বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

একটি দাঁড়কাক কিংবা আমি

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X একটি দাঁড়কাক কিংবা আমি ---সাহিব আশরাফুল রাত ৪ টা ২৯ ঢুলুঢুলু চোখে চুপচাপ তাকিয়ে আছি আমি - জানালা দিয়ে । একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে । হালকা বাতাসে প্রথম শ্রাবণের সোঁদা গন্ধ ভেসে আসছে । আমি বুক ভরে তাই শুকছি - নিজের ক্ষয় হয়ে যাওয়া ফুসফুসটায় কেমন যেন একটা কোমল স্পর্শ অনুভব করছি । প্রচন্ড রকমের ঘুম পেয়েছে আমার , গত ৪২ ঘণ্টা ধরে জেগে থাকার ফল । অবশ্য ঘুম পেলেও আমি ঘুমাবো না । কারন জীবনের প্রথম স্বাধীন রাতটাকে নিজের মত করে উপভোগ করছি , আজকের রাতে কোনো পিছুটান নেই আমার । নিজের ভেতর একটা বুনো উল্লাস অনুভব করছি । কেমন যেন একটা বাঁধনহারা অনুভুতি । আশ্চর্য ! আজ আমি মুক্ত , ল্যাপটপ খুলে বসে পড়ে কিছু একটা লিখে ফেললে বাঁধা দিবে কেউ এখন । তবুও কেন যেন ল্যাপটপটার প্রতি একটা গা ঘিনঘিনে অনুভুতি হচ্ছে । তবু গা ঘিনঘিনে ব্যাপারটাকে দূর করে ওটা অন করলাম আমি । ১০ মিনিট পেরিয়ে গেলো । আমি চুপচাপ কি বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছি । Q , W , E , R , T …… অক্ষরগুলোকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে , মনে হচ্ছে যেন একেকটা গুবরে পোকা । কি-গুলোর উপর আঙ্গুল ছোঁয়ানোর সাহস পাচ্ছি না আমি । আঙ্গুল দিয়ে বেয়ে উঠে যদি ওগুলো আমার শরীরে এসে পড়ে ! মাথাটা ঠিক কাজ করছে না । কি অদ্ভুত ! গত ৪২ ঘন্টা আগেও লেখার নানান প্লট মাথায় শুঁয়াপোকার মত কিলবিল করছিলো । অথচ আজ ওদের টিকিটিরও দেখা নেই । ভাবতে পারছি না আমি । শেষমেশ ল্যাপটপটা হাইবারনেট মুডে রেখে ওঠে দাঁড়ালাম । পুব আকাশ ধীরে ধীরে ফর্সা হচ্ছে । আধো আলো আঁধারীতে আমার অগোছালো রুমটার দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠলাম আমি । গত ৪২ ঘন্টা আগেও ওটা নিখুঁত পরিপাটি করে সাজানো ছিলো । মাত্র ৪২ ঘন্টার ব্যবধানেই একেবারে গরুর গোয়াল ঘর বানিয়ে ফেলেছি আমি ! আমি ঘর গোছাতে জানি না । কাজটা অন্য কেউ করে দিতো । যদিও এর জন্য প্রচুর কথা শুনতে হতো আমাকে । আমি গা করতাম না । আড়ালে মুখ টিপে হাসতাম , অথবা কানে ইয়ারফোন গুঁজে স্লিপনটের চিতকার শুনতাম । বলা বাহুল্য , ওদের চিতকারের আড়ালে এসব কথা কোথায় যে হারিয়ে যেতো তা বুঝতেই পারতাম না । এখন অগোছালো রুমটা দেখে কিছুটা বিরক্তিবোধ জাগলো । এবারের গোছানোর কাজটা তাহলে আমাকেই করতে হবে , হুঁহ । মনে মনে বেশ রাগ পেলাম । অবশ্য ঠিক কার উদ্দেশ্যে রাগ্লাম তা জানি না আমি । কি দরকার ছিলো এখনই আমাকে এতোটা স্বাধীনতা দেয়ার ! ভাবতে ভাবতে অগোছালো টুকটাক ছড়ানো ছিটানো জিনিসগুলো গোছাতে লাগলাম আমি । টেবিলের নিচে কিছু ছেঁড়া কাগজ পরে আছে । ওগুলো হাতে তুলে দেখতে লাগলাম । আধো অন্ধকারেও চিনতে পারলাম আমি , কিছু পরীক্ষার প্রশ্ন ওগুলো । মনে মনে হাসলাম আমি । গত ৪২ ঘন্টা আগেও ওগুলো এখানে পড়ে থাকতে দেখে কি বকুনিটাই না শুনেছি । আর এখন ওগুলো পরে থাকলেও কেউ কিছু বলবে না , আমি স্বাধীন । কাগজগুলো দলামোচা করে বাস্কেটে ফেলে দিলাম । ওগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই আর । গত ৪২ ঘন্টা আগেই প্রশ্নগুলোর আবেদন ফুরিয়ে গেছে আমার কাছে । আবার কাজে হাত লাগালাম । এবার হয়েছে ! এক কোনে দাঁড়িয়ে সারা রুমে চোখ বুলালাম আমি । কিছুটা শ্রী ফিরেছে রুমের চেহারাটায় , এখন আর কেউ গোয়াল ঘর বলতে না পারলেও উল্লুকের ঘর বলতে পারে অবশ্য – তাতে আমি গা করি না । গোয়াল ঘর না বললেই আমি খুশি । অবশ্য এখন আর এসব বলার মত কেউ নেইও । মাথা চুলকাতে গিয়েই টের পেলাম , রুক্ষ চুলগুলোতে অনেকদিন যাবত শ্যাম্পু বা সাবান – কোনোটাই দেইনি । এর জন্য আমার কথা শুনতে হয়েছে , মাত্র ৪২ ঘন্টা আগেও ! আশ্চর্য ব্যাপার ! আগে রুক্ষ চুলগুলোতে সারাক্ষন হাত বুলোলেও আমার বিরক্তি লাগতো না । অথচ এখন কেমন জানি অপরিছন্ন মনে হচ্ছে নিজেকে । তোয়ালে টা ভাঁজ করে রেখেছি চেয়ারের হাতলটার উপর , একটু আগে । ওটা তুলে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম । ইচ্ছে করেই লাইট জ্বালালাম না । ভেন্টিলেটর দিয়ে সূর্যের মৃদু আলো আসছে । ওই আলোতেই আয়নায় নিজের মুখটার দিকে তাকালাম । নাকের চারপাশে ব্রনে ভরে গিয়েছে । থুতনির নিচেও খোঁচা খোঁচা দাড়ি । নিজের চেহারা দেখেই হেসে ওঠলাম আমি । এখন আর কেউ বলবে না আমার মুখে ময়লা জমে ব্রন উঠেছে , কেউ খোচা খোচা দাড়িগুলোকে কাটার জন্য বলবে না । অবশ্য কখনো রেজর লাগাইনি আমি । ছোট কাঁচি দিয়েই এতদিন কাজ সেরে এসেছি । আজ কেন যেন নিজেকে একেবারে পরিস্কার করে ফেলতে ইচ্ছে হলো । তাই কাঁচির বদলে রেজর তুলে নিলাম । আগে কখনো রেজর লাগাইনি । তাই কিছুটা সমস্যা হলো । তবে শেষ করে যখন নিজের মুখটাকে আবার আয়নায় দেখলাম , তখন কেমন যেন বাচ্চা বাচ্চা লাগলো নিজেকে । সেই ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া আমিতে ফিরে গেলাম , যখন বিকেলে ঘুম থেকে ওঠেই ডানহাতে হরলিক্সের বোতলে স্ট্র লাগিয়ে চুষতে চুষতে মাঠে খেলতে যেতাম । আর বামহাতে বহু রংয়ের রাবার বল , দামটা ঠিক মনে নেই আমার । পুরোনো আমিকে দেখে খানিকটা লজ্জা পেলাম আমি । আমি না এখন স্বাধীন ! আমার এখন পুরোনো আমি তে পড়ে থাকলে চলবে কি করে ! জীবনে প্রথম বারের মত টানা ৫ মিনিট সাবান লাগালাম আমি – ইম্পেরিয়েল । ওটা ঠিক আমার হাতে আঁটে না , তাই কতবার যে ওটা টয়লেটের কোমোডে পড়লো আর কতবার যে বকুনি খেয়েছি , তার ইয়ত্তা নেই । আজকে হঠাত দুষ্টু বুদ্ধি চাপলো । একবার কোমোডের দিকে তাকালাম মাত্র । তারপরেই সুন্দর করে সাবানটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম কোমোডের ভেতর । ওটা প্রাসের সুত্র মেনে সুন্দর করে কোমোডের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে । আর আমি অবাক হয়ে তা দেখছি ! আজ কেউ আমাকে বকুনি দিবে না এর জন্য – আমি যে স্বাধীন্ ! শাওয়ারের নিচে খানিকটা সময় কাটিয়ে শরীর মুছতে মুছতে বের হলাম । এখনো শরীর থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে । সেই পানি মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছে । আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পানির গড়িয়ে যাওয়া দেখছি ! পারদের মত টলটল করে এগিয়ে যাচ্ছে পানির ধারা । আজ সারা ঘর ভিজিয়ে ফেললেও কেউ কিছু বলবে না , তাই পানির ধারাটা থামানোর কোনো চেষ্টাই করলাম না আমি । যেদিকে খুশি যাক ওটা । কাপর চেঞ্জ করে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম । নিজের দিকে তাকিয়ে কেমন অদ্ভুত মনে হলো যেন ! এক নতুন আমিকে দেখছি আমার সামনে , যার চোখে খেলা করছে মুক্তির বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস । সেই চোখে বিষাদের লেশ মাত্র নেই ! আয়নার সামনে থেকে সরে এসে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম । এক কোণে কাকাতুয়ার খাঁচাটা ঝুলে আছে । খাঁচাটার ভেতর কাকাতুয়াটা চুপচাপ বসে আছে । ওটাকে আমিই এনেছিলাম । আজকে কেন যেন মায়া হলো ওটার প্রতি । কাছে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম আমি । অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ওটার নড়ার কোনো লক্ষণ নেই ! বেশ বদ তো ব্যাটা ! “ বেরিয়ে যা , তুইও আজ স্বাধীন , একেবারে আমার মত !” কথাটা বলে একটু হাসলাম আমি । তবু ওটার নড়ার লক্ষন নেই । বরং আরেকটু চেপে বসলো যেন । “ এখানে থেকে কি করবি রে ? আমি নিজেই তো চলে যাচ্ছি ! তুইও যা , নইলে না খেয়ে খাঁচায় আঁটকে মরতে হবে !” গম্ভীরভাবে মাথা একপাশে কাত করে আমার কথা কয়টা শুনলো যেন । তারপর সামান্য একটু নড়লেও ঠায় বসে থাকলো । শেষে বিরক্ত হয়ে ওটাকে টেনে বের করে বারান্দার গ্রিলের বাইরে হাত নিয়ে ছেড়ে দিলাম । এবার বেচারা না ওড়ে যাবে কোথায় , হুঁ হুঁ হুঁ ! সত্যিই এবার কাকাতুয়াটা ওড়ে চললো , মুখ দিয়ে বিচিত্র সব শব্দ করতে করতে । আমি কখনো কথা শিখাইনি ওটাকে , নিজেই তো প্রাধীন ছিলাম , অন্যকে কথা বলার অধিকার করে দিবো কিভাবে ! কথা বলতে না পেরেই বোধহয় ওটা কিচকিচ শব্দ করতে করতে গেলো – ভাবি আমি । শুন্য খাঁচাটা রেখে আর লাভ নেই । ওটা বাম হাতে ঝুলিয়ে রুমের ভেতর আনলাম । একটু পর বাইরে যাবো । তখন ওটাকে সাথে করে নিয়ে যেতে হবে । বাসায় খাওয়ার মত কিছু রাধা আছে কিনা তা দেখতে ফিজ খুললাম । ভেতর থেকে কয়েকটা বাটি বের করলাম , খালি ওগুলো । ডাইনিং টেবিলের উপরে ঢাকনা দিয়ে ঢাকা তরকারী আর ভাত পেলাম । ঢাকনা তুলতেই একটা পঁচা গন্ধ এসে নাকে ধাক্কা মারলো । পঁচে গেছে ওগুলো । খাওয়া যাবে না , গত ৪২ ঘন্টা ধরে বাইরে আছে , পঁচবে না তো কি হবে ! ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে এলাম । এক মাত্র ডিমটাই ভাঁজতে পারি আমি । তাই চুলায় আগুন দিয়ে ডিম ভেজে নিয়ে এলাম । আপাতত ওটা খেয়েই চলি । গত ৪২ ঘন্টা ধরে কিছু খাইনি , তাই প্লেটের ডিমটা দেখতে না দেখতেই শেষ হয়ে পড়লো । পেটে আর কিছু না হোক , এই সামান্য দানাপানিটুকু পড়ে যথেষ্ট ভালো লাগছে । হ্যা , এবার নতুন ভাবে নিজের স্বাধীন ভাবটা এসেছে আমার মাঝে । ছবির এলবামটা ড্রয়ার থেকে বের করে কয়েকটা ছবি পকেটে ভরলাম । তারপর খাঁচাটা হাতে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম । রাস্তাঘাট সম্পুর্ণ ফাঁকা । এত ভোরে নগর এখনো জেগে ওঠেনি । পিচঢালা চকচকে রাস্তাটায় গতকালের বৃষ্টিতে এখানে সেখানে পানি জমে আছে । সেগুলোর মাঝে প্রায়ই সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে চোখে পড়ছে । ব্যাপারটা আগেও দেখেছি । তবে আজকে অন্যরকম লাগলো । হয়তো আজ আমি স্বাধীন বলে !! সামনেই ডাস্টবিন । পাখির খাঁচাটা ওটায় ফেললে গিয়ে একটা হাড় জিরজিরে কুকুর পেলাম । ডাস্টবিনের ভেতর মুখ ডুবিয়ে খাবার খুঁজছে । একবার আমার দিকে শুধু মুখ তুলে তাকালো , তারপরই আবার নিজ কাজে মন দিলো । কেন জানি ওটাকে আজ খুব আপন লাগছে । ওটার গলা জড়িয়ে ধরে নিজের কথাগুলো বলতে ইচ্ছে করছে । তবে আমি জানি , ওটা আমাকে সেই সুযোগ দিবে না । খাঁচাটা ফেলে তাই হাঁটতে লাগলাম । ********* সামনেই হাসপাতারের গেট । গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা বড় করে শ্বাস নিলাম । হাসপাতালের ভেতর অক্সিজেনের অভাব বোধ হয় কি না , তাই আরকি । অক্সিজেন নেয়া শেষ । আমি ধীরে সুস্থে ভেতরে ঢুকে গেলাম । এতো ভোরে লোকজন কিছুটা কম । চুপচাপ করিডোর ধরে হাটছি আমি । সেই ছোটবেলা থেকেই হাসপাতাল দেখলে গা ঘিনঘিন করে আমার । বমি বমি ভাব হয় । তাই যতসম্ভব হাসপাতাল থেকে দূরে থাকতে চেয়েছি । অথচ গত ৪২ ঘন্টা আগেও এই হাসপাতালে টানা আটটি ঘন্টা কিভাবে যে কাটিয়েছি তা নিজেও জানি না । বার্ন ইউনিটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাতড়াতে থাকা রোগীর আওয়াজে ভরে ওঠলো চারপাশ । অবশ্য তাতে মোটেও বিচলিত না আমি । বরং এই কাতড়াতে থাকা গোঙ্গানিটাকেও বেশ লাগছে শুনতে । একবার ভাবি আমার বোধহয় মানুষ হিসেবে যে গুনাবলিটুকু ছিলো , সেগুলো বিলুপ্ত হচ্ছে , আবার ভাবি , না ঠিকই আছে । এটা আসলে হঠাত মুক্তি পাওয়ার আনন্দ ! শিশু ইউনিটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার ভেতরে উঁকি দিলাম । ছোট্ট ছোট্ট দেহগুলোকে দেখে মায়াই লাগলো । বেচারারা ! আফসোস করলাম আমি । ওরা স্বাধীনতা পাবে না । আমার মত বন্দী থাকতে হবে ওদের , প্রতিটা কাজে বকুনি শোনা লাগবে , আহা ! একবার ভাবি ছোট্ট কোনো দেহকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি , “ তোমার স্বাধীনতা লাগবে ? লাগলে বেরিয়ে পড়ো , মুক্তির আনন্দ বড্ড বেশি ! এই দেখো – আমি কেমন সুখে আছি !” ওদেরকে জিজ্ঞেস করার চিন্তাটা বাদ দিলাম । আমি জানি , ওরা কথা বলতে পারবে না । ওরা তো স্বাধীন নয় ! ওদেরকে আসলে কথা বলতে দেয়া হয় না ! তাই শুধু শুধু প্রশ্ন করার মানে হয় না । ওখান থেকে চলে আসি আমি । হাঁটতে হাঁটতে সেই ডাক্তারটাকে দেখতে পেলাম , যার সাথে গত আটটি ঘন্টা কেটেছে আমার । উনার খোঁজেই এখানে আসতে হলো - গত ৪২ ঘন্টা আগেও অবশ্য এসেছিলাম , ঠিক এখানেই । আমাকে দেখে চোখ কুঁচকালো একটু । বিনিময়ে সুন্দর একটা হাসি দিয়ে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে দিলাম । গত আট ঘন্টার খরচ । টাকা কয়টা দিয়েই বেরিয়ে আসলাম হাসপাতাল থেকে । ডান হাত পকেটে ঢুকিয়ে চুপচাপ হাটতে থাকলাম । নিজেকে এখন আলেকজান্ডার আলেকজান্ডার লাগছে । আমি স্বাধীন ! আমি যেদিকে খুশি সেদিকে যেতে পারি ! আমাকে বাঁধা দেয়ার কেউ নেই ! আমার কোনো পিছুটান নেই ! কারন গত ৪২ ঘন্টা আগেই সকল পিছুটান কাটিয়ে এসেছি আমি ! ************ কবরস্থানের গেটটার সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম । ভেতরে কেউ নেই । একেবারে সব নিস্তব্ধ । ধীর পায়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম , হাত দিয়ে ঠেলা দিতেই সামান্য ক্যাঁচকোঁচ করে ওঠলো পুরোনো লোহার গেইট । ওটা খুলে সোজা পুর্ব দিকে হাটতে লাগলাম । ১৭ নাম্বার সারির ৩৯ নাম্বার কবর । স্পষ্ট মনে আছে আমার । চারদিকে সারি সারি কবরের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা অদ্ভুত চিনাত ঢুকলো মাথায় । মৃতরাও কি আমার মত স্বাধীন ? তাদের কি যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার আছে ? তারাও কি আমার মত স্বাধীন হওয়ার অনুভুতি কেমন তা বুঝতে পারে ? প্রশ্নটা করতে মন চাইলো । তবে পারলাম না , নীরবতাটা ভাংতে মন সায় দিচ্ছিলো না । নিস্তব্ধ মৃত্যুরাজ্য দেখতে দেখতে এগুতে লাগলাম । এই মৃত্যু রাজ্যেরও একটা সৌন্দর্য আছে - ব্যাপারটা আজই প্রথম বুঝতে শিখলাম । দাঁড়িয়ে আছি আমি – ১৭ নাম্বার সারি , ৩৯ নাম্বার কবর । গতরাতের বৃষ্টিতে নতুন মাটি কিছুটা আলগা হয়ে গিয়েছে । কাঁচা বাঁশের বেড়ার নীচ দিয়ে আলগা মাটি বেরিয়ে এসেছে । বেড়ার গা ঘেঁসে বসে পড়লাম আমি । দুহাতে একটু একটু করে মাটির ঢেলা তুলে আবার কবরের উপর ছড়িয়ে দিচ্ছি । কাঁচা বাঁশের গন্ধটা নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে আমার । আমি মাটির ঢেলা তুলছি , আর ছড়িয়ে দিচ্ছি কবরের উপর – যন্ত্রচালিত কলের পুতুলের মত । বৃষ্টি ভেজা কাঁদামাখা হাতের উপর কয়েক ফোঁটা উষ্ণতা অনুভব করে চমকে ওঠলাম ! এবং গত ৪২ ঘন্টার মাঝে প্রথমবারের মত খেয়াল করলাম – কাঁদছি আমি ! আস্তে আস্তে আলগা মাটিগুলো ঝাপসা হতে লাগলো চোখের সামনে । ৪২ ঘন্টায় জমানো অশ্রুটুকু হঠাত যেন সব একসাথে বেরিয়ে আসতে চাইছে । আর পারলাম না আমি । আস্তে করে কাঁচা বাঁশের বেড়ার ফোঁকর দিয়ে মুখ রেখে বিড়বিড় করে ডাকলাম , “ মা !” কোনো সাড়া নেই । আবার ডাকলাম আমি । “ মা !” এবারো কোনো সাড়া নেই । আর পারছি না আমি । গলার ভেতর থেকে কি যেন একটা উঠে আসতে চাইছে । চেষ্টা করেও সেটা আঁটকাতে পারছি না । আমার মুক্ত সত্ত্বাটা হঠাত যেন মিলিয়ে গেলো কোথাও । “ আমি এমন স্বাধীনতা চাইনি , সত্যি বলছি আমি , একবার বিশ্বাস করো , আমি সত্যিই এমন স্বাধীনতা চাইনি । গত ৪২ টি ঘন্টা ধরে আমি অনুভুতিহীন ছিলাম । একেবারেই অনুভুতিশুন্য । আমি অস্বীকার করবো না , যখন তোমায় চলে যেতে দেখি , তোমার নিষ্প্রাণ হাতটা তখনো আমার মুঠোয় ধরা ছিলো । ডাক্তার যখন বললো – অল ইজ অভার , তখন সত্যিই একটি মাত্র সত্ত্বা কাজ করছিলো আমার মাঝে । আমি মুক্ত ছিলাম । আমাকে আর কেউ বাঁধা দিবে না কোনো কাজে , আমি গোসলে সাবান না মাখলেও কেউ বলবে না , “ তোর শরীর থেকে তো ছাগলের গন্ধ বের হচ্ছে , যা গোসল করে আয় আবার ।” আমি ঘর না গোছালেও কেউ বলবে না , “ ঘরটাকে গোয়াল ঘর বানিয়ে রেখেছিস একেবারে , তুই কি কোনোদিনই মানুষ হবি না ?” যেখানে সেখানে প্রশ্ন ফেলে রাখলেও কেউ বলবে না , “ পরীক্ষা শেষ বলেই কি এগুলো ফেলে রাখতে হবে ? পরের পরীক্ষার জন্য প্র্যাকটিস তো করতে পারবি ! ওগুলো গুছিয়ে রাখ !” আমাকে আর কেউ বকবে না , আমি মুক্ত ! জানি না কেন যেন এই অনুভুতিটাই কাজ করছিলো তখন , তোমার হাতটি ধরে তাই ই ভাবছিলাম আমি । একদিকে আমার মুক্ত সত্ত্বা – অন্য দিকে তোমার আঁচল ধররে বেড়ে ওঠা ছোট্ট আমি’ সত্ত্বা – দুটোর পারস্পরিক দ্বন্দে আমি সত্যিই হারিয়ে গিয়েছিলাম । আমি এমন স্বাধীনত চাই না , যে স্বাধীনতা আমাকে তোমার বকুনি শোনার অধিকারটুকু কেড়ে নেয় । এমন জীবন চাই না আমি , যা প্রতিটি মুহুর্তে আমার অসহায়ত্ব প্রমাণ করে , চাই না এসব । আমি পুরোনোতে ফিরতে চাই , আগের মত ভয় পেয়ে তোমার আঁচলে মুখ লুকোতে চাই । সত্যি বলছি আম্মু , আগের মত আবার তোমার বকুনি শুনে কানে ইয়ারফোন গুঁজতে চাই আমি , বিশ্বাস করো…….” জমানো কথাগুলো আর বলতে পারলাম না আমি । গলায় ওঠে আসা বাঁধাটা আমাকে বলতে দিচ্ছে না কিছু । কতক্ষণ এভাবে থাকলাম জানি না । কাছেই কোথাও একটা কাক ডাকার আওয়াজ পেলাম । কাঁচা বাঁশের বেড়ার ফাঁক থেকে মুখ তুলে তাকালাম । আমার সামনের গাছটাতেই কালো কাকটা বসে আছে । ঝাপসা চোখে একবার তাকালাম আমি । আবার কা কা করে ওঠলো ওটা । আচ্ছা , ওটাও কি আমার মত একা নাকি ? হবে হয়তো বা । মাথা দোলালাম আমি । কাঁচা বাঁশের বেড়া ধরে ধীরে ধীরে ওঠে দাঁড়ালাম আমি । আমি জানি না , কবে আমি আবার আম্মুর কাছে যেতে পারবো , অথবা যাওয়ার সৌভাগ্য হবে কিনা । তবে এটা জানি , এই পৃথিবীতে একা হলেও আত্মহত্যা করতে পারবো না আমি । আমাকে একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে , নতুবা অপেক্ষা করতে হবে হবে , যতদিন না আমি আম্মুর ছোট্ট ছোট্ট কিছু স্বপ্ন পূরন করতে পারি । আম্মুর কিছু স্বপ্ন ছিলো আমাকে নিয়ে , ওগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত আমার ছুটি নেই , আমাকে ততদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে হবে । একমাত্র তার পরেই মিলবে আমার ছুটি । শেষবারের মত আম্মুর কবরের দিকে তাকালাম । কাঁচা বাঁশের বেড়া থেকে অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ বের হচ্ছে । কাকটা আবার ডেকে ওঠলো । কা কা কা ওটাকে উড়ে যেতে দেখলাম গাছটা ছেড়ে । আমাকেও যেতে হবে । আরেকবার কবরটার দিকে তাকিয়ে উল্টো ঘুরে হাঁটা দিলাম । আমার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসছে আবার । হাতের উপর কয়েকফোটা উষ্ণতাও টের পেলাম । পেছন থেকে আম্মু আমাকে ডাকলো না । আর কেউ না জানুক , আম্মু তো জানে – তার অগোছালো ছেলেটি এবার গোছালো হতে শিখছে । তার সেই ছন্নছাড়া অবাধ্য ভীতু পিচ্চিটি – যে কিনা সামান্যতেই শাড়ির আঁচলে মুখ লুকাতো , সেই পিচ্চিটি আজ হঠাত করেই বুঝতে শিখেছে , সে বড় হয়ে গিয়েছে । তাকে এগিয়ে যেতে হবে সামনে - একা একা । তার সামনে যে অনেক লম্বা পথ ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now