বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আহমদ মুসা আর কোন কথা না বলে মনোযোগ দিল কম্পিউটারের স্ক্রীণের দিকে।
‘ভাইয়া মনে হয় আমরা সাংঘাতিক জিনিস পেয়ে গেছি।’ বলল যায়েদ। তারপর যায়েদ ‘কিবোর্ডে’ একটা বোতাম চাপ দিয়ে স্ক্রীনের একটা জিনিসের দিকে ইংগিত করে বলল, ওটা কি চিনতে পারছেন ভাইয়া।
হ্যাঁ , ওটা ‘স্পুটনিক।’ রাশিয়ার প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’ স্পুটনিকের নিচের হেডিংটা পড়ুন। বলল, যায়েদ।
‘এর বিপজ্জনক পরিকল্পরা’-পড়ল শিরোনামটি আহমদ মুসা।
স্ক্রীনের শিরনাম দেয়া পাতাটি যায়েদ ধীরে ধীরে উপরে তুলল। বলল, ‘ভাইয়া, এবার স্পুটনিকের বিপজ্জনক পরিকল্পনাটা, পড়ুন।
পড়তে লাগল আহমদ মুসা। পাতাটি ধীরে ধীরে উপরে উঠছে আর পড়ছে তা আহমদ মুসা।
পড়ার এক পর্যায় এসে আহমদ মুসা আনন্দে যায়েদের পিঠ চাপড়ে চিৎকার করে উঠল, ‘যায়েদ, এ তো আমাদের স্পুটনিকের পরিকল্পনা!
নিউইয়র্কের ‘লিবার্টি’ ও ডেমোক্রাসি’ টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য উন্মোচনে স্পুটনিক তদন্তের যে পরিকল্পনা করেছিল এবং এর যে উদ্দেশ ছিল, এ সবইতো এখানে বলা হয়েছে ! আলহামদুলিল্লাহ। থামল আহমদ মুসা।
কম্পিউটার স্ক্রীনে পাতাটি থেমে গিয়েছিল। আবার তা উপরে উঠতে লাগল। সামনে এসে দাঁড়াল পাতার দ্বিতীয় শিরনাম। যায়েদ বলল, ‘ভাইয়া পড়েন শিরোনামটা।’
‘ষ্টার ওয়ারঃ স্পুটনিককে গুলি করে নামানো’ পড়ল শিরোনামটি আহমদ মুসা। বলল, ‘তার মানে এবার স্পুটনিক ধ্বংসের পরিকল্পনা। আগাও যায়েদ।’
কম্পিউটার স্ক্রীনে পাতা উপরে উঠতে লাগল। উম্মুক্ত হতে লাগল পাতার লেখাগুলো। বলল যায়েদ, ‘ধীরে ধীরে পড়তে থাকুন ভাইয়া’ পড়তে লাগল আহমদ মুসা। তার পড়া যতই এগুলো, তার চোখে-মুখে আনন্দ-বিস্ময়ের খেলা ততই বাড়তে লাগল।
এক সময় পাতাটা কম্পিাউটার স্ক্রীনে স্থির হয়ে গেল। তার মানে দ্বিতীয় শিরোনামের বক্তব্য শেষ।
যায়েদ বলল, ‘কি বুঝলেন ভাইয়া?’
আহমদ মুসা ভাবছিল। তার ভাবনায় ছেদ নামল যায়েদের কথায়।
তাকাল সে যায়েদের দিকে। বলল, একটু ক্যামোফ্লেজ করেছে। কিন্তু ষড়যন্ত্র বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না। ওদের ‘ষ্টার ওয়ার’ টা হলো নিউইয়র্কের টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য অনুসন্ধানে স্পুটনিকের পরিকল্পনা। ‘ষ্টার ওয়ার’ বর্জন মানে স্পুটনিকের তদন্ত বর্জন করার জন্য তারা স্পুটনিকের পিসফুল ডেথ ঘোষনা করেছে। ষড়যন্ত্রের এই প্রকল্পে আরও দেখা যাচ্ছে ওদের কাছে স্পুটনিকের চেয়ে বড় হলো স্পুটনিকের সাত নির্মাতা। কারণ ‘স্পুটনিক ওয়ান’ হারালে ‘স্পুটনিক টু’ তৈরী করতে পারে। তাই স্পুটনিকের জন্য যে দন্ড সেই দন্ড সাত নির্মাতার জন্যও। তবে তার আগে সাত নির্মাতার এক্সরে প্রয়োজন ‘ষ্টারওয়ার’ অর্থাৎ টুইন টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য সন্ধানে তারা কতটুকু এগিয়েছে, কাদেরকে আরও তারা জানিয়েছে তা বের করার জন্য।’ থামল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া, আমরা এটাই বুঝেছি। তবে স্পুটনিকের ‘পিসফুল ডেথ’ ব্যাপারটা বুঝিনি।’ বলে উঠল যায়েদ ও ফাতিমা প্রায় এক সংগেই।
‘পিসফুল ডেথ’ মানে উত্তাপ-উত্তেজনাহীন নিরব মৃত্যু। স্পুটনিককে এভাবেই ধ্বংস করা হয়েছে। স্পুটনিকের সবই ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু বিল্ডিং-এর গায়ে কোন আঁচড় লাগেনি, আসবাবপত্রও সব ঠিক আছে। শুধু নেই ফাইল কাগজ-পত্র, ফিল্ম এবং কম্পিউটারের সফটওয়ার ও ডিস্কগুলো। এগুলো নেই, কিন্তু কি হয়েছে এগুলোর সামান্য নির্দশনও কোথাও নেই। মনে হতে পারে, স্পুটনিকের সাত গোয়েন্দা অফিস ছেড়ে দিয়ে ফাইল-পত্র নিয়ে কোথাও উধাও হয়েছে। এটাকে বলা হয়েছে স্পুটনিকের পিসফুল ডেথ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অদ্ভুত এ কৌশল ভাইয়া। ফারাসী গেয়েন্দারা যদি স্পুটনিকের অফিসের কেমিকেল টেষ্ট না করত, তাহলে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে তার কিছুই জানা যেত না, বলল ফাতিমা।
ফাতিমা থামতেই যায়েদ বলে উঠল, আরও মজার জিনিস ভাইয়া, আমরা যার কিছুই বুঝতে পারিনে।’
কথা বলতে বলতেই যায়েদ কস্পিউটারের কীবোর্ডে তার আঙুল চালনা শুরু করেছে। আহমদ মুসা তাকিয়ে আছে কম্পিউটারের স্ক্রীনের দিকে। বলল, মজার জিনিসটা কি যায়েদ?
‘একটা মানচিত্র ভাইয়া।’ বলেই যায়েদ কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে আঙুলি সংকেত করল, দেখুন ভাইয়া তৃতীয় একটা শিরোনাম।’
আহমদ মুসা আবার চোখ ফিরাল কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে। তাকাতেই চোখে পড়ল ‘নিউগুলাগ’ শিরোনামটা। ভ্রুকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার।
শিরোনামটা উপরে উঠে এল।
তার সাথে সাথে স্ক্রীনে ভেসে উঠল একটা মানচিত্র।
মানচিত্রটা যে একটা দ্বীপের, তা পরিস্কার বুঝা যায় তার চারদিকের রং দেখে। মানচিত্রেও বিভিন্ন বর্নের ল্যান্ড স্কেপ। মানচিত্রের নীচে লেখা ‘নিউ গুলাগ সাও তোরাহ।’
কম্পিউটার স্ক্রীনের উপর ঝুঁকে পড়েছে আহমদ মুসা।
যায়েদ, ফাতিমাও নিরব।
কিছুক্ষন পর মাথা সোজা করে বসল আহমদ মুসা। চোখ বন্ধ তার।
ভাবছে আহমদ মুসা।
মূহূর্ত কয়েকপর চোখ খুলল আহমদ মুসা। বলল, ‘এটা মজার জিনিস নয় যায়েদ। এটা ভয়ংকর একটা স্থানের মানচিত্র। মানচিত্রের নিচে ফুট নেট আকারে তারকা চিহ্নিত দু’টো প্যারাগ্রাফ পড়েছ যায়েদ?’
‘জ্বি, ভাইয়া।’ যায়েদ বলল।
‘দেখ এক নাম্বার প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে, ধর্মহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল বলে, ‘ওল্ড গুলাগ’ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ‘নিউ গুলাগে’র ভিত্তি হবে ঈশ্বরের মনোনীত ধর্ম এবং নিউ গুলাগ পরিচালনা করবে ঈশ্বরের সহস্র সহস্র বছরের পরীক্ষিত ও মনোনীত লোকেরা। দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে আছে, নিউ গুলাগ ঈশ্বরের বিশ্ব গড়ার একটা কারখানা এবং ল্যাবরেটরী। পৃথিবীর পথভ্রষ্ট মিলিট্যান্ট-মৌলবাদীদের এখানে এনে এক্সরে করা হবে এবং তার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসা চলবে, গোটা পৃথিবীতে যাতে দ্রুত ইসরাইলের ঈশ্বরের রাজত্ব কায়েম হয়।’
থামল আহমদ মুসা। একটু থেমেই আবার বলল, কি বুঝলে যায়েদ, ফাতিমা।
‘বুঝলাম, ধর্মহীন কম্যুনিষ্টদের গুলাগ ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু ইহুদীদের ধর্মের নিউ গুলাগ সফল হবে। কিন্তু ঝুঝতে পারছিনা এক্সে-রে এবং তার ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী চিকিৎসার ব্যাপারটা।’ বলল, ফাতিমা।
‘ব্যাপারটা আমার কাছেও খুব স্পষ্ট নয়। তবে যতটুকু বুঝতে পেরেছি তাতে বিষয়টা এই রকম হতে পারে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিউ গুলাগে ধরে নিয়ে যাবে। সেখানে তাদের সব কথা বের করে নেয়া হবে বা জেনে নেয়া হবে যেমন এক্সরে’র মাধ্যমে করা হয়। এর ফলাফলের ভিত্তিতেই অতঃপর গোটা দুনিয়ায় তারা অপারেশন পরিচালনা করবে।’
আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। আমারও তাই মনে হয়।’ বলল যায়েদ।
‘সবটাই ভয়ংকর ব্যাপার ভাইয়া। ঐ এক্সরের পর নিশ্চয়ই ওখানে
কাউকে বাঁচিয়ে রাখা হবে না। আর বিশ্বব্যাপী ওদের অপারেশনটা ওল্ড গুলাগের ষ্ট্যালিনের মত।’ বলল ফাতিমা। তার চোখে-মুখে আতংক।
‘ঠিক বলেছ ফাতিমা। তবে ইহুদীবদীরা এটা করবে ধর্ম, মানবতা, মানবাধিকার ও সন্ত্রাস দমনের পোশাক পরে।’ বলে একটা দম নিয়েই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘আমার অনুমান যদি মিথ্যা না হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের স্পুটনিকের সাত গোয়েন্দাকে নিউ গুলাগ সাও তোরাহ দ্বীপেই রাখা হয়েছে।’
চমকে উঠল ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনেই। তাদের দু’জনের চোখে-মুখেই নেমে এল অন্ধকার। দু’জনে এক সাথে বলে উঠল, ‘কোথায় এই দ্বীপ?’ কান্নার মত ভারী শোনাল তাদের কন্ঠস্বর।
আহমদ মুসা গা এলিয়ে দিল চেয়ারে। বলল, এটাই এখন প্রধান প্রশ্ন।’
সংগে সংগেই আবার সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা। বলল, ‘যায়েদ সবগুলোর প্রিন্ট নাও। আর চল যাবার আগে পুলিশকে টেলিফোনে সব কিছু বলে যাই।’
উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, ‘যায়েদ তুমি প্রিন্টগুলো তাড়াতাড়ি সেরে ফেল। আমি এখনি আসছি।’
আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফিরে এল পাঁচ মিনিট পরে দ্রুত। বলল, ‘যায়েদ প্রিন্ট শেষ?’
‘জি ভাইয়া।’ বলল যায়েদ।
‘তাহলে তোমরা দু’জন দ্রুত আমার পেছনে এস।’ বলেই আহমদ মুসা ঘর থেকে বেরুবার জন্য হাঁটা শুরু করল।
ফাতিমা উঠে দাঁড়িয়েছিল সংগে সংগেই। যায়েদও কাজ গুছিয়ে নিয়ে আহমদ মুসার পেছনে হাঁটতে লাগল।
তারা দ্রুত নেমে এল নিচের তলায়।
এসে বাড়ির ভেতরে প্রবেশের গেট থেকে যে করিডোরটা ভেতরে এগিয়ে এসেছে তার মুখে দেয়ালের আড়ালে ওঁৎ পেতে দাঁড়াল তারা। আহমদ মুসা তার হাতে রিভলবার তুলে নিয়েছে।
ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনেরই চোখে-মুখে উদ্বেগ। বলল, যায়েদ ‘কি ব্যাপার ভাইয়া?’ ফিস ফিস কন্ঠ যায়েদের।
‘একটা প্রাইভেট কারকে আমি বাইরের গেটে দাঁড়াতে দেখেছি। দেখেছি দু’জন লোক নামতে। এরা নিশ্চয় WFA-এর লোক। ওদের রিল্যাক্স মুড দেখে মনে হয়েছে ওরা এখানকার ভেতরের খবর জানে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কেন? আমরা এগুচ্ছিনা কেন?’ ফাতিমা বলল।
‘সামনে এগিয়ে ওদের মুখোমুখি হয়ে আমি আর লড়াই বাধাতে চাই না। আমি ওদের ধরতে চাই। এ পর্যন্ত ওদের কাউকে আমরা জীবন্ত হাতে পাইনি। ওদের কাউকে জীবন্ত হাতে পেলে ‘নিউ গুলাগ সাও তোরাহ’ দ্বীপ কোথায় জানার চেষ্টা করা যেত।
ফাতিমা ও যায়েদের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল। ফাতিমা বলে উঠল, ‘আপনার এ চিন্তা ঠিক ভাইয়া।’
‘কিন্তু ওরা তো এতক্ষনে ভেতরে প্রবেশ করার কথা। আসছেনা কেন? ঠিক আছে, তোমরা এখানে দাঁড়াও। আমিএকটু ওদিকে.....।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলনা। পেছন থেকে একটা কর্কশ কন্ঠ ধ্বনিত হলো, ‘ও দিকে নয়, এ দিকে তোমার যম আহম .......। তারও কথা শেষ হতে পারল না।
পেছনের দিকে কর্কশ কন্ঠ ধ্বনিত হবার সাথে সাথেই আহমদ মুসা অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে নিজেকে ছুড়ে দিল মেঝেতে এবং সেই সাথেই তার হাতের রিভলবার গর্জন করে উঠল পরপর কয়েকবার।
ওদিকে পেছন থেকে যে কন্ঠ গর্জন করে উঠছিল তারা ছিল দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দু’জনের হাতে উদ্যত রিভলবার। তাদের কন্ঠ থেমে যাবার সাথে সাথে তাদের রিভলবার ও গর্জন করে উঠেছিল।
আহমদ মুসা আগেই মেঝেয় ছিটকে পড়ার ফলে গুলি দু’টি তার উপর দিয়ে চলে যায়। তারা দ্বিতীয় গুলি করার আগেই আহমদ মুসার গুলি তাদের বিদ্ধ করল। বুকে গুলি খেল তারা দু’জনেই। তাদের রক্তাক্ত দেহ লুটোপুটি খাচ্ছিল মেঝেতে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
ভয় ও আকস্মিকতায় কাঠ হয়ে ফাতিমা ও যায়েদ পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়েছিল। বাকরোধ হয়ে গেছে যেন তাদের। মৃত্যুকে যেন তারা একদম চোখের উপর নাচতে দেখল। জীবন ও মৃত্যু এত কাছাকাছি!
আহমদ মুসা যদি ঠিক সময়ে মেঝতে নিজেকে ছুঁড়ে দিতে না পারতো, তাহলে ওদের প্রথম গুলিই তার বক্ষ ভেদ করত। তারপর আহমদ মুসা যদি তার গুলিগুলো করতে কয়েক মুহুর্তও বিলম্ব করতো, তাহলে ওদের দ্বিতীয় গুলীর শিকার হতো আহমদ মুসা। তারপর ওদের তৃতীয় গুলি নিশ্চয় ছুটে আসতো যায়েদ ও ফাতিমার লক্ষ্যে। তাদের পকেটে একটি করে রিভলবার আছে, কিন্তু বের করার কথা মনে হয় নি, কখন বের করবে তাও বুঝতে পারেনি। আহমদ মুসা এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন!এত ক্ষিপ্র তিনি !যা ঘটে গেল তা অবিশ্বাস্য এক ঘটনা বলে মনে হচ্ছে তাদের কাছে। তাদের স্থির চোখের শূন্য দৃষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এস যায়েদ এদের একটু চেক করি।’
বলে আহমদ মুসা ওদের দিকে এগুলো।
আহমদ মুসার কথা শুনল যায়েদ। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া হলোনা তার মধ্যে। যেমন নিশ্চল দাঁড়িয়েছিল, তেমনি দাঁড়িয়ে রইল।
আহমদ মুসা প্রথমেই ওদের জামার কলার ব্যান্ড পরীক্ষা করল। তারপর তাদের পকেটগুলো সার্চ করল। দু’জনের পকেটে দু’টি মানিব্যাগ ছাড়া আর কিছুই পেলনা। মানিব্যাগে কোন কাগজপত্র পেলনা। এমনকি কোন নেমকার্ডও নয়। শুধু কিছু ইউরো মুদ্রা রয়েছে মানিব্যাগে। মানিব্যাগ দু’টি আবার ওদের পকেটে রেখে দিয়ে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল এবং বলল, ‘যায়েদ ফাতিমা এ দু’জনের কলার ব্যান্ডে ঐ একই ইনসিগনিয়া রয়েছে।’
কথা শেষ করে একটু থেমেই আবার বলল, চলো আমরা যাই।
আশে-পাশের কোন টেলিফোন বুথ থেকে পুলিশকে এখনি খবরটা জানাতে হবে। যাতে WFA -এর কেউ এখানে আসার আগেই পুলিশ আসতে পারে, সেটাও আমাদের দেখতে হবে।
আহমদ মুসা ‘এসো’ বলে হাঁটতে শুরু করল।
নিশ্চল মূর্তির আবস্থা থেকে ওরা নড়ে উঠল এবং আহমদ মুসার সাথে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে ফাতিমা বলল, ‘এ ধরনের সংঘাতে জীবন-মৃত্যু যে কত কাছাকাছি, তা আজ প্রথম দেখলাম।
আপনার খারাপ লাগেনা ভাইয়া? একটুও চিন্তা হয়না আপনার? আমার বুক এখনোও কাঁপছে। যদি মেঝেয় ছিটকে পড়েগুলী করতে একমুহুর্তও দেরী করতেন তাহলেই তো আপনি আর থাকতেন না। আমি ভাবতেই পারছিনা এ সব কথা।’ কন্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠছিল ফাতিমার।
‘জীবন-মৃত্যু কোন বুলেটের বা কোন অস্ত্রের হাতে নয়। এর ফায়সালা আসে আল্লাহর কাছ থেকে এবং তা আসে যখন তা আসার কথা। সুতরাং এ নিয়ে ভাবনার কিছু নেই।’ তারা গেটে পৌছে গিয়েছিল।
‘ভাইয়া সামনেই রাস্তার পূর্ব পাশে টেলিফোন আছে। আমি আসার আগে দেখেছি।’ বলল, যায়েদ গেটে পৌছেই।
‘যায়েদ চল, টেলিফোনটা করবে তুমি। টেলিফোন করে আমরা পাশেই কোথাও অপেক্ষা করব। এ বাড়িটা পাহাড়া দিতে হবে, যাতে পুলিশ আসার আগে ওরা কেউ আসতে না পারে।’
আহমদ মুসা ‘এস’ বলে আবার হাঁটা শুরু করল।
‘টেলিফোনে কি বলব ভাইয়া?’ বলল যায়েদ।
‘বলবে, ‘অমুক নাম্বার বাড়িতে গোলাগুলির আওয়াজ শুনেছি। বড় কিছু ঘটছে সেখানে। ব্যস আর কিছু নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
টেলিফোন করে আহমদ মুসারা পাশেই অপেক্ষা করল। দশ মিনিটও পার হলো না। পুলিশের দু’টি গাড়ি ছুটে এল তীব্রবেগে এবং তাদের অতিক্রম করে চলে গেল বাড়িটার দিকে।
এবার যায়েদ গাড়ি ষ্টার্ট দিল যাবার জন্যে। গভীর রাতের নিরবতা ভেঙে ছুটে চলছে গাড়ি। যায়েদের পাশে আহমদ মুসা।
পেছনের সিটে ফাতিমা।
চোখ বন্ধ করে গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে আহমদ মুসা।
তিন জনেই নিরব।
নিরবতা ভাঙল যায়েদ। বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের স্বরণীয় রাত চির স্বরণীয়ভাবে কাটল ভাইয়া। আমরা খুব খুশি।’
‘তোমাদের অভিনন্দন। কিন্তু মনে রেখ, তোমাদের দু’জনের নতুন জীবন যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এবং সে যুদ্ধটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়েকে প্রতিষ্ঠার জন্য। সুতরাং এটা আমাদের সৌভাগ্য।’ যায়েদ বলল।
‘ধন্যবাদ যায়েদ, তোমাদের মত করে সব মুসলমান যে দিন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের সংগ্রাম কে তাদের জন্য সৌভাগ্যের মনে করবে, সেদিন গোটা দুনিয়ার মুসলমানদের জীবন থেকে, অন্ধকারের অমানিশা কেটে যাবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সেদিন কত দূরে ভাইয়া? ফাতিমা বলল।
‘সেটা নির্ভর করছে তোমরা তরুন-তরুনীরা কত দ্রুত সামনে আগাতে পারছো তার ওপর।’ বলল আহমদ মুসা।
ফাতিমা কোন কথার উত্তর দিল না। তার নিরব দৃষ্টি প্রসারিত হলো সামনে।
যায়েদের দৃষ্টিও সামনে প্রসারিত।
আবার আহমদ মুসা তার চোখ বন্ধ করেছে। ভাবছে সে।
এক সময় যায়েদ মুখ তুলল আহমদ মুসার দিকে। বলল, কি ভাবছেন ভাইয়া?
চোখ খুলল আহমদ মুসা। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘ভাবছি ওদের নিউ গুলাগ ‘সাও তোরাহ’ দ্বীপের কথা। কেথায় এই ভয়ংকর দ্বীপটা? কিন্তু এই মুহুর্তে তার চেয়েও বেশি ভাবছি আজকের রাতের ঘটনাকে পুলিশ কতটা, কিভাবে ব্যাবহার করবে? তারা প্রেসকে এ চাঞ্চল্যকর বিষয়টা জানতে দিবে কিনা?
বলেই আহমদ মুসা হঠৎ সোজা হয়ে বসল। তার চেখে- মুখে চাঞ্চল্যের চিহ্ন দেখা দিল। বলল দ্রুত কন্ঠে, যায়েদ ফাতিমা কোন সাংবাদিকের ঠিকানা তোমাদের কাছে আছে?
ফাতিমা, যায়েদ দু’জনেই সোজা হয়ে বসল। যায়েদ বলল, আমার কাছে কোন সাংবাদিকের টেলিফোন নাম্বার নেই। তবে আবদুল্লাহ ভাইয়ের বাসায় সাংবাদিক বুমেদিন বিল্লাহর টেলিফোন নাম্বার থাকতে পারে। কাল ঐ সাংবাদিক ভাইয়ার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ছিলেন।’
‘বুমেদিন বিল্লাহ’ মানে লা-মন্ডের সাংবাদিক যিনি প্রথম নিউজটা করেছিলেন।’
‘হ্যাঁ ভাইয়া।’ বলল যায়েদ।
খুশি হলো আহমদ মুসা। বলল, তাকেই আজ বেশি দরকার। কিন্তু তিনি কি স্ট্রাসবার্গে আছেন?
