের কাছে একটু রহস্যজনক লাগলো কবুতরের বিষয়টা। কবুতরের পায়ের দিকে তাকাতেই একটা ব্যাপার খেয়াল করলো শায়ন। সাথে সাথে কিছু একটা মাথায় আসলো তার। ব্যাপারটা মাথায় আসতেই মনে হলো এখুনি অফিসে যাওয়া দরকার। রহস্যের জট খুলতে শুরু করছে একটু একটু। ............................................................ ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে শায়ন। জায়গাটা সাভারের কাছাকাছি। মোটামুটি জনমানবশূন্য এলাকা। কিডন্যাপারদের ঘাঁটি হিসেবে অতি উত্তম জায়গা। সামনে দাঁড়ানো বাড়িটাতেই যে রাফিন আছে সে ব্যাপারে মোটামুটি শিওর শায়ন। - তুমি বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ঢুকবে, আমি সামনের দিকটা দেখবো। কোন রকম শব্দ করা যাবেনা। এবং একা কাউকে দেখতে পেলেই গুলি করবে, যতটা নিঃশব্দে পারো। ওরা কিন্তু সংখ্যায় অনেক বেশী থাকতে পারে। সো কোন ভুল করা যাবেনা, সেক্ষত্রে মার্ডারও হতে পারো। মনে রেখো সুযোগ কিন্তু একটাই পাবে। তাসিনকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতেই তাসিন মাথা নেড়ে জানালো যে সে বুঝতে পেরেছে। নির্দেশ পেয়েই তাসিন বেড়ালের মতো নিঃশব্দে সামনে যেতে লাগলো। আসন্ন রোমাঞ্চকর দৃশ্যের কথা ভেবে বুকে জমে থাকা নিঃশ্বাসটা ‘হুফ’ করে ছেড়ে দিয়ে সামনে বাড়লো শায়ন। বাড়িটার সামনের দিকে একটা মানুষকে দেখা যাচ্ছে। হালকা ঝিমুচ্ছে। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে তার সামনে গিয়ে রিভলবারের বাঁটটা দিয়ে ঘাড়ের পেছনে আঘাত করলো শায়ন। টুঁ শব্দ করতে পারলো না লোকটা। নীরবে ঢলে পড়লো। আপাতত ২-৪ ঘন্টা জ্ঞান ফিরবে না আশা করা যায়। তাকে একটা গাছের সাথে বেঁধে মুখে রুমাল গুঁজে বাড়ির ভেতরে ঢোকার প্রস্তুতি নিলো শায়ন। পুরো বাড়িটাই অন্ধকার বলা চলে। শুধু একটা রুমে ডিম লাইটের মত হালকা আলো জ্বলছে। সেখানেই রাফিন আছে বলে ধারণা করছে শায়ন। একটু এগুতেই চোখে পড়লো তাসিন উল্টাদিক থেকে পা টিপে টিপে আসছে। শায়নকে দেখে প্রথমে হাতের ২ আঙুল ও পরে একটা হাত গলা কাঁটার মত করে দেখিয়ে বোঝালো ২ জনকে খতম করে দিয়েছে। দুজনে একসাথে হয়ে আস্তে আস্তে এগুতে লাগলো। “গুস্তাভ” হঠাৎ একটা বাজখাঁই কন্ঠস্বর শুনে দুজনেই পাশে থাকা একটা টেবিলের নিচে আশ্রয় নিলো। “গুস্তাভ” আবার ডাকতে লাগলো দৈত্যটা। ডাকতে ডাকতে তাদের এদিকেই আসছে। গুস্তাভ যে তাসিনের গুলিতে ধরাধাম ত্যাগ করেছে সেটা এখনো বুঝতে দৈত্য বুঝতে পারেনি, ভেবে কিছুটা স্বস্তি পেল শায়ন। কাছাকাছি আসতেই টেবিলের একটু কোণা দিয়ে তাকালো শায়ন। বাজখাঁই কন্ঠের মালিককে দেখে বিষম খেল সে, দেখতে আসলেই দৈত্যের মত। আবছা আলোয় চেহারা দেখে শায়ন ঠিক বুঝতে পারলো কোন দেশের লোক সে। হতে পারে স্পেন বা রাশিয়ার। টেবিলের একদম কাছাকাছি আসতেই তাসিন একটা পা বাড়িয়ে দিল। তাতে দৈত্যের অবস্থানের কোন পরিবর্তনই হলো না, তবে সে বুঝে গেলো সে নিরাপদ নয়। দৈত্য কোমরে হাত দিতেই শায়ন আর দেরী করলো না। উল্টাভাবে মাথা বের করে একটা গুলি চালান করে দিল দৈত্যর চিবুক বরাবর। রিভলবার ধরা হাতেই স্রেফ কাটা কলাগাছের মতো পড়ে গেল দৈত্য। এক সেকেন্ড দেরী হলেই তার অবস্থাটা কি হতো সেটা আর ভাবতে চাইছে না শায়ন। বেচারা তাসিনের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তাসিনকে ওঠার তাড়া দিলো শায়ন। আবার রাফিনের সম্ভাব্য রুমমুখী রওনা দিলো তারা। প্ল্যান দুজন দরজার দুদিক দিয়ে আক্রমণ করবে। দরজার যে পাশটার গা ঘেঁষে শায়ন দাঁড়িয়ে আছে সে পাশ থেকে রুমের একপাশটা দেখা যাচ্ছে। তার দৃষ্টিসীমার মাঝে সে কোন মানুষ দেখতে পেল না। তাসিনের দিকে তাকাতেই তাসিন ইশারায় জানালো একজন আছে ভেতরে। তাসিনকে পূর্বনির্দেশ মত অপেক্ষা করার ইশারা দিয়ে আচমকা ঘরে ঢোকার প্রস্তুতি নিতে লাগলো শায়ন। শেষ লোকটাকে মারতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। আচমকা আক্রমণে সে খেই হারিয়ে ফেলতেই পর পর দুটা বুলেট তার বুকে পাঠিয়ে দিলো শায়ন। ঘরের ভেতর একটা চেয়ারে রাফিনকে বসে থাকতে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে গেল শায়ন। শায়নের দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো রাফিন। - আমাকে কীভাবে খুঁজে পেলে শায়ন ভাই? - ওসব কথা পরে হবে। আগে বলো এখানে মোট কতজন আছে? জানো কিছু? - নাহ, শায়ন ভাই। - আচ্ছা যাই হোক, এটা রাখো, আর আমার সাথে আসো। আগে এখান থেকে বেরোতে হবে। তারপর তোমার সাথে অনেক কথা আছে। কোমর থেকে অন্য একটা রিভলবার টেনে বের করে রাফিনের দিকে এগিয়ে দিলো শায়ন। আস্তে আস্তে পা টিপে বাড়ির বাইরে চলে আসলো শায়ন আর রাফিন। - শায়ন ভাই, আপনার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো আমি। হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলছিল রাফিন। - আরে রাখো তো। - এবার বলেন কীভাবে আমার খোঁজ পেলেন? - তোমার বাসায় একটা নোট রেখে এসেছিল কিডন্যাপাররা, আর সেটাতে লাল মাটির নমুনা পেয়েই আমার সন্দেহ হয়েছে, তাদের আস্তানা এমন কোথাও যেখানে লালমাটি আছে। আর তাদের আস্তানা যে মোটামুটি ঢাকা থেকে কাছাকাছি কোথাও এটা তো সহজেই আন্দাজ করা যায়। দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে বের করে ফেললাম। - ব্রিলিয়ান্ট শায়ন ভাই। - তোমাকে কারা কিডন্যাপ করেছিল সেটা সেটা জানো? - নাহ। - মাফিয়ার লোকজন। শুনে রাফিনের মুখটা হা হয়ে গেল। - আগেই অবাক হয়ো না। এখন এমন কিছু বলবো যেটা শুনে তোমার অবাক হবার মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। বলেই চুপ হয়ে গেল শায়ন। রাফিনের চোখে প্রশ্ন দেখে আবার বলা শুরু করলো শায়ন... - আর এই মাফিয়া এবং তোমার কিডন্যাপের সাথে জড়িত আমাদের বস কর্নেল আনোয়ার হুসাইন। রাফিনের চোখটা বড় বড় হয়ে গেল। - আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল যে আমাদের ভেতরকার কেউ নিশ্চিতভাবে মাফিয়ার সাথে জড়িত। নাহয় আমরা যতবারই মাফিয়ার কোন ডনদের পেছনে লাগি তারা কীভাবে টের পেয়ে যায়? তোমার মনে আছে সেবারের কথা? যেবার তুমি আর আমি তোমার বাসায় বসে করা ৫ মিনিটের প্ল্যানে সেলিম চৌধুরীকে ধরতে বেরিয়েছিলাম। মনে করে দেখো, আমাদের সেই টপ সিক্রেট প্ল্যানের কথা আমি তুমি বাদে শুধুমাত্র বস জানতেন। সেবারো আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এর একটাই কারণ কোন না কোন ভাবে সেলিম চৌধুরীর কাছে খবর পৌছে গিয়েছিল। তুমি আর আমি তো একসাথেই ছিলাম, আমাদের মাঝে কেউ জানায়নি, তাহলে সেলিম চৌধুরী খবর পেল কীভাবে? উত্তর একটাই বস জানিয়েছে। তোমার কি মনে হয় এ বিষয়ে? পাশে তাকাতেই দেখলো রাফিন নেই। পিছে ঘুরে তাকাতেই বুকে লাথি খেয়ে পড়ে গেল শায়ন। লাথিটি দিয়েছে তারই বন্ধু রাফিন। তাল সামলাতে না পেরে প্রায় ৬ ফিট দূরে গিয়ে পড়লো শায়ন। কিছুটা ধাতস্থ হতেই দেখলো রিভলবার হাতে সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাফিন, মুখে ক্রুর হাসি। নিজের কোমরের দিকে হাত বাড়াতেই রাফিন বলে উঠলো... - উহু, এই ভুল করো না। তুমি রিভলবার বের করতে করতেই অন্তত তিনটা বুলেট তোমার বুকে পাঠানোর ক্ষমতা আমি রাখি। আমার ক্ষিপ্রতা সম্পর্কে তোমার থেকে ভালো আর কে জানে, শায়ন আহমেদ? বলেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাসলো রাফিন। - কিছু মনে করো না। আসলে তোমার বিশ্লেষণ শুনে অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখেছি। আর পারলাম না। জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে শায়ন শুধু তাকিয়ে রইলো, কিছু বলল না। - তোমার ধারণা কিছুটা ঠিক আছে। আমাদের ভেতর কেউ একজন মাফিয়ার ইনফরমার হিসেবে কাজ করছে, তবে সেটা বস নয়, সেটা আমি। লাস্ট ৭ বছর ধরে আমি মাফিয়ার সাথে আছি। মাফিয়ার ইনফরমার হিসেবে কাজ করার উদ্দেশ্যেই আমার ইন্টেলিজেন্সে জয়েন করা। আর আমার কিডন্যাপ আমারই সাজানো। তোমাকে এখানে টেনে আনার জন্যে। সে উদ্দেশ্যেই মাটিটা লাগানো হয়েছে ঐ নোটটাতে যাতে কুকুরের মত গন্ধ শুকে শুকে তুমি এখানে চলে আসো। এটা তুমিও পারবে তা আমি জানতাম, তোমার ওপর আমার সে বিশ্বাসটুকু আছে। তাই এসে ধরা দিলে আমারই ফাঁদে। তবে এতোটা তাড়াতাড়ি পারবে বুঝতে পারিনি। সে জন্যে আমার কোন লোক রেডি ছিল না, তাই আমি হারালাম আমার কিছু চৌকস লোককে। শায়ন কিছু বলল না। - এখন আমি কি করবো জানো? তোমাকে খুন করে খুব সুন্দর ভাবে এখান থেকে পালিয়ে যাবো। সবাই ভাববে তুমি খুন হয়েছ আমাকে বাঁচাতে এসে। আর আমি কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকবো। তারপর বের আসবো। সবাই ভাববে এজেন্ট রাফিন কিডন্যাপারদের হাত থেকে পালিয়ে এসেছে নিজ কৌশলে। শায়ন তাও কিছু বলল না, মুখের কোনায় একটু হাসি দেখা গেল শুধু। - ওহ হো তোমার একটা প্রশ্ন আছে, যদিও তুমি করনি। তাও আমি বলি, জানতে ইচ্ছা করছে না কীভাবে সেলিম চৌধুরী তোমার আমার প্ল্যানের খবরটা পেল? মুচকি হেসে জানতে চাইলো রাফিন। শায়ন এবারও কিছু বলল না, হাসিটা খানিকটা বিস্তৃতি পেল শুধু। - বার্তাবাহক হিসেবে কবুতরের কোন বিকল্প নেই, বুঝলে ভায়া? হাসিমুখে জানলো রাফিন। শায়ন কোমরে হাত দিল। প্রায় সাথে সাথেই ট্রিগার চাপলো রাফিন !!! ক্লিক ! ক্লিক !! কোন গুলি বের হলো না। রাফিন আশ্চর্য হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। উত্তেজনায় আসলে রিভলবারে গুলি আছে কিনা সে ব্যাপারটা সে চেক করেই দেখেনি। ততক্ষণে শায়নের মুখে শোভা পাচ্ছে হাসি আর হাতে শোভা পাচ্ছে রিভলবার। দেরী না করে রাফিন উল্টো ঘুরে দৌড় দিতে গিয়ে দেখে ১০ ফিট দূরে দাঁড়িয়ে আছে তাসিন। তার হাতেও বিদঘুটেদর্শন রিভলবার। রাফিন বুঝতে পারলো যে সে ধরা পড়ে গেছে। - তোমার ব্যাপারে এখানে আসার আগেই আমি জানতে পেরেছি সব। এখন বাকিরাও জানবে সব কারণ তোমার হাতে ধরা আমার দেয়া রিভলবারটাতে একটা ছোট্ট টেপ রেকর্ডার আছে। তোমার ‘রেসিং হোমার’ কবুতরটাই তোমার সর্বনাশ করলো। আর তাছাড়া এতো তাড়াতাড়ি তোমাকে কীভাবে খুঁজে পেয়েছি সেটা দেখেও তোমার কি একটুও সন্দেহ জাগেনি? রাফিন কিচ্ছু বলছে না। শুধু তাকিয়ে আছে শায়নের দিকে। - দিকনির্দেশনা দিতে কবুতরের কোন বিকল্প নেই, বুঝলে ভায়া? রাফিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখ টিপ দিয়ে বলল শায়ন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১৩৩৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ গোয়েন্দা গল্প - কিডন্যাপ (থ্রিলার)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

২০.অন্ধকার আফ্রিকায় (২)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X ইয়েসুগো প্যালেস। ইয়াউন্ডির অন্যতম প্রধান সড়ক ‘নর্থ এ্যাভেনিউ’-এর পশ্চিম পাশে পূর্বমূখী হয়ে দাঁড়ানো বিশাল বাড়ি। বাড়ির সামনে একটা বিশাল গেট। ইয়েসুগো রাজ পরিবার এই বাড়িটি তৈরী করে ক্যামেরুনে ফরাসি শাসনের মাঝামাঝি সময়ে, যখন ফরাসী শাসকদের ষড়যন্ত্রে ইয়েসুগো সালতানাতের উপর একের পর এক বিপদ নেমে আসতে থাকে। বাড়িটি তৈরী করা হয় রাজ-পরিবারের একটা বিকল্প বাসস্থান হিসেবে। লেখাপড়া উপলক্ষ্যে আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো এবং তার বোন লায়লা ইয়েসুগোর বসবাস এই বাড়িতে এখন প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে। ইয়েসুগো প্যালেসে ইয়েসুগো পরিবারের পারিবারিক একটা ড্রইংরুম। ঘরটা খুব বড় নয়, কিন্তু খুব ছোটও নয়। ঘরের গোটা মেঝে লাল কার্পেটে মোড়া। সোফা সেট দিয়ে সাজানো ড্রইংরুম। ড্রইংরুমের এক পাশে একটা বড় টিভি সেট। তার পাশে একটা রেডিও। সে পাশেরই এক কোনায় রয়েছে ছোট্ট একটা ফ্রিজ এবং অন্য কোণায় রয়েছে ছোট্ট একটা বুক সেলফ। বুক সেলফে আছে দেশি-বিদেশী ম্যাগাজিন। টিভি’র ঠিক বিপরীত দিকে তিন সোফায় পাশাপাশি তিনজন বসে। মাঝখানে আহমদ মুসা। তার বাম পাশে মুহাম্মদ ইয়েকিনি। এবং ডান পাশে আরেকজন নব্য যুবক। চুল কোঁকড়া কিন্তু রং প্রায় ফর্সা। ঠোঁট পাতলা। তার চেহারায় আরবীয় একটা ভাব আছে। এই যুবকই আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো। সে ইয়েসুগো রাজপরিবারের ৭ম পুরুষ। ৫ম পুরুষ পর্যন্ত তাদের রাজত্ব টিকে ছিল। রাশিদির আব্বা আমীর আবদুল্লাহ ইয়েসুগো যখন যুবরাজ, তখন তাদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায়্ রাশিদি ইয়েসুগোর মা মিসরীয় এবং দাদিও মিশরীয় ছিলেন। গতকাল আহমদ মুসা এসেছে। তারপর থেকে শুধু গল্পই শুনছে রাশিদি ইযেসুগো আহমদ মুসার কাছ থেকে। অসীম তার উৎসাহ। আজ ক্যামেরুনের সাধারণ ছুটির দিন। অফিস-আদালত-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ। আজ সকাল থেকেই রাশিদি ইয়েসুগো আহমদ মুসাকে নিয়ে বসেছে। মাঝখানে তারা যোহরের নামায সেরেছে এবং লাঞ্চ করেছে। তারপর আবার এসে বসেছে সোফায়। রাশিদি বলছিল, ‘বড় ভুল করেছি। কাল থেকে যদি রেকর্ডার কাছে রাখতাম, তাহলে একা ইতিহাস রেকর্ড হয়ে যেত।’ ‘ঠিক বলেছেন, আহমদ মুসা ভাইয়ের ভয়েসও রেকর্ড হয়ে যেত।’ বলল ইয়েকিনি। ‘সত্যি বিরাট একটা লস হলো’ বলল ইয়েসুগো। ‘অতীতের কথা নয়, এস ভবিষ্যতের কথা ভাবি।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আমার কাছে ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতই বেশী প্রয়োজনীয়।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘কেন?’ বলল আহমদ মুসা। ‘ইতিহাস না জনালে ইতিহাস গড়াও যায়না। অতীত না জানলে ভবিষ্যত বুঝাও যায় না। আমরা অতীত জানি না, তাই আমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে আমরা অসচেতন।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘তোমার কথা ঠিক। কিন্তু ইতিহাসের এই অতীত এবং একজনের কাহিনী এক জিনিস নয়।’ বলল আহমদ মুসা। ‘বিষয়টাকে এইভাবে দেখা আমি মনে করি ঠিক নয়। মুসলমানদের বিপ্লব ও পরিবর্তনের এই ঘটনাগুলোকে এক ব্যক্তি মূখ্য ছিলেন বটে, কিন্তু কাজটা ছিল মুসলিম জনগণের জন্যে আত্ববিশ্বাস ও প্রেরণার উৎস। আজ বেশীর ভাগ মুসলিম সমাজে অবস্থার স্রোতে গা ভাসিয়ে চলার দৃশ্য দেখা যায়। এর কারণ, অনেকের ধারণা অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়, চেষ্টা করে লাভ নেই। বিপ্লব ও পরিবর্তনের কাহিনী এদের জন্যে বিরাট শিক্ষকের কাজ করবে এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে এদের দেহে। সুতরাং আমার মতে এই কাহিনীগুলোর সংগ্রহ ও প্রচার খুবই জরুরী।’ ‘ঠিক আছে, জাগরণ সৃষ্টির এটাও একটা পথ। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা জাগরণ নয় এ্যাকশন প্রোগ্রামে আছি।’ ‘ঠিক। কিন্তু কি করণীয় তা মাথায় আসছে না।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘ব্ল্যাক ক্রস কিংবা ওকুয়ার সাক্ষাত না পেলে তো আমরা কাজ শুরুই করতে পারছি না।’ বলল ইয়েকিনি। ‘পথ বেরিয়ে যাবে। আজ একটু বেরুব। অন্ততঃ চীফ জাস্টিসের বাড়ি এবং সুপ্রীম কোর্ট দেখে আসব।’ বলে আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রাশিদি ইয়েসুগো ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’র সময় হয়ে এল। আর দশ মিনিট। টিভি’টা খুলে দাও।’ ‘কিন্তু বললেন না ভাইয়া, FW টিভির আজকের অনুষ্ঠানের জন্যে এত উদগ্রীব কেন আপনি?’ আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘না শুনলেই আনন্দ পাবে বেশী। তোমার আনন্দ কমাতে চাই না।’ একটু থেমেই আবার বলল, ‘আজ তোমাদের পত্রিকাও দেরীতে বেরুচ্ছে।’ ‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু ন্যাশনাল ডে’তে সকালের জাতীয় অনুষ্ঠানের খবর নিয়ে পত্রিকা বের হয় তো তাই এ রকম দিনে বিকেল তিনটায় বেরোয়। পরের দিন পত্রিকা বের হয় না বলেই এই ব্যবস্থা।’ বলল ইয়েসুগো। ‘বাইরের দৈনিক পত্রিকা ইয়াউন্ডিতে কি আসে?’ ‘নিয়মিত পাওয়া যায় ফ্রান্সের ‘লা মন্ডে’ এবং মিসরের আল-আহরাম।’ বলল ইয়েসুগো। আহমদ মুসা সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘তুমি কাউকে পাঠিয়ে ঐ দু’টিসহ আজকের এখানকার পত্রিকাগুলো আনাও। ৩টা তো বেজে যাচ্ছে।’ ‘পাঠাচ্ছি, বিশেষ কিছু কি থাকবে পত্রিকায়?’ বলল ইয়েসুগো। ‘আশা করি বিশেষ কিছু থাকতে পারে।’ ‘কি?’ ‘যদি থাকে। খুশী হবে। অপেক্ষা কর।’ রাশিদি ইয়েসুগো উঠে গিয়ে টিভি অন করে এসে আবার সোফায় বসল। টেলিফোন বেজে উঠল এ সময়। ইয়েসুগো উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরল। ‘হ্যাঁ, লায়লা?’ ‘হ্যাঁ, ভাইয়া।‘ ‘এসে গেছ? কোথায় তুমি?’ ‘এই তো শহরে ঢুকলাম। গাড়ি থেকে টেলিফোন করছি। জরুরী কিছু? খবর দিয়েছ কেন?’ ‘বড় ঘটনা ঘটেছে।’ ‘কি?’ ‘বলব না, আসলে চোখে দেখবে।’ ‘আমার টেনশন হচ্ছে। বল, খারাপ কিছু না আনন্দের।’ ‘আনন্দের, তবে তার সাথে উদ্ধেগের খবরও আছে।’ ‘তুমি না বললেই ভাল করতে। এখন খারাপ লাগছে।’ ‘আম্মা আসছেন তো?’ ‘আসছেন কিন্তু একটু পরে পৌছবেন।’ ‘ও. কে। ফি আমানিল্লাহ। আসসালামু আলাইকুম।’ ‘ওয়া আলাইকুমসসালাম।’ ইয়েসুগো টেলিফোন রেখে তার জায়গায় ফিরে এল। ‘আহমদ মুসা ভাইয়ের কথা লায়লাকে বলেছ?’ বলল ইয়েকিনি। ‘না বলিনি।’ ‘এখন বললে না?’ ‘ওকে একটা সারপ্রাইজ দেয়া যাবে।’ ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’র প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেল। এই টিভির প্রোগ্রামে প্রথমে ৫ মিনিট আগের দিনের বিশ্ব সংবাদের প্রধান বিষয় গুলোর ফলোআপ হয় তারপর দিনের প্রো প্রোগ্রামের বিবরন দেয়া হয়। খবর প্রায় শেষ সেই সময় একজন তরুণী প্রবেশ করল ড্রইং রুমে। ফুলহাতা পা পর্যন্ত নামানো আরবীয় স্টাইলের গাউন পরা। মাথায় একটা সাদা রুমাল বাঁধা। তার উপর দিয়ে পরেছে চাদর। তরুণীটির রংও ফর্সা। তরুণী ড্রইং রুমে প্রবেশ করে সালাম দিয়েই আহমদ মুসার উপর নজর পড়ল। অপরিচিত লোককে দেখে সংকুচিত হয়ে উঠল এবং মাথার ওড়নাটাকে কপালের উপর আরও টেনে দিল। রশিদি ইয়েসুগো উঠে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটি আরও এগিয়ে এলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, ‘এই আমার সেই বোন।’ আর লায়লাকে আহমদ মুসাকে দেখিয়ে বলল, ‘ইনি আমাদের সম্মানিত মেহেমান।’ ‘নাম তো লায়লা ইয়েসুগো না? লায়লার আগে-পিছে তো আর কোন শব্দ নেই।’ বলল আহমদ মুসা। কথা শেষ করেই রশিদি ইয়েসুগো বসে পড়েছিল। লায়লাকে ইংগিত করেছিল বসতে। লায়লা গিয়ে ওদের তিনজনের বিপরীত দিকে একটা সোফায় ভিন্ন হয়ে বসল। ‘বল লায়লা। তোমার পুরো নামটা।’ বলল রশিদি ইয়েসুগো। রশিদির কথায় লায়লা মনে মনে বিরক্ত হলো। কপালটা কুঞ্চিত হলো অসন্তুষ্টির প্রকাশ হিসাবে। না চেনা, না জানা একজন লোকের তার নাম সংক্রান্ত প্রশ্নের তাকে জবাব দিতে হবে কেন? ভাইয়া নিজে না বলে তাকে জবাব দিতে বলল কেন? ভাইয়ার এই আচরন তার কাছে নতুন মনে হচ্ছে। অপরিচিত জনের সামনে এভাবে বসা তাদের ঐতিহ্যেই নেই। তার উপর তাকে অপরিচিত জনের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়ে। লায়লা বিস্মিত দৃষ্টিতে একবার ভাইয়ার দিকে তাকাল। তারপর চকিতে একবার আহমদ মুসার দিকে চোখ তুলল। দেখল আহমদ মুসার মুখ নিচু। একবারই তার দিকে তাকিয়েছিল। আর সে তাকায়নি। লায়লা মনে হল মেহমানটি ভদ্র এবং ভালো। ক্যামেরুনের মুসলিম সমাজে চোখের পর্দা খুব কমই দেখা যায়। আসল পর্দা তো চোখের পর্দাই। ‘‘লায়লা’র পর একটি শব্দ আছে। আমার নাম ‘লায়লা নুর ইয়েসুগো’।’ ‘ধন্যবাদ বোন’, মাথা না তুলেই বলা শুরু করল, ‘খুব ভাল নাম। লায়লা নুর অর্থ নুরের বা আলোর মত রাত। এই অর্থের দিক দিয়ে বিজয়ের রাত বা সফল্যের রাতও বলা যায়।’ ‘আমিন। সামনের দিন গুলো আমাদের সাফল্যের হোক।’ বলল রশিদি ইয়েসুগো। বিব্রত লায়লা কিছু বলতে যাচ্ছিল। এই সময় ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভিতে দিনের পরবর্তী প্রোগামের বিবরণ দিতে শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা সবাইকে থামিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে বলল, ‘এস আমরা টিভি প্রোগামের দিকে মনযোগী হই।’ আহমদ মুসার আকস্মিক এবং নির্দেশমূলক আচরন লায়লার কাছে অসৌজন্যমুলক বলে মনে হলো। কিন্তু সবাইকে টিভির প্রতি মনোযোগী হতে বলে সেও টিভির দিকে তাকাল। লায়লার মনে প্রশ্ন জাগল। টিভিতে এমন কি প্রোগ্রাম আছে যে ওরা সবাই এভাবে টিভিমুখী হলো। অনুষ্ঠানসুচির শুরুতেই ঘোষক বলল, ‘আজকের অনুষ্ঠানে নিউজ ফিচার পর্যায়ের শুরুতেই রয়েছে ক্যামেরুনের জাতিগত অবস্থার উপর একটা আনুসিন্ধান রিপোর্ট। এতে আপনারা শুনবেন দক্ষিণ ক্যামেরুনের মুসলিম জাতি গোষ্ঠী কি ধরণের নির্মূল অভিযানের শিকার হয়েছে।’ ঘোষনা শুনে রশিদি ইয়েসুগো সোজা হয়ে বসল। তার চোখে মুখে বিস্ময়ের একটা ঢেউ আছড়ে পড়ল। সে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘একি শুনছি মুসা ভাই। সত্যি শুনছি তো? আপনি কি এ প্রোগ্রামের কথাই বলেছিলেন?’ লায়লার চোখে-মুখেও প্রশ্ন। ‘হ্যাঁ, রশিদি। আমি এ প্রোগ্রামের কথাই বলছিলাম। এস দেখি, সব কথা ঠিক ভাবে এসেছে কিনা?’ বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার কথার ধরনে বিস্মিত হলো লায়লা। কথায় মনে হচ্ছে টিভি অনুষ্ঠানটির সব আয়োজনই যেন মেহেমান লোকটি করেছে। কে লোকটি! টিভি’র অনুষ্ঠানসুচি শেষ হলো। শুরু হলো ক্যামরুনের নিউজ ফিচারটি। আহমদ মুসাদের আটটি চোখ টিভি পর্দার উপর স্থিরভাবে নিবন্ধ। ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি (FWTV) তার দীর্ঘ দশ মিনিটের নিউজ ফিচারে যে রিপোর্ট পেশ করল তা সংক্ষেপে এইঃ “আফ্রিকার কথিত অন্ধকারের আড়ালে জাতি নির্মূলের নীরব অভিযান চলছে। এই অভিযানের প্রধান চাপ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের মধ্যাঞ্চলে কেন্দ্রীভুত হয়েছে। দক্ষিণ ক্যামেরুন ইতিমধ্যেই এই নির্মূল অভিযানের পূর্ণ গ্রাসের মধ্যে এসে পড়েছে। পেছন থেকে এই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে কিংডোম অব ক্রাইস্ট বা ‘কোক’। আর ‘কোক’-এর পেছনে রয়েছে জঙ্গি খৃষ্টান সংগঠন ‘ওকুয়া’। কোক তার পুরনো কৌশল নিয়ে সামনে এগুচ্ছে। ওয়াকিফহাল মহলের বরাত দিয়ে আমাদের প্রতিনিধি জানাচ্ছেন, দক্ষিণ ক্যামেরুনের সব জমি স্বেচ্ছা বিক্রয়, জবরদস্তি ক্রয় এবং ভুয়া দলিলের মাধ্যমে ‘কোক’ দখল করে নিয়েছে। দক্ষিণ ক্যামেরুনের ৪০লাখ একর মুসলিম মালিকানাধীন জমির মধ্যে মাত্র ২ লাখ একর জমি তারা মালিকের কাছ থেকে স্বেচ্ছা বিক্রয়ের মাধ্যমে কিনেছে। অবশিষ্ট জমির ষাট ভাগ তারা কিনেছে জবরদস্তি ক্রয়ের মাধ্যেমে। বাকি ৪০ ভাগ জমি তারা মালিকেদের উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দিয়ে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছে। গত পাঁচ বছরে ‘কোক’ দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে ১০ লাখ মুসলমানকে সম্পত্তি ও ঘর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে। খৃস্টান সংগঠন ‘কোক’ দৃশ্যের আড়ালে থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং নানা নামের এনজিও-এর মাধ্যমে দক্ষিণ ক্যামেরুনে এই ভুমি দখলের কাজ সম্পন্ন করেছে। ‘কোক’ এর এই ভুমি দখল এবং মুসলিম নির্মল অভিযানে শত শত মুসলিম জীবন দিয়েছে, শত শত পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। কারন এরা আপোসে জমি তাদের হাতে তুলে দিয়ে নীরবে এলাকা ত্যাগ করতে রাজী হয়নি। ভুমি দখলে তারা কত বেপরোয়া তার দৃষ্টান্ত হিসাবে আমাদের প্রতিনিধি দক্ষিণ ক্যামেরুনের একটি মুসলিম পরিবারের মর্মান্তিক কাহিনী তুলে ধরেছেন। সমগ্র দক্ষিণ ক্যামেরুনে একটি মাত্র মুসলিম পরিবার অবশিষ্ট ছিল। ওমর বায়ার পরিবার। ক্যম্পু উপত্যাকায় তাদের বাড়ি। উপত্যকায় একটি সম্মানিত পরিবার ছিল এটা। দশ হাজার একরের একটা প্লটের মালিক ছিল এই পরিবার। শুর থেকেই ‘কোক’ এর নজর পড়ে এই জমি খণ্ডের উপর। কিন্তু যখন ওরা বুজল ওমার বায়ার আব্বার কাছ থেকে এ জমি তারা হস্তগত করতে পারবেনা, পরিবারটিকে দুর্বল ও ভিত করার পথ হিসাবে কোক হত্যা করল ওমার বায়ার আব্বাকে। পিতা নিহত হবার পর ওমার বায়ার উপর অব্যাহতভাবে চাপ দিতে থাকল তারা। আশে পাশের মুসলমানরা উচ্ছেদ হয়ে যাবার পর ওমর বায়ার পরিবার একা পড়ে গেল। বিপন্ন হয়ে উঠল তাদের জীবন। ওমর বায়া তার মা’কে নিয়ে জীবন বাঁচাবার জন্যে উত্তর ক্যামেরুনের কুম্বায় পালিয়ে গেল পালিয়ে গিয়েও তারা বাঁচতে পারল না। ‘কোক’ ও ‘ওকুয়া’র লোকেরা ওমর বায়াকে হত্যা প্রচেষ্টা চালায়। ওমর বায়া পালাতে সমর্থ হলেও নিহত হয় তার মা। কিন্তু এরপরও তার সম্পত্তি ওমর বায়া খৃস্টানদের হাতে ছেড়ে দিতে রাজী হয় না। ক্যামেরুনে থেকে তার জীবন বাঁচানো অসম্ভব হয়ে উঠল। অবশেষে ক্যামেরুনের একটা উচ্চ আদালতে তার সম্পত্তির ব্যাপারে একটা উইল রেজিস্ট্রি করে তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পত্তি হস্তান্তর ও দখলের সকল পথ বন্ধ করে সে ফ্রান্সে পালিয়ে গেল। কিন্তু রক্ষা পায়নি সে। জানা গেছে কয়েকদিন আগে ওমর বায়াকে কিডন্যাপ করে ক্যামেরুনে আনা হয়েছে। এখন তারা ওমর বায়াকে হাতে রেখে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের উপর চাপ প্রয়োগ করে ওমর বায়ার জমিটা হস্তগত করতে চায়। সংশ্লিষ্ট বিচারককে বাধ্য করার জন্যে তার এক অতি আপনজনকে কিডন্যাপ করেছে তারা। আমরা যখন এই রিপোর্ট সম্পুর্ন করছি, তখন ইয়াউন্ডির কুন্তে কুম্বা এলাকার ভীতিকর একটা রিপোর্ট আমরা পেলাম। কুন্তে কুম্বা এলাকায় কোক জবরদস্তি জমি কেনা শুরু করেছে। ‘কোক’কে তার দাবীকৃত একটি ভূমিখন্ড দিতে রাজী না হওয়ায় কোক কুন্তে কুম্বার দু’জন লোককে হত্যা এবং সেখানকার মসজিদের সম্মানিত ইমামকে কিডন্যাপ করে। এছাড়াও কোক কয়েকবার ঐ এলাকায় হামলা চালায়। ৪ দিন আগে অনুরুপ একটি হামলা সংঘটিত হয়। দু’টি মাইক্রোবাসে বোঝাই পনের বিশ জনের একটি সশস্ত্র দল খুব ভোরে এই হামলা চালায়। স্থানীয় মুসলমানদের পক্ষ থেকে সব সময় এসব বিষয় পুলিশকে যথারীতি অবহিত করা হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে পুলিশ ‘কোক’-এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করে না। দক্ষিন ক্যামেরুনের ক্ষেত্রেও এটাই দেখা গেছে। ক্যামেরুনের সরকার এবং বিশ্বের মানবতাবাদী সংস্থাসমুহের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হওয়া আবশ্যক। ‘কোক’-এর জাতি নির্মূল অভিযান অবিলম্বে বাদ এবং তাদের অতীত কৃতকর্মের প্রতিকার হওয়া উচিত।” দশ মিনিটের প্রোগ্রামটি শেষ হলো ফ্রি ওয়াল্ড টিভি”র। আহমদ মুসা উঠে গিয়ে টিভি অফ করে দিয়ে এল। টিভি প্রোগ্রাম শেষ হলেও রশিদি ইয়েসুগো এবং লায়লা টিভি স্ক্রিন থেকে তাদের চোখ সরায়নি। বিস্ময়ে যেন তারা পাথর হয়ে গেছে। ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’তে ক্যামেরুনের মুসলমানদের এই বিবরন তাদের কাছে স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। কি করে সম্ভব হলো এটা। রাশিদি ভাবল, টিভি’তে এই প্রোগ্রাম আজ হবে আহমদ মুসা তা আগাম জানল কি করে! এই সময় একটি অল্প বয়সের ছেলে কতগুলি খবরের কাগজ নিয়ে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল। রাশিদি ইয়েসুগো সেদিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, ‘যা বলেছিলাম, সব কাগজ পেয়েছ?’ ‘পেয়েছি।’ বলল ছেলেটি। ছেলেটি কাগজগুলো এনে রাশিদি ইয়েসুগোর কাছে খুব সম্মানের সাথে রেখে বেরিয়ে গেল। লায়লা ছাড়া আহমদ মুসারা তিনজন সংগে সংগে টেবিল থেকে কাগজ তুলে নিল। আহমদ মুসা তুলে নিয়েছিল ফ্রান্সের ‘লা-মন্ডে’। আহমদ মুসা প্রথম পাতার উপর একবার নজর বুলিয়েই বলল, ‘ইয়েসুগো লা-মন্ডে এই খবর প্রথম পাতায় ডাবল কলাম হেডিং-এ ছেপেছে।’ ‘কোন খবর?’ পত্রিকা থেকে মুখ তুলে বলল ইয়েসুগো। সে আল আহরামের উপর নজর বুলচ্ছিল। ‘ক্যামেরুনের যে রিপোর্ট টিভিতে দেখলে সেই রিপোর্ট। ’ আহমদ মুসর কথা শেষ না হতেই ইয়েসুগো চিৎকার করে উঠল, ‘কি আশ্চর্য, টিভি’র এই খবর আল আহরাম প্রথম লিড আইটেম হিসাবে ছেপেছে।’ রাশিদি ইয়েসুগোর কথা শেষ না হতেই কথা বলে উঠল ইয়েকিনি। বলল, ‘দেখ দেখ, আমাদের ‘দি লিবার্টি’ও সিঙ্গল কলামে খবরটি ছেপেছে।’ দেখা গেল ক্যামেরুনের স্থানীয় অন্যান্য কাগজও সংক্ষেপে সিংগল কলামে হলেও খবরটি ছেপেছে। শুধু ‘কোক’-এর সিজার পত্রিকা ‘দিস ক্রস’ খবরটি ছাপেনি। ‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না কিভাবে এটা সম্ভব হলো? টিভি এবং খবরের কাগজে এক সাথে খবরগুলো এলো?’ বিস্মিত কন্ঠে বলল রাশিদি ইয়েসুগো। রাশিদি ইয়েসুগো, লায়লা, ইয়েকিনি সবার দুষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। লায়লা বুঝতে পারছেনা, তার ভাইয়া রাশিদি, ইয়াকিনি সবাই মেহমানকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? মেহমানের সামনে তাদের আচরনকে অনেকটা জড়োসড়ো বলে মনে হচ্ছে। কে এই মেহমান? ‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, কাজটা পরিকল্পনা মোতাবেক হয়ে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা। ‘পরিকল্পনা? কার পরিকল্পনা?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘ওমর বায়ার খবরটা পাঠিয়েছে ফ্রান্স থেকে আমাদেরই এক সাংবাদিক বোন।’ ‘সে জানল কি করে?’ ‘আমি তাকে নিউজটা করতে বলেছিলাম আর কুন্তে কুম্বা’র রিপোর্ট লিখেছে ইয়েকিনির বোন ফাতেমা মুনেকা। তোমাদের সামনেই তো গতকাল আমি তা পাঠালাম।’ বলল আহমদ মুসা। ‘কিন্তু টিভি ও নিউজ মিডিয়া রিপোর্ট পেলেই কি এভাবে প্রচার করে? কিভাবে এটা হলো?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘FWTV এবং ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সী (WNA)-এর সাথে আমাদের সুসম্পর্ক আছে। এ ধরনের নিউজ প্রচার করা ওদের একটা দায়িত্ব।’ ‘তার মানে সংস্থা দু’টি কি মুসলমানদের?’ বলল লায়লা। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। ‘মুসলমানদের। কিন্তু বাইরে এ পরিচয় নেই। মুসলিম পুঁজি এ সংস্থা দু’টি গড়ে তুলেছে এবং পরিচালনা করছে। কিন্তু কাজ-কামে এর মুসলিম পরিচয়কে মূখ্য করা হয় না। এটা সম্পুর্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। মুসলিম স্বার্থের পক্ষে কাজ করে, কিন্তু সেটা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেই করা হয়।’ বলল আহমদ মুসা। ‘বুঝা গেল, আপনার পরিকল্পনাতেই এটা হয়েছে। কিন্তু কি লক্ষ আমরা অর্জন করতে চাচ্ছি এর দ্বারা?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘প্রথমত, নীরব জাতি নির্মূলের এই ঘটনা বিশ্ববাসীকে জানানো। চক্ষু লজ্জার খাতিরে হলেও বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখানে কি ঘটেছে তা এখন জানতে চেষ্টা করবে। দ্বিতীয়ত, ক্যামেরুন সরকারকে সক্রিয় করা, যাতে তারা মুসলমানদের অভিযোগগুলোর দিকে নজর দেয়। বিশ্বব্যাপী এই প্রচারের ফলে ক্যামেরুন সরকার নিজেদেরকে কিছুটা অপরাধী ভাবতে বাধ্য হবে এবং কিছুটা হলেও নিরেপেক্ষ হবার চেষ্টা করবে। তৃতীয়ত, ওমর বায়ার সম্পত্তি হস্তান্তরে একটা বাধার সৃষ্টি হবে।’ ‘ঠিক বলেছেন। ব্যাপারটাকে কোনদিন তো আমরা এই ভাবে চিন্তা করিনি। এভাবে এক ঢিলে যে বহু পাখি মারা যায়, তা আমাদের কখনও মাথায় আসেনি।’ ‘দেখ, আনবিক বোমার চাইতে মিডিয়া অস্ত্র অনেক বেশী পাওয়ারফুল। একটা আনবিক বোমা একটা শহরে বা একটা এলাকায় আগুন লাগাতে পারে, কিন্তু একটা মিডিয়া আগুন লাগাতে পারে গোটা দুনিয়ায়।’ ‘FWTV’এবং ‘WNA’ কি এই লক্ষ্য সামনে রেখেই মুসলমানরা করেছে?’ ‘অবশ্যই।’ ‘কিন্তু আমরা তো জানি না।’ ‘আজ জানলে। এভাবেই যাদের জানা উচিত তারা জানবে। এ সংস্থা দু’টি মুসলমানরা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করেছে। তা যদি সবাই জেনে ফেলে, তাহলে এ সংস্থা দু’টির ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হয়ে যাবে। সবাই এর বক্তব্যকে দলীয় ভাষ্য হিসেবে ভাববে।’ ‘ঠিক। এই কৌশল যে আমারা নিতে পেরেছি, এ জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।’ লায়লা ইয়েসুগোর বিস্ময় তখন চরমে। কে এই মেহমান? দেখতে অনেকটা তুর্কিদের মত চেহারা। তাদের পরিবারের পরিচিত এমন তো কেউ নেই! মনে হচ্ছে সে অনেক জানে, অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তি তার! লায়লা একটু পাশে ঝুঁকে রাশিদি ইয়েসুগোর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, মেহমানের পরিচয় দাওনি।’ রাশিদি ইয়েসুগো হেসে উঠল। বলল,‘স্যরি, লায়লা। তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে ওঁর পরিচয় রিজার্ভ রেখেছিলাম।’ বলে একটু থামল রাশিদি ইয়েসুগো। গম্ভীর হলো সে। বলল, ‘ইনি আমাদের অতি সম্মানিত ভাই বিশ্ব-বিশ্রুত আহমদ মুসা।’ শক খাওয়ার মত চমকে উঠল লায়লা। তার চোখ প্রথমে ছুটে গেল আহমদ মুসার দিকে। তারপর এসে নিবদ্ধ হলো রাশিদি ইয়েসুগোর উপর। বলল, ‘কি বলছ ভাইয়া! তিনি! তিনি ক্যামেরুনে! আমাদের এখানে।’ ‘যখন ইয়েকিনি ওঁকে আমার এখানে নিয়ে এল, তখন ব্যাপারটা তার চেয়েও অবিশ্বাস্য ঠেকছিল আমার কাছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আল্লাহ আহমদ মুসাকে ক্যামেরুনে এনেছেন। তাঁর আসার সাথে সাথে আমাদের সৌভাগ্যের যাত্রাও আলহামদুলিল্লাহ শুরু হয়েছে। এই মাত্র ক্যামেরুনের উপর যে টিভি রিপোর্ট শুনলাম এবং সংবাদপত্রে যে রিপোর্ট দেখেছি, এগুলো তারই প্রমান। কুন্তে কুম্বায় আরও কি ঘটেছে ইয়েকিনির কাছে শুনবে। দেখবে কিভাবে রাতের অন্ধকার দিনের আলোতে রুপান্তরিত হয়েছে।’ থামল রাশিদি ইয়েসুগো। লায়লা ইয়েসুগো সংগে সংগে উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম। মাফ করবেন। আমি যা শুনলাম, আমি যা দেখছি সব আমার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে।’ আহমদ মুসা সালাম গ্রহন করে মুখ না তুলেই বলল, ‘কোন কাউকে অস্বাভাবিকভাবে বড় কল্পনা করলে বাস্তবে তার যখন সাক্ষ্য পাওয়া যায়, তখন এ রকমই হয়। তাই কোন কাউকে খুব বড় করে দেখা ঠিক নয়।’ ‘বড়কে ছোট করে দেখাও বোধহয় ঠিক নয়।’ বলল লায়লা। ‘যে যা তাকে তাই ভাবা উচিত।’ ‘সেটা ভাবতে গেলে তো ডিকশনারীতে যত বিশেষণ তার অধিকাংশই তো আপনার নামের আগে বসাতে হয়।’ বলল ইয়েকিনি। ‘থাক, এসব কথা। এস কাজের কথা ভাবি। আমার ক্যামেরুনে আসার চতুর্থ দিন আজ। কিন্তু এখনও আসল কাজ শুরু করতে পারিনি।’ বলল আহমদ মুসা। ‘মাফ করবেন। গতকাল থেকে ভাইয়ারা আপনার অনেক কাহিনী শুনেছেন। আমি কিন্তু বঞ্চিত হলাম।’ বলল লায়লা। ‘আমি আশা করি রাশিদি সব বলবে তোমাকে।’ বলল, আহমদ মুসা মুখ না তুলেই। ‘অবশ্যই বলব।’ এসব কাজে ওর খুব আগ্রহ বলেই তো জরুরী খবর দিয়ে নিয়ে এসেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি সত্বেও। বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘আপনার ক্যামেরুন মিশনের লক্ষ্য কি?’ বলল লায়লা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। ‘আমার ক্যামেরুন মিশনের লক্ষ্য ছিল ওমর বায়া এবং ড. ডিফরজিসকে উদ্ধার করা এবং ওমর বায়ার সম্পত্তি তার দখলে আনার ব্যবস্থা। করা কিন্তু ক্যামেরুন আসার পর, বিশেষ করে কুন্তে কুম্বায় দু’দিন কাটিয়ে যে ক্যামেরুনকে দেখলাম, তাতে লক্ষ্য আরও বড় হয়েছে।’ ‘ক্যামেরুনের সৌভাগ্য এটা।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘এমন কিছু যদি ক্যামেরুনে না ঘটত, সেটাই হতো ক্যামেরুনের সৌভাগ্য।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ঘটে গেছে বলেই তো আমরা দূর্ভাগ্যের শিকার। এখন আমরা সন্ধান করছি সৌভাগ্যের।’ বলল লায়লা। ‘এ সন্ধানকে আল্লাহ সফল করুন।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনার সম্পর্কে আমাদের সীমাহীন কৌতুহল। কিছু প্রশ্ন করতে পারি?’ বলল লায়লা। ‘অবশ্যই।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন।’ বলল লায়লা। ‘আমার ব্যক্তিগত তেমন কিছু নেই, যা কিছু আছে বোন ফাতেমা মুনেকা মনে হয় সব কিছু জেনেছে। তুমি তাকে জিজ্ঞেস কর।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আপনার বোন তো একটা নয়।’ বলল লায়লা। ‘তা হবে কেন। হাজারো বোন, হাজারো ভাই নিয়ে আমার পৃথিবী।