বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মা হবার অনুভূতি

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X " মা হবার অনুভূতি " ------নওশীন শিকদার আব্বু বিদেশ চলে যাবার পর,আমি,আম্মু নানুর বাসায় চলে আসি,আমার ছোটবেলা থেকেই রক্তে হিমোগ্লোবিনে প্রবলেম। যখন খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লাম,ডক্টর আমার কিছু টেস্ট করাতে দিল।তারিখটা ছিল উনত্রিশ আগস্ট, ক্লাস টু পড়ুয়া নওশীনের সেদিন ছিল জন্মদিন, যেদিন আমার ব্লাড টেস্ট করা হলো...।আমি ইনজেকশন খুববই ভয় পাই ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত! অথচ জন্মদিনের দিনই ইনজেকশন তারপর আবার আম্মুর আদর করে আমাকে আমার পছন্দের লাভ শেইপের চার পাউন্ডের কেক কিনে দেয়া... বাসায় এসে মোমবাতিতে ফু দিয়ে কেক কাটা.. স্মৃতিগুলো চমৎকার মিষ্টি! *** এক সন্ধ্যায় আম্মু প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে যায়.. অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ে নানুর রুমের মেঝেতে! বাসায় তেমন কেউ নেই হসপিটালে নেয়ার মতো... পাশের বিল্ডিং এর রীনা খালামনির মা কে এক দৌড়ে ডাকতে গেলাম, এই ছোট্ট নওশীনের ভেজা চোখে তখন আকাশের নীলচে তারাও ঝাপসা দেখাচ্ছিল.. পাশের ডিসপেনসারির ডাক্তার বললেন প্রেশার লো..।সারারাত বমি করে আম্মু, শেষরাতের দিকে ঘুমায়..।নওশীন কিন্তু তারপরও ঘুমায়না,ঘুমন্ত মায়ের মুখের দিক তাকিয়ে ছোটবেলা থেকেই চাঁপা স্বভাবের নওশীন তার মলাটহীন ছোট্ট খাতাটা ভরে ফেলে চোখের জলে ভেসে গিয়ে "আম্মু তোমাকে ভালোবাসি " লিখতে লিখতে...। ভোরের আলো ফোটার আগেই অবশ্য সেই খাতা চুপচাপ লুকিয়ে ফেলে নওশীন। *** কয়েকদিন পরঃ -- আম্মু আমরা কই যাই? -- ডাক্তারের কাছে যাই,রিপোর্ট আনতে,দুআ করো তোমার আম্মুর রিপোর্ট যেন ভালো আসে.. *** -- চুপ করে রিকশার হুড ধরে বসে থাক,আমি রিপোর্টটা নিয়ে এক্ষুনি আসতেছি। সিদ্বেশরীতে ডক্টর রওশন আরার সফেদ বিল্ডিংয়ের ক্লিনিকটার গেটের পাশে রিকশায় একা বসে আছে নওশীন.. চারপাশে নিজ কৌতূহলী চোখ দুটো মেলে মিষ্টিরঙা একটা জামা পরে। বেশকিছুক্ষন পরঃ -- আম্মু,রিপোর্ট ভালো আসছে? -- হমম..... আম্মুর পেটে একটা বাবু আছে! -- সত্যিই? -- হুমম! সত্যি আমার নওশীন বাবু। *** স্কুল দূরে হওয়ায় আম্মু বাবুকে পেটে নিয়েই ক্লাস ওয়ান টপকে ক্লাস টু পড়ুয়া নওশীনকে অনেক কষ্টে মালিবাগ মৌচাকের "মনিমুকুর শিশু বিদ্যালয়ে " দিয়ে ,সেখানেই বসে থাকত,দুপুরে ছুটি হলে আমাকে নিয়ে একবারে বাসায় আসতো। তবু কখনো নিজের অসুস্থতায় আমাকে স্কুলে দিয়ে আসা বাদ দেয়নি আম্মু। আম্মুর এমন সময়ে তেমন কেউ ছিলনা পাশাপাশি থেকে আম্মুর কেয়ার করার,আম্মুর ছোট ছোট শখগুলো আহলাদে পূরণ করার। মা হতে চললে একেকজনের নাকি একেক নেশা হয়! আম্মুর নেশা ছিল জনসন বেবী পাওডারের ঘ্রান নেবার! নিজের ছোট্ট দৃষ্টি দিয়ে একজন মা কে মা হতে দেখছিলাম প্রতিনিয়ত! *** কয়েকমাস পরঃ -- আম্মু.... তোমার পেটে মাথা রাখি? -- আস্তে রাখো.. ছোটো বাবু ব্যথা পাবে। -- আম্মু ...... আমি বাবুর আওয়াজ শুনসি!! -- কি বলিস এসব! -- হুমম... বাবু কি সুইট করে "আআআ..." করলো! -- নওশীন তুই পাগল হয়ে গেছিস! *** কয়েকমাস পরঃ -- বাবু,শোন আমি হসপিটালে গেলে কান্নাকাটি করবিনা একদম! -- আচ্ছা। -- আমি ছোট্ট একটা বাবুকে সাথে নিয়ে আসবো.. -- আম্মু তুমি এক্ষনি হসপিটালে যাওনা.. প্লীইইইজ! আমি এখনই বাবুকে কোলে নেবো! -- হইছে,ঢং করিসনা.. শোন, খাটের নিচে লাল ঝুড়িতে ঝিনুকের ছেঁড়া ঝালরটা আছে,তুই মালা বানাইস, সময় কেটে যাবে। -- আম্মু আমাকে তুমি করে বলোনা কেনো? -- ক্যান?! -- "তুমি" হচ্ছে আদরের ডাক! *** সময়টা ছিল শীতকাল..।ডিসেম্বরের কুয়াশার রাজ্য নামা এক রাতে আম্মুর পেইন শুরু হলো,বাসায় কোন ছেলেমানুষ ছিলনা। রাজিয়া খালামনি আমার হাত ধরে ভোরের আগেই বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন। ছোট্ট আমি কিছুই বুঝতে পারছিলামনা,আমার ঠান্ডা হাত আরো ঠান্ডা হয়ে আসছিল, মনে শুধুই প্রার্থনা ছিল ..আল্লাহ যেন সব ঠিক করে দেন!কুয়াশায় অন্ধকার রাস্তায় কোন গাড়ি নেই! সুবেহ সাদিকের আগের সময়টাতে গাড়ি পাওয়া সহজ কথা নয়! বেবী ট্যাক্সির গ্যারেজে গিয়ে বহু সাহস করে আমরা গেট ধাক্কাতে থাকলাম। কেউ যখন এলোনা.. সবাই যখন শীতের ভোরের ঘুমে ব্যস্ত ...তখন মাঝ বয়স্ক একজন ফেরেশতার মতো লোক উঠে এলেন,খুব তাড়াতাড়ি স্কুটার বের করলেন... গর্ভবতী একজন মায়ের কথা শুনে আর সেই মায়ের এই ছোট্ট মেয়ের বড় বড় চোখে বিশাল অস্থিরতা দেখে! *** আম্মু হসপিটালে যাবার পর আমি কেমন যেন ভেঙে পড়লাম, এতোবছরে কখনোই আম্মু ছাড়া কারো পাশে ঘুমাইনি.. নানু জোড় করে আমাকে তার খাটে তার পাশে ঘুমাতে বলে নিজে ঘুমিয়ে পড়ল।কিন্তু.. নওশীনের ভেতরটা ছটফট করা থামেনি! ছোটবেলায় আমার একটা স্বপ্নের অসুখ ছিলো। যখনই আমি খুব বেশী চিন্তিত ,অস্থির বা অসুস্থ থাকতাম,ঘুম আসতনা..তারপর যখন হুট করে ঘুমিয়ে পড়তাম,ভয়ঙ্কর একটা স্বপ্ন দেখতাম সবসময়,দম আটকে আসতে চাইত তখন, মাঝে মাঝে বাথরুমে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলেও মনে হতো আমার প্রতিবিম্বটা আমার দিকে ভয়ানক দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে অট্টহাসিতে! এবারও তার ব্যাতিক্রম হলোনা! আমি স্বপ্নে দেখলাম .... বিশাল গোছের কদাকার একটা লোক সূতার কারখানায় সূতা পেচিয়ে জমা করছে,আমি তার পাশে দাড়িয়ে আছি.. কিন্তু কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছিনা,দম আটকে আসছে প্রচন্ডভাবে .... আর আমার দিকে তাকিয়ে বিকট শব্দে হাসছে সেই লোক,এ হাসি যেন কোন সাধারণ হাসি নয়... খুনে হাসি! কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল আমার আর সেই দম আটকে আসা অনুভূতিতে বমি করে সমস্ত বিছানার চাদর নষ্ট করে ফেললাম,নানু আমাকে নির্দয়ভাবে অনেক বকাঝকা করলেন,বললেন আবার যদি এমন করি,আমাকে বারান্দায় ফেলে দরজা আটকে দিয়ে আসবেন! *** বেশ শীত পড়েছিল সেবছর।ডিসেম্বরের ছয় তারিখ। দুপুরবেলায় শুনলাম টেলিফোনে শুনলাম আমার একটা ছোট্ট বোন হয়েছে। তবে সেই ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত আম্মুর পেইন স্থায়ী ছিল, আম্মুর মারা যাবারও আশঙ্কা ছিল! বেবীর ওজন নাকি মাত্র পাঁচ পাউন্ড।মেয়ে বেবী হয়েছে শুনে নানু বেশ মন বেজার করে রইলেন। রাজিয়া খালামনি বলল.. বেবীটা নাকি পুতুলের মতো কিউট হয়েছে! হসপিটাল থেকে বাসার প্যাকেট বিরিয়ানি পাঠিয়েছে আম্মু, কিন্তু আম্মুকে ছাড়া আমি শখের বিরিয়ানিও খেতে পারলামনা, বাথরুমে গিয়ে বমি করে আসলাম। আমি আম্মুকে ছাড়া অবহেলায় একটা দিন পার করে দিলাম। পরদিন সকালে অনেক কষ্টে রুটি আর ঝাল ভাজি দিয়ে সকালের নাস্তা খাচ্ছিলাম। আম্মু এসেছে শুনতে পেয়ে বারান্দায় দৌড়ে গেলাম... মনে প্রচন্ড অভিমান ছিল.. যে ,কেন আমাকেও সাথে করে হসপিটালে নিয়ে না গিয়ে এখানে ফেলে গেছে আম্মু! ক্যাচিগেট খুললাম অভিমানী মুখে। আম্মুর সাথে ছিল শিউলী খালামনি। নানুতো মেয়ে বাবু শুনে কোলেই নেয়নি বেবীকে। অবশেষে বাবুটার মুখ দেখার মূহুর্ত এলো...যা এ জীবনে ভোলা আমার পক্ষে সম্ভাবনা! এতো সুন্দর কোন নিউ বর্নবেবী আজ পর্যন্ত দেখিনি আমি! ছোট হবার কারনে তুলো দিয়ে পেচানো ছিল আমার বোনটা,কিন্তু ওর মুখটা স্বর্গের কোন রাজকুমারীর মতোই ছিল! পাপড়িভর্তি চোখ মেলে কি অবাক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিল! ছোট ছোট লাল টুকটুকে হাত পা দেখে আনন্দে অবশ হয়ে গেছিলাম আমি! আর সবচেয়ে বড় ভালোলাগা ওর ছোট্ট রক্তের মতো টুকটুকে লাল ঠোঁট দুটি! বেশীরভাগ সময় আমি মৌমিতা মানে আমার আদরের ছোট্ট বোনটাকে কোলে নিয়ে বসে রইতাম,গান শোনাতাম...। ভোরবেলায় আযানের সুর ভেসে আসার সময়টাতে ,ঘরের ডিম লাইটের রঙিন আলো দেখে একদিনের একটা নিউবর্ন বেবী কেমন করে ঠোঁট গোল করে হাসে,পাপড়িভরা চোখ মেলে চারপাশে তাকায় তা উপভোগের মূহুর্তগুলো আজও আমাকে নাড়া দেয়! আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি,আগষ্ট মাসের দিকে আম্মু অসুস্থ হয়ে দশদিনের জন্য হলি ফ্যামিলি হসপিটালে ভর্তি ছিলেন,মৌ কে রাতজেগে মায়ের মতো দেখে রাখা, খাওয়ানো,ঘুম পাড়ানো..। কারো এতোটুকু স্নেহ, সাপোর্ট পায়নি ছোট্ট নওশীন! মা অসুস্থ, এ নিয়ে স্বান্তনা দেবার মতো কেউ ছিলনা পাশে। রাতদিন নির্ঘুম কাটাতাম। হলি ফ্যামিলিতে ক্যাবিনে আম্মুর পাশের বেডে একরাত ছিলাম,মৌ কে সাথে নিয়ে। মৌ কে সবভাবে টেক কেয়ার করা দেখে মানুষ বলাবলি করতো, ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া এই ছোট্ট মেয়ে কিভাবে এতোটা ম্যাচিউর। আসলে মৌয়ের মা হয়ে ওঠার ফিলিংস কাজ করতো আমার মাঝে। আম্মুর অপারেশন হয়েছিল আমার বার্থডের দিন,আম্মু হসপিটাল থেকেই আমার জন্য অনেকরকম খাবার পাঠিয়েছিল,কিছুই খেতে পারিনি। যখন শুনলাম অপারেশন সাকসেসফুল.. সেটাই ছিল আমার জন্মদিনের শ্রেষ্ঠ উপহার! *** অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। সেই নিউবর্ন বেবী মৌ এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে, আর সেই ক্লাস টু পড়ুয়া ছোট্ট নওশীন অনার্সে পড়ে। নানু মারা গেছেন,তবে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত মৌ কে ভালোবেসে,ভালো জেনে গেছেন। । সেই রীনা খালামনির মা ও মারা গেছেন। কয়েক শীত বসন্ত পেরিয়ে গেছে.... কিন্তু আম্মুকে ঘিরে সেই ডিসেম্বরের শীতের দিনগুলো আজও স্মৃতির পাতায় জোনাকির মতো জ্বলজ্বলে


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now