বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখক: প্রফেসর ড. প্রণব কুমার ভট্টাচার্য
এম ডি (কলিকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়) ; ficpath, WBMES ( retired)
(১)
সেপ্টেম্বরের শেষভাগ। দুর্গাপুর শহরের প্রান্তঘেঁষা একটি পুরনো স্কুল সকাল-সকাল ছেলেমেয়েদের কোলাহলে মেতে উঠেছে। প্রত্যেকটি করিডোর যেন ছন্দে বেঁধে উঠেছে—টিফিনবক্সের ঠোকাঠুকি, হাসির শব্দ, শিক্ষিকাদের কড়া ধমক আর তার মাঝখানে একটানা বেজে চলা ঘন্টাধ্বনি।
এই প্রাণচঞ্চল দৃশ্যপটের ভেতরেও বাংলা ক্লাসরুমটিতে যেন এক ভিন্ন আবহ। শ্রদ্ধেয় আখিপূর্ণা মুখার্জির পাঠদান চলছে। তাঁর মুখে 'মেঘ বলেছে যাব যাব' আবৃত্তি যেন নতুনভাবে ধরা দেয়—শব্দগুলো কেবল উচ্চারিত হয় না, তারা যেন ক্লাসরুমের বাতাসে গীত হয়ে বাজে।
আখিপূর্ণাদেবী কেবল একজন শিক্ষিকাই নন, তিনি যেন শব্দের শরীরচর্চা করিয়ে তোলেন ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে।
অধ্যায় (২)
রূপক ভট্টাচার্য—একটি শান্তশিষ্ট ছেলে। শ্রেণির এক কোণায় বসে, যেন নিজের ছায়া আঁকছে সারাক্ষণ। পড়ায় মেধাবী, অথচ গায়ে পড়ে কিছু বলার মানুষ নয়। তার চোখে ছিল এক অন্যমাত্রার একাকীত্ব, যা বয়সের তুলনায় গভীর, অনুচ্চারিত।
শিক্ষিকা আখিপূর্ণা বেশ কয়েকবার লক্ষ করেছিলেন—রূপক ক্লাসে বা অবসরে কখনও খাতার শেষ পাতায় কিছু লিখছে। কখনও ছিঁড়ে ফেলছে, আবার কখনও দাগ কেটে মুছে দিচ্ছে।
একদিন, ক্লাসে "সৃজনশীলতা ও লুকোনো প্রতিভা" নিয়ে আলোচনা চলছিল। কবিতার ভূমিকায় উঠে এল যে—"কোনো কোনো প্রতিভা চেঁচায় না, তারা চুপ থেকে বড় হয়।"
এই কথাটায় রূপকের মুখে একটি অদ্ভুত আলো ফুটে উঠেছিল।
অধ্যায় (৩)
ক্লাস শেষে আখিপূর্ণা দেবী তার খাতা ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। শেষ পাতায় চোখ পড়তেই থমকে গেলেন। কিছু কাটা-কাটা পঙ্ক্তি।
"ঘুমিয়ে থাকা বিকেলে / জানালার পাশে বসে / আমি ভাবি— আমি কি একা, না কি একটাই আমি?"
তিনি রুপককে বললেন, “এইগুলো তোমার লেখা রূপক?”
রূপক মৃদু গলায় বলল, “লিখি তো মাঝে মাঝে… জানি না এগুলো ঠিক লেখা হয়ে ওঠে কিনা।”
“লেখা তো ঠিক বা বেঠিকের বিচার না। ওটা হৃদয়ের অভ্যাস,”।আখিপূর্ণাদেবী বললেন, “তোমার শব্দে আবেগ আছে, সাহস আছে—তাই তো লেখো তুমি।”
অধ্যায় (৪)
সেই শুরু।আখিপূর্ণা দেবী তাঁকে কিছু বাংলা এবং নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দের অনুবাদ সাহিত্যের বই দেন—জীবনানন্দ, শক্তি, জয় গোস্বামী, রবীন্দ্রনাথ, তার পাশাপাশি, রিলকে ও পাবলো নেরুদার অনুবাদ কবিতা। আখিপূর্ণার কৌশল ছিল একেবারেই নীরব—রূপক যা লিখত, তিনি কিন্তু তেমন পড়তেন, কিন্তু তেমন সংশোধন করতেন না। বরং বলতেন—“ভয় পেও না, শব্দের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাও, ব্যাকরণকে নয়।”
অর্ণব ধীরে ধীরে নিজের অভ্যন্তরকে চিনতে শিখল। তার কবিতা হয়ে উঠল তার মানসিক আর্তির,ভালোবাসার প্রতিফলন।
অধ্যায় (৫)
বছরের শেষে স্কুলে সাহিত্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। অর্ণব নিজের লেখা কবিতা “আলোর ওপারে আমি” পাঠ করতে উঠে দাঁড়ায়।
পিনপতন নীরবতা। তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিগুলো যেন হলঘরের প্রতিটি ফাঁকা জায়গাকে পূর্ণ করে তোলে—
"আমি আলো নই, আমি আলোর অভাব—
তবু আমি ছায়া হই, ছায়ার ভিতরেও প্রণয় থাকে।"
সেদিন হল ভর্তি শ্রোতা এক নতুন কবির জন্ম প্রত্যক্ষ করল।
অধ্যায়( ৬)
পুরস্কার হাতে অর্ণব যখন মঞ্চ থেকে নামল, সে এক দৃষ্টিতে আখিপূর্ণা ম্যামের দিকে তাকাল। তাঁদের দু’জনের মাঝখানে কোনো শব্দ উচ্চারিত হয়নি। তবুও চোখে চোখে এক সংলাপ সেদিন সম্পূর্ণ হয়েছিল।
"ম্যাম… আপনি না থাকলে হয়তো এই আমি কখনো জন্মাত না," ফিসফিসিয়ে বলেছিল রূপক।
অখিপূর্ণা রূপকের হাতে হাত রেখে বলেছিলেন, "তুমি আগুন ছিলে, আমি শুধু বাতাস দিয়েছি।"
অধ্যায় (৭)
বেশ কয়েক বছর কেটে যায়।
"বর্ণমালার চাঁদরাত"—একটি কবিতা সংকলনের উৎসর্গ পাতায় লেখা থাকে:
"তাঁকে, যিনি প্রথম আমার শব্দকে মানুষ করে তুলেছিলেন।"
প্রচ্ছদে নাম—রূপক ভট্টাচার্য।
উপসংহার
শিক্ষা কিন্তু কেবল পরীক্ষা পাস করানোর সরঞ্জাম নয়। সত্যিকারের শিক্ষকতা মানে একজন মানুষকে নিজেকে চিনিয়ে দেওয়ার রাস্তা দেখানো। রূপক হয়তো আজ একজন খ্যাতনামা কবি, কিন্তু তার কবিতার প্রতিটি লাইনের অলঙ্কারে আখি ম্যামের স্পর্শ আজও রয়ে গেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now