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আমার জানার খুব ইচ্ছা, এই কঠিন পথে আপনার যাত্রা কিভাবে?’ ‘এ প্রশ্নের উত্তর আমার জন্য কঠিন। ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে সংঘাত-সংঘর্ষের মধ্যে বেড়ে উঠা একজন ফিলিস্তিনি বলতে পারবেন তার বিপ্লবী শুরু কিভাবে। আমার ব্যাপারটাও ঐ রকম। আমার চোখের সামনে আমার মা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আরও হাজারো জনের সাথে আব্বা ও ছোট ভাইয়ের দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়েছে বোমায়, ক্ষুধা-তৃষ্ণা-শীতে সাথীদের একে একে ঢলে পড়তে দেখেছি মৃত্যুর কোলে হিমালয়ের উপত্যকায়। তাদের সকলের একটা অপরাধ ছিল, তারা মুসলমান। এই বোধ কখন যে কিভাবে আমাকে দূর্ভাগা মুসলিম সমাজের একজন সেবকে পরিনত করেছে আমি জানিনা।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনি সবচেয়ে খুশী হন কিসে?’ বলল লায়লা। ‘যখন কারো মুখে আমি নির্মল হাসি দেখি।’ বলল আহমদ মুসা। ‘সবচেয়ে দুঃখিত হন কিসে?’ ‘যখন মানুষের চোখে অশ্রু দেখি।’ ‘তাহলে মানুষকে কেন্দ্র করেই আপনার সব কিছু। মানুষকে এত ভালোবাসেন কেন?’ ‘মানুষকে ভালোবাসলে আল্লাহ সবচেয়ে খুশী হন বলে।’ ‘সত্যিই খুশী হন? কেন?’ ‘মানুষকে দিয়েই তো আল্লাহর সব আয়োজন। এই দুনিয়া, এই মহা-বিশ্ব, সব কিছুই আল্লাহ করেছেন মানুষের জন্যেই।’ ‘মানুষকে এই নির্বিচার ভলোবাসা কি সেকুলার ভালোবাসা নয়?’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মানুষকে নির্বিচারে ভালোবাসতে না পারলে পথভ্রষ্ট মানুষকে, দূর্ভাগা পাপীদের কিভাবে আলোর পথে, মুক্তির পথে নিয়ে আসবো?’ ‘তাহলে মুসলিম এবং অমুসলিমকে ভালোবাসায় কোন পার্থক্য থাকবে না?’ ‘মুসলিমরা তোমার দেহের অংগ, আর অমুসলিমরা তোমার আশ্রিত অসহায় জন। পার্থক্য বুঝেছ?’ ‘বুঝেছি। বড় একটা বিভ্রান্তি আমার দূর হলো।’ ‘লায়লার মধ্যে যে একটা ভ্রান্তি ছিল তার স্বীকৃতি অনন্ত পাওয়া গেল। কী বল ইয়েকিনি।’ বলল রাশিদি মুখ টিপে হেসে। ‘যাই বল আমি কিছু বলব না আজ। তবে ইয়েকিনিকে সাক্ষী মানা ঠিক হয় নি। ভুল স্বীকারকে সে কুইনাইনের চেয়েও তেতো মনে করে।’ বলল লায়লা। ‘দোষ করলে রাশিদি তুমি, লায়লা শোধ নিল আমার ওপর।’ বলল ইয়েকিনি। ‘নিরাপদ জায়গা কোনটা লায়লা চিনে।’ লায়লা কিছু বলতে চাচ্ছিল। তার আগে আহমদ মুসা বলল, ‘তোমাদের মধুর বিতর্ক আপাতত স্থগিত। আমার ঘুম পাচ্ছে। তোমাদের এখানে আরামের জীবন আমাকে অলস করে তুলল মনে হচ্ছে।’ ‘স্যরি, না, ঠিক আছে। খাওয়ার পর একটু রেষ্ট নেওয়া প্রয়োজন।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘আরামের জীবন মানে কি অলস জীবন?’ বলল লায়লা। ‘আরামের জীবন মানে অলস জীবন নয়। তবে আরামের জীবন যদি লক্ষ্যহীনতা ও নিশ্চিন্ততায় আক্রান্ত হয়, তাহলে জীবন কাজ না পেয়ে অলস হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ ‘নিশ্চিন্ততা ও লক্ষ্যহীনতা দ্বারা আপনি কি বুঝতে চাচ্ছেন?’ লায়লা বলল। ‘মানব জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে উদাসিনতা এবং মানুষ হিসেবে নিজের দ্বায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে কোন চিন্তা না করা।’ ‘মাফ করবেন। এক কথায় মানব জীবনের লক্ষ্যকে আপনি কিভাবে বর্ণনা করবেন?’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে লায়লা বলল। ‘মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্যে কাজ করা।’ ‘সব মানুষের কল্যাণ সব মানুষের মুক্তির জন্য?’ ‘অবশ্যই, আল্লাহর কোন বান্দা কি তোমার পর যে তার কল্যাণ ও মুক্তির কথা ভাববে না? তবে প্রথম ভাবতে হবে আয়ুর কথা, পরে আশ্রিত’দের কথা।’ ‘আমার মনে হচ্ছে কি জানেন, আমাদের মত আপনার ভাই-বোনদের শিক্ষিত করার জন্যে গোটা দুনিয়ায় আপনার শিক্ষা কোর্স চালানো দরকার। আমরা অনেক কিছুই জানি না।’ লায়লা বলল, ইয়েসুগোদের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে। সাংঘাতিক দামী কথা বলেছ লায়লা তুমি। বলল রাশিদী ইয়েসুগো। ‘রাশিদী তুমি আরও স্বীকার করবে, আমাদের মেয়েরা দামী কথাই বেশী বলে। আসলে ইসলামের প্রতি ওদের চিন্তা আন্তরিকই বেশী।’ বলল ইয়েকিনি। ‘আচ্ছা ইয়েকিনি, লায়লা তোমাকে অতবড় আঘাত করল, আর তুমি তাকে এত বড় সমর্থন দিলে?’ মুখ টিপে হেসে বলল রাশিদী। ‘সমর্থন নয়, সত্যের প্রতি স্বীকৃতি।’ বলল লায়লা। লজ্জার একটি ঢেউ তার মুখের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। ইয়েসুগো ও আহমদ মুসার পেছনে পাশাপাশি হাটছিল লায়লা এবং ইয়েকিনি। কথা শেষ করেই লায়লা তাকাল ইয়েকিনির দিকে। ইয়েকিনি কিছু বলতে যাচ্ছিল। যেন মুখ ফস্কে বেরুচ্ছিল কিছু কথা। লায়লা ঠোঁটে আঙ্গুল চাপা দিয়ে আহমদ মুসাদের দিকে ইংগিত করে কিছু না বলার জন্যে অনুরোধ করল। লায়লার চোখে-মুখে রক্তিম লাজ-নম্রতা। লায়লা কথা শেষ করার পর মূহুর্ত কয়েক নিরবতা। নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসার কন্ঠ। বলল, ‘ইয়েকিনি ঠিকই বলেছে। প্রমাণিত হয়েছে প্রতিকূল পরিবেশে মেয়েরাই ইসলামকে ধরে রাখতে পারে বেশী। ইসলামের শিক্ষাও তাদের মাধ্যেমে বেশী সম্প্রসারিত হয়। সাবেক কম্যুনিষ্ট দেশগুলোতে এটা আমরা দেখেছি। আফ্রিকাতেও তোমরা এটা দেখবে।’ ‘ব্যাস লায়লা, তোমার আর কি চাই, দলিল পেয়ে গেছ।’ পেছনে তাকিয়ে হেসে বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘দেখ ভাইয়া ধর্মের কল এভাবেই বাতাসে নড়ে।’ লায়লার কথায় হেসে উঠল ওরা তিনজন সকলেই এক সাথে। ইয়াউন্ডির বাণিজ্যিক এলাকায় একটা চারতলা ভবন। ভবনের তিনতলার একটা প্রশস্ত কক্ষ। কক্ষের বড় একটা টেবিলকে সামনে রেখে এক চেয়ারে বসে আছে পিয়েরে পল। তার ডানপাশে ফ্রান্সিস বাইক, ওকুয়ার প্রধান। তাদের সামনের টেবিল ঘিরে আরো অনেকগুলো চেয়ার। টেবিল থেকে অল্পদূরে দেয়ালে আটা একটা টিভি স্ক্রীনে ফ্রি-ওয়াল্ড টিভি’র প্রোগ্রাম চলতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে পিয়েরে পলের কোন খেয়াল নেই। তার চোখ-মুখ আগুনের মত লাল। ফ্রান্সিস বাইকের মুখ নিচু। আষাঢ়ের মেঘের মত ভারী। কথা বলছিল পিয়েরে পল ‘এতবড় ঘটনা কিভাবে ঘটল। ফ্রিওয়াল্ড টিভির মত একটা বিখ্যাত আন্তর্জাতিক মিডিয়া ১০মিনিট ধরে মুসলিম উচ্ছেদ এবং ‘কোক’ এর কুকীর্তি বর্ণনা করল! এটা কি করে সম্ভব হলো? রীতিমত এটা মিডিয়া জগতে বিপ্লবের মত। ওমর বায়ার কাহিনী সর্বস্তরে বর্ণনা করেছে। কত লাখ একর জমি কিভাবে দখল হয়েছে তাও বলেছে। বলতে গেলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে। নিশ্চয় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে ও.আই.সি, রাবেতা সহ মুসলিম দেশ গুলো চিৎকার করবেই। পশ্চিমা অনেক মানবধিকার সংস্থা দেখবেন সোচ্চার না হয়ে পারবে না। এখানকার সরকারও এখন চাপের মুখে পড়বে। তাদের কাছ থেকে যে সহযোগিতা আমরা পাচ্ছিলাম, ভবিষ্যতে তা পাওয়া আর আগের মত সহজ হবে না। সবচেয়ে বড় কথা ওমর বায়ার জমি হস্তান্তরের কাজটাও জটিলতায় পড়বে।’ থামল একটু পিয়েরে পল। সে আবার মুখ খোলার আগেই কথা বলে উঠল ফ্রান্সিস বাইক। বলল, ‘এ রকম কত নিউজ হয়। চীফ জাস্টিস কি তার কথা থেকে সরবেন? সরলে আমাদের অস্ত্র তো আছেই। চীফ জাস্টিস তার জীবনের চাইতেও ডঃ ডিফরজিসকে ভালবাসেন। সুতরাং.........’ ‘সুতরাং কাজটা সহজ হতেও পারে।’ ফ্রান্সিস বাইককে বাধা দিয়ে বলতে শুরু করল পিয়েরে পল, ‘কিন্তু সরকার যদি বাইরের চাপে এনিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে, তাহলে কাজটা কঠিন হতে পারে।’ ‘তা হতে পারে। তাই চীফ জাস্টিস কে দিয়ে কাজটা আমাদের আগেই সেরে ফেলতে হবে। তাছাড়া সরকার চাপে পড়লেই যে সরকার সঙ্গে সঙ্গে গলে যাবে, ব্যাপার তা নয়। সরকারের দু’একজন মানবতাবাদী ছাড়া সকলেই আমাদের পক্ষে। সরকার চাপে পড়ে তদন্তের কথা বলতে পারে, কিন্তু সেটা লোক দেখানোই হবে। তাদের ভাই-ভাতিজা ও পুত্র-কন্যা-জামাইদের আমাদের এনজিওগুলো বড়বড় বেতন দিয়ে পুষছে।’ ‘সুখবরের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশন কিংবা পশ্চিমের অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা সরেজমিন তদন্তের জন্যে আসতে পারে। বলা যায় আসবেই। ও. আই. সি. এবং মুসলিম দেশগুলো অবশ্যই এর ব্যবস্থা করবে।’ ‘সেগুলো মোকাবিলার পথ করা যাবে। কাগজে কলমে কোথাও আমাদের কোন ত্রুটি নেই। দক্ষিণ ক্যামেরুনের কোথাও মুসলিম জনপদ ছিল তা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। কোন মসজিদই আস্ত রাখা হয়নি। ভেঙ্গে সেখানে গীর্জা তৈরী করা হয়েছে।’ একটু থামল ফ্রান্সিস বাইক। তারপর বলল, ‘অন্য একটা কথা ভেবে আমি বিস্মিত হচ্ছি, রিপোর্টের কোথাও ব্ল্যাক ক্রস-এর নাম নেই। ডঃ ডিফরজিস এবং চীফ জাস্টিস এর আদালতের উল্লেখ নেই। বোধহয় এ ব্যাপারগুলো পুরো জানেনা যে রিপোর্ট পাঠিয়েছে।’ ‘আমার তা মনে হয় না। সংশ্লিষ্ট বিচারকের আত্মীয়কে ফ্রান্স থেকে কিডন্যাপ করে আনা হয়েছে, সে কথা রিপোর্টে বলেছে। এ তথ্য যারা জানে, তারা ঐসব ব্যাপারও জানে। আমার মনে হচ্ছে, যারা এখবর প্রচারের পেছনে আছে তারা খুব ঠান্ডা মাথার লোক। তারা গোটা রিপোর্টে সরকারের জন্যে সামনে এগুবার কোন ক্লু রাখেনি। চীফ জাস্টিস এবং ডঃ ডিফরজিসের নাম করলে সরকার ক্লু পেয়ে যেত। আমার মনে হয় যারা খবর প্রচারের পেছনে আছে তারা চাচ্ছে নিজেরাই ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করতে। তারা সরকারকে মনে হয় বিশ্বাস করে না।’ ‘ঠান্ডা মাথার এ লোকটা কে হতে পারে, যে ফ্রিওয়ার্ল্ড কে দিয়েও নিউজ করিয়ে নিতে পারে।’ ‘এটাই তো বুঝতে পারছিনা। এ ধরণের একজন লোক আহমদ মুসাই। কিন্তু সে কি বেঁচে আছে? অবশ্য দুয়ালা’য় যে লোকটি আমাদের পরাজিত করে পালাতে সমর্থ হয়, তার চেহারার যে বিবরণ পাওয়া গেছে তাতে আহমদ মুসার সাথে মিলে যায়। আবার আমাদের দুয়ালা ঘাঁটি থেকে আমরা চলে আসার পর যে লোকটি হানা দেয় তার চেহারাও আহমদ মুসার মতই। সব মিলিয়ে আমার মনে হচ্ছে লোকটি আহমদ মুসাই। কিন্তু ভাবছি, সে বাঁচল কি করে ধ্বংস হওয়া মটর থেকে।’ একটা ঢোক গিলল পিয়েরে পল। থামল একটু। শুরু করল আবার, ‘রিপোর্টে কুন্তে কুম্বা’র কি শুনলাম? কি ঘটেছে সেখানে?’ এই সময় ইন্টারকম কথা বলে উঠল, ‘মিঃ ফ্রান্সিস বাইক, ইদেজা থেকে লোক এসেছে। জরুরী মেসেজ।’ ‘নিয়ে এস।’ ফ্রান্সিস বাইক বলে উঠল, ‘এখনি জানা যাবে সব কিছু। কুন্তে কুম্বার সবচেয়ে কাছের ঘাটি ইদেজা থেকে লোক এসেছে।’ ফ্রান্সিস বাইকের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের পাশে রক্ষিত ইন্টারকমে একটা নীল বাতি জ্বলে উঠল। ফ্রান্সিস ইন্টারকমের দিকে মুখ নিয়ে বলল, ‘গেটে কে?’ ইন্টারকমেই উত্তরটা ধ্বনিত হলো। বলা হলো, ‘স্যার ইদেজার লোককে নিয়ে এসেছি।’ ‘এস।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক। দরজা খুলে গেল। প্রবেশ করল একজন শ্বেতাঙ্গ যুবক। খৃষ্টান ফাদারের পোশাক পরা। ‘মিঃ পিয়েরে পল, যুবকটি আমাদের ইদেজা গীর্জার একজন ফাদার এবং ‘কোক’-এর ইদেজা-ঘাঁটির ইনফরমেশন ডাইরেক্টর।’ যুবকটি টেবিলের সামনে এলে ফ্রান্সিস বাইক উঠে দাঁড়িয়ে যুবকটির সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘বসুন ফাদার জেমস।’ ফাদার জেমস পিয়েরে পলের সাথেও হ্যান্ডশেক করল। তারপর বসল। ফাদার জেমস হ্যান্ডশেক করার সময় হাসার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হাসিটা কান্নার চেয়েও কাল হয়ে উঠেছিল। ‘বলুন ফাদার জেমস। নিশ্চয় ইদেজা’র কিছু দুঃসংবাদ আমাদের শুনাবেন।’ ‘শুধু দুঃসংবাদ নয়, বিপর্যয় ঘটে গেছে।’ বলল ফাদার জেমস। ‘বিপর্যয়! কেমন বিপর্যয়?’ ‘কুন্তে কুম্বার ওরা ইদেজা’র ‘কোক’ প্রধান জন স্টিফেনসহ আমাদের ১৬জনকে বন্দী করেছে এবং তাদের সাথের দু’জনকে হত্যা করেছে। পরে ইদেজা থেকে ওদের ইমামকে মুক্ত এবং ইদেজার ডেপুটি ‘কোক’ প্রধান ফ্রাসোয়া বিবসিয়ের’কে বন্দী করে নিয়ে গেছে।’ থামল ফাদার জেমস। ‘কি বলছ তুমি? তোমার মাথা ঠিক আছে তো?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক। মাথা নিচু করল ফাদার জেমস। বলল, ‘অবিশ্বাস্য বটে, কিন্তু যা বলেছি তাই ঘটেছে।’ ‘ইদেজায় ওরা কয়জন লোক এসেছিল?’ ‘তিনজন।’ ‘কি বলছ? তিনজন লোক এসে আমাদের ঘাটিতে ঢুকে তাদের ইমামকে খুলে নিয়ে গেল। আর ফ্রাসোয়াকেও বন্দী করে নিয়ে গেল। তোমরা কি করছিলে?’ ‘বাধা দিতে গিয়ে আমাদের দু’জন খুন হয়েছে ইদেজায়।’ ‘এবং কুন্তে কুম্বায় দু’জন। ওদের কেউ মারা যায়নি?’ ‘না। ওদের কেউ মারা যায়নি।’ ‘আচ্ছা, বলত ঘটনা। শুনি কি করে ঘটতে পারল এই অসম্ভব ঘটনা।’ ফাদার জেমস কুন্তে কুম্বার সব ঘটনা এবং ইদেজাতে যেভাবে যা ঘটেছিল সবিস্তারে সব বর্ণনা করল। ফাদার জেমস কথা শেষ করে থামতেই পিয়েরে পল বলে উঠল, ‘দেখা যাচ্ছে গোটা বিপর্যয়, ঘটেছে মাত্র একজন লোকের হাতে।’ ‘তাই তো দেখছি। কিন্তু কুন্তে কুম্বা তো দুরে, ক্যামেরুনের কোথাও তো এ ধরণের লোক গত দশ বছরে আমাদের চোখে পড়েনি।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক। ‘লোকটিকে আপনি দেখেছেন?’ জিজ্ঞেস করল পিয়েরে পল ফাদার জেমস কে। দেখেছি। ‘বলুন তো লোকটা কেমন?’ বল পিয়েরে পল। ‘লোকটা ফর্সা এশিয়ান। তুর্কিদের সাথেই তার চেহারার মিল বেশী।’ ‘ঘন কাল চুল মাথায়?’ বলল পিয়রে পল। ‘হ্যাঁ।’ ‘চুল কিছু কোকড়ানো?’ ‘ঠিকই বলেছেন।’ ‘মুখের চেহারায় কি শিশু সুলভ সহজ ভাব?’ ‘হ্যাঁ।’ বলল জেমস। পিয়েরে পল মুখ ঘুরিয়ে তাকাল ফ্রান্সিস বাইকের দিকে। বলল, ‘তাহলে আহমদ মুসা সেদিনের গাড়ি বিস্ফোরণে মরেনি। এই চেহারা নিঃসন্দেহে আহমদ মুসার। বুঝা যাচ্ছে, কুমেটে আমাদের ঘাটিতে সেদিন আহমদ মুসাই তাহলে হানা দিয়েছিল।’ ‘আমি বুঝতে পারছিনা মিঃ পল এই ওমর বায়ার সাথে আহমদ মুসার কি সম্পর্ক? আহমদ মুসার সাথে আমাদের কোন শত্রুতা নেই! তাহলে সে আমাদের পিছু ছাড়ছে না কেন?’ ‘মিঃ ফ্রান্সিস বাইক আহমদ মুসাকে আপনি চিনতেই পারেননি। সে তো জাতির জন্যে কাজ করছে। ওমর বায়া তার জাতির একজন। আমরা ওমর বায়ার শত্রু মানে তার শত্রু।’ বলল পিয়েরে পল। পিয়েরে পল আবার ফিরল ফাদার জেমসের দিকে। বলল, ‘ফ্রাসোয়া বিবসিয়ের’কে ওরা ইদেজা থেকে ধরে নিয়ে গেছে, দু’জনকে হত্যা করে গেছে, জন স্টিফেনসহ ১৬জনকে কুন্তে কুম্বায় বন্দী করে রেখেছে-এই বিষয়গুলো আপনারা পুলিশকে জানিয়েছেন তো?’ মুখটা ম্লান হয়ে গেল ফাদার জেমসের। বলল, ‘আমরা গিয়েছিলাম থানায় মামলা দায়ের করতে। কিন্তু দেখা গেল, তারা আগেই মামলা দায়ের করে গেছে।’ ‘ওরা কি মামলা দায়ের করেছে?’ বলল পিয়েরে পল। ‘ওরা ঐদিন পরপর দুইটি মামলা দায়ের করেছে। প্রথমটিতে মূল অভিযোগ, জন স্টিফেন ও ফ্রাসোয়া বিবসিয়েরের নেতৃত্বে জনা বিশেক সশস্ত্র লোক কুন্তে কুম্বার উপর আক্রমণ চালায়। এলাকাবাসী চারদিক থেকে ছুটে এসে ওদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। প্রতিরোধের মুখে ওরা কয়েকটি লাশ সহ পালিয়ে গেছে। ওদের দুটি গাড়ি আটক করা হয়েছে। আর ২য় মামলায় বলেছে, ওরা ইদেজা থেকে কুন্তে কুম্বায় আক্রমণ করতে এলে সুযোগ পেয়ে ওরা কিডন্যাপ করে রাখা আমাদের ইমাম আলী ওকেচুকু ওদের দু’জন লোককে পরাভুত করে পালিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। আমরা তার নিরাপত্তাহীনতার ভয় করছি।’ ‘তার মানে ওরা জন স্টিফেন সহ আমাদের ১৬জন লোককে যে বন্দী করে রেখেছে এবং ইদেজা ঘাটিতে এসে আমাদের দু’জনকে হত্যা করে ফ্রাসোয়া বিবসিয়েরকে ধরে নিয়ে গেছে সব অস্বীকার করছে।’ চিৎকার করে উঠল ফ্রান্সিস বাইক। ফাদার জেমস কোন কথা বলল না। ‘সাংঘাতিক ব্যাপার। আপনারা ওদের মুক্ত করার জন্যে ওখানে আর অভিযান করেননি?’ বলল পিয়েরে পল। ‘আমরা লুলমডোর, ম্যালমায়া, ইবোলোয়া এবং ক্রিবি ঘাঁটির সাথে আলোচনা করেছি। তারা সব শুনে বলেছে, বড় ধরনের যুদ্ধ ছাড়া কুন্তে কুম্বায় এখন ঢোকা যাবে না। ওদের হাতে অনেকগুলো মেশিনগান, সাব মেশিনগান ও গোলা-গুলী চলে গেছে। এখন ওদের মোকাবিলা করতে গেলে বিরাট ক্ষয়-ক্ষতি হতে পারে। বড় ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়া এটা করা যাবে না। ইতিমধ্যে আমরা খবর পেলাম আপনারা ক্যামেরুন ফিরেছেন। ইয়াউন্ডি এসেছেন। তাই শুনেই এখানে ছুটে এলাম।’ ‘কি মনে করেন, বন্দীদেরকে কি ওরা মেরে ফেলতে পারে? বন্দী করার কথা যখন ওরা গোপন করেছে, তখন মেরে ফেলাই ওদের জন্যে স্বাভাবিক।’ বলল পিয়েরে পল। ‘না মেরে ফেলেনি। ইতিমধ্যে আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে স্যার। যার কারণে আরও বেশী ছুটে আসা এখানে?’ বলল ফাদার জেমস। ‘খারাপ কিছু? কি ঘটনা?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক। ‘কুন্তে কুম্বা থেকে ভায়া-মিডিয়া মেসেজ এসেছে, তাদের চারটি দাবী পূরণ হলে ওরা বন্দীদের ছেড়ে দেবে।’ ‘চারটি দাবী কি?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক। ‘তাদের প্রথম দাবী ইয়াউন্ডি হাইওয়ে থেকে দক্ষিণে ইদেজা অঞ্চলে জবরদস্তি ও ভুয়া দলিলের মাধ্যমে আত্মসাতকৃত সকল মুসলিম জমি ফেরত দিতে হবে। দুই, গত পাঁচ বছরে যাদেরকে এই অঞ্চল থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণসহ পূনর্বাসন করতে হবে। তিন, গোটা দক্ষিণ ক্যামেরুনে খৃষ্টানদের সত্যিকার মিশনারী সংস্থাগুলো থাকবে, কিন্তু সেবার নামে ষড়যন্ত্ররত এনজিও-দের তৎপরতা বন্ধ করে দিতে হবে। চার, ‘কোক’ কে তার সকল দুস্কর্ম লিখিতভাবে স্বীকার করতে হবে।’ ‘দাবীগুলো ও প্রতিশ্রুতি কি তারা লিখিতভাবে দিয়েছে? আমাদের দলিল প্রয়োজন, যাতে প্রমাণ হয় স্টিফেনরা তাদের হাতে বন্দী আছে।’ বলল পিয়েরে পল। ‘ওরা লিখিত কিছু দেয়নি। একটা অডিও ক্যাসেটে জন স্টিফেন তাদের দাবীগুলো আমাদের শুনিয়েছে। তারপর ক্যাসেট তারা ফেরত নিয়ে গেছে।’ বলল ফাদার জেমস। ‘জন স্টিফেনকে দিয়ে ওরা কথা বলিয়েছে?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘আর কিছু বলেছে?’ ‘পনের দিন ওরা সময় দিয়েছে। দাবী পূরণ না হলে বন্দীদের তারা কি করবে তা তারাই জানে।’ ‘ওদের কাজগুলো নিখুঁত দেখছি। আইনের দিক দিয়ে ওদের ধরার কোন পথ তারা রাখেনি। শক্তি প্রয়োগ করতে গেলেও ঝুঁকি আছে। বন্দীদের ওরা খুন করে ফেলতে পারে।’ বলল পিয়েরে পল। ‘কিন্তু এমন বুদ্ধি ওরা কোথায় পেল? ক্যামেরুনে বহুদিন কাজ করছি। এমন তো ঘটেনি?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক। ‘ভুলে যাচ্ছ কেন, ওদের মাঝে এখন আহমদ মুসা। তারই কাজ এসব।’ ‘আমরা এখন কি করব মিঃ পল?’ ‘চিন্তা করতে হবে। তবে অন্য কিছুর দিকে মন দেবার আগে ওমর বায়ার সম্পত্তির ফয়সালা করে ফেলতে হবে। আহমদ মুসা কুন্তে কুম্বায় ব্যস্ত থাকতে থাকতে আমাদের এই কাজটা শেষ করতে হবে।’ ‘ঠিক বলেছেন মিঃ পল।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক। বলে ফ্রান্সিস বাইক ফাদার জেমসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জন স্টিফেনদের ওরা কোথায় আটকে রেখেছে?’ ‘এটা জানার কোন উপায় নেই। ওদের এলাকায় এখন এমন পাহারা অপরিচিত কোন লোক সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না।’ বলল ফাদার জেমস। ‘পুলিশ পাঠানো যায় না?’ ‘পুলিশের সাথে আলোচনা করেছি। তারা ওদের কম্যুনিটি সেন্টার মসজিদ পর্যন্ত যেতে পারে। পুলিশ বলেছে, ওদের এলাকা সার্চের কোন সুযোগ পুলিশের নেই। কারণ, কেস গেছে ওদের পক্ষে। ওরা বাদী। ‘বুদ্ধিতে আপনারা পরাজিত হয়েছেন। এখন তার মাশুল তো দিতেই হবে।’ তীব্র ক্ষোভ ঝরে পড়ল ফাদার ফ্রান্সিস বাইকের কন্ঠে। একটু থেমে একটু শান্ত হয়ে ফ্রান্সিস বাইক বলল, ‘ঠিক আছে মিঃ জেমস আপনি যান। পরে কথা হবে আপনার সাথে।’ ফাদার জেমস চলে গেলে ফ্রান্সিস বাইক পিয়েরে পলের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না ওমর বায়ার লোকরা এত বড় ‘মিডিয়া ক্যু’ করল কি করে?’ ‘তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না পিয়েরে পল। শূন্য দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি এবং ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সীকে এ ধরনের নিউজ মাঝে মাঝেই করতে দেখা যাচ্ছে। এটা ওদের নিছক ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ না ওরা কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে তা দেখা প্রয়োজন। আপনি একটা ভালো বিষয়ের দিকে ইংগিত করেছেন। ও দু’টি সংবাদ মাধ্যমকে ভালো করে এক্স-রে করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমাদের ব্ল্যাক-ক্রস ইনটেলিজেন্স এবং ইসরাইলি ইনটেলিজেন্স এক সাথে কাজ করতে পারে। আমি এখনি আমাদের ইনটেলিজেন্স চীফ সাইরাস শিরাককে টেলিফোন করে দিচ্ছি।’ বলে টেলিফোন তুলল পিয়েরে পল। সাইরাস শিরাক থাকেন প্যারিস। ‘হ্যালো, শিরাক।’ টেলিফোন সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে বলল পিয়েরে পল। ‘ইয়েস স্যার।’ ওপার থেকে বলল সাইরাস শিরাক। ‘আজকের FWTV দেখেছ?’ ‘মনিটর করা হয়েছিল, আমি দেখলাম।’ ‘কি বুঝলে?’ ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে তারা এটা প্রচার করেছে।’ ‘তুমিও বলছ একথা?’ ‘কেউ নিশ্চয় করিয়েছে এটা।’ ‘কিন্তু সি এন এন কে দিয়ে কেউ করাতে পারে এটা?’ ‘না পারে না।’ ‘তাহলে কি বুঝছ?’ ‘বুঝতে পারছি FWTV-তে ইসলামী মৌলবাদের জীবাণু ঢুকেছে।’ ‘এই জীবাণু তোমাকে ধ্বংস করতে হবে।’ ‘বুঝেছি।’ ‘কাজ শুরু করে দাও। প্রথমে সন্ধান, তারপর চিহ্নিতকরণ এবং শেষ কাজ ধ্বংস করা।’ ‘শুরু করছি। ওদিকের কি খবর?’ ‘চীফ জাষ্টিসের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। কাজ হবে।’ ‘খুশীর খবর স্যার।’ ‘প্রভু যিশু সদয় হোন। রাখি।’ ‘ও, কে স্যার।’ ‘ও, কে। বাই।’ টেলিফোন রেখে ফ্রান্সিস বাইকের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমাদের শিরাক করিতকর্মা। সেও ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে।’ ‘ভালই হলো, সব দিকেই আমাদের নজর দেয়া দরকার।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক। ‘কিন্তু সবচেয়ে বেশী নজর রাখতে হবে রেডিও, টিভি, সংবাদ সংস্থা ও সংবাদপত্রের দিকে। এ চারটি সংবাদ মাধ্যমের আন্তর্জাতিক কোন চ্যানেলে মুসলমানদের ঢুকতে দেয়া যাবে না। ‘কিন্তু ওদের টাকার জোর তো কম নেই। আন্তর্জাতিক চ্যানেল তো ওরাও গড়তে পারে।’ ‘পারে। কিন্তু সেগুলোকে বাঁচতে দেয়া হবে না। যেমন ওদের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক নিউজ এজেন্সী’ (IINA) এবং ওদের মক্কা ভিত্তিক ‘ভয়েস অব ইসলাম’ বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়।’ কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল পিয়েরে পল। বলল, ‘বসুন, আমি আসছি। চীফ জাষ্টিসের সাথে কথা বলতে হবে।’ চীফ জাষ্টিস উসাম বাইকের ড্রইং রুম। পাশাপাশি দু’টি সোফায় বসেছিলেন চীফ জাষ্টিস এবং ল’সেক্রেটারী লাউস মেইডি। ল’সেক্রেটারী নতুন নিয়োগ লাভের পর চীফ জাষ্টিসের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্যে এসেছে। লাউস মেইডি এর আগে ছিলেন স্বরাষ্ট্র সেক্রেটারী। চা খেতে খেতে দু’জনে গল্প করছিলেন। FWTV- এর প্রোগ্রাম শুরু হলে তাদের গল্প থেমে গেল। ক্যামেরুন সংক্রান্ত ফিচার নিউজের ঘোষণা শুনে তারা অবাক হয়ে গিয়েছিল। পুরো ফিচার নিউজটি তারা দু’জনে সম্মোহিতের মত দেখল। চীফ জাষ্টিসের মুখে একটা প্রবল উত্তেজনার ছাপ। আর ল’সেক্রেটারীর চোখ তো রীতিমত ছানাবড়া হয়ে উঠেছে। নিউজ ফিচারটি শেষ হলে প্রথমে কথা বলল ল’ সেক্রেটারী লাউস মেইডি। বলল, ‘স্যার, ক্যামেরুনের মান-ইজ্জত সব ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে। এ ভয়ানক রিপোর্ট তারা কোথায় পেল।’ চীফ জাষ্টিসের মনে তখন অন্য চিন্তার ঝড়। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠেছে পিয়েরে পলের মুখ এবং পণ-বন্দী হিসেবে আটক ডঃ ডিফরজিসের মুখ। তার মনে পড়ল পিয়েরে পলের সাথে তার কথোপকথন এবং ডঃ ডিপরজিসের মুক্তির জন্যে পিয়েরে পলের প্রস্তাবে তার মৌন স্বীকৃতির কথা। এই নিউজ তো সব লন্ড-ভন্ড করে দেয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করল, ভাবল সে। মিশেল প্লাতিনির কথা তার মনে পড়ল। মনে পড়ল আহমদ মুসার কথাও। ওরা কি ওমর বায়া ও ডঃ ডিফরজিসকে সথাসময়ে উদ্ধার করতে পারবে? পুলিশের সাহায্য নেয়ার কথাও তার মনে হলো। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, তাতে নিস্ফল হৈ চৈ বাড়বে এবং ডঃ ডিফরজিসের জীবন তাতে বিপন্ন হতে পারে। তার পিতৃপ্রতিম ডঃ ডিফরজিসের মুখ তার মনের আকাশে ভেসে উঠল। কেঁপে উঠল উসাম বাইকের হৃদয়। সে কোন ভাবেই তার প্রিয় এ লোকটির জীবন বিপন্ন হতে দিতে পারে না। আবার তার কাছে FWTV এর নিউজ যে সঙ্কট সৃষ্টি করল তাও বড় হয়ে উঠল। ‘কোক’ এবং খ্রিস্টান এনজিও’রা খ্রিস্টান স্বার্থে বেআইনি কিছু করেছে এটা তার অজানা নয়, কিন্তু তার প্রকৃত রুপ যে এত ভয়াবহ তা সে কোনদিন কল্পনাও করেনি। ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডির প্রশ্নে চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের চিন্তায় ছেদ পড়ল। লাউস মেইডি থামার পর সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল না চীফ জাস্টিস। একটু ভাবল। বলল তারপর, ‘এ ভয়ানক রিপোর্ট তারা কোথায় পেল তার চেয়ে বড় কথা হল, যা বলল তা সত্য কিনা। যদি সত্য হয়, তাহলে ইজ্জত আর আছে কোথায়?’ ‘সব কথা সত্য বলাও কঠিন, মিথ্যা বলাও সম্ভব নয় স্যার।’ ‘কেন?’ ‘তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাবে না।’ ‘স্পেসিফিক ঘটনার সত্য-মিথ্যা তদন্ত-সাপেক্ষে হতে পারে। কিন্তু মূল অভিযোগ সত্য কিনা? কোক দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে মুসলমানদের সমূলে উচ্ছেদ করেছে কিনা? জোর করে মুসলিম ভূমি ক্রয় ও আত্মসাৎ করেছে কিনা?’ ‘এই মূল অভিযোগ সত্য স্যার। তিন বছর আমি স্বরাষ্ট্র বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম। আমার অনেক সরেজমিন অভিজ্ঞতা রয়েছে।’ ‘কিন্তু প্রশাসন এর প্রতিকার কি করেছে?’ ‘স্যার অন্য কোন জায়গায় হলে বলতাম, প্রশাসন এর কাছে এসব ঘটনা আসেনি, প্রশাসন কি করবে? কিন্তু এ কথা আপনার কাছে বলতে পারি না। আসলে প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করেছে। এ না করে উপায়ও ছিল না।’ ‘একথা কি আসলেই সত্য?’ ‘স্যার, আমাদের দলে ও সরকারে ওরা সংখ্যা গরিষ্ঠ নয়, কিন্তু প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে নিরঙ্কুশ। তাছাড়া দেশের খ্রিস্টান এনজিও এবং সংস্থা-সংগঠনসমূহ গ্রাম ও শহরের অধিকাংশ ভোট নিয়ন্ত্রণ করেছে। সুতরাং এরা যা চায়, সরকার এবং দল তার বাইরে যেতে পারে না। দ্বিতীয়ত, বাইরের দাতা দেশ ও সংস্থা গুলো প্রায় সবই খ্রিস্টান। তারা খ্রিস্টান এনজিও ও সংস্থাগুলোকেই বেশি বিশ্বাস করে। সুতরাং সরকার ঘরে বাইরে সব দিকে থেকেই অব্যাহত চাপের শিকার, যা উপেক্ষা করার সাধ্য সরকারের নেই।’ ‘এ সবের কিছু কিছু আমিও জানি। কিন্তু এখন ঐ পশ্চিমা দাতা দেশগুলো এবং তাদের সংস্থা-সংগঠনগুলোই তো মানবাধিকার এর স্লোগান তুলে সরকারের উপর চড়াও হবে। যে কারন আপনি শুরুতেই সরকারের ইজ্জতের ভয় করেছেন।’ ‘না, পশ্চিম এর সবাই এটা নিয়ে হৈচৈ করবেনা। দেখুন না আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা পড়ল। তাতে কয়েকজন লোক মারা গেল, কিন্তু গায়ে কোন আঁচড় পড়ল না বিল্ডিং এর। এটা নিয়ে কি হৈচৈ। ঘটা করে অপরাধীর বিচার হল, শাস্তি হল। কিন্তু সেই আমেরিকায় ওকলাহোমার সিটি সেন্টারে বোমা পড়ল। লোক নিহত হল প্রায় শ-এর কাছাকাছি। বিল্ডিং এমন ক্ষতিগ্রস্ত হল যে, বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিং ধ্বসিয়ে দিতে হল। কিন্তু ঘটনার ঘটা করে তদন্তও হল না। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিচারও হল না। এরকমটা কেন হল? কারন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ঘটনায় আসামি ছিল মুসলমান এবং ওকলাহোমার ঘটনায় আসামি ছিল খ্রিস্টান। আমাদের ক্ষেত্রেও এটাই ঘটবে। কথা, সমালোচনা কিছু হবে না তা নয়, কিন্তু সেটা হবে অনেকটা লোক দেখানো। তবে ভয় হল মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে। তারা অথবা তাদের সংস্থা-সংগঠনগুলো বিরাট রকমের হৈচৈ করবে। বিষয়টা জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে উঠবে এবং জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনও সক্রিয় হয়ে উঠবে। তাদের সাথে সাথে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার প্রতিনিধিরাও ক্যামেরুনে ছুটে আসবে। আমি আমাদের বেইজ্জতির কথা বলেছি এসব ভেবেই।’ ‘এই পরিস্থিতিতে কি ভাবছেন? দুটো বিষয় এখন আমাদের সামনে। একটা দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে মুসলিম উচ্ছেদের বিরাট অভিযোগ। অন্যটি ওমর বায়ার পরিবার সম্পর্কিত ঘটনা।’ ‘আমাদের মাথা কিছু ঘামাতে হবে প্রথম বিষয়টা নিয়ে। ওমর বায়ার পরিবারের ব্যাপারটা ওরা রিপোর্টে বললেও আমাদের সামনে নেই। এব্যাপারে বন্দী হিসেবে কেউ আমাদের কাছে আসছে না। সুতরাং ঐ ব্যাপারে আমরা চুপ থাকতে পারি স্যার।’ চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক একবার ভাবল, ওমর বায়ার ঘটনা ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডিকে বলেই ফেলি। কিন্তু পরক্ষনেই তার মনে হল, এ নিয়ে সরকারিভাবে কোন তৎপরতা শুরু হলে ওরা ডঃ ডিফরজিসকে মেরেই ফেলবে। প্রশাসন শুধু হৈচৈ ছাড়া তাকে উদ্ধারের কিছুই করতে পারবে না। তার কাছে এখন ডঃ ডিফরজিসের উদ্ধারই সবচেয়ে বড়। ‘প্রথম বিষয়টা নিয়ে এখন কি করার আছে?’ ‘প্রতিকারমূলক কিছু করার সুযোগ আমাদের কমই আছে। ইচ্ছা করলে কিছু করতে পারে কোক এবং অন্যান্য খ্রিষ্টান সংস্থাগুলো। আমরা উদ্বাস্তু সম্পর্কিত অভিযোগের খোঁজ-খবর নিতে পারি, ভুমি রেজিস্ট্রি রেকর্ড আমরা চেক করতে পারি এবং বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করতে পারি, অভিযোগ শুনতে পারি।’ ‘তাছাড়া বিভিন্ন থানায় মুসলমানদের অভিযোগগুলোর খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা যেতে পারে।’ ‘জি স্যার, এটাও আমরা পারি।’ ‘আমার মনে হয়, এসব যদি আমরা করি, কোকসহ খ্রিষ্টান এনজিও এবং মিশনারিদের উপর একটা চাপ পড়বে। তারা এ ব্যাপারে আমাদের দোষ দিতে পারবে না। কারন তারা বুঝবে আমরা চাপে পড়ে করছি। অন্য দিকে এসব করে আমরা জাতিসংঘ ও মুসলিম দেশগুলোকেও একটা বুঝ দিতে পারবো।’ ‘ঠিক বলেছেন স্যার।’ বলে লাউস মেইডী হাতের ঘড়ি দেখল। তারপর বলল, ‘স্যার আজকের মত উঠি।’ ‘ঠিক আছে। খুব খুশি হলাম আপনি এসেছেন।’ দু’জনেই উঠে দাঁড়াল। ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডিকে বিদায় দিয়ে চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এসে তার স্টাডিতে ঢুকলেন। বসলেন পড়ার টেবিলে। ঠিক এসময়েই তার টেলিফোন বেজে উঠল। কর্ডলেস টেলিফোন হাতে তুলে নিলেন তিনি। টেলিফোনে পার্সোনাল সেক্রেটারির কণ্ঠ পেয়ে তিনি বললেন, ‘বল’। ‘স্যার, ফ্রান্স থেকে আসা সেই লোকটি কথা বলতে চায়।’ বলল চীফ জাস্টিসের পার্সোনাল সেক্রেটারি। ‘দাও লাইন।’ ‘গুড ইভেনিং। আমি পিয়েরে পল মাই লর্ড। সেদিন আপনার বাসায় গিয়ে কথা বলেছিলাম।’ ‘গুড ইভেনিং। বলুন।’ ‘মাই লর্ড, আমি জানতে চাচ্ছি, আমরা কবে আমাদের কাজটা শেষ করতে পারি।’ ‘FWTV আজ ক্যমেরুন এর উপর যে ফিচার নিউজ প্রচার করেছে, সেটা দেখেছেন?’ ‘ইয়েস মাই লর্ড।’ ‘এই নিউজে আমাকে, আমার আদালতকে টার্গেট করা হয়েছে বুঝতে পেরেছেন?’ ‘কিন্তু তার চেয়ে বড় টার্গেট করা হয়েছে আমাদের।’ ‘স্বার্থের কারনে সেটা আপনারা বরদাশত করতে পারছেন।’ ‘মাই লর্ড স্বার্থ আমাদের নয়, স্বার্থ প্রভু খ্রিষ্টের, তাই সবার।’ ‘আমি তর্ক করব না। তারপর বলুন।’ ‘মাই লর্ড আমি বলেছি। কাজটা আমরা তাড়াতাড়ি শেষ করতে চাই। ডেটটা কবে হতে পারে?’ ‘FWTV এর আজকের নিউজের পর সত্তর কিছু করা যাবে না। অপেক্ষা করতে হবে।’ ‘কিন্তু আপনার পিতা ডঃডিফরজিসের মুক্তি তাতে বিলম্বিত হবে। তাছাড়া অনির্দিষ্ট ভাবে তাকে এইভাবে আমরা রাখতে চাই না। হয় আপনি তাড়াতাড়ি তাকে মুক্ত করবেন। না হলে আমরা তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়ে মুক্ত হবো।’ পিয়েরে পলের কথা শুনে কেঁপে উঠল চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের হৃদয়। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘তার ক্ষতি করে আপনারা কি লাভ করবেন?’ ‘লাভ করার পথ বের করব। দেখুন, আপনি অত্যন্ত সম্মনিত বাক্তি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য অর্জনে আপনি বাঁধা দিলে সব ধরনের অসম্মানের কাজ আমরা করতে পারবো।’ আবার বুকটা কেঁপে উঠল চীফ জাস্টিসের। তার বুঝতে বাকি রইলনা পিয়েরে পল কি বলতে চাচ্ছে। চীফ জাস্টিসের উত্তর দিতে একটু দেরি হল। কথা বলল আবার পিয়েরে পলই। বলল, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে এক ডঃ ডিফরজিস নয়, শত ডঃ ডিফরজিসকে কিডন্যাপ করতে পারি। আমার অনুরোধ মাই লর্ড, আপনি FWTV কি বলল সেটা একদম ভুলে যান।’ ‘আমি ভুলে গেলেই তো বিষয়টা মিথ্যা হয়ে যাবে না। কিংবা যারা ওটা করিয়েছে তারা বসে যাবে না।’ ‘ওসব নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই মাই লর্ড। আমাদের সমস্যা আপনি, আপনি ঠিক হয়ে গেলে আর কোন চিন্তা নেই।’ একটু থামল পিয়েরে পল। একটা ঢোঁক গেলার জন্য। পরক্ষনেই আবার শুরু করল, ‘কথা আর বাড়াতে চাই নি মাই লর্ড। আমরা কাজ শুরু করে দিচ্ছি। আমাদের লোকরা ওমর বায়ার পক্ষ থেকে তার মামলা প্রত্যাহার এবং উইল বাতিলের একটা দরখাস্ত দেবে। আমরা চাই আপনি সত্তর একটা ডেট দেবেন।’ কথা শেষ করে ‘থ্যাংস মাই লর্ড’ বলে চীফ জাস্টিসকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে টেলিফোন রেখে দিল। অপমানে-উদ্বেগে পাথরের মত হয়ে গেলেন চীফ জাস্টিস। টেলিফোনটা কানে যেভাবে ধরেছিল, সেভাবেই ধরে থাকল। চোখে-মুখে অসহনীয় অপমান ও প্রবল উদ্বেগের কালোছায়া। চীফ জাস্টিসের মেয়ে রোসেলিন ঘরে প্রবেশ করল। সে তার পিতাকে দেখে ভীত হয়ে পড়ল। সে দ্রুত এগিয়ে তার পিতার কাঁধে হাত রাখল। ডাকল, ‘আব্বা।’ চীফ জাস্টিসের হাত থেকে টেলিফোনটা পড়ে গেল। চমকে উঠে নড়ে-চড়ে বসল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক। রোসেলিন টেলিফোনটা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে বলল, ‘তোমার কি হয়েছে আব্বা? অসুস্থ বোধ করছ?’ রোসেলিনের চোখে-মুখে উদ্বেগ। চীফ জাস্টিস হাসতে চেষ্টা করে বলল, ‘না মা আমি ভাল আছি।’ ‘তাহলে নিশ্চয় তুমি খারাপ টেলিফোন পেয়েছো?’ ‘হ্যাঁ মা।’ ‘সত্যি? কি সেটা? কোত্থেকে?’ আবার উদ্বেগ ঝরে পড়ল রোসেলিনের কন্ঠে। মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলল, ‘কত রকম কেস করি মা। তুমি এসব নিয়ে ভেব না।’ ‘তুমি ভাববে, আর আমি ভাবব না?’ ‘মেয়ের ভাবনা তো তার পিতারাই ভাবেন মা।’ ‘তা ঠিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্র আছে যখন মেয়েরা ভাবনার কিছু অংশ পাওয়ার দাবী করতে পারে।’ ‘তুমি একটা সহযোগিতা আমাকে করবে মা?’ ‘সেটা কি?’ চীফ জাস্টিস মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোমাকে একটু সাবধানে থাকতে হবে মা।’ ‘কেমন সাবধানে?’ ‘বাইরে একটু কম বেরুবে। বেরুলে রাতে বেরুবে না, সম্ভব হলে একা বেরুবে না। এই রকম।’ রোসেলিন পিতার দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, ‘তুমি খারাপ কিছু আশংকা করছ? কিন্তু তোমার আমার তো কোন শত্রু নেই!’ ‘বললাম তো। কত রকম কেসের সাথে আমি জড়িত। আমি কাউকে শত্রু না ভাবলেও, কেউ আমাকে তার স্বার্থের শত্রু ভাবতে পারে।’ ‘বুঝেছি আব্বা।’ ম্লান কন্ঠে বলল রোসেলিন। ‘ভেবনা মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ বলে একটু থামল চীফ জাস্টিস। তারপর বলল আবার, ‘মারিয়াদের সাথে এর মধ্যে কথা বলেছ? লাগাও তো টেলিফোন ওদের ওখানে। আমি মশিয়ে প্লাতিনির সাথে একটু কথা বলব।’ রোসেলিন বলল, ‘নাম্বারটা নিয়ে আসি আব্বা। আমি কালকেই কথা বলেছি মারিয়ার সাথে।’ বলে রোসেলিন ছুটে বেরিয়ে গেল স্টাডি রুম থেকে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ২০.অন্ধকার আফ্রিকায় (২)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন