বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শেষ বাস জেনার-রহস্য গল্প

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান MD.Belal Hosan (০ পয়েন্ট)

X 'ভাই আর একটু জোরে চালা তো।'- আমি রিক্সাওলাকে তাড়া দেই। মফস্বল শহরে রাত বারটার দিকে বাস আশা করা ঠিক না। তার পরেও কেন জানি মনে হচ্ছে শেষ বাসটা হয়ত একটুর জন্য মিস করব। তাই এই তাড়াহুড়া। হয়তো শুনব একমিনিট আগে ছেড়ে গিয়েছে শেষ বাস। বাস স্টেশন অন্ধকার, মনে হচ্ছে ইলেকট্রিসিটি নেই। মরার উপর খাড়ার ঘা আরকি! আশেপাশে তাকিয়ে কোন জনমানব চোখে পড়লনা। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। আজ সকাল থেকেই কুফা যাচ্ছে। কাল সকালে ঢাকায় না পৌছুতে পারলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। রিক্সাওয়াল কে বিদায় করে দাড়িযে রইলাম। দেখা যাক, যদি কোন ট্রাকও পাই তাও রওনা হয়ে যাব আল্লাহ ভরসা করে। অষ্পষ্টভাবে শব্দগুলো কানে যেতেই কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। বাসের গায়ে চাপড় দিয়ে ডাকাডাকির শব্দ বলে মনে হল। আমি একটু সামনে এগুলাম। হ্যা, ঠিকই। বাসের হেলপার সম্ভবতঃ বাসের গায়ে জোড়ে চাপড়াচ্ছে আর প্যাসেন্জার ডাকছে। প্রায় সব বাসগুলোই এই কাজ করে। প্যাসেন্জার না পেলে স্ট্যান্ড থেকে একটু দুরে দাড়িয়ে ডাকাডাকি করতে থাকে। বেশী প্যাসেনজারের আশায়। আমি দ্রুত এগুতে থাকি। ’এই বাস এই।’ - আমি দু একবার হাকও দিলাম। ’আমাকে নিয়ে যাও। দাড়াও, আমাকে নিয়ে যাও।’ আশ্চর্য। যতই এগুতে থাকি মনে হয় বাস ঠিক তত দুরেই রয়ে গেছে। ছেড়ে চলে গেল নাকি? আমি হতাশ হয়ে দাড়াতেই আবারও শুনলাম বাস চাপড়ানোর শব্দ। আমি আবছা অন্ধকারে এবার দৌড়াতে লাগলাম। ’এই দাড়াও এই দাড়াও।’ আমি এগুতে থাকি। আশ্চর্য। সেই একই ঘটনা। বেটা ড্রাইভার কি আমাকে নিয়ে ইদুর বেড়াল খোলা শুরু করল নাকি? কতক্ষন দৌড়ালাম জানিনা। হঠাৎ বাসের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। অন্ধকারে খেয়ালই করিনি। বাসের ভিতরে কোন আলো নেই। দরজার সামনে গিয়েও কাউকে পেলাম না। কি ব্যাপার এই বাসটাই কি প্যাসেন্জার খুজছিল? নাকি অন্যটা। বাসের গেটে পা দিতেই হঠাৎ যেন প্রান ফিরে পেল বাসটি। এক মুহুর্ত আগেও যেটাকে মনে হচ্চিল জনশুন্য। আমি উঠার পর হঠাৎ সে দৃশ্য পাল্টে গেল। আবার হেলপারের সেই ডাক। বাসের ভেতরে যাত্রীদের কথোপকথন। মাঝারি সাইজের বাস। ভিতর ১৮ থেকে ২০ জনের মত লোক হবে। সবাই যার যার মত বসে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে। আমি উঠে পিছনের দিকে গেলাম। একেবাওে শেষ সিটটা একদম খালি দেখে ওখানে বসলাম। দৌড়ে ঘেমে গেছি। একটু রেস্ট নিয়ে নেই। ’এই যে ভদ্রলোক, এই’ - কেউ আমার জামা ধরে টান দিল মনে হল! আমি জানালা দিয়ে উকি দিলাম। অন্ধকারে ঠিকমত দেখা যাচ্ছেনা। তবে বুঝলাম বাসের হেলপার আমাকে জানালা দিয়ে ডাকছে। ’কি হয়েছে’- আমি জিজ্ঞেস করি। সামনে মানুষের ছায়া। সম্ভবতঃ হেলপার। ’আপনে এই বাসে উঠছেন ক্যান? আপনে এই বাসে যাইতে চান কেন?’ - জিজ্ঞেস করে ছায়ামুর্তি। ’কেন অসুবিধা কি? এটা কি রিজার্ভ বাস? দেখ আমি খুব সমস্যায় পড়েছি। আমার খুব যাওয়া দরকার’ - আমি সাফাই গাইতে থাকি। ’আমরাই তিনদিন ধইরা যাইতে চেষ্টা করতাছি তা পারতাছিনা। আর আপনে আইজকা আইসাই যাইতে চাইতাছেন?’ - কে যেন ভিতর থেকে বলে উঠল কথাগুলো। সম্ভবতঃ বাসের ভিতর থেকে কোন প্যাসেনঞ্জার। ’আপনি নামেন।’ - হেলপার আমাকে তাড়া দেয়। ’দেখ আমাকে যেতেই হবে। দরকার হলে দ্বিগুন ভাড়া দেব। আর বাস তো খালিই পড়ে আছে। তোমাদের সমস্যা তো ঠিক বুঝলাম না।’ ’সমস্যা আমাদের না। আপনারই হইবো। ভাল চান তো নামেন’ - হেলপার বলে উঠে। আমি পাত্তা দিলাম না। মাঝে মাঝে এরা এরকম ফালতু আচরন করে থাকে। ’আচ্ছা বাসটা এত দেরী করছে কেন?’ বাসের ভিতরেই প্রশ্নটা ছুড়ে দিলাম। ’আমাদের আর একজন বাকি আছে। ও এখনো আইসা পৌছায় নাই।’ - আবারো ভেতর থেকেই কেউ একজন বলে উঠল। - ’এই বুইড়ারে নিতে গিয়াই বাসটা দেরী কইরা ফালায়। সে জন্যই’- এপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। - ’তারপরও কেন যে বুইড়া দেরী কইরা আসে’ কি মুশকিল। প্যাসেন্জার বাস আবার একজনের জন্য দাড়িয়ে থাকে নাকি? আমি ভাবতে থাকি। আচ্ছা ডাকাত দল নয়তো! কিছুদুর গিয়ে বাস ডাকাতি শুরু করবে? আমার কাছে তেমন টাকা পয়সা নেই। আসলে বলতে গেলে কিছুই নেই। তাই ভয় পাওযার কোন কারনই নেই। যা হবার হবে। পেছনেই বসে থাকব বলে ঠিক করলাম। বিপদ দেখলে জানালা দিয়ে পগার পার হতে চেষ্টা করব। ’ঐ খাড়া। আমি আইয়া পড়ছি।’ - বাইরে কারো চিৎকার শোনা যায়। একজন বৃদ্ধ। এর জন্যই কি এতক্ষন দেরী করল বাসটি? কারন বৃদ্ধ উঠতেই মূহুর্তে তুমুল বেগে ছুটে চলল বাস। ধীরে ধীরে বৃদ্ধ লোকটি বাসের পেছন দিকে চলে আসল। আমার ঠিক সামনের সিটে বসার আগে এক মুহুর্তের জন্য তার সাথে চোখাচোখি হল আমার। তার চোখ দেখে ভয়ানক চমকে গেলাম আমি। নির্জিব ঘোলা দুটি চোখ! মুহুর্তেই গাড়ীর ভেতরে অন্ধকার নেমে এল। খুব সম্ভবতঃ বাতি নিভিয়ে দিয়েছে ড্রাইভার! কিন্তু ঐ চোখ দুটো অমন কেন? ও কি অন্ধ? আমি একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। সারাদিনের ক্লন্তি ভর করল আমার উপর। কতক্ষন কেটে গেল জানিনা। হঠাৎ সম্পুর্নরুপে তন্দ্রার ঘোর কেটে গেল। চারিদিক নিঝুম অন্ধকার, কোন সাড়া শব্দ নেই। আমি যেন উড়ে চলেছি অন্ধকারে! চারিদিকে কিছু চোখে পড়লনা। আমি তো বাসের ভিতর থাকার কথা। বিষয়টা কি? দ্রুত উঠে দাঁড়াতেই আবার বাসের ভিতর আলো জলে উঠল। ঠিক আগের মত করে প্রান ফিরে পেল যেন বাসটি! ধেৎ, খুবসম্ভবতঃ ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম। আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। কতক্ষন ঘুমিয়েছি বলতে পারবনা। হঠাৎ জোরে হুইসেলের শব্দে কানে তালা লেগে গেল। ট্রেনের হুইসেল না? চারপাশে আবারো সেই অন্ধকার। চিৎকার চেচামেচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। ’আরো জোরে যা, আরো জোরে’ ’আইজকা পার হইতেই হইব’ ’জোরে চালা’ ’আমার আইজকা যাইতেই হইব’ ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎ আমার সামনেই মনে হল সেই বৃদ্ধের গলা শুনলাম। - জোরে চালা বাবা, আইজকা পার কইরা দে বাবা, আইজকা পার কইরা দে।’ কানের কাছের ট্রেনের একটানা হুইসেল আরো বিকট হয়ে বাজছে। - ’অই ড্রাইভার, জোওে চালা।’ - বুড়ো তাড়া দিচ্ছে ড্রাইভারকে। আমি আন্দাজে জানালার দিকে যাবার জন্য চেষ্টা করলাম। সংঘর্ষের বিকট আওয়াজটা কানে যাবার ঠিক আগমুহুর্তে বৃদ্ধের চিৎকার কানে বাজল ’আইজকাও পারলিনা হারামজাদা।’ তারপর আর কিছু মনে নেই। ************************************* ’ভাই আপনে কেডা? বাসের ভিতরে কি করেন?’ - অস্পস্ট কন্ঠের আওয়াজ কানে যেতেই আমি ধরমরিয়ে উঠে বসলাম। কোথায় আমি? মুখের উপর কেউ ঝুকে ছিল। আমি উঠে বসতেই সোজা হয়ে দাড়াল। ছেড়া গেন্জী গায় লুঙ্গি পরিহিত মধ্যবষস্ক একজন মানুষ। চারিদিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলাম। একটা ভাঙা চোরা বাসের ভিতরে আধশোয়া আমি। মুহুর্তেই মনে পড়ে গেল সব। বাস এ্যাক্সিডেন্ট করেছে। সৌভাগ্য আমার আমি বেঁচে আছি। নিজের হাত পা নাক মুখ সব এক নজরে দেখে নিলাম। কপাল ভালো আমার কোথাও কোন চোট লাগেনি। তবে আশ্চর্য হলাম আমি ছাড়া আর কেউ ভিতরে নেই দেখে। সবাই বের হয়ে গেছে? আমি একাই পড়ে আছি? লোকটির সাহায্য নিয়ে বাসের ভিতর থেকে বের হযে এলাম। রেল লাইনের ঠিক পাশে প্রায় দুখন্ড হয়ে রয়েছে বাসটি। পেছনের খন্ডে ছিলাম আমি। গতকাল রাতে এই বাসেই উঠেছিলাম আমি। দুমরে মুচড়ে গেলেও চিনতে পারলাম। একটু সামনে রেল ক্রসিং দেখতে পেলাম। ট্রেনটি বাসটিকে এতদুর পর্যন্ত টেনে হিচড়ে নিয়ে এসেছে! আশ্চর্যের ব্যাপার আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। এতবড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল আর কেউ এলনা এখানে? নাকি সবাইকে বের করে নিয়ে গেছে? আমাকে কেউ খেয়াল করেনি? ’আচ্ছা, বাসের অন্যান্য যাত্রীদের কি অবস্থা? কেউ কি মারা গেছে?’ - আমি জিজ্ঞেস করি লোকটিকে। লোকটি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাল। আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করল - 'আপনে কে কনতো? ভাঙ্গা বাসে ঢুকছিলেন ক্যান এত সকালে?’ ’তুমি কে আগে সেইটা বল? বাসের সব যাত্রীরাই বা কোথায় গেল?’ - আমি আসলে কিছুই মেলাতে পারছিনা। ’দেখেন মালিক সাব আমারে বাসের পাহারাদার বসাইছে। কেউ যাতে কিছু চুরি না কইরা নিয়া যায় সেইটা দেখার জন্য। আপনেরে দেইখা তো ভদ্রলোকই মনে হইতেছে। বাসে উঠছিলেন ক্যান সেইটা কন’ এই ব্যাটার আচরন রহস্যময়। কিছু একটা গুব্লেট হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। - ’আরে বোকা তুমি বুঝতে পারছনা গাড়িটা রাতে এক্সিডেন্ট করেছে আর আমি ভাগ্যগুনে বেঁচে গেছি।’ - আমি বোঝানোর চেষ্টা করি লোকটিকে। আবারো অদ্ভুত সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাল লোকটা আমার দিকে। - ’দেখেন উল্টাপাল্টা কথা কইয়েননা। তিনদিন ধইরা গাড়ীর ভিতরে পইরা রইছেন আর কেউ দেহে নাই কইবার চান?’ এনবার আমার অবাক হবার পালা। ’তিনদিন মানে? আমিতো গতকাল রাতে বাসে উঠেছিলাম।’ - আচ্ছা এই লোক উল্টাপাল্টা কথা বলছে কেন। আমি চারিদিকে আর কেউ আছে কিনা দেখলাম। ’আফনে আহেন তো আমার সাথে। মাস্টারের সাথে কথা কই।’ - লোকটি আমার হাত টানতে লাগল। ’মাস্টারটা আবার কে?’ - আমি ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলাম। ব্যাটা একটা আস্ত পাগল। ঐ যে ’আঙ্গুল তুলে ক্রসিংএর পাশে রেলএর ঘরটা দেখাল। চলেন লাইন মাস্টারের লগে কথা কই। গুড আইডিয়া। এই পাগলের সাথে কথা বলার চেয়ে মাস্টারের সাথে কথা বলাই উত্তম। আমিও রাজি হলাম। ’কিরে ব্যটা রমজাইন্যা ডাকস ক্যান’।' - লোকটির ডাকে ভিতর থেকে রেলের পোষাক পরা একজন - খুব সম্ভবতঃ ক্রসিংএর ডিউটিরত গার্ড হবে - বের হয়ে এল। ’দেখেন এই লোক’ - আমার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাল সে - ’আমাগো গাড়ির পিছে শুইয়া আছিল সক্কাল বেলা। হেয় কয় হেও এক্সিডিন হইছে।’ আশ্চর্য! সেও সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। - ’আপনেরে দেইখা তো ভদ্রলোক মনে হয়। কি করেন আপনে?’ আমি বল্লাম। সব শেষে এও বল্লাম যে, গতকাল রাতে ঐ বাসে ছিলাম আমি এবং এক্সিডেন্ট এর কবলে পড়েছি। ওরা দুজন মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। - ’কথা সইত্য।’ - লোকটি বলতে শুরু করল। - ’এক্সিডিন হইছে। গার্ডের ভুলের কারনে খুব খারাপ এক্সিডিন হইছে। থানা পুলিশ অনেককিছু হইয়া গেছে। কিন্তু সেইডাতো গত পরশুদিন। ১১ তারিখ রাইতে। আর আইজতো ১৩ তারিখ তাইনা?’ সত্যিই আজ তের তারিখ। গতকাল সন্ধায় জরূরী ফোন আসে ঢাকা থেকে। রাতেই যেতে হবে। গতকাল ১২ তারিখ উপজেলা লেভেলে বড় একটা প্রোগ্রাম হয়েছে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। গত এক মাস ধরেই এই ১২ তারিখ আমার মুখস্ত। আমার নীরবতা দেখে লোকটি আবারো বলতে শুরু করল - ’আর গতরাইতে এতবড় এক্সিডেন্ট হইলে এইখানে মানুষ থাকতো না? আর লাশগুলা গেল কই? এত তাড়াতাড়ি উধাও হইয়া গেল?’ ’এবার আমার অবাক হবার পালা। লাশগুলো মানে? লোকজনও মরেছে নাকি?’ ’এতবড় একটা এক্সিডিন। মানুষ মরবো না? এয় কয়কি? এইখান থাইকা ছেঢ়ড়াইয়া বাসটা দুইটুকরা কইরা ফালাইলো আর আপনে ’- হতাশ শোনাল লোকটির গলা। আসলে সত্যিই। বেশ বড় এক্সিডেন্টই হয়েছে। রাতের ঘটনা একটুমনে করার চেষ্টা করলাম। ট্রেনের দ্রুত হুইসেল, বাস ট্রেন সংঘর্ষেও শব্দ, চিৎকার, কান্না - তারপর আর কিছু মনে নেই। কিন্তু এতবড় দুর্ঘটনায় আমার কিছুই হলনা? অবাক হয়ে ভাবি আমি। কোথাও একটু ছড়েও যায়নি আমার। আশ্চর্য!! ’হায় কপাল এ কিয়ের মইধ্যে পড়লাম সক্কাল বেলা’ - দেখি রমজান নামের লোকটিও অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ’খাড়ান খাড়ান, এক মিনিট। আপনেরে একটা জিনিস দেখাই।’ লোকটি মুহুর্তেও মধ্যে ঘরে ঢুকে একটা দৈনিক পত্রিকা নিয়ে এল। ’আইজ তো ১৩ তারিখ তাইনা? এইযে দেখেন ১১ তারিখের পেপার।’ - আমাকে পত্রিকার তারিখটা ভাল করে দেখিয়ে নিল আগে। দেখছেন তারিখ? এবার দেখেন। পুরো পত্রিকা মেলে ধরল সে। হেডিং দেখে তাজ্জব বনে গেলাম। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত। ঠিক নিচেই প্রকাশিত ছবিটা দেখে শিউরে উঠলাম আমি। সারি সারি লাশের ছবির; ইনসেটের ছবিটা চিনতে এতটুকু কষ্ট হলনা। সেই বৃদ্ধের মুখ - যে শেষ মুহুর্তে ড্রাইভারকে লক্ষ করে বলে উঠেছিল - ’আইজও পারলিনা হারামজাদা।’


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৬১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ শেষ বাস জেনার-রহস্য গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now

১৯.ক্রস এবং ক্রিসেন্ট (১)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X ডোনা তার আব্বার কোল থেকে মুখ তুলল। অশ্রু ধোয়া তার মুখ। কিন্তু চোখে তার অনেকটা লড়াকু ও বেপরোয়া দৃষ্টি। তার এই দৃষ্টি গিয়ে পড়ল এলিসা গ্রেসদের উপর। তাদের চোখ-মুখের বিস্ময়ভাবের দিকে চেয়ে ডোনা বলল, ‘আপনারা ভাবছেন, আহমদ মুসার কথা বলে কাঁদছি কেন? ভাবছেন, ওমর বায়ার নাম জানলাম কি করে?’ একটু থেমে একটা ঢোক গিলে নিয়ে ডোনা বলল, ‘আহমদ মুসা আমার সব, আমার জীবন। আর তার কাছেই আমি ওমর বায়ার নাম শুনেছি। তিনি ওমর বায়াকে উদ্ধার করতেই সেইন্ট পোল ডে লিউন-এ এসেছিলেন।’ বলে ডোনা উঠে দাঁড়াল এবং এলিসা গ্রেস ও পিয়েরাকে টেনে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসাল। তারপর লুই ডোমাসের দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনি ঐ চেয়ারটায় বসুন। দেখুন, এখানে কোন রাজা-প্রজা নেই, আমরা সবাই সমান। বসুন আপনি।’ পিয়েরা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং ডোনাকে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘এখানে রাজা-প্রজা নেই ঠিক, কিন্তু রাজা-প্রজার পরিচয় মিথ্যা হয়ে যায়নি, সময়ের পরিবর্তনে রক্ত পাল্টে যায় না।’ ডোনাকে বসিয়ে দিয়ে লুই ডোমাসের দিকে চেয়ে পিয়েরা বলল, ‘তুমি এস, বিছানায় বস।’ বলে পিয়েরা এলিসা গ্রেসের পাশে গিয়ে বসল। লুই ডোমাসও বিছানার এক প্রান্তে গিয়ে বসল। এলিসা গ্রেস, পিয়েরা, লুই ডোমাস তিনজনের চোখেই ডোনাকে ঘিরে একটা নতুন দৃষ্টি, মনে চিন্তার নতুন স্রোত। ডোনার ঋজুতা ও স্পষ্টবাদিতায় তারা মুগ্ধ। ডোনা ও আহমদ মুসার প্রতি তাদের মন নুয়ে পড়ল অফুরান ভালোবাসা এবং ভক্তিতে। তারা বসতেই ডোনা বলল, ‘গত চারদিন ধরে আহমদ মুসার কোন খবর পাইনি। তাই ছুটে এসেছি আমরা প্যারিস থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, খুব কাছে এসেও দেখা পেলাম না।’ কণ্ঠটা কেঁপে উঠল ডোনার। থামল সে। একটা ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলল, ‘তবু আমরা খুশি এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, আপনাদের দেখা পেয়েছি, যারা তার সাথী ছিলেন।’ আবার থামল ডোনা। এলিসা গ্রেসদের দিকে গভীরভাবে তাকাল এবং বলল, ‘এখন দয়া করে কি ঘটেছে বলুন?’ পিয়েরা এবং লুই ডোমাস দু’জনেই এলিসা গ্রেসের দিকে তাকাল। পিয়েরা বলল, ‘এলিসাই সব বলবে। আহমদ মুসা সম্পর্কে শুরুর যেটুকু ঘটনা আমি বলছি।’ একটু থামল পিয়েরা। তারপর শুরু করল, ‘আমার নামটাই বলা হয়নি। আমি পিয়েরা পেরিন।’ একটু থেমে লুই ডোমাসকে দেখিয়ে বলল, ‘এ হলো লুই ডোমাস। আমার বন্ধুর চেয়েও বড়। এলিসার অনুরোধে ওমর বায়ার অভিযানে আমি জড়িয়ে পড়ি। লুই ডোমাস আমাকে স্বতস্ফূর্তভাবে সাহায্য করে।’ আবার থামল পিয়েরা। চোখটা একটু নিচু করল। যেন ভাবল এবং গুছিয়ে নিল কথা। তারপর শুরু করল, ‘ব্ল্যাক ক্রস-এর হেডকোয়ার্টার সংলগ্ন তাদেরই নিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টের সামান্য পরিচারিকা আমি। খদ্দের হিসেবে আহমদ মুসা আমাদের রেস্টুরেন্টে আসেন।’ তারপর কিভাবে আহমদ মুসার খাওয়া, আচার-আচরণ পিয়েরা পেরিন-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করল, কিভাবে গতকাল এগারটার দিকে পিয়েরা আহমদ মুসার টেবিলে গিয়ে আহমদ মুসার পরিচয় জানতে পারে এবং তাকে ব্ল্যাক ক্রসের হেডকোয়ার্টারের পরিচয় বলে, কিভাবে একজন ব্ল্যাক ক্রসের নেতৃস্থানীয় লোককে দেখিয়ে দেয়, কিভাবে আহমদ মুসা তাকে অনুসরণ করে বেরিয়ে যায় এবং আবার ফিরে আসে এবং আহত হয়ে ব্ল্যাক ক্রসের হাতে বন্দী হয়- সব কথা পিয়েরা পেরিন বলল ডোনাকে। শুনতে শুনতে ডোনার মুখ মলিন এবং চোখ ছলছলে হয়ে উঠেছিল। পিয়েরা থামতেই ডোনা বলল, ‘খুব বেশি আহত হয়েছিলেন উনি?’ ডোনার কণ্ঠে উদ্বেগ। ‘খুব বেশি না হলেও তার মাথার এক পাশের চামড়া উঠে গিয়েছিল। রক্তে তার মুখের একপাশ এবং শরীরের একটা দিক প্রায় ভিজে গিয়েছিল।’ বলল পিয়েরা পেরিন। ‘কোন চিকিৎসা হয়নি, না?’ দু’হাতে চেয়ারের দু’টি হাতল আঁকড়ে ধরে মাথাটা চেয়ারে ঠেস দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসল ডোনা। ‘ঐ অবস্থায় তাকে ধরে নিয়ে গেছে। ব্ল্যাক ক্রস-এর অভিধানে তার শত্রুর জন্যে হত্যা-নির্যাতন-নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছু লেখা নেই।’ বলল পিয়েরা। ডোনা কোন কথা বলল না। চোখও খুলল না সে। পিয়েরাই বলল আবার, ‘কিন্তু আমি বিস্মিত হয়েছি, মাথায় অতবড় আঘাত পাওয়ার পরও তার মুখে বেদনার সামান্য ভাঁজও পড়েনি কিংবা বন্দী হবার সময় ভয়-বিহ্বলতার বিন্দুমাত্র চিহ্নও তার চোখে-মুখে আমি দেখিনি।’ ‘নিজের ভালো চিন্তা করলে, তবেই তো কারো মনে তার মন্দ চিন্তা নিয়ে ভয় জাগবে। উনি সবার ভালো নিয়ে ভাবেন নিজেরটা ছাড়া।’ চোখ খুলে বলল ডোনা। বলতে গিয়ে তার ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল যা কান্নার চেয়েও করুণ। বলে একটু থেমেই এলিসা গ্রেসের দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনি বলুন।’ ‘গত রাতটা ছিল আমার জীবনের স্মরণীয় রাত। এই রাতেই আমি ওমর বায়াকে নিয়ে পালাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন রাত আড়াইটা কিংবা তার কিছু বেশি হবে। আমি লিটলকে পালাবার পথ টাওয়ারের বেজমেন্টে পাঠিয়ে দিয়ে...।’ কান্নায় আটকে গেল এলিসা গ্রেসের কথা। অল্পক্ষণ পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘মাফ করবেন, ‘লিটল’-এর জন্যে দুনিয়াতে কাঁদার কেউ নেই। আমাকে এবং ওমর বায়াকে সাহায্য করতে গিয়ে নির্মমভাবে নিহত হলো সে। ওমর বায়াকে সাহায্য করার পেছনে আমার স্বার্থ ছিল, ওমর বায়া আমার মাতৃধর্মের লোক এবং আমি অভিনয় করতে গিয়ে ওকে ভালোবেসে ছিলাম। কিন্তু ‘লিটল’-এর তিলমাত্র কোন স্বার্থ ছিল না। সে মিঃ বেনহামকে দু’চোখে দেখতে পারতো না। সে মনে করতো, আমাকে দিয়ে ওমর বায়ার কাছ থেকে কাজ উদ্ধার করার পর আমাদের দু’জনকেই মেরে ফেলবে। এই চিন্তা থেকেই সে নিজে একদিন আমার কাছে প্রস্তাব করল, ওমর বায়া এবং আমার পালানো উচিত। সে সাহায্য করবে। জেটি হয়ে সমুদ্রপথে পালাবার গোপন পথটির সন্ধান সে-ই আমাদের দিয়েছিল। তার সাহায্য ও সাহস না পেলে পালাবার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না।’ থামল এলিসা গ্রেস। চোখ মুছে শুরু করল আবার, ‘‘লিটল’কে পাঠিয়ে আমি এবং ওমর বায়া বাইরের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে লিটলের সংকেতের অপেক্ষা করছিলাম। বাংলোর প্রাচীরের গেট থেকে গোটা চত্বর আমাদের চোখের সামনে ছিল। হঠাৎ দেখলাম, স্টেনগান ও লাইট মেশিনগান সজ্জিত সাত-আটজনের একটা দল আমার বাংলোর সামনে এসে অবস্থান নিল। দেখে ভয়ে ও হতাশায় আমার ভেঙে পড়ার দশা। আমি ভাবলাম, হয় ‘লিটল’ ধরা পড়ে গেছে, না হয় অন্য কোনভাবে আমাদের প্ল্যান তারা জানতে পেরেছে। ব্ল্যাক ক্রস-এর ভয়ংকর মূর্তি আমি মনে মনে কল্পনা করলাম। কাঁপতে শুরু করেছিলাম আমি। এই সময় দেখলাম, ব্ল্যাক ক্রস-এর গার্ডের পোশাক পরা একজন লোক এগিয়ে আসছে। তার মাথায় ব্ল্যাক ক্রস-এর গার্ডদেরই হ্যাট। ঠিক এ সময়েই আরও কয়েকজন লোক গেট দিয়ে আমাদের চত্বরে প্রবেশ করল। তাদের দ্রুত এগিয়ে আসতে দেখা গেল। তারা সকলেই ব্ল্যাক ক্রস-এর গার্ড। যে লোকটি একা এগিয়ে আসছিল, সে একবার পেছনে তাকিয়েই শরীরটাকে সামনের দিকে একটু বাঁকিয়ে স্টেনগানের গুলি ছুঁড়ল আমার বাংলোর সামনে বসা লোকদের লক্ষ্য করে। গুলি করেই চোখের পলকে গড়িয়ে এসে উঠল আমাদের বারান্দায়। আসার সময় যারা ব্রাশফায়ারে মারা গিয়েছিল, তাদের লাইট মেশিনগানও নিয়ে এসেছিল। যারা গেট থেকে এগিয়ে আসছিল, তারা গুলির শব্দ হবার সাথে সাথেই শুয়ে পড়েছিল এবং ক্রলিং করে এদিকে এগিয়ে আসছিল। তারা কাছাকাছি এগিয়ে এলে তারাও আমার বারান্দায় উঠে আসা লোকটির লাইট মেশিনগানের শিকারে পরিণত হলো। ঠিক এই সময় দশ-বারো জনের আরেকটি বড় দল গেট দিয়ে প্রবেশ করল। পুতুলের মত দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু দেখছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না, কে কাকে মারছে। কিন্তু ভাবছিলাম, কিছু একটা করা দরকার। তাছাড়া আজ পালাতে না পারলে আর সুযোগ নাও আসতে পারে বুঝতে পারছিলাম। অনেকটা মরিয়া হয়েই পিস্তল বাগিয়ে বাইরে গেলাম। লোকটি স্টেনগান বাগিয়ে বসেছিল গেটের দিক থেকে যারা এগিয়ে আসছিল সেদিকে লক্ষ্য করে। আমি তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে আপনি? কোন পক্ষের?’ লোকটি স্টেনগান ছেড়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। আমার দিকে এক নজর তাকিয়েই বলল, ‘ব্ল্যাক ক্রস-এর লোককে মারছি দেখেও যখন এতক্ষণ আমাকে গুলি করেননি, তখন আমি আপনার পক্ষের।’ তার মুখে ভয় কিংবা বিস্ময়ের বা অপ্রস্তুতির কোন চিহ্নই লক্ষ্য করলাম না। ঠোঁটে এক টুকরো নিষ্পাপ হাসি। হঠাৎ আমার মনে হলো, এমন লোক আহমদ মুসা না হয়ে যায় না। ওমর বায়ার কাছে আহমদ মুসার কথা শুনেছিলাম, আরও শুনেছিলাম, শুধু আহমদ মুসাই আসতে পারে তাকে উদ্ধার করতে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি আহমদ মুসা?’ এরপরই ওমর বায়া বেরিয়ে এল। জড়িয়ে ধরল দু’জন দু’জনকে।’ থামল এলিসা গ্রেস। তারপর এলিসা ধীরে ধীরে কি করে আহমদ মুসা গেটের দিক থেকে অগ্রসরমান লোকদের লাইট মেশিনগান দিয়ে চত্বরের বাইরে তাড়িয়ে দিল, কিভাবে লাইটের বাল্বগুলো নষ্ট করে তাদের টাওয়ারের বেজমেন্টে যাওয়ার পথ পরিষ্কার করে দিল, কি করে আহমদ মুসা বেজমেন্টে এবং জেটিতে নামার সিঁড়িতে একা মেশিনগান নিয়ে বসে ব্ল্যাক ক্রসের লোকদের ঠেকিয়ে রেখে এলিসা গ্রেস ও ওমর বায়াদের যাবার পথ নিরাপদ করেছিল, কি অলৌকিকভাবে জেটির দরজা চোখের নিমেষে খুলে দিয়েছিল, কিভাবে এই দরজায় ব্ল্যাক ক্রস-এর লোকদের ঠেকিয়ে রেখে এলিসা গ্রেসদের বোটে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল, কি অবিশ্বাস্যভাবে ‘লা আটলান্টিক’ রেস্টহাউসে ব্ল্যাক ক্রসের আক্রমণকে সে একাই ঠেকিয়েছিল- সবকিছু বর্ণনা করে বলল, ‘গত রাতেই ব্ল্যাক ক্রস-এর তিরিশ জন লোক আহমদ মুসার হাতে নিহত হয়েছে। কি ধরনের ভয়াবহ সংঘাত হয়েছে আপনি চিন্তা করে দেখুন।’ ডোনা চোখ বন্ধ করে বাম হাতের উপর মুখ ঠেস দিয়ে কথা শুনছিল। তার দৃষ্টিতে গভীর শূন্যতা। বলল, ‘ওর জীবনে এমন সংঘাত কিছুই নয়। ব্ল্যাক ক্রস-এরই প্রায় সাড়ে তিন ডজন লোক নিহত হয়েছে ওর হাতে এই রাতের আগে।’ তার কণ্ঠ অনেকটা স্বগতোক্তির মত। একটু থামল। তারপর আবার বলল, ‘ওর আহত স্থানের কোন চিকিৎসা হয়নি, না?’ ভেজা কণ্ঠস্বর ডোনার। ‘না রাজকুমারী, ‘লা আটলান্টিক’ রেস্টহাউসের লবির আলোতেও আমি ওর মুখে ও মাথার চুলে রক্তের দাগ দেখেছি। তারপর আর খেয়াল করিনি।’ ডোনা আবার চোখ বুজল। তার মুখজুড়ে রাতের অন্ধকার। ‘ওমর বায়াকে কিডন্যাপ করে ব্ল্যাক ক্রস কোথায় নিয়ে যেতে পারে? সেইন্ট পোল ডে লিউন-এর হেডকোয়ার্টারে?’ বলল ডোনার আব্বা। ‘না, জনাব। আমি শুনেছি, ব্ল্যাক ক্রস-এর কোন অফিস বা আস্তানায় শত্রুর পা পড়লে সে অফিস বা আস্তানা তারা সংগে সংগেই পরিত্যাগ করে।’ বলল পিয়েরা পেরিন। ‘নিশ্চয় সেইন্ট পোল ডে লিউন-এ ওদের আরও আস্তানা আছে?’ ডোনার আব্বাই আবার জিজ্ঞেস করল। ‘জনাব, আমার তা জানা নেই।’ বলল পিয়েরা। ‘আমাদের এখন কি করণীয়? আমি ও পিয়েরা ব্ল্যাক ক্রস-এর সন্দেহের মধ্যে এখনও আসিনি। আমাদের বাসা সেইন্ট পোল ডে লিউন-এ। আমরা এলিসাকেও নিয়ে যেতে পারি।’ ডোনার আব্বার দিকে চেয়ে বলল লুই ডোমাস। ‘আমার মতে, আহমদ মুসার কোন নির্দেশ না আসা পর্যন্ত যে যেমন আছি সেভাবে রেস্টহাউসেই থাকা উচিত।’ বলল ডোনা। একটু থামল, একটু ভাবল ডোনা। তারপর আবার বলল, ‘আহমদ মুসার অতিথি বা আশ্রয়ে ছিল এলিসা। আহমদ মুসা কোন নতুন সিদ্ধান্ত না নেয়া পর্যন্ত এলিসা গ্রেস আমার অতিথি। তার সব দায়িত্ব আমার। আপত্তি নেই তো?’ বলে ডোনা এলিসা গ্রেস, পিয়েরা, লুই ডোমাস সবার দিকে তাকাল। এলিসা গ্রেস-এর চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতার চিহ্ন ফুটে উঠল। সে মাথা নিচু করল। কিন্তু মুখ খুলল পিয়েরা। বলল, ‘সম্মানিতা রাজকুমারী, আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু শুধু এলিসা গ্রেসেরই কি এ সৌভাগ্য হলো?’ ‘না, আপনারা সবাই আমার অতিথি। আমি বিশেষভাবে এলিসা গ্রেসের নাম করেছি মাত্র।’ ‘ধন্যবাদ।’ পিয়েরা বলল। ‘ওয়েলকাম।’ বলল ডোনা। ‘সম্মানিতা রাজকুমারী, আমি কি আপনাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি?’ দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বলল পিয়েরা। ‘অবশ্যই।’ বলল ডোনা। ‘আমাদের রাজকুমারীর মাথায় ওড়না কেন? টিভিতে দেখেছি, এ ধরনের ওড়না মৌলবাদী মুসলিম মেয়েরা পরে।’ ‘কেন পরেছি বলুন তো?’ বলল ডোনা। তার ঠোঁটে হাসি। ‘আমাদের বিস্ময় লাগছে, তাই তো জিজ্ঞেস করছি।’ ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি।’ ‘আপনি বুরবোঁ রাজকুমারী ইসলাম গ্রহণ করেছেন!’ পিয়েরার কণ্ঠে বিস্ময়। ‘কেন, বুরবোঁ রাজকুমারী ইসলাম গ্রহণ করতে পারে না?’ ‘ফরাসীদের কাছে এটা বিস্ময়ের হবে।’ ‘শুধু এটাই কি বিস্ময়ের হবে? এটা কি বিস্ময়ের হবে না যে, নিশ্চয় ইসলাম আরও বড় বিস্ময়ের?’ ‘তাও হবে। অনেককে ইসলামের ব্যাপারে অনুসন্ধিৎসুও করে তুলবে।’ ‘আপনার এবং এলিসার মাতৃধর্ম ইসলাম। আপনারা তো পক্ষে কিছু বলবেনই। মিঃ ডোমাস, আপনার মত কি?’ বলল ডোনা। লুই ডোমাস ডোনাকে একটা বাউ করে একটু নড়ে-চড়ে বসে বলল, ‘আপনি সত্য বলেছেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস হতে চাইছে না।’ ‘কেন?’ ‘সভ্য পাশ্চাত্যের একটি শীর্ষ পরিবারের মেয়ে অসভ্য প্রাচ্য দেশের ধর্ম গ্রহণ করবে, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’ ‘ভুলে যাবেন না, খৃস্টধর্মও ‘অসভ্য প্রাচ্য’ দেশের। যিশুখৃস্ট একটি ‘অসভ্য’ প্রাচ্য দেশেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানেই বড় হয়েছিলেন, ধর্ম প্রচার করেছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন।’ ‘আমিও শুনেছি।’ ‘তাহলে?’ ‘কিন্তু ইসলাম প্রাচ্য দেশের ধর্ম বলেই পরিচিত, আর খৃস্টধর্ম পাশ্চাত্যের।’ ‘পাশ্চাত্য গ্রহণ করলেই তা পাশ্চাত্যের ধর্ম হয়ে উঠবে।’ ‘কিন্তু পাশ্চাত্য এককভাবেই বলা যায় খৃস্টধর্মের দখলে।’ ‘সত্যিই কি তাই? তাহলে শত শত গীর্জা আজ অব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত কেন? শত শত গীর্জা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে কেন?’ ‘মানুষের ক্রমবর্ধমান ধর্মহীনতার কারণেই এটা ঘটছে।’ কারণ দেখাল ডোমাস। ‘ঠিক ধর্মহীনতা নয়, যারা গীর্জায় যাচ্ছে না, তারা কিন্তু নিজেদের খৃস্টানই বলছে। আসল কথা হলো, সময়ের প্রয়োজন মেটাবার মত কিছুই নেই খৃস্টান ধর্মে।’ ‘সময়ের এই প্রয়োজনের অর্থ?’ ‘পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইনগত বিধিবিধান যা প্রাত্যহিক জীবন-পরিচালনায় প্রয়োজন।’ বলল ডোনা। ‘এসব প্রয়োজন কি ধর্মকেই পূরণ করতে হবে?’ ‘তা না করলে ধর্ম মানুষের জীবন পরিচালনা করবে কি করে? ধর্মকে গীর্জায় রেখে জীবনের সব ক্ষেত্রে অধর্মের রাজত্ব চলতে দিলে ধর্মজীবন আর থাকে না। এই কারণেই আমাদের পাশ্চাত্যে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মহীনতা বাড়ছে।’ ‘আবার উত্থানও তো ঘটছে।’ ‘ঘটছে। কিন্তু সেটা একটা রাজনৈতিক রূপ। ব্ল্যাক ক্রস-এর মত যে সব খৃস্টান ধর্মের সর্বব্যাপী প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করছে, দেখবেন তাদের জীবনাচরণে কোন ধর্ম নেই।’ ‘ঠিকই বলেছেন। ব্ল্যাক ক্রস-এর নেতৃবৃন্দের কাউকে গীর্জায় যেতে দেখিনি। ধর্মভীরু লিটলের তাদেরকে ঘৃণা করার একটা বড় কারণ ছিল এটা।’ বলল এলিসা। ‘যা খৃস্টান ধর্মে নেই, সেই জীবনযাপন প্রণালী কি ইসলামে আছে?’ ‘আছে এবং এ কারণেই ইসলাম জীবন্ত ও পূর্ণ ধর্ম। ইসলামের প্রতি আমার আকৃষ্ট হবার কারণ এটাই।’ বলল ডোনা। দরজায় নক করার শব্দ হলো, ডোনার কথা শেষ করার সাথে সাথেই। ডোনা একবার তাকাল তার আব্বার দিকে। তারপর উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে ডোনা তার হাত দিয়ে পকেটের রিভলভার একবার স্পর্শ করল। দরজা খুলে দিল ডোনা। দরজায় দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ অফিসার। ‘গুড মর্নিং।’ বলল ডোনা। ‘গুড মর্নিং।’ বলল পুলিশ অফিসারটিও। মুখে সে শব্দ ক’টি বললেও তার চোখ একবার গোটা কক্ষে ঘুরছিল। তার চোখ গিয়ে আটকে গেল ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনীর মুখে। প্রথমে বিস্ময়! তারপর আনন্দ মিশ্রিত শ্রদ্ধা নেমে এল তার চোখে। সে দু’ধাপ সামনে এগিয়ে মাথা নুইয়ে বাউ করল মিশেল প্লাতিনীকে। বলল, ‘স্যার, আপনিই এখানে উঠেছেন বুঝতে পারিনি।’ ‘ওয়েলকাম।’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে মিশেল প্লাতিনী হ্যান্ডশেকের জন্যে তার হাত বাড়িয়ে দিল। পুলিশ অফিসার দ্বিধাগ্রস্থভাবে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল। ডোনার আব্বা তাকে ডোনার চেয়ারটা দেখিয়ে দিল বসার জন্যে। কিন্তু পুলিশ অফিসারটি বসল না। বলল, ‘মাফ করুন স্যার। আমরা দারুণ বিপদে। গত কয়েকদিনের ঘটনা আমাদের দিশেহারা করে তুলেছে। একের পর এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আজকের ঘটনা সে রকমই একটা হত্যাকাণ্ড। নিহত ও আহতদ্বয় যখন রেস্টহাউসে এসেছিলেন, সেই সময় লুই ডোমাস নামের একজন যুবকও রেস্টহাউসে আসেন। খবর পেলাম, তিনি এখানে এসেছেন। তার কাছে কোন সাহায্য পাওয়া যায় কিনা, এ জন্যেই আপনাদের বিরক্ত করছি। দুঃখিত।’ কথা শেষ করে পুলিশ অফিসারটি তাকাল লুই ডোমাসের দিকে। ‘আমিই লুই ডোমাস।’ লুই ডোমাস মাথা খাড়া করে বলল। ‘আপনি কি কোন সাহায্য করতে পারেন?’ ‘কি সাহায্য?’ ‘নিহত ও অপহৃতদের পরিচয় কি?’ ‘দুঃখিত, তারা কেউ আমার পরিচিত নন।’ উত্তর দিয়ে একটু থেমেই লুই ডোমাস পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘ওদের পরিচয়ের চেয়ে এখন তো জরুরি খুনিদের পরিচয় বের করা?’ ‘ঠিকই বলেছেন।’ বলে হাসল পুলিশ অফিসারটি। তারপর মিশেল প্লাতিনীর দিকে চেয়ে সশ্রদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘মাফ করবেন স্যার। বিরক্ত করলাম।’ বলে সে ফিরে দাঁড়াতে চাইল ঘর থেকে বের হওয়ার জন্যে। ‘লুই ডোমাস যে কথা বলল, তাতে খুনিদের পরিচয় কিছু জানতে পেরেছেন অফিসার?’ পুলিশ অফিসার ফিরে না দাঁড়িয়ে স্থির হলো। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল মিশেল প্লাতিনীর দিকে। কিন্তু কিছু বলল না। মুহূর্ত কয়েক পরে বলল, ‘জানতে পারিনি বললে ভুল হবে স্যার।’ ‘কারা সে খুনি?’ পুলিশ অফিসার একবার লুই ডোমাসদের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘আপনার কিছুই অজানা থাকবে না স্যার। এখানে খুনি ব্ল্যাক ক্রসের লোকেরা।’ ‘ও, শক্তিমান খুনি।’ বলল মিশেল প্লাতিনী। ‘শক্তিমান স্যার। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার স্যার, তারা ইদানিং অবিরাম মার খেয়েই চলেছে। গত কিছুদিনের কথা বাদ দিলাম, আজ রাতেই ওদের তিরিশ-চল্লিশজন লোক মারা গেছে এবং মনে হচ্ছে, ওদের হেডকোয়ার্টারটাই ধ্বংস হয়ে গেছে আজ রাতে।’ একটু থামল পুলিশ অফিসার। বলল আবার, ‘বিস্ময়ের ব্যাপার, মারা গেছে সব ব্ল্যাক ক্রসের লোক, তাদের প্রতিপক্ষের একজন লোকও মারা যায়নি। এটা একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা। মাত্র রেস্টহাউসের এই একটি ঘটনায় মারা গেল একজন ব্ল্যাক ক্রসের হাতে। সুতরাং এই নিহতের পরিচয়টা আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো তার পরিচয়ের সূত্র ধরে আজকের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের এবং অতীতের হত্যাকাণ্ডগুলোর খুনিপক্ষ কারা তা জানা যেত।’ ‘ব্ল্যাক ক্রসের চেয়ে শক্তিশালী কিংবা ব্ল্যাক ক্রসকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন কেউ এদেশে আছে নাকি? আপনি কি মনে করেন, অফিসার?’ বলল মারিয়ার আব্বা। ‘এ বিষয়টাই আমাদের বিস্মিত করেছে সবচেয়ে বেশি। কিন্ত ভেবে কোন কূল পাচ্ছি না আমরা। শুনলাম, পাশের রেস্টহাউসের আরেকজন যুবক ঘটনার সময় থেকেই নেই। যা জানা গেছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, সে ব্ল্যাক ক্রসের লোক নয়, ব্ল্যাক ক্রসকেই সে একটা গাড়ি হাইজ্যাক করে নিয়ে ধাওয়া করেছে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, নিহতরা সংখ্যায় কমপক্ষে তিনজন ছিল।’ ‘কোন পথে ওরা গেছে, তা কি আপনারা জানতে পেরেছেন?’ ‘না, এখনও নয় স্যার। তবে তারা কাছের পেরেজ গিরেক কিংবা সেইন্ট পল ডে লিউন শহরের দিকে যায়নি। এদিকে আমাদের কড়া পাহারা ছিল।’ ‘আপনারা কি ওদের পিছু নেবার কোন চেষ্টা করছেন অফিসার?’ ‘সে সুযোগ হয়নি। তাদের গাড়ির নাম্বার বা কোন চিহ্ন পেলে আমরা ওদের লোকেট করার ব্যবস্থা করতাম। তবু দুটো গাড়ি সম্পর্কে একটা জেনারেল ইন্সট্রাকশন আমরা চারদিকে পাঠিয়েছি।’ ‘ব্ল্যাক ক্রস সম্পর্কে কোন ইন্সট্রাকশন পাঠিয়ে কি কোন লাভ আছে?’ ‘আপনি যা জানেন স্যার। তারাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তবে বিশেষ ফেভার পায় তারা আমাদের মত অফিসারদের ব্যক্তিগত দুর্বলতার কারণে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো রাজনীতি।’ ‘রাজনীতি? কি সেটা?’ ‘সব আপনি জানেন স্যার। আগে ওরা কমিউনিজমের বিরুদ্ধে বিরাট অস্ত্র ছিল। এই কারণে সুযোগ দেয়া হতো, সাহায্য করা হতো। এখন কমিউনিজম কোন বড় সমস্যা নয়, ওদেরকে এখন কাজে লাগানো হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সরকার অনেক কিছু পারে না বাইরের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে। সরকারের না পারা এসব কাজ ব্ল্যাক ক্রস করছে। সুতরাং ফেভার তাদের পাবারই কথা।’ ‘তাহলে তো সরকারের এখন উচিত, ব্ল্যাক ক্রস-এর বিরুদ্ধে যে বা যারা লেগেছে, তাদের বিরুদ্ধে তৎপর হওয়া।’ ‘সরকার এবং পুলিশ সে চেষ্টা করছে স্যার।’ বলেই পুলিশ অফিসার একটু হাসল এবং বলল, ‘মাফ করবেন স্যার। কিছুই আপনার অজানা নয়।’ ‘ধন্যবাদ। গুড মর্নিং’- বলে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াল মিশেল প্লাতিনী। ‘গুড মর্নিং’- বলে ঘুরে দাঁড়াল পুলিশ অফিসারটি। চলে গেল। ‘তাহলে তো ওরা পেরেজ পিরেক কিংবা ডে লিউন শহরের দিকে যাননি। কোথায় গেলেন ওরা?’ পুলিশ অফিসার বেরিয়ে যেতেই বলে উঠল ডোনা। ‘ওমর বায়া ব্ল্যাক ক্রসের জন্যে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। সুতরাং তাকে নতুন কোন সুরক্ষিত স্থানে নিয়ে গেছে। হেডকোয়ার্টারে তারা ওমর বায়াকে রেখেছিল। হেডকোয়ার্টার ধ্বংস হবার পর তাকে তারা এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক যাকে তারা হেডকোয়ার্টারের মর্যাদা দিতে পারে।’ ‘তেমন জায়গা অনেক দূরেও তো হতে পারে?’ ‘দূরে হওয়াই স্বাভাবিক।’ ‘খুব দূরে?’ ‘হতে পারে তা দেশের একদম ভিন্ন প্রান্তে।’ মুখ মলিন হয়ে গেল ডোনার তার আব্বার কথায়। বলল, ‘তাহলে আমরা কি করব?’ ডোনার কথা শেষ না হতেই টেলিফোন বেজে উঠল। ডোনা দ্রুত উঠে গেল টেলিফোনের কাছে। ‘হ্যালো।’ ‘ইয়েস, মিস ডোনা বলছি।’ ‘কে?’ ‘ঠিক আছে, লাইন দিন।’ ‘তুমি... তুমি! কোথায়... তুমি?’ আবেগে-আনন্দে মুখ লাল হয়ে উঠেছে ডোনার। গলা তার কাঁপছে। বহু কষ্টে কথাগুলো যেন ডোনার গলা থেকে বেরুলো। ‘কুমেট-এর কাছাকাছি থেকে বলছি।’ ‘কুমেট?’ ‘তুমি কবে এলে, কার সাথে এলে?’ ‘সে কথা পরে। তুমি ভাল আছ?’ হঠাৎ কথা বন্ধ হয়ে গেল ডোনার। চোখ দু’টি তার আতংকে বিস্ফারিত হয়ে উঠল। তার পরেই চিৎকার করে উঠল, ‘হ্যালো, ...হ্যালো... কথা বলছো না কেন?’ কিন্তু মুহূর্তেই তার কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে এল। তার হাত থেকে টেলিফোন পড়ে গেল। জ্ঞান হারিয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়ল ডোনা। আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল মিশেল প্লাতিনীসহ সবার চোখে-মুখে। এলিসা গ্রেস, পিয়েরা পেরিন এবং লুই ডোমাস বুঝল, ভয়ানক কিছু ঘটেছে। আর ডোনার আব্বা ডোনার কথা শুনেই বুঝেছিল, সে আহমদ মুসার সাথে কথা বলছে। কিন্তু কি হল? কি ঘটেছে টেলিফোনের ঐ প্রান্তে! মিশেল প্লাতিনীসহ সবাই ছুটে এল ডোনার দিকে। শীঘ্রই জ্ঞান ফিরে পেল ডোনা। জ্ঞান ফিরে কেঁদে উঠল। ‘কি ঘটেছে বল মা, টেলিফোন তো আহমদ মুসার ছিল?’ বলল ডোনার আব্বা। ‘আব্বা তুমি বল, তার মত একজন পরোপকারী মানুষকে আল্লাহ দীর্ঘজীবী করবেন?’ বলল ডোনা কান্নাজড়িত কণ্ঠে। ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’ ‘বল, শত্রুর বোমাও তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না?’ ‘কি বলছ এসব মা?’ ‘না বল, তার কোন ক্ষতি হয়নি, তার কোন ক্ষতি হতে পারে না।’ পিতার দু’টি হাত জড়িয়ে ধরে বলল ডোনা। তার চোখে-মুখে বিহ্বল ভাব। ‘কি হয়েছে বল মা।’ ‘হঠাৎ তার কথা বন্ধ হয়ে গেছে। তারপরেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ। মনে হলো যে, টেলিফোনের উপরই বিস্ফোরণ।’ ডোনার কথা শোনার সাথে সাথে উদ্বেগের ছায়া নামল মিশেল প্লাতিনীর মুখে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ঘটনার এতটুকু দিয়ে নিশ্চিত করে কোন কিছুই বলা যায় না মা। তুমি চিন্তা করো না।’ ‘না আব্বা, তুমি বল ওর কিছুই হয়নি।’ ‘আল্লাহ তা-ই করুন মা।’ বলে একটু থামল ডোনার আব্বা। পরক্ষণেই মুখ খুলল। বলল, ‘কুমেট-এর কথা তুমি কি বললে?’ মুখ তুলল ডোনা। তার দু’চোখে নতুন চাঞ্চল্য ফুটে উঠল। বলল, ‘ও ‘কুমেট’ থেকে টেলিফোন করেছিল। আমরা তো এখন ‘কুমেট’ যেতে পারি আব্বা।’ ‘পারি। যেতেই হবে। তবে আহমদ মুসার টেলিফোনের জন্যে আমাদের আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত। তার অসমাপ্ত কথা বলার জন্যে আবার টেলিফোন সে নিশ্চয়ই করবে।’ ‘কিন্তু উনি যদি সে অবস্থায় না থাকেন?’ ‘কিন্তু আমরা কিছুটা সময় দেখি।’ ‘এটাই মনে হয় ভাল হবে। ইতোমধ্যে ওর নতুন লোকেশন জানা যেতে পারে।’ বলল এলিসা গ্রেস। ডোনা কোন কথা বলল না। চোখ বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। গণ্ডে তার অশ্রুর দাগ। ঠোঁট দু’টি শুকনো। সূক্ষ্ম একটা কম্পন তাতে। অন্তরে তার যে ঝড় বইছে তারই প্রকাশ এটা। ডোনার আব্বা উঠল। এগোলো টেলিফোনের দিকে। বলল, ‘ভুলেই গেছি যে, আমাদের কারো নাস্তা হয়নি।’ ছুটে চলছিল আহমদ মুসার গাড়ি। সামনের গাড়িটি দু’শ গজের বেশি দূরে নয়। রাতের অন্ধকার কেটে যাবার পর এখন পরিষ্কারভাবে গাড়িটা দেখতে পাচ্ছে। আট সিটের একটা বাঘা ল্যান্ড ক্রুজার। আহমদ মুসার এই পিছু নেয়া ওদের কাছে ধরা পড়েছে কিনা আহমদ মুসা বুঝতে পারছে না। আহমদ মুসা ইচ্ছে করেই ওদের কাছাকাছি হওয়ার কিংবা ওদের ধরে ফেলার চেষ্টা করেনি। আহমদ মুসা আগে ওদের বুঝতে চায়। গাড়িতে ওমর বায়া আছে। তার নিরাপত্তার কথাও তাকে ভাবতে হচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে ওরা? দক্ষিণগামী হাইওয়ে ধরে গাড়ি চলার পর পুবদিকে টার্ন নিয়েছে। আহমদ মুসা বুঝতে পারছে, গাড়ি এখন ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূল ধরে পূর্ব দিকে এগিয়ে চলেছে। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা, ফ্রান্সের এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর ব্রিস্টে ওরা গেল না, তাহলে কোথায় যেতে চায় ওরা? ডে লিউনের মতই কোন অখ্যাত শহরের কোন বড় ঘাঁটিতে কি? চার ঘণ্টা সময় পার হয়ে গেছে। কোথায় তাদের গাড়ি এখন? ব্রিস্ট শহর পেছনে ফেলার পর যে সময় গেছে তাতে তারা নিশ্চয় পরবর্তী বড় শহর ‘কুমেট’-এর কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। এ সময় একটা রোড-মাইলের উপর নজর পড়ল আহমদ মুসার। দেখল, কুমেট শহর আর পঁচিশ মাইল। গাড়ি তখন একটা সংরক্ষিত বন এলাকার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। দু’ধারেই ঘন বন। হঠাৎ আহমদ মুসা দেখল, সামনের গাড়িটি তার স্পীড ডাবল বাড়িয়ে দিয়েছে। তীর বেগে ছুটে গাড়িটি আহমদ মুসার নজরের বাইরে চলে যাচ্ছে। আহমদ মুসাও গাড়ির স্পীড ডাবল করতে বাধ্য হলো। কিন্তু সামনে বাঁক থাকায় সামনের গাড়িটি চোখের আড়ালে চলে গেল। কিন্তু বাঁক ঘুরে মুশকিলে পড়ে গেল আহমদ মুসা। এখানে রাস্তার একটা শাখা ডানে গেছে সমুদ্র তীরের দিকে। আর একটা সামনে এগিয়েছে। সামনে আরও একটা বাঁক। কোন রাস্তায়ই ব্ল্যাক ক্রস-এর গাড়ি দেখতে পেল না। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি পকেট থেকে ওয়্যারলেস রিমোট সেন্সর বের করল। আইডি কার্ডের মত ছোট যন্ত্রটির বিশেষ একটি বোতামে চাপ দিতেই এর স্ক্রীনে সোজা সামনের দিক নির্দেশ করে একটা লাল অ্যারো মার্ক ফুটে উঠল। সোজা রাস্তাটি ধরে ছুটে চলল আহমদ মুসার গাড়ি। প্রসন্ন হয়ে উঠল আহমদ মুসার বুক। আহমদ মুসা ব্ল্যাক ক্রস-এর পিছু নেবার পর পরই একটা ‘মাইক্রো ট্রান্সমিটার চিপ’ ছুঁড়ে দিয়েছিল তাদের গাড়ি লক্ষ্যে। এটা ছোঁড়ার একটা বিশেষ পিস্তল রয়েছে। রাবার বুলেটের গায়ে ট্রান্সমিটার চিপ সেট করা থাকে। বুলেটটি গাড়ির গায়ে আঘাত করার সাথে সাথে ‘ট্রান্সমিটার চিপ’ চুম্বকীয় প্রভাবে গাড়ির গায়ে সেঁটে যায়। এই চিপ পঞ্চাশ মাইল দূর পর্যন্ত সংকেত পাঠাতে পারে, যা বিশেষভাবে তৈরি রিমোট সেন্সর-এ ধরা পড়ে এবং রিমোট সেন্সর তখন কোনদিক ও কতদূর থেকে ‘ট্রান্সমিটার চিপ’ সংকেত পাঠাচ্ছে, সেই দিক নির্দেশ করে থাকে। অল্প কিছুদূর চলার পরেই আহমদ মুসা ব্ল্যাক ক্রসের গাড়ি দেখতে পেল। আহমদ মুসা ফ্রান্সের এই এলাকার একটা মানচিত্রের প্রয়োজনীয়তা খুবই অনুভব করল। আহমদ মুসা জানে, ট্যুরিস্টরা ও গাড়িতে সব সময় সফরকারীরা হাতের কাছে মানচিত্র রাখে। এই আশাতেই আহমদ মুসা গাড়ির চারদিকে নজর বোলাল। তারপর সে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের রেকর্ড ড্রয়ারটা খুলে ফেলল। দেখতে পেল বেশ কিছু কাগজপত্র। প্রথমেই নজর পড়ল ফরাসি ভাষায় ছোট একটা বইয়ের দিকে। নাম পড়ে ভীষণভাবে চমকে উঠল আহমদ মুসা। বইটি হাতে তুলে নিল সে। নামঃ Towards Understanding Islam. রাস্তায় একটা বড় বাঁক। আহমদ মুসার মনোযোগ স্টিয়ারিং হুইলের দিকে। তীব্র গতিতে চলছে গাড়ি, সামনের গাড়ির সাথে সমান বেগে। আহমদ মুসা ওমর বায়াকে অপহরণকারী গাড়িটাকে কিছুতেই ছেড়ে দিতে রাজি নয়। দরকার হলে সে লড়াই করবে, যা এতক্ষণ সে এড়িয়ে এসেছে। আর লড়াইয়ের উপযুক্ত স্থান এই বনভূমি। আহমদ মুসা গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিল। স্টিয়ারিং হুইল ধরা বাম হাতে তখনো বইটি। এমন একটি জায়গায় ইসলামের উপর এমন একটি বই! বিস্ময় কাটছে না আহমদ মুসার। ডান হাত স্টিয়ারিং হুইলে রেখে বাম হাতে কষ্ট করেই একটা পাতা উল্টাল আহমদ মুসা। ভেতরের টাইটেল পেজে হাতে লেখা একটা নামের প্রতি নজর পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল আহমদ মুসা। পরিষ্কার অক্ষরে ‘মারিয়া জোসেফাইন’-এর নাম লেখা। হস্তাক্ষরটি ডোনার, তাও চিনতে পারলো। এতক্ষণে তার মনে পড়ল, গাড়িতে উঠার পর থেকে একটা পরিচিত সেন্টের সে গন্ধ পাচ্ছে। এ রাজকীয় সেন্ট ডোনাই সব সময় ব্যবহার করে। তাছাড়া এখন সে চিনতে পারছে, এ গাড়িটাও ডোনাদের। উত্তেজনার আকস্মিকতায় আহমদ মুসার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। ডোনা তাহলে চলে এসেছে! ঐ রেস্টহাউসে সে ছিল। হৃদয়ের কোন এক গভীরে প্রশান্তির এক স্নিগ্ধ প্রলেপ অনুভব করল আহমদ মুসা। সেই সাথে একটা উদ্বেগও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে কি একা তার ঐ পরিচারিকা নিয়ে চলে এসেছে, যেমন সে বলেছিল! ভীষণ জেদী মেয়ে- মনটা একটু বেসুরো হয়ে উঠল আহমদ মুসার। কিন্তু পরক্ষণেই মন স্বীকার করল, না, ডোনা কোন অন্যায় ও অযৌক্তিক জেদ করে না। সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকবে- জীবনসঙ্গিনী তো এরই নাম! বইয়ের ভেতর থেকে একটা নেইম কার্ড খসে পড়ল আহমদ মুসার কোলের উপর। বইটা পাশে রেখে নেইম কার্ডটা তুলে নিল আহমদ মুসা। নেইম কার্ডটা ‘লা ইল’ রেস্টহাউসের যেখানে ওমর বায়ারা ছিল এবং যার সামনে থেকে আহমদ মুসা গাড়িটা নিয়ে এসেছে। নেইম কার্ডে ‘লা ইল’ রেস্টহাউসের ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার। হঠাৎ আহমদ মুসার মনে ঝিলিক দিয়ে উঠল কথাটা। এ গাড়ির ড্যাশবোর্ডে টেলিফোন সেট করা, সে তো ডোনাকে টেলিফোন করতে পারে! যেই ভাবা সেই কাজ। সামনেটা একবার দেখে নিল আহমদ মুসা। দূরত্ব কমছে সামনের গাড়ি থেকে। আহমদ মুসা ডান হাতে স্টিয়ারিং-এর গোটা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাম হাতে টেলিফোনের সুইচ অন করে নাম্বার নবগুলোতে চাপ দিল তর্জনী দিয়ে। ‘লা ইল’ রেস্টহাউসকে পাওয়া গেল। পিএবিএক্স অপারেটর লাইন দিল ডোনার সাথে। ‘আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছ ডোনা?’ ‘কুমেট।’ ‘তুমি কবে, কিভাবে, কার সাথে এলে?’ টেলিফোনের ইন্টারকম সিস্টেম। এতে আলাদা কোন রিসিভার নেই। আহমদ মুসা কথা বলছিল। কিন্তু চোখ ছিল সামনে। গাড়িটা অনেক কাছে চলে এসেছে। সেদিক থেকে চোখ দু’টি গাড়ির সামনে রোডের উপর এসে পড়তেই ভূত দেখার মত আঁৎকে উঠল আহমদ মুসা। একদম গাড়ির মুখের সামনে রাস্তা জুড়ে কয়েক ডজন চকোলেট ছড়ানো। ওগুলো চকোলেট তো নয়, বিধ্বংসী বোমা। ওগুলোর উপর চোখ পড়তেই আহমদ মুসা বুঝতে পারল, ব্ল্যাক ক্রস তাকে পেছন থেকে সরিয়ে দেবার অতি সহজ একটা পথ অবলম্বন করেছে। গাড়ি ব্রেক করার অথবা ঘুরিয়ে নেবার সময় পার হয়ে গেছে। আহমদ মুসা চকোলেট বোমার অবস্থান দেখার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছিল, এখন ব্রেক বা ঘুরিয়ে নিতে গেলে গাড়ি বোমার উপর গিয়ে পড়বে। সুতরাং কি করতে হবে সে সিদ্ধান্ত আহমদ মুসা নিয়ে নিয়েছিল। স্টিয়ারিং হুইল থেকে তার ডান হাত বিদ্যুৎ বেগে গিয়ে দরজার ইমার্জেন্সী এক্সিট সুইচে চাপ দিল। সঙ্গে সঙ্গে দরজা ছিটকে খুলে গেল। আহমদ মুসাও সুইচে চাপ দিয়েই লাফিয়ে পড়েছিল। প্রায় দরজার সাথেই তার দেহ বাইরে ছিটকে পড়ল। তার দেহ তখনও মাটিতে পড়ে সারেনি, এই সময় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ কানে এল আহমদ মুসার। মাটিতে পড়ার সময় হাত দিয়ে মাথাটা বাঁচাবার চেষ্টা করেছিল আহমদ মুসা। কিন্তু তবু পারল না। মাথার সেই আহত জায়গাটাই আবার ঠোকা খেল রাস্তার কনক্রিটের সাথে। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল আহমদ মুসা তার অজান্তেই। কিন্তু দম নেবার সুযোগ নেই। মাটিতে পড়েই তাকাল গাড়ির দিকে। দেখল, বিস্ফোরণের পর গাড়ির ধ্বংসাবশেষ তার দিকে ছুটে আসছে। চকোলেট বোমার পরপর বিস্ফোরণ ঘটছে। সুতরাং মাটিতে পড়েই নিজের দেহকে গড়িয়ে সরিয়ে নিল। রাস্তার পাশের একখণ্ড ঝোপের আড়ালে গড়িয়ে পড়ল দেহটা। যখন তার দেহটা রাস্তার উপর স্থির হল, বুঝলো, তার দু’হাতের তালুতেও প্রচণ্ড ব্যথা। মাথার আহত স্থানে প্রচণ্ড ব্যথা। মনে হলো, উঠতে চেষ্টা করলে সবগুলো ব্যথাই যেন শতগুণে বেড়ে যাবে। সব চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেকে সেই মুহূর্তে অবস্থার উপর ছেড়ে দিয়ে গভীর ক্লান্তিতে চোখ বুজল আহমদ মুসা। কোথা থেকে রাজ্যের ঘুম যেন নেমে এল চোখে। সে সময় একটা গাড়ি পেছন দিক থেকে ছুটে আসছিল। নিকটতর হচ্ছিল জ্বলন্ত গাড়িটার।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ১৯.ক্রস এবং ক্রিসেন্ট (১)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন