বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ভুল মানুষ :: চতুর্থ পর্ব

"ওয়েস্টার্ন গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X কিন্তু জন রায়ান ভাঙে, কিন্তু মচকায় না। নিজের সম্পর্কে এমনি ধারণা ওর। জীবনে অনেক বড় বড় সঙ্কটের মুখে পড়তে হয়েছে ওকে। জীবন সংশয় হয়েছে। তবে প্রত্যেকবারই সঙ্কট থেকে উতরে এসেছে নিজের কঠিন মনোবল আর চেষ্টার মাধ্যমে। যে কোনো বিপদেই মাথা ঠাণ্ডা রাখা ওর সহজাত অভ্যাস। অভ্যাসটা গড়ে ওঠার মূলে কাজ করেছে ওর বুড়ো দাদুর জীবনভর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে শোনা বিভিন্ন গল্প। দাদু ছিলেন পশ্চিমের একদম প্রথম দিককার সেটলার। বৈরী সময় আর পরিস্থিতির মোকাবিলা করে বেঁচে থাকতে হয়েছে ওদের। লড়তে হয়েছে ইন্ডিয়ান, আউট ল’ আর দখলদারদের বিরুদ্ধে। দাদু সারা জীবন প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচেছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নাতিকে শিখিয়েছেন কীভাবে বৈরী পরিবেশের বিপরীতে বেঁচে থাকতে হয়। দাদুর একটা কথা খুব মনে পড়ে ওর। বুড়ো ঘাগু সব সময় বলতেন, ‘এমন কোনো সমস্যা নেই, যা সমাধান করা মানুষের পে সম্ভব নয়। দরকার শুধু সমস্যাটাকে ঠিক মতো বোঝার চেষ্টা করা আর সমাধানের উদ্যোগ নেয়া। সমাধানের উপায়টা আপনা আপনিই বেরিয়ে আসে।’ জন রায়ান বহুবার বহু বিপদ থেকে বেরিয়ে এসেছে। এমন সব বিপদ, যা একজন মানুষকে হতবিহ্বল করে দেয়। স্বাভাবিক বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়। আত্মসমর্পণ করে বসে ভবিতব্যের কাছেÑÑএবং শেষে মারা যায়। ও জানে, এখন তার ঘোর বিপদ। এ রকম বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া ধরতে গেলে অসম্ভব। কিন্তু এই অসম্ভবটাকেই সে সম্ভব করে তুুলবে। অত সহজে হার মানবে না। একবার নিউ মেক্সিকোতে এমন ভয়ানক এক বিপদের মুখে পড়েছিল রায়ান। মরুভূমিতে তাকে এক নাগাড়ে তিন সপ্তাহ কাটাতে হয়েছিল। ওর সঙ্গে কোনো ঘোড়া ছিল না। এর মধ্যে নয়দিন তাকে অ্যাপাচিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই টিকে থাকতে হয়েছিল। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল এক অ্যাপাচিকে ধাওয়া করার মধ্য দিয়ে। লোকটা মরুভূমিতে একা পেয়ে একটা পরিবারের সবাইকে খুন করে ওদের মালপত্র লুটে নিয়েছিল। ওই পরিবারটা ছিল রায়ানের পরিচিত। রায়ান খবর পেয়ে ওই অ্যাপাচির পিছু নেয় এবং ধাওয়া করে শেষ পর্যন্ত খুন করে বন্ধুহত্যার প্রতিশোধ নেয়। কিন্তু এরই মধ্যে ওর পিছু নিয়েছিল ওই অ্যাপাচির গোত্রের সতেরো জন যোদ্ধা। প্রথম ধাক্কায় ওদের হাতে খুন হতে হতেও বেঁচে যায় রায়ান। অবশ্য ওর ঘোড়াটাকে গুলি করে মেরে ফেলে ওরা। এরপর শুরু হয়ে যায় এক অসম লড়াই। ঠিক লড়াই নয়, লড়াকু সতেরো জন অ্যাপাচির হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর এক অবিশ্বাস্য, প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। আপাচিদের এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে লড়ে বেঁচে থাকাটা এক অসম্ভব ব্যাপার। আর সে লোক যদি হয় শ্বেতাঙ্গ, সে েেত্র সম্ভাবনাটা শতকরা একভাগও থাকে না। কিন্তু রায়ান সে-অসম্ভবটাকে সম্ভব করেছিল অবিশ্বাস্য মনের জোর আর প্রচণ্ড ক্রোধ দিয়ে। সতেরো জন অ্যাপাচিদের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, বলা যায় লুকোচুরি খেলতে খেলতে সে যখন ুধা, পিপাসা আর কান্তিতে মর মর হয়েছে, ঠিক সে সময় মনের মধ্যে ভেসে উঠেছে মরুভূমিতে মৃত্যুপথযাত্রী বন্ধুর তীব্র যন্ত্রণায় কাতর মুখটি। ওর পেছনের ট্রেইলের কোনো এক জায়গায় পড়েছিল স্ত্রী আর শিশুসন্তানের মৃতদেহ। রায়ান কথা দিয়েছিল ওই অ্যাপাচিকে সে খুঁজে বের করে হত্যা করে এর বদলা নেবেই। বন্ধুকে কবর দিয়ে ওর মৃত স্ত্রী-সন্তানের মৃতদেহ খুঁজে বের করে সে। তাদেরও কবর দেয়। তারপর পিছু নেয় ওই অ্যাপাচির। দুরন্ত ক্রোধে ধাওয়া করতে করতে ওর এলাকায় পৌঁছে ওর নাগাল পায় সে। তারপর খুন করে। এরপরই সতেরো জন অ্যাপাচি পিছু ধাওয়া করে ওকে। মৃত্যুপথযাত্রী বন্ধুকে কথা দিয়েছিল সে প্রতিশোধ নেবে। সে কথা রেখেছে ও। তারপর নিজেও বেঁচে এসেছে প্রায় অলঙ্ঘনীয় এক মৃত্যুর ঘেরাটোপ থেকে। যতটা না সাহস, শক্তি আর দতা দিয়ে, তার চেয়ে বেশি ইচ্ছাশক্তি বলে। রায়ানের এখনকার অবস্থাও সেরকম ভয়াবহ। এখানে তাকে উদ্ধার করার জন্যে কেউ আসবে না। জনহীন মরুভূমিতে কারো সাহায্যের প্রত্যাশা করার কোনো কারণ নেই। এ-অবস্থায় মৃত্যুই শেষ পরিণতি। কিন্তু জন রায়ান কোনো কিছুর শেষ না-দেখে ছাড়ে না। যারা তার এ অবস্থা করেছে, তাদের সে চেনে না। ওদের কাছে কোনো ঋণ ছিল ন ওর। কিন্তু এরপরও সম্পূর্ণ বিনা-কারণেই ওরা তাকে অসহনীয় এক কষ্টকর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। ওদের এই ধৃষ্টতার শোধ না-তুলে সে মরে কেমন করে? এরকম দুরাচারের প্রতিকার না-করে মরাটাও তো অন্যায় হবে ওর। নিজের ভেতর প্রচণ্ড ক্রোধ আর দুরন্ত এক ইচ্ছাশক্তি টের পাচ্ছে রায়ান। জীবন-মরণের সন্ধিণে দাঁড়িয়েও এই অর্থহীন মৃত্যুকে প্রবল তেজে অস্বীকার করতে চাইছে ওর মন। হাল ছেড়ে দেয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। সে এখান থেকে বেঁচে ফিরবে এবং যারা তার এ-অবস্থা করেছে, তাদের এর মাশুল কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দেবে। ওরা জানে না ওরা যার গায়ে হাত তুলেছে, তার নাম জন আব্রাহাম রায়ান। কষ্ট হচ্ছে খুব। কিন্তু পাত্তা দিতে চাইছে না সে। প্রাণান্তকর চেষ্টায় মাথা ঘোরাচ্ছে চারদিকে। দেখতে চাইছে ঠিক কোন ধরনের জায়গায় ওরা ওকে ফেলে গিয়েছে। জায়গাটা উঁচু-নিচু নয়, সমতলই মনে হচ্ছে। এখানে সেখানে ভাঙাচোরা পাথরের চাঁই আর উস্কখুস্ক পাইনের ছড়াছড়ি। মাথার পেছনের অংশে কী আছে দেখার জন্যে এক অসম্ভব চেষ্টা চালাচ্ছে ও। অতি কষ্টে এপাশ-ওপাশ করল। মাথাকে যতটা সম্ভব ঘোরানো যায় ঘোরাবার চেষ্টা করল। তাতে অবশ্য খুব বেশি কাজ হলো না। তবে এটুকু আন্দাজ করতে পারল যে, বাঁচার জন্যে চেষ্টা চালানোর মতো কিছু না কিছু উপায় খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে। কথাটা বুঝতে পেরে মনে কিছুটা স্বস্তি পেল রায়ান। জায়গা থেকে নড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে ও। কিন্তু শরীরে অসহ্য ব্যথার কারণে খুব একটা সুবিধে করতে পারছে না। ব্যথা আবার নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে ঢিলে দিল না সে। দাঁতে দাঁত কামড়ে সহ্য করছে। আস্তে আস্তে ইঞ্চি ইঞ্চি করে জায়গা থেকে নড়ার চেষ্টা করছে। অনেকণ চেষ্টা করে কয়েক ফুট সরে গেল জায়গা থেকে। হাঁফাতে হাঁফাতে বিশ্রাম নিতে লাগল রায়ান। খাণিকণ পর আবার চেষ্টা চালাল। কয়েক ফুট এগিয়ে আবার বিশ্রাম নিল। আরো প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে পুরোটা ঘুরে গেল। এখন তার পা যেদিকে আগে মাথা ছিল সেদিকে। ‘হুঁ,’ কোলা ব্যাঙের মতো ঘোঁৎ শব্দ বেরোল ওর মুখ থেকে। ‘এবার মনে হয়, একটা উপায় খুঁজে বের করতে পারব।’ ব্যথা, পরিশ্রম আর উদ্বেগে গলার স্বর বিকৃত হয়ে গেছে ওর। গলা শুকিয়ে কাঠ। জিভ নড়তে চাইছে না। পিপাসায় বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করছে। তবে এসব অসুবিধেকে পাত্তা দিচ্ছে না সে। ওর কাছ থেকে গজ পঞ্চাশেক দূরে একটা অ্যারোয়ো। আর অ্যারোয়ো মানে হলো একটা ভালো আশ্রয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, অ্যারোয়োর ভেতরে শুয়ে নিশ্চিন্তে মৃত্যুর জন্যে অপো করতে পারবে। খোলা মরুভূমিতে রোদে শুকিয়ে মরার চেয়ে ছায়াময় একটা জায়গা বেছে নিয়ে মৃত্যুর অপো করাটা কিছুটা হলেও আরামের। তবে রায়ান এখনই হাল ছেড়ে দিচ্ছে না। যতণ নাক দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস চলবে, ততণ হাল ছেড়ে দেয়ার কথা ভাববে না সে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল রায়ান। ধীরে ধীরে গড়াতে শুরু করল অ্যারোয়োর দিকে। কিন্তু মিনিটখানেক গড়িয়ে যেতেই অসহযোগিতা শুরু করল শরীর ও মন দুটোই। মনে হচ্ছে স্রেফ পণ্ডশ্রম। সে কখনো ওই অ্যারোয়োর কাছে পৌঁছাতে পারবে না; তার আগেই জ্ঞান হারাবে এবং সে-অবস্থায় মারা যাবে। কিন্তু বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছের কাছে হার মানল শারীরিক যন্ত্রণা আর মানসিক অনীহা। দাদু বুড়ো ম্যাক রায়ানের কথা মনে পড়ল। দাদু গল্প শেষ করে বলত, ‘বাছা, আশা ছাড়বি না কখনো। তাহলে দেখবি একটা না একটা উপায় বেরিয়ে পড়েছে।’ আস্তে আস্তে গড়াতে গড়াতে প্রায় মিনিট দশেক পরে অ্যারোয়োর পাড়ে গিয়ে পৌঁছাল রায়ান। তাকাল নিচের দিকে। পাড়টা খাড়া নয়, ঢালু। তবে অসংখ্য পাথরের টুকরো মাথা জাগিয়ে আছে। ধারাল পাথর গড়িয়ে নামতে গেলে শরীর কেটে ফালা ফালা হয়ে যাবে। কিন্তু নামার জন্যে আর কোনো উপায় দেখছে না সে। ধারাল পাথর! সম্ভাবনাটা বিদ্যুৎ ঝলকের মতোই মাথায় এল রায়ানের। ওর দরকার এই ধারাল পাথরই। তীক্ষ্ম চোখে পরখ করতে শুরু করল সে পাথরগুলোকে। বেশির ভাগই মাটিতে পোঁতা। ওর দরকার এমন একটি পাথর, যেটির এক প্রান্ত ধারাল এবং প্রান্তটি মাটি থেকে আলগা। আবার অন্য প্রান্তটি মাটিতে ভালোভাবে গাঁথা। শুধু তাই নয়, আলগা প্রান্তটি ভূমি থেকে বেশি উঁচু হলেও চলবে না। অনেক দেখে শুনে একটা পাথর বাছাই করল সে। পাথরটা একদম অ্যারোয়োর তলার কাছাকাছি। মাটি থেকে কতটা উঁচু ওপর থেকে সেটা আন্দাজ করা যাচ্ছে না। তবে পাথরটির প্রান্ত দেখে বোঝা যাচ্ছে, ওটায় ঘষে কোনো কিছু কাটা সম্ভব। এটা আসলে গ্রানিট পাথরের একটি চ্যাপটা টুকরো। এর বেশির ভাগ মাটিতে গেঁথে আছে আর ওপরের প্রান্ত দিনে দিনে বিভিন্ন কারণে য় হতে হতে বর্তমানের ধারাল আকার ধারণ করেছে। পাথরটা একদম আরোয়োর তলায়। ওটার কাছে যেতে হলে অনেকগুলো পাথর ডিঙিয়ে যেতে হবে। স্বাভাবিক অবস্থায় অ্যারোয়োর তলায় যাওয়া নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করার কিছুই ছিল না। স্রেফ হেঁটে চলে গেলেই হতো। কিন্তু এখন ওর জন্যে সেটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। হাত-পা বাঁধা শোয়া অবস্থায় গড়িয়ে গড়িয়ে যেতে হবে। পাড় থেকে তলা পর্যন্ত ঢালু। এই ঢালটুকু পেরোতে গিয়ে তাকে গড়াতে হবে অসংখ্য পাথরের ওপর দিয়ে। সেগুলোর চোখা মাথার ঘায়ে তার সারা রক্তাক্ত হবে। ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে গায়ের কাপড়চোপড়। কিন্তু উপায় নেই। এ-অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে তাকে ওই কাজটাই করতে হবে। তবু নতুন করে ব্যথা পাওয়ার কথা ভাবতে গা শিউরে উঠছে। ইতোমধ্যে কাঁচা চামড়ার রশি শুকিয়ে আরো চেপে বসতে শুরু করেছে। হাত-পা টন টন করছে ওর। উত্তপ্ত টেক্সাস সূর্য যেন তার শরীর থেকে সব রস শুষে নিচ্ছে। সব চিন্তা ঝেঁটিয়ে একপাশে সরিয়ে দিল সে। আরেকটু গড়িয়ে নিজেকে একদম কিনারে নিয়ে গেল। শরীরের ব্যথা অসহ্য হয়ে উঠেছে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত যেন বিস্ফোরিত হচ্ছে। গোঙাচ্ছে সে। মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। গড়াতে শুরু করল। পাথরের প্রথম খোঁচাটা খেল ও নাকে। তীব্র ব্যথায় মনে হলো নাকের হাড় ভেঙে গেছে যেন। ফুঁপিয়ে উঠল ও। পরণেই আরেকটা খোঁচা খেল একই জায়গায়। চোখে অন্ধকার দেখল রায়ান। শরীর থেমে যেতে চাইছে। কিন্তু ঢালু জায়গা বলে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। পরের আঘাতটা পেল মাথায়। এরপরেরটা গলায়। তারপর ঘাড়ে। একের পর এক ব্যথায় জ্ঞান হারানোর মতো হলো ওর। যখন মনে হলো, ও আর পারছে না, মরে যাচ্ছে, তখনই থামল ওর শরীর। পড়ে পড়ে গোঙাতে লাগল ও, হাঁ করে নিঃশ্বাস টানতে লাগল। শরীরের ঝাপটায় উড়ন্ত ধুলো গলায় ঢুকে খক খক করে কাশতে শুরু করল। গলা এবং নাকে পাথরের খোঁচাটা বেশ গভীর হয়েছে। রক্ত বেয়ে পড়া টের পাচ্ছে সে। চোখ মেলল। যে-পাথরটা ল্য করে সে নেমে এসেছিল ওপর থেকে, সেটার পাশে এখন ওর শরীর। পাথরটা দেখল রায়ান। ভূমি থেকে ফুটতিনেক ওপরে ওটার ধারাল প্রান্তটা। পাথরটা যেন ওকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে ওটার ধারাল প্রান্তটাকে রশি কাটার কাজে ব্যবহার করার জন্যে। কিন্তু ওর মনে হচ্ছে, ও মারা যাচ্ছে কিংবা মারা না-গেলেও যেভাবে আছে, সেখান থেকে একচুল নড়ার শক্তিও নেই। তাছাড়া অতটা উঁচু প্রান্তে সে কীভাবে শোয়া অবস্থায় হাতদুটো তুলবে বুঝতে পারছে না। এটা অসম্ভব। কিন্তু অসম্ভব কি সম্ভব তা নিয়ে ভাবছে না রায়ান। ওর মাথায় কেবল একটাই চিন্তা। ওই পাথর দিয়ে রশি কেটে ওকে মুক্ত হতে হবে। এবং সেটা এখনি। তা করতে না-পারলে নির্ঘাত মৃত্যু। বন্ধনমুক্ত হওয়ার প্রবল ইচ্ছা তার শারীরিক যন্ত্রণাকে চাপা দিল যেন। শোয়া অবস্থায় পাথরের ওপরের প্রান্তের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। নানা রকম কসরত শুরু করল উঠে দাঁড়ানোর জন্যে। কাজটা কঠিন। কোনোভাবেই যুত করতে পারছে না রায়ান। ঘামছে দর দর করে। চোখ জ্বালা করছে। একেকবার মনে হচ্ছে সে কোনোভাবেই পাথরের প্রান্ত বরাবর হাতদুটো নিয়ে যেতে পারবে না। পাথরটা আরেকটু নিচু হলে অবশ্য এ-সমস্যা হতো না। অবশ্য শারীরিক ব্যথাটাও তাকে কাজটা সহজে করতে দিচ্ছে না। তবে হাল ছাড়ছে না ও। দাঁড়ানোর আগে ওকে আগে উঠে বসতে হবে। কিন্তু হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উঠে বসাটাও কঠিন। বসতে হলে ওকে হাতের ভর দিতে হবে ভূমির ওপর। কিন্তু ওর হাতদুটো সামনে একত্র করে বাঁধা। ওদিকে পাদুটোকেও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বার কয়েক চেষ্টা করল মোচড় দিয়ে শরীরটাকে তুলে ধরতে। কিন্তু কাজটা অসম্ভব বোধ হওয়ায় সে চেষ্টা বাদ দিল। কান্তি আর যন্ত্রণায় জান বেরিয়ে যাচ্ছে রায়ানের। তবে হতাশ হচ্ছে না। জানে, হতাশ হলে মাথা ঠিকমতো কাজ করবে না। সম্ভাবনার ছোটখাট দিকগুলো তাহলে দেখতে পাবে না। ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে যত কঠিনই মনে হোক, ও জানে, কোথাও না কোথাও একটা উপায় বেরিয়ে আসবে। এখন সেটাই আগে খুঁজে বের করতে হবে। মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম নেয়ার সিদ্ধান্ত নিল রায়ান। সমস্যাটাকে খতিয়ে দেখা দরকার। সে সাথে নিজের অবস্থানটাও বুঝতে হবে। সে এখন পাথরের গোড়ায় চিৎ হয়ে পড়ে আছে। হাতদুটো বাঁধা বুকের ওপর। ওদিকে দু’পা একত্র করে বাঁধা। সুতরাং হাত বা পায়ে ভর দিয়ে চিৎ অবস্থা থেকে উঠে বসা সম্ভব হচ্ছে না। নিজেকে স্রেফ একটা উল্টে দেয়া তেলাপোকার মতো মনে হচ্ছে ওর। না, একটু পার্থক্য আছে। তেলাপোকা চিৎ হয়ে পড়লেও নিজের পাগুলো নাড়াতে পারে। কিন্তু চিৎ হয়ে থাকা রায়ান হাত-পা কোনোটাই কাজে লাগাতে পারছে না। ধরতে গেলে তেলাপোকার চেয়ে খারাপ অবস্থা ওর। উপমাটা মনে আসায় এমন অবস্থায়ও হাসি পেয়ে গেল ওর। এতে অবশ্য কিছুটা লাভও হলো। মনে মনে কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল সে। হাসির কারণে সেটা কেটে গেল। ঠিক পাঁচ মিনিট পর আবার চেষ্টা চালাল রায়ান। এতণ ধরে পাথরের সমান্তরালে পড়েছিল ও। এবার গড়ান দিয়ে সরে গেল কিছুটা। পিঠে ঘষটে ঘষটে পাগুলো সরিয়ে নিল পাথরের কাছ থেকে। মাথাটাকে এনে লাগাল পাথরের সাথে। আস্তে আস্তে আলগা করল মাথা। তারপর পিঠে ঘষটাতে ঘষটাতে পাথরের গায়ে রাখল মাথা। সেভাবে শুয়ে আবার কিছুণ বিশ্রাম নিল। মাথাটা আবার আলগা করল। আরেকটু উঁচিয়ে তুলে পাথরে গায়ে আবার ঠেক দিল। এবার ওর ঘাড় লাগল পাথরের গায়ে। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে কাজটা করতে। তবে আস্তে আস্তে আশাবাদী হয়ে উঠছে সাফল্যের ব্যাপারে। এভাবে বার কয়েকের চেষ্টায় পাথরের গায়ে পিঠ রেখে বসতে সফল হলো সে। বসে বসে হাঁফাতে লাগল কুকুরের মতো জিভ বের করে। আচমকা যেন শারীরিক ব্যথা-বেদনা কমে গেছে রায়ানের। এতণ যে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছিল তার কিছুই যেন আর নেই। আসলে মুক্তির কাছাকাছি এসে ওর ভেতরে যেন অন্যরকম এক শক্তির প্রকাশ ঘটেছে। মৃত্যুর আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার পর এখন এক দুর্ধর্ষ মানুষ ও। এমন অভিজ্ঞতা অবশ্য ওর আগেও হয়েছে। আরো অনেক বার, বিপদ কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা টের পেতেই নিজের ভেতর অমিত এক শক্তির অস্তিত্ব টের পেয়েছে। ওর পরবর্তী ল্য হলো উঠে দাঁড়ানো। এটা অবশ্য খুব বেশি কঠিন হলো। হাত-পা বাঁধা থাকা সত্ত্বেও পাথরের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর অতি কষ্টে নিজেকে ফেরাল পাথরের দিকে। ওর জন্যে বসে থাকা অবস্থায় পাথরের প্রান্তটা উঁচু হয়ে যায়, আবার দাঁড়ানো অবস্থায় বেশ নিচু হয়ে যায়। সুতরাং পাথরের ধারাল আগাকে রশি কাটার কাজে লাগানোর জন্যে রায়ানকে কুঁজো হয়ে দাঁড়াতে হলো। বেছে বেছে পাথরের আগার যে অংশটা সবচেয়ে ধারাল মনে হলো, সেখানে অনেক কষ্টে রশিবাঁধা হাতদুটো তুলল। তারপর ঘষতে শুরু করল। কাজটা যে কতটা কঠিন, ঘষতে গিয়ে টের পেল রায়ান। গরুর কাঁচা চামড়ার রশি আস্তে আস্তে শুকোতে শুরু করেছে। চামড়া কেটে বসে গেছে প্রায়। পাথরে ঘষতে গিয়ে দেখল রশির আগে নিজের হাতের চামড়ায় কেটে ছিঁড়ে যাচ্ছে। অদ্ভূত ভাবে বাঁকানো শরীর কান্তিতে কেঁপে কেঁপে উঠছে। হাতের চামড়া কেটে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে। হাতের পেশী কুঁচকে আসছে। ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যেতে চাইছে হাত। কিন্তু তারপরও থামতে পারছে না। জানে, বাঁধন থেকে মুক্তি পেতে হলে তাকে গরুর চামড়ার রশি কাটতেই হবে। কাটতে না-পারলে এই পাথরের গোড়ায় পড়েই মরতে হবে। মুক্ত হওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তিই যেন ওকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওর প্রাণান্তকর চেষ্টা ব্যর্থ হলো না। রশির একটা প্যাঁচ কাটতে পারল। এতণ ধরে বন্ধ করে রাখা নিঃশ্বাস সশব্দে বেরিয়ে এল নাক থেকে, অনেকটা ফোঁপানোর মতো করে। মিনিট দুয়েক বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করল সে। এখন যেন আর আগের মতো কঠিন মনে হচ্ছে না কাজটা। এক ঘণ্টার মধ্যে হাতের বাঁধন কেটে ফেলল রায়ান। হাতদুটো নিঃসাড় হয়ে গেছে। ডলে ডলে ওগুলোতে সাড়া আনার চেষ্টা করল রায়ান। হাতের পরিচর্যায় প্রায় মিনিট দশেক ব্যয় করল সে। এবার পা। হাত দিয়ে পায়ের বাঁধন খোলার চেষ্টা করল সে প্রথমে। গিঁঠ খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু বাঁধন যেভাবে এঁটে বসেছে, বোঝা গেল অশক্ত দুর্বল হাতে তা খোলা কিছুতেই সম্ভব নয়। কাটতে হবে। ছুরির মতো ব্যবহার করার জন্যে একটা আলগা পাথর খুঁজে বের করতে রীতিমতো বেগ পেতে হলো রায়ানকে। মুক্ত হাতদুটো ব্যবহার করে পা চেঁছড়াতে চেঁছড়াতে হামাগুড়ি দিতে লাগল ও। প্রায় আধা ঘণ্টা পর খুঁজে পেতে ইঞ্চি ছয়েক লম্বা একটা মোটামুটি ধারাল একটা পাথর পেয়ে গেল ও। হামাগুড়ি দিয়ে ফের আগের পাথরটার কাছে চলে এল ও। হেলান দিয়ে বসল। তারপর ধীরে সুস্থে পায়ের বাঁধনের দিকে নজর দিল। ঘণ্টাখানেক পরে গরুর কাঁচা চামড়ার শেষ প্যাঁচটিও কেটে ফেলল সে। আহ্, এখন সে মুক্ত।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now