‘শুনেছিলাম আছেন। তিনি নাকি এই কেসটার ব্যাপারে আগ্রহী।’ যায়েদ বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে যায়েদ মোবাইলে তুমি তোমার ভাইয়ার বাসায় টেলিফোন কর। সাংবাদিক বুমেদীন বিল্লাহর টেলিফোন নাম্বার নাও।’ দ্রুত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
গাড়ির ষ্টিয়ারিং এ এক হাত রেখে অন্য হাতে মোবাইলে টেলিফোন করল যায়েদ। প্রথমবার ও দ্বিতীয়বারের চেষ্টাতেও টেলিফোন কেউ ধরল না। তৃতীয় বারের চেষ্টায় টেলিফোন রিসিভ করল ওপার থেকে। খুশিতে মুখ উজ্জল হয়ে উঠল যায়েদের। বুমেদীন বিল্লাহর নাম্বার সে নিয়ে নিল।
টেলিফোন অফ করে দিয়ে বলল যায়েদ, ‘আলহামদুলিল্লাহ, নাম্বারটা পেয়েছি ভাইয়া।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। এবার, মিঃ বুমেদীন বিল্লাহকে দেখ। পেলে তাকে বল, ‘শার্লেম্যান রোডের ৫নং বাড়িটা স্পুটনিক ধ্বংসকারী ও সাত গোয়েন্দাকে অপহরনকারীদের একটা ঘাঁটি। আজ রাতে ওখানে ওদের বার চৌদ্দজন লোক মারা গেছে। ওখানে ওদের ঐ অফিসে কয়েকটা কম্পিউটার রয়েছে। কম্পিউটারে স্পুটনিক ধ্বংস ও সাত গোয়েন্দাকে অপহরনের ব্যাপারে চাঞ্চলকর তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ব্যাস, এই টুকুই বললে হয়ে যাবে। এই মাত্র পুলিশ সেখানে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া’ বলে যায়েদ মোবাইল তুলে নিল। টেলিফোন করল। প্রথম বারেই ওপার থেকে সাড়া পেয়ে গেল যায়েদ। আহমদ মুসা যেভাবে বলেছিল সেই ভাবেই সব কথা যায়েদ সাংবাদিক বুমেদিন বিল্লাহকে জানাল। তারপর ওপারের কথা সে শুনল। চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল যায়েদের। ধন্যবাদ বলে সে মোবাইলটা অফ করে দিল।
আহমদ মুসা ও ফাতিমা উদগ্রীব হয়ে শুনছিল যায়েদের কথা।
যায়েদ কথা শেষ করতেই ফাতিমা দ্রুত কন্ঠে বলল, কি রেজাল্ট? কি বলল সাংবাদিক বুমেদীন বিল্লাহ?
‘খুব খুশী হয়েছেন। এখনি যাচ্ছেন উনি ৫নং শার্লেম্যান রোডে। আমাকে অনেক করে ধন্যবাদ দিয়েছেন তিনি।’ বলল যায়েদ।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ধন্যবাদ যায়েদ তোমার এ সফল মিশনের জন্য। যদি বিষয়টা পত্রিকায় আনা যায় তাহলে তো একটা বিরাট ব্যাপার হবে। ফরাসি পুলিশও তখন চাপে পড়বে।’ থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই যায়েদ বলে উঠল, ‘মিশন আমার কোথায় ভাইয়া! আমি তো মাত্র আপনার প্রক্সি দিলাম।’
‘রাখ এসব কথা। বল, আরও কিছু বলেছেন উনি? বলল আহমদমুসা।
‘একটা প্রশ্ন উনি করেছেন। সেটা হলো, কে তাদের হত্যা করল। প্রশ্ন করে তিনিই আবার তার উত্তর দিয়েছেন। বললেন সেদিন হোটেলে যে ভাবে যে কারনে মরেছে, সে ধরনের ঘটনাই বোধহয় ঘটেছে। দেখলেই বোঝা যাবে। বাড়তি একথা টুকুই তিনি বলেছেন।’ যায়েদ বলল।
‘এ কথাটুকুই অনেক কথা যায়েদ। সাংবাদিক বুমেদীন বিল্লাহ দেখছি খুব বুদ্ধিমান। আমার বিশ্বাস ওখানকার সব কিছুই তার কাছে ধরা পড়ে যাবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাই যেন হয় ভাইয়া।’ বলে উঠল ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনেই।
আহমদ মুসা আর কিছু বললনা। গাড়ির চেয়ারে গা এলিয়ে দিল ফাতিমা ও যায়েদ নিরব। আশায় উজ্জ্বল তাদের চারটি চোখ সামনে নিবদ্ধ।
ছুটে চলছে গাড়ি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now