বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
স্বপ্নের রং অথবা বিষাদ কালো
-- হিমু অমি
ছোট একটা রুম, আট ফুট চওড়া আর তিন ফুট লম্বা। সাদা ধবধবে চুনকাম করা ছিলো হয়তো কোনো কালে কিন্তু কালের বিবর্তনে সেটা এখন হালকা বাদামী রং ধারন করেছে।
এই ছোট্ট ঘরের মধ্যে রয়েছে একটা টেবিল আর গদি মোড়া একটা চেয়ার। গদির কিছু কিছু অংশ আবার ফুটো হয়ে ভেতরের ফোম দেখা যাচ্ছে। টেবিলের বাম দিকে একটা টিয়া রঙের ফুলদানী, ফুলদানীতে কোনোই ফুল নেই।
ফুলদানীটি টিয়া রঙের না হয়ে হালকা সবুজ রঙের হলে বেশি ভালো লাগতো আর ঘরের রংটা যদি আকাশি হত তবে জমতো............ এইসব হিবিজিবি কথা যখন মাথার মধ্যে পিঁপড়ের মত সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে ঠিক তখন-ই ডাক্তার আফলাতুনের কথায় ভাবনায় ছেদ পড়লো আফসানার।
‘আপনি কিন্তু চাইলে এখনও গর্ভপাত করাতে পারেন। আপনাদের ভবিষ্যতে যে সকল সমস্যা ফেস করতে হবে, সেগুলো মাথায় রেখেই কিন্তু এই কথাটা বলছি। নয়তো একজন ডাক্তার কখনোই কাউকে এ্যাবোরশন করতে উৎসাহিত করেননা।’ চেয়ার সহকারে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে আফসানার দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন এই শহরের মধ্যবিত্তের অন্যতম ভরসা ডাক্তার আফলাতুন।
‘নাহ আমি পারবোনা’ বলেই শোয়েবের দিকে তাকায় আফসানা।মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দেয় ।
***
নিস্তব্ধতা যখন কথা বলে তখন সেই কথা আর্তনাদের মত শোনায়। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে নিস্তব্ধতা রোজ-ই কথা বলে; আর্তনাদ করে। হয়ত ঘরে ভাতের চাল নেই; এই নিয়ে তুমুল কথা কাটাকাটির পরে নিস্তব্ধতাই কথা বলে...
আবার পাশের বাসার ছেলের হাতে ক্রিকেট ব্যাট দেখে বাবার কাছে আবদার করে মার খাবার পরের নিস্তব্ধতাও আর্তনাদ করে। অপ্রাপ্তিগুলো সীমা ছাড়িয়ে অন্তরীক্ষে পৌঁছে গেলেই আর্তনাদের শুরু হয়। তবে মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত কোনো কিছুর থেকেও নিস্তব্ধতারা আর্তনাদের শুরু করে। ফকিরাপুলের এই ছোট দুইরুমের বাসায় এখন নিস্তব্ধতা তার কাজ করে যাচ্ছে। আর্তনাদ করে যাচ্ছে সাধ্যমত।
মুখোমুখি বসে আছে শোয়েব আর আফসানা। তিন তিনবার ইসিজি করার পরেও ঠিক নিশ্চিত হতে পারেননি ডাক্তার তাদের অনাগত সন্তানের কি শারিরীক সমস্যা আছে।
তবে এটা নিশ্চিত তাদের অনাগত মেয়ে পুরোপুরি সুস্থ নয়।
বড় রকমের একটা শারিরীক সমস্যা নিয়েই আসছে সে এই জগতে যেখানে কেউ কারও নয়, যেখানে মানুষ নামে রোবো মানবে ভর্তি সংসার, যেখানে বেঁচে থাকার তাগিদে আরেকজনকে পেছনে ফেলতে কেবল দৌড়াতেই হয় অথবা মিলিয়ে যেতে হয় হাওয়াই মিঠায়ের মত বাতাসের সাথে।
***
--------------জন্মের পর আর দশটা বাচ্চার মতই স্বাভাবিক লেগেছিল ওকে। ওর মা খুব শখ করে নাম রেখেছিল নীলুফা। আমি অবশ্য কখনো নীলুফা বলে ডাকিনি। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হত নীলুর কথা ভেবে। আমি যখন বুঝতে পারলাম ওর শারিরীক সমস্যাটার কথা, তখন ওর বয়স চারের মত। নীলু আর দশটা বাচ্চার মত বেড়ে উঠছিল না। ডাক্তাররাও বলে দিলেন ও আর বাড়বেনা খুব একটা। সুস্থ জীবন যাপন করতে পারবেনা। আফিসে আমাকে রোজ রোজ নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। আড়ালে কেউ কেউ বলে এটা আমাদের পাপের ফল যার কারনে আমাদের মেয়ে বামন হয়েছে। আবার কেউ বলে শয়তানের আছর।
আচ্ছা মানুষ হয়ে জন্মানোটাই কি নীলুর দোষ হয়ে গেছে? ওর জন্মের আগেই যখন ডাক্তার আমাদের ওকে এ্যাবোরশনের কথা বললো, তখন-ই ওকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আসলেই কি আজ ঠিক থাকতো সব? জানি নাহ আমি।
চাকুরিটা ছেড়ে দিব চিন্তা করছি, শেয়ার বাজারের ব্যাবসা করব। কত কত স্বপ্ন ছিল আমার আর আফসানার। মেয়েকে ভালো জায়গায় পড়াবো। এখন নীলুকে কোথাও ভর্তি করাতে পারব কি-না সেটাই বড় চিন্তা। আমাদের স্বপ্নের রংগুলো বিষাদ কালো হয়ে যাচ্ছে এক্কেবারে হুট করেই------------------- শোয়েবের হারিয়ে যাওয়ার তিন মাসে শোয়েবের ডায়েরির পাতাগুলো লক্ষবার পড়েছে আফসানা। কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো শোয়েব। সকালে একদিন বের হল তারপর ৩ মাস ১১ দিন হয়ে গেল তবুও ফেরত আসলো না সে।
প্রতিবারের মত এবারো ডায়েরিটা রাখার আগে একেবারে শেষ পাতায় চলে গেল আফসানা। সেখানে মোটা নীল কালিতে লেখা—
প্রিয় নীলু-
নীলের ফাঁকিতে আমাকে আর আটকে রাখা যায় না,
ওই আকাশ যেমন নীল; নীল জলের রং
সবাই বলে, বেদনার রং নাকি নীল!
কিন্তু নাহ! আমি তো তোমার নীল জামা কিংবা ছোট্ট নীল কাঁচের চুড়িতে বেদনার ছিটেফোঁটাও খুজে পাইনি।
তোমার নীল নোনাজলেই খুঁজে পাই আমি বেদনার সবকটি রং--
তোমার ভালোবাসার অনুভবে সারারাত্রি নির্ঘুম জাগা...'
কষ্টের অনুভুতিগুলোও অনেক কষ্টকর।
অবশেষে......
হারিয়ে যাবার পনেরো বছর পরেও শোয়েব ফিরে আসেনা। নীলার কোনো রকম চিকিৎসা করানো তো দূরের কথা দুইবেলা খাবার জোগাড় করতে নীলা এখন সার্কাস পার্টির রেগুলার ডান্সার। মানুষ নিজে ব্যতিক্রম কিছু করতে না পারলেও ব্যতিক্রম কিছু দেখে মজা লুটতে খুব ভালো পারে, নিতে জানে হস্তমৈথুনের পুরো স্বাদ।
‘হরিপদ সার্কাস পার্টির’ ব্যানারে তাই হয়তো ভুল বানানে লেখা থাকে, ‘সঙ্গে রয়াছে বামমুন (বাইট্টা) মেয়েছেলের দাড়ুন নাঁচ’
আফসানা শুনেছে সার্কাসে রেগুলার মেয়েদের নাকি মাঝে সাঝে ‘দিগম্বর’ হয়েও নাচতে হয়। এতে সার্কাসের কাটতি ভালো হয়। আবার ড্যান্সাররাও ভালো পয়সা-পাতি পায়। সে জানেনা নীলা কি করে সার্কাসে...... তাকেও কি......।।
ভাতের অভাব সবচেয়ে বড় অভাব আর পেট সব চেয়ে বেশরম জিনিস!